গোলামগিরি
(সভ্য ব্রিটিশ সরকারের শাসনামলে
ব্রাহ্মণ্যবাদের ছদ্মবেশে)
উন্মোচক:
জ্যোতিরাও গোবিন্দরাও ফুলে
বাংলা রূপায়ণ:
সুধীর রঞ্জন হালদার
(সভ্য ব্রিটিশ সরকারের শাসনামলে
ব্রাহ্মণ্যবাদের ছদ্মবেশে)
উন্মোচক:
জ্যোতিরাও গোবিন্দরাও ফুলে
বাংলা রূপায়ণ:
সুধীর রঞ্জন হালদার
সূচীপত্র
মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলের মারাঠি ভাষায় লেখা ‘গুলামগিরি’ বইটি ১৮৭৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। মহারাষ্ট্র সরকার কর্তৃক প্রকাশিত অধ্যাপক পি.জি. পাটিল-এর ইংরেজি অনুবাদ ‘Slavery’ থেকে আমি বাংলায় রূপান্তর করে নাম দিয়েছি ‘গোলামগিরি’। এই বইটি কোনো সাধারণ বই নয়; এটি ছিল তৎকালীন সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি চার্জশিট। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত ভারতের দলিত-বহুজন আন্দোলনের জন্য একটি ‘ইশতেহার’ বা ‘মেনিফেস্টো’ হিসেবে কাজ করছে। জ্যোতিরাও ফুলে ও ধোণ্ডিবা কুম্ভার-এর আলাপচারিতা আসলে ভারতের দলিত-বহুজন আন্দোলনের ভিত্তিপ্রস্তর।
বইটিতে তৎকালীন ভারতের গ্রামীণ প্রশাসনিক ব্যবস্থার মেরুদণ্ড সরকারি কর্মচারীদের- যারা ছিল তথাকথিত আর্য বা ব্রাহ্মণ শ্রেণির- তাদের শোষণ ও দুর্নীতির কৌশল এবং সাধারণ কৃষকদের (শূদ্রদের) নিঃস্ব করার পদ্ধতি অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এখানে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, বর্ণাশ্রম প্রথা বা চতুর্বর্ণের কোনো ঐশ্বরিক ভিত্তি নেই। এটি ছিল আর্য-ব্রাহ্মণদের একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল, যার মাধ্যমে তারা ভারতের আদিবাসিন্দাদের (বর্তমানের তপশিলি জাতি-উপজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি- যাদের শূদ্র-অতিশূদ্র নামে অভিহিত করা হতো) দাসে পরিণত করেছিল এবং শিক্ষার আলো থেকে তাদের বঞ্চিত রেখেছিল। মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে অত্যন্ত নিপুণভাবে বর্ণনা করেছেন কীভাবে সরকারি আমলাতন্ত্রের নিচুতলা থেকে ওপরতলা পর্যন্ত ব্রাহ্মণ কর্মকর্তারা (ভট) একে অপরের সাথে যোগসাজশ করে সাধারণ কৃষকদের ওপর জুলুম করত এবং ব্রিটিশ শাসকদের চোখে ধুলো দিত।
মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে ও ধোণ্ডিবা কুম্ভার-এর এই ঐতিহাসিক কথোপকথনের মাধ্যমে ফুলে কেবল একটি বিদ্রোহের ডাকই দেননি, তিনি ভারতীয় সমাজব্যবস্থার এক বিকল্প ইতিহাসও তৈরি করেছেন। তাঁর এই দূরদর্শী চিন্তা থেকেই পরবর্তীতে ‘সত্যশোধক সমাজ’ (১৮৭৩)-এর জন্ম হয়, যা আধুনিক ভারতের দলিত, পিছিয়ে রাখা শ্রেণি ও নারী জাগরণের প্রধান প্রেরণা।
মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে তাঁর এই কথোপকথন শেষ করার আগে আমাদের মনে করিয়ে দেন যে- সত্যের পথ কঠিন, কিন্তু সেখানেই মুক্তি। তিনি নিজেই নিজের বাড়িতে অনাথ আশ্রম খুলেছিলেন, যেখানে ব্রাহ্মণ বিধবাদের সন্তানদের লালন-পালন করা হতো (১৮৬৩ সালে স্থাপিত বালহত্যা প্রতিবন্ধক গৃহ)। তিনি কোনো সরকারি অনুদান বা ব্রাহ্মণদের সাহায্য ছাড়াই সমাজসেবা করেছিলেন।
এই বইয়ে মহাত্মা ফুলে ভারতের যে চিত্র এঁকেছেন, আজ দেড়শতাধিক বছর পরে- স্বাধীন ভারতের আশি বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও আমরা একই চিত্র দেখতে পাই। ধর্মীয় উন্মাদনায় আজও ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যে সাধারণ মানুষ জাতব্যবস্থার শিকার হয়ে শোষিত ও অত্যাচারিত হচ্ছে, এটা আমাদের সকলেরই লজ্জার। এই অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি পেতে হলে আমাদের যা যা বুঝতে হবে এবং যা যা করণীয়, মহাত্মা ফুলেই তা আমাদের শিখিয়ে গিয়েছেন তাঁর এই বইয়ের মাধ্যমে। সেগুলি হলো-
১। ইতিহাসের বিকৃতি— কীভাবে একটি বিশেষ গোষ্ঠী নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য ইতিহাস ও ধর্মগ্রন্থ তৈরি করেছে।
২। ধর্ম ও উৎসবের আড়ালে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই লুকিয়ে আছে ভারতের আদিবাসিন্দা তথাকথিত শূদ্রদের শোষণের ইতিহাস।
৩। শিক্ষা ছাড়া মানুষ নিজের অধিকার বুঝতে পারে না। শিক্ষা ছাড়া কোনো মুক্তি নেই।
৪। জাতিভেদ দূর করতে হলে দলিত ও অবহেলিত সমস্ত জাত ও শ্রেণির মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
৫। শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে শোষণের ইতিহাস ও ধর্মতাত্ত্বিক চক্রান্তকে বুঝতে হবে।
৬। মানবাধিকার— জন্মগত পরিচয়ের বদলে মানুষের কর্ম এবং মানবিক গুণাবলিই শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হতে হবে।
বিনীত
সুধীর রঞ্জন হালদার
‘যে দিনটি একজন মানুষকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে, সেই দিনটিই তার গুণাবলির অর্ধেক কেড়ে নেয়।’ —হোমার
‘ভারতে আমাদের শাসন ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি নয় যা শাসিতদের চরিত্রের উন্নতি ঘটাবে; বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাও গুটিকতক মানুষকে অতি-শিক্ষিত করা ছাড়া আর তেমন কিছুই করে না, যার ফলে সাধারণ মানুষ বরাবরের মতোই অজ্ঞ থেকে যায় এবং সেই স্বল্পসংখ্যক শিক্ষিত শ্রেণির করুণার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে, এটি সেই মনোবলক্ষয়কারী ‘ব্রাহ্মণ-শাসিত’ নীতিরই একটি বর্ধিত রূপ, যা সম্ভবত ভারতের সভ্যতা ও সাধারণ উন্নতির পথে অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে বেশি বাধা সৃষ্টি করেছে।’
—কর্নেল জি. জে. হ্যালি, ‘অন ফিশারিজ ইন ইণ্ডিয়া’।
‘বহু যুগ কেটে গেছে— যখন থেকে ব্রাহ্মণদের বিশেষ সুযোগসুবিধা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু খুব বিবেচক কোনো বিশ্বপ্রেমিকও ব্রাহ্মণদের নাম বিশ্বের হিতাকাঙক্ষীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে দ্বিধা বোধ করবেন। তারা প্রাচীন বিদ্যার বিশাল ভাণ্ডারের বড়াই করে। তারা অগাধ সম্পদ সঞ্চয় করেছে, অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে, কিন্তু কোন মহৎ উদ্দেশ্যে? তারা অত্যন্ত নিচুমানের কুসংস্কার লালন করেছে এবং নির্লজ্জভাবে প্রতারণা চালিয়েছে। তারা ভাগ্যের দুর্লভতম উপহারগুলো কেবল নিজেদের ভোগদখলে রাখার দাবি করেছে এবং বিশ্বের ইতিহাসে পরিচিত নিকৃষ্টতম প্রথাকে জিইয়ে রেখেছে। তাদের এই অপব্যবহার করা ক্ষমতার হ্রাস ঘটলেই কেবল আমরা জাতীয় পুনর্জাগরণের মহান কাজ সম্পন্ন করার আশা করতে পারি।’
—মিড-এর ‘সিপাহি রিভল্ট’
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে যে, ব্রাহ্মণরা ভারতের আদিম অধিবাসী ছিল না। সুদূর অতীতের কোনো এক সময়ে, সম্ভবত ৩,০০০ বছরেরও বেশি আগে, বর্তমান ব্রাহ্মণ জাতির আর্য পূর্বপুরুষরা সিন্ধু নদ, হিন্দুকুশ এবং অন্যান্য সংলগ্ন অঞ্চল অতিক্রম করে হিন্দুস্তানের সমতলে নেমে এসেছিল। নৃবিজ্ঞানী ডঃ প্রিচার্ডের (Dr. Prichard) মতে, তারা ছিল বিশাল ইন্দো-ইউরোপীয় জাতির একটি শাখা, যাদের থেকে এশিয়ার পারস্য, মিডিয় ও অন্যান্য ইরানি জাতি এবং ইউরোপের প্রধান জাতিগুলোও উদ্ভূত হয়েছে। জেন্দ (Zend, প্রাচীন আবেস্তা), ফার্সি ও সংস্কৃত ভাষার মধ্যে বিদ্যমান সাদৃশ্য, সেইসাথে ইউরোপের সমস্ত ভাষার মধ্যে যে মিল রয়েছে, তা স্পষ্টভাবে একটি সাধারণ উৎসের দিকেই নির্দেশ করে। এটিও অত্যন্ত সম্ভাবনাময় বলে মনে হয় যে, এই জাতির আদি নিবাস একটি শুষ্ক, বালুকাময় ও পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় এবং তাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত রসদ সেখানে ছিল না। ফলে তারা পূর্ব ও পশ্চিম- উভয় দিকে বিভিন্ন উপনিবেশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ভারতের মাটির চরম উর্বরতা, এর সমৃদ্ধ উৎপাদন, এখানকার মানুষের প্রবাদতুল্য ধনসম্পদ এবং এই আশীর্বাদপুষ্ট দেশের অন্যান্য অসংখ্য উপহার- যা সম্প্রতি পশ্চিমা জাতিগুলির লালসাকেও প্রলুব্ধ করেছে- নিঃসন্দেহে আর্যদের আকর্ষণ করেছিল। তারা ভারতে এসেছিল নিছক উপনিবেশ স্থাপনের শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে আসা অভিবাসী হিসেবে নয়, বিজেতা বা দখলদার হিসেবে। তাদের দেখে মনে হয় তারা এমন এক জাতি