লক্ষণপুর গ্রামের পুব-পশ্চিম ঘেষে যে বাড়িঘরের জটলাটা আছে তারই এক উঠোনে বুড়ো তার নাতনিকে নিয়ে বসে। সকালের আলোতে, বাড়ির পেছনে থাকা ধান, পাটের চারাগুলি সবুজ হয়ে ঘুম থেকে ওঠে। তাদের সাথে চোখ পিটপিট করে জেগে ওঠে আরো একজন। রোদের সাথেই জড়ানো যার সমস্ত বেলা, বুড়োর নাতনি রোদেলা।
একদিকে বাঁশের ঝাড়, অন্যদিকে ঘেটু আশশ্যাওড়ার জঙ্গল। তার মাঝখানে টালি-খড়ে ছাওয়া টিনের ঘর। বুড়ো ভাঙা কাঁপা গলায় গল্প পড়া শুরু করে। শুরুটা হয় ছড়া দিয়ে,
"মোতির ফুল, মোতির ফুল সে বড় দূর
তোমার পুত্র পাঠাইয়ো কলাবতীর পুর
হাটের সওদা ঢোল-ডগরে, গাছের পাতে ফল
তিন বুড়ির রাজ্য ছেড়ে রাঙা নদীর জল।"
রোদেলা কাঁধের উপর দিয়ে ঝুঁকে দেখবার চেষ্টা করে দাদু ঠিক পড়ছেন কী না। নিজের সীমিত জ্ঞানকে সর্বোচ্চ কাজে লাগিয়ে সে অক্ষরগুলোর দিকে তাকায়, এরপর নিশ্চিত হয়। ছড়াটার মানে সে জানেনা এখনো। বুড়ো তখন ধীরে ধীরে কলাবতীর গল্প শুরু করে। কী করে সাত রাণীর মধ্যে পাঁচ রাণী শলাপরামর্শ করে শেকড় বাটা খেয়ে নিল, ন-রাণী আর ছোট রাণী কিছুই পেল না, তাই তাদের ঘরে হলো পেঁচা ভূতুম আর বানর বুদ্ধু। রোদেলার হাসি পায়। মানুষের ঘরে কী কখনো বানর, পেঁচা হতে পারে? মানুষের ঘরে ব্যাখ্যাতীত কত অমানুষ জন্মাতে বুড়ো দেখেছে, তাই সে ততোটা অবাক হয়না। হেসে বলে, "তারপর শোনো দাদু।"
ধীরে ধীরে গল্পে ডুবে যায় দু'জন। বাড়ির সামনের পুকুরটার দিকে তাকিয়ে মেয়েটা ভাবে, এইখানেই কী অভিমানী কঙ্কাবতী নৌকা ভাসিয়েছিল, এমন এক খিড়কি পুকুরের মাঝখানে? গল্পে তখন কাতলা মাছেরা আসে। কাঁকড়া মহাশয়, ঝিনুক, একটা ভয়ংকর দর্শন বাঘ, নাকেশ্বরী ভূতনি। শুনে কঙ্কাবতীর জন্য চিন্তা হয় তার। গ্রাম ইতিহাসের নীরব সাক্ষী বটের ঝুড়িগুলি দুজনের মনে দু'রকম দাগ কাটে। রোদেলা ভাবে ঘ্যাঘো ভূতের কথা, আর বুড়ো স্পষ্ট দেখে এক অলৌকিক জগত, যেখানে পাড়ি জমাবার সময় তার ঘনিয়ে এসেছে।
ডালিমকুমারের আয়ু কোথায় জানতে উদগ্রিব হয়ে পড়ে রোদেলা। বুড়ো ছড়া শুরু করে,
"সূতাশঙ্খ, সূতাশঙ্খ শাঁখের আওয়াজ
কুমারের আয়ু কীসে বল দেখি আজ?
তোর আয়ু কীসে রাণী, মোর আয়ু কীসে
ডালিমকুমারের আয়ু ডালিমের বীজে।"
কচুরিপানা ভর্তি খাল-ডোবা, জঙ্গলাকীর্ণ পথঘাটের দু'পাশে হিজল,অর্জুন,করঞ্জার শাখা উত্তরের ঠান্ডা বাতাসে দোল খায়। শীতটা জীবনকে ওই দুটো কালেই আক্রমণ করে, শুরুতে আর শেষে। মধ্যিখানের সময়টুকুর কথা বলতে গেলে বুড়োর প্রবাসী ছেলের কথা বলতে হয়। গরমের দেশ মধ্যপ্রাচ্যে কাজের সন্ধানে চলে গেছে যে'জন।
গল্পের মধ্যে বুদ্ধু আর ভূতুম এখন নৌকায় উঠে চলে যাচ্ছে। তাদের মা ডেকে হয়রান।
"ভূতুম আমার বাপ!
কি করেছি পাপ?
কোন পাপে ছেড়ে গেলি দিয়ে মনস্তাপ?
শুকপঙ্খী নায়ের পাছে ময়ুরপঙ্খী যায়
আমার বাছা থাকলে যেতিস মায়ের এই নায়।"
ছড়াটা বলতে বলতে বুড়োর চোখ ভিজে ওঠে কেন রোদেলা কখনো জিজ্ঞেস করে না।
মৃত্যুর এক অর্থ অন্ধকার, কিন্তু এ অন্ধকারেই পেঁচা খুঁজে নেয় তার শিকারকে যা তার জীবনকে বাঁচিয়ে রাখে। অন্ধকারের কোনো রঙ নেই, অথচ সেই অন্ধকারেই জোনাকি পোকা আলো ছড়ায়। যা জীবন তাই মৃত্যু, যা অন্ধকার তাই আলো, যা শৈশব তাই বার্ধক্য। সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত চমৎকার সব ডাইকোটমি, অস্তিত্বের প্রতিটি বিপরীত সত্ত্বা একই সময়ে মূর্ত।
--দাদু তারপর?
--তাহার পর কী হইলো? তাহার পর আমার গল্পটি ফুরাইলো। নোটে গাছটির কপালে যাহা লিখা ছিল তাহাই ঘটিল।
পুনশ্চঃ রোদেলার পুরো নাম ইকরা জাহান রোদেলা। ইকরা অর্থ পড়। মেয়েটা সকালের রোদে দাদুর সাথে পড়তে বসছে। জীবনটা ম্যাজিক রিয়েলিজম ছাড়া আর কী!