নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবের ইতিহাসে কিছু নাম চিরকাল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে উচ্চারিত হয়—শাহিদুল হাসান পাঠান স্যার সেই তালিকার শীর্ষে থাকা এক উজ্জ্বল নাম। প্রায় এক দশক ধরে ক্লাবের মডারেটর হিসেবে তিনি শুধু একটি সংগঠন পরিচালনা করেননি, গড়ে তুলেছেন একটি পরিবার, তৈরি করেছেন নেতৃত্বের অসংখ্য উত্তরসূরি, এবং প্রতিটি প্রজন্মের ভেতর ছড়িয়ে দিয়েছেন দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা ও সাহসের বীজ।
এবারের সংখ্যায় তাঁর সঙ্গে আমাদের এই সাক্ষাৎকার ছিল স্মৃতির অ্যালবাম খুলে বসার মতো—যেখানে উঠে এসেছে ক্লাবের ওঠানামা, জাতীয় উৎসব আয়োজনের অভিজ্ঞতা, প্রিয় প্রাক্তনদের গল্প, নেতৃত্ব নির্বাচনের দৃষ্টিভঙ্গি, এবং একজন শিক্ষক ও অভিভাবকের চোখে আজকের তরুণদের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ। শাহিদুল হাসান পাঠান শুধু এক মডারেটরের নাম নয়—তিনি এক যুগের প্রতিচ্ছবি, যার আলোয় আলোকিত হয়েছে শত শত বিতার্কিকের পথচলা।
শহিদুল হাসান পাঠান
৩৪তম দ্বৈরথ -বিশেষ ইন্টারভিউ
প্রশ্ন ১ আপনি কি আমাদের আপনার শৈশব কিংবা প্রাথমিক দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন? বিশেষ করে কীভাবে শিক্ষকতা পেশার প্রতি আপনার আগ্রহ তৈরি হলো? এটি কি আপনার দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ছিল?
আমার শৈশব জীবন শুরু হয় ময়মনসিংহ সদরে এবং স্কুলজীবন কাটে ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে। আমি আমার শৈশবকালীন দিনগুলো বেশ আনন্দময়ভাবে কাটিয়েছি। সেখানে পড়ালেখার জন্য সুন্দর ও উপযুক্ত পরিবেশ ছিল। সহপাঠীদের সাথে খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। আমরা একসাথে স্কুলে যাওয়া-আসা এবং খেলাধুলা করতাম। আমার জীবনে চলার পথে সবসময়ই কোনো না কোনো বন্ধু ছিল। খেলাধুলা থেকে শুরু করে পড়ালেখা সবসময় আমরা একসাথে থাকতাম। এই দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে। আমার শিক্ষকতা পেশায় আসার পিছনে একটা বড় কারণ হচ্ছে আমার বাবা। তিনি একজন আইনজীবী হলেও, তিনি তার পেশাজীবনের প্রথম ভাগে একজন শিক্ষক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত থাকা অবস্থায় তিনি আমাকে প্রায়ই বলতেন যে, শিক্ষকতার মধ্যে একটা অন্যরকম আনন্দ রয়েছে। এটা আমার জন্য সবসময় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করত। আর আমি আমার বাবাকে বলতাম, এই যুগে কেউ শিক্ষক হতে চায় না; সবাই বড় বড় পদে চাকরি করতে চায়, বড় হতে চায়। তিনি উত্তরে বলতেন, শিক্ষক হবার মধ্যেও একটা আনন্দ রয়েছে, যা অন্য কোনো পেশায় নেই। তুমি অনেক কিছু শিখতে পারবে। তিনি কখনোই অর্থনৈতিক দিকগুলোকে বড় করে তুলতেন না। তিনি শিক্ষকতার মধ্যে অনেক প্রাপ্তি দেখতেন। তার পক্ষ থেকে এসব উপদেশ আমি মনে-প্রানে লালন করতাম। এবং তার আগ্রহ থেকেই আমার শিক্ষকতা পেশায় আসা।
প্রশ্ন ২ আপনি নিজেও একসময় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। তখন কলেজে কী ধরনের বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও উৎসব আয়োজন হতো? আজকাল যেমন আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড় পরিসরে আমাদের ইভেন্টগুলো প্রচার করি, তখনকার দিনে এসব আয়োজন প্রচার ও ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের পদ্ধতি বা কৌশল ব্যবহার করা হতো? সেসব অভিজ্ঞতা কি এখনও আপনার মনে আছে?
