গণিত-এর চর্চার নানান পরিসর আছে - তাত্ত্বিক, শিক্ষামূলক, বিজ্ঞানের ভাষা হিসাবে আর বাস্তব ঘটনার ব্যখ্যান যোগাতে। এই প্রত্যেকটা কাজ সুষ্ঠ ভাবে সম্পন্ন করতে চাইলে প্রয়োজন প্রতুল পরিমাণে গাণিতিক পরিভাষা। গাণিতক ধারণা ভাষা নিরপেক্ষ| এর নির্মাণ অথবা অর্থ সম্পূর্ণ যুক্তিশাস্ত্রের নিয়ম-শৃঙ্খলা থেকে তৈরি হয়। পরিভাষার কাজ হলো, এই বিমূর্ত গাণিতিক ধারণাগুলি নিজ ভাষার মধ্যে আটক করা। আমরা বাংলা ভাষিরা রোজকার নিত্য-প্রয়োজনীয় কথা বাংলাতেই কুলিয়ে নিতে পারি, কিন্তু কোনো বৈজ্ঞানিক অথবা গাণিতিক আলোচনা সামান্য জটিল হলেই আমরা ইংরাজি পরিভাষা ধার করি। বাংলা পরিভাষা না ইংরেজি পরিভাষা ব্যবহার করি তাতে কিছু এসে যায় না, গাণিতিক অর্থ অটুট থাকে। গণিত তথা যে কোনো জ্ঞান-চর্চা বাংলাতেই করা দরকার, মূলত ভাষার স্বার্থেই। আমাদের প্রয়াস হলো দুইটা -- ভাষা আর গণিত যুগ্ম ভাবে চর্চার নানান দিক গভীরে বুঝে দেখা। আর এই চর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক পর্য্যায় নিয়ে যাওয়া।
যে কোনো উচ্চাঙ্গিক গাণিতিক ধারণা দাড়িয়ে থাকে আরো প্রাথমিক ধারণা বা বোধের একটা পিরামিড বা ধাঁচার ওপরে। বাংলাতে গণিত চর্চা করা মানে কি ? মানে হলো, যে যে চিন্তার এই ধাঁচা, যেটা সম্পূর্ণ যুক্তি-তাত্ত্বিক, তার প্রতি ঘাট আর দালান বাংলা শব্দের মাধ্যমে গড়তে গড়তে ক্রমশ উচ্চতম ধারণাটাতে পৌছানো।
এমনটা করায় তিনটে লাভ আছে। প্রথমত যেই গাণিতিক ধারণাটা আমাদের মূল লক্ষ্য, তার যেই পরিভাষা তৈরি হবে তার একটা নির্ভরযোগ্য আর যুক্তি-সম্মত ব্যুৎপত্তি থাকবে, অর্থাৎ জীবন-কাহীনি বা ইতিবৃত্ত থাকবে। দ্বিতীয়ত, এর ফলে আমাদের সাধারণ ভাষার ব্যবহার এমন আত্ম-অনুসন্ধানের মধ্যে দিয়ে যাবে যে এর ফলে আমাদের সাধারণ ভাষাই আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে। তৃতীয়ত, পরিভাষা যে গণিতেরই হোক অথবা বিজ্ঞানের, সেটা জনসাধারণের জন্য একটা খুবই কাজের জিনিস। পরিভাষাগত শব্দ একটা বিরাট ভাব সম্প্রসারণ করে। এক০একটা বিরাট ধারণা আর তার নির্মাণকে একটা সংক্ষিপ্ত শব্দ বা শব্দ-বন্ধের বাক্সের মধ্যে পুরে দেয়। এর ফলে সেই ভাষার ব্যবহারকারীর কাছে খুব শক্তিশালী একটা হাতিয়ার থাকে, যেটা সে গণিতের বাইরেও ব্যবহার করতে পারে।