A discussion on the current state of left politics in Bangladeshi Universities
Published in the Dhaka Tribune: Save them from the ‘big brothers’ (dhakatribune.com)
In the last twenty years, almost all student movements in public universities have been hijacked by the professional leftist leaders. In recent years, looking at the movements in various universities including University of Dhaka and Shahjalal University of Science and Technology, this information is clear. I would not raise a question if left-wing political parties in Bangladesh were liberal in their ideal position. I raise this discussion because our left-wing political parties are as toxic as the right-wing parties. In order to achieve their political objectives, they take teenage boys and girls from 19/20 years old into the party and use them for violent political purposes. This process, most importantly, destroys the academic lives of middle-class and lower-middle class students. Why don’t we take a step to prevent these disasters?
Based on some experiences in university life with a left-wing political party, I know how destructive this attraction can be for teenagers. Many left-wing leaders are students just by name; they do not do the minimum necessary academic performance to be a formal “student”. They do not have “time” to take exams or to attend classes. These leaders occupy free seats in public universities and spend their time idly. Many boys and girls who had just passed high school thought highly of these left-wing leaders and, driven by the same desire, joined their party. They continue the same cycle by hanging out in the canteen and trying to uphold the great vow of saving the country/world without any future planning! As the public universities do not have a tuition fee, they can get by from year to year in one place without any big financial loss. These so-called left leaders still roam the campus as "student leaders" in their 30’s and 40’s.
One major reason for this vicious cycle is the absence of cultural clubs and organizations for intellectual discussions and free thinking in Bangladesh's campuses. If organizations like student unions existed, young students would not have to rely on the big "brothers" for such extracurricular activities, instead they could pursue their own professional and academic careers alongside. However, now these "big brothers" have become the main cult, and they have never graduated from their own Honors degree. If any young student expresses interest in formal education, the left leaders try to discourage and destroy their academic careers. They even discourage anyone who wants to take an exam or even attend classes regularly. The bullying crosses every limit, and I know people who went through severe depression in this process.
To the leftists, any position against the government or university institutions is a great achievement. When the topic of ban on student politics is raised, the leftist leaders strongly disapprove. However, there are no examples of politics on campuses in civilized countries. The left leaders disapprove for a simple reason. Except for inexperienced young students, no one takes them seriously. A large part of these students who are attracted to the left ideology come from impoverished backgrounds. They have no social network in the big cities. Left leaders take advantage of this helplessness. Simply put, if student politics is closed on campus, the names of the leftists will also be erased in Bangladesh.
I will tell you about a small personal experience. This happened in the second year of my DU life, around 2007/2008 - I also used to feel a bit attracted by the so-called charismatic "leftist leaders". Many well-known writers' names were on the lips of these leaders. In my inexperienced ears, their discussions sounded like complex scholarly debates. The leftist leaders would often ask us to wait in the canteen for them from the early morning. Why? To save the country! We would sit in the canteen from 9 am on days in the hope for the liberation of the country, and the leftist leaders would arrive after 2 pm. Days after days, hours after hours, such irresponsible waste of time would continue.
One day, while trying to bring about the “political revolution” in this country, the responsibility fell upon us to stop the TSC canteen from raising lunch prices. The TSC wanted to increase the price to 20 TK from 18 TK! To fulfill that responsibility, the left "leaders" went to hold a cigarette worth four taka in their hands and describe this as the product of the imperialist fascist government etc. in front of the TSC. We, the younger ones, were somewhat amazed and somewhat confused. From that time, I was always concerned about this hypocrisy. If one student gets a good academic result or just wants to attend classes regularly, there is always a strong resentment among the left leaders. They would bully, “only selfish, self-interested people have an interest in academic exams.”
For young students who are just entering university, it is important to keep these topics in mind. Many boys and girls are driven to despair by this racket. Almost every day in the newspaper, there are reports of left-wing political activists, young boys and girls, committing suicide. The role of political "leaders" behind this, their use of bullying, and the extent of the racket need to be recognized as an important concern.
On the other hand, it is incumbent upon universities to adopt appropriate policies to create an open environment for students' rights and cultural discussions. If there are various clubs on the campus and an environment for brainstorming, inexperienced students would not have fallen prey to this propaganda.
