বারুদ চেপে রেখে যত বেশি উত্তপ্ত করা হয়, তার বিস্ফোরণের সম্ভাবনার মাত্রা বাড়তে থাকে। রসায়নের ক্ষেত্রে এটি যেমন সত্য, মানুষের ব্যক্তিক ও সামষ্টিক আচরণেও তার প্রতিফলন ঘটে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে পিছনে যাওয়ার আর সুযোগ থাকে না। হয় অনিবার্য মৃত্যু হবে, অন্যথায় সামনে ঠেলে আসতে হবে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষায়। বাংলাদেশের জাতীয় চরিত্রের ধারাবিবরণী করলেও এটা খুব সহজেই অনুমেয় হবে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসে এমনই একটি গণজাগরণের বিস্ফোরণ ঘটে, যা “জুলাই বিপ্লব” নামে পরিচিত হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুতই ছাত্র-জনতার ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা বিদ্যমান কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, যার মূল ভিত্তি ছিল সমতা ও ন্যায়ের দাবি।
এর পেছনের প্রেক্ষাপট গড়ে ওঠে ২০১৮ সালের প্রথম কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে। যেখানে বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে ৫৬% কোটার সংস্কারের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী। সে সময় সরকার কোটা ব্যবস্থা বাতিলের ঘোষণা দেয়, তবে ২০২৪ সালে এসে হাইকোর্ট পূর্বের রায় বৈধ ঘোষণা করলে দেশজুড়ে ক্ষোভ দানা বাঁধে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আবারও সংগঠিত হয়ে "বাংলা ব্লকেড" কর্মসূচির মাধ্যমে দেশব্যাপী অবরোধ শুরু করে। এই আন্দোলনে সরকার কঠোর দমননীতি গ্রহণ করে—আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের উপর হামলা চালানো হয়।
রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ নামে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর আন্দোলন আরও বিস্ফোরিত রূপ নেয়। সহিংসতা ঢাকাসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সরকার কারফিউ জারি করে ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও, আন্দোলন দমানো সম্ভব হয়নি। পুলিশের গুলি, ছাত্রলীগের হামলা এবং নিরস্ত্র মানুষের ওপর নির্মম অত্যাচার এক পর্যায়ে গণহত্যায় রূপ নেয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের মতে, এই আন্দোলনে প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হন। এছাড়া প্রায় ১১,৭০০ জনকে আটক করা হয়। শহীদ আবু সাঈদ ও মীর মুগ্ধ দেশের বিবেককে জাগিয়ে তোলে।
এই ভয়াবহ দমন-পীড়নের মুখে আন্দোলনকারীরা শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করে। "দফা এক, দাবি এক—শেখ হাসিনার পদত্যাগ" স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত হয়। ছাত্র, সাধারণ মানুষ, পেশাজীবীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে এটি একটি জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি, পুলিশের টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড সত্ত্বেও আন্দোলন থেমে যায়নি। পরিস্থিতি চূড়ান্ত মোড় নেয় যখন সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ্জামান শেখ হাসিনাকে পদত্যাগের পরামর্শ দেন। অবশেষে তিনি দেশত্যাগে বাধ্য হন।
জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি শুধু একটি সরকারের পতন নয়, বরং জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জনের প্রতীক। এ বিপ্লব প্রমাণ করে, দমন নয়, মানুষের সম্মিলিত শক্তিই সবচেয়ে বড় সত্য।
জুলাই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে এবারের সংখ্যায় আমরা আয়োজন করেছি বিশেষ সাক্ষাৎকার পর্ব, যেখানে অংশ নিয়েছেন আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা দুই সংগ্রামী কণ্ঠস্বর—সাদিক কায়েম ও উমামা ফাতেমা।
সাম্প্রতিক ছাত্র রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব, ‘জুলাই আন্দোলন’-এর অন্যতম সংগঠক সাদিক কায়েম।রাজনৈতিক বিশ্বাস, দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব, আত্মপরিচয়ের টানাপড়েন, এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশের রূপরেখা নিয়ে ছিল আমাদের দীর্ঘ ও গভীর আলাপ। প্রথাবিরোধী এক কণ্ঠস্বর হিসেবে তিনি যেভাবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন, সেই যাত্রার অন্তরঙ্গ ও বিশ্লেষণধর্মী কথোপকথনটির সম্পূর্ণ অংশ তুলে ধরা হলো এবারের সংখ্যায়। বিস্তারিত পড়ে দেখুন...
‘জুলাই আন্দোলন’-এর অন্যতম অগ্রণী সংগঠক ছিলেন উমামা ফাতেমা, কিন্তু আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে না গিয়ে থেকেছেন স্বাধীন অবস্থানে। নারী অধিকার, ছাত্র রাজনীতি, রাজনৈতিক লোভের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, এবং নিজের সংগ্রামী চেতনার উৎস নিয়ে তিনি আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন অনেক না-বলা গল্প। বিস্তারিত পড়ে দেখুন...
জুলাই গ্যালারি