ব্যক্তিচিন্তার সংকীর্ণ আবর্তে আবদ্ধ জীবন প্রকৃত মানবজীবনের পূর্ণতা বহন করে না; এতে নেই জীবনের আসল রস, নেই পরিপূর্ণতার স্বাদ। মানুষের সত্যিকারের সার্থকতা নিহিত আত্মিেকন্দ্রকতার সীমানা অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবসমাজের সঙ্গে গভীর ও মমতাময় সম্পর্ক গড়ে তোলার মধ্যেই। বৈরাগ্য সাধনার অন্তরালে থেকেও নীরব তপস্যার মতো অসংখ্য সম্পধর্ক ও দায়িত্বের মাঝে মহানন্দময় মুক্তির অন্বেষায় অনেক প্রতিভাধর ব্যক্তি নিভৃতে আত্মনিয়োগ করে চলেন। তেমনি এক প্রজ্ঞা ও মানবিকতায় উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব মহাথের কে. শ্রী জ্যোতিসেন ভিক্ষু যিনি মানবসেবাকে জীবনের ব্রতরূপে ধারণ করে সমাজকল্যাণে নিরলসভাবে অবদান রেখে চলেছেন। তাঁর জীবন যেন এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত, যেখানে ত্যাগ, প্রজ্ঞা ও মমত্ববোধ মিলেমিশে এক অনন্য মানবিক মহিমার রূপ নিয়েছে। প্রথিবীর সর্বদীর্ঘ সমুদ্র সৈকত পরিবেষ্টিত অপার সৌন্দর্য্যরে রম্যভূমি কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত উখিয়া উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অনন্য একটি গ্রাম কুতুপালং। মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধদের মাঝে সম্প্রতির মেলবন্ধনে এ অঞ্চল সুদীর্ঘ সময় ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্তরূপে গণ্য।
এই অনন্য সুন্দর পল্লীতে ঐতিহাসিক ক্রান্তিক্ষণে ২০ এপ্রিল, ১৯৮২ খ্রিঃ, রোজঃ শুক্রবার, পিতা- প্রবীন বড়ুয়া ও মমতাময়ী মাতা- আংকু বালা বড়ুয়ার সংসারে জন্মগ্রহণ করেন মহাথের কে. শ্রী. জ্যোতিসেন ভিক্ষু। পরিবারের সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি হলেন ষষ্ঠ। একাডেমিক ও ধর্মীয় জীবনে তাঁহার সফলতা অত্যন্ত গৌরবের। ২০০৩ সালে কলকাতায় ২৪ পরগনার বারসাতে অবস্থান করে হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য থাইল্যান্ডে গমন করেন। সেখানে দীর্ঘবছর অবস্থানের মধ্য দিয়ে থ্যাই ভাষা আয়ত্ব করেন এবং ডিপ্লোমাভিত্তিক কোর্স সম্পন্ন করে থাইল্যার্ডের ধর্ম মন্ত্রণালয় হতে নাকথাম সার্টিফিকেট অর্জন করেন। তিনি নতুন জায়গার বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের লক্ষ্যে ৪০ টিরও বেশি বহু দেশ বহুবার ভ্রমণ করে অভিজ্ঞতাগুলো নিজের স্ব-দেশের সমাজে মানবিক কাজে লাগাতে বদ্ধ পরিকর। যার বড় উদাহরণ ইতিমধ্যে ডজনখানিক শিক্ষা ও মানবিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা।
তিনি জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমাজসেবা ও মানবতার কাজ করতে গিয়ে নিজ উদ্যোগে কক্সবাজার রামুতে ২০২১ সালে জ্যোতিসেন উচ্চ বিদ্যালয় (ঊওওঘ১৩৯৯৩৩), ২০২৪ সালে বান্দরবান নাইক্ষ্যৎছড়ির প্রত্যন্ত এলাকা ঘুমঘুমে জ্যোতিসেন মহাথের স্কুল এন্ড কলেজ, তিনটি মেডিটেশন সেন্টার, সমাজের অসহায় বৃদ্ধ নর-নারীর জন্য ২০১৯ সালে মা-বাবা বৃদ্ধাশ্রমসহ ডজনখানেক শিক্ষা, মানবতা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে সমাজের সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি ‘‘জ্যোতিসেন ফাউন্ডেশন” প্রতিষ্ঠা করে সমাজে পিছিয়ে থাকা মানুষের উন্নতির জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন। জ্যোতিসেন মহাথের ২০১৩ সাল হতে প্রত্যেক রমজান মাসে প্রতিবেশী রোজাদারি অসহায় মুসলিমদেরকে ইফতার বিতরণ এবং প্রায় সময় বিভিন্ন হাসপাতালে অসহায় রোগিদের মাঝে ফলমূল বিতরণ ও চিকিৎসা সামগ্রী বিতরণ এবং শীতের মাসে গরীব অসহায় মানুষের মাঝে শীতকালীন কম্বল বিতরণ করে আসতেছেন। মানবসম্পদ ও তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়ন সাধনে কম্পিউটার ল্যাব প্রতিষ্ঠা, প্রাকৃতিক দুয্যোগ প্রতিরোধ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কাজে সহায়তা, অসহায়, গরিব ও এতিম পরিবারের চিকিৎসার জন্য অর্থ, স্বেচ্ছায় রক্তদান ও ত্রাণ কাজে অবদানে সাক্ষর রেখে চলেছেন। এসব কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় বাধাবিঘœ ও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিন্তু সব বাধাবিঘœকে ধৈর্যের মাধ্যমে তুচ্ছ করে সমাজে বিবিধ সৃজনশীল কর্ম উপহার দিয়ে চলেছেন।
তাঁহার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় দাতব্য হাসপাতাল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, সুদত্ত শিশু কল্যাণ আশ্রম ও কম্পিউটার সেন্টার প্রতিষ্ঠাসহ আরো বেশ কয়েকটি সেবামূলক অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা উল্লেখযোগ্য। তাঁর নিজের সমাজসেবা ও মানবতার কাজের জন্য ২০২৪ সালে ভারতের কলকাতায় “মহাত্মা গান্ধী আন্তর্জাতিক শান্তি পুরষ্কার”, বাংলাদেশ সংঘরাজ মহাসভা কর্তৃক “সদ্ধর্মভাণক”, উখিয়া বিশ্বজ্যোতি মিশন কল্যাণ ট্রাষ্ট কর্তৃক ২০২২ সালে “অনাথপিতা” ও জ্ঞানসেন বৌদ্ধ ভিক্ষু-শ্রামণ প্রশিক্ষণ ও সাধনা কেন্দ্র কর্তৃক ২০১৯ সালে “ধর্মদূত” সম্মাননাসহ দেশ-বিদেশ হতে বহু সম্মাননা ও উপাধী অর্জন করেছেন। মহাথের কে. শ্রী. জ্যোতিসেন ভিক্ষু অর্ধ-ডজন গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং ডজনের অধিক প্রবন্ধ লিখেছেন। তার মধ্যে যেমন কর্ম তেমন ফল, দুঃখ মুক্তির অন্বেষণ, বিহার তুমি কার ও সম্যক আত্মপ্রতিষ্ঠা অন্যতম গ্রন্থাবলী। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশের হাজার বছরের নিদর্শন কক্সবাজার জেলাধীন রামু ঐতিহাসিক রাংকুট বনাশ্রম বৌদ্ধ তীর্থস্থানের প্রধান পরিচালকের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে অভূতপূর্ব সংস্কার ও উন্নয়ন সাধন করে করেছেন। বিশেষ করে তিনি রাংকুট জাদুঘর, স¤্রাট অশোক প্রতিবিম্ব, সীবলী প্রতিবিম্ব, পদ্মবীণা ঝুলন্ত ব্রীজ, মীরাকেল গার্ডেন, প্রজ্ঞাবংশ ফ্লাইওভার, রাংকুট ইকো মেডিটেশন পার্ক, ১১৫ ফিট লম্বা দুটো নান্দনিক ড্রাগন, প্রতীকী লুম্বিনী, প্রতীকী সারনাথ, হিউয়েন সাং প্রতিবিম্ব, ড. বি.আর আম্বেদকরের প্রতিবিম্ব এবং অতিথিদের জন্য উত্তম মঞ্চ উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও বর্তমানে দেশের সর্ববৃহৎ ১৫০ ফুট নির্বাণশয্যা বুদ্ধবিম্ব প্রতিষ্ঠা এখনো চলমান।