Link: Muktiforum
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে আমার জীবনের প্রায় একটি বছর ঘরে বসে কেটেছে। ২০০৫ এ ঢুকেছিলাম ছাত্র হিসেবে; এরপর নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো। অনেকদিন ঘরে বসে থেকে ক্যাম্পাসে ক্লাস শুরু হওয়ার পরও খাপ খাওয়ানো অনেক কঠিন হয়ে যেতো। এর মধ্যে আবার ছাত্র রাজনীতির এইসব তাণ্ডবের বিরুদ্ধে কিছু বলা যেতো না, বিপদের আশংকা থাকতো। ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতির কারণে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলাদেশে ছাত্ররা জীবনের মূল্যবান অনেকগুলো বছর সেশনজটে নষ্ট করেছে। এতে আয় বৈষম্য বেড়েছে; অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং খাবারে ছাত্রদের পরবর্তী জীবনের বুনিয়াদও নষ্ট করা হয়েছে। অথচ এ নিয়ে দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ সম্পূর্ণই নিশ্চুপ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শেষ করে দেশের বাইরে পড়তে এসে দেখলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। ক্যাম্পাসে ছাত্ররা অধিকার সম্পর্কে সচেতন, সারা বিশ্বের খবর রাখছে, তর্ক করছে। এত রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে আলোচনা করলেও ক্যাম্পাসে রাজনীতির নাম মাত্র নেই। ছাত্ররা করছে যা ছাত্রদের করা উচিত -পড়াশোনা, নিজেকে তৈরি করা। শিক্ষকেরা করছেন যা তাদের করা উচিত – গবেষণা, শিক্ষকতা। এর অনেক আলোচনাই রাজনীতি কেন্দ্রিক হলেও গুণ্ডামির কোনো স্থান নেই। সিস্টেম চলছে একটা সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে যা কোনভাবেই কাউকেই অসচেতন করছে না নিজের দায়িত্ব সম্বন্ধে। বাংলাদেশের সাথে বহির্বিশ্বের শিক্ষা ব্যাবস্থার তফাতের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে ক্যাম্পাসে শিক্ষক এবং ছাত্রের দলীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ। বৃহৎ জায়গায় আবরার খুনের মত নৃশংস ঘটনা এবং নিত্যমৈমিত্তিক আকারে বছরের পর বছর রাজনৈতিক কর্মীদের সিট নষ্ট করা – সবই এর মধ্যে পড়বে।
আর্টিকেলের শুরুতেই বলে নেওয়া ভালো, আমি ক্যাম্পাসে ছাত্র এবং শিক্ষকের দলীয় রাজনীতি, বাম-ডান-মধ্য, এর বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক সচেতনতার জন্য দলীয় রাজনীতির দরকার নেই। এবং, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়ে মানুষের ট্যাক্সের পয়সায় নিজের সিট ধরে রেখে বছরের পর বছর সময় নষ্ট করাকে রীতিমত অপরাধ হিসেবে দেখা প্রয়োজন বলে আমার বিশ্বাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সিটের পেছনে ট্যাক্সদাতা মানুষের অনেক টাকা বরাদ্দ থাকে, সেই সিট “রাজনীতি”র নামে নষ্ট করা গ্রহণযোগ্য না। বাংলাদেশের ইতিহাস ঘাঁটলে মোটামুটিভাবে প্রথম থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক প্রতিষ্ঠানকেই রাজনৈতিক আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকতে দেখা যায়। ক্যাম্পাসে এই রাজনৈতিক আন্দোলন আমরা ৪৭-পূর্ব ভারত থেকেই পেয়েছি।
তখনকার বাস্তবতায় কলোনিয়াল শাসনব্যবস্থাকে উপেক্ষা করা বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব ছিলো না। এর পর ৪৭ এর পরেই বাংলা ভাষা আন্দোলন ছাত্রদের আবার টেনে নিয়ে যায়। তবে ৬৯, ৭১, ৯০ পেরোনোর পর গত ত্রিশ বছরে ছাত্র রাজনীতি আমাদের ছাত্রদের এবং সমাজের কি উপকারে আসছে, পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে। ছাত্র রাজনীতির টিকে থাকার পেছনে আমার অভিজ্ঞতায় কয়েকটি কারণ আছে। এক) সিনিয়র নেতাদের অত্যধিক ক্ষমতা। ২) কালচারাল কাজে সংশ্লিষ্ট না থাকা, ৩) হলের অব্যবস্থাপনা, এবং ৪) ক্যারিয়ারের প্রয়োজনীয় নেটওইয়ার্কিং না থাকা। একটি ১৮ – ১৯ বছরের শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে, তার দরকার হয় গাইডেন্স, উৎসাহ, যে কোনো ক্লাস করার সামর্থ্য, লার্নিং – পড়াশোনার জন্য পরিবেশ। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে মোটাদাগে এগুলো নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান চর্চা দিয়ে ছাত্রদের আটকে রাখবে এই পরিবেশটাই নেই। তার উপর “ভর্তি করেছেন যিনি পাশ করাবেন তিনি” নীতিতে আমাদের পরীক্ষা ব্যবস্থার অজস্র খারাপ দিক আছে। যেমন, আমি যে শত শত পরীক্ষা দিয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, মিডটার্মের খাতার মুখও কোনোদিন দেখি নি।
