তাওহীদ (Tawhid) একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো ‘একত্ববাদ’ বা এক করা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়— মহান আল্লাহ তায়ালাকে তাঁর সত্তা, গুণাবলি এবং ইবাদতের ক্ষেত্রে এক ও অদ্বিতীয় হিসেবে বিশ্বাস করার নামই হলো তাওহীদ। তাওহীদের মূল কথা হলো— ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই)।
সহজভাবে তাওহীদকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়:
১. তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ (প্রভুত্বে একত্ববাদ): বিশ্বাস করা যে, আল্লাহই একমাত্র স্রষ্টা, রিজিকদাতা এবং মহাবিশ্বের সবকিছুর পরিচালক।
২. তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ (ইবাদতে একত্ববাদ): সকল প্রকার ইবাদত (যেমন: নামাজ, দোয়া, সিজদা) একমাত্র আল্লাহর জন্য করা।
৩. তাওহীদুল আসমা ওয়াস-সিফাত (নাম ও গুণাবলিতে একত্ববাদ): কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত আল্লাহর সুন্দর নাম ও গুণাবলিকে কোনো পরিবর্তন ছাড়াই বিশ্বাস করা।
কুরআনের দলিল:
"বলুন, তিনিই আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়। আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।" (সূরা আল-ইখলাস, আয়াত: ১-৪)।
তাওহীদ হলো ইসলামের প্রথম এবং প্রধান স্তম্ভ। এটি ছাড়া একজন ব্যক্তি মুসলিম হতে পারে না।
তাওহীদকে তিনটি ভাগে (রুবুবিয়্যাহ, উলুহিয়্যাহ এবং আসমা ওয়াস-সিফাত) বিভক্ত করার ইতিহাস মূলত গভীর গবেষণালব্ধ একটি প্রক্রিয়া। কুরআন ও হাদিসে এই বিভাগগুলো সরাসরি নাম ধরে উল্লেখ না থাকলেও, আলেমগণ দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো সহজভাবে বোঝানোর জন্য এই শ্রেণিবিভাগ করেছেন।
তাওহীদ বিভাজনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস নিচে দেওয়া হলো:
১. প্রাথমিক যুগ (সাহাবী ও তাবেয়ীগণের সময়)
সাহাবী এবং তাবেয়ীগণের যুগে তাওহীদকে এভাবে আলাদা ভাগে ভাগ করার প্রয়োজন ছিল না। তখন ‘ঈমান’ বা ‘তাওহীদ’ একটি অখণ্ড ধারণা ছিল এবং মানুষ সরাসরি কুরআন ও সুন্নাহ থেকে বিশুদ্ধ বিশ্বাস গ্রহণ করত।
২. শ্রেণিবিন্যাসের সূচনা (৩য় ও ৪র্থ হিজরি শতক)
পরবর্তীতে বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদের উদ্ভব ঘটলে আলেমগণ বিশুদ্ধ আকিদা রক্ষার জন্য তাওহীদের বিষয়বস্তুগুলোকে বিন্যস্ত করতে শুরু করেন।
ইমাম ইবনে মানদাহ (মৃত্যু ৩৯৫ হি.) এবং ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারী (মৃত্যু ৩১০ হি.): অনেক গবেষকের মতে, তাঁদের কিতাবসমূহে তাওহীদের এই প্রকারভেদগুলোর ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ইমাম ইবনে বাত্তাহ (মৃত্যু ৩৮৭ হি.): তাঁকে অনেক আলেম তাওহীদকে স্পষ্টভাবে তিন ভাগে ভাগ করে বর্ণনা করা প্রথম দিকের আলেমদের একজন মনে করেন।
৩. তাত্ত্বিক পূর্ণতা (ইমাম ইবনে তাইমিয়ার যুগ)
তাওহীদের এই শ্রেণিবিভাগ সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পায় এবং পূর্ণ তাত্ত্বিক রূপ লাভ করে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (মৃত্যু ৭২৮ হি.) এবং তাঁর ছাত্র ইমাম ইবনে আল-কায়্যিম-এর মাধ্যমে। তাঁরা কুরআন ও হাদিসের আয়াতগুলো বিশ্লেষণ করে দেখান যে:
মক্কার কাফেররা আল্লাহর সৃষ্টি ও রিজিকদাতাকে (রুবুবিয়্যাহ) বিশ্বাস করত, কিন্তু ইবাদতে (উলুহিয়্যাহ) শরিক করত।
