সময়ের সাথে সাথে নানা ধরনের পেশার সুযোগের পরিবর্তন ঘটে। আজ থেকে দশ বা বিশ বছর আগে যেসব বিষয়ে পড়ালেখা করলে কাজের সুযোগ বেশি ছিল, এখন আর সেসব পেশায় কাজের সেই সমান সুযোগ নেই। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে যেসব বিষয়ে পড়ালেখা করলে কাজের সুযোগ একটু বেশি রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম ফার্মেসি। এই বিষয়ে পড়ালেখা এবং কাজ ও চাকরির সুযোগ সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।বাংলাদেশ এখন ওষুধ শিল্পে স্বয়ংসম্পন্ন এবং ক্রমবর্ধমান এ শিল্পের মূল চালিকা ফার্মাসিস্টদের হাতে। এ দেশে বর্তমানে আড়াইশ'র বেশি ওষুধ প্রস্তুত ও বিপণনকারী কোম্পানি সক্রিয়। এসব কোম্পানি দেশের চাহিদা পূরণ করে আন্তর্জাতিক বাজারেও ওষুধ রপ্তানি করছে। এসব কোম্পানির প্রোডাকশন, প্রোডাক্ট ম্যানেজম্যান্ট, প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, ট্রেনিংসহ বিভিন্ন বিভাগে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের চাহিদা রয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষকতা, গবেষণা এবং দেশের বাইরে কাজ করার সুযোগ তো আছেই।
বাংলাদেশের ফার্মাসি গ্র্যাজুয়েটরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে আমেরিকা, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্য, জাপানসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সম্মানের সাথে কর্মরত আছে। বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল (পিবিসি)-এ রেজিস্টার্ড ২৩০০ ফার্মেসি গ্র্যাজুয়েটের মধ্যে মাত্র ১,০০০ জন আমাদের দেশের বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে কর্মরত আছে। আর বাকি প্রায় ১৩০০ জন ফার্মাসিস্ট পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঔষধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে যাচ্ছে। এদের শতকরা ৬৩ ভাগ আবার আমেরিকাতে কাজ করছে। ফার্মাসিস্টরা ড্রাগ এক্সপার্ট। তারা ড্রাগ কনসালটেন্ট হিসেবেও কাজ করতে পারে।
ফার্মাসিস্ট হতে হলে যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছর মেয়াদি ফার্মেসি কোর্স (বি ফার্ম) ডিগ্রি সম্পন্ন করতে হবে। এরপর এক বছর মেয়দি মাস্টার্স (এম ফার্ম) কোর্স করার সুযোগও রয়েছে। এ জন্য ফার্মেসি কোর্স চালু আছে এমন সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হবে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় পনেরটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি ইস্ট ওয়েস্ট, নর্থ সাউথ, স্টামফোর্ড, এশিয়া প্যাসিফিক, নর্দানসহ প্রায় সতেরটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসিতে পড়ার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে জীববিজ্ঞানসহ বিজ্ঞান থেকে অবশ্যই ভালো ফলাফল থাকতে হবে। এরপর ভর্তি পরীক্ষার কঠিন যুদ্ধে উত্তীর্ণ হওয়ার পালা।
ফার্মেসিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছর মেয়াদি বি ফার্ম শেষে যেকোনো ওষুধ প্রস্তুত ও বিপণনকারী কোম্পানিতে এক মাসের ইন্টার্নি সম্পন্ন করতে হয়। এরপর বাচাই পরীক্ষায় যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারলেই কাঙ্ক্ষিত চাকরি মিলবে।
ফার্মাসিস্টদের কাজের মধ্যে রয়েছে ঔষধ গবেষণা, প্রস্তুত, মান নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ, সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, বিপণনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজ। ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে ঔষধের ফর্মুলেশন, উত্পাদন, ঔষধের মান উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণ ও নিশ্চিতকরণ, স্থিতিশীলতা, গবেষণা প্রভৃতি ক্ষেত্রে ফার্মাসিস্টরা চাকরি করে। এ ছাড়া ফার্মাসিউটিক্যাল মার্কেটিংয়ে তাদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এর বাইরে সরকারি অফিসগুলোর মধ্যে কমিউনিটি স্বাস্থ্য সেবা, আর্মড ফোর্সেস, সরকারি হাসপাতাল, ঔষধ প্রশাসনসহ প্রশাসনিক বিভিন্ন উচ্চ পদে ফার্মাসিস্টরা চাকরি পেতে পারে। বেসরকারি হাসপাতালে ও ক্লিনিকে ফার্মাসিস্ট পদে, ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট, ফার্মেসি ম্যানেজার ছাড়াও প্রশাসনিক ও তথ্য বিভাগে এদের কাজের সুযোগ রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজী বিভাগের সহকারি অধ্যাপক মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, একজন প্রকৃত ফার্মাসিস্ট হতে হলে আমাদের প্রয়োজন হবে অনেক জানা ও অনেক প্রশিক্ষণের। ফার্মেসি শিক্ষার প্রতিটি বিষয়কে সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। কর্মক্ষেত্রের বিচারে বাংলাদেশের অনেক বিষয়ের চাইতে ফার্মেসি অনেক উপরে অবস্থান করছে। তাই প্রকৃত ফার্মেসি শিক্ষা একজন মানুষকে যুগোপযোগী জীবন-ধারণের পাশাপাশি সমাজের সেবা করার সুযোগ প্রদান করবে।
শেখ মহিউদ্দিন