নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাব—বাংলাদেশের বিতর্ক আন্দোলনের পথিকৃৎ—১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জীববিজ্ঞানী ফাদার টিমের হাত ধরে। ১৯৮৩-৮৪ সাল থেকে ক্লাব আনুষ্ঠানিকভাবে “গোল্ড” ও “ব্লু” নামে দুটি প্রধান বিতর্ক দল গঠন করে, যেখান থেকে উঠে আসা বিতার্কিকরা কলেজ জীবনেই অসামান্য দক্ষতা প্রদর্শন করে দেশের শ্রেষ্ঠ বিতার্কিকদের কাতারে স্থান করে নেয়। সেই ধারাবাহিকতায় আজও ক্লাব নির্মাণ করে চলেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিতর্কচর্চার এক উজ্জ্বল উত্তরাধিকার।
তবে কালের স্রোতে নতুন বিতার্কিকদের মাঝে হারিয়ে যেতে বসেছে সেই অতীতের নক্ষত্রদের মুখ, যাঁদের হাত ধরে গড়া হয়েছিল ক্লাবের ভিত্তি, যাঁদের শব্দে শব্দে লেখা হয়েছিল একেকটি গৌরবময় ইতিহাস। এই প্রজন্মের কাছে তাঁদের পরিচয় যেন শুধুই একটি নাম—অচেনা, অলিখিত, অথচ অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
তাই অতীতকে বর্তমানের সাথে যুক্ত করার প্রয়াসে, উত্তরাধিকারকে জীবন্ত করে তোলার আকাঙ্ক্ষায়, গতবারের ন্যায় এবারও দ্বৈরথ সংখ্যায় যুক্ত হয়েছে ব্যতিক্রমী সংযোজন—নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবের স্বর্ণযুগের পথিকৃৎ বিতার্কিকদের সাক্ষাৎকার। এবারের সংখ্যায় আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম ২০০৭-০৮ সালের এনডিডিসি গোল্ড এর প্রাক্তন বিতার্কিক এবং প্রেসিডেন্ট (এডমিন) নাজমুল হোসান অভির সাথে। সেই সাক্ষাৎকারের উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরা হলো।
প্রাক্তন বিতার্কিক এনডিডিসি গোল্ড এবং জি.ও.ডি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। নটরডেম ডিবেটিং ক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি (প্রশাসন) ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষ। তার হাত ধরেই সূচনা হয়েছিল বর্তমান সময়ের তুমুল জনপ্রিয় টুর্নামেন্ট "ডিবেটার্স লীগের"
প্রশ্ন: নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবের প্রথম ডিবেটার্স লিগ-এর অন্যতম আয়োজক ছিলেন আপনি, যা আজ দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিতর্ক প্রতিযোগিতা। যখন ইতোমধ্যে প্রতি বছর ন্যাশনালস-এর মতো বড় আয়োজন হতো, তখন এমন একটি নতুন প্রতিযোগিতার ধারণা কীভাবে এলো? এর পেছনে আপনাদের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর: প্রতি বছর নটর ডেম ডিবেটিং ফেস্টের মূল আকর্ষণ ছিল ন্যাশনালস। আমি আর আমার কয়েকজন বন্ধু যখন ক্লাবে সময় কাটাতাম, তখনই ডিবেটার্স লিগ-এর ধারণা মাথায় এসেছিল। ন্যাশনালস-এর নকআউট সিস্টেম আমাদের খুব পছন্দ ছিল, কিন্তু এটার একটা সমস্যা ছিল। ন্যাশনালস-এ প্রতিটি বিতর্কই নকআউট—একটি ম্যাচ হারলেই বাদ। এতে অনেক ভালো দলও প্রথম রাউন্ডে বাদ পড়ে যেত। অথবা এমন কোনো দল, যারা আরও কয়েকটি বিতর্ক করলে নিজেদের উন্নতি করতে পারত, তারা সেই সুযোগ পেত না। প্রতিটি বিতর্কে তাই প্রচণ্ড চাপ থাকত। এই চিন্তা থেকেই ডিবেটার্স লিগ-এর ধারণা এলো।
আমি ব্যক্তিগতভাবে ফুটবলের ভীষণ ভক্ত। ছোটবেলা থেকে ফুটবল খেলি এবং পছন্দ করি। ফুটবলের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ-এর ফরম্যাট আমার খুব প্রিয় ছিল। তাই আমরা ভাবলাম, বিতর্কে কীভাবে এমন একটা ফরম্যাট আনা যায়? আমরা চেয়েছিলাম, বড় বড় দলের পরিবর্তে কাছাকাছি মানের দলগুলো এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিক। এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়বে এবং দলগুলোর উন্নতির সুযোগও থাকবে। আমার ধারণা ছিল, একটি প্রতিযোগিতায় যদি একটির বদলে চারটি বিতর্ক করার সুযোগ পাওয়া যায়, তাহলে বাদ পড়ার আগে প্রতিটি দল অনেক কিছু শিখতে পারবে। এভাবেই ডিবেটার্স লিগ-এর ধারণা জন্ম নেয়।
প্রথম ডিবেটার্স লিগ আয়োজনের সময় আমরা পর্যাপ্ত স্পনসর জোগাড় করতে পারিনি। কারণ, সবার আকর্ষণ ছিল ন্যাশনালস-এর দিকে। তাই আমাদের কলেজের আর্থিক সহযোগিতা নিতে হয়েছিল। আমরা প্রায় ২৫-২৬ হাজার টাকার সহযোগিতা নিয়েছিলাম। আমরা কলেজ কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করে বলেছিলাম, যদি একবার ডিবেটার্স লিগ সফলভাবে আয়োজন করা যায়, তাহলে এটা ক্লাবের দ্বিতীয় বড় আকর্ষণ হয়ে উঠবে। আমার মনে হয়েছিল, বাংলাদেশে কলেজ লেভেলে এমন একটি কার্যকর বিতর্ক টুর্নামেন্টের প্রয়োজন ছিল, কারণ এমন কিছু তখন আর কোথাও ছিল না।
ডিবেটার্স লিগ-এর সাফল্য অনেকাংশে সম্ভব হয়েছিল ভলান্টিয়ারদের কঠোর পরিশ্রম এবং সিনিয়রদের অক্লান্ত সময় দেওয়ার কারণে। আরেকটা কথা না বললেই নয়—ভিকারুননিসা, হলি ক্রস, ঢাকা কলেজের মতো অন্যান্য ডিবেটিং ক্লাবগুলো আমাদের এই আয়োজনে অনেক সহযোগিতা করেছিল। তাদের ছাড়া ডিবেটার্স লিগ আয়োজন করা অনেক কঠিন হতো। আমার মতে, ডিবেটার্স লিগ-এর মতো টুর্নামেন্ট বিতার্কিকদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের এবং নিজেদের উন্নতির দুয়ার খুলে দেয়।
প্রশ্ন: যখন আপনারা প্রথমবার ডিবেটার্স লিগ-এর প্রস্তাব কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করলেন, তাঁরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন? কী কী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছিল?
উত্তর: প্রথম এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল কলেজ কর্তৃপক্ষকে বোঝানো—এই প্রতিযোগিতার দরকার কেন? ঠিক যে প্রশ্নটা তুমি আমাকে করলে। ন্যাশনালস-এর মতো বড় আয়োজন থাকতে এমন একটা নতুন প্রতিযোগিতা কেন প্রয়োজন? আমাদের মডারেটর এবং শিক্ষকদের বোঝাতে হয়েছিল যে এই প্রতিযোগিতা বিতার্কিকদের উন্নতির জন্য এবং ক্লাবের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ করার জন্য জরুরি। আমরা খুব ভাগ্যবান যে কিছুটা হলেও তাঁদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ ছিল আর্থিক। বড় বড় প্রোগ্রামে স্পনসররা সহজেই আগ্রহ দেখায়, কিন্তু নতুন কোনো আয়োজনের ক্ষেত্রে তাদের আকর্ষণ করা কঠিন। ফলে আমাদের কলেজের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা নিতে হয়েছিল।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ ছিল বিচারকদের জোগাড় করা। ঢাকা শহরে বড় আয়োজনে বিচারক পাওয়া সহজ, কিন্তু ডিবেটার্স লিগ-এর মতো প্রতিযোগিতায়, যেখানে অল্প সময়ে অনেক টিম বারবার বিতর্ক করে, বিচারকদের কিছুটা অনীহা থাকে। তবে এর একটা ইতিবাচক দিক ছিল। এই ফরম্যাটে বিচারকরা ৭-৮টি দলের বিতার্কিকদের ভালোভাবে জানার এবং তাদের দক্ষতা মূল্যায়নের সুযোগ পান। প্রতিটি দল তিন-চারটি বিতর্ক করার সুযোগ পাওয়ায়, বিচারকদের জন্যও এটা শেখার একটা প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছিল। এই বিষয়টি তাদের আকর্ষণ করেছিল।
সবশেষ চ্যালেঞ্জ ছিল এই আয়োজনের ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা। নটর ডেম কলেজের মতো বড় প্রতিষ্ঠানে এমন একটা নতুন প্রোগ্রাম শুরু করার পর এটা যেন বন্ধ না হয়, সেটা নিশ্চিত করা। আমরা দেখতে পাচ্ছি, এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে। এবার ১৩তম ডিবেটার্স লিগ আয়োজিত হতে যাচ্ছে, যা আমাদের জন্য গর্বের।
প্রথম ডিবেটার্স লিগ-এর পর দ্বিতীয় আয়োজনে আমরা টেলিটকের স্পনসরশিপ পেয়েছিলাম। এই স্পনসরশিপ আমরা নিজেরাই ম্যানেজ করেছিলাম, ক্লাবের এক্সিকিউটিভ মেম্বাররা নয়। যেহেতু আমাদের ব্যাচই ডিবেটার্স লিগ-কে সবার সামনে তুলে ধরেছিল, তাই আমরাই এর দায়িত্ব নিয়েছিলাম। দ্বিতীয় এবং তৃতীয়বারও আমরাই স্পনসর ম্যানেজ করেছি। তাই বলতে পারি, আমরা শুধু এই আয়োজনের ধারণা দিইনি, এটাকে গড়ে তুলতেও আমাদের বড় ভূমিকা ছিল। চতুর্থবার থেকে কলেজের আর কোনো আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন পড়েনি, কারণ ততক্ষণে ডিবেটার্স লিগ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছিল
প্রশ্ন : ডিবেটার্স লিগ-এ বিতার্কিকদের নিলাম বা অকশন ফরম্যাটের ধারণা কীভাবে এলো? এই উদ্ভাবনী চিন্তার পেছনে কী ছিল?