আমি নটরডেম কলেজে ১৯৯৮–২০০০ শিক্ষাবর্ষে পড়াশোনা করেছি। তখন আমাদের বিতর্ক অঙ্গন বেশ সমৃদ্ধ ছিল এবং ক্লাব সংখ্যা খুবই কম ছিল। আমার জানামতে, ১০ থেকে ১২ টি ক্লাব ছিল। ডিবেটিং ক্লাব অনেক সুন্দর ও গোছানো ছিল। প্রত্যেক সপ্তাহের বুধবার একটি করে বিতর্কের আয়োজন করা হতো। সহপাঠীরা বিতর্ক দেখার জন্য অডিটোরিয়ামে যেত; পুরো অডিটোরিয়াম শিক্ষার্থীতে ভরে যেত। খুব জমজমাট ছিল বিতর্কগুলো এবং বিতর্কগুলো দেখার জন্য সবাই আগ্রহ প্রকাশ করত। সেসময় মিডিয়া, ফেসবুক বা প্রচার করার মতো কোনো ব্যবস্থা ছিল না। বিতর্ক ক্লাবের সদস্যরা লিফলেট এবং হাতে লেখা কাগজের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রচার করত; এটা একটা খুব বড় প্রতিকূলতা ছিল। এই যুগে ফেসবুক ও পেজের মাধ্যমে প্রচার করা হয়। তারা কিন্তু রোদ,ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে কলেজের ক্লান্তি সাথে নিয়ে যানজটের মতো প্রতিবন্ধকটার মধ্যেও প্রচার কাজ করতো। আমার কিছু বিতর্কিক বন্ধু ছিল এবং তারা খুব চমৎকারভাবে কথা বলতে পারত। তাদের দেখেও অনেক কিছু শেখা যেত। আমি বিতর্ক ক্লাবে না থাকলেও, বন্ধুদের কাজগুলো দেখেই কিছু অভিজ্ঞতা লাভ করি।
প্রশ্ন ৩ নটর ডেম কলেজে শিক্ষার্থী হিসেবে সোনালী সময় কাটানোর পর, কী বিশেষ অনুপ্রেরণা আপনাকে আবার এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে ফিরিয়ে এনেছিল? নটর ডেম কলেজে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা আপনার জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?
আমার জীবনের সোনালী দিনগুলার মধ্যে একটা বড় অংশ হচ্ছে আমার স্কুলজীবন। শিক্ষকদের সন্তানসূলভ আচরণ আমাকে সবসময় খুব অনুপ্রেরণা দিত; এটা আমার জন্য বড় একটা প্রাপ্তি ছিল। আমার স্কুলশিক্ষকেরা আমাকে যেসব শিক্ষা দিয়েছিলেন, সেগুলো আমি আমার প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ নটরডেম কলেজে দেওয়ার চেষ্টা করি। কোন ছাত্র যদি কোনো সমস্যা নিয়ে আসে, আমি তাকে কখনো ফিরিয়ে দিই না। বরং আমি তাকে আমার জায়গা থেকে সাহায্য করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। একজন ছাত্রকে যেভাবে গাইড করলে তার ডেভেলপমেন্ট হবে, আমি তাকে সেভাবেই সাহায্য করার চেষ্টা করি। নটরডেম কলেজে শিক্ষকতা করা খুবই সম্মান এবং গৌরবের। এর জন্য আমি আমার স্কুলশিক্ষকদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। যারা শুধুমাত্র লেখাপড়া করানোর মাধ্যমেই নয়, বরং এর সাথে আমাকে জ্ঞানদান এবং সন্তানসুলভ আচরণ করার মাধ্যমে সমৃদ্ধ করেছেন। এছাড়া আমাদের সময়ের কলেজের শিক্ষকেরাও অনেক পরামর্শদান করতেন এবং সন্তানসুলভ শাসন করতেন। এসব বিষয়ই আমার পরবর্তী জীবনে অনেকভাবে প্রভাব ফেলেছে। যার দরুনই আমি নটরডেম কলেজে ১৬ বছর ধরে শিক্ষকতা করছি। আমার চিন্তা-চেতনা ও মানসিকতা গড়ে তোলার পিছনে কলেজের শিক্ষকবৃন্দ, স্কুলের শিক্ষকবৃন্দ এবং বাবার কৃতিত্ব রয়েছে। তাদের কারণেই আমি এতদূর আসতে পেরেছি।
প্রশ্ন ৪ নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাব, যা বাংলাদেশের প্রথম কলেজভিত্তিক বিতর্ক ক্লাব এবং "Father of Debating" নামে পরিচিত,যখন আপনাকে এর মডারেটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন আপনার প্রথম প্রতিক্রিয়া কি ছিল? এই দায়িত্বের বিশালতা কি তখনই উপলব্ধি করেছিলেন, নাকি সময়ের সাথে সাথে তা বুঝতে পেরেছিলেন?