একটি ছাত্রকে আপনি তার খাতা ফেরত না দিলে সে জানবে কিভাবে তার ভুলগুলো? আবার, যেখানে শিক্ষক- ছাত্রের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বলতে কিছুই নেই, জানার জন্য রিসোর্স নেই, লাইব্রেরি নেই, ডিপার্টমেন্টে সেমিনার নেই; এত নেই নেই এর মধ্যে ঘাড় গুজে কয়েকজন পড়ার অভ্যাসের জন্যই পড়তে থাকে। আর বাকিদের হয় হতে হয় লক্ষ্যহীন। এই লক্ষ্যহীন তরুণদেরই চুম্বকের মত টানে রাজনৈতিক দলগুলো। আমার মতে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি অক্ষমতা ছাত্র রাজনীতি টিকিয়ে রাখছে। প্রথমতঃ ছাত্রদের আবাসিক এবং ভৌত অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা। গণরুমের নোংরামি নিয়ে সবসময় কথা হয় কিন্তু মেটানোর কথা শোনা যায় না। যতজন ছাত্র রাখা সম্ভব তার বাইরে ভর্তি করার বদঅভ্যাস থেকে বিশ্ববিদ্যালয় বের হতে পারে না। ছাত্রদের ডিমান্ড – সাপ্লাই এর এই ভিন্নতাটা ছাত্র রাজনীতি ব্যবহার করে। দ্বিতীয়তঃ ইনটেলেকচুয়াল কিউরিওসিটি – ছাত্রদের প্রয়োজন প্যাশনের সাথে কিছুতে লেগে থাকা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এক্সট্রা কারিকুলার কাজের সংখ্যা নগণ্য, প্রচণ্ড অব্যবস্থাপনা এবং তার উপর নেই ডিপার্ট্মেন্টাল সেমিনার যার মাধ্যমে ছাত্ররা বেড়ে উঠতে পারবে। রেগুলার সেমিনার, কনফারেন্স আয়োজন করলে অনেক ছাত্রই বাইরে নিজের জন্য রিসোর্স খুঁজতে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করতো না। তৃতীয়ত: ছাত্রদের দরকার একটা টার্গেট – কিছু করার তাগিদ। বিশ্ববিদ্যালয়ে কারা রাজনীতি করছে, এই ছাত্ররা কোন বিভাগে পড়ছে – এগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে জব মার্কেটে ভ্যালু কম এমন বিষয় থেকে আসা ছাত্রদের মধ্যে রাজনীতির টান বেশি। কারণ আমাদের অনেক ছাত্রদের সামনে কিভাবে কি করবে তার নির্দেশনা নেই। ক্যারিয়ার ফেয়ার বলতে কিছু নেই ক্যাম্পাসে, গাইডেন্স নেই। এই তিনটি ব্যাপারকে বিশ্ববিদ্যালয় যদি ইন্টারনালাইজ করতে পারে, তাহলে কার্যত ছাত্রদের কাছে দলীয় রাজনীতি করার দরকার পড়বে না। এর মধ্যে স্টেপগুলো হোলোঃ ১) যত ছাত্র নেওয়া হয়েছে তাদের জন্য আবাসিক, স্বাস্থ্য, খাদ্য সমস্যার সমাধান।
বাংলাদেশে এখন যত বিশ্ববিদ্যালয় আছে, তার প্রেক্ষিতে এই কাজ অসম্ভব নয়। ২) বিভিন্ন ক্লাব, বিতর্ক এইগুলোতে জোর দেওয়া। ভলান্টিয়ারিং কাজ থাকা যাতে ছাত্ররা নিজেদের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতাকে তৈরি করতে পারে। ৩) প্রতিটি বিভাগে এবং ফ্যাকাল্টিতে রেগুলার সেমিনার, কনফারেন্স আয়োজন করা।৪) ক্যারিয়ার নির্দেশনা থাকার দরকার প্রথম থেকেই। ক্যারিয়ার ফেয়ার হতে পারে একটি সুন্দর সমাধান। কোনও ছাত্র বছর গ্যাপ দিলে তাকে মেন্টরিং করানো, নিয়মিত ছাত্রদের খোঁজ নেয়ার জন্য এডভাইজিং কমিটি রাখা। এর বাইরে আরেকটি যা প্রয়োজন তা হোল ছাত্রদের নিজস্ব ইউনিয়ন থাকা যা দলীয় রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট হবে না। লেবার ইউনিয়নের আদলে ছাত্রদের অধিকার নিয়ে কথা বলার জন্য উন্নত বিশ্বে আছে স্টুডেন্ট কাউন্সিল। ছাত্রদের যে কোনো অসুবিধার প্রেক্ষিতে কাউন্সিল এডমিনিস্ট্রেশনের সাথে ডিল করে। এমন একটি কাঠামো থাকলে ছাত্রদের নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হবে। আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতি আইন করে বন্ধ করা সম্ভব বলে মনে হয় না। ভাংচুর করে সেই আইন বাতিল করা হবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়, ইউজিসি, কলেজগুলো নিজেরা পদক্ষেপ নিলে ছাত্ররা চটকদার রাজনৈতিক হাতছানি উপেক্ষা করতে পারবে। পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে ছাত্ররা ছাত্রদের যা কর্তব্য তাতেই মন দিতে পারবে বলে বিশ্বাস করি।