উত্তর: অকশনের ধারণাটা আমার মাথা থেকেই এসেছিল। তিনটি ডিবেটার্স লিগ আয়োজনের পর লক্ষ করলাম, লিগটা কিছুটা একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে। কারণ, এতে নতুন বা উদ্ভাবনী কিছু ছিল না। অনেকে বলতে শুরু করলেন, “ন্যাশনালস-এ নটর ডেম আর ঢাকা কলেজের দলগুলো ডিবেট করে, আর ডিবেটার্স লিগ-এও একই দলগুলো। তাহলে নতুনত্ব কোথায়?” এই প্রশ্নটা আমার মাথায় ঘুরতে লাগল।
তখন আমি ইউনিভার্সিটিতে উঠে গেছি। গ্রুপ অফ ডিবেটার্স (G.O.D)-এর হয়ে ফার্স্ট ইয়ারে বিতর্ক শুরু করেছি। সেই সময় অভিষেক জামান ছিলেন বাংলাদেশের একজন তারকা বিতার্কিক—একজন কিংবদন্তি। তিনি আমার দুই বছরের সিনিয়র। আমি তাঁর বিতর্ক দেখে বড় হয়েছি। তাঁর সঙ্গে একই টিমে বিতর্ক করা ছিল আমার জন্য বিশাল ব্যাপার। শুরুতে এটা আমার উপর চাপ সৃষ্টি করলেও, তাঁর সঙ্গে বিতর্ক করতে গিয়ে আমি অনেক কিছু শিখলাম। এই শিক্ষা কলেজে চার-পাঁচটা বিতর্ক করেও পেতাম না। তখন আমার মাথায় এল, “যদি ডিবেটার্স লিগ-কে আইপিএলের মতো করে ফেলি?” আইপিএল তখন দুটি সিজন পার করেছে। সেখানে রঞ্জি ট্রফির খেলোয়াড়রা ধোনির মতো সিনিয়রদের সঙ্গে খেলার সুযোগ পায়। আমার মনে হল, এটা ডিবেটার্স লিগ-এর জন্য চমৎকার মডেল হতে পারে।
এই ধারণা নিয়ে আমি নিলয়, ফারাবী আর সাঈদের সঙ্গে আলোচনা করলাম। তারা তখন এক্সিকিউটিভ প্যানেলে ছিলেন—নিলয় জোসেফাইট, ফারাবী গভর্নমেন্ট ল্যাব, আর সাঈদ মতিঝিল আইডিয়াল থেকে। তাঁরা তিনজনই প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তবে এর আগে আমি আমার পরের ব্যাচের মারজুক আর নির্ঝরের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তারা একেবারেই রাজি ছিল না! বলল, “ভাই, আপনি অনেক এক্সপেরিমেন্ট করছেন। এবার জিনিসটা নষ্ট হয়ে যাবে। এটা পোলাপানের মাথায় ঢুকলে তারা গ্যাম্বলিং করবে, আরও কী কী করবে!” আমি বললাম, “এখানে তো টাকা নেই। আমরা কাল্পনিক মুদ্রা দিয়ে করব।” নিলয়রা কিন্তু এই ধারণায় খুব উৎসাহিত ছিল। কারণ, এটা তাঁদের জন্য একটা সুযোগ ছিল নতুন কিছু প্রবর্তনের। তিন বছর পর আমরা একটা নতুন ফরম্যাট নিয়ে এলাম।
মজার ব্যাপার, প্রথম অকশনে আমিই ছিলাম সবচেয়ে দামি বিতার্কিক। কিন্তু এটা আমার জন্য একটা বিপদও হয়ে দাঁড়াল। আমরা A+, A, B ক্যাটাগরির বিতার্কিকদের একটা তালিকা তৈরি করেছিলাম। আমাকে তখন তারান্নুম আপা কিনেছিলেন। তিনি আমাকে এত বেশি দামে কিনেছিলেন যে বাকি দুজন বিতার্কিক কেনার জন্য তাঁর কাছে পর্যাপ্ত মুদ্রা ছিল না। তিনি আমাকে টিমে নিতে খুব আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু এতে আমার উপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে গেল। আমার সঙ্গে যে দুজন বিতার্কিক দেওয়া হলো, তাঁদের নিয়ে আমাকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছিল। আমরা ছয়টা বিতর্ক করেছি, কিন্তু মাঝখানে আমি প্রচণ্ড চাপ অনুভব করছিলাম। কারণ, আগের দুটি ডিবেটার্স লিগ-এ আমি চ্যাম্পিয়ন এবং সেরা বিতার্কিক হয়েছিলাম। তাই আমাকে ঘিরে অনেক প্রত্যাশা ছিল।
আমি বলব না, আমার সঙ্গের দুজন বিতার্কিক খারাপ ছিলেন। একজন পরে বুয়েটে বিতর্ক করেছেন, আরেকজন নটর ডেমের ব্লু টিমে ছিলেন। তাঁরা খারাপ ছিলেন না। কিন্তু অন্য টিমগুলো একটা ভারসাম্যপূর্ণ দল গঠন করেছিল। তারা স্টার বিতার্কিকদের পেছনে না গিয়ে ব্যালেন্সড টিম তৈরি করে ভালো করেছিল। যাই হোক, সেই টুর্নামেন্টে আমি ছয়টা বিতর্ক করেছিলাম। প্রথমে কিছুটা হতাশ ছিলাম, কিন্তু পরে দেখলাম, ডিবেটার্স লিগ-এর মূল লক্ষ্য—নতুন বিতার্কিকদের শেখার সুযোগ দেওয়া—পূরণ হচ্ছে। আমার সঙ্গে যে দুজন বিতর্ক করেছিলেন, তাঁরা অনেক উপকৃত হয়েছিলেন। পরে তাঁদের সঙ্গে অনেকদিন ধরে কথা হয়েছে, আড্ডা দিয়েছি। এই বিষয়টা আমাকে খুব আনন্দ দিয়েছিল। জেতাই আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিল না; নতুন বিতার্কিকদের শেখার সুযোগ তৈরি করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
পরের ডিবেটার্স লিগ-এ আমরা নটর ডেম গোল্ডের তুরাগ, ফাহমি আর আবিরের কাছে ফাইনালে হেরে গিয়েছিলাম। এরপর সিদ্ধান্ত হলো, মিক্সড টিম আর করা হবে না, কারণ ভালো ভারসাম্যপূর্ণ টিম গঠন করা কঠিন। তাই আমরা ডিবেটার্স লিগ-কে ইন্টার-ক্লাব ফরম্যাটে নিয়ে গেলাম। এতে আমার মতো কয়েকজন বিতার্কিকের একচেটিয়া আধিপত্য কমে গেল। আমি প্রায়ই টুর্নামেন্টের সেরা বিতার্কিক হতাম বা ফাইনালে যেতাম, কিন্তু এই ফরম্যাটে গ্রুপ অফ ডিবেটার্স আর নটর ডেম গোল্ড ফাইনালে মুখোমুখি হলো। আমার টিমে ছিলাম আমি, ইয়াসিন শাফি আর সৌরভ ভাই। আমরা নটর ডেম গোল্ডের কাছে হেরে গেলাম। এটা গোল্ডের জন্য রেগুলার ছিল। কলেজে থাকতেও আমরা নটর ডেমের হয়ে যেমন বড় ক্লাবদের হারিয়ে এসেছি এখন জিওডি থেকে এসে গোল্ডের কাছে হেরেছি। প্রথমে খারাপ লাগলেও, দুই-তিন সপ্তাহ পর ভালো লাগল। কারণ, নটর ডেম থেকে এত ভালো টিম উঠে আসছে।
প্রশ্ন : ডিবেটার্স লিগ-এর শুরুর দিকে ক্লাবের সিনিয়র, এলামনাই এবং বিতর্ক সার্কিটের সাপোর্ট কেমন ছিল?