ছিল যারা অত্যন্ত উচ্চবংশীয় অহমিকা ও আত্মম্ভরিতায় আচ্ছন্ন এবং চরম ধূর্ত, উদ্ধত ও গোঁড়া। ‘আর্য ভূদেব’ (পৃথিবীর দেবতা)-এর মতো আত্মতৃপ্ত ও অহংকার-তোষণকারী যেসব উপাধি দিয়ে তারা নিজেদের ভূষিত করেছিল, তা তাদের আদিম চরিত্র সম্পর্কে আমাদের মতামতকেই নিশ্চিত করে- যে চরিত্র তারা আজ পর্যন্ত বজায় রেখেছে এবং ভালোর দিকে এর খুব সামান্যই পরিবর্তন ঘটেছে। আর্যরা যেসব আদিবাসিন্দাদের বশে এনেছিল ও উচ্ছেদ করেছিল, তারা যে একরোখা ও সাহসী জাতি ছিল তা এই অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে তাদের দৃঢ় প্রতিরোধ থেকেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। ‘শূদ্র’ (তুচ্ছ), ‘মহারি’ (মহা-অরি, মহাশত্রু), ‘অন্ত্যজ’, ‘চণ্ডাল’ ইত্যাদি যেসব অবমাননাকর শব্দ দিয়ে আর্যরা তাদের অভিহিত করেছিল, তা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, শুরুতে তারা এই দেশে আর্যদের আধিপত্য বিস্তারে নিজেদের সাধ্যমতো সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে বাধা দিয়েছিল; আর সেইজন্যই তাদের প্রতি আর্যদের এত চরম ঘৃণা ও বিদ্বেষ। আমাদের কাছে ঐতিহ্যগতভাবে চলে আসা অনেক রীতিনীতি১ এবং ব্রাহ্মণদের তথাকথিত পবিত্র গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত পৌরাণিক কাহিনীগুলো থেকে স্পষ্ট যে, এই দুই জাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য এক কঠিন সংগ্রাম হয়েছিল। দেবতা এবং দৈত্য বা রাক্ষসদের মধ্যেকার যুদ্ধ সম্পর্কে ব্রাহ্মণদের গ্রন্থগুলোতে যে অসংখ্য কাল্পনিক কাহিনী ছড়িয়ে রয়েছে, তা নিশ্চিতভাবেই এই আদিম সংগ্রামের প্রতি ইঙ্গিত করে। এই ‘ভূদেব’ বা মর্ত্যের দেবতা ব্রাহ্মণরা যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল, সেই মূল আদিবাসিন্দাদের ‘রাক্ষস’ (অর্থাৎ দেশের রক্ষক) হিসেবে অভিহিত করা মোটেই অযৌক্তিক ছিল না। তাদের আকার-আকৃতি নিয়ে যে অবিশ্বাস্য ও হাস্যকর কিংবদন্তি রয়েছে তা নিঃসন্দেহে নিছক কল্পনা মাত্র; প্রকৃত সত্য হচ্ছে- সেই মানুষগুলো ছিল দীর্ঘকায় ও বলিষ্ঠ গড়নের। ব্রহ্মা, পরশুরাম ও অন্যান্য নেতাদের অধীনে ব্রাহ্মণরা আদিবাসিন্দাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধ চালিয়েছিল। অবশেষে তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এবং আদিবাসিন্দাদের সম্পূর্ণভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে বশ্যতা স্বীকার করাতে সক্ষম হয়েছিল। অবিশ্বাস্য কল্পকাহিনির আড়ালে ঢাকা এই বিজয়ের বিবরণগুলো ব্রাহ্মণদের বইয়ে পাওয়া যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আদিবাসিন্দাদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল, আবার কোথাও কোথাও চালানো হয়েছিল পাইকারি গণহত্যা। ইউরোপীয় বসতিস্থাপনকারীরা নতুন বিশ্বে প্রথম বসতি স্থাপনের সময় আমেরিকার আদিবাসিন্দাদের (রেড ইণ্ডিয়ান) উপর যে নৃশংসতা চালিয়েছিল, আর্যদের ভারতে আগমন এবং আদিবাসিন্দাদের বশ্যতা স্বীকার করার ঘটনার মধ্যে অবশ্যই তার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। পরশুরাম এই দেশের মানুষ অর্থাৎ ক্ষত্রিয়দের উপর যে নিষ্ঠুরতা ও অমানবিক অত্যাচার চালিয়েছিল— তার সম্পর্কে প্রচলিত কিংবদন্তির যদি মাত্র দশভাগের একভাগও আমরা বিশ্বাস করি, তবে তা আমাদের বিশ্বাসের সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং প্রমাণ করে যে, সে দেবতার চেয়ে একজন পিশাচই ছিল বেশি। সম্ভবত সমগ্র ইতিহাসের পাতায় পরশুরামের মতো এত স্বার্থপর, কুখ্যাত, নিষ্ঠুর ও অমানবিক চরিত্রের দেখা মেলা ভার। নিরো, অ্যালারিক বা মেকিয়াভেলির কর্মকাণ্ডও পরশুরামের হিংস্রতার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়। এই দেশে নিজের সহধর্মীদের (ব্রাহ্মণদের) অবস্থান সুদৃঢ় ও স্থায়ী করার উদ্দেশ্যে সে যে অসংখ্য মানুষ ও নিরপরাধ শিশুদের হত্যা করেছিল, তার জন্য বর্তমান প্রজন্মের উচিত তার নামকে দেবত্ব দেওয়ার পরিবর্তে ঘৃণা জানানো।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, এটিই ভারতে ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের ইতিহাস। তারা মূলত গঙ্গার তীরে বসতি স্থাপন করেছিল এবং সেখান থেকে ধীরে ধীরে পুরো ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। তবে মানুষের উপর দখল বজায় রাখার জন্য তারা পুরাণের সেই অদ্ভুত ব্যবস্থা, বর্ণের বিধান এবং নিষ্ঠুর ও অমানবিক আইনের একটি সংহিতা তৈরি করেছিল, যার কোনো তুলনা অন্য কোনো জাতির মধ্যে পাওয়া যায় না। তারা পুরোহিততন্ত্রের এমন এক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল যা তার লক্ষ্য ও প্রয়োগে এতটাই পীড়াদায়ক ছিল যে, দ্রুইডদের (Druids) সময়ের পর থেকে এমনটি আর কোথাও দেখা যায় না। তাদের আইনের মূল লক্ষ্য ছিল জাতিভেদ প্রথা বা বর্ণপ্রথা; কিন্তু আদিতে তা তাদের মধ্যে ছিল না। তাদের নিজস্ব লেখনি থেকেই স্পষ্ট যে, এটি ছিল তাদের গভীর ধূর্ততার পরবর্তী সৃষ্টি। সর্বোচ্চ অধিকার, সর্বোচ্চ সুযোগসুবিধা ও উপহার এবং যা কিছু একজন ব্রাহ্মণের জীবনকে সহজ, মসৃণ ও সুখী করতে পারে- যা কিছু তাদের আত্ম-অহংকারকে রক্ষা বা তোষণ করতে পারে- সেগুলোকেই বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া এবং নির্দেশ করা হয়েছিল। অন্যদিকে, শূদ্র ও অতিশূদ্রদের দেখা হতো চরম ঘৃণা ও অবজ্ঞার চোখে এবং তাদের সাধারণ মানবিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়। তাদের স্পর্শ, এমনকি তাদের ছায়া মাড়ানোকেও অপবিত্রতা বলে গণ্য করা হয়। তাদের নিছক অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং তাদের জীবনের মূল্য অধম সরীসৃপের চেয়ে বেশি ছিল না; কারণ শাস্ত্রে বিধান দেওয়া হয়েছে যে, যদি কোনো ব্রাহ্মণ ‘একটি বিড়াল বা বেজি, নীলকণ্ঠ পাখি বা ব্যাঙ, কুকুর, টিকটিকি, পেঁচা, কাক অথবা একজন শূদ্রকে হত্যা করে’, তবে সে ‘চান্দ্রায়ণ প্রায়শ্চিত্ত’ (সম্ভবত কয়েক ঘণ্টা বা একদিনের একটি ব্রত, যাতে খুব বেশি পরিশ্রম বা কষ্ট নেই) পালনের মাধ্যমেই তার পাপ থেকে মুক্তি পেতে পারে। অথচ একজন শূদ্রের জন্য একজন ব্রাহ্মণকে হত্যা করা সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তার অপরাধের একমাত্র শাস্তি হিসেবে প্রাণদণ্ডকেই যোগ্য মনে করা হয়। আমাদের বর্তমান শূদ্র ভাইদের সৌভাগ্য যে, আমাদের জ্ঞানালোকিত ব্রিটিশ শাসকরা এই অযৌক্তিক বিধানগুলোকে স্বীকৃতি দেননি। এই জাতীয় অন্যান্য গ্রন্থগুলো পড়লে নিঃসন্দেহে যে কেউ ব্রাহ্মণদের সেই গভীর ধূর্ততা দেখে বিস্মিত হবেন, যেখানে ঈশ্বর বা দৈব অসন্তোষের ভয় দেখিয়ে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব বা মাহাত্ম্যকে ধরে রাখা হয়েছে এবং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ব্রাহ্মণকে ‘বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, এমনকি স্বয়ং ঈশ্বরের সমান বলা হয়েছে। সকলের দ্বারা সে পূজিত, সেবিত ও আদৃত হবে। একজন ব্রাহ্মণ কোনো ভুল বা অন্যায় করতে পারে না।
রাজা কখনোই একজন ব্রাহ্মণকে হত্যা করবেন না, যদিও তিনি সম্ভাব্য সকল প্রকার অপরাধ করে থাকে।
একজন ব্রাহ্মণের জীবন বাঁচাতে যে কোনো মিথ্যা বলা যেতে পারে; এতে কোনো পাপ নেই।
ব্রাহ্মণের কোনো সম্পদ কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।
অভাবের তাড়নায় রাজা মৃতপ্রায় হলেও ব্রাহ্মণের উপর কোনো কর ধার্য করবেন না, কিংবা তাকে ক্ষুধার্ত থাকতে দেবেন না- অন্যথায় সমগ্র রাজ্যে দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে।
ব্রাহ্মণের পদযুগল পবিত্র। তার বাম চরণে সকল ‘তীর্থ’ (পবিত্র স্থান) অবস্থান করে এবং সেই পা জলে ডুবিয়ে সে সাধারণ জলকে পবিত্রতম তীর্থের জলের মতো পবিত্র করে তোলে।
একজন ব্রাহ্মণ নিচুতলার মানুষকে দাসসুলভ কাজ করতে বাধ্য করতে পারে, কারণ সর্বশক্তিমান ঈশ্বর ওই ব্যক্তিকে কেবল ব্রাহ্মণদের সেবা করার জন্যই সৃষ্টি করেছেন।
একজন শূদ্র তার মালিকের দ্বারা মুক্তি পেলেও সে দাসত্ব থেকে মুক্ত হয় না; কারণ যে অবস্থায় তার জন্ম হয়েছে, দাসত্ব তার জন্য স্বাভাবিক, তবে কে তাকে তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে?
