গণিত এর চর্চা, বিশেষ করে সেটা যদি বাংলার মতো কোনো এক অনুন্নত ভাষায় করার জন্য বিশেষ ভাবে আয়োজন করে করতে হয়, তাহলে একটা গোটা কর্মকান্ডের পরিকল্পনার প্রয়োজন। এমন কর্মকান্ড অন্যান্য নানান দেশে দেখতে পাওয়া যায়, ইউরোপ আমেরিকাতে তো বটেই, ভিয়েতনাম, মেহিকো, ইরান জাপান সব দেশেতেই যেখানে উন্নত মানের গণিত চর্চার প্রচলন আছে। এই কর্মকান্ডটাকে নানান পরিসরে ভাগ করে ফেলা যায়। নিচের ছবিতে সার্বিকভাবে আমরা এই গোটা কর্মকাণ্ডটাকে পাঁচ ভাগে ভাগ করে রাখা হয়েছে।
খেয়াল করে দেখা যাবে যে এই প্রত্যেকটা পরিসরে কাজের ধরণ আলাদা, গণিতের স্তর আলাদা আর উদ্দিষ্ট পাঠক আলাদা। তাই লেখালেখি আর চিন্তার ধরণও বদলাবে। আলাদা হলেও এই কাজগুলি পরস্পর সম্পর্কিত, পরস্পর নির্ভর। এই নির্ভরতাটাকেই সবুজ কালিতে সংক্ষেপে বোঝানো হবে।
যেমন, যেকোনো আঞ্চলিক গণিত চর্চায় একটা শব্দকোষ-এর ভাণ্ডার বানিয়ে রাখতে হয়, যেটা একই সাথে আঁকর বা রেফারেন্সের কাজ করে। এই শব্দ- -কোষের অন্তর্ভুক্ত শব্দ গুলি কিন্তু সহজ পথে তৈরি হয়না। তার জন্যে ধীরগতিতে, প্রাথমিক থেকে উচ্চতম স্তরের গণিত বাংলাতে চিন্তন করতে হয়। তাই এই নানান কর্তব্যের মধ্যে পরিভাষার আগার আর উচ্চতর তাত্ত্বিক গণিতের চর্চার অঙ্গনগুলিই সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের একটা অদ্ভুত ধাঁধার মুখোমুখি হতে হয়। গণিতের সাথে সকলের পরিচয় হয় একই পথে -- সহজ স্তর থেকে শুরু করে, ক্রমশ আরো কঠিন বিষয়ে আর ধারণাতে উত্তীর্ণ হই। ওপরের ছবিটাতে গণিত চর্চার যেই পাঁচটা প্রাঙ্গনের কথা বলা হয়েছে , তাদেরকেও এমন সহজ থেকে কঠিন অংকের মাপকাঠিতে স্তরবিন্যস্ত করা যায়। অদ্ভুত ব্যাপারটা হলো, যে পাঠক অংক সহজ থেকে কঠিন শিখলেও, গণিতকারদের কাজটা শুরু করতে হবে কঠিন থেকে সহজ। অর্থাত উচ্চাঙ্গিক তাত্ত্বিক গণিতের ভাষ্য তৈরি হলেই একমাত্র একটা শব্দকোষ তৈরি হবে যার শব্দগুলি সঠিক পদ্ধতিতে সৃষ্ট হয়েছে। আবার এমন তাত্ত্বিক পাটাতন আর শব্দকোষ থাকলে সাধারণ গণিত আলোচনা একটা তাত্ত্বিক আর প্রাতিষ্ঠানিক সম্বল পায়। পাঠকের আর গণিতকারের অভিজ্ঞতা তাই চলে উল্টো-মুখে।
মনে রাখতে হবে যে ইস্কুল স্তরে, বা জন-সাধারণের জন্য গণিত চর্চায়, লেখকের আসল চ্যালেঞ্জটা কিন্তু গণিত-চিন্তা নয়, বরং তার বিবৃতিটাকে সহজগ্রাহ্য বানানো, বাস্তবের সাথে সফল ভাবে মিলিয়ে দেখানো। এই প্রাঙ্গনের গণিতচর্চায়, পরিভাষাগত শব্দের ব্যুৎপত্তি আর সৃষ্টি নিয়ে বেশি সময় ব্যায় করা যাবে না। সেই জন্যেই প্রয়োজন, আগে থেকে, আর আলাদা করে, তাত্ত্বিক চর্চায় এই পরিভাষার প্রস্তুতি।
তবে গণিতের চর্চাতে এই সম্পর্কটা সবসময়ে গণিতের জতিলতার মাপকাঠিতে নিম্নমুখি নয়। এই পাঁচতা প্রাঙ্গনেতেই কাজ চলমান থাকে। সমান্তরাল ভাবে চলে। প্রায়সই, সহজতর স্তরের কোনো গণিতের আলোচনা থেকে কোনো উদাহরণ বা বাস্তবধর্মী উপলব্ধি তুলে আনা হয় তাত্ত্বিক চর্চাতে।
সব মিলিয়ে, গণিত চর্চা এই পাঁচটা প্রাঙ্গনে সঞ্চরমান, খুবই সজীব একটা পরিমন্ডল হতে পারে।