উত্তর: সাপোর্ট ছিল অসাধারণ। বিতর্ক সার্কিটের রেগুলার বিতার্কিক, সিনিয়র এবং বিচারকরা সবাই আমাদের পাশে ছিলেন। আমরা তাঁদের সঙ্গে কফি খেতাম, আড্ডা দিতাম। কলেজে থাকতে আমি আমার থেকে ১০-১২ বছরের সিনিয়রদের সঙ্গে নিয়মিত আড্ডা দিতাম। এটা আমার ক্যারিয়ারে অনেক সাহায্য করেছে। সবাই উৎসাহ দিতেন। বলতেন, “টাকা ম্যানেজ করতে না পারলে আমরা ঢাকা ইউনিভার্সিটি বা বুয়েটের অডিটোরিয়াম খালি করে টুর্নামেন্ট আয়োজনে সাহায্য করব।” আমাদের সময় ডিবেটার্স লিগ ছিল উৎসবের মতো। তখন সোশ্যাল মিডিয়া এত জনপ্রিয় ছিল না। বিতর্ক প্রতিযোগিতাই ছিল আমাদের একসঙ্গে মিলে আড্ডা দেওয়ার, দেখা করার জায়গা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবাই সাহায্য করেছেন—বিচারক নির্বাচন, আয়োজনের পদ্ধতি, সবকিছুতে। নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবের (NDDC) এলামনাই তো সবসময় পাশে ছিলেন। এছাড়া ঢাকা কলেজ, বুয়েটের এলামনাইরাও আমাদের অনেক সহযোগিতা করেছেন।
প্রশ্ন :আপনাদের সময় স্পনসর সংগ্রহের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? কীভাবে স্পনসরশিপ নিশ্চিত করতেন? কোন কৌশলগুলো সবচেয়ে কার্যকর ছিল?
উত্তর: স্পনসরশিপ মূলত ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নির্ভর করত। প্রথমে আমরা খোঁজ নিতাম, কোন বন্ধুর বাবা বা চাচা কোন প্রতিষ্ঠানে বড় পদে আছেন। সেখান থেকে শুরু করতাম। নটর ডেম কলেজের নামটা নিজেই একটা ব্র্যান্ড ছিল, যা আমাদের অনেক সাহায্য করেছে। কোথাও এপ্রোচ করার আগে আমরা ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতাম। আমরা জানতাম, কী ধরনের টপিক হবে, কীভাবে কাজ করবে। আমরা একটা বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরি করতাম, যেখানে বলা হতো, “আপনার প্রতিষ্ঠানের লোগো এখানে থাকবে।”
উদাহরণস্বরূপ, প্রাইম ব্যাংক আমাদের টানা অনেক বছর স্পনসরশিপ দিয়েছে। এটা আমার অষ্টম শ্রেণির এক বন্ধুর বাবার মাধ্যমে পেয়েছিলাম। তিনি প্রাইম ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন। সেই বন্ধু ডিবেটিং ক্লাবের সদস্য ছিল না, কিন্তু আমরা তাকে খুঁজে বের করেছিলাম। দ্বৈরথ-এর প্রথম কাভার পেজে ইউএনডিপি, দ্বিতীয় কাভারে গ্রামীণফোনের স্পনসরশিপ পেয়েছিলাম। এগুলো পুরোপুরি ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে হয়েছে। শাকিল ফজলুল্লাহ ভাই, যিনি ইউএনডিপি’র কর্মকর্তা ছিলেন, তাঁর মাধ্যমে স্পনসরশিপ পেয়েছিলাম। এছাড়া দ্বৈরথ-এর জন্য টেলিটকের স্পনসরশিপও পেয়েছিলাম। দ্বৈরথ প্রকাশ করা নিজেই একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে দ্বৈরথ-এ প্রকাশিত আমার লেখাটি পড়তে পারেন।
প্রশ্ন: সিনিয়রদের কাছে শুনেছি, আপনাদের বছরে ন্যাশনালস-এর জন্য অনেক বেশি খরচ হয়েছিল, যার ফলে দ্বৈরথ-এর জন্য স্পনসর সংগ্রহে তীব্র মার্কেটিং করতে হয়েছিল। এর পেছনের কারণ কী ছিল?
উত্তর: এটা একটা ভুল ধারণা যে আমাদের ন্যাশনালস-এ অতিরিক্ত খরচ হয়েছিল। আমাদের আগের ব্যাচে সৌরভ ভাই এবং সাজিদ ভাই ন্যাশনালস শেষ করে ফাদারকে এক লাখ বিশ হাজার টাকা সঞ্চয় হিসেবে দেখিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের ন্যাশনালস-এ আমরা মাত্র বিশ হাজার টাকা সঞ্চয় করতে পেরেছিলাম। এটা নিয়ে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। ফাদার প্রথমে বুঝতে পারেননি যে আগের ন্যাশনালস-এ ৪৮টি টিম অংশ নিয়েছিল, আর আমাদের সময়ে ৯৬টি টিম অংশ নিয়েছিল। টিমের সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ায় খরচও অনেক বেড়ে গিয়েছিল। এটাই ছিল মূল কারণ।
আমরা কখনো কাউকে অসম্মান করিনি বা অযৌক্তিকভাবে টাকা খরচ করিনি। আমি সবকিছু খুব স্বচ্ছভাবে, সবার সঙ্গে মিলেমিশে করেছি। আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ন্যাশনালস-কে সফলভাবে আয়োজন করা। টাকা সঞ্চয় করা আমার মূল কাজ ছিল না। আমাদের ফোকাস ছিল একটি উৎকৃষ্ট ন্যাশনালস উপহার দেওয়া। যদি তারপর টাকা বাঁচত, তাহলে সেটা সঞ্চয় করা হতো। কিন্তু কিছু মানুষ প্রশ্ন তুলেছিল যে আমরা বেহিসেবি খরচ করেছি কিনা। আমরা তা করিনি। আমরা খুব সৎ ছিলাম, আর হয়তো এই সততাই কখনো কখনো আমাদের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে পরে ফাদার আমাদের সততা বুঝতে পেরেছিলেন।
আমাদের সময় ন্যাশনালস-এ বিচারকদের জন্য অনেক কিছু দেওয়া প্রয়োজন ছিল—বিশেষ করে চা-নাস্তা । জানি না এখন এই সংস্কৃতি আছে কিনা। তখন বিচারকরা বলতেন, “তুমি চা-নাস্তা দিতে পারছ না? তাহলে আমাদের হতাশ করছ!” আমরা নিজেদের স্বার্থে এগুলো দিতাম। এই ধরনের ছোট ছোট খরচের কারণেই সঞ্চয় কম হয়েছিল।
এরপর আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম দ্বৈরথ পাবলিশ করব। এটা ছিল একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা যেখান থেকে পারি, সেখান থেকে ফান্ড সংগ্রহ করেছি। তুমি বিশ্বাস করবে না, ইউএনডিপি আমাদের ৯৫ হাজার টাকা দিয়েছিল। গ্রামীণফোন দিয়েছিল ৬০ হাজার টাকা। মোট আমরা তিন লাখ ষাট হাজার টাকা তুলেছিলাম। দ্বৈরথ পাবলিশ করতে আমাদের প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে, বিভিন্ন পার্টনারশিপ ম্যানেজ করতে হয়েছে। তবে দিনশেষে আমরা দ্বৈরথ সফলভাবে প্রকাশ করতে পেরেছি। এবং সেই টাকার অধিকাংশ অংশই কলেজের সেভিংস ফান্ডে জমা দিতে পেরেছিলাম।
প্রশ্ন: নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবের কার্যনির্বাহী পরিষদে কাজ করার মাধ্যমে আপনি কী কী অর্জন করেছেন? এই অভিজ্ঞতাগুলো আপনার জীবনে কীভাবে কাজে লেগেছে?