আমি নটরডেম ডিবেটিং ক্লাবে যোগদান করি ২০১৪ সালে। তৎকালীন সময়ে মডারেটর ছিলেন ভাইস প্রিন্সিপাল ফাদার অ্যাদাম স্যার এবং কো-মডারেটর ছিলেন কমল গোমেজ স্যার। তারা দুজনই একসাথে হঠাৎ করে নটরডেম থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যান। এমন সংকটকালীন সময়ে আমি ডিবেটিং ক্লাবের হাল ধরি। এটা আমার কাছে খুবই চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছে। হঠাৎ একদিন আমাদের বর্তমান অধ্যক্ষ হেমন্ত পিউস রোজারিও স্যার আমাকে ডেকে পাঠান। তিনি আমাকে নটরডেম মানবিক ক্লাবের দায়িত্ব ছেড়ে ডিবেটিং ক্লাবে আসতে বললেন। সেখানে আমি প্রায় তিন বছর দায়িত্বে ছিলাম। যখন ডিবেটিং ক্লাবের হাল ধরলাম, তার দুই মাস পরই ফেস্ট অনুষ্ঠিত হবে। ক্লাবের কর্মকাণ্ড, স্ট্রাকচার, বিতর্কসংক্রান্ত বিষয়গুলো আমি ভালো করে বুঝতাম না। আমি দায়িত্ব পেয়ে খুব ঝামেলায় পড়ে গেলাম। ডিবেটিং ক্লাবের এক বছরব্যাপী কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও আমি খুব একটা সচেতন ছিলাম না। কী করতে হবে, মডারেট হিসেবে আমার দায়িত্ব কী, কোন সেক্টরে কাজ করতে হবে, ছাত্রদের দায়িত্ব কী– সবকিছু আমার কাছে অস্পষ্ট ছিল। এটা খুব বড় একটা দায়িত্ব ছিল। আমি হাল ছেড়ে না দিয়ে চেষ্টা করলাম। ইসিদের(এক্সিকিউটিভ কমিটি) সাথে অনেকবার বৈঠক করলাম। বৈঠক করে আত্মবিশ্বাস পেলাম। সর্বশেষে আমি ভালোভাবেই কাজগুলো সমাপ্ত করতে পেরেছি। এই ক্লাবের মধ্য দিয়ে যা শেখা হয়েছে, তা আমার স্কুল ও কলেজ জীবনেও শেখা হয়নি। তবে ছাত্রদের সাথে কাজ করতে পারাটা ক্লাবের মডারেটর ও শিক্ষক হিসেবে আমার জন্য একটা বড় অর্জন ও সৌভাগ্যের ব্যাপার। তাদের কাজগুলো খুব প্রচুর পরিশ্রমসাধ্য। বিতর্ক করা ও ধারাবাহিকতা ধরে রাখাটা তাদের জন্য ও আমাদের প্রতিষ্ঠান উভয়ের জন্যেই গর্বের বিষয়। তারা বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে আমন্ত্রিত করে বিতর্ক প্রতিযোগিতা আয়োজন করার মাধ্যমে ক্লাব ও দেশ উভয়ের অর্জনে অবদান রাখছে। আমি দশ বছর ধরে ডিবেটিং ক্লাবের দায়িত্বে ছিলাম। আমার জন্য এই দায়িত্বটা বরাবরই চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছিল। এছাড়া আমাদের ক্লাবের কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল—যেমন, ক্লাবরুম সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়নি। এবং দ্বিতীয়ত, একজন শিক্ষার্থী ফেস্টে যে তার প্রতিভা প্রকাশ করবে, সে জায়গায়ও সীমাবদ্ধতা ছিল। উদাহরণস্বরূপ রাতের বেলায় অনেকসময় বিতর্ক অব্যাহত থাকত। সেখানে একটা সমস্যা হতো। অনেক বাবা-মা ফোন করে জিজ্ঞাস করতেন, তাদের ছেলে-মেয়েরা কি এখনো কলেজে আছে কিনা। ক্লাবে মডারেটর হিসেবে যোগ দেওয়ার পর আমি কলেজে অবস্থানরত অবস্থায় এসব সমস্যাগুলোর সমাধান করার চেষ্টা করতাম। এরপরে আমি তাদেরকে সন্ধ্যার আগেই বিতর্ক শেষ করার জন্য চেষ্টা করতে বলি। কারণ অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের নিয়ে খুবই উৎকন্ঠিত থাকেন। তারা তাদের সন্তানদের দেরি করে বাড়ি ফেরা নিয়ে চিন্তিত থাকতেন। এমন দিনও ছিল যখন রাত দুইটা পর্যন্ত বিতর্ক চলছিল। ওইদিন আমার পরিবার থেকে শুরু করে অর্গানাইজার ও শিক্ষার্থীদের পরিবার সবাই খুবই উদ্বিগ্ন ছিল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিতর্ক অব্যাহত রাখা আমার জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কারণ একটি রাউন্ড ১.