আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন।। তিনি ১৯৮২ সালে জামায়াতের রুকন হিসেবে শপথ গ্রহন করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি জামায়াতের মজলিশে শুরা সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। আল্লামা সাঈদী ২০০৯ সাল থেকে আজ অবধি জামায়াতের নায়েবে আমীরের দায়িত্ব পালন করছেন।
আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর ১ আসন থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে পরপর দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তাকে পরিকল্পিতভাবে হারিয়ে দেয়া হয়। তিনি মাত্র ৬,৯৯৬ ভোটে পরাজিত হন।
২০০১ সালে তিনি ১,১০,১০৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দী আওয়ামী লীগের প্রার্থী সুধাংশু শেখর হালদার ৭৬,৭৩১ ভোট পেয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে সারাদেশে জামায়াতে ইসলামীর মাত্র তিন জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে আল্লামা সাঈদী ৫৫,৭১৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দী আওয়ামী লীগে প্রার্থী সুধাংশু শেখর হালদার পেয়েছিলেন ৫৫,৪৩৭ ভোট।
জোট সরকারের সময় আল্লামা সাঈদী সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় সময়ে তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় পিরোজপুর-১ সংসদীয় এলাকার ইন্দুরকানীকে তিনি জিয়ানগর নামে সম্পূর্ণ নতুন একটি উপজেলায় পরিণত করন। ২০০২ সালের ২১ এপ্রিল তারিখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জিয়ানগর উপজেলাটির উদ্ধেধন করেন। আল্লামা সাঈদী জিয়ানগর উপজেলার সকল ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ রাস্তা ঘাট, স্কুল কলেজ, ব্রীজ হাসপাতাল সবকিছুই নির্মান করেন। বর্তমান সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারনে ২০১৭ সালে আল্লামা সাঈদীর হাতে গড়া জিয়ানগর উপজেলার নাম পরিবর্তন করে আবার ‘ইন্দুরকানি’ নামকরণ করেছে। তবে আল্লামা সাঈদীর এই এলাকা এখনো দেশের মানুষের কাছে ‘জিয়ানগর’ নামেই পরিচিত।
দেশ ও জাতি গঠনের আল্লামা সাঈদীর ভূমিকা
সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে অনৈসলামিক কর্মকান্ড বন্ধে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ভূমিকাঃ
বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। এ দেশের রাজধানী ঢাকা মসজিদের শহর হিসেবে পরিচিত। এ জাতি নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয় তাওহীদের ধ্বনি শুনে। কিন্তু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র মূর্তি বানানো হচ্ছিলো দেদারছে।
১৯৭৮ সালে রাজধানী ঢাকার জিপিওর সামনে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি নির্মাণ করা হয়েছিল। আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এই ভাস্কর্য নির্মাণের বিরুদ্ধে তাওহীদী জনতাকে সাথে নিয়ে প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলেন। তিনি এর প্রতিবাদে জনতার বিশাল মিছিল নিয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্টে হুসেইন মোহাম্মাদ এরশাদের কাছে গিয়ে এই মূর্তি অপসারণের জন্য স্মারকলিপি পেশ করেন। আল্লামা সাঈদীর এই প্রতিবাদী ভূমিকার কারনে তৎকালীন সরকার সেই রাতেই অভিশপ্ত মূর্তিটি অপসারণের নির্দেশ দিতে বাধ্য হয়।