তাই তাওহীদকে পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝতে এই বিভাজন জরুরি।
৪. আধুনিক যুগ ও বর্তমান অবস্থা
পরবর্তীতে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব এবং তাঁর অনুসারীদের দাওয়াতের ফলে এই তিন প্রকার তাওহীদের আলোচনা মুসলিম বিশ্বে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে সালাফি ও আহলে হাদিস ঘরানার আলেমগণ আকিদা শেখানোর ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিটি সবচেয়ে বেশি অনুসরণ করেন।
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় তাওহীদকে আলোচনার সুবিধার্থে যে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে, তার প্রত্যেকটির স্পষ্ট দলিল পবিত্র কুরআন ও হাদিসে বিদ্যমান। নিচে দলিলসহ বর্ণনা দেওয়া হলো:
১. তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ (আল্লাহর প্রভুত্ব ও কর্মে একত্ববাদ)
এর অর্থ হলো—সৃষ্টি করা, জীবন-মৃত্যু দেওয়া এবং বিশ্ব পরিচালনা করা যে একমাত্র আল্লাহর কাজ, তা বিশ্বাস করা।
কুরআনের প্রমাণ: "জেনে রেখো, সৃষ্টি করা এবং নির্দেশ দান করা কেবল তাঁরই কাজ। মহাবিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহ অত্যন্ত বরকতময়।" (সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ৫৪)।
হাদিসের প্রমাণ: নবীজি (সা.) ইবনে আব্বাস (রা.)-কে বলেছিলেন, "জেনে রেখো, যদি সমস্ত জাতি তোমার কোনো উপকার করতে চায়, তবে আল্লাহ তোমার জন্য যা লিখে রেখেছেন তা ছাড়া আর কোনো উপকার তারা করতে পারবে না..." (তিরমিজি, হাদিস নং: ২৫১৬)।
২. তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ (ইবাদতে একত্ববাদ)
এর অর্থ হলো—একমাত্র আল্লাহরই উপাসনা করা এবং অন্য কাউকে ইবাদতে শরিক না করা।
কুরআনের প্রমাণ: "আপনার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না।" (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ২৩)।
হাদিসের প্রমাণ: মুয়াজ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, "বান্দার ওপর আল্লাহর হক (অধিকার) হলো—তারা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না।" (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ২৮৫৬)।
৩. তাওহীদুল আসমা ওয়াস-সিফাত (নাম ও গুণাবলিতে একত্ববাদ)
এর অর্থ হলো—আল্লাহর যে সকল নাম ও গুণের কথা কুরআন ও হাদিসে এসেছে, সেগুলোকে কোনো তুলনা বা বিকৃতি ছাড়া বিশ্বাস করা।
কুরআনের প্রমাণ: "আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম; অতএব তোমরা তাঁকে সেই নামগুলো দিয়েই ডাকো।" (সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ১৮০)। এছাড়া অন্য আয়াতে আছে, "তাঁর সদৃশ বা সমান কিছুই নেই।" (সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১)।
হাদিসের প্রমাণ: নবীজি (সা.) বলেছেন, "আল্লাহ তাআলার ৯৯টি নাম রয়েছে; যে ব্যক্তি এগুলো (বিশ্বাস ও আমলের মাধ্যমে) সংরক্ষণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।" (সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ২৭৩৬)।
সারকথা: যদিও 'তিন ভাগ' শব্দটি সরাসরি কুরআনে নেই, কিন্তু কুরআনের আয়াতগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তাওহীদ এই তিনটি বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সূরা ফাতিহার প্রথম তিন আয়াতেই এই তিন প্রকার তাওহীদের ইঙ্গিত রয়েছে।