(ছবিতে) আবদুল হামিদ মসজিদ-এর দোরে, সোনারগাওঁ, বাংলাদেশ
(ছবিতে) আবদুল হামিদ মসজিদ-এর দোরে, সোনারগাওঁ, বাংলাদেশ
অন্যের জুতায় পা গলানো
আমাদের অনুবাদ চর্চার এক জরিপ
নতুন ধ্যান-ধারণাকে আমাদের বুলির অন্তর্ভুক্ত করতে আমাদের নতুন শব্দ ক্রমাগত বানিয়ে যেতে হয়। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে প্রযুক্তিগত আর বৈজ্ঞানিক-জ্ঞান সঞ্জাত বহু নতুন জিনিস যোগ হয়ে চলেছে। সেইগুলি ভাষায় প্রকাশ করার সময় হয় আদি ইংরাজিটাই ব্যাবহার করি, নয়তো বাংলা প্রতিশব্দ বানানোর চেষ্টা চলে। এই পর্বে এই দ্বিতীয় প্রয়াসটা আমরা খতিয়ে দেখবো। এই প্রয়াসে নামকরণের তরিকা নিয়ে অস্পষ্টতার দরুণ, আর নানান ভ্রান্ত ধারণা-বশত খুবই অকেজো নাম তৈরি হয়ে চলেছে। এই ভুল-ভ্রান্তিগুলি খতিয়ে দেখা হবে। এইটা আমাদের পরিভাষা তৈরির বৃহত্তর প্রকল্পের একটা অঙ্গ, এর উদ্দেশ্য এখানে আর নিয়মনীতি এখানে আলোচিত হয়েছে।
পরিভাষার সন্ধান, অনুবাদ – এই সব প্রচেষ্টাতেই শুদ্ধবাদিতা থেকে দূরে থাকতে হবে। ভাষা মাত্রই একটা মিশ্র জিনিস, এর শুদ্ধ-বিশুদ্ধ বিচার করা অমূলক। বাংলা-ভাষা তার বর্তমান বলিষ্টতা পেয়েছে ফার্সি, সংস্কৃত আর নানান প্রাকৃত ভাষা থেকে নেওয়া অনুসর্গ, উপসর্গ, আর প্রত্যয় থেকে। একটা চমৎকার উদাহরণ হলো "দেখনদারী" - এইখানে "দেখার" বঙ্গিয় ভাষারীতি অনুযায়ী বিশেষ্যরূপ "দেখন"-এর সাথে ফার্সি অনুসর্গ "-দারী"-র যোগে তৈরি। বাংলায় কর্তা-র নির্দেশিকার অভাব আছে বলে হিন্দুস্তানি থেকে "-ওয়ালা" আর ফার্সি থেকে "-দারি", "-দার" অনুসর্গ সুন্দর ভাবে আমাদের ভাষার অঙ্গিভূত হয়ে গেছ। বাংলায় কর্তার নির্দেশিকার অভাব মেটাতে আমরা হিন্দুস্তানি থেকে "-ওয়ালা" আর ফার্সি থেকে "-দার" ধার নিয়েছি [৬]। এই ধরণের উদাহরণে সঠিক অনুবাদচর্চার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
এই পর্বে আমাদের চোখ থাকবে নতুন জিনিস বা ধারণা বাংলায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়াসের ওপর। রবীন্দ্রনাথ তার "অনুবাদচর্চা" প্রবন্ধে [৩] দাবি করেছিলেন যে শব্দের আক্ষরিক অনুবাদ না হয়ে অনুবাদ হওয়া উচিত ধারণার, বা শব্দের ব্যাবহারিক অর্থের। প্রবন্ধটা রবীন্দ্রনাথের ভাষাজ্ঞানের অগাধ পান্ডিত্য আর বোধের প্রমাণ দেয়, যদিও আলোচনা করেছেন খুবই সহজ ভাষায়, আর উদাহরণ ধরে ধরে। একটা সাধারণ ইংরাজি লেখার বাংলা অনুবাদের নানান প্রচেষ্টা একে একে খতিয়ে দেখে এই ভুলের অগুণতি নমুনা দেখিয়েছেন। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আলোচিত এই ভুলগুলি এখনো চলে আসছে। সেই আলোচনাটাই এইখানে আরেকটু টানবো।
আমাদের আলাপে আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে একএকটা শব্দ, ধরা যাক বিশেষ্যপদ, আসলে কখনই একটা বিশেষ বস্তু বা জনিসের প্রতি নির্দেশ করেনা, আসলে নির্দেশ করে একটা "বর্গ" বা ক্যাটেগরির দিকে। বিভিন্ন জায়গায় এর বিভিন্ন মানে দাড়াতে পারে। প্রতিশব্দ সন্ধানের সময় সেইটা মাথায় না রাখলে নানান হাস্যকর অনুবাদ তৈরি হয়। যেমন ধরা যাক "ক্লাসরুম"-এর বাংলা প্রতিশব্দ, যা বহু জায়গাতেই "শ্রেণিকক্ষ" বলা