"My short stories are like soft shadows I have set out in the world, faint footprints I have left. Short stories are like guideposts to my heart…" — Haruki Murakami
❝গেস্টরুম ট্রায়াল❞
~নাঈম এম ইসলাম
এক।
“ঠাস!...!” “ঠাস!...!”
মনে হলো যেন কয়েক মুহুর্তের জন্য পৃথিবী থমকে গিয়েছে। ঠাস করে বাজ পড়ার শব্দে ঘড়ির কাঁটা যেন হঠাৎ থেমে গিয়ে আবার চলতে শুরু করেছে।
নিঃশব্দ পৃথিবী। স্তব্ধ পৃথিবী।
কিন্তু মুহুর্তগুলো কেটে গেলেই খেই ফিরে পেল সে। হিতাহিত জ্ঞান ফিরছে তার। এতক্ষণে সে বুঝতে পারছে, কী ঘটেছে। শব্দের তরঙ্গ কর্ণের পর্দা ভেদ করে মস্তিষ্কে পুনরায় সিগনাল দিচ্ছে।
এ কি!
পৃথিবীর কোলাহল শুধু ডান দিক থেকে বাজছে, কিন্তু বাম দিকে স্তব্ধ কেন? ভোঁ ভোঁ করছে। কিছুই শোনা যাচ্ছেনা কেন?
এমনি করে হল রুমের ঠিক মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে হিতাহিত জ্ঞান লব্ধ করতে চেষ্টা করে যাচ্ছে সে। পরোক্ষণে একে একে চোখের সামনে স্পষ্ট হতে শুরু করেছেঃ
সামনে সারিবদ্ধ বসে আছে ইমেডিয়েট সিনিয়র ভাইয়েরা। ওর ঠিক ডান পাশেই মুখে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে
ওর পেছনের দিকে রয়েছে ওরই ব্যাচের সহপাঠী অনেকজনঃ কাচুমাচু, ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায়।
ঘরের বাতাসে কেমন গুমোট লাগছে। ফ্যান চলছে ঘড়ঘড় করে শব্দ করে করে। হলরুমের লাইট গুলো নষ্ট অধিকাংশ। পুরো ঘরে তাই আলো কম। চারদিক থেকে শব্দ আসছে, পুরো বাইরের পৃথিবীটা যেন জমজমাটভাবে চলছে। কিন্ত এদিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘুমোট স্যাতস্যাতে কয়েদকক্ষের মত লাগছে সব। শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
বলছিলাম অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পিজে হার্টয্ ডর্মিটরির প্রথম বর্ষের ছাত্র ড্যানিয়েলের কথা।
তার গালে লালচে ছাপ।
হলরুমে মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে, নেই কোনো অভিযোগপত্র।
তবুও এ যেন এক আদালত। আর এই আদালতে জবাবদিহি একতরফা।
“মআদারচো**, সাহস কত তোর! তুই আন্দোলনে যেয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াস! তাও আবার গেস্টরুম বন্ধের জন্য?”
সাইদুল ভাই তার সীট থেকে উঠে বলতে বলতে থাপড়ায়। আগুনের গোলার মতো কথা ছুড়ে দিতে দিতে নিজের সিটে বসছিলেন।
পাশে দাঁড়িয়ে সোহানও একই অপরাধে অভিযুক্ত। গালে হাত দিয়ে আহত শালিকের মত নিরুপায় হয়ে নত হয়ে পাথর হয়ে আছে। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দুজন, যাদের অপরাধ, একটি ছবিতে প্লেকার্ড হাতে দেখা গিয়েছে, যেখানে লেখা ছিল "Say No To Guest Room Culture"।
ড্যানিয়েল তখনো বোবা হয়ে আছে। গালে থাপ্পড়ের রেশ।
কান্না পাচ্ছে, কেন? তবে দুঃখে নয়, অপমানে নয়, ব্যথাতেও নয়।
একটা এলোমেলো বোধ তাকে চেপে ধরছে। কত দিকে মন চলে যাচ্ছে। থাপ্পড় খাইতে কেমন লাগে, বিগত জীবনের অভিজ্ঞতায় তা নেই। ভাবছে শুধুঃ
“তাহলে থাপ্পড় খেতে এমন লাগে? কিন্তু বুঝতে পারছি না, আমি কি কাঁদছি? কাঁদছি কেন?”
