আমাদের সম্পর্কে
About Us
আমাদের সম্পর্কে
About Us
এই বৌদ্ধ বিহারটির নাম রাংকুট। আভিধানিক অর্থে রাং অর্থ বুদ্ধের বক্ষাস্থি, আর কুট অর্থ পর্বত বা চূড়া। অর্থাৎ বুদ্ধের বক্ষাস্থির পর্বত। খ্রীষ্টপূর্ব ২৬৮ অব্দে সম্রাট অশোক বুদ্ধের বক্ষাস্থি দিয়ে রাংকুট চৈত্যটি প্রতিষ্ঠা করেন। কথিত আছে খ্রীষ্টপূর্ব ৬০০ অব্দে গৌতম বুদ্ধ তাঁর প্রধান সেবক আনন্দ ভিক্ষুকে সাথে নিয়ে তৎসময়ে ব্রহ্মদেশের রাজা চান্দাচুরিয়ার নিমন্ত্রণে ব্রহ্মদেশে যাবার পথে এই স্থানে এক রাত্রি বিশ্রাম নিয়েছিলেন। তখন বুদ্ধ তাঁর সেবক আনন্দকে উপলক্ষ করে বলেছিলেন- হে আনন্দ, আমার পরিনির্বাণের (দেহাবসান) পরে আমার বক্ষাস্থি দিয়ে পশ্চিম সাগরের পূর্ব তীরে এই পর্বতে একটি চৈত্য নির্মিত হবে। বুদ্ধের ভবিষ্যৎ বাণী অনুসারে বুদ্ধের পরিনির্বাণের ২৩৯ বছর পরে সম্রাট অশোক বুদ্ধের প্রচারিত ৮৪ হাজার ধর্মবাণী উপলক্ষে ৯৬ কোটি স্বর্ণ মুদ্রা ব্যয় করে ৮৪ হাজার ধর্মচৈত্য প্রতিষ্ঠা করেন। সেই ৮৪ হাজার ধর্মচৈত্যের মধ্যে এই রাংকুট চৈত্যটি একটি। ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে আরাকানী রাজা চেন্দি রাংকুট চৈত্য থেকে বুদ্ধের বক্ষাস্থিটি নিয়ে ৬ ফুট মনোরম পাথরের একটি বুদ্ধবিম্ব তৈরী করে বুদ্ধবিম্বের মাথার ভিতরে প্রতিস্থাপন করেন। সেই সময়ে রাজা বুদ্ধের বক্ষাস্থির প্রতি সম্মানার্থে রাং এর পরে "উ" যোগ করে দেন। এই রাং-উ থেকে রামুর উৎপত্তি। বুদ্ধের বক্ষাস্থি সম্মলিত এই রাংকুট বুদ্ধ নাম হলেও ভিন্ন ভিন্ন নামে জনমুখে প্রচারিত রয়েছে। যেমন- ঋদ্ধিময় বুদ্ধ, বুড়াগোসাই, জীবিত বুদ্ধ, জাগ্রত বুদ্ধ ইত্যাদি। বিখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং ৭ম শতাব্দিতে ভারত-বাংলা ভ্রমণের সময় এই রাংকুট বিহারটিও পরিদর্শন করেছেন বলে কথিত আছে।
ঐতিহাসিক রাংকুট বৌদ্ধ তীর্থস্থান বাংলাদেশের ধর্মীয় পর্যটনের এক গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় কেন্দ্র। প্রাচীন বিহার, মূল্যবান প্রত্নসম্পদ, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই বনাশ্রম দীর্ঘদিন ধরে সকল ধর্মাবলম্বীদের জন্য এক পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত। প্রতদিনি দেশ-বিদেশ থেকে ভক্ত ও পর্যটকদের আগমন এই স্থানের পর্যটন সম্ভাবনাকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে অল্পসংখ্যক দর্শনার্থী এলেও, সংশ্লিষ্ট মহলের মতে পরিকল্পিত উন্নয়ন ও যথাযথ প্রচারণা থাকলে দৈনিক কমপক্ষে ৫০০-১০০০ পর্যটক আকর্ষণ করা সম্ভব। বিশেষ করে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সাথে সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনা গ্রহণ করলে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই তীর্থস্থানটি এখনো পর্যটন খাতে পূর্ণ বিকাশ লাভ করতে পারেনি। এর অন্যতম প্রধান কারণ আর্থিক সীমাবদ্ধতা। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংযোজন, সংরক্ষণ কার্যক্রম এবং প্রচারণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের অভাব দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্থ করছে। ফলে পর্যটকদের জন্য মানসম্মত আবাসন, বিশ্রামাগার, স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমান সমস্যাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা, পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার অভাব, প্রশিক্ষিত গাইড ও তথ্যকেন্দ্রের সংকট এবং দেশ-বিদেশে সরকারি ও বসেরকারি র্পযায়ে পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণার অভাব। এছাড়া প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণে যথাযথ উদ্যোগের অভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সুপরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রাংকুট বনাশ্রমকে আন্তর্জাতিক মানের বৌদ্ধ পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করা সম্ভব। এতে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বাংলাদেশের ধর্মীয় পর্যটন খাত নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। অতএব, এই ঐতিহাসিক তীর্থস্থানের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এখনই প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং সমন্বিত উদ্যোগ রাংকুট বনাশ্রম র্তীথস্থানকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সহায়ক হবে।