উত্তর: আমি প্রায়ই আমার জুনিয়র এবং কাছের মানুষদের সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা করি। ক্লাবের কার্যনির্বাহী পরিষদে (ইসি) কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তুমি যদি সেরা বিতার্কিক নাও হও, তবুও ইসিতে থাকার অভিজ্ঞতা একজনকে অনন্যভাবে যোগ্য করে গড়ে তোলে। তুমি ক্লাবের প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, সাংগঠনিক দায়িত্বে বা ইসির যেকোনো ভূমিকায় থাকো না কেন, এটা তোমাকে এমন দক্ষতা শেখায়, যার মূল্য তুমি বাইরের জগতে গিয়ে বুঝতে পারবে।
যখন তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে, তখন কোনো সংগঠন বা ক্লাবে কাজ করার সময় এই অভিজ্ঞতার গভীরতা উপলব্ধি করবে। আমি, উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম সোসাইটি, গ্রুপ অফ ডিবেটার্স (জিওডি) এবং ইকোনমিক্স ডিপার্টমেন্টের বিভিন্ন ক্লাবের কার্যক্রমে জড়িত ছিলাম। তখন আমি বুঝতে পেরেছি, কলেজে থাকার সময় আমি কতটা মূল্যবান দক্ষতা শিখেছি। এই অভিজ্ঞতার ফল খুবই সুদৃঢ়।
ইসিতে কাজ করার মাধ্যমে আমি সাংগঠনিক দক্ষতা, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি ও ব্যবস্থাপনা, এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্জন করেছি। উদাহরণ হিসেবে বলি, কলেজে আমাদের হাতে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকার বাজেট দেওয়া হতো। এই বাজেট ম্যানেজ করার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যে দক্ষতা তৈরি হয়, তা অসাধারণ। পরবর্তী জীবনে, যখন তুমি কোনো পেশায় বড় বাজেট নিয়ে কাজ করবে, তখন এই অভিজ্ঞতা তোমাকে আত্মবিশ্বাস দেবে। তুমি ভাববে, “আমি তো এর আগেও এরকম কাজ করেছি!”
এছাড়া, বিতর্কের মাধ্যমে অর্জিত দক্ষতা সারাজীবন কাজে লাগে। যেমন, মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে একটি বক্তৃতা প্রস্তুত করা, প্রতিপক্ষ কী বলতে পারে তা অনুমান করা, নিজের দলের কৌশল ঠিক করা—এসবের মাধ্যমে টিমওয়ার্কের অসাধারণ দক্ষতা গড়ে ওঠে। চাকরির ইন্টারভিউতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলার সাহস, যুক্তি দিয়ে নিজের মত প্রকাশের ক্ষমতা—এগুলো বিতর্কের মাধ্যমে এমনভাবে গড়ে ওঠে, যা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজে লাগে।
প্রশ্ন: ডিবেট ক্লাবের প্রতি আবেগ এবং ভালোবাসা কেমন কাজ করে? ক্লাবের মধ্য থেকে যে সম্পর্কগুলো গড়ে উঠেছিল, এগুলো এখনো টিকে আছে কি? তাছাড়া, জীবনের এই পর্যায়ে এসে যখন মূল্যায়ন করেন, এনডিডিসি থেকে কী পেয়েছেন?
উত্তর: ক্লাবের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা বোঝানোর জন্য একটা ঘটনা বলি। আমি যখন ইউরোপে পিএইচডি করছিলাম, তখন একদিন ক্লাবের ফেসবুক পেজে দেখলাম যে নটর ডেম কলেজ নাকি আর ইন্টার-ক্লাব টুর্নামেন্ট করবে না। এটা আমাকে খুব মর্মাহত করেছিল। ভাবলাম, তাহলে আমরা কোথায় দাঁড়াব? নটর ডেম কলেজ যদি ক্লাব ডিবেট না করে, তাহলে আমরা নিজেদের কী-ই বা প্রমাণ করব? আমরা তো প্রতি বছরই ভিকারুননিসা, ঢাকা কলেজের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে চ্যাম্পিয়ন হই। আমার আসল প্রতিদ্বন্দ্বিতা তো বুয়েটের বুয়েটডিসি বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওডি’র সঙ্গে। এই খবরে আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। তখনই আমরা কয়েকজন সিনিয়র একটা জুম কলে জয়েন করেছিলাম। কারন আমরা এই ক্লাব নিয়ে এতটাই আবেগপ্রবণ। এখনো সেই অনুভূতি একই রকম।
কিন্তু না এসে, না যোগাযোগ করলে কী হয়? সেই অনুভূতিগুলো ধীরে ধীরে কমতে থাকে। যেমন বলা যায়, out of sight, out of mind। তবে কিছু সম্পর্ক এখনো অটুট আছে। যেমন, মিনহাজ—২০০৭-০৮ সালের প্রচার ও প্রকাশনা সভাপতি—গতকাল আমার বাসায় ছিল। ও ইউএস থেকে এসেছে। আমরা একসঙ্গে ফ্যামিলি টাইম কাটিয়েছি। ও জানতে পেরে খুব উৎসাহিত হয়েছে যে আমি আজ কলেজে আসছি। বলল, “তুই আমাকে আগে বলিসনি কেন? তাহলে আমি কালকের সময়টা ফ্রি রাখতাম, তোর সঙ্গে যেতাম।” আমি বললাম, “তুই ইউএস থেকে এসে এত কম সময়ের মধ্যেও আমার সঙ্গে দেখা করতে ভুলিসনি।” এভাবেই এই সম্পর্কগুলো কাজ করে। এত বছর দূরে থাকলেও কিছু বন্ধন এখনো টিকে আছে।
এনডিডিসি আমাকে কী দিয়েছে? নটর ডেম গোল্ডে বিতর্ক করার সময় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসরদের সঙ্গে চা খেয়েছি, আড্ডা দিয়েছি। তারা আমার সঙ্গে বিতর্ক নিয়ে কথা বলতেন না। বাংলাদেশের রাজনীতি, উন্নয়ন, পলিটিক্স নিয়ে কথা বলতেন। কলেজ ছাত্র হিসেবে সেখানে আমার যে শিক্ষা হয়েছে, তা আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমেও পাইনি।
আমি যখন অনির্বাণ ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডা দিতাম—ডিএফআইডির প্রাইভেট সেক্টর অ্যাডভাইজার, নটর ডেম গোল্ডের অন্যতম সেরা বিতার্কিক—তিনি আমার সবকিছুর মেন্টর ছিলেন। অনির্বাণ ভৌমিকে ভাই কে দেখে আমি ঠিক করেছিলাম, উন্নয়ন খাতে চাকরি করব। এবং বিপ্লব কুমার দত্ত ভাইকে দেখে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ইকোনমিকসে পড়বো নটর ডেম গোল্ডে থাকতে আমি অনির্বাণ ভাই, বিপ্লব ভাইদের দেখতাম। তারা ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সেমিনারে যেতেন, পেপার পাবলিশ করতেন, এত ভালো বিতার্কিক ছিলেন। আমি ভাবতাম, তারা যদি নটর ডেম গোল্ড থেকে এটা করতে পারে, তাহলে আমিও পারব।
বিতর্ক আমার ক্যারিয়ারে সাহায্য করেছে। যদি কোনো জুনিয়র আমাকে দেখে মনে করে, “আমিও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় কাজ করতে পারি,” সেটাই আমার আসল অর্জন। আমার আজকের এই অবস্থানে আসার জন্য এবং এত অভিজ্ঞতার সঙ্গে নটর ডেম কলেজ এবং এই ক্লাবের অবদান জড়িত.
প্রশ্ন: বিতর্ক অঙ্গনে দেখা যায় জুনিয়রদের উপর সিনিয়রদের ছায়া থাকে, হতে পারে সেটা স্নেহের কিংবা কিছুটা কর্তৃত্বের। এই বিষয়ে আপনি কী মনে করেন?