শরীর গরম হয়ে উঠছে, কিন্তু মুখ গলে পড়ছে না। চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে নামছে—গাল, গলা বেয়ে বুকের শার্ট ভিজে যাচ্ছে।
ব্যথা পাচ্ছে না, তবু বুক ফেটে যাচ্ছে। ভিতরটা যেন ভেঙে পড়ছে। কান্নারা শব্দ না করে জমা হচ্ছে বুকের ভেতরে। হাহাকার লাগছে। ফাঁকা লাগছে ভেতরটা। অথচ টু’ শব্দ করার জো নেই। করলে আবার লাভা ছুটে আসবে! তাই রইলো ঠায় দাঁড়িয়ে, নিঃশব্দে।
ওদিকে, ডান কানে লাভা বিচ্ছুরিত হয়েই চলেছে। হয়তো কানের ভেতরকার অস্থি মজ্জা গলিত হয়ে বেরিয়ে আসে প্রায়! এবার হৃদয় ভাই বলছেনঃ
“গুয়া পাকছে? এই মাদা*চো**গুলা,, গুয়া পাইক্কা ঝোল পড়তেছে টপটপ করে?”
সিনিয়র ৩:
“হ্লারপো হ্লারা, তোরা দুইডা হলেত্ত্যা আজ বাইরেইয়্যে যাবি। গেস্টরুম শেষ করে তোগোরে জানি হল-এ না দেখি। অহন যা জাগায় গিয়া বয়।”
-অবশেষে হুকুম জারি। ফায়সালা হয়ে গেল। হল ছাড়া। এ পর্যায়ে এসে ওদের দুজনের গেস্টরুম ট্রায়াল শেষ হলো। বাম দিকের গেট দিয়ে আগে সোহান নিঃশব্দে, পেছনে ড্যানিয়েলও চোখ মুছতে মুছতে নিজ নিজ সিটে গিয়ে বসলো। লাভা-গলা পরিবেশ পেছনে ফেলে, ভাইদের রাগের দাবানল আর গালির আসর হতে নিস্তার পেয়ে।
দুই।
সিনিয়র ১:
“এই! আহাদ কইরে? আহাদ সামনে আয়”
সিনিয়র ২:
“এইডা আবার কী করেছে?”
সিনিয়র ৩:
“ও কী করে না, তাই ক!”
পেছন হতে আহাদ উঠে যায়। পা সামনে ওর চলে না। ড্যানিয়েল- সোহানদের পরে ওর সিরিয়াল পড়ে যাবে, ও ভাবতেই পারেনি। আসলে এমন কোনোবার নেই যে ওর ডাক পড়েনা। আর এখন তো ক্যাম্পাসে চলছে কোটা আন্দোলন মৌসুম। সবাই তটস্থ।
আহাদ সামনে গিয়ে নির্দিষ্ট দাগের মধ্যে দু পা নির্ধারিত ভাবে রেখে, হাত পেছনে নিয়ে দাঁড়ায়। মাথা নিচু।
সিনিয়র ৪:
“ওই, তুই প্রোগ্রামে যাস নাই ক্যান? তোরে হল-এ রাখছি বা*ল ফালাইতে?”
আরেকজন:
“ওই, মাথা উচা কর, হ্লারপুত!”
সিনিয়র ৫:
“কী বলিস, ওরে সেইদিন না ঘাড়াইলাম এই প্রোগ্রামে না জাওয়া কইরা!?”
সিনিয়র ৫:
“এই হ্লার হাঁটাচলা ই তো ভালো না। পথে সিনিয়রদের দো*চেও না!”
সিনিয়র ৬ (থাপ্পড় দিয়ে):
“এই তোর এত হ্যাডম কইত্যা পাস? এই মা*দারি, তোর হ্যাডম দো*সার টাইম আছে আমগোর?”