৫-২ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। যদি একদিনে ৪টি রাউন্ড অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে তা রাতেই শেষ হবে। রাত পর্যন্ত বিতর্ক অব্যাহত রেখে তাদের জীবনে তা কতটুকু সুফল বয়ে আনবে-তা নিয়ে আমি কিছু বলবো না। তবে বাবা-মা ও শিক্ষকেরা উৎকণ্ঠা করে এবং পরবর্তী দিন তাদের ক্লাস-কুইজের চাপ। অনেকগুলো সমস্যা থাকা সত্ত্বেও তারা চালিয়ে যায়। কারণ এটি তাদের নিজের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। এছাড়া আমি এই কলেজের শিশুদের সান্ধ্যকালীন স্কুলের দায়িত্বে ছিলাম। তাই আমার উপরও ক্যাম্পাসের নিয়ম ও বিধিমালার রক্ষার জন্য কিছু দায়িত্ব ছিল। আমি এগুলো বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। এক সময় আমি এসবের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেই। পরবর্তীতে আমি ভাবলাম যে, শিক্ষার্থীদের সাথে সমস্যা নিয়ে যদি আলোচনা করা যায়, তাহলে আমি সব চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে পারব এবং সহজেই এসব সমস্যার সমাধান হবে।
প্রশ্ন ৫ প্রায় এক দশক ধরে নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবের মডারেটর হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়া কোনো সাধারন দায়িত্ব নয়। মডারেটর হিসেবে আপনার সামনে আসা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী ছিল? এমন কোনো বিশেষ মুহূর্তের কথা কি মনে পড়ে যা মানসিকভাবে অত্যন্ত কঠিন ছিল এবং যা আপনার নেতৃত্বকে পরীক্ষা করেছিল? আপনি কীভাবে সেই পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছিলেন?
আমি ডিবেটিং ক্লাবে প্রায় ১০ বছর দায়িত্বে ছিলাম। এই সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল যে, আমরা চট্টগ্রাম বিটিভি কর্তৃক আয়োজিত বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলাম এবং আমরা নটরডেম কলেজ জয়লাভ করেছি। এটি আমাদের জন্য একটা বড় সাফল্য ছিল। এছাড়া বিতর্ক ক্লাব কর্তৃক নির্ধারিত গোল্ড, সিলভার,রেড, ব্লু এবং গ্রিন টিমগুলো প্রতিবছর বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স-আপ হয়। তারা এমনকি বিদেশেও বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে পদক জয়লাভ করে। কলেজের অধ্যক্ষের রুমে ডিবেটিং ক্লাবের অসংখ্য প্রাইজ সাজানো আছে। অন্যান্য ক্লাবগুলোর মধ্যে ডিবেটিং ক্লাবের সবচেয়ে বেশি পুরস্কার রয়েছে। আমি ক্লাবের ট্রফি গুলো দেখে খুবই আনন্দিত হই। শিক্ষক- শিক্ষার্থীরাও দেশ-বিদেশ থেকে আনা বিভিন্ন পুরস্কার দেখে খুশি হয়। এটা আমার দশ বছর থাকাকালীন সময়ে, আমাদের সবার জন্য একটা বড় অর্জন। ভবিষ্যতে যারা এই ক্লাবকে নেতৃত্ব দিবে তারা যেন এই সম্মান বজায় রাখে- এটাই আমার প্রত্যাশা। নটরডেম কলেজে অনুষ্ঠিত হওয়া ন্যাশনাল ফেস্টের ইভেন্টগুলো অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিতর্ক প্রতিযোগিতা থেকে একটু ব্যতিক্রম। কারণ আমাদের প্যানেল এবং বিচারক নির্বাচন করার প্রক্রিয়া বেশ সমৃদ্ধ। কারণ এখানে বিতর্ক অঙ্গনের মানুষেরাই বিচারক হিসেবে থাকে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিচারকরা হয়তো অনেক সময় মিক্সডআপ থাকে। আমাদের এখানে কিছু মিক্সডআপ থাকলেও, বেশিরভাগই নটরডেম থেকে ১০-১৫ বছর আগে পাস করা করে যাওয়া শিক্ষার্থীরা। তারা সবাই মিলে বন্ডিং তৈরি করার মাধ্যমে এই আয়োজনটা সম্পন্ন করে থাকে। এটা এই ইভেন্টের একটা স্বতন্ত্রতা।
প্রশ্ন ৬ আপনার তত্ত্বাবধানে নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাব বহু সফল জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে, যার মধ্যে অন্যতম "NDDC Debaters' League"। বাংলাদেশের অসংখ্য বিতর্ক প্রতিযোগিতার ভিড়ে নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবের ইভেন্টগুলোকে আপনি কীভাবে স্বতন্ত্র মনে করেন? এছাড়া, এমন কোনো অভিজ্ঞতার কথা কি শেয়ার করতে পারবেন, যা এইসব বড় ইভেন্ট আয়োজনে আপনাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে?
