দ্বৈরথ
HEAVY IS THE CROWN
যুগে যুগে দ্বৈরথের রণধ্বনি মানবসভ্যতার হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত—কখনো কুরুক্ষেত্রে অর্জুনের গাণ্ডিবের ঝংকারে, কখনো ট্রয়ের রণাঙ্গনে একিলিসের বিজয় নিশানে। সিংহাসনের লোভে, আদর্শের অগ্নিতে জ্বলে বীরেরা রক্তাক্ত যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু মুকুট, যা গৌরবের প্রতীক, তা দায়িত্বের ভারী শৃঙ্খল। অশোকের ধ্যানমগ্ন বিবেক, সিরাজের প্রতিরোধের আগুন, বা লিংকনের নির্মম সংগ্রাম সাক্ষ্য দেয়—শিখরে আরোহণ নয়, মুকুটের ভার বহনই আসল দ্বৈরথ।
আজ দ্বৈরথ রণক্ষেত্র থেকে বিতর্কের মঞ্চে স্থানান্তরিত। ফুটবলের মাঠে জয়ের মুকুট বা বিতার্কিকের যুক্তির ধারায় শ্রেষ্ঠত্বের খেতাব—প্রতিটি ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নিষ্ঠা ও ত্যাগ দাবি করে।
বিতার্কিকদের দ্বৈরথ তরবারির নয়, বুদ্ধির; রক্তপাতহীন, তবু তীব্র। এখানে আদর্শের সংঘাত যুক্তির আলোয় পুনর্জাগরণ লাভ করে, প্রতিজ্বলনের দাবানল নয়, সংলাপের আলো জ্বালে।
কিন্তু মুকুটের ভার কেবল বিজয়ে নয়, তার দায়িত্বে। ইতিহাস শেখায়, আদর্শ যদি নীতিহীন হয়, তবে গৌরব সংকটের অন্ধকারে ডুবে যায়।
তবুও এই দ্বৈরথই নিশ্চিত করেছে সভ্যতার অগ্রগতি কেননা নেতৃত্ব যদি নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়, যদি তা কেবল নিজের গৌরবের জন্য না হয়ে অন্যের কল্যাণের জন্য হয়- তখনই মুকুটের হয়ে উঠে আলোকবর্তিকার প্রতীক।
মুকুটের আকাঙ্ক্ষা যেমন চিরন্তর, তেমনিভাবে চিরন্তন সেই প্রশ্নটি আমাদের সামনে এসে হাজির হয়- আমরা কি শুধু গৌরবের জন্যই লড়ছি, নাকি সেই গৌরবের ভার বইবার সাহসও রাখি?
এবারের সংখ্যায় আছে
দ্বৈরথ - প্রকাশনার ৩৪ তম সংখ্যা
রাত গভীর। জানালার ফাঁক গলে আসা হালকা বাতাসে নড়ে ওঠে টেবিলের উপর রাখা একগুচ্ছ পাণ্ডুলিপি। শহর ঘুমিয়ে, কিন্তু এই ঘর এখনও জেগে। এই ঘরে লেখা হচ্ছে ইতিহাসের সেই পাঠ, যা পাঠ্যবই এড়িয়ে গেছে—যেখানে কথার রাজনীতি, চুপচাপ চলা যুদ্ধ, আর তরুণদের তর্কে লুকিয়ে থাকে এক জাতির বিবেক।
দ্বৈরথ–এর ৩৪ তম সংখ্যার প্রতিটি পৃষ্ঠা শুধু মতামত নয়—প্রতিবাদের দলিল, প্রতিরোধের মানচিত্র। এই সংখ্যায় আমরা খুঁজে ফিরেছি সেই সকল কণ্ঠকে, যারা ব্যারিকেডের ওপার থেকে সত্য বলেছে, যারা বিতর্কের ভাষায় বদলে দিতে চেয়েছে শোষণের সংবিধান। এখানে রাজনীতি আছে, কিন্তু তা দলীয় নয়; তা আদর্শের। এখানে নেতৃত্ব আছে, কিন্তু তা ক্ষমতার নয়; তা দায়িত্বের। ক্ষমতার মুকুট যদি অপব্যবহারে জর্জরিত হয়, তবে তা টিকতে পারে না। আর যদি দায়িত্বের সঙ্গে ধারণ করা হয়, তবে সেটিই নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে।
দ্বৈরথ–এর ৩৪ তম সংখ্যা একটি প্রশ্নচিহ্ন—সেই ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়ানো এক আয়না, যেখানে তরুণ কণ্ঠগুলো শুধুই উচ্চারণ করে না, তারা চ্যালেঞ্জ করে। “Heavy is the crown”—এই বাক্যটি যেন শাসক এবং সংগ্রামী, উভয়ের জন্য এক সতর্কবাণী। কারণ মুকুট মানে শুধু গৌরব নয়, ইতিহাসের বিচারও।
নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবের ৭২ বছরের পদযাত্রার এক ক্ষুদ্র অংশীদার হতে পারা এক গর্বের ব্যাপার। আমাদের সম্পাদকীয় পরিষদের প্রতিটি সদস্য, এই বিশাল যাত্রার পেছনে যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে, তাদের অন্তর্দৃষ্টি, শ্রম, দায়িত্ববোধে, অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল এই প্রকাশনা। ‘দ্বৈরথ’ এর ৩৪ তম সংখ্যাকে সর্বোচ্চ চেষ্টা ছিল নির্ভুল করার। এরপরও কোনো ভুল ত্রুটির ক্ষেত্রে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি কাম্য।
মোঃ মোহসিন হোসেন মঈন
প্রধান সম্পাদক, দ্বৈরথ ৩৪তম সংখ্যা
সভাপতি, প্রচার ও প্রকাশনা
নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাব
আপনার জন্য