সবচেয়ে ছোট সাইজের সিনিয়র বড় ভাইটি এসে আকাশ-সমান লম্বা আহাদের মুখে প্রায় লাফ দিয়ে ঠাস করে থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। আহাদ গালে হাত দিয়ে মাথা নিচু করে থাকে। ওদিকে গালির ঝড় অবিরত বয়েই চলছে। একজনের মুখ হতে অন্যজনে, তারমুখ হতে অপরজন। অবশেষে ঝড়ের তেজ ধীরে ধীরে নিবতে থাকে। একজন বলে,
“হইসে, এই, তুই যা বয়।”
আহাদ হাফ ছেড়ে বাঁচে। অপর কর্ণার ঘুরে এসে আহাদ এসে বসে ওর সিটে। ধবধবে ফর্সা মুখে পাঁচটা আঙুলের লাল ছাপ অল্প আলোতেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
তিন।
হৃদয় ভাই: “এইবার আয়, আসলডা।”
শাহীন ভাই: “কে?”
হৃদয় ভাই: “আরে ওই মালডা, যেইডা গেস্টরুমের ব্যাপারে পোস্ট দিছে।”
শাহীন ভাই: “আরে-আরে... ওওওও... ওই হ্লা আসাইদ্দা কই?”
ইমরান ভাই: “আসাদ কই? আসাদ...”
ফয়সাল ভাই: “কিরে, অয় নাই গেস্টরুমে?”
আমাদের মধ্যে একজন করে জানায়,
“না ভাই, আসাদ নেই আজ।”
ফয়সাল ভাই: “এই সাদি, মুবিন, যা তো। খোঁজ নিয়া আয়। ধইরা আন। কইস—ভাইয়ারা মিষ্টি খাওয়াচ্ছে।”
শাহীন ভাই: “হ্লারে, জম্মের মিষ্টি খাওয়ামু আজ।”
— কথাটা শুনে সবাই একসাথে হো হো করে হেসে ওঠে।
আজ্ঞাবাহী সাদি আর মুবিন বের হয়ে গেল। এর মধ্যেই রুমে চলতে থাকল খুচরা কায়দার ট্রায়াল। কয়েকটা ভিন্ন ধাচেরও। একটু পরে,
ইমরান ভাই: “এই শাহাবুদ্দিন, সামনে আয় তো। একটা গান শোনাইয়া দে। মনমেজাজ ঠিক করি।”
শাহাবুদ্দিন ধীর পায়ে সামনে এগোয়। সে এমন এক চরিত্র, যাকে আমরা বলি “উল্টো পাল্টা গানের জনক”। ছিপছিপে গড়ন, হ্যাংলা চেহারা। ইংল্যান্ডের এক প্রান্তিক কাউন্টি থেকে উঠে আসা এক অবিশ্বাস্য মেধাবী, অথচ গানের ব্যাপারে একেবারেই অদ্ভুত।
শাহাবুদ্দিন: “ভাই, কী গান গাইব?”
ইমরান ভাই: “আরে, ধর একটা। এক কাজ কর, ‘গাজার নৌকা’ ধর।”
শাহাবুদ্দিন একটু থেমে গাইতে শুরু করে:
“গাজার নৌকা পাহাড়তলী যায়, ও মীরাবাঈ,
গাজার নৌকা পাহাড়তলী যায়!
আম খাইলাম আটি আটি,
মাল খাইলাম বাটি বাটি,
চোখে অহন ঝাপসা দেহি ভাই, ও মীরাবাঈ
গাজার নৌকা পাহাড়তলী যায়!”
সে নিজের উদ্ভট কণ্ঠে গাইতে থাকে গণরুমে বানানো উদ্ভট এই গান।
ইমরান ভাই সহ কয়েকজন হেলে দুলে তাল মেলাতে থাকে। কেউ টেবিলের ওপর ঢোলের মতো বাজায়, কেউ তালি দেয়। গেস্টরুম যেন এক কর্কশ গানের উৎসবে পরিণত হয়।
পনেরো মিনিট বাদেই হুট করে ওদিকে দরজায় টোকা পড়ে, আসাদকে দেখা গেল।
শাহীন ভাই: “এই শাহাবুদ্দিন, যা তর জায়গায় ব’। মালে আইছে।”
আসাদ: “ভাই, আসসালামু আলাইকুম, আসবো?”