উত্তর: আমার কথা খুব সহজ। সিনিয়রদের প্রভাব কোনো ভালো জিনিস নয়। ফুলস্টপ। এখানে কোনো তর্ক নেই। সিনিয়ররা যদি প্রভাব ফেলে, তবে সেটা ক্লাবের জন্য ভালো না, এক্সিকিউটিভ কমিটির (ইসি) জন্য ভালো না, এমনকি কলেজের জন্যও ভালো না। তবে মনে রাখতে হবে, সিনিয়রদের ইতিবাচক প্রভাব খারাপ নয়। এটা মাথায় রাখো। আমি তোমাদের একটা সহজ উদাহরণ দিই।
আমরা একটা স্ট্যান্ডার্ড জাজমেন্ট শিট চালু করেছিলাম। দেখো, আমি তখন কাজ করছিলাম এই ভেবে যে বিতর্ক সার্কেলে জাজমেন্ট শিট একেক জায়গায় একেক রকম। নটর ডেমে এক রকম, ভিকারুননিসায় আরেক রকম, এক ভার্সিটিতে আরেক রকম। আমার পরিকল্পনা ছিল, সবকিছু সরিয়ে সব জায়গায় পার্লামেন্টারি বিতর্কের জন্য একটা স্ট্যান্ডার্ড জাজমেন্ট শিট তৈরি করা। এজন্য আমি একটা জাজেস সামিট আয়োজন করেছিলাম। এটা আমার প্ল্যান ছিল। আমরা সেই জাজমেন্ট শিট পাবলিশ করে ক্লাবের কনস্টিটিউশনে যুক্ত করেছিলাম। জানি না, এখনো সেটা কনস্টিটিউশনে আছে কিনা। কিন্তু পয়েন্ট হলো, জাজমেন্ট শিট হওয়া উচিত একটা স্ট্যান্ডার্ড জাজমেন্ট শিট।
এই ধরনের চিন্তা আমরা ছোটবেলা থেকেই শিখেছি। বড় করে ভাবতে শিখেছি। বিতর্কের বাইরে, টপিকের বাইরে, কে চ্যাম্পিয়ন হলো বা হলো না, তার বাইরে। জাজমেন্ট শিট পরিবর্তন করা একটা কৌশলগত চিন্তাভাবনা। এই ধরনের সকল কাজে সিনিয়ররা অনেক সাহায্য করেছেন। ক্লাবের যত টুর্নামেন্ট হতো, সেগুলোতে সিনিয়র ভাইয়ারা বড় স্টেকহোল্ডার ছিলেন। তাঁদের ছাড়া টুর্নামেন্টগুলো আয়োজন করা সম্ভবই ছিল না।
কিন্তু কখনো কখনো মনে হতো, তাঁদের প্রভাব এত বেশি যে আমরা নিজেরা কাজ করতে পারছি না। কিছু ঘটনায় সিনিয়রদের আচরণে কষ্টও পেয়েছি। তবে দিনশেষে এই সিনিয়ররাই আমাদের ভুল ধরিয়ে দিতেন। বলতেন, “অভি, এই জায়গাগুলোয় কাজ কর, এখানে সুযোগ আছে।” বা “তারেক, হাসান, মিনহাজ, তোমরা এই জায়গাগুলোয় কাজ করো।” তখন আমরা বুঝতাম, আসলেই তো, এই জায়গাগুলোয় কাজ করার সুযোগ আছে। তাই আমরা সেটা করতাম।
তাই আমি মনে করি, হয়তোবা সিনিয়রদের অতিরিক্ত প্রভাব ভালো না। কিন্তু তাঁদের ইতিবাচক নির্দেশনাগুলোই তোমাকে ভালো কিছু করতে উৎসাহিত করবে, সেটা অবশ্যই মূল্যবান।
প্রশ্ন: নটর ডেম কলেজ প্রতিবছরই কঠোর পরীক্ষার মাধ্যমে ছাত্র ভর্তি করে, তবে ইতিহাসে একবার এই পদ্ধতির ব্যতিক্রম ঘটেছিল, সেটা আপনার বছরে। আপনার নটর ডেমে চান্স পাওয়ার গল্পটা শুনতে চাই।
উত্তর: এটা একটা মজার গল্প, শুনো। আমি আসলে নটর ডেম কলেজে চান্স পাইনি! হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছ। আমি যখন ভর্তি হই, তখন আমাদের ভর্তি পরীক্ষা দিতেই হয়নি।
আমাদের সময়ের কথা বলি। তখন সরকার একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে বয়সের ভিত্তিতে ভর্তি হবে। আমরা ছিলাম সেই প্রথম ব্যাচ। এটা নিউজপেপারে ছাপা হয়েছিল, এখন সার্চ করলেও পাবেন। আমি তো নটরডেম বাদে কোথাও থেকে ফর্মই তুলিনি। আমার রেজাল্ট ভালো ছিল, আমি রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলের ভালো ছাত্র ছিলাম। ভাবলাম, ভর্তি পরীক্ষা হলে হবে, ফিজিক্স-কেমিস্ট্রিতে মার্ক পেয়েই চান্স পাব। আমি শুধু কনফিডেন্টই ছিলাম না, বলতে গেলে ওভার-কনফিডেন্ট ছিলাম। এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের চোটে আমি কোনো কলেজের ফর্মই কিনিনি।
তারপর নোটিশ এলো, “বয়সের ভিত্তিতে ভর্তি হবে।” কিন্তু আমি তো শুধু নটর ডেমের ফর্ম জমা দিয়েছিলাম, আর কোথাও ফর্ম কিনিনি। বয়সের ভিত্তিতে আমি এখানে চান্স পেলাম না। আর আমি এতটাই আত্মবিশ্বাসী, বা বলা যায় অহংকারী ছিলাম যে, আমার স্কুল রেসিডেন্সিয়ালের কলেজ আছে, সেটাই ভুলে গিয়েছিলাম। এমনকি সেখানেও ফর্ম কিনিনি!
তাড়াতাড়ি রেসিডেন্সিয়ালে গেলাম, প্রিন্সিপাল আর ভাইস প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখা করলাম। বললাম, “স্যার, আমি তো ফর্ম কিনিনি।” তারা বললেন, “অভি, তুমি আমাদের ছেলে, তুমি আমাদের কলেজের ফর্ম কিনলে না? আমাদের তো গায়ে লাগছে!” তারপর বললেন, “আচ্ছা, তুমি আমাদের ছেলে। এখন কী করব? তোমাকে আমরা ভর্তি করব। কোনো সমস্যা নেই। তুমি আমাদের সঙ্গে থাকবে।”
এই ঘটনা মনে পড়লে আমি এখনো আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। কারণ, আমার ক্লাস এইট থেকে স্বপ্ন ছিল নটর ডেম কলেজের হয়ে বিতর্ক করা। আমি নটর ডেম গোল্ডের হয়ে বিতর্ক করতে চাইতাম। এটা ছিল আমার লক্ষ্য। কলেজ নিয়ে আমি তেমন উত্তেজিত ছিলাম না, কিন্তু গোল্ড ছিল আমার প্রথম মুগ্ধতা।
ক্লাস এইটে আমি নটর ডেম গোল্ডের বড় ভাইদের কয়েকটা বিতর্কে দেখেছি। তারা বুয়েটের সিনিয়র টিমকে বুয়েটের টুর্নামেন্টে হারিয়ে দিয়েছিল! আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম, “এরা কারা? এরা কোথায় বিতর্ক করে? এরা এমন বিতর্ক কীভাবে করে?” তখন আমি রেসিডেন্সিয়ালে সবে ক্লাস সেভেন-এইটে, বিতর্ক শুরু করেছি। এক-দুটো টুর্নামেন্টে গিয়েছি।
নটর ডেমে চান্স না পাওয়াটা আমার মা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি। আমার মা, অনেক মায়েদের মতো, বিশ্বাস করতেন, “আমার ছেলে সেরা। আমার ছেলে যা চায়, তা তাকে পেতেই হবে।” এখনো তিনি এই মানসিকতায় জীবনযাপন করেন। আমি কিছু না পেলে আমার থেকেও বেশি কষ্ট পান তিনি। আমি একপর্যায়ে মেনে নিলেও, আম্মু কখনো মেনে নিতে পারেননি। তিনি খুব কষ্ট পেয়েছিলেন।
একসময় আম্মু কলেজে চলে এলেন। কলেজের গেটে দাঁড়িয়ে অনেক অভিভাবকের মতো বললেন, “আমার ছেলেকে চান্স দিতে হবে। পড়তে দিতে হবে। আমরা হাইকোর্টে মামলা করব, রিট দেব, নটর ডেমকে পরীক্ষা নিতে হবে।”
আম্মু তখন অন্যান্য অনেক প্যারেন্টসের মতো ফাদার বেঞ্জামিনের সাথে এপয়েনমেন্ট ম্যানেজ করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলো এবং এক পর্যায়ে অনেক কষ্ট করে একটা এপয়েন্টমেন্ট ম্যানেজ করে ফেললো। আমি বললাম, “আম্মু, আমি এই কলেজে পড়ব না। আমাকে না নিলে নিক না। আমি ঢাকা কলেজে পড়ব, রেসিডেন্সিয়ালে পড়ে দেখিয়ে দেব।” আমার ইগোতে লেগে গিয়েছিল। আম্মু বললেন, “চুপ। তুই তোর বিতর্কের সার্টিফিকেট, ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ, অভিনয়, আবৃত্তি—সব সার্টিফিকেট আমাকে দে। আর তুই ক্লাস এইটে ঢাকা বোর্ডে জুনিয়র স্কলারশিপে সপ্তম বা অষ্টম হয়েছিস। সেগুলো কোথায় রাখিস? আমাকে দে। তুই আমার সঙ্গে যাবি না, আমি একা যাব।” আমি বললাম, “আচ্ছা, যা ইচ্ছা করো। আমি এসবের মধ্যে নেই।”
আমি তখন রেসিডেন্সিয়ালের ভর্তি নিয়ে ব্যস্ত। নটর ডেমের আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আম্মু আর আব্বু মিলে ফাদার বেঞ্জামিনের সাথে দেখা করলেন। দুপুরে দেখি আম্মু ফিরে এসে হাসছেন, আবার মেলোড্রামাটিকভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি বললাম, “কী হয়েছে?” আম্মু বললেন, “ফাদার বেঞ্জামিনকে আমি তোর সব সার্টিফিকেট দেখিয়েছি। বলেছি, আমার ছেলে ক্লাস এইট থেকে নটর ডেমে পড়তে চায়। অনেক ছেলেই পড়তে চায়, কিন্তু আমার ছেলে নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবের হয়ে বিতর্ক করতে চায়। এটা তার স্বপ্ন। আর এই সার্টিফিকেটগুলো তার বিতর্কের। এই কলেজের টিমে বিতর্ক করলে এটাকে আরও ভালো করা সম্ভব।”
আম্মু নিশ্চয়ই ফাদারের সামনেও কেঁদেছেন, যদিও আমাকে বলেননি। আমার ধারণা, তিনি আরও কান্নাকাটি করেছেন! তারপর ফাদার বেঞ্জামিন একটা সমাধান দিলেন। বললেন, “বাংলা ভার্সনে সিট খালি নেই। তবে ইংরেজি ভার্সনে কিছু সিট এখনো খালি আছে শূণ্য আসনের ভিত্তিতে তাকে আমরা ইংরেজি ভার্সনে ভর্তি করাতে পারি তবে আপনার ছেলে কি ইংলিশ ভার্সনে পড়তে পারবে? ওর ইংরেজি কেমন? ও তো বাংলা মিডিয়াম থেকে পড়েছে। ওর ইংরেজি ভালো হলে ইংলিশ ভার্সনে আমি তাকে জায়গা দিতে পারি।” আম্মু বললেন, “ও ইংলিশ ভার্সনেই পড়বে।” আম্মু আমাকে কোনো অপশনই দেননি। বলেননি, “তুই পারবি?” বা “এটা কি চ্যালেঞ্জিং হবে?” হঠাৎ ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথ ইংরেজিতে পড়া শুরু করা কি সহজ? আম্মু বললেন, “তুই ইংলিশ ভার্সনে ভর্তি হবি। আমি বলে এসেছি।” আমি বললাম, “আচ্ছা, ঠিক আছে। লেট মি ডাইজেস্ট।”
আমার আব্বা কিন্তু কনভিন্সড ছিলেন না। তিনি বললেন, “না, না। ইংলিশ ভার্সনে পড়তে গিয়ে যদি রেজাল্ট খারাপ করে? ইন্টারমিডিয়েট বেশি গুরুত্বপূর্ণ, বিতর্ক না।” আব্বা আমার দুই-একজন ইংরেজি শিক্ষকের সঙ্গে কথা বললেন। আমি ইংরেজিতে ভালো ছিলাম। ইংরেজি বিতর্ক, এক্সটেম্পোর স্পিচ দিতাম। ভালো ছাত্র হওয়ায় ইংরেজিও ভালোভাবে শিখেছিলাম। শেষ পর্যন্ত ইংলিশ ভার্সনেই ভর্তি হলাম।
এখান থেকেই আমার যাত্রা শুরু। আমি সবাইকে বলি, আমি আসলে কলেজে পড়িনি, আমি ক্লাবে পড়েছি। কলেজ আমার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। (সরি, কলেজ অথরিটি হয়তো এটা পছন্দ করবে না।) আমার কাছে ক্লাবই ছিল সবকিছু। আর এটা পুরোটাই ছিল নাটকীয়!
