গণতান্ত্রিক উপায়ে ইসলাম কায়েম করা 'হারাম' নাকি 'হালাল'—এই বিষয়ে মুসলিম উম্মাহর আলেমদের মধ্যে প্রধানত দুটি ভিন্ন মত রয়েছে। বিষয়টি বেশ জটিল এবং এটি ইজতিহাদী (গবেষণামূলক) বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। সংক্ষেপে মত দুটি নিচে দেওয়া হলো:
১. একদল আলেমের মতে (যাঁরা জায়েজ মনে করেন):
বিশ্বের অনেক বড় বড় আলেম ও ইসলামি দল (যেমন: মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমিন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী বা তুরস্কের একে পার্টি সংশ্লিষ্ট আলেমগণ) মনে করেন গণতান্ত্রিক উপায়ে ইসলাম কায়েম করা জায়েজ। তাঁদের যুক্তি হলো:
মন্দের ভালো (Least Evil): বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় সরাসরি বিপ্লব বা যুদ্ধ করে ইসলাম কায়েম করা প্রায় অসম্ভব এবং এতে রক্তক্ষয় বেশি হয়। তাই তুলনামূলক কম ক্ষতিকর পথ হিসেবে নির্বাচনকে বেছে নেওয়া।
দাওয়াতের মাধ্যম: নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো সহজ হয় এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পেলে ইসলামের অনেক বিধিবিধান বাস্তবায়ন করা যায়।
হজরত ইউসুফ (আ.)-এর উদাহরণ: তিনি তৎকালীন অমুসলিম রাজার অধীনে মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেছিলেন বৃহত্তর কল্যাণে, একে অনেকে দলিল হিসেবে ব্যবহার করেন।
২. অন্যদলের মতে (যাঁরা হারাম বা নাজায়েজ মনে করেন):
সালাফি ধারার অনেক আলেম এবং হিজবুত তাহরীর বা জাওয়াহিরি পন্থী আলেমদের মতে গণতন্ত্র ও ইসলাম সাংঘর্ষিক। তাঁদের যুক্তি:
সার্বভৌমত্ব কার?: ইসলামে সার্বভৌমত্ব কেবল আল্লাহর (হাকিমিয়্যাত), আর গণতন্ত্রে সার্বভৌমত্ব জনগণের। আইনের উৎস হিসেবে জনগণকে মানা শিরকের অন্তর্ভুক্ত বলে তারা মনে করেন।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা বনাম সত্য: ইসলামে সত্য দালিলিক, কিন্তু গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতই আইন। যদি ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ হারামের পক্ষে ভোট দেয়, গণতন্ত্রে তা বৈধ হয়ে যায়, যা ইসলামের বিরোধী।
কুফরি ব্যবস্থার অংশ: তাদের মতে, একটি কুফরি সিস্টেমের ভেতরে ঢুকে ইসলাম কায়েম করা সম্ভব নয়।
সারকথা:
এটি একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিতর্ক।
যারা একে হারাম বলেন, তারা মূলত গণতন্ত্রের 'আকিদাগত' দিক (জনগণের সার্বভৌমত্ব) দেখেন।
যারা একে জায়েজ বলেন, তারা একে 'পদ্ধতিগত' দিক (শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা বদল) হিসেবে দেখেন এবং একে ইসলাম কায়েমের একটি মাধ্যম মনে করেন।
অধিকাংশ আধুনিক ফকীহ মনে করেন, যদি লক্ষ্য হয় আল্লাহর দ্বীন কায়েম করা এবং বৃহত্তর ফিতনা থেকে বাঁচা, তবে কৌশল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ নয়। তবে শর্ত হলো, মূল লক্ষ্য ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না।