ডিবেটারস লীগের এই উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতার আয়োজনটা নাজমুল হোসেন অভি ২০০৮ সালে শুরু করেছিল এবং মাঝে তা লেখাপড়ার চাপ বা অন্যান্য কারণে বেশ কয়েক বছর বন্ধ ছিল। এটা খুব সুন্দর একটা সিস্টেম ছিল, যেখানে ৩০ জন বিতর্কিক অংশগ্রহণ করে। দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে তারা বিতর্কের সাথে জড়িত থাকে। এখানে লড়াইটা শেয়ানে শেয়ানে হয় এবং তারা সবাই নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে বড় মাপের বিতর্কিক। তাদের বিতর্ক করার স্টাইল খুব সুন্দর হয় এবং তাদের বিতর্ক শুনতে আমার খুব ভালো লাগে। ডিবেটারস লীগের দুইদিনব্যাপী আয়োজনের সিস্টেমটা আমার খুব ভালো লাগত। যুক্তিতর্কের মাধ্যমে কিভাবে একটা বিষয়কে প্রতিষ্ঠা করা যায়, সেটা দেখেও শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
প্রশ্ন ৭ প্রতি বছর পালাবদলের মাধ্যমে নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবের নেতৃত্ব নতুন এক্সিকিউটিভ কমিটির বা কার্যনির্বাহি কমিটির কাছে সোপর্দ করা হয়। এই কমিটির সদস্যদের নির্বাচনের ক্ষেত্রে একজন ক্লাব মেম্বারের কোন বৈশিষ্ট্য বা যোগ্যতাগুলোকে আপনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন?
বছরের পর বছর ধরে আমাদের এই ক্লাবটাকে সচল রেখে আসছে কার্যকারী পর্ষদ এবং তাদের ছাড়া ক্লাবটা একদম অচল এবং ভিত্তিহীন হয়ে পড়বে। একটা ক্লাবে মডারেটরের ভূমিকার পাশাপাশি কার্যকরী পরিষদের একটা বড় ভূমিকা আছে। যেটাকে আমরা ইসি(এক্সিকিউটিভ কমিটি) বলে ডাকি। প্রতিবছর নতুন যারা কমিটিতে আসে, তাদেরকে আসলে অনেক ভাবে আমরা বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্বাচিত করি। বিশেষ করে সারা বছর সে কি কি কাজ করেছে ও কোন কোন সেক্টরে কাজ করেছে- এগুলোর উপর বাছাই প্রক্রিয়া হয়। একজন ইসি মেম্বারের দায়িত্বটা কি– সেটা তাকে বুঝতে শিখতে হয়। আমরা হঠাৎ করে কাউকে প্যানেলে নিয়ে আসি না। তাকে এক-দেড় বছর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। যেমন এখানে অনেকগুলো উইংস আছে। যেমন: প্রশাসন শাখা, বিতর্ক ও কর্মশালা শাখা, প্রচার ও প্রকাশনা শাখা এবং সাধারন সম্পাদক শাখা। প্রতিটি শাখারই নিজস্ব কাজ আছে। যেমন: স্পনসরশীপ নিয়ে আসা, বিতর্ক আয়োজন করা এবং প্রচার প্রচারনা করা। সব শাখারই আলাদা আলাদা দায়িত্ব আছে। তারা যে যে সেক্টরে আগ্রহী হয়, তাদেরকে আমি সেসব সেক্টরে কাজ করতে বলি এবং প্যানেলকে তাদের উত্তরসূরি আগে থেকেই প্রস্তুত করতে বলি। যার যে সেক্টরে কাজ করতে ভালো লাগে, তাকে সে সেক্টরে কাজ দেয়া হয়। তাদের পছন্দ অনুযায়ী কলেজের ভিতর ও বাইরের কাজগুলো করে তারা সে যোগ্যতা অর্জন করতে থাকে। তারপর ইসি প্যানেল আমাকে তাদের জুনিয়রদের এই দেড় বছরের কাজের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী যোগ্যতাধারীদের তালিকা দেয়। তখন আমি ইসি প্যানেল ও সবাইকে একসাথে ডেকে নিয়ে তাদের ভাইবা নেই। তারপর আমরা ভেবেচিন্তে তার পুরো প্রোফাইল অনুযায়ী নতুন প্যানেল নির্বাচন করি। এখানে খুব ফেয়ার সিলেকশন হয় এবং তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কমিটিতে এসে তারা তাদের দায়িত্বগুলো পালন করে। এই দেড় বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সে তার পোস্টের জন্য যোগ্যতার প্রমাণ করে। তো এটা বেশ সুন্দর একটা সিস্টেম– যেখানে মুখ না দেখে তার কাজগুলো বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা নিয়ে সিলেকশনটা দেয়া হয়।
প্রশ্ন ৮ বছরের পর বছর ধরে অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে আপনার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, বিশেষ করে যারা ক্লাবের বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। তাদের কলেজ থেকে পাশ করে চলে যাওয়ার পর এই সম্পর্কের ধারাবাহিকতা কীভাবে বজায় রাখেন আপনার সঙ্গে কি এখনও পুরোনো শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ আছে? তাছাড়াও নেতৃত্ব হস্তান্তরের সময় নতুনদের সাথে নতুনভাবে ক্লাবের কার্য পরিচালনা করা কি কখনো ব্যক্তিগতভাবে কঠিন হয়ে পড়ত?