প্রশ্ন: আপনাদের সময়ে নটর ডেমের টিম সিলেকশন প্রক্রিয়া কেমন ছিল? আপনার নটর ডেম গোল্ডে আসার যাত্রাটা জানতে চাই।
উত্তর: আমার নটর ডেম গোল্ডে নির্বাচিত হওয়ার গল্পটাও বেশ নাটকীয়। আমি রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল থেকে এসেছিলাম, যেখানে বিতর্কের কোনো বলার মতো ঐতিহ্য ছিল না। আইডিয়াল, সেন্ট জোসেফ, গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি, এমজিবিএস—এই স্কুলগুলোর স্কুল লেভেল বিতর্কে তখন দারুণ ঐতিহ্য ছিল। এমনকি সেন্ট গ্রেগরিও ছিল বড় নাম। কিন্তু রেসিডেন্সিয়াল? লোকে বলত, “কে তুমি? কোন স্কুল থেকে এসেছ?” আমি বলতাম, “রেসিডেন্সিয়াল।” তারা বলত, “ও, তুষার ভাইয়ের স্কুল? আবদুন নূর তুষারের?” “তোমরা বিতর্ক পারো?” এরকম কথাবার্তা আমাকে পিছিয়ে দিত।
আমাকে অনেক লড়াই করতে হয়েছে। আমাদের আগের ব্যাচ গোল্ড আর ব্লু টিমের সব মেম্বারই খুবই যোগ্য ছিল। প্রত্যেকে অসাধারণ পারফর্ম করত। আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ, কারণ তারা সিলেকশন প্রক্রিয়াটাকে খুব সুনির্দিষ্ট আর গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল। আমি জানি না এখন গোল্ড-ব্লু সিলেকশন কীভাবে হয়, কিন্তু তখন এটা ছিল প্রায় বিসিএস পরীক্ষার মতো! প্রথমে একটা লিখিত পরীক্ষা, তারপর প্রিলিমিনারি রাউন্ডে একটা ছোট উপস্থিত বক্তৃতা। এরপর সেকেন্ড রাউন্ড, তারপর ফাইনাল রাউন্ড।
আমাদের সময় মনে হয় প্রায় ২৪৮ জন লিখিত পরীক্ষা দিয়েছিল। সেখান থেকে শর্টলিস্ট হয়ে, এক রাউন্ড থেকে আরেক রাউন্ডে গিয়ে, আমরা শেষ দশে পৌঁছেছি। শেষ দশে যখন গেলাম, সেমিফাইনাল রাউন্ডে আমি ভালো করিনি। সিনিয়ররা আমাকে বলে দিয়েছিল, “তুমি ষষ্ঠ বা সপ্তম হয়েছ। এটা শেষের দিকে। ফাইনাল রাউন্ডে ভালো না করলে ব্লু টিমও হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে, গোল্ড তো দূরের কথা।”
কিন্তু আমার একটা ব্যাপার আছে—চাপের মুহূর্তে, আলহামদুলিল্লাহ, আমি ভালো পারফর্ম করি। প্রেশার সিচুয়েশনে আমি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো! আমি সবসময় চাপের মধ্যে নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছি। তো, সেমিফাইনালে সপ্তম হওয়ার পর ফাইনাল রাউন্ডে আমি প্রচণ্ড চাপ নিয়ে গেলাম। আর সেই ফাইনাল রাউন্ডে আমি বেশ ভালো ব্যবধানে প্রথম হলাম। আমি কৃতজ্ঞ আমার সিনিয়রদের প্রতি, কারণ তারা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ওয়েটেড সিস্টেম ব্যবহার করেছিল। ফাইনাল রাউন্ডের জাজরা ছিলেন অনেক সিনিয়র, তাই সেই রাউন্ডের ওজন বেশি ছিল। সেমিফাইনালের জাজরা ছিলেন মিড-লেভেল, তাই তার ওজন কম ছিল। এর ফলে আমি ভাগ্যবশত তৃতীয় মেম্বার হিসেবে গোল্ড টিমে চান্স পেলাম।
গোল্ড টিমের ফরমাল অ্যানাউন্সমেন্টের দিনও আমাকে সিনিয়ররা বলেছিল, “গোল্ডে চান্স পাওয়াই যথেষ্ট না। ভালো বিতর্ক করতে হবে। তিন-চার মাসের মধ্যে ভালো না করলে আমরা কিন্তু টিম চেঞ্জ করে দেব।” আমি বুঝতে পেরেছিলাম, এটা আমার প্রতি একটা ইঙ্গিত, আমাকে একটু ছোট করা হচ্ছে। কিন্তু আমি এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। তারপর, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর রহমতে আমি আমার ব্যাচে ‘ডিবেটার অফ দ্য ইয়ার’ হতে পেরেছি।
প্রশ্ন: অনেক সিনিয়র বলেন, তাঁদের ব্যাচে গোল্ড-ব্লু বিতর্কে এত বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো যে ব্যক্তিগত সম্পর্কেও তার প্রভাব পড়ত। আপনাদের ব্যাচেও কি এমন ছিল?
উত্তর: না, গোল্ড-ব্লু’র মধ্যে আমাদের ব্যাচে এমনটা হয়নি। তবে অন্য জায়গায় হয়েছে। যেমন, বুয়েটের কিছু বন্ধুর সঙ্গে আমার সম্পর্ক বেশ ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়- গ্রুপ অফ ডিবেটার্স(G.O.D) আর বুয়েট ডিবেটিং টিমের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে। গোল্ড-ব্লু’র মধ্যে আমাদের মধ্যে এমন কিছু ছিল না, কিন্তু বুয়েটের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আমাকে ব্যক্তিগতভাবেও প্রভাবিত করেছিল।
দেখো, বুয়েটের কিছু বন্ধু, যারা আমার সমবয়সী বা কাছাকাছি জুনিয়র, তারা নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবেও ছিল। আমরা একই ব্যাচের বিতার্কিক ছিলাম। এমনও হয়েছে, আমার টিমমেট তারেক, যে বুয়েটের মূল টিমে বিতর্ক করত, আমি তখন G.O.D-এ। আমরা দুজনেই গোল্ডে একসঙ্গে ছিলাম। বুয়েটের সঙ্গে আমাদের রেকর্ড ছিল অপ্রতিরোধ্য! শুধু একবার হেরেছি, তাও সেটা বুয়েটের টুর্নামেন্টের ফাইনালে, বুয়েটের কাছে!