একজন ব্রাহ্মণ যেন শূদ্রকে কোনো জাগতিক বা আধ্যাত্মিক পরামর্শ না দেয়।
শূদ্রের সঞ্চয় করার ক্ষমতা থাকলেও সে যেন অতিরিক্ত সম্পদ জমা না করে; কারণ সম্পদশালী দাস অহংকারী হয়ে ওঠে এবং তার ঔদ্ধত্য বা অবহেলার মাধ্যমে সে ব্রাহ্মণদেরও কষ্ট দিয়ে থাকে।
যদি কোনো শূদ্র কোনো ব্যভিচারিণী ব্রাহ্মণীর সাথে সহবাস করে, তবে তার প্রাণদণ্ড হবে। কিন্তু যদি কোনো ব্রাহ্মণ কোনো শূদ্রের বৈধ স্ত্রীর কাছেও গমন করে, তবে সে সব ধরনের শারীরিক শাস্তি থেকে অব্যাহতি পাবে।
এই ধরণের উদাহরণের সংখ্যা বাড়িয়ে চলা নিরর্থক। এর চেয়ে আরও জঘন্যতর শত শত অনুরূপ বিধান তাদের বইগুলোতে ছড়িয়ে রয়েছে।
কিন্তু এই ধরনের নিষ্ঠুর ও অমানবিক আইনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কী হতে পারে? আমি বিশ্বাস করি, বিভ্রান্ত, অন্ধ এবং স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি ছাড়া এটি সবার কাছেই স্পষ্ট। যে কেউ চাইলেই তা বুঝতে পারবেন। এইসব মিথ্যা তৈরির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল অজ্ঞদের মনকে ধোঁকা দেওয়া এবং তাদের উপর চিরস্থায়ী দাসত্ব ও শৃঙ্খল শক্তভাবে গেঁথে দেওয়া, যা তাদের স্বার্থপরতা ও ধূর্ততা দিয়ে তৈরি। শূদ্রদের উপর প্রয়োগ করা আইনের কঠোরতা এবং ব্রাহ্মণদের দ্বারা তাদের প্রতি পোষণ করা তীব্র ঘৃণা- এই বিষয়গুলো অন্য কোনোভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয় যদি না আমরা ধরে নেই যে, তাদের মধ্যে একটি মারাত্মক জাতিগত বিরোধ ছিল, যা এই দেশে আর্য ব্রাহ্মণদের আগমনের ফলেই সৃষ্টি হয়েছিল। এটা ভেবে অবাক হতে হয় যে, এই অনুপ্রবেশকারীরা এই মাটির আদিম অধিবাসীদের সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তাদের নিজেদের মুঠোয় বন্দি করে রাখার জন্য এবং আগামী যুগ যুগ ধরে নিরাপদে রাজত্ব করার উদ্দেশ্যে কতটা চাতুর্যপূর্ণ মিথ্যা গল্পের মিথ্যা বুনেছিল। যে কেউ ভারতে ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের সমগ্র ইতিহাস এবং আজ অবধি যে দাসত্বের অধীনে জনগণকে আটকে রাখা হয়েছে, গভীরভাবে তা বিবেচনা করলে আমাদের সাথে একমত হবেন যে, ভারত দীর্ঘকাল ধরে যে স্বার্থপর নিষ্ঠুরতা ও চরম ধূর্ত ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের দ্বারা শাসিত হয়েছে, তাকে বিশেষায়িত করার জন্য কোনো ভাষাই যথেষ্ট কঠোর নয়। শূদ্র ও অতিশূদ্রদের মনকে গোলাম বানিয়ে রাখার প্রচেষ্টায় ব্রাহ্মণরা কতটুকু সফল হয়েছে, তা তাদের মধ্যে যারা প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে জানতে পেরেছে, তারা নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতা দিয়ে ভালোভাবেই বুঝতে পারে। গত কয়েক প্রজন্ম ধরে তারা এই দাসত্ব ও পরাধীনতার শৃঙ্খল বহন করে আসছে। মনু ও তার শ্রেণির অন্যান্যদের মতো একই উদ্দেশ্য নিয়ে অসংখ্য ‘ভট’ (স্তুতিগায়ক) লেখক সময় সময় বিদ্যমান কিংবদন্তিগুলোর সাথে নিজেদের মস্তিষ্কের অলস কল্পনা যোগ করেছে এবং সেগুলোকে অজ্ঞ জনসাধারণের কাছে ‘ঐশ্বরিক প্রেরণা’ বা ‘স্বয়ং ভগবানের লীলা’ হিসেবে চালিয়ে দিয়েছে। যিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা, শাসক ও রক্ষাকর্তা এবং যিনি স্বয়ং পরম পবিত্র- সেই সত্তার উপর অত্যন্ত অনৈতিক, অমানবিক এবং অন্যায়মূলক কর্মকাণ্ড ও আচরণের দায়ভার চাপানো হয়েছে। এই অনুপ্রবেশকারীদের বিকৃত মস্তিষ্কের ফসল হিসেবে সৃষ্ট এই সব ধর্মদ্রোহী লেখাকে একসময় অভ্রান্ত, ধ্রুব সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল; কারণ এগুলোকে সন্দেহ করা সবচেয়ে অমার্জনীয় পাপ হিসেবে গণ্য করা হতো। ব্রাহ্মণরা নিম্নবর্গকে যে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেছিল, তা কোনো অংশেই কয়েক বছর আগে আমেরিকায় প্রচলিত দাসপ্রথার চেয়ে কম ছিল না। এমনকি কঠোর ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের দিনগুলোতে, অর্থাৎ গত পেশোয়া আমলের মতো নিকট অতীতেও, আমার শূদ্র ভাইদের উপর আমেরিকার দাসদের চেয়েও অনেক বেশি কষ্ট ও নিগ্রহ সইতে হয়েছে। ভারতের এই স্থবিরতা এবং বিগত বহু শতাব্দী ধরে এ দেশ যেসব অনিষ্টের তলে পিষ্ট হচ্ছে, তার মূলে রয়েছে এই স্বার্থপর কুসংস্কার এবং গোঁড়ামির ব্যবস্থা। এই চরম স্বার্থপর ও অত্যাচারী গোষ্ঠীর আগমনে আদিবাসিন্দাদের একটিও লাভ হয়েছে- এমন কিছু খুঁজে বের করা বাস্তবে কঠিন। ভারতের কৃষক (শূদ্র ও অতিশূদ্র) বাস্তবে এক ‘দুধেল গাই’-এ পরিণত হয়েছে। সে কেবল একজনের হাত থেকে অন্যজনের কাছে হাতবদল হয়েছে। যারা পর্যায়ক্রমে তার উপর কর্তৃত্ব করেছে, তারা কেবল তার কপালে ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের বিনিময়ে নিজেদের হৃষ্টপুষ্ট করতেই ব্যস্ত রয়েছে; তার কল্যাণ বা অবস্থার কথা তারা কখনোই ভাবেনি। তাদের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল যে, তারা তাকে নিজেদের মুঠোয় শক্তভাবে বন্দি করে রেখেছে যাতে তার কাছ থেকে যতটা সম্ভব নিংড়ে নেওয়া যায়। ব্রাহ্মণ শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ছোটো-বড়ো উদ্যোগে, প্রতিটি পারিবারিক বা সামাজিক কাজে শূদ্রের চারপাশকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে যে, দীর্ঘদিনের প্রথার ফলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজই ব্রাহ্মণের সাহায্য ছাড়া সম্পন্ন করতে বর্তমানে শূদ্ররা একেবারেই অক্ষম।
বর্তমান সময়ের ক্ষেত্রেও এটি সমানভাবে সত্য। অপরদিকে, শূদ্ররা ব্রাহ্মণ্য শাসনের জোয়ালের সাথে এতটাই মানিয়ে নিয়েছে যে, আমেরিকান ক্রীতদাসদের মতোই তারা নিজেদের মুক্তির যে কোনো প্রচেষ্টাকে বাধা দেবে, এমনকি তাদের হিতৈষীদের বিরুদ্ধেও লড়াই করবে। ধর্মের ছদ্মবেশে একজন শূদ্রের প্রতিটি ছোটো-বড়ো কাজে ব্রাহ্মণের হস্তক্ষেপ রয়েছে। আপনি তার বাড়িতে যান, তার খামারে যান কিংবা কোনো প্রয়োজনে আদালতে যান- ব্রাহ্মণ কোনো না কোনো চাতুর্যপূর্ণ অছিলায় সেখানে উপস্থিত থাকবেই এবং তার ধূর্ত ও কুটিল মস্তিষ্ক খাটিয়ে যতটা সম্ভব তার থেকে নিংড়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে। ব্রাহ্মণ কেবল একজন পুরোহিত হিসেবেই শূদ্রকে লুণ্ঠন করে তা নয়, বরং আরও নানাভাবে তাকে নিঃস্ব করে। নিজের উচ্চতর শিক্ষা ও ধূর্ততাকে কাজে লাগিয়ে সে (ব্রাহ্মণ) সব ধরনের লাভজনক উচ্চপদগুলো দখল করে নিয়েছে। তার কৌশলের চাতুর্য খুঁজে বের করা দুঃসাধ্য, যা পাঠক এই বইটি মনোযোগ সহকারে পড়লেই বুঝতে পারবেন। সবচেয়ে নগণ্য গ্রাম থেকে শুরু করে বৃহত্তম শহর- সবখানে ব্রাহ্মণই সর্বেসর্বা; রায়ত বা কৃষকদের জন্য সে-ই আদ্যন্ত সব কিছু। সে-ই প্রভু, সে-ই শাসক। একটি গ্রামের ‘প্যাটেল’ বা গ্রাম-প্রধান ব্যক্তিটি বাস্তবে অস্তিত্বহীন বা ক্ষমতাহীন। কিন্তু ‘কুলকার্নি’— যে বংশানুক্রমিক ব্রাহ্মণ গ্রাম্য হিসাবরক্ষক এবং কুখ্যাত বিবাদ সৃষ্টিকারী- সে-ই গ্রাম-প্রধানকে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালিত করে। সে রায়তদের জাগতিক ও আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা, তাদের প্রয়োজনে মহাজন (সাউকার) এবং সব বিষয়েই সাধারণ সালিশকারী। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে বিবদমান দুই পক্ষকে আলাদা আলাদা কুপরামর্শ দিয়ে সক্রিয় অনিষ্টের পরিকল্পনা করে, যাতে নিজের পকেট ভালোভাবে গরম করা যায়। আমরা যদি আরও উচ্চতর স্তরে অর্থাৎ ‘মামলতদার’-এর (তহশিলদার বা রাজস্ব কর্মকর্তা) আদালত পর্যন্ত যাই, সেখানেও আমরা একই চিত্র দেখতে পাই।