প্রত্যেক বছর ১২ থেকে ১৫ জন প্যানেলের জন্য নির্বাচিত হয়। আবার ক্লাবের সাথে প্রায় ৩০০-৩৫০ জন শিক্ষার্থী যুক্ত থাকে। এত জনের সঙ্গে আসলে ঐরকম রিলেশনটা তৈরি হয় না। ডিবেটে যারা বেশি আগ্রহ দেখায় ও ইসি প্যানেলের সবাইকে আমি চিনি। তাদের পার্সোনাল প্রোফাইলও আমি খুব ভালো করে জানি। তারা কে কোথায় পড়াশোনা করছে– সেটাও আমার জানা। কিন্তু কারো সঙ্গে একটা ভালো সম্পর্ক তৈরি হতে একটা কারণ লাগে। ডিবেটিং ক্লাব কারো একার প্রচেষ্টার দ্বারা সমৃদ্ধ হতে পারে না। এখানে সবাইকে নিয়েই তবে সমৃদ্ধ হতে হয়। কারণ ডিবেটিং ক্লাব আসলে একা পরিচালনা করার মতো কোনো কিছু না। এখানে সবাইকে নিয়ে কাজ করতে হবে। এজন্য তারা যখন ক্লাবের কাজে সম্পৃক্ত হয়, তখন তাদের সাথে কাজ করতে করতে বন্ধুসুলভ একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমি এবং তারা একে অপরের চাওয়া-পাওয়াটা বোঝার চেষ্টা করি। এভাবে আস্তে আস্তে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। আর সেই সম্পর্ক ও যোগাযোগ অনেক বছর পরে গিয়েও অটুট থাকে। দেশের বাইরে যারা চলে যায়, তাদেরকে যদি জুনিয়রদের জন্য একটা ওয়ার্কশপ নিতে বলি; তারা কিন্তু আমার অনুরোধে না করেনা । উদ্দেশ্য ক্লাবের প্রয়োজনে হোক অথবা আমাদের কলেজের প্রয়োজনে হোক, তারা তারা রাখার চেষ্টা করে। এই সম্পর্ক একদিনে গড়ে ওঠে না, দীর্ঘদিনের ইন্টারেকশনের মাধ্যমে তৈরি হয়। ডিবেটিং ক্লাবে তাদের এই বন্ডিংটা তৈরি হয়। ডিবেটিং ক্লাবের মধ্য দিয়ে সিনিয়র ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সাথে জুনিয়র ব্যাচের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়। চলার পথে মানুষ কখনো একা চলতে পারে না বলেই ক্লাবিংয়ের মাধ্যমে তারা এই বন্ডিং তৈরি করে।
আর একটা বিষয়ে আমি দেখেছি যে, ব্যক্তিগত সম্পর্কটা আসলে গড়ে ওঠার পিছনে কিছু কারণ আছে। দেখা যায় যে, ক্লাবিং করার সময় তার হয়তো ব্যক্তিগত কিছু চাওয়া-পাওয়া থাকে। অনেকে আছে যে, তার হয়তোবা প্রয়োজনটা শুধু যে ক্লাবের প্রয়োজন ছিল তাও না। কারণ মানুষ চলার পথে তার কিন্তু সামাজিক সমস্যায় পড়তে হয় এবং তার এই সমস্যা সমাধান করার জন্যও কিন্তু ক্লাবিং এর প্রয়োজন আছে। তো নেতৃত্বের হস্তান্তরটা যখন হয়, তখন নতুনদের সাথে ক্লাবের যে সম্পর্ক আছে এটা শুধু ক্লাব পর্যায়ে থাকে না সেটা ব্যক্তিগত রিলেশনেও চলে যায়। এই রিলেশনটা তৈরি করা যে খুব একটা কঠিন তা না, যদি আমরা সেই সম্পর্কটা সুন্দর করে গড়ে নিতে পারি। শুধু একটা পদ পাবো বা কাজ করবো বা একটা পুরস্কার পাবো, সেটার মধ্যে ক্লাবিং কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না। এখান থেকে আমরা মানুষের মধ্যে যে ভালোবাসার সম্পর্ক যেটা অনেকদিন ধরে আমরা বহন করতে পারি সেটা কিন্তু গড়ে ওঠে।
আর প্রতিবছর নতুন নেতৃত্ব আসার পর ক্লাব কার্যক্রমের ব্যাপারে যদি বলতে হয়; আসলে এটা দেখতে দেখতে আমাদের ছাত্ররা অভ্যস্ত হয়ে যায়। যখন কোন নতুন ছাত্র ক্লাবে জয়েন করে, তারা পরবর্তীতে বড় ভাইদের কাজগুলো দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। তখন তারা আর প্রশ্ন করে না। কিন্তু যখন মাঝখান থেকে ছাত্ররা আসে, তারা বিভিন্ন রকমের প্রশ্ন করে। কিন্তু আমি দেখেছি যে, যারা প্রথমে দিকে আসে তারা দেখে যে বড় ভাইয়েরা অর্থাৎ সেকেন্ড-ইয়ার ভাইয়েরা কিভাবে কাজ করে এবং তাদের কাছ থেকে এরা শিখে। আর সেকেন্ড ইয়ারে যারা আছে তারা আবার ইসিদের কাছে থেকে শিখে। এভাবে তিনটা ব্যাচের সমন্বয়ে আমাদের ডিবেটিং ক্লাবটি পরিচালিত হয়। শুধু ইসি দ্বারা যে কাজগুলো হয় তা কিন্তু না। এটার সাথে আরও দুটি ব্যাচ জড়িত থাকে।
প্রশ্ন ৯ সামনের দিনে নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার প্রত্যাশা কী? এবং আপনার সেই প্রত্যাশা পূরণে পরবর্তী মডারেটর ও ভবিষ্যৎ এক্সিকিউটিভ কমিটিগুলোর প্রতি আপনার কী পরামর্শ থাকবে?