একটা মজার ইতিহাস বলি। বুয়েটের পঞ্চম ন্যাশনাল ডিবেট টুর্নামেন্টে আমরা—আমি, সৌরভ ভাই আর মারজুক—G.O.D নামে বিতর্ক করতে গিয়েছিলাম। আমরা তিনজনই নটর ডেমের। সৌরভ ভাই ব্লু টিমে ছিলেন, মারজুক আমার পরের ব্যাচের গোল্ড, আর আমি আমার ব্যাচের গোল্ড। এর আগে বুয়েট তাদের টুর্নামেন্টে টানা চারবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। চতুর্থবার আমরা রানার্স-আপ হয়েছিলাম। কিন্তু পঞ্চমবারে প্রথমবারের মতো একটি নন-বুয়েট টিম চ্যাম্পিয়ন হলো, আর সেই টিমে ছিলাম আমি!
একটা মজার কথা বলি। জানো, সিলভার টিমও আমাদের ব্যাচ থেকেই প্রথম শুরু হয়েছিল? হ্যাঁ, নটর ডেমের ইতিহাসে এটা প্রথম। তবে এটা কাগজে-কলমে পাবে না। কারণ আমরা তখন গোল্ড আর ব্লু ছিলাম, সিলভারকে খুব একটা স্বীকার করতাম না! আমরা বন্ধুদের সঙ্গে ঠাট্টা করতাম, আর তারাও এটা মাইন্ড করত না। তাদের দলের মূল উদ্দেশ্য ছিল কলেজ থেকে তৃতীয় টিম হিসেবে বিতর্কে অংশ নেওয়া।
কিন্তু পরে আমাদের ব্যাচে প্রথমবারের মতো সিলভার টিমকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আমাদের ব্যাচে নয়-দশজন ভালো বিতার্কিক ছিল। ফাদার অ্যাডাম বলেছিলেন, “সবাই যেহেতু ভালো বিতার্কিক তাদের একটা নাম দিয়ে আমরা পাঠাতে পারি। অনেক টুর্নামেন্টে তিন-চারটি টিম পাঠানো যায়। তাহলে কেন নয়?” আমরা বললাম, “হ্যাঁ, ঠিক আছে। তবে কতক্ষণ পর্যন্ত? গোল্ড-ব্লু থেকে সিলভারকে আমরা কোনো ছাড় দিচ্ছি না!” গোল্ড-ব্লু আগে জিতবে, তারপর সিলভারকে সুযোগ দেওয়া হবে!
মজার ব্যাপার হলো, কয়েকটা টুর্নামেন্টে নটর ডেমের সিলভার টিম ব্লু টিমকে কোয়ার্টার ফাইনালে এবং সেমিফাইনালে হারিয়ে দিয়েছিল। তখন একটা তুমুল টেনশন তৈরি হয়েছিল। ব্লু আর সিলভারের মধ্যে দুই-তিন মাস ধরে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছিল। আমরা সিলভারকে নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করলাম, “আরে, তোদের কেন সিলভার বলছে? ব্লু বলা উচিত না?” এগুলো সবই মজার ছিল।
আমার মনে আছে, পরের ব্যাচে ইথার, তুরাগদের ব্যাচের ইথার, যখন সিলভারে ছিল, তাদের টিমটা বেশ ভালো ছিল। তারা প্রায় ব্লুকে হারিয়ে দিত। তখনই আলোচনা শুরু হলো, “চলো, সিলভারকেও নিয়মিত টিম হিসেবে গণ্য করি।”
প্রশ্ন: আপনি যখন সিদ্ধান্ত নেন বিতর্ক ছেড়ে দেবেন, তখন আনুষ্ঠানিকভাবে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিলেন এবং নটর ডেমের টুর্নামেন্টে এসে বিতর্ক থেকে অফিশিয়ালি “রিটায়ার” করেন। সেই গল্পটা জানতে চাই।
উত্তর: এটা আমার জন্য খুবই বিশেষ ছিল, কারণ আমার শেষ বিতর্কটা ছিল নটর ডেম কলেজে—নটর ডেম ন্যাশনাল টুর্নামেন্টে, ২০১২ সালে। ওটাই ছিল আমার শেষ বিতর্ক। আর আমি কিছু বাজে ট্রেন্ড শুরু করেছিলাম, সেটার দায় আমি নিজেই নেব। আমি বিতর্ক ছেড়ে দেওয়ার আগে একটা রিটায়ারমেন্ট টাইপের ফেসবুক পোস্ট দিয়েছিলাম। আমার মনে হয়, আমিই প্রথম এটা করি। এজন্য আমাকে অনেক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। অনেক সিনিয়র আমাকে বেশ ধোলাই দিয়েছেন!
নটর ডেম টুর্নামেন্ট শুরুর দুই সপ্তাহ আগে আমি লিখেছিলাম, “দুই সপ্তাহ পর এই টুর্নামেন্টে আমার শেষ বিতর্ক হবে। এরপর আমি আর বিতর্ক করব না।” এই পোস্টটা এখনো আছে। সেদিনও একজন বলল, “ভাই, তুমিই এই ট্রেন্ড শুরু করেছ, আর এটা এখনো চলছে!” খারাপ কিছু করেছি আরকি।
ওই টুর্নামেন্টটা আমার জন্য একটা স্বপ্নের মতো ছিল। ফাইনালে হেরিংটনের ২০১ নম্বর রুমে, ভর্তি অডিয়েন্সের সামনে আমি শেষ বক্তব্য দিলাম। পুরো রুম দাঁড়িয়ে গেল স্ট্যান্ডিং ওভেশন দিতে। এটা আমার জীবনের শেষ বিতর্ক বলে নয়, বরং সেদিন আমি আমার জীবনের সেরা বিতর্ক পারফরম্যান্স দিয়েছিলাম। সেই পারফরম্যান্সের জন্যই সবাই দাঁড়িয়েছিল। এমনকি সানা ভাইয়ের মতো সিনিয়ররাও দাঁড়িয়েছিলেন।
সানা ভাই পরে স্টেজে কিছু কথা বলেছিলেন, যেগুলো আমার চিরদিন মনে থাকবে। সানা ভাই ছিলেন আমার মেন্টর, আমার বড় ভাই, G.O.D-এর একজন কিংবদন্তি। তিনি বলেছিলেন, “আজ ছিল অভির দিন। আজ যে কেউ ভালো বিতর্ক করলেও কাজ হতো না।” আমি শেষ বিতর্কটা কোনো স্ক্রিপ্ট ছাড়াই করেছিলাম। শুধু দাঁড়িয়ে কথা বলেছি। সানা ভাই নিজেই বলেছিলেন, “আর এক-দুই মিনিট বেশি কথা বললে আমি নিজেই কেঁদে দিতাম।”
টপিকটা বাংলাদেশের কী নিয়ে ছিল, ঠিক মনে নেই। তবে আমি বাংলাদেশের মানুষকে বেশ ধোলাই দিয়েছিলাম। আর ওই টুর্নামেন্টে আমি বেস্ট ডিবেটারও হয়েছিলাম। যখন অডিটোরিয়ামে পুরস্কার নিতে গেলাম, তুরাগ খুব সিনেমাটিকভাবে ঘোষণা দিল, “আমাদের সবার বিতর্ক এভাবে শেষ হয় না…” তখন আবার পুরো অডিটোরিয়াম দাঁড়িয়ে স্ট্যান্ডিং ওভেশন দিয়েছিল। ছবিগুলো এখনো আছে। শুভজিৎ মজুমদার সেগুলো আপলোড করেছিল। এই কারণে নটর ডেম কলেজ আমার কাছে খুব আবেগের জায়গা।
প্রশ্ন: অনেক বিতার্কিক তাঁদের বিতর্ক ক্যারিয়ারকে দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যান, কিন্তু আপনি তারকা বিতার্কিক হওয়া সত্ত্বেও ভার্সিটি লাইফে খুব তাড়াতাড়ি বিতর্কের ইতি টেনে ফেলেছিলেন। এর পেছনের কারণ কী?
উত্তর: বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রুপ অব ডিবেটারস (G.O.D)-এর হয়ে তিন বছরে আমি অনেক বিতর্ক করেছি। তিন বছরে ১৯টি টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছি, ১৭টি ফাইনালে গেছি, দুটিতে রানার্স-আপ হয়েছি, আর ১৫টি চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছি। আমি সেই ধরনের বিতার্কিক ছিলাম না, যে খুব সুন্দর বাংলা বলে মানুষকে মুগ্ধ করে ফেলে। বরং আমি এমন ছিলাম, যে টুর্নামেন্ট জিততে পারে। মেসি রোনাদলোর সাথে তুলনা করলে আমাকে রোনালদোর কাতারে রাখতে পারো!