১৯৮৫ সনের ২০ ডিসেম্বর জাতীয় স্টেডিয়ামে সাফ গেমস উপলক্ষে নির্মাণ করা হয় মশাল টাওয়ার। মশাল টাওয়ার তথা আগুন পূজার বিরুদ্ধে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী তাওহিদী জনতাকে সাথে নিয়ে দেশে প্রবল গণ-আন্দোলনের সূচনা করেন। তদানীন্তন সরকার আল্লামা সাঈদীর সে আন্দোলনে ভীত হয়ে এক সপ্তাহের মধ্যেই মশাল টাওয়ার ভেঙে ফেলতে বাধ্য হয়।
রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে আল্লামা সাঈদী
ডেপুটি লিডার, পার্লামেন্টারী পার্টি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
চেয়ারম্যান, ধর্ম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি
সদস্য, বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি
সদস্য, জাতীয় পানি সম্পদ কাউন্সিল, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়
সদস্য, ট্রাষ্টি বোর্ড, জাতীয় কৃষি পুরস্কার, কৃষি মন্ত্রণালয়
সদস্য, যাকাত বোর্ড, ধর্ম মন্ত্রণালয়
এ পর্যন্ত চার বার হত্যা করার লক্ষ্যে আল্লামা সাঈদীর প্রতি গুলী ছুড়া হয়, আক্রমন করা হয়। সর্বপ্রথম ঘটনাটি ঘটে ১৯৭৩ সালের ১৪ জানুয়ারী। উত্তরবঙ্গের চাঁপাই নবাবগঞ্জের একটি কলেজ মাঠে আয়োজিত তাফসীর মাহফিলে অংশগ্রহনের জন্য আল্লামা সাঈদী চাঁপাই নবাবগঞ্জ গমন করেন। মাহফিল শেষে তাকে যে বাড়িতে রাখা হয় সেই বাড়িটি গভীর রাতে ঘিরে ফেলে নাক মুখ বাঁধা সশস্ত্র আততায়ীরা। আল্লামা সাঈদীর সাথে তখন উপস্থিত ছিলেন পাবনা ইশ্বরদীর নন্দিত আলেম মাওলানা খোদা বখ্স খান (মরহুম)। ঘাতকদের উপস্থিতি টের পেয়ে মাওলানা খোদা বখ্স খান আল্লামা সাঈদীকে নিয়ে পাশ্ববর্তী এক বাড়িতে অবস্থান করেন। আল্লামা সাঈদী যে রুমে ছিলেন ঘাতকরা এসে সেই রুমে ৫/৬ রাউন্ড গুলি ছুড়ে মুহুর্তের মধ্যেই স্থান ত্যাগ করে। হয়তো ঘাতকেরা ভেবেছিলো তারা তাদের ষড়যন্ত্রে সফল হয়েছে, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা আপন কুদরতে তাঁর গোলাম আল্লামা সাঈদীকে ঘাতকদের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন।
১৯৭৫ সালের ২৯ জুলাই আল্লামা সাঈদী প্রথমবার কারাবরণ করেন। খুলনার হেলাতলা মসজিদের সামনে আয়োজিত একটি তাফসীর মাহফিল শেষে ঘরে ফেরার পথে সাদা পোশাকের পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে খুলনা থানায় নিয়ে যায়। খুলনা থেকে রেলপথে তাকে ঢাকা রাজারবাগ পুলিশ ফাঁড়িতে পাঠানো হয়। সেখান থেকে তাকে নেয়া হয় শাহবাগের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে। সেখানে ৩/৪ দিন রাখার পর আল্লামা সাঈদীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ডিটেনশনে [রাজনৈতিক কারনে বিনা বিচারে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্দীত্ব] নিয়ে যাওয়া হয়।
১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসের শেষ ভাগে আল্লামা সাঈদী কারাগার থেকে মুক্তি পান। [এখানে গ্রেফতার ও তৎপরবর্তী ঘটনা বর্ণনা করে আল্লামা সাঈদীর সাক্ষাৎকারের ভিডিওটি সংযুক্ত হবে]
দ্বিতীয়বার ২০১০ সালের ২৯ জুন ঢাকাস্থ শহীদবাগের নিজ বাসভবন থেকে গ্রেফতার হন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। এর আগে ২১ মার্চ বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা’র কথিত অভিযোগে আল্লামা সাঈদীসহ আরো ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। সেই মামলায় আল্লামা সাঈদীকে গ্রেফতার দেখানো হয়। ঐ মামলায় তাকে সাজা দিতে না পেরে পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তথাকথিত যুদ্ধপরাধের মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগে কারান্তরীণ থাকা অবস্থায় আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে (২০১১ সালে) যুদ্ধাপরাধ মামলা দায়ের ও বিচার শুরু করা হয়।
