সূর্য : আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্র হচ্ছে সূর্য। এটি হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকটতম তারা। আসুন, সূর্য সম্পর্কে জেনে নেই কিছু সাধারণ তথ্য।
কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল সূর্য? আমরা জানি, মহাশূন্যে সবসময়ই গ্যাস বা ধূলিকণা ভেসে বেড়ায়। সেই সাথে মৃত নক্ষত্রের কিংবা মৃত তারার অবশিষ্ট শক্তিও তরঙ্গাকারে মহাশূন্যে ভেসে বেড়ায়। সূর্য নামক আমাদের কাছের তারাটি আজ থেকে প্রায় ৫০০ কোটি বছর আগে সৃষ্টি হয়েছিল মহাশূন্যে ভেসে বেড়ানো এরকমই কিছু গ্যাসীয় কণা এবং মৃত কোনো তারার অবশিষ্ট তরঙ্গ শক্তি নিয়ে। ভেসে বেড়ানো হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাসীয় কণাগুলোকে দূর থেকে ভেসে আসা তরঙ্গ শক্তি ধাক্কা দিয়ে একত্রিত করে। এরপরে সেখানে তৈরি হয় গ্যাসীয় মেঘ। গ্যাসীয় কণাগুলো পরস্পরের নিকটবর্তী হয়ে মাধ্যাকর্ষণ বলের আকর্ষণে এরা পুঞ্জীভূত হয়ে একটি গ্যাসীয় পিণ্ডে পরিণত হয়। মাধ্যাকর্ষণ বলের কারণে কণাগুলোর মধ্যে সংঘর্ষও হয়, যার ফলে কণাগুলো চার্জিত হয়। ফলে এরা আয়নিত গ্যাসে রূপান্তরিত হয়ে প্লাজমা অবস্থায় পরিণত হয়। প্লাজমা মানে হচ্ছে পদার্থের চতুর্থ অবস্থা। আমরা সাধারণত পদার্থের তিনিটি অবস্থার কথা জানি। এগুলো হল- কঠিন, তরল ও বায়বীয়। এই তিন অবস্থা ছাড়াও চার্জিত বা আয়নিত গ্যাসীয় অবস্থাকে পদার্থের চতুর্থ অবস্থা বলে। প্লাজমা অবস্থায় গ্যাসীয় কণাগুলোকে দূর থেকে দেখলে অগ্নিময় দানা দানা রূপে দেখা যায়। যাই হোক, এরপরে সৃষ্ট গ্যাস পিন্ডের চার্জিত গ্যাসীয় কণাগুলোর মধ্যে ফিউশন বিক্রিয়া শুরু হয়। অর্থাৎ হাইড্রোজেন গ্যাস ফিউশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে হিলিয়াম গ্যাসে রূপান্তরিত হয়। এতে শক্তি হিসেবে আলো নির্গত হয়। সূর্যের বেশীর ভাগ অংশ মানে প্রায় ৭৩ ভাগ হাইড্রোজেন গ্যাস এবং ২৫ ভাগ হিলিয়াম গ্যাস দ্বারা গঠিত। বাকী অংশগুলো অক্সিজেন, কার্বন,নিয়ন এবং আয়রন দ্বারা গঠিত। তবে এগুলোর সবই জ্বলন্ত এবং আয়নিত অবস্থায় রয়েছে। সূর্যকে বলা হয় সুষম প্লাজমা গোলক।
আগেই বলেছি সূর্যের বয়স ৫০০ কোটি বছর। এটি আয়তনে পৃথিবী থেকে প্রায় ১৩ লক্ষগুণ বড়। এর ভর পৃথিবীর ভরের চেয়ে ৩৩০০০০ গুণ ভারী। সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৬৫০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস এবং কেন্দ্রের তাপমাত্রা প্রায় ৩০০০০০০০ (তিন কোটি) ডিগ্রী সেলসিয়াস। এটি পৃথিবী থেকে গড়ে ১৪ কোটি ৮৮ লক্ষ কিলোমিটার দূরে। তাই সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে ৮ মিনিট সময় লাগে। বিজ্ঞানীরা হিসেব করে দেখেছেন আনুমাণিক আরো ৫০০ কোটি বছরের মধ্যেই সূর্যের হাইড্রোজেন জ্বালানী নিঃশেষ হয়ে যাবে। সূর্যের মধ্যে নিয়ত সঙ্ঘটিত হওয়া ফিউশন বিক্রিয়ায় যে আলো উৎপন্ন হয় তার রং সাদা। আমরা জানি, সাদা রং মৌলিক নয়, যৌগিক। এটি মূলতঃ সাতটি রং-এর সমন্বয়ে গঠিত। সেই সাতটি রং হল- বেগুনী, ঘন নীল, আসমানী নীল, সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল। সূর্যের আলো হচ্ছে পৃথিবীতে বিদ্যমান সকল প্রাণের শক্তির একমাত্র উৎস।
সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা আনুমানিক ৫৫০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (5,778 K), সে কেন্দ্রভাগে নিউক্লীয় সংযোজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে অবিরাম হাইড্রোজেন পুড়িয়ে হিলিয়াম উৎপাদন করে যাচ্ছে। কেন্দ্রে সূর্য প্রতি সেকেন্ডে ৬২ কোটি মেট্রিক টন হাইড্রোজেন পোড়ায়।
সূর্য আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে আনুমানিক ২৪ - ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এবং কেন্দ্রের চারদিকে ২২.৫ থেকে ২৫ কোটি বছরে একবার ঘুরে আসে। এইভাবে সূর্য সমগ্র সৌরজগৎ মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের চারপাশে প্রায় 828,000 কিমি/ঘন্টা বেগে প্রদক্ষিণ করছে। সূর্যের একবার গ্যালাকটিক কেন্দ্রের চারপাশে যেতে 230 মিলিয়ন বছর সময় লাগে।
পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব আনুমানিক ১৪.৯৬ কোটি কিলোমিটার। তবে পৃথিবীর কক্ষপথ যেহেতু উপবৃত্তাকার সেহেতু সূর্য থেকে তার দূরত্ব পরিবর্তিত হয়, জানুয়ারি মাসে সে সূর্যের সবচেয়ে কাছে (অনুসূর) আসে এবং জুলাইয়ে সবচেয়ে দূরে (অপসূর) সরে যায়। গড় দূরত্বে সূর্য থেকে আলো পৃথিবীতে আসতে ৮ মিনিট ১৯ সেকেন্ড সময় নেয়। এই সূর্যালোকের শক্তি পৃথিবীর প্রায় সকল জীবকে বাঁচিয়ে রাখে। উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় এই আলো থেকে খাদ্য উৎপাদন করে এবং প্রাণীরা খাদ্যের জন্য এসব উদ্ভিদ বা অন্য প্রাণীর উপর নির্ভর ।