আমি তিন বছরের বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্ক করিনি। অনেককে দেখেছি, তারা মাস্টার্সের পরেও বিতর্ক করে। এটা আমার ভালো লাগে যে তারা এটাকে পেশাদারভাবে নেয়, কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়, বিতর্ক ছাড়া তাদের আর কিছু করার নেই।
একটা জিনিস আমি লক্ষ্য করেছি। আমার দেখা ৯৬-৯৭ শতাংশ বিতার্কিক তাঁদের অহংকার থেকে বের হতে পারেন না। এটা খারাপ। আমিও একসময় তেমন ছিলাম। আমি বলব না আমি ধোয়া তুলসীপাতা ছিলাম। আমি নিজেও অনেক অহংকারী ছিলাম। কিন্তু এই অহংকার যদি দীর্ঘদিন চলতে থাকে, তাহলে এটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
সেদিন বিটিভিতে লেবার মার্কেট নিয়ে একটা বিশেষ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। উদ্ভাসের একটা ক্যারিয়ার আড্ডাতেও বাবলা আমাকে ডেকেছিল। এসব জায়গায় গিয়ে বুঝতে পারি, বিতর্কের অভিজ্ঞতা আমাকে পাবলিক প্ল্যাটফর্মে কথা বলতে কতটা সাহায্য করেছে। তবে এটা নিয়ে বেশি গর্ব করা উচিত নয়। কারণ এটা শুধুই একটা “এড-অন”। এড-অনের ওপর ভর করে তুমি জীবনের ২৪-২৫ বছর কাটাতে পারো না। দিনশেষে এটা একটা সহশিক্ষা কার্যক্রম।
আমি অনেক বিতার্কিককে দেখেছি, যারা তাদের কমিউনিকেশন স্কিলের ওপর ভর করে ক্যারিয়ার গড়েছেন। যেমন, কেউ কেউ জাতিসংঘের কমিউনিকেশন সেক্টরে কাজ করছেন, কেউ সাংবাদিকতায়। কিন্তু আমার মনে হয়, বিতর্ক শুধু একটা টুল, পুরো ক্যারিয়ার নয়।
প্রশ্ন: কালের বিবর্তনে নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবের অতীত ঐতিহ্যের অনেকটুকুই আজ আর নেই। ক্লাবের পুরানো ঐতিহ্যগুলোকে নতুনভাবে জাগিয়ে তোলার জন্য কী করা উচিত বলে মনে করেন?
উত্তর: আমার মনে হয়, নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবের একটা দীর্ঘ ইতিহাস আর ঐতিহ্য আছে, তাই না? আমি ধরে নিচ্ছি যে সবকিছু নষ্ট হয়ে যায়নি। হয়তো বেশিরভাগ জিনিস এখনো টিকে আছে, কিন্তু কিছু কিছু জিনিস এখন ভিন্নভাবে হচ্ছে। এটা আসলে প্রত্যাশিতও। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, মানসিকতা বদলেছে। আমি এটা বেশ উপভোগ করি। তবে আমার মনে হয়, সিনিয়রদের কাছ থেকে তাদের গল্প শোনার ঐতিহ্যটা ধরে রাখা উচিত। কারণ আমাদের ক্ষেত্রে এটা অনেক কাজে দিয়েছে।
উদাহরণ দিই, আমি যখন কলেজে ছিলাম, তখন এমন হয়েছে যে আমি একজনের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছি, যিনি গ্রামীণফোনের জেনারেল ম্যানেজার। লাখ লাখ ডলারের পোর্টফোলিও পরিচালনা করেন তিনি। আর আমি তার সঙ্গে কলেজ জীবন থেকে আড্ডা দিয়ে আসছি! এটা আমার মধ্যে কিছু একটা জাগিয়েছিল। অনেক পরে বুঝেছি, এটা আমাকে কতটা পরিপক্কভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছে।
আরেকটা জিনিস, ক্লাবের মধ্যে সেই “উদ্দীপনা” বা “হাঙ্গার” থাকতে হবে। যদি আমরা সবসময় কমফোর্ট জোনে থাকি, তাহলে কিছুই হবে না। নিজেদেরকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। যেমন, ডিবেটরস লিগ ১৩-১৪ বছর ধরে চলছে। এটাকে আরও নতুনভাবে কীভাবে করা যায়, সেটা ভাবতে হবে। সবসময় নতুন কিছু করার আগ্রহ থাকা জরুরি।
একটা র্যান্ডম আইডিয়া দিচ্ছি। আমাদের ডিবেটরস লিগে একটা বা দুটো “শো ডিবেট” হতে পারে, শুধু পলিসি নিয়ে। বাংলাদেশে এখন পলিসি নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাব (এনডিডিসি) থেকে একটা ডিবেট আয়োজন করা যেতে পারে, যেখানে প্রফেশনালদের নিয়ে আসা হবে। এটা স্পনসরদের জন্যও আকর্ষণীয় হবে। ধরুন, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ইউএনডিপি-র প্রফেশনালরা এসে বাংলাদেশের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পলিসি নিয়ে বিতর্ক করছেন। এমনকি সিনিয়র প্রফেশনালরা, যারা একসময় বিতর্ক করতেন, তাদেরও ডাকা যেতে পারে। যেমন, জিল্লুর রহমানের মতো বড় নাম। এমনকি ডিবেটটা স্ক্রিপ্টেডও হতে পারে। স্ক্রিপ্ট তৈরি করে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে জমা দেওয়া যেতে পারে, আয়োজনে থাকবে নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাব।
কারণ, ইতিহাসে দেখুন, আমাদের ক্লাবের উপদেষ্টা ছিলেন ডক্টর কামাল হোসেন, জিল্লুর রহমানের মতো ব্যক্তিত্ব। আমাদের এই অ্যাক্সেস আছে। শুধু একটু “আউট অফ দ্য বক্স” ভাবতে হবে আর নিজেদেরকে একটু পুশ করতে হবে। আমরা যেসব কাজ রুটিনে করি, সেগুলো তো ভালোভাবেই করব। এটা আমাকে অবাক করে না।
আমার প্রিয় দলের খেলা আমি কখনো সেমিফাইনালের আগে দেখি না। কারণ সেমিফাইনাল পর্যন্ত তো ওরা এমনিতেই উঠবে। তারপর দেখব আসল খেলা, গৌরবের লড়াই। তোমাদেরও নিজেদের ক্ষেত্রে এটা মনে রাখতে হবে। তোমাদের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে ভাবতে হবে। আর আমরা শ্রেষ্ঠ। ঠিক আছে? শুধু চিন্তার ধরনে একটু পরিবর্তন আনতে হবে।
সিনিয়রদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলে দেখবে, কত আইডিয়া কফির দোকানে, আড্ডায় তৈরি হয়। ফাহমি, তাহমিদ, শৌভিক, কুন্দ্র, সৃজন, নুহাশ, ইথার—এদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে কত কিছু হয়েছে। আমার বাসায় মিটিং বসত। এখন হয়তো আমাদের সেই সময় দেওয়া অনেকের পক্ষে সম্ভব না, জীবনের অগ্রাধিকার বদলে গেছে। আমি নিজেও অবাক হই, আমাদের সিনিয়ররা আমাদের জন্য এত সময় কীভাবে বের করতেন! আমরা এখন সেটা সহজে পারছি না। তবে এটা মানে এই না যে আমরা একেবারেই পারব না। ঠিক আছে?
তোমাদের সঠিক পথটা খুঁজে বের করতে হবে। যেমন, নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবের একজন অসাধারণ মেধাবী, নিলয়, এখন দেশে আছে। সে বিএটি-তে কাজ করে, সেন্ট জোসেফের ছেলে। আমি দেখা সবচেয়ে তীক্ষ্ণ বিতার্কিকদের একজন। সে এখন কর্পোরেট জগতে বড় নাম। কানাডায় কাজ করেছে, এখন বাংলাদেশে ফিরেছে। তাকে নিয়ে এসো। তার গল্প শোনো। বছরে এরকম দুই-তিনটা আয়োজন করতে পারলেও তো অনেক কিছু হয়ে যায়।
আমি বা নিলয় হয়তো এখন বিতর্কের যুক্তি শেখাতে পারব না। আমি জানি না নিলয় পারবে কিনা, তবে আমার তিন ব্যাচ জুনিয়র হওয়ায় তারও স্বাভাবিকভাবে পারার কথা না। কিন্তু আমরা শেয়ার করতে পারি, আমরা কীভাবে কাজ করতাম। যেমন, ইমতিয়াজ ফারুক ভাইকে যখন আনতাম, তিনি ক্লাব রুমের পর্দা কেনার গল্প পর্যন্ত খুলে বলতেন। কীভাবে আমরা ফরম্যাট তৈরি করেছি, সব শেয়ার করতেন। এসব শুনলে তোমরা বুঝবে, তুমি একটা বড় ইতিহাসের অংশ। এটা তোমাদের আত্মবিশ্বাস দেবে। জীবনে এটা কাজে লাগবে।
নিজেরা ভালো করছ, এটা ঠিক আছে। কিন্তু আরও বড় কিছু ভাবতে হবে। আমি বেশি উপদেশ দিতে চাই না। আমার বয়সী লোকেরা হয়তো এখন দেখা হলে একটু বেশিই উপদেশ দেয়। এটা একটা বিপদ!