২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কথিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল আল্লামা সাঈদীকে ফাঁসির রায় দেয়। দেশব্যাপি ফাঁসির রায় পরবর্তী ব্যাপক বিক্ষোভ ও ২৪৫জনের জীবন দানের পর ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আল্লামা সাঈদীর সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়। রাষ্ট্রপক্ষ এবং আল্লামা সাঈদী উভয়ই সুপ্রিম কোর্টের রায়ে রিভিউ আবেদন করলে ২০১৭ এর ১৫ মে আপিল বিভাগ উভয়ের আবেদন খারিজ করে দেন।
পিরোজপুরের উন্নয়নে আল্লামা সাঈদী
* পিরোজপুর সদর হাসপাতাল সংলগ্নে নার্সিং ট্রেনিং ইনষ্টিটিউট প্রতিষ্ঠা
* পিরোজপুর বাইপাস সড়কে যুব উন্নয়ন কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ
* পিরোজপুর বাইপাস সড়কে নতুন বাস টার্মিনাল নির্মাণ
* নাজিরপুর কালিগঙ্গা নদীর উপর কালিগঙ্গা ব্রীজ নির্মাণ
* নাজিরপুরে আধুনিক ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নির্মাণ
* পিরোজপুর শহরে শিল্পকলা একাডেমী ভবন নির্মাণ
* পিরোজপুর সদর হাসপাতালকে ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীতকরণ
* নাজিরপুর হাসপাতালকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ
* নাজিরপুর পুলিশ ফাঁড়িকে থানায় উন্নীতকরণ
* ইন্দুরকানী থানাকে জিয়ানগর উপজেলায় উন্নীতকরণ
* জিয়ানগর বলেশ্বর নদীর উপর জিয়ানগর ব্রীজ নির্মাণ
* জিয়ানগরে ৩১ শয্যা বিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ
* জিয়ানগরে পোষ্ট অফিস স্থাপন
* জিয়ানগরে উপজেলা পরিষদ ভবন, প্রশাসনিক ভবন, অফিসার্স কোয়ার্টারসহ সকল ভবন নির্মাণ
* পিরোজপুর সদর-নাজিরপুর-জিয়ানগর উপজেলায় ৫টি টেকনিকেল কলেজ নির্মাণ
* পিরোজপুর সদর-নাজিরপুর-জিয়ানগর উপজেলার অসংখ্য স্কুল-মাদরাসাকে এমপিও ভূক্ত করণ
* পিরোজপুর সদর-নাজিরপুর-জিয়ানগর উপজেলার অসংখ্য স্কুল-কলেজ-মাদরাসার নতুন ভবন নির্মাণ
* পিরোজপুর সদর-নাজিরপুর-জিয়ানগর উপজেলায় অসংখ্য কাঁচা রাস্তা কার্পেটিং করণ
* পিরোজপুর-নাজিরপুর-জিয়ানগর উপজেলায় ৯টি আধুনিক ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মাণ
* জিয়ানগরে ১৮১ ব্যারাক বিশিষ্ট দেশের ২য় বৃহত্তম আবাসন ‘চর সাঈদখালী আবাসন প্রকল্প’ নির্মাণ
* পিরোজপুর সদর-নাজিরপুর-জিয়ানগর উপজেলার অধিকাংশ ঘরে বিদ্যুতায়ন
১৯৭১ সালে আল্লামা সাঈদীর অবস্থান
১৯৬৭ সালে আল্লামা সাঈদী যশোরে বসবাস করা শুরু করেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর সময়ে তিনি যশোরের নিউমার্কেট এলাকার ‘এ’ ব্লকে স্বপরিবারে বসবাস করতেন। যুদ্ধ শুরু হলে তাঁর বাসার আশপাশে পাক সেনাদের বোমা পড়তে থাকায় ‘বাঘারপাড়া’ চলে যান। বাঘারপাড়া ও মহিরনে আল্লামা সাঈদী প্রায় চার মাস স্বপরিবারে অবস্থান করেন।
যুদ্ধের ভয়াবহতা কিছুটা কমে এলে আল্লামা সাঈদী যশোর থেকে নিজ গ্রাম পিরোজপুরের সাঈদখালী গ্রামে জুলাই’৭১ সালের মাঝামাঝি ফিরে যান। যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের পক্ষে যেসব দল তৈরী হয়েছিল, যেমন রাজাকার, আল বদর, আল শামস, মুজাহিদ বাহিনী, শান্তি কমিটি এসবের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন না। পিরোজপুরের মুক্তিযোদ্ধারাও এসবের সাক্ষী।