একজন ‘মামলতদার’-এর প্রথম উদ্বেগ থাকে তার নিজের আত্মীয়স্বজন না হলেও অন্তত নিজের জাতের লোকদের দিয়ে তার অধীনে থাকা বিভিন্ন পদগুলো পূরণ করা। এরা সক্রিয়ভাবে বিবাদ উসকে দেয় এবং এই আদালতগুলোতে সাধারণভাবে প্রচলিত সমস্ত দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। যদি কোনো শূদ্র বা অতিশূদ্র তার আদালতে যায়, তবে সে এমন আচরণ পায় যা কোনো তুচ্ছ সরীসৃপ জাতীয় প্রাণীর প্রাপ্য। তার মামলাটি ধৈর্য ধরে মনোযোগের সাথে শোনার পরিবর্তে, তার অসহায় মাথায় একরাশ গালিগালাজ বর্ষণ করা হয় এবং কোনো না কোনো অজুহাতে তার আবেদনকে একপাশে সরিয়ে রাখা হয়। পক্ষান্তরে, যদি তার নিজের জাতের কেউ একই কাজে আদালতে যায়, তবে তাকে পূর্ণ সৌজন্যের সাথে গ্রহণ করে এবং বিষয়টি মিটিয়ে ফেলতে সামান্যতম সময়ও নষ্ট করে না। আমরা যদি আরও উচ্চতর স্তরে অর্থাৎ কালেক্টর বা রেভিনিউ কমিশনারের আদালত এবং সরকারি পরিষেবার অন্যান্য বিভাগগুলোতে যাই- যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং বা শিক্ষা বিভাগ ইত্যাদি- সেখানেও কমবেশি একই ব্যবস্থা কার্যকর থাকতে দেখা যায়। উচ্চপদস্থ ইউরোপীয় কর্মকর্তারা সাধারণত এই সব মানুষ ও পরিস্থিতিকে ‘ব্রাহ্মণ্য চশমা’ দিয়ে বিচার করেন, আর একারণেই প্রায়শই তাদের সম্পর্কে সঠিক ধারণা গঠনে তাঁরা শোচনীয়ভাবে অজ্ঞতা দেখান। আমি এই বইয়ের শেষ অংশগুলোতে পাঠকদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি যে, কীভাবে বিভিন্ন সরকারি বিভাগে নিজের প্রয়োজন বা কাজ হাসিল করতে আসা কুনবিদের (কৃষক) পকেট কাটতে এই ব্রাহ্মণ কর্মকর্তারা নানা কৌশল অবলম্বন করে থাকে। যে কোনো ব্যক্তি, যিনি এই বিভাগগুলোর কর্মপদ্ধতি এবং ভেতরের গোপন কলকাঠি সম্পর্কে নিবিড়াভাবে জানেন, তিনি দ্বিধাহীনভাবে আমার সাথে একমত হবেন যে- পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে আমি যা বর্ণনা করেছি, তা আমার দরিদ্র, নিরক্ষর ও অজ্ঞ শূদ্র ভাইদের উপর সাধারণভাবে চালিত ধূর্ততার শতভাগের একভাগও নয়। যদিও পুরনো পেশোয়া আমলের ব্রাহ্মণ আর বর্তমান সময়ের ব্রাহ্মণ হুবহু এক নয়, এবং পশ্চিমা ধ্যানধারণা ও সভ্যতার অগ্রগতি নিঃসন্দেহে তাদের কুসংস্কার ও গোঁড়ামির উপর প্রভাব ফেলছে; তবুও তারা তাদের দীর্ঘদিনের লালিত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা বা তাদের অসাধু পথ এখনো ত্যাগ করেনি। গোমাংস, মটন (ভেড়ার মাংস) এবং বিখ্যাত সোমরসের চেয়েও শক্তিশালী ও তীব্র মাদকদ্রব্য- যা এককালে তাদের পূর্বপুরুষরা পরম উপাদেয় খাবার হিসেবে উপভোগ করত- বর্তমানে তাদের মধ্যে পুনরায় অসংখ্য অনুসারী খুঁজে পাচ্ছে।
বর্তমান সময়ের ব্রাহ্মণরা কিছুটা ওথেলোর (Othello) মতোই অনুভব করছে যে, ‘তাঁর কাজ ফুরিয়ে এসেছে’। কিন্তু এই পরিস্থিতি পুরোপুরি জানা সত্ত্বেও, ব্রাহ্মণরা কি তাদের অতীতের স্বার্থপরতার জন্য কোনো প্রায়শ্চিত্ত করতে ইচ্ছুক? হয়তো যা ঘটে গেছে এবং যা সহ্য করতে হয়েছে, তা নিয়ে অনুশোচনা করা বৃথা হতো, যদি বর্তমান পরিস্থিতি কাঙিক্ষত বা সন্তোষজনক হতো। আমরা খুব ভালো করেই জানি যে, কোনো প্রকার লড়াই ছাড়া একজন ব্রাহ্মণ কখনোই নিজের তৈরি করা সেই উচ্চ আসন থেকে নিচে নেমে আসবে না এবং নিম্নবর্গের ভাইদের সাথে সমান মর্যাদায় মিলিত হবে না। এমনকি একজন শিক্ষিত ব্রাহ্মণও- যে নিজের প্রকৃত অবস্থান এবং তা কীভাবে অর্জিত হয়েছে সে সম্পর্কে সম্যক অবগত— সেও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তার পূর্বপুরুষদের ভুলগুলো স্বীকার করবে না এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্বের দীর্ঘদিনের লালিত মিথ্যা ধারণাগুলো স্বেচ্ছায় ত্যাগ করবে না। কর্তব্যের খাতিরেই যা করা উচিত, বর্তমানে এমন নৈতিক সাহস কারো নেই। যতক্ষণ এই পরিস্থিতি চলতে থাকবে, অর্থাৎ এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়কে অবিশ্বাস ও হেয় প্রতিপন্ন করতে থাকবে, ততক্ষণ শূদ্রদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না এবং ভারতও মহত্ত্ব বা সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারবে না। পরিস্থিতিকে এই সংকটের পর্যায়ে নিয়ে আসার পিছনে হয়তো দোষের একটি অংশ ন্যায্যভাবেই সরকারের উপর চাপানো যেতে পারে। উচ্চশিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল ও অধিকতর সুযোগসুবিধা প্রদান এবং সাধারণ জনগণের শিক্ষাকে অবহেলা করার পিছনে তাদের উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, সবাই স্বীকার করবেন যে, জনসাধারণের প্রতি সুবিচারের খাতিরে এটি মোটেও কাম্য ছিল না। এটি একটি স্বীকৃত সত্য যে, ভারতীয় সাম্রাজ্যের রাজস্বের সিংহভাগই আসে রায়ত বা কৃষকদের হাড়ভাঙা খাটুনি এবং তাদের ঝরানো রক্তঘাম থেকে। উচ্চবিত্ত ও ধনিকশ্রেণি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সামান্যই অবদান রাখে অথবা কিছুই দেয় না। একজন পণ্ডিত ইংরেজ লেখক উল্লেখ করেছেন, ‘আমাদের আয় উদ্বৃত্ত মুনাফা থেকে আসে না, আসে পুঁজি থেকে; বিলাসদ্রব্য থেকে নয়, বরং দরিদ্রতম মানুষের অতি প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্য থেকে। এটি হলো পাপ এবং অশ্রুর ফসল’।
কষ্টার্জিত রাজস্বের একটি বিশাল অংশ সরকার উচ্চবিত্তদের শিক্ষার পিছনে অকাতরে ব্যয় করবে- যেহেতু কেবল তারাই এর সুযোগ গ্রহণ করে- এটা কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত বা সমতাপূর্ণ হতে পারে না। এই তথাকথিত উচ্চবিত্ত শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা করার পিছনে সরকারের উদ্দেশ্য সম্ভবত এমন কিছু পণ্ডিত তৈরি করা, ‘যাদের সম্পর্কে ভাবা হয়েছিল যে, তারা সময়কালে কোনো অর্থ বা মূল্য ছাড়াই জ্ঞান বিলিয়ে দেবে’। সরকার বলে থাকে, ‘যদি আমরা উচ্চতর শ্রেণির মনে জ্ঞানতৃষ্ণা জাগিয়ে তুলতে পারি, তবে তার ফলাফল হবে সেই ব্যক্তিদের উন্নত নৈতিক মানদণ্ড, ব্রিটিশ সরকারের প্রতি অগাধ আনুগত্য ও নিজেদের দেশবাসীর মধ্যে প্রাপ্ত বৌদ্ধিক জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার এক অপরাজেয় আকাঙক্ষা।’ সরকারের এই লক্ষ্যগুলো সম্পর্কে উপরে উল্লিখিত লেখক জানিয়েছেন- “আমরা এর চেয়ে বেশি পরোপকারী এবং এর চেয়ে বেশি কাল্পনিক দর্শনের কথা আগে কখনো শুনিনি। পশ্চিমা বিশ্বে জনশিক্ষার মাধ্যমে যে বিস্ময়কর পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, তার প্রত্যক্ষদর্শী কিছু মানুষ প্রস্তাব করেছেন যে, ভারতের বিশ কোটি মানুষের ত্রুটিগুলো দূর করা হবে কেবল উচ্চবিত্ত শ্রেণিকে উচ্চশিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে।” *** “আমরা ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বন্ধুদের কাছে অনুরোধ করছি, তাঁদের অভিজ্ঞতার পরিসরে ঘটে যাওয়া এমন একটি উদাহরণ আমাদের দিতে, যা তাঁদের এই তত্ত্বের সত্যতা প্রমাণ করে। তাঁরা অনেক ধনী ব্যক্তির সন্তানদের শিক্ষিত করেছেন এবং তাঁদের অনেক ছাত্রের পার্থিব উন্নতি ও ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত করার মাধ্যম হয়েছেন; কিন্তু নিজেদের দেশবাসীকে পুনর্জীবিত করার এই মহান কাজে তারা কী অবদান রেখেছেন? জনসাধারণের উপর তারা কীভাবে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছেন? তাঁদের মধ্যে কেউ কি নিজেদের বাড়িতে বা অন্য কোথাও তাঁদের কম ভাগ্যবান অথবা কম বুদ্ধিমান দেশবাসীদের শিক্ষাদানের জন্য কোনো শ্রেণি গঠন করেছেন? নাকি তাঁরা তাঁদের জ্ঞানকে একটি ব্যক্তিগত উপহার হিসেবে নিজেদের মধ্যেই কুক্ষিগত করে রেখেছেন- যাতে ‘অজ্ঞ সাধারণ’ মানুষের সংস্পর্শে এসে তা কলুষিত না হয়? তাঁরা কি কোনোভাবে এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন? কোন যুক্তিতে উচ্চবিত্তদের মধ্যে শিক্ষার এই মানদণ্ডের দাবি করা হয়? অভিজাততন্ত্রের পক্ষে এটি একটি চমৎকার যুক্তি হতো, যদি তা আদৌ ধোপে টিকত! জাতীয় সুখের প্রবৃদ্ধি দেখানোর জন্য কেবল কলেজগুলোতে ছাত্রসংখ্যা এবং অ্যাকাডেমিক ডিগ্রির তালিকার দিকে আঙুল তোলাই যথেষ্ট হতো। তখন প্রত্যেক ‘র্যাংলার’ (শীর্ষ মেধাবী ছাত্র)-কে একজন জাতীয় হিতৈষী হিসেবে গণ্য করা হতো; ডিন ও প্রক্টরদের অস্তিত্বকে- শিকার আইন (game laws) বা দশ-পাউণ্ডের ভেটাধিকারের (ten-pound franchise) মতোই- সংবিধানের সর্বোত্তম স্বার্থের সাথে যুক্ত বলে বিবেচিত হতো।”