ইশারায় অনুমতি পেয়ে আসাদ সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। পেছনে পেছনে সাদি আর মুবিন ঢুকে, তারা নিজেদের জায়গায় বসে পড়ে।
ফয়সাল ভাই চোখ সরু করে বলেন, “আরে স্যার, কেমন আছেন? আপনারে তো দেখাই যায় না স্যার। কই ছিলেন স্যার? বরণ কুলা দিয়া বইরা আনতে হইবো?”
আসাদ বলে, “ভাই, কাল ফাইনাল। তাই রিডিং রুমে ছিলাম।”
ফয়সাল ভাই: “কয়টায়?”
আসাদ: “১টায় ভাই।”
শাহীন ভাই ঠোঁট বাঁকিয়ে, দাঁত কচলে বলেন, “ওরে কয় কী! হারারাত, হারাদিন পইড়া রইছে, আর ১ ঘণ্টার গেস্টরুম বাদ দিয়া রিডিং রুম চু**আও?”
সাইদুল ভাই: “এই তুই ছুটি নিছস?”
আসাদ: “না ভাই।”
সিনিয়রদের উত্তেজনা বাড়ছে। ইমরান ভাই নির্দেশ দিলেন, “রাফি, যা তো স্ট্যাম্প গুলো নিয়ে আয়।’’ রাফি ইতস্তত করে। ইমরান ভাই ধমক দিয়ে বলে, “ওই, যাঃ!” রাফি এবার বেরিয়ে গেল স্ট্যাম্প আনতে। এদিকে চলতে লাগলো কোর্টরুম ট্র্যায়াল।
শাহীন ভাই: “ওই হ্লারপুত, তুই ছুটি নিস নাই, গেস্টরুমেও আসিস নাই, আবার পোস্ট মারাস? কোন বাপের হ্যাডম দেখাস তুই? হ্যা? এত হ্যাডাম কই পাস?”
আসাদ আবছা গলায় বলে, “ভাই, হ্যাডাম তো দেখাইনি।”
ফয়সাল ভাই: “আবার মুখের ওপর কথা কয়! এই মাদারি কথা কস আবার?”
আসাদ: “স্যরি ভাই...”
ইমরান ভাই: “এই ‘স্যরি’, কিয়ের স্যরি? মা**রবোর্ড দি ইংরেজিও মারায়! তোর ভাইয়েরা কি ইংরেজি বোঝে না? দেখাস আমগোরে? শা**য়ার পোলা! ইংরেজি ফুটাস!””
আসাদ: “না ভাই...”
উসমান ভাই বলে উঠে, “থাম হ্লা। আবার নি ভাই সু*দাস!”
আসাদ চুপ।
শোনে। গিলছে।
তার চোয়ালের পেশি কাঁপছে, অস্পষ্টভাবে, অশ্রুত হুঙ্কারে। মাথা নিচু করে রাখে। তাতেও কি শান্তি?
পরোক্ষণেই ইমরান ভাই তাচ্ছিল্য সুরে বলে উঠে,
“স্যার, এদিকে তাকান। আপনি নাকি আমাদের দুচেন না? পার্টি দু*সেন না? আপনি কারে কারে নিয়ে পোস্ট দিছেন? কন দি? আমাদের কার কার বিরুদ্ধে আপনার অভিযোগ, নালিশ আছে কন দি হুনি?”
আসাদ চুপ করে থাকে। মাথা নিচু করে শুনে যায় অমোঘ বাণী অর্চনা। ড্যানিয়েলের মত কাঁদছে না। ওকে দেখলে ভীত লাগছে না। যেন আগুনে ভস্ম হলেও, মুখে টু শব্দ করছে না। ভেতরে ভেতরে জমে থাকা আগুনে জ্বলছে ওর চোখ, ফুঁসে উঠছে ভিতরের ঘূর্ণি। ওর সহপাঠি সবাই ভয়ে আছে, ও দুপুরে হল গার্ডেনে বসে যা যা বলতেছিল, পাছে তা করে বসে কীনা।
হৃদয় ভাই: “এখন চুপ ক্যান তুই? এই আমি কি ত’র হোগা মারছিলাম? আমার নামে পোস্ট দেস?”
