ঈমান (Eiman) একটি আরবি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ হলো বিশ্বাস করা, স্বীকার করা বা আস্থা রাখা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় ঈমানের সংজ্ঞা অত্যন্ত গভীর। কেবল মনে মনে বিশ্বাস করার নামই ঈমান নয়, বরং এর পূর্ণতা তিনটি বিষয়ের সমন্বয়ে ঘটে:
১. তাসদীক বিল কালব: অন্তরে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা।
২. ইকরার বিল লিসান: মুখে তা স্বীকার করা।
৩. আমাল বিল আরকান: তদানুযায়ী কাজে পরিণত করা বা ইবাদত করা।
ঈমানের মূল ভিত্তি (রোকন)
সহীহ মুসলিমের ‘হাদিসে জিবরীল’ অনুযায়ী ঈমানের মূল স্তম্ভ ৬টি:
১. আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস।
২. তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস।
৩. তাঁর নাজিলকৃত কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস।
৪. তাঁর প্রেরিত নবী-রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস।
৫. পরকাল বা আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস।
৬. ভাগ্যের (তকদির) ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস।
ঈমান সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসের বর্ণনা
কুরআনে আল্লাহ বলেন: “মুমিন তো তারাই, যাদের অন্তর আল্লাহকে স্মরণ করার সময় প্রকম্পিত হয় এবং যখন তাঁর আয়াত তাদের নিকট পাঠ করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে...” (সূরা আনফাল, আয়াত: ২)।
হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন: “ঈমানের ৭০টিরও বেশি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোত্তম হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা এবং সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। আর লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি বিশেষ শাখা।” (সহীহ মুসলিম: ৩৫)।
সারকথা: ঈমান হলো এমন এক নূর বা আলো, যা একজন মানুষকে আল্লাহর অনুগত বান্দা হিসেবে গড়ে তোলে এবং তার জীবনকে ইসলামের ছাঁচে ঢেলে সাজাতে সাহায্য করে। ঈমান ছাড়া কোনো আমল বা ইবাদত আল্লাহর কাছে কবুল হয় না।
মানবিক গুণাবলি এবং আমলের গভীরতার ভিত্তিতে কুরআন ও হাদিসের আলোকে ঈমানকে প্রধানত তিনটি স্তরে বা প্রকারে ভাগ করা যায়:
১. ঈমানে কামিল (পূর্ণাঙ্গ ঈমান)
এটি এমন এক স্তর যেখানে একজন মুমিন কেবল অন্তরে বিশ্বাস ও মুখে স্বীকারই করে না, বরং তার প্রতিটি কাজে ইসলামের প্রতিফলন ঘটে।
হাদিসের দলিল: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত (পূর্ণাঙ্গ) মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করবে যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।" (সহীহ বুখারী: ১৩)।
২. ঈমানে নাগিস (ত্রুটিপূর্ণ বা দুর্বল ঈমান)
যখন একজন ব্যক্তি অন্তরে বিশ্বাস রাখে কিন্তু আমলের ক্ষেত্রে অলসতা বা গুনাহের কাজে লিপ্ত হয়, তখন তার ঈমান দুর্বল হয়ে পড়ে।
হাদিসের দলিল: নবীজি (সা.) বলেছেন, "ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে, তখন সে মুমিন অবস্থায় থাকে না...।" (সহীহ বুখারী: ২৪৭৫)। এর অর্থ হলো, ওই মুহূর্তে তার পূর্ণাঙ্গ ঈমান তার সাথে থাকে না।
৩. ঈমানে হাকিকি (প্রকৃত ঈমান)
এটি অন্তরের সেই গভীর বিশ্বাস যা মানুষকে আল্লাহর ভয়ে গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং বিপদে অটল রাখে।
কুরআনের দলিল: "মুমিন তো তারাই, যাদের অন্তর আল্লাহর নাম স্মরণ করার সময় প্রকম্পিত হয় এবং যখন তাঁর আয়াত তাদের নিকট পাঠ করা হয়, তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়।" (সূরা আনফাল, আয়াত: ২)।
ঈমানের শাখা-প্রশাখা (হাদিসের আলোকে)
ঈমান যে কেবল একটি বিষয় নয় বরং অনেকগুলো কাজের সমষ্টি, তা নিচের হাদিসটি থেকে পরিষ্কার হয়:
হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "ঈমানের ৭০টিরও বেশি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোত্তম হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা এবং সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা।" (সহীহ মুসলিম: ৩৫)।
ঈমানের রোকন বা স্তম্ভ (মৌলিক বিশ্বাস)
আকিদাগতভাবে ঈমান বলতে ওই ৬টি মৌলিক বিষয়কে বোঝায় যা ছাড়া কেউ মুসলিম হতে পারে না:
১. আল্লাহর ওপর বিশ্বাস।
২. ফেরেশতাদের ওপর বিশ্বাস।
৩. আসমানি কিতাবসমূহের ওপর বিশ্বাস।
৪. রাসূলগণের ওপর বিশ্বাস।
৫. পরকালের ওপর বিশ্বাস।
৬. তকদিরের ওপর বিশ্বাস।
দলিল: জিবরীল (আ.)-এর প্রশ্নের উত্তরে নবীজি (সা.) এই ৬টি বিষয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। (সহীহ মুসলিম: ৮)।
সংক্ষেপে, ঈমান বাড়ে সৎকাজের মাধ্যমে এবং কমে যায় পাপাচারের মাধ্যমে।