Published: BDnews opinion
প্রতিবছরই দেশের বিভিন্ন জায়গায় পূজার সময় সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের খবর আসে। গত কয়েক বছরে হামলা করে মূর্তি ভাঙা প্রায় 'ঐতিহ্য'-তে পরিণত হয়েছে। 'নাস্তিকতার অপরাধেও নিয়মিত সহিংসতা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এসব গুজব বাতাসের বেগে ছড়িয়ে যায়। শাস্তির ভয় কিংবা জবাবদিহিতার দায় না থাকাকেই আপাতদৃষ্টিতে সমস্যার মূল কারণ মনে করা হয়। প্রতিবছরের মতোই এবার কিছু ভাঙাভাঙি দিয়ে আক্রমণ শুরু হয়ে পরে গুজবের ভিত্তিতে হিন্দুপাড়া ধরে বাড়ি পোড়ানো হয়েছে। মূল অপরাধীর ধর্ম চিহ্নিত হওয়ার পর আপাতত সাম্প্রদায়িক হামলা থেমেছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, আগের বছরগুলোতেও বেশিরভাগ সাম্প্রদায়িক হামলার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মূল অপরাধী কোনও না কোনও চক্রান্ত করে ধরা পড়েছে, কিন্তু ততক্ষণে নিরাপরাধ হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেই শিকার হয়েছেন নির্যাতনের। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বারবার। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে, রাজনীতিবিদদের তরফ থেকেও কথা হচ্ছে। আমাদের অনেকের জন্যই স্বীকার করে নেওয়াই কঠিন, কিন্তু বাংলাদেশে একটি উগ্র পরমতঅসহিষ্ণু তরুণ-যুবক সমাজ বিদ্যমান যারা এসব ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে।
গত কয়েক বছর বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক হামলা কিংবা ধর্মভিত্তিক অন্যান্য হামলার প্রেক্ষিতে সামাজিক বিজ্ঞানের ছাত্র/গবেষক হিসেবে কিছু প্রসঙ্গ উত্থাপনের প্রয়োজনবোধ করছি। এ প্রশ্নগুলো সামনে আসছে না বা অন্তত আমি দেখছি না। কিন্তু অন্যান্য দেশের নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করে আমার কাছে প্রশ্নগুলো সময়োপযোগী এবং গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। আমি মূলত বাংলাদেশে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণার অভাব এবং এ অভাবের কারণে টার্গেটেড জননীতির (পাবলিক পলিসি) দুর্বলতার কথা বলতে চাচ্ছি। দুইটি বিষয় মনে রাখা দরকার-
প্রথমত, তথ্য অবকাঠামোর অভাব (ডেটা ইনফ্রাস্ট্রাকচার) আমাদের সর্বত্রই। কিন্তু সামাজিক বিজ্ঞান সম্পর্কিত প্রশ্নগুলোর ক্ষেত্রে তথ্য-উপাত্তের দৈন্য সীমাহীন। এ সীমাহীন দৈন্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সামাজিক বিজ্ঞান গবেষকদের আন্দাজে ঢিল মারা ছাড়া কাজের কাজ করার অবকাশই কম। গত কয়েক দশকে প্রতিবছর কোথায় হামলা হয়েছে, কারা মূলত হামলার সাথে জড়িত ছিল, তাদের বয়স কেমন, আয় ও পড়াশোনা কেমন, সংখ্যালঘু পরিবারদের সাথে তাদের সম্পর্ক কেমন– এ তথ্যগুলো জোগাড় করা দরকার। আমাদের যদি অঞ্চলভিত্তিতে নিরাপত্তার কথাও ভাবতে হয়, তাহলেও এসব তথ্য হাতের কাছে থাকা প্রয়োজন।
হিন্দু অভিবাসনের তথ্যও যতটা সম্ভব জানা প্রয়োজন। এর বেশিরভাগটাই আইনিভাবে নয়, সেহেতু আমাদের মাইগ্রেশন সোর্স বুঝতে হবে। বাংলাদেশে মুসলিম তরুণ যুবকেরা কোথায় যাচ্ছে? সরকারের সাহায্য পাওয়া যায় কোন কোন দেশের শ্রমবাজারে? এসব জায়গায় হিন্দু বা অন্যান্য সংখ্যালঘুদের পক্ষে যাওয়া সম্ভব কতটা? শ্রম আইনে কিছু পরিবর্তন এনে এই ধারা বদলানো সম্ভব কিনা– শ্রম বাজারের সাথে সাম্প্রদায়িকতার সম্পর্ক বুঝতে গেলে অভিবাসনের এ ধাপটি বোঝা প্রয়োজন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে হিন্দুরা না যেতে চাওয়ার পেছনে অনেকগুলো সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে, সেই কথা মাথায় রেখে আইনিভাবে সংখ্যালঘু তরুণ সমাজের জন্য মাইগ্রেশনের কথা ভাবতে হবে। তার জন্য আগে প্রয়োজন অভিবাসনের অন্তর্নিহিত কারণগুলো বোঝা। ডেটা ইনফ্রাস্ট্রাকচারের অবদান এ ক্ষেত্রে হতে পারে অসীম।