আমি বিশ্বাস করি, নটরডেম ডিবেটিং ক্লাব তার যে সামনের দিনগুলো আছে এটার একটা সুন্দর পথ তৈরি করবে এবং দেশের সংকটে বা দেশের প্রয়োজনে ডিবেটিং ক্লাবের যে ভূমিকাটা আছে সেটা আরও স্পষ্ট করে তুলবে। একই সাথে যিনি মডারেটর হয়েছেন, আমাদের শুভাশিস সাহা স্যার, তিনি একজন চমৎকার ব্যক্তিত্ব এবং খুব ভালো শিক্ষক। এবং আমি মনে করি, একজন মডারেটরের যে গুনগুলো আছে তার প্রত্যেকটি গুণ তার মধ্যে আছে। একটা ক্লাবের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে এক্সিকিউটিভ প্যানেল এবং সেইসাথে মডারেটর এর উপর। তাই যারা ভবিষ্যতে আসবে এবং বর্তমানে যারা আছেন, তারা খুব চমৎকারভাবে সবাই মিলে পরবর্তীতে যে ব্যাচগুলো আছে তাদের কিভাবে সক্রিয় করা যায়, কিভাবে তাদের মাঝে সুন্দর করে দায়িত্বটা বন্টন করা দেয়া যায়, এবং কাজগুলো কিভাবে শেখানো যায়— সেই বিষয়ে খুবই আগ্রহের সাথে কাজ করে যাবে। আমি আশা করি, দীর্ঘদিনের যে এই ক্লাবটি আছে যার বয়স প্রায় ৭৩ বছর হয়ে গেছে, নতুন যারা আসবে পরবর্তীতে হাল ধরবে, তারা আমাদের যে ইতিহাসটা আছে সেটা তাদের ভালো করে জানা প্রয়োজন। জানা প্রয়োজন যে, ক্লাবটা কিভাবে পূর্বে চলতো এবং এই ক্লাবের ধারাবাহিকতায় আর নতুন করে কি যুক্ত করা যায়। সেদিকেও আমাদের এক্সিকিউটিভ প্যানেল এবং মডারেটরকে সচেতন হওয়া দরকার। আমি বলতে চাচ্ছি, যা আছে সেটাকে ধরে রাখা এবং ভবিষ্যতে আরো নতুন কিছু যুক্ত করা। এবং এর মাধ্যমে আমার মনে হয়, আমাদের এই ক্লাবটি আরো এগিয়ে যাবে।
প্রশ্ন ১০ যদি আপনাকে নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবের সঙ্গে আপনার ১০ বছরের পথচলা একটি বাক্যে সংক্ষেপে প্রকাশ করতে হয়, তাহলে আপনি কীভাবে তা বর্ণনা করবেন?
নটরডেম ডিবেটিং ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে আমি সৌভাগ্যবান মনে করছি নিজেকে। আমি আসলে সত্যিই খুব ভাগ্যবান যে, একটা এমন একটা ক্লাবের মডারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি। এই ক্লাবের যে ছাত্রবন্ধুরা আছে, তাদের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। তাদের যে ভালোবাসা, যে আন্তরিকতা, তাদের যে শ্রম এটা আমাকে অভিভূত করে। একজন ছাত্র হিসেবে তারা যে কর্মক্লান্ত জীবন অতিবাহিত করে, লেখাপড়ার পাশাপাশি যে কাজগুলো করে এটা খুব কঠিন পরিশ্রমের। ওদের দেখে আমি ভাবি যে, ওদের মতো আমিও কাজ করতে চাই। এটা আমার কাছে মনে হয় খুব আসলে একটা চ্যালেঞ্জিং কাজ এবং আমি ওদের কাছে থেকে খুবই অনুপ্রেরণা পাই।
প্রশ্ন ১১ নটর ডেম কলেজের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত বিশেষ ম্যাগাজিন ‘সোনার তরী’-র আপনি প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন, যা কলেজের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই গুরুত্বপুর্ণ ম্যাগাজিন সম্পাদনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? পাশাপাশি, ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সঙ্গেও আপনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন—এই পুরো আয়োজনের অংশ হতে পারা আপনার জন্য কতটা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল?
