২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন তার পঞ্চম বছরে পদার্পণ করেছে এবং এটি আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত হিসেবে অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ পরিস্থিতির মূল পয়েন্টগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. রণক্ষেত্রের বর্তমান অবস্থা (মার্চ ২০২৬)
ইউক্রেনের পাল্টা আক্রমণ: ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইউক্রেনীয় বাহিনী ওলেক্সানদ্রিভকা এবং হুলিয়াইপোল অভিমুখে প্রায় ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা পুনর্দখল করার খবর পাওয়া গেছে।
রুশ অগ্রযাত্রা: অন্যদিকে, রাশিয়ার শীর্ষ জেনারেল ভ্যালেরি গেরাসিমভ দাবি করেছেন যে, মার্চ মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে রুশ বাহিনী পূর্ব ও দক্ষিণ ইউক্রেনের প্রায় ১২টি জনপদ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
ড্রোন যুদ্ধ: বর্তমানে উভয় পক্ষই ব্যাপকভাবে ড্রোন ব্যবহার করছে। ১৭ মার্চ ২০২৬-এর খবর অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার প্রায় ২,০০০ ড্রোন ধ্বংস করার দাবি করেছে।
২. হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি
সেনা হতাহত: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যমতে, যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত রাশিয়ার সামরিক হতাহতের সংখ্যা (নিহত ও আহত) প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। ইউক্রেনের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ৩ লাখের কাছাকাছি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সম্মিলিত ক্ষয়ক্ষতি: ২০২৬ সালের বসন্ত নাগাদ উভয় পক্ষের মোট হতাহতের সংখ্যা ২০ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
৩. আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও নতুন জোট
প্রতিরক্ষা চুক্তি: ১৭ মার্চ ২০২৬ তারিখে ইউক্রেন ও যুক্তরাজ্য একটি নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব চুক্তি সই করার কথা রয়েছে, যার মূল লক্ষ্য হলো কম খরচে উন্নত প্রযুক্তির ড্রোন তৈরি ও মোকাবেলা করা।
আঞ্চলিক অস্থিরতা: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনার ফলে রাশিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক মনোযোগ কিছুটা কমেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ অব্যাহত রেখেছে।
বিদেশি যোদ্ধা: রাশিয়া কেনিয়ার নাগরিকদের তাদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। এর আগে অনেক আফ্রিকান ও এশীয় নাগরিক (বাংলাদেশিসহ) রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল।
৪. মানবিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি
ইউক্রেন বর্তমানে রাশিয়ার দখলকৃত প্রায় ২০% অঞ্চল উদ্ধারের চেষ্টা করছে।
আইএমএফ (IMF) ইউক্রেনের জন্য ৮.১ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা ছাড়ের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, কারণ ইউক্রেনীয় পার্লামেন্ট কর বৃদ্ধির মতো প্রয়োজনীয় আইন পাসে বিলম্ব করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষই চূড়ান্ত বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে নেই, বরং যুদ্ধটি একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং ক্ষয়িষ্ণু সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার প্রধান সহযোগী দেশগুলো মূলত সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সমর্থনের ভিত্তিতে বিভক্ত।
রাশিয়ার প্রধান সহযোগী দেশসমূহ:
বেলারুশ: রাশিয়ার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্র। যুদ্ধের শুরু থেকেই তারা নিজেদের ভূখণ্ড রুশ সেনাদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে সহায়তা করছে।
উত্তর কোরিয়া: রাশিয়ার জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সহযোগী। তারা রাশিয়াকে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রয়োজনে সৈন্য দিয়ে সহায়তা করছে।
ইরান: রাশিয়াকে কয়েক হাজার ড্রোন (বিশেষ করে শাহেদ-১৩৬) এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করছে। এমনকি রাশিয়ায় ড্রোন তৈরির কারখানাও স্থাপন করেছে।
চীন: রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। সরাসরি অস্ত্র না দিলেও তারা রাশিয়াকে ড্রোন তৈরির যন্ত্রাংশ, কম্পিউটার চিপস এবং সামরিক কাজে ব্যবহৃত অন্যান্য প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করছে।
অন্যান্য সমর্থক দেশ: সিরিয়া, কিউবা, ভেনিজুয়েলা, নিকারাগুয়া, মিয়ানমার, মালি এবং ইরিত্রিয়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে রাশিয়ার পক্ষ নিয়েছে বা সমর্থন দিয়ে আসছে।
সামরিক জোট (CSTO):
রাশিয়া নেতৃত্বাধীন 'কালেক্টিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজেশন' (CSTO)-এর সদস্য হিসেবে আর্মেনিয়া, বেলারুশ, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান এবং তাজিকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার নিরাপত্তা সহযোগী।
এছাড়াও ভারত ও হাঙ্গেরির মতো কিছু দেশ রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখলেও যুদ্ধের সরাসরি কোনো পক্ষ নেয়নি।
২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইউক্রেনকে মূলত পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলো এবং সামরিক জোট ন্যাটো (NATO) ব্যাপক সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দিচ্ছে।
ইউক্রেনের প্রধান সহযোগী দেশগুলো হলো:
যুক্তরাষ্ট্র (USA): ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় সামরিক ও আর্থিক সহায়তাকারী। তারা হিমার্স (HIMARS), আব্রামস ট্যাঙ্ক, এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এবং অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করছে।
যুক্তরাজ্য (UK): ইউক্রেনের অন্যতম প্রধান কৌশলগত মিত্র। ১৭ মার্চ ২০২৬-এ তারা ইউক্রেনের সাথে একটি নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব চুক্তি সই করেছে, যার লক্ষ্য ড্রোন প্রযুক্তি উন্নত করা।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU): জার্মানি, ফ্রান্স, পোল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ডস ইউক্রেনকে শত শত ট্যাঙ্ক, সাঁজোয়া যান এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ইউরো সহায়তা দিচ্ছে। পোল্যান্ড ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রধান ভূমিকা পালন করছে।
কানাডা: তারা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সাঁজোয়া যান দিয়ে সাহায্য করছে।
অন্যান্য দেশ: দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপান সরাসরি অস্ত্র না দিলেও মানবিক সহায়তা এবং অ-ঘাতক সামরিক সরঞ্জাম (যেমন: জেনারেটর, চিকিৎসা সরঞ্জাম) সরবরাহ করছে।
এছাড়া বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলো—লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া এবং এস্তোনিয়া ইউক্রেনকে তাদের জিডিপির অনুপাতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা প্রদানকারী দেশ হিসেবে পরিচিত।