বলতে বলতেই হৃদয় ভাই আসাদের মুখ চিপে ধরতে হাত বাড়ায়, কিন্তু বিধিবাম!
আসাদ হঠাৎ খপ করে ধরে ফেলে তার হাত!
এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায় সব! করলো কী ও!
তারপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ে সবাই—শাহীন ভাই, ইমরান ভাই, সাইদুল ভাই, ফয়সাল ভাই... যেন নিউমার্কেটের চোর ধোলাই। আসাদও কয়েকটা পাল্টা দিতে গেলেও ব্যর্থ হয় এতজনের বেধড়ক প্রহার শক্তিতে। বরং প্রহারের মাত্রা বেড়ে যায় তাতে।
মাটিতে ফেলে শুরু হয় তীব্র প্রহার—উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া নির্মমতা। ওরা যেন উন্মত্ত প্রাচীন পশুর মতো মারছে ওকে।
হল রুমের বাতাস হঠাৎ যেন ভারী হয়ে গেল। নিঃশ্বাস ফেলাও কঠিন হয়ে পড়ল।
আসাদের শরীরটাকে মাটিতে ফেলে লাথি-ঘুষি মারছে একাধিক বড় ভাই। চারপাশে বসে থাকা ব্যাচমেট হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। কেউ কেউ চোখ নামিয়ে নিয়েছে। সবাই হতভম্ব! “এতটাও না হলে পারতো!” রাফির নিয়ে আসা স্ট্যাম্প হাতে ইমরান ভাই উত্তেজিত অবস্থায় আসাদকে টার্গেট করে মারে। বাড়িটা ওর গায়ে না লেগে লাগলো মাথায়।
আসাদের চিৎকার আর কান্নার আওয়াজে হলরুম ছাপিয়ে আসমান অবধি পৌঁছে যাচ্ছিল। কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করছে না। আসাদ তাকিয়ে আছে সহপাঠিদের দিকে। পৃথিবীর সবকিছু স্তব্ধ লাগছিল ওর কাছে। ও ভাবছে, এরা আমার বন্ধু, আমার সহপাঠী। সবাই ভুক্তভোগী অথচ কেউ কথা বলছে না ওর হয়ে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে কতটা সাহসের প্রয়োজন? আমিতো শুরু করেছি, ওরা কি পারে না আমার সাপোর্টে কথা বলতে? আমাকে মাইর থেকে বাঁচাতে? সবাই কেন সহ্য করছে? কেউ কি নেই দাঁড়াবে আমার হয়ে?
চার।
কিন্তু কেউ একজন পেছন থেকে দাঁড়িয়ে গেল হঠাৎ।
“থামেন ভাই। দয়া করে থামেন!”—শব্দটা এত প্রখর ছিল যে ঘরের নিস্তব্ধতায় কাঁপন তুলল। এদিকে পিটুনি থামলো, ভাইয়েরা সবাই হতবাগ, এ কি কার এত সাহস, কথা বলে কে!