আমরা যখন আক্ষরিক অর্থেই বুঝতে পারব গুজব শুনলেই মিছিল করে বের হয়ে অন্যের জানমাল ধ্বংস করতে আগ্রহ কাদের থাকতে পারে, তখনই আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে সুনির্দিষ্ট নীতি নিয়ে চিন্তা করা। কথা উঠতে পারে যে, এ ডেমোগ্রাফিক তথ্য কিভাবে বের করা সম্ভব। প্রয়োজনে পুলিশের কাছে থেকে যাদের সন্দেহ করা হচ্ছে তাদের তথ্য নেওয়া যেতে পারে। এর সাথে যোগ করা যেতে পারে জরিপ। জরিপ মারফত জানার চেষ্টা করা যেতে পারে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার মাত্রা এবং রূপ। দুই ধাপে সংগ্রহ করা এ দুই তথ্যের বিশ্লেষণ করলে আমাদের লক্ষ্যে যেতে পারা উচিত।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণার অভাব। বাংলাদেশে এখনো সামাজিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন ধাপের গবেষণা খুবই অপ্রতুল। যা আছে, তা দিয়ে ঘটনা এবং তথ্যের ওপর ভিত্তি করে 'অভিসন্দর্ভ' দাঁড় করানো কঠিন। আমাদের এমনকি মুক্তিযুদ্ধের কারণে ক্ষয়ক্ষতি নিয়েও ঘটনাভিত্তিক ভালো কোনও গবেষণা নেই। সারাবিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় সংঘাত ও যুদ্ধের তথ্য সংগ্রহ করে আক্রান্ত জনপদের অর্থনৈতিক রূপরেখা নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। আমাদের এ ক্ষেত্রেও বলার মতো বিশেষ কিছু নেই। এমনকি ভারত ভাগ নিয়ে আমাদের ভালো গবেষণা নেই। অর্থনৈতিক ইতিহাস এর যে কাজগুলো বাংলা নিয়ে হয়েছে তার ৯৫ শতাংশ বিদেশিরা করেছেন বা করিয়েছেন। সেগুলো আমাদের স্বার্থসংশ্লিষ্টতার কথা চিন্তা করে করা হয়নি। গবেষণার দীনতার ছাপ নীতিনির্ধারণে পড়ছে।
গবেষণাভিত্তিক তত্ত্ব এবং জ্ঞানচর্চার অভাবের কারণে আমরা তাত্ত্বিকভাবে সুদূরপ্রসারী চিন্তা করতে ব্যর্থ হচ্ছি যে, কেন বারবার সাম্প্রদায়িক হামলা হচ্ছে। এসব হামলার পেছনে কোনও আঞ্চলিক বৈষম্য কাজ করছে কিনা, সেটি কোনও গবেষণায় ঠিকঠাক মতো আসেনি। অর্থনৈতিক বৈষম্য আমাদের যুবসমাজকে বিপথে ঠেলে দিচ্ছে কিনা তা বোঝার কোনও উপায় নেই।
বাংলাদেশের গ্রাম এবং উপশহরের বাস্তবতায় হিন্দু-মুসলিম মিথষ্ক্রিয়া বোঝার জন্য যে গভীর জ্ঞানচর্চা প্রয়োজন তার কণামাত্র আমাদের নেই। 'কান নিয়েছে চিলে' শুনে রাস্তায় নামছে যে বিপুল জনতা তার 'মোটিভ' কী? পলিসি ধরে পরিবর্তন আনতে চাইলে আমাদের বিপুল পরিমাণে এ ক্ষেত্রে গবেষণার প্রয়োজন। সংক্ষেপে, আমার প্রস্তাবনা:
১. তথ্য অবকাঠামোতে জনবল নিয়োগ এবং বাজেট বাড়ানো। প্রয়োজনে দেশের ভেতরে এবং বিভিন্ন দেশে কর্মরত আমাদের সামাজিক বিজ্ঞানীদের দল তৈরি করে এ কাজে পাঁচ বছর মেয়াদী পরিকল্পনা করা। এই সম্পূর্ণ কাজটিকে রাজনীতির ছত্রচ্ছায়া থেকে দূরে রাখাও প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিক্সকে কাজে লাগানো যেতে পারে যদি তারা এইসব তথ্য পাবলিক ইনফরমেশন হিসেবে রাখতে আগ্রহী হয়।
২. উগ্রবাদীদের কাজের পেছনে মূলত তিনটি উৎস থাকে– জমিজমা সংক্রান্ত, শিক্ষার অভাব, কর্মসংস্থানের অভাব। এর ওপরে রাজনীতির কালো ছায়া তো আছেই। আমাদের প্রয়োজন তথ্যের ভিত্তিতে বের করা কোথায়, কারা এবং কেন সহিংসতার সাথে জড়িত। তাদের অন্য পথে পরিচালিত করতে আমাদের সামগ্রিক কী কী পরিবর্তন আনতে হবে। প্রয়োজনে সিলেবাস নিয়ে চিন্তা করতে হবে, মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকীকরণ নিয়ে ভাবতে হবে। তরুণসমাজের সামনে অর্থবহ কাজ না থাকলে বিপথে পরিচালিত হওয়াই স্বাভাবিক, অর্থবহ কাজের সুযোগ ও সম্ভাবনা তৈরির ক্ষেত্রে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা রাখতে পারে যৌক্তিক অবদান।