সরকারের এই উচ্চবিত্ত শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে প্রকট প্রবণতা হলো- তাদের অধীনে থাকা সমস্ত উচ্চপদগুলোতে ব্রাহ্মণদের কার্যত একচেটিয়া আধিপত্য। যদি রায়ত বা সাধারণ কৃষকদের কল্যাণই সরকারের লক্ষ্য হয়, যদি অনাচার ও শোষণ দমন করা সরকারের কর্তব্য হয়, তবে তাদের উচিত এই একচেটিয়া আধিপত্যকে দিন দিন সংকুচিত করা, যাতে অন্যান্য বর্গের মানুষেরাও সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ পায়। হয়তো কেউ কেউ বলতে পারেন যে, শিক্ষার বর্তমান অবস্থায় এটি সম্ভব নয়। আমাদের একমাত্র উত্তর হলো- সরকার যদি উচ্চশিক্ষার দিকে একটু কম নজর দিয়ে জনসাধারণের শিক্ষার দিকে বেশি মনোযোগ দেয় (যেহেতু উচ্চবিত্তরা নিজেরাই নিজেদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে সক্ষম), তবে সবদিক থেকে যোগ্য এবং সম্ভবত নৈতিকতা ও আচরণের দিক থেকে আরও অনেক উন্নত একদল মানুষ গড়ে তুলতে কোনো অসুবিধা হবে না।
বর্তমান গ্রন্থটি রচনার পিছনে আমার উদ্দেশ্য কেবল আমার শূদ্র ভাইদেরই জানানো নয় যে কীভাবে তারা ব্রাহ্মণদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছে; বরং সরকারের চোখ খুলে দেওয়াও আমার লক্ষ্য- যাতে তারা এযাবৎকাল অত্যন্ত একগুঁয়েভাবে অনুসরণ করা সেই ক্ষতিকর উচ্চবিত্ত শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতন হয়। এমনকি বর্তমান বাংলার লেফটেন্যান্ট-গভর্নর স্যার জর্জ ক্যাম্পবেলের মতো উদার ও সকলের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়করাও এখন অনুভব করছেন যে, এই ব্যবস্থা সরকারের স্বার্থের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ও অনিষ্টকর। আমি আন্তরিকভাবে আশা করি যে, সরকার অতি শীঘ্রই তাদের ভুল বুঝতে পারবে এবং সবকিছুকে ‘উচ্চবিত্ত চশমা’ দিয়ে বিচার করা সেইসব লেখক বা ব্যক্তিদের উপর নির্ভরতা কমাবে। সরকার যেন আমার শূদ্র ভাইদের সেই দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার গৌরব নিজের হাতে তুলে নেয়, যে শৃঙ্খলকে ব্রাহ্মণরা তাদের চারপাশে সর্পকুণ্ডলীর মতো পেঁচিয়ে রেখেছে। আমার যেসব শূদ্র ভাই সামান্য শিক্ষা লাভ করেছেন, এটি তাঁদেরও পরম কর্তব্য যে, তাঁরা সরকারের সামনে তাঁদের স্বজাতির প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরবেন এবং নিজেদের সাধ্যমতো ব্রাহ্মণ্য পরাধীনতা থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করবেন। প্রতিটি গ্রামে শূদ্রদের জন্য বিদ্যালয় গড়ে উঠুক; কিন্তু সেখান থেকে সমস্ত ব্রাহ্মণ শিক্ষকদের বিদায় করা হোক! শূদ্ররাই হলো এই দেশের প্রাণ এবং মেরুদণ্ড। আর্থিক বা রাজনৈতিক- যে কোনো সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকারকে কেবল তাদের দিকেই তাকাতে হবে, ব্রাহ্মণদের দিকে নয়। যদি শূদ্রদের হৃদয় ও মন সুখী এবং সন্তুষ্ট থাকে, তবে ভবিষ্যতে তাদের আনুগত্য নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের আর কোনো ভয় থাকবে না।
১ জুন, ১৮৭৩ জ্যোতিরাও গোবিন্দরাও ফুলে
ভারতে শতাব্দীপ্রাচীন ব্রাহ্মণ্য শাসনের সূচনালগ্ন থেকেই শূদ্র ও অতিশূদ্ররা চরম দুর্দশা ও যন্ত্রণার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করছে। মানুষের দৃষ্টি এই কষ্টের দিকে আকর্ষণ করা, তাদের নিজেদের দুর্ভাগ্য নিয়ে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করা এবং শেষ পর্যন্ত ভটদের (ব্রাহ্মণদের) চাপিয়ে দেওয়া এই স্বৈরাচারী শাসন থেকে নিজেদের মুক্ত করা- এটাই এই গ্রন্থটি লেখার প্রধান উদ্দেশ্য। প্রায় তিন হাজার বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে আর্যরা (যারা ভারতের আদিবাসিন্দা ছিল না) এদেশে এসেছিল এবং তারা ভারতের মূল অধিবাসীদের পরাজিত করে তাদের উপর এক জঘন্য স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করেছিল। যখন তারা বুঝতে পারল যে আদিবাসিন্দারা তাদের পরাজয়ের ইতিহাস ভুলে গেছে, তখন এই বহিরাগত ভটরা (ব্রাহ্মণরা) তাদের জয় করে দাসে পরিণত করার পর অত্যন্ত চতুরতার সাথে প্রকৃত সত্যটি স্থানীয়দের কাছে গোপন করে ফেলেছিল। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে ও তাদের কায়েমি স্বার্থ চিরস্থায়ী করার জন্য এই বিজয়ীরা বিভিন্ন কৌশলের উদ্ভাবন করেছিল।
দুর্ভাগ্যবশত, তারা তাদের এই উদ্দেশ্যগুলোতে সফল হয়েছিল; কারণ ভারতের আদি নিবাসীরা ইতিপূর্বেই একটি পরাজিত জাতিতে পরিণত হয়েছিল এবং ব্রাহ্মণরা তাদের জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত করে এক চিরস্থায়ী অন্ধকারের মধ্যে বন্দি করে রেখেছিল। এই কারণেই সেই অসহায় মানুষগুলো তাদের বিজয়ীদের চাতুর্য ও কুটিলতা বুঝতে পারেনি। তাদের দমন করতে এবং যুগের পর যুগ দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখতে আর্যরা অনেক মিথ্যা বা কৃত্রিম ধর্মগ্রন্থ রচনা করেছিল এবং দাবি করেছিল যে, সেগুলো ঈশ্বরের কাছ থেকে পাওয়া ‘ঐশ্বরিক বাণী’ বা প্রত্যাদেশ। এই দরিদ্র ও অজ্ঞ মানুষদের বোঝানো হয়েছিল যে, তারা যদি এই দখলদারদের একনিষ্ঠভাবে সেবা করে তবেই ঈশ্বর খুশি হবেন- যা ‘ঐশ্বরিক বিধান’ অনুযায়ী তাদের জীবনের পরম লক্ষ্য হওয়া উচিত। তারা তাদের ওইসব মিথ্যা ধর্মগ্রন্থে এই কাল্পনিক কাহিনীগুলোকেই বিশেষভাবে তুলে ধরেছিল।
এইসব মিথ্যা ধর্মগ্রন্থগুলোতে সামান্য দৃষ্টি দিলেই এদের ‘ঐশ্বরিক উৎস’ বা ঈশ্বরপ্রদত্ত হওয়ার অসারতা প্রমাণিত হয়ে যায়। আমাদের এই চতুর ভট-ভাইদের (যাদের ‘ভাই’ বলে পরিচয় দিতেও আমরা লজ্জিত) লেখা এই ধরনের কৃত্রিম ধর্মগ্রন্থগুলো এই মহাবিশ্ব, মানুষ এবং সমস্ত বস্তুর সর্বশক্তিমান স্রষ্টার প্রতি চরম অমর্যাদা ও ঘৃণা প্রদর্শন করে, যিনি তাঁর প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি সমান ভালোবাসা ও মমতা পোষণ করেন। এমনকি আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত ভট (ব্রাহ্মণ) ভাইয়েরাও আনন্দের সাথেই এই সত্যটি স্বীকার করে নেবে। আমরা তাদের আমাদের ‘ভাই’ হিসেবে স্বীকার করতে লজ্জিত বোধ করি কারণ একসময় তারা নিপীড়িতদের উপর প্রচণ্ড অত্যাচার চালিয়েছিল এবং আজও আমরা এই ‘তথাকথিত ধর্মের’ নামে চরম বৈষম্য ও প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছি। অথচ এটি এক শাশ্বত সত্য যে, ভ্রাতৃত্ববোধসম্পন্ন ধর্মে পারস্পরিক অত্যাচারের কোনো স্থান নেই। একই স্রষ্টার সন্তান হওয়ার কারণে আমরা তাদের ‘ভাই’ হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য ঠিকই, কিন্তু এই দখলদারদের উচিত কেবল নিজেদের স্বার্থপর চিন্তায় মগ্ন না থেকে ন্যায়সংগত ও নিরপেক্ষভাবে বিচার করা। বিজ্ঞ ইংরেজ, ফরাসি, জার্মান, আমেরিকান এবং অন্যান্য পণ্ডিতরা নিশ্চিতভাবেই এই মত দেবেন যে, ব্রাহ্মণদের দ্বারা রচিত এই ধর্মগ্রন্থগুলো মিথ্যা ও কৃত্রিম; কারণ এই বইগুলো মানুষের মনে এমন এক কাল্পনিক ধারণা গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করে যে, ব্রাহ্মণরা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার চেয়েও শ্রেষ্ঠ। কিছু ইংরেজ লেখক তাঁদের ঐতিহাসিক প্রবন্ধে ইতিমধ্যেই এই মত প্রকাশ করেছেন যে, ভট (ব্রাহ্মণ) লেখকরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই দেশের ‘ভূমিপুত্রদের’ দাসে পরিণত করেছে। এই ভট লেখকরা টেরও পায়নি যে, তাদের এই হীন রচনার মাধ্যমে তারা ঈশ্বরের মহিমা ও রাজকীয় মর্যাদাকে কতটা খাটো ও কলঙ্কিত করেছে! ঈশ্বর এই পৃথিবীতে সৃষ্টি করা সমস্ত কিছুর (জড় ও জীব) সমান অধিকার ও আনন্দ ভোগের স্বাধীনতা নিপীড়িত ও পদদলিত সমাজসহ প্রতিটি মানুষকে দিয়েছেন। কিন্তু এই ভট লেখকরা ঈশ্বরের নামে মিথ্যা ধর্মগ্রন্থ তৈরি করেছে, সাধারণ মানুষকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে এবং (সমাজের স্তরবিন্যাসে) নিজেদের জন্য শ্রেষ্ঠ আসন দখল করে নিয়েছে।