হয়ে থাকে। প্রথমত "ক্লাস" শব্দটা এখন সর্বৈব ভাবে বাংলা শব্দ হয়ে গেছে। ইংরাজি ক্লাস শব্দটার অন্তত দুইটা মানে আছে, একটা হলো - পাঠদান, আরেকটা হলো "শ্রেণি"। হয়তো স্কুল পাঠ্যক্রমে বাচ্চাদের বিভিন্ন স্তরে আলাদা পাঠদান করার ব্যাবস্থা হয়েছিল বলে "শ্রেণি"-র সমনামি আখ্যা দেওয়া হয়েছিল ইংরাজি ভাষায়, সম্ভবত আধুনা পশ্চিমা শিক্ষাব্যাবস্থার চালু হওয়ার সময়। আজকের একবিংশ শতাব্দীতে এই দুইটা ধারণাকে আমরা আলাদা ভাবেই দেখি, ব্যুৎপত্তিগত কারণে দুইটাকে একেবারেই মিশিয়ে দেখিনা। সেই জন্যে "ক্লাসরুম"-এর "ক্লাস"-এর অনুবাদ "শ্রেণি" করা শুধুমাত্র অন্ধ অনুকরণ। আর "রুম"কে "ঘড়" না বলে "কক্ষ" বলতে চাওয়ার পেছনে আমাদের সংস্কৃত-পিরিতির একটা লম্বা ইতিহাস আছে। এ নিয়ে নানান উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশ্লেষণ এখানে দেখুন [৪,৫,৬]।
আমাদের প্রতিশব্দের সন্ধান অথবা অনুবাদের চেষ্টা অনেক সময় একটা লেবেল তুলে নতুন লেবেল লাগানোর প্রয়াসের মতো হয়ে দাড়ায়। কোনো জিনিসের গায়ে লেবেল লাগানোর একটা উদ্দেশ্য হয় শুধুমাত্র নির্দেশিকা হিসাবে। সেই ক্ষেত্রে অনেক সময় নতুন লেবেল লাগানোর প্রণোদনাই থাকে না। ঠিক যেমন "লেবেল" শব্দটাই। "লেবেল"-কে "তকমা" বলা গেলেও, তকমা বলে বেশি কোনো অর্থপ্রাপ্তি হবে না। সেই একই কারণে "ক্লাস"-এর বাংলা "ক্লাস" রাখাতে" কোনো সমস্যা দেখি না।
বিদ্ঘুটে কিছু অনুবাদ
ক্লাসরুম = শ্রেণিকক্ষ
ব্লুপ্রিন্ট = নীলনকশা
ফাউন্টেনপেন = ঝর্ণাকলম
ওপেন ইউনিভার্সিটি = উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
আরেকটা নমুনা দেখা যাক – ঝর্ণা কলম। কোনো ঐতিহাসিক কারণে ইংরাজিতে তরল কালির কলমকে "ফাউন্টেন পেন" আখ্যা দেওয়া হয়েছে। সেই তরল কালির কলমের তর্যমা "ঝর্ণাকলম" আমাদের মূর্খামি আর অন্ধ অনুকরণের পরিচয়। অন্যের জুতোয় নিজের পা-আটানোর চেষ্টার মতো। বাংলায় "পুস্তক" শব্দটারও এরকম একটা ঐতিহাসিক ব্যুৎপত্তি আছে। বাধানো বই চালু হয়েছিল দফতরি কাজে, আর দফতরি ভাষা ছিল ফার্সি, কোথাও কোথাও বাংলা। তখনকার দিনের বই বাধা হতো ছাগল বা ভেড়ার চামড়া দিয়ে, চামড়ার ফার্শি হলো "পোশ্ত্", সেই পোশ্ত্ থেকে কালক্রমে পুস্তক। সুলতানি, মোগল আর নবাবি আমলে যেই শ্রেণি নিযুক্ত ছিল লেখাপত্র নিয়ে, তাদের "কাগজ " (আরবি কাঘাজ্হ থেকে) নিয়ে কারবার ছিল বলে "কায়স্থ" শ্রেণির পরিচয় তৈরি। একএকটা সংজ্ঞার জন্মকাহীনি সেই ভাষার সম্পদ আর দলিল। ভাষান্তরের সময় সেই ইতিহাসকে তোয়াক্কা না করে আক্ষরিক অনুবাদ খুবই ভ্রান্ত একটা চেষ্টা।
অনুবাদ করা বা নতুন শব্দের সন্ধানের আসল উপকারিতা হলো চালু শব্দ বা সংজ্ঞাগুলির অন্তরলীন প্রতিকীশক্তিকে আরো খোলতাই করা। এ নিয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
তথ্যসূত্র
[১] কেন বাংলায় গণিত
[২] গাণিতিক পরিভাষা
[৩] অনুবাদচর্চা, শব্দতত্ত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
[৪] বাংলা ভাষার প্রমিতকরণ ও উপনিবেশায়ন - মোহাম্মদ আজম
[৫] বাংলা ও প্রমিত বাংলা সমাচার - মোহাম্মদ আজম
[৬] Bengali, Spoken and Written. Sayamacharan Ganguli (1877)