স্বল্পতম সময়ে আইনের মাধ্যমে সুবিচার হলেও মানুষের মধ্যে এ ধারণা তৈরি হবে যে, সহিংসতা করে, সাম্প্রদায়িক হামলা করে পার পাওয়া যায় না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আমাদের প্রয়োজন কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো নিয়ে চিন্তা করা, গবেষণার প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সংগ্রহ করা। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মননের লড়াই শিক্ষা এবং উৎপাদনশীল কর্মের মাধ্যমেই করতে হবে।
Published: Sahitya Cafe
উবু হয়ে বসে ঘাস ছিঁড়ছে তারেক। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ এর পশ্চিম কোণে, দুই সরু রাস্তা চলে গেছে তার একটু পাশের থেকে। এই কড়ই গাছের ছায়ায় বসে সে অনেকক্ষণ। ছায়াটা ছেড়ে দিলে মাঠের বেশির ভাগ জায়গা কড়া রোদ। দুরে জারুল, রাধাচূড়া আর কৃষ্ণচূড়া তিন ধরণের গাছেই থকে থকে তিন রঙ্গের ফুল ফুটে আছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের তো কোনো প্ল্যানিং ঠিকঠাক কেউ করেনি, এমনকি টঙ্গের চা এর দোকানটা উঠিয়ে সামাজিক বিজ্ঞান এর নতুন দালান উঠছে। দোকানটা তারেক এবং ওর বন্ধুদের সন্ধ্যা থেকে প্রিয় আড্ডার জায়গা ছিলো। হাকিম চত্বর কিংবা মধুর ক্যান্টিনের ভেতরে অতটা সন্ধ্যায় আর আড্ডা দেয়ার মত জায়গা থাকে না। সামাজিক বিজ্ঞানকে কলাবিভাগ থেকে আলাদা করার এই বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদী ন্যাক্করজনক ঘটনা নিয়ে তারেকের মেজাজ খারাপ হয়। তার উপর এক পা হাঁটার জায়গা নেই, শব্দে এমনকি মধু’তেও টেকা যায় না। কিন্তু এই পরিকল্পনা না থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মাঠটা আর জারুল রঙের ফাঁক দিয়ে আভাস দিতে থাকা অল্প আকাশ তারেকের ভালো লাগে।
তার আপাতবাস যে ছাত্র হলে, কিংবা বলা ভালো, ঘোড়ার আস্তাবলে, সেই হলও কয়েক মিনিট হাঁটা দূরে। এই কড়ই এর নিচের আবছায়া জায়গাটার ওপর তারেরকের যেন একটু অধিকার আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই না-বিকেল-না-দুপুর এ ক্লাসের ছেলেমেয়েরা এখানে আর আসবে না। তারেক চায় না তাকে কেউ এখন পরিচিত কেউ দেখুক। দেখে প্রশ্ন করুক। কি ধরণের প্রশ্ন করবে চেনা মানুষ এখন তাকে দেখলে, তারেক জানে। আকাশ একটু থমথমে। গলায় পেঁচানো পাতলা চাদরটা দিয়ে মুখের ঘাম মুছলো তারেক। আজকাল ছেলেরাও এমন চাদর গলায় দিয়ে ঝুলছে, তারেকেরও ভালো লাগে কালো চাদরটা গায়ে থাকলে। আসলে আজকে তারেকের অস্থির থাকার কথা, কিন্তু যতটা থাকা উচিত ততটা অস্থির সে নয়। এই পর্যাপ্ত অস্থির হতে না পারাটা তারেককে ভাবায়।
আজকের সকালের ফাইনাল পরীক্ষাটা সে দিতে যায়নি। সোজা কথায় এর মানে, তার থার্ড ইয়ারে ওঠা হবে না। এমন না যে সে জানতো না পরীক্ষা কবে বা জানতো না সিলেবাসের দৈর্ঘ্য। এমনও না যে সে অসুস্থ কিংবা আর কিছু। হঠাত মাঝরাতে উঠে পর থেকে তার আর পরীক্ষা দিতে ইচ্ছা করলো না। পরীক্ষা দেবে বলেই ফর্ম ফিলাপ করেছিলো সে। পরশু নোটও এনেছিলো। কার নোট কে জানে, বেশ পরিষ্কার হাতের লেখা। পরীক্ষার আগের দেড়দিন অন্যের নোট পড়েই সে গত দুই বছর চালিয়েছে। সেকেন্ড ক্লাস দেওয়াটা স্যারের দায়িত্ব এই ভরসায় তারেক এবারও দিতে পারতো পরীক্ষাটা। সেকেন্ড ক্লাস দিয়ে দেয় ডিপার্টমেন্ট, নাহলে ছাত্ররা সরকার চাকরির পরীক্ষায় বসবে কি করে! কিন্তু এত কিছু জানা সত্ত্বেও তারেক সকালে পরীক্ষা দিতে যায়নি। সকালে ফয়সাল ফোন করেছে হলের সামনে থেকেও পৌনে নয়টাতেও, তারেক ধরেওনি ফোন। যায় তো নি অবশ্যই।