আমাদের কিছু ভট-ভাই এই পর্যায়ে প্রশ্ন তুলতে পারে— ‘ধরা যাক এই ধর্মগ্রন্থগুলো মিথ্যা, কিন্তু কেন দলিত ও নিপীড়িতদের পূর্বপুরুষরা এগুলো বিশ্বাস করেছিল এবং কেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ আজও এগুলো বিশ্বাস করে চলেছে?’ এর সহজ উত্তরটি হলো- এই আধুনিক যুগে যখন আমাদের নিজেদের চিন্তা বলার বা লেখার পূর্ণ স্বাধীনতা আছে, তখনো যদি কোনো ধূর্ত ব্যক্তি একজন সম্মানীয় ব্যক্তির নাম করে কোনো মিথ্যা চিঠি একজন বিজ্ঞ ব্যক্তির কাছে নিয়ে যায়, তবে সেই বিজ্ঞ ব্যক্তিও সাময়িকভাবে সেটি বিশ্বাস করে প্রতারিত হতে পারেন। ঠিক তেমনি, ভটদের দ্বারা অজ্ঞতার অন্ধকারে বন্দি থাকা নিপীড়িত ও দলিত শ্রেণির মানুষরা তাদের চতুর ফাঁদে পা দিয়েছিল। তারা প্রতারিত হয়েছিল এবং তাদের বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে, এই মিথ্যা ধর্মগ্রন্থগুলো আসলে তাদেরই মঙ্গলের জন্য। ভটরা আজও সেই অজ্ঞ মানুষদের একইভাবে প্রতারিত করে চলেছে। সরল মানুষদের উপর চালানো এই প্রতারণা ঠিক উপরের উদাহরণের মতোই। এই বিষয়টি যুক্তি দিয়ে বিচার করলেই বোঝা যায়। তাদের এই নেতিবাচক বা অশুভ কর্মকাণ্ড নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
নিজেদের আখের গোছানোর জন্য ভটরা (ব্রাহ্মণরা) বারবার এই অজ্ঞ ও নিপীড়িত মানুষদের নানা উপদেশ দিয়ে থাকে। এই কারণেই সেই দরিদ্র মানুষগুলো এই তথাকথিত শিক্ষিত ভটদের শ্রদ্ধা করতে শুরু করে। এইভাবে ভটরা শূদ্রদের বাধ্য করেছে তাদেরকে এমন সম্মান প্রদর্শন করতে, যা আসলে কেবল ঈশ্বরেরই প্রাপ্য। প্রকৃতপক্ষে এটি এক চরম অবিচার! নিশ্চিতভাবেই, ভটদের এই কাজের জন্য খোদ ঈশ্বরের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। শূদ্রদের মনে ভটদের এই প্রতারণাপূর্ণ শিক্ষার প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে, যাঁরা তাদের এই শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করছিলেন, তারা তাঁদেরই বিরোধিতা বা তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। ঠিক এভাবেই আমেরিকার নিগ্রোরা সেইসব দয়ালু ব্যক্তিদের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল- যাঁরা তাদের দাসত্বের বন্ধন থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। তারা তাদের হিতৈষীদের শুধু একথা বলেই ক্ষান্ত হয় না যে— ‘আমাদের উপর দয়া করার চেষ্টা করবেন না, আমরা আমাদের বর্তমান অবস্থার (দাসত্বের) মধ্যেই বেশ সুখে আছি’; বরং তারা আরও একধাপ এগিয়ে সেই হিতৈষীদের সাথেই ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হয়। এটা সত্যিই এক অদ্ভুত ব্যাপার! মনে রাখা উচিত যে, এই অজ্ঞ মানুষগুলোর হিতৈষীরা তাঁদের এই মহৎ কাজের মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে কোনো কিছু লাভ করেন না। উল্টো, তাঁদের মধ্যে অনেককে এই কাজের জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দিতে হয় এবং নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থকেও বিপন্ন করতে হয়। কেন তাঁরা এই ধরনের জনহিতকর বা পরোপকারী প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হন? সামান্য একটু আত্মোপলব্ধি করলেই আমরা বুঝতে পারব যে, মানুষের জন্য ‘স্বাধীনতা’ অপরিহার্য, এবং যারা এই স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত, তাদের তা ফিরিয়ে দেওয়া প্রতিটি মানুষের কর্তব্য। যখন একজন ব্যক্তি স্বাধীন থাকে, তখনই সে তার অন্তরের গভীরতম চিন্তাগুলো মৌখিকভাবে বা লিখিতভাবে অন্যের কাছে প্রকাশ করতে পারে। এমনকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কল্যাণকর চিন্তাভাবনাও প্রকাশের স্বাধীনতার অভাবে অন্যের কাছে পৌঁছাতে পারে না এবং এভাবেই সময়ের সাথে সাথে সেগুলো বিলীন হয়ে যায়। এই বিশ্বের স্রষ্টা, যিনি সর্বব্যাপী, তিনি সমস্ত মানবজাতিকে (সকল নর-নারীকে) কিছু মূল্যবান মানবাধিকার প্রদান করেছেন। কিন্তু স্বার্থপর ও চতুর ব্রাহ্মণরা মানুষকে তাদের এই মানবাধিকার সম্পর্কে অন্ধকারের মধ্যে রেখেছে। একজন সত্যিকারের মুক্ত মানুষ কখনোই তাঁর অত্যাচারীদের কাছ থেকে নিজের জন্য এই মানবাধিকারগুলো দাবি করতে দ্বিধা করবেন না। যথাযথ অধিকার মানুষকে সুখ প্রদান করে। জনহিতৈষী ব্যক্তিরা প্রত্যেককে স্বাধীনতা প্রদান করতে ও অন্যায় নিপীড়ন থেকে তাদের মুক্ত করে সুখী করতে অনুপ্রাণিত হন। এই কাজে জড়িত বিপজ্জনক ঝুঁকিগুলোকে তাঁরা পরোয়া করেন না। তাঁদের এই কাজ কতই না মহৎ ও পরোপকারী! যেহেতু তাঁদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল মহান, তাই যেখানেই তাঁরা এই লক্ষ্যে সংগ্রাম করেছেন, ঈশ্বর তাঁদের সেই প্রচেষ্টাকে সাফল্যের মুকুট দিয়েছেন। আমরা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন তাঁদের এই মহৎ প্রচেষ্টায় আশীর্বাদ বর্ষণ করেন। এই মহৎ উদ্দেশ্যে তাঁরা যেখানেই সচেষ্ট হন, তাঁরা যেন সমৃদ্ধি লাভ করেন!
আফ্রিকা ও আমেরিকা মহাদেশে অসহায় মানুষদের বন্দি করা ও তাদের দাসে পরিণত করার এই জঘন্য প্রথা বহু শতাব্দী ধরে প্রচলিত ছিল। ইউরোপ এবং অন্যান্য স্থানের কিছু উন্নত জাতি এই হীন অপরাধের জন্য প্রকৃতপক্ষেই লজ্জিত বোধ করেছিল। ইংল্যাণ্ড ও আমেরিকার অনেক উদারমনা ব্যক্তি এই কুপ্রথা বিলোপ করার জন্য অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে কঠোর সংগ্রাম করেছিলেন। তাঁরা এমনকি নিজেদের নিরাপত্তা বা স্বার্থের পরোয়াও করেননি। অনেক ক্রীতদাসকে তাদের আপনজনদের কাছ থেকে নিষ্ঠুরভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল এবং এভাবেই তারা নরকযন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছিল। এর ফলে তারা শোকে মুহ্যমান হয়ে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই সেইসব মহৎ প্রাণ ব্যক্তিদের সদয় প্রচেষ্টায় তারা তাদের প্রিয়জনদের সাথে আবার মিলিত হতে পেরেছিল। সেইসব নিঃস্বার্থ আমেরিকান সংস্কারকদের তাঁদের এই মহৎ কর্মের জন্য জানাই অশেষ প্রশংসা! তাঁদের এই সদয় প্রচেষ্টা ও সেবা না থাকলে, সেই দুর্ভাগা ক্রীতদাসরা তাদের আপনজনদের সাথে মিলিত না হয়েই মৃত্যুবরণ করত। যারা তাদের দাসে পরিণত করেছিল, তারা কি তাদের সাথে মানবিক আচরণ করছিল? না! একেবারেই না! তাদের উপর চালানো সেই নিষ্ঠুরতার বর্ণনা পাষাণ-হৃদয়েও রক্তক্ষরণ ঘটাবে। ক্রীতদাস-মালিকরা তাদের নিয়মিত লাথি মারত যেন তারা কোনো পশুমাত্র। কখনো কখনো তাদের লাঙলে জুড়ে দিয়ে প্রখর রোদে তাদের দিয়ে জমি চাষ করানো হতো। যদি তারা সামান্যতম কাজে ঢিলেমি করত, তবে তাদের নির্দয়ভাবে চাবুক মারা হতো। মালিকরা তাদের ঠিকমতো খাবার দেওয়ার প্রয়োজনটুকুও বোধ করত না। অনেক সময় তাদের উপোস করে কাটাতে হতো। যে যৎসামান্য খাবার তাদের দেওয়া হতো, তা ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের এবং প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত। কখনো কখনো সেটুকুও তাদের জুটত না।
ক্রীতদাসদের সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে বাধ্য করা হতো যতক্ষণ না তারা পুরোপুরি ভেঙে পড়ত এবং রাতের বিশ্রামের জন্য তাদের আস্তাবলে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। সেই আধমরা ক্লান্ত দেহগুলো নিয়ে তারা আস্তাবলের অস্বাস্থ্যকর মেঝেতে শুয়ে পড়ত। এমনকি ঘুমের প্রশান্তিটুকুও তাদের কপালে জুটত না। সেখানে তারা ঘুমাবেই বা কী করে? যে কোনো সময়- রাতের বেলাতেও মালিকের ডাক পড়ার আতঙ্কে তারা সিঁটিয়ে থাকত। খালি পেটে কি আর ঘুম আসে? দিনের বেলা শরীরের উপর চাবুকের যে বৃষ্টি নেমে আসত, সেই ব্যথায় তারা এপাশ-ওপাশ করত। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠত যখন তাদের সেইসব প্রিয়জনদের কথা মনে পড়ত, যাদের কাছ থেকে তাদের নিষ্ঠুরভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে- তাদের ক্লান্ত চোখ দিয়ে তখন ‘তপ্ত সীসার মতো অশ্রু’ ঝরতে থাকত। এই নিরুপায় অবস্থায় তারা সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করত, তিনি যেন তাদের উপর করুণা করেন এবং এই মর্ত্যের নরক থেকে তাদের মুক্তি দেন। তারা প্রার্থনা করত— ‘এ অসহ্য! দয়া করে তোমার মৃত্যুর দূতকে আমাদের কাছে পাঠাও আর আমাদের উদ্ধার করো।’ এভাবেই তারা রাতের যন্ত্রণাময় প্রহরগুলো পার করত। তাদের সেই চরম যন্ত্রণা, দুর্দশা ও নারকীয় অত্যাচারের বর্ণনা দেওয়ার মতো ভাষা কোনো অভিধানে নেই!