কথাটা বলেছে… ড্যানিয়েল।
এবার তার কণ্ঠে ছিল না কান্না, ছিল না ভীত সন্ত্রস্ত কাঁপুনির ছাপ। ছিল একধরনের কঠিন দৃঢ়তা।
“ভাই, আমরা সবাই জানি আসাদ কী পোস্ট দিয়েছে। সে কারও নাম নেয়নি। শুধু অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছে।”
সোহানও দাঁড়িয়ে যায় সবাইকে উদ্দেশ্য করে চিল্লায়া বলে উঠে,
“এই! তোরা বলতে ভয় পাস কেন? এই কালচার আর কত চলবে? আওয়াজ ওঠা, কথা ক। আজ আসাদ, কাল তুই আমি আমরা সবাই। আজ কথা না বললে আমরাও একদিন মৃত আত্মা হয়ে যাবো, জীবিত লাশ।”
দাঁড়িয়ে যায় আরও একে একে আরও অনেকে। সবাই সম্মিলিত প্রতিবাদ জানায়। আসাদের বুক ভরে যাচ্ছে ওদের ভালোবাসায়। আসাদ হাসতে শুরু করে। প্রথমে মিষ্টি মিষ্টি করে। পরে শব্দ করেই হাসতে থাকে।
আসাদের কান্না মূহুর্তেই খিলখিল হাসিতে রুপান্তরিত হয়েছে। ও আজ খুশি। ওর এত দিনের চেষ্টা বিফলে যায়নি। রক্ত ঝরা ঠোঁটেও আসাদের হাসি ভয়ঙ্কর সুন্দর লাগছে।
আসাদের অট্টহাসিতে হঠাৎ হল রুমে ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। ভাইয়েরা মা’র বন্ধ করে দেয়ভ্রম ভাঙে আসাদের। সে হাসছে চিল্লায়ে। হঠাৎ সে বুঝতে পারে কেউই তার পক্ষে দাঁড়ায়নি। মুখ বুজে আছে সবাই। আর সে পড়ে আছে হল রুমের ফ্লোরে। রক্তাক্ত অবস্থা।
যেন ভায়োলিনের করুন সুর ওর কানে ভেসে আসছে দূর কোথাও থেকে। এতক্ষণ মাথা ঘুরছিল, যেন সদ্য মদ্যপ সে। কিন্তু, তার দৃষ্টি স্পষ্ট হয়েছে এখন। ভ্রম ভেঙ্গে তার হাসি আবার মোড় নেয় কান্নায়। এবার সে মন খুলে সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠে। ওর চিৎকারের আওয়াজ পৌঁছে যায় আসমানের আরশ অব্ধি।
আমি ওর কান্না সইতে পারছিলাম নাহ। বুক জুড়ে কান্না এল। ভাবতে থাকলাম, “এই হলরুমটা কি কেবল একটা রীতি? নাকি একেকটা শরীরের লেখা দাহের ইতিহাস?”
ডিসক্লেইমারঃ গল্পটি এবং এর অন্তর্হিত চরিত্রাবলি নিছক কাল্পনিক এবং লেখকের স্বত্বপ্রসুত লেখনী। লেখকের অনুমতি ব্যতিত এর কোনোরুপ ব্যবহার গর্হিত বলে গণ্য হবে।
লেখকঃ
—-নাঈম এম ইসলাম
০১৭৯৮৩৬২২০৭
জাহাজী
~নাঈম এম ইসলাম
পরদিন সংবাদপত্রে খবর ছাপা হলোঃ
“বরিশালগামী লঞ্চে কলেজছাত্রী খুন, প্রেমিক পলাতক”
ঢাকা, সোমবার।
রাজধানীর একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে রবিবার গভীর রাতে বরিশালগামী লঞ্চে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। নিহতের নাম—ফারহা (ছদ্মনাম)। পুলিশ জানিয়েছে, সন্দেহভাজন প্রেমিক রাকিব (ছদ্মনাম) পলাতক। যাত্রীদের বর্ণনায় জানা যায়, রাতে দু’জনকে কেবিনে একসাথে দেখা গিয়েছিল।
এ নিয়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে তোলপাড়। ফেসবুক গ্রুপ, মেসেঞ্জার গ্রুপগুলোতে আজকের এই গরম সংবাদে সয়লাব হয়ে আছে।
Read more.
ডিসক্লেইমারঃ গল্পটি এবং এর অন্তর্হিত চরিত্রাবলি নিছক কাল্পনিক এবং লেখকের স্বত্বপ্রসুত লেখনী। লেখকের অনুমতি ব্যতিত এর কোনোরুপ ব্যবহার গর্হিত বলে গণ্য হবে।
লেখকঃ
—-নাঈম এম ইসলাম
০১৭৯৮৩৬২২০৭