আরও কিছু মিসকল ছিলো ফোনে। মিসকলের মধ্যে একটা ওই মেয়েটার ফোন থেকে দেওয়া, এটা ভাবতে তারেকের ভালো লাগে। কিন্তু মেয়ে যা আঁতেল, তাতে তারেক পরীক্ষা দিয়েছে কি দেয়নি, ওর হয়তো কিছুই আসে যায় না। বরং ফার্স্ট ক্লাস মিস হয়ে যাবে, এই নিয়ে ঘ্যানরঘ্যানর শুরু হয়ে গেছে এতক্ষণে। হয়তো তারেক পরীক্ষা দেয়নি বলে মেয়েটা বিশ্ববিদ্যালয় সিস্টেমের লস হিসাব করতে বসবে। সিস্টেমের তো কিছু লস হবেই। তারেকের মনে হয়, সিস্টেমকে এই লস মানতে হবে। সিস্টেম কি দিয়েছে তারেককে? না একটা থাকার মত চলনসই হলের সিট, না একটা পড়ার মত লাইব্রেরি। পরীক্ষা না দেওয়াটাই তারেকের সিস্টেমের প্রতি প্রতিবাদ। তারেক অন্যমনস্ক হয়ে যায়, মেয়েটা কি তাকে আলাদা করে খেয়াল করে? তারেকের এই প্রতিবাদের ভাষা কি মেয়েটা বুঝবে? পরীক্ষার চিন্তা বাদ দিয়ে তারেক ঘাস চিবোতে চিবোতে মেয়েটার কথা ভাবতে থাকে।
হঠাত একটা কাগজের টুকরা এসে পড়লো উড়ে বইয়ের উপর। ঝাড়তে গিয়ে তারেকের চোখ ফেরে হাতে রাখা বইটায়। সলিমুল্লাহ খানের “আদমবোমা”। বইটা সে পড়তে চাইছে অনেকদিন ধরেই, ফয়সাল আগেই মধুতে এই বই নিয়ে তর্ক করেছে। সলিমুল্লাহ খান যে একজন জিনিয়াস, আর বাংলাদেশ জীবিতদের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিভাবান, এই কথা ফয়সাল সবসময়ই বলে বেড়ায়। ফয়সাল এই দুই বছরেই অনেককে চেনে, পত্রিকায় লেখে। সলিমুল্লাহ খানকে ফয়সাল সলিমুল্লাহ ‘ভাই’ ডাকে। তারেক ফয়সালের আশেপাশে ঘোরে, কিন্তু ফয়সালের মত করে লোকে তাকে মনে রাখে না।
তারেক মন বসাতে পারছে না “আদমবোমা’র সাধুভাষায়। তারেক একবার ভাবে, কী যে আঁতলামি খান এর, কিন্তু আবার বইটা নিয়েই হাঁটে। ফয়সালের কাছে তর্কে সে হারতে পারবে না। অন্তত মেয়েদের সামনে তো নাইই, বিশেষত পরীক্ষা শেষে ওই মেয়েটা ক্যান্টিনে আসা বাড়িয়ে দেবে, তখন তো নয়ই। ওকে আবার পরীক্ষা বা পিএল এ কোথাও পাওয়া যাবে না। মেয়ে রাজনীতি করবে, লিখবে, পল্টনে যাবে কিন্তু পরীক্ষা আসলেই চম্পট। পরীক্ষার সাথে রাজনীতির একটা বিপরীত সম্পর্ক, তারেকের মনে হয়। কে কবে পরীক্ষা দিয়ে চে গুয়েভারা হয়েছিলো। তারেক ভাবে। আবার তারেকের মনে পড়ে, চে ডাক্তার ছিলো। পরীক্ষা দিয়েই নিশ্চয়ই চে ডাক্তার হয়েছিলো। চে এর উপর তারেকের একটু রাগ হয়। আচ্ছা, চে না সই, কিন্তু শহীদ ভাই? বিশ্ববিদ্যালয় ঢোকা অবধি সাত আট বছর কাটিয়েছেন, কিন্তু শেষ করেননি অনার্স। কী সুন্দর লম্বা চেহারা, কী ধার চোখেমুখে। এমন হয় রাজনীতিকরা। পরীক্ষা না দিয়েই তো! তারেক পরীক্ষাটা দেয়নি সকালে, সে ভাবতে থাকে আর কিছুদিন পর সেও শহীদ ভাই’র মত খদ্দেরের পাঞ্জাবি পরে মিটিং এ বক্তৃতা দিবে। কিন্তু সে শহীদ ভাইর মত দেখতেও সুন্দর না, তার গলাতেও ধার নেই। একটু খাটোও, মেয়েরা খাটো ছেলে পছন্দ করে না। গলায় ধারটা হয়তো আনা যাবে, তারেক ভাবে। শহীদ ভাইর মত কিছু একটা তারেককে হতে হবে। শহীদ ভাইর শ্বশুরের বিশাল বিজনেস, নাঈমা আপু একমাত্র মেয়ে। তারেক এটা ভেবে একটু আটকে যায়, কিন্তু দমে যায় না। পরীক্ষা না দিয়ে কেউ না কেউ বড় নিশ্চয়ই হয়েছে, নাহলে তারেকই হবে প্রথম।
পাশে থেকে চানাচুর ওয়ালা ডেকে যাচ্ছিলো, “মামা নিবেন নাকি ঝাল কইর্যা দিমু”। তারেকের মনে পড়লো বরিশাল ক্যাডেটের কথা। সেভেন থেকেই সেখানে বন্দী। প্রথমে র্যাগ খাওয়া এবং পরে র্যাগ দেওয়ার বছরগুলো। ক্যাডেটে এইসব খাবার একেবারেই চলতো না। কড়া স্বাস্থ্যনীতি এবং পড়াশোনার চাপ। তারেক কিছুটা সেলফ রিফ্লেকশন মুডে চলে যায়। কড়ই-এর ছায়াটাও পাতলা হতে থাকে। গলার চাদরটা দিয়ে তারেক চোখটা ঢাকে। সে ক্যাডেটের নামকরা ছেলে ছিলো। দেশজোড়া পত্রিকায় তার নাম উঠেছে মেট্রিকে ঝাঁঝালো রেজাল্ট করে। কিন্তু গত দুই বছরে হাতে গুণে কয়দিন বইখাতা ধরেছে সে? তারেক ভাবে, পড়াশোনা – আসলে এই প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা, এর কি মূল্য। এর মূল্য নাই বলেই তো তারেক পরীক্ষা দিতে যায়নি। এটা তারেকের সিস্টেমের বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ। সেই গৎবাঁধা পরীক্ষা, রেজাল্ট, চাকরি। এর বিরুদ্ধে তো প্রতিবাদ হওয়া উচিত। পরীক্ষা না দিয়ে প্রতিবাদে করে কার কি লাভ হোলো? না হলে নাই হোক, একটু দ্বিধার সাথে তারেক ভাবতে থাকে। প্রতিবাদ তো হয়েছে, ফলের কথা পরে দেখা যাবে।