আমেরিকার সহৃদয় ব্যক্তিরা সেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রচলিত এই নিষ্ঠুর দাসপ্রথা বিলোপ করেছেন এবং অনেক অসহায় ক্রীতদাসকে মালিকদের অত্যাচারের কবল থেকে মুক্ত করেছেন। ভারতের নিপীড়িত ও পদদলিত মানুষরা এই শুভ ঘটনায় বিশেষভাবে আনন্দিত বোধ করছে; কারণ একমাত্র তারাই অথবা আমেরিকার সেই ক্রীতদাসরাই দাসত্বের সাথে জড়িত অমানবিক কষ্ট ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে। এই দুই ধরনের দাসের মধ্যে একমাত্র পার্থক্য হলো— ভারতীয়দের প্রথমে পরাজিত করা হয়েছিল, তারপর তাদের দাসে পরিণত করা হয়েছিল; অপরদিকে আফ্রিকানদের আফ্রিকা থেকে ধরে এনে আমেরিকায় নিয়ে দাসে পরিণত করা হয়েছিল। উভয় প্রকার দাসের শোচনীয় অবস্থা হুবহু এক। আমেরিকার ক্রীতদাসদের উপর যে নির্মম কষ্ট চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ভারতের নিচু তলার মানুষদেরও ভটদের (ব্রাহ্মণদের) হাতে ঠিক তেমনই কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে— না, বরং তার চেয়েও বেশি! তাদের সেই নিষ্ঠুর যন্ত্রণার সামান্য উল্লেখও পাষাণহৃদয় ব্যক্তিদের বুক ফাটিয়ে দেবে। এমনকি কঠিন পাষাণেরও অশ্রুধারা নির্গত হয়ে গোটা পৃথিবীকে ভাসিয়ে দেবে। যারা একসময় শূদ্রদের অমানুষে পরিণত করেছিল— সেইসব ভট— ভাইদের বংশধরদের মধ্যে যদি সামান্যতম মানবিকতাও অবশিষ্ট থাকে, তবে তাদের কাছে— এটি একটি প্রকৃত ‘মহাপ্রলয়’ বলে মনে হবে। অবশ্য তাদের সম্প্রদায়ের অন্য অংশের তুলনায় তা হবে সম্পূর্ণ আলাদা।
যদি ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী শূদ্রদের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করে, তবে তারা ভটদের (ব্রাহ্মণদের) দ্বারা শূদ্রদের (নিপীড়িত ও পদদলিত সমাজ) উপর চাপিয়ে দেওয়া অবর্ণনীয় নির্যাতন ও দুঃখকষ্ট সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা পাবে। তারা তখন নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারবে যে, এ যাবৎকাল পর্যন্ত লেখা ভারতের ইতিহাস বইগুলো থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অত্যন্ত কৌশলে মুছে ফেলা হয়েছে।
নিপীড়িত ও দলিত মানুষের ভোগ করা এই চরম দুর্দশার সঠিক উপলব্ধি আমাদের সাহিত্যের উপরও প্রভাব ফেলতে বাধ্য। শূদ্রদের ইতিহাস হবে অত্যন্ত মূল্যবান এক দলিল— যা তাদের উপর শতাব্দীকাল ধরে দুষ্ট অত্যাচারীরা কীভাবে অমানবিক পরিস্থিতি চাপিয়ে দিয়েছিল, তা ফুটিয়ে তুলবে। কোমল হৃদয়ের কোনো কবি এই কথা শুনে ভাষায় বর্ণনা করার অতীত এক প্রচণ্ড ধাক্কা খাবেন। কিন্তু মন্দের ভেতর থেকেও ভালোর জন্ম হয়! এ যাবৎ পাঠকদের মনে অকৃত্রিম শোকাতুর আবেগ তৈরি করার জন্য কবিদের কাল্পনিক কাহিনীর আশ্রয় নিতে হতো। কিন্তু শূদ্রদের জীবনের এই বিয়োগান্তক পরিস্থিতির কথা জানলে কবিদের আর সেই পরিশ্রম করতে হবে না, কারণ বাস্তবের যন্ত্রণাই যে কোনো কল্পনাকে হার মানাবে।
বিদেশিরাই যদি ভারতের শূদ্রদের ভোগ করা দুর্দশা দেখে এতটা শোকাতুর হয়ে পড়ে, তবে ভারতের আদি শূদ্রদের বর্তমান বংশধররা যখন তাদের পূর্বপুরুষদের সেই যন্ত্রণার কথা চিন্তা করে, তখন তাদের মানসিক যন্ত্রণার মাত্রা কতই না বেশি হবে! তাদের প্রভু তথা শাসকগোষ্ঠীর (ব্রাহ্মণ্যবাদী স্বৈরতন্ত্রের) দ্বারা শূদ্রদের উপর চালানো সেই অমানবিকতার কথা স্মরণ করলে আজও গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে। আমাদের সহজাতভাবেই মনে হয় যে, যদি সেই যন্ত্রণার স্মৃতিটুকু আমাদের মনে এমন গভীর দুঃখের জন্ম দেয়, তবে সেই ভুক্তভোগীরা নিজেরা না জানি কী ভয়াবহ নারকীয় যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গিয়েছিল! ভারতের ভটদের প্রধান পরশুরাম কীভাবে ভারতের আদি বাসিন্দা অর্থাৎ ক্ষত্রিয়দের (যোদ্ধা শ্রেণি) উপর নির্যাতন চালিয়েছিল, তা আমাদের এই নিবন্ধে যথাসময়ে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হবে। সে ক্ষত্রিয়দের নির্বিচারে হত্যা করেছিল, এমনকি সে হতভাগ্য নারীদের কোল থেকে তাদের দুগ্ধপোষ্য শিশুদেরও কেড়ে নিয়েছিল; এভাবে সে এক ‘নিরপরাধের হত্যাকাণ্ড’ (massacre of the innocents) সম্পন্ন করেছিল! পরশুরাম আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল— সে সেইসব গর্ভবতী ক্ষত্রিয় নারীদের খুঁজে বের করতে শিকারীর মতো পিছু ধাওয়া করেছিল, যারা নিজেদের এবং তাদের গর্ভস্থ সন্তানদের প্রাণ বাঁচাতে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে এদিক— ওদিক পালাচ্ছিল; সে তাদের বন্দি ও কারারুদ্ধ করেছিল। যদি তারা পুত্রসন্তান প্রসব করত, তবে পরশুরাম সেখানে ছুটে যেত এবং সেই নবজাতককে হত্যা করত। ক্ষত্রিয়দের উপর অত্যাচারকারী ওই ভটদের কাছ থেকে একটি তথ্যসমৃদ্ধ এবং নিরপেক্ষ ইতিহাস আশা করা বৃথা। ভট ঐতিহাসিকরা হয়তো অত্যন্ত চতুরতার সাথে এই অশুভ অধ্যায়টি তাদের ইতিহাস বই থেকে মুছে ফেলেছে, কারণ কেউই নিজের পৈশাচিক কর্মকাণ্ডের কথা স্বীকার করতে চায় না। তবুও এটি অত্যন্ত বিস্ময়কর যে, তাদেরই কিছু ইতিহাসবিদ তাদের ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোতে— তা যেমনই হোক না কেন, এই ঘৃণ্য ঘটনার কথা লিপিবদ্ধ করে গেছে!
ভট ঐতিহাসিকরা তাদের বইপত্রে লিপিবদ্ধ করে গেছে যে, পরশুরাম একুশবার ক্ষত্রিয়দের পরাজিত করেছিল এবং ভবিষ্যৎ পাঠকদের আনন্দের জন্য ক্ষত্রিয় বিধবাদের সন্তানদের হত্যা করার ঘটনাকে এক বীরত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু হাতের তালু দিয়ে যেমন সূর্যের তেজ ঢেকে রাখা যায় না, তেমনি সত্যকেও চিরকাল চেপে রাখা যায় না, ঠিক সেভাবেই তারা হয়তো সেই আদি অমানবিকতার একটি আংশিক বিবরণ নথিভুক্ত করতে বাধ্য হয়েছিল— কারণ এটি একটি চিরন্তন সত্য যে, ‘খুন যেমন চাপা থাকে না, সত্যও তেমনি একদিন না একদিন প্রকাশ পাবেই’!