নটরডেম কলেজের ইতিহাসে ৭৫ বছর পূর্তি একটা বিশেষ স্মরণীয় দিন ছিল। সেই ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে যে ম্যাগাজিন বের হয়েছে, তার আমি প্রধান সম্পাদক ছিলাম। আসলে যখন উদযাপন শুরু হয়, তার এক বছর আগে থেকেই আমি কাজ শুরু করেছিলাম। প্রথম প্রথম আমার কাছে এটি চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছিল। তবে আমি সফলতার সাথে কাজটি সম্পন্ন করতে পেরেছিলাম। তো আমি ছোট করে বলি, এই প্রকাশনায় প্রায় ৭৫ জন নটরডেমিয়ান তো আছে, এটার সাথে আমি কয়েকজন মানুষকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছিলাম। তখন আমি বিভিন্ন ব্যাচের একদম ১৯৪৯ সালের ব্যাচ থেকে শুরু করে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন নটরডেমিয়ানদের কাছে যাই এবং তাদের ওই সময়ের পড়াশুনা, ওই সময়ের যে ক্লাবিং সিস্টেম, ওই সময় তাদের যে অনুপ্রেরণা বা পরবর্তীতে শিক্ষার যে ভবিষ্যৎ- এইসব বিষয়ে তাদের থেকে আমি সাক্ষাৎকারের নেই। এখান থেকে বিশাল একটা অভিজ্ঞতা হয় আমার।
এই কাজগুলো করতে গিয়ে দেখা যায় যে, অনেক বড় ভাইয়েরা আছে যারা অনেক এস্টাবলিশড। তাদের সাথে যোগাযোগ করাটা খুব কঠিন কাজ ছিল। তো আমি আমার ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে যে সময়টুকু থাকতো সেই সময়গুলোতে তাদের অফিসগুলোতে চলে যেতাম এবং তাদের সাথে আলোচনা করে এগুলো রেকর্ড করে নিয়ে আসতাম এবং রাত্রিবেলা বসে বসে আমি ইন্টারভিউগুলো ট্রান্সক্রিপ্ট করতাম। এই কাজগুলো খুবই চ্যালেঞ্জের ছিল যে, মানুষের কাছে কথা শুনে সেটাকে আবার কম্পিউটারে এসে লেখা। তবে পরবর্তীতে আমি সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছিলাম।
অনেক সময় যে বড় ভাইদের কাছে যেতাম তারা সাক্ষাৎকার দেয়ার সাথে সাথে একটা স্পনসরও দিতেন; যেটা কলেজকে এবং ৭৫ বছরের আয়োজনকে সমৃদ্ধ করেছে।
আমার কাছে মনে হয় এই ম্যাগাজিন বের করাটা আমার জীবনের অন্যতম একটা বড় কাজ ছিল কলেজের জন্য। আমার সাথে যারা কাজ করেছে শিক্ষকবৃন্দ, আমার ছাত্ররা যারা আছে তারা কিন্তু অনেক পরিশ্রম করেছে। আমরা এ কাজগুলো ভাগ ভাগ করে নিয়ে করতাম। এবং আমার এই কমিটির মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল যে, যারা উপদেষ্টা-পরিষদে ছিলেন তারা কিন্তু খুব স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন— যেখানে ছিলেন হলিক্রস কলেজের প্রিন্সিপাল, সেন্ট জোসেফ কলেজের প্রিন্সিপাল ব্রাদার লিও এরকম অনেক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যারা সব সময় আমাকে অনুপ্রেরণা দিতেন এবং এই ম্যাগাজিনটা তৈরি করার জন্য যতধরনের সহযোগিতা লাগে সব ধরনের সহযোগিতা দিতেন। এরকম একটা ম্যাগাজিনের দায়িত্ব পাওয়া একটা গৌরবের বিষয় এবং এটা আমি আমার অবসরের সময় মানুষকে বলতে পারব। এটা আমার জীবনের একটা বিশাল অর্জন যে, কলেজের ইতিহাসে এরকম একটা গৌরবময় দিনের বিশেষ ম্যাগাজিন “সোনার তরী”– এর প্রধান সম্পাদক হতে পেরেছিলাম।