আর্টস পড়তে হয়েছিলো। ম্যাথে ৬৮ পাওয়ায় ক্লাস এইটে, নাইলে ছাত্র হিসেবে নাম তারেকের সেই থেকেই ভালো। বিশ্ববিদ্যালয়ে এডমিশন টেস্টে ১২ তম ছিলো সে। সেই শেষ পড়াশোনার সাথে দিবারাত্রির সম্পর্ক। ঢুকেছিল চকচকে এক বিভাগে। এসি রুম, টকাসটকাস ইংরেজি বলেন শিক্ষকেরা। তারেকের ক্যাডেট ঝালানো বিদ্যায় তাতে ঝামেলা হয় না। প্রথম বছর ঘুরতে হয়েছে দলের ভাইদের সাথে মিছিলে। দূর থেকে ক্লাসমেটরা দেখে ফেললে, সে কি লজ্জা। তারেক কি একটা দলের গুণ্ডা নাকি! তারেক ক্যাডেটের নামকরা ছেলে, সুধীন দত্তের ‘শ্বাশ্বতী’ তার মুখস্থ। তারেক গুণ্ডা না, কিন্তু মিছিলে হাজিরা দিতে হয় ক্লাস পালিয়ে হলে সিট পাওয়ার জন্য। ক্লাস পালানোটা কিছুদিনের মধ্যে অভ্যাস হয়ে গেলো। দুইচারটা ছাত্র আছে ক্লাসে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চায় হয়তো, দেদারসে নোট করে বিলায়। ওদের থেকে নিয়ে নিলেই হয়। ক্লাস করা, পড়াশোনার খেয়াল রাখা এগুলো তারেকের বাহুল্য মনে হয়। তারেক ফয়সালের পেছনে পেছনে ঘোরে মধুর ক্যান্টিনে, আজিজে, ধানমন্ডিতে। ফয়সাল অবশ্য ক্লাস ফাঁকি দেয় না, পরীক্ষার ব্যাপারেও সিরিয়াস। সিরিয়াস না হলেও তারেক আজ অবধি পরীক্ষাগুলো টেনে এসেছিলো, অন্তত শরীরে উপস্থিত ছিলো। কিন্তু আজকে সে যায়নি । হঠাত করেই।
ঘাসটা তুলে মুখে দিলো তারেক। একটা ঘাসের মত গন্ধ নাকে লাগছে। ঘাসের গন্ধটা তারেকের খারাপ লাগছে না। অন্তত হলের রুমে ১২ জনের গাদাগাদিতে ঘামের পুরুষালি বোটকা গন্ধের মত না। তারেক পকেট থেকে ২০ টাকার নোটটা বের করে আবার রেখে দেয়। টিএসসি তে লাঞ্চ ১৮ টাকা। মুরগী, আলু ভর্তা আর ডাল। যাবে কি যাবে না ভাবছে না তারেক। ৩ টায় বন্ধ হয়ে যাবে মনে হয়। তারেক ঘাস চিবোচ্ছে। কে না কে পা দিয়েছে কে জানে, তাতে কি। আজকে তারেকের সবই ডিকন্সট্রাকশন, সবই প্রতিবাদ।
তারেকের বুকটা টিপটিপ করে। এই কথা এখন ঝালকাঠিতে ফোন করে বলতে হবে? বাবা-মা তো ছেলে পরীক্ষা দিবে না এটা বিশ্বাসই করবে না। বিসিএস দিয়ে সরকারি কর্মকর্তা হতে হবে, এই ভবিষ্যৎ পাড়া-প্রতিবেশি সবাই জানে। আকারে ইঙ্গিতে বলেও। সেইখানে তারেক কীনা পরীক্ষার হলে না গিয়ে সকালটা বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে থাকলো। এই কথা কি ওরা বিশ্বাস করবে। বাড়ি থেকে তাকে টাকা পাঠায় প্রতি মাসে, সে টিউশনিও করে একটা। পরীক্ষা না দেওয়ার কথা বললে যদি টাকা বন্ধ করে দেয়? তবে কি চলবে ঢাকায়?
আচ্ছা, না জানালে কেমন হয়? এই ডিপার্টমেন্টে আর কেউ নেই ঝালকাঠির। বাবা’র চেনা কেউ।
কিন্তু ঐ মেয়েটা সিনিয়র হয়ে যাবে? আচ্ছা, সিনিয়র হয়ে গেলে কি তারেকের দাম কমে যাবে নাকি? সে আদমবোমার পৃষ্ঠা ওলটায়। মেয়েটার বাবা কি করে কে জানে, শহীদ ভাই’র মত কপাল কি আর তারেকের হবে। নাঈমা আপু তো পলিটিক্যাল সায়েন্সে ডিফিল করছে, তারেকের তো হতেও পারে শহীদ ভাইর মত কপাল। শহীদ ভাই হলে আর কি কি করবে সিস্টেম পালটাতে সেটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে প্যান্ট ঝেড়ে উঠে দাঁড়ায় তারেক। অন্তত গলার স্বরটা তো শহিদ ভাই’র মত বানাতেই হবে।
কোনো কারণ ছাড়া পরীক্ষা না দেওয়াটার কনসেকোয়েন্স নিশ্চয়ই কিছু থাকবে, কিন্তু তারেক এটা নিয়ে ভাবতে চাচ্ছে না। সে পাতলা চাদরটা গলায় ঝুলিয়ে মধুর দিকে হাঁটতে থাকে।
পরীক্ষা শেষ করে, প্রশ্নোত্তর মিলিয়ে, দুপুরের খাবার সেরে জেরিনরা তখন মধুতেই বসা। তারেক আসেনি পরীক্ষা দিতে, ফোনও ধরেনি কিন্তু হলেই ছিলো, এটা নিয়েই সবাই কথা বলছে। সবাই কথা বলছে, জেরিন কিছু বলছে না। ফুলস্ক্যাপ কাগজে সে অংক কষছে, একজন ছাত্র বিনা কারণে এক বছর লস দিলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কত ক্ষতি হয়। জেরিনের হিসেবে অংকটা প্রায় ১ লাখের কাছাকাছি। জেরিন বিরক্ত হয়ে কাগজটা ব্যাগে রেখে দেয়।