পরশুরামের দ্বারা সংঘটিত সেই অমানবিকতার বিবরণের উপর আজ সামান্য চোখ বুলালেও আমাদের হৃদয় বিষাদে ভরে ওঠে। পরশুরাম ও তার বাহিনী যখন সেই গর্ভবতী মায়েদের তাড়া করেছিল, তখন তারা কী নিদারুণ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গিয়েছিল! নারীরা সাধারণত দ্রুত দৌড়াতে অভ্যস্ত নয়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছিল উচ্চবংশীয় ব্যক্তিদের সহধর্মিনী, যারা দিনের পর দিন ঘরের চার দেয়ালের সুরক্ষায় থাকতেই অভ্যস্ত ছিল। যে গর্ভবতী নারীরা ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের স্বামীদের আশ্রয়ে অত্যন্ত বিলাসপূর্ণ জীবন যাপন করত, তাদেরকে নিজের জীবন ও গর্ভস্থ সন্তানকে বাঁচাতে প্রাণপণে দৌড়াতে বাধ্য করাটা ছিল দুর্ভাগ্যের চরম সীমা! তাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো হোঁচট খেয়ে প্রান্তরের রুক্ষ পাথরের উপর আছড়ে পড়েছিল। নিশ্চিতভাবেই তারা শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুরুতর আঘাত পেয়েছিল এবং তাদের শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছিল; কিন্তু সেই নির্দয় পশ্চাদ্ধাবনকারী পরশুরামের ভয়ে তারা এক মুহূর্তের জন্যও জিরিয়ে নেওয়ার সাহস পায়নি। কাঁটার আঘাতে তাদের পায়ের তলা বিদীর্ণ হয়েছিল, পরনের কাপড় ছিঁড়ে গিয়েছিল এবং ঝোপঝাড়ের ঘর্ষণে শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল— ফলে অনিবার্যভাবেই রক্তক্ষরণ ঘটছিল। প্রখর রোদে দৌড়ানোর পরিশ্রমে তাদের পা, সেই সাথে তাদের কোমল পদ্মের মতো গায়ের রঙ নিশ্চয়ই ঝলসে গিয়েছিল। তাদের মুখে হয়তো ফেনা উঠে এসেছিল, চোখ নোনতা অশ্রুতে টলমল করছিল। দিনের পর দিন এক ফোঁটা জলও না পেয়ে তাদের পেট হয়তো যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়েছিল। সেই নির্দয় পশ্চাদ্ধাবনকারীর হাত থেকে বাঁচতে তারা হয়তো প্রার্থনা করেছিল যেন পৃথিবী দ্বিখণ্ডিত হয় এবং তাদের গ্রাস করে নেয়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো এভাবে প্রার্থনা করেছিল— ‘হে প্রভু! কেন তুমি আমাদের এই পরিস্থিতির মুখোমুখি করলে?’ ‘আমরা এমনিতেই অসহায়, আমাদের স্বামীদের অনুপস্থিতিতে আমরা আরও বেশি অসহায় হয়ে পড়েছি। কেন তুমি আমাদের এই যন্ত্রণা দীর্ঘায়িত করছো? হে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর! এই পিশাচ যখন আমাদের স্বামীদের হত্যা করে এখন আমাদের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে, তখন তুমি কেন নির্বাক দর্শক হয়ে আছো?’ তারা যখন এভাবে প্রার্থনা করছিল, পরশুরাম হয়তো তাদের অনেককে ধরে ফেলেছিল আর বন্দি করে নিয়ে গিয়েছিল। অনেক নারী হয়তো তাকে অত্যন্ত বিনীতভাবে অনুনয়— বিনয় করেছিল, আবার কেউ কেউ অসহ্য যন্ত্রণায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিল। তারা হয়তো তাদের অনাগত সন্তানদের প্রাণভিক্ষা চেয়ে পরশুরামের কাছে মিনতি করেছিল— ‘আমরা হাঁটু গেঁড়ে আপনার কাছে এই ভিক্ষা চাইছি— আপনি চাইলে আমাদের মেরে ফেলুন, কিন্তু অন্তত আমাদের সন্তানদের প্রাণভিক্ষা দিন। আপনি আমাদের বিধবা করেছেন, এরপর আমরা আর কোনো সন্তান জন্ম দিতে পারব না। আমরা আমাদের এই শেষ সন্তানের জন্মের প্রতীক্ষায় আছি। কেন আমাদের গর্ভস্থ সন্তানকে হত্যা করে আপনি আমাদের শোকের সাগরে ডুবিয়ে দেবেন? আমরা আপনার কন্যার মতো, আমাদের উপর এইটুকু অনুগ্রহ করুন।’ কিন্তু এই সব কাকুতি— মিনতি পাষাণ— হৃদয় পরশুরামের মনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। কংসের মতো পরশুরাম যখন সেই নবজাতকদের মায়েদের কোল থেকে ছিনিয়ে নিত, তখন মায়েরা হয়তো তাদের সন্তানদের আগলে রাখার জন্য ঝুঁকে পড়ত এবং প্রার্থনা করত— প্রয়োজন হলে যেন তাদেরই মেরে ফেলা হয়, কিন্তু তাদের সন্তানদের যেন ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তাতে কোনো লাভই হয়নি! মায়েদের কোল থেকে পরশুরামের সেই শিশু ছিনিয়ে নেওয়ার বিষাদময় দৃশ্য বর্ণনা করার ক্ষমতা আমাদের কলমের নেই। যখন সে মায়েদের চোখের সামনেই সেই শিশুদের হত্যা করত, তখন কেউ হয়তো শোকে বুক চাপড়াতো, কেউ নিজের চুল ছিঁড়ত, কেউ বা চরম দুঃখে নিজের জীবন বিসর্জন দিত; আবার কেউ কেউ হয়তো শোকে পাগল হয়ে দিকবিদিক ঘুরে বেড়াতো আর তাদের সেই অপূরণীয় ক্ষতির জন্য বিলাপ করত। আমাদের ইতিহাসের এই অন্ধকার অধ্যায়ের একটি বিশ্বস্ত বিবরণ ভটদের কাছ থেকে আশা করা একেবারেই নিরর্থক।
ভটরা (ব্রাহ্মণরা) এই নিপীড়িত ও পদদলিত মানুষগুলোর মগজধোলাই এমনভাবে করেছে যে, তারা পরশুরামকেই এই মহাবিশ্বের সর্বশক্তিমান স্রষ্টা হিসেবে মেনে নিয়েছে— সেই পরশুরাম, যে তাদের সেনাপতি হিসেবে শত শত ক্ষত্রিয়কে হত্যা করেছিল এবং তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের অবর্ণনীয় দুঃখকষ্টের জন্য দায়ী ছিল। এটা সত্যিই এক বিরাট বিস্ময়! পরশুরামের পরবর্তী প্রজন্মের ভটরা ক্ষত্রিয়দের উপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। আমরা এই গ্রন্থের পরবর্তী অংশে উল্লেখ করব কীভাবে ভটরা অট্টালিকার ভিত তৈরির সময় জ্যান্ত ক্ষত্রিয়দের পুঁতে ফেলত। যদি কোনো ভট এমন কোনো নদীর পাশ দিয়ে যেত যেখানে কোনো শূদ্র কাপড় কাচছে, তবে সেই শূদ্রকে তার সমস্ত কাপড় গুটিয়ে অনেক দূরের কোনো স্থানে চলে যেতে হতো— যাতে দূষিত জলের কোনো কণা ওই ভাটের গায়ে ছিটকে না লাগে। তারপরও যদি সেখান থেকে জলের কোনো ফোঁটা ভাটের শরীর স্পর্শ করত, অথবা ভট যদি কেবল তেমনটা কল্পনাও করত, তবে সে তার হাতের পাত্রটি সজোরে ওই শূদ্রের মাথায় ছুড়ে মারতে দ্বিধা করত না। এতে শূদ্রটি মাথায় গভীর ক্ষত আর প্রচুর রক্তক্ষরণ নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ত। সংজ্ঞা ফেরার পর সেই শূদ্র তার রক্তভেজা কাপড়গুলো গুছিয়ে নিয়ে নিঃশব্দে বাড়ির পথ ধরত। সে সরকারের কাছে কোনো অভিযোগও করতে পারত না, কারণ পুরো প্রশাসন ছিল ভটদের দখলে। উল্টো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভটদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার জন্য তাকেই কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হতো। এটি ছিল অবিচারের চরম সীমা!
শূদ্রদের জন্য তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনে রাস্তাঘাটে অবাধে চলাফেরা করা ছিল অত্যন্ত কঠিন; বিশেষ করে সকালবেলা, যখন মানুষ বা বস্তুর দীর্ঘ ছায়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। যদি বিপরীত দিক থেকে কোনো ‘ভট সাহেব’ আসত, তবে শূদ্রকে রাস্তার একপাশে ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হতো যতক্ষণ না সেই ‘ভট সাহেব’ তাকে অতিক্রম করে চলে যেত— যাতে শূদ্রের ‘অপবিত্র’ ছায়া তার উপর না পড়ে। ‘ভট সাহেব’ চলে যাওয়ার পরই কেবল সে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেত। যদি কোনো শূদ্র দুর্ভাগ্যক্রমে অসাবধানতাবশত কোনো ভাটের উপর তার অপবিত্র ছায়া ফেলে দিত, তবে সেই ভট তাকে নির্দয়ভাবে প্রহার করত এবং তারপর সেই অপবিত্রতা ধুয়ে ফেলতে নদীতে স্নান করতে যেত। শূদ্রদের এমনকি রাস্তায় থুতু ফেলার উপরও নিষেধাজ্ঞা ছিল। যদি তাকে কোনো ব্রাহ্মণ পাড়ার ভেতর দিয়ে যেতে হতো, তবে তার থুতু ফেলার জন্য নিজের গলায় একটি মাটির পাত্র ঝোলানো থাকত। যদি কোনো ভট কর্মকর্তা রাস্তায় কোনো শূদ্রের মুখের থুতু পড়ে থাকতে দেখত, তবে সেই শূদ্রের কপালে যে কী দুর্ভোগ জুটত, তা অবর্ণনীয়! শূদ্ররা এই ধরনের অসংখ্য লাঞ্ছনা ও প্রতিবন্ধকতা সহ্য করছিল আর এই অত্যাচারীদের হাত থেকে মুক্তির পথ চেয়ে ছিল, ঠিক যেভাবে বন্দিরা ব্যাকুল হয়ে মুক্তির প্রতীক্ষা করে। সর্বদয়াবান বিধাতা শূদ্রদের প্রতি করুণাপরবশ হলেন এবং তাঁর ঐশ্বরিক বিধানে ভারতে ব্রিটিশ রাজের সূচনা করলেন, যা শূদ্রদের এই শারীরিক দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করল। আমরা ব্রিটিশ শাসকদের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। আমরা তাঁদের এই দয়া কখনোই ভুলব না। এই ব্রিটিশ শাসকরাই আমাদের ভটদের (ব্রাহ্মণদের) শতাব্দীপ্রাচীন অত্যাচার থেকে মুক্ত করেছেন এবং আমাদের সন্তানদের জন্য এক আশাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করেছেন। যদি ব্রিটিশরা শাসক হিসেবে ভারতে না আসতেন, তবে ভটরা নিশ্চিতভাবেই অনেক আগেই আমাদের পিষে শেষ করে ফেলত।
কেউ কেউ হয়তো বিস্ময় প্রকাশ করতে পারেন যে— কীভাবে ভটরা এই নিপীড়িত ও পদদলিত মানুষগুলোকে পিষে ফেলতে সক্ষম হলো, যেখানে শূদ্রদের সংখ্যা ছিল ভটদের তুলনায় দশগুণ বেশি। এটি একটি সুপরিচিত বিষয় যে, একজন চতুর ব্যক্তি দশজন অজ্ঞ ব্যক্তিকে অনায়াসেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে (যেমন একজন মেষপালক ও তার ভেড়ার পাল)। যদি সেই দশজন অজ্ঞ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হতো, তবে তারা অবশ্যই সেই চতুর ব্যক্তির উপর জয়ী হতো। কিন্তু যদি সেই দশজন বিচ্ছিন্ন থাকে, তবে তারা সহজেই ওই চতুর ব্যক্তির দ্বারা প্রতারিত হবে। ভটরা শূদ্রদের মধ্যে বিভেদের বীজ বপন করার জন্য একটি অত্যন্ত কুটিল পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিল। নিপীড়িত ও পদদলিত মানুষের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা দেখে ভটরা স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত ছিল। তারা জানত যে, কেবল তাদের বিচ্ছিন্ন রাখতে পারলেই তাদের (ভটদের) প্রভুত্ব চিরস্থায়ী হবে। তাদের অনির্দিষ্টকালের জন্য অধম দাসে পরিণত করে রাখার একমাত্র পথ ছিল এটাই; আর কেবল এভাবেই তারা শূদ্রদের গায়ের রক্তঘাম ঝরানো পরিশ্রমের বিনিময়ে বিলাসিতা ও ভোগবিলাসের জীবন অতিবাহিত করতে সক্ষম হবে। সেই উদ্দেশ্যেই ভটরা ‘বর্ণপ্রথা’ ও জাতিভেদপ্রথার মতো এক অনিষ্টকারী কাল্পনিক কাহিনী উদ্ভাবন করেছিল, নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য জটিল সব গ্রন্থ রচনা করেছিল এবং অজ্ঞ শূদ্র জনসাধারণের সরল মনে সেই অনুযায়ী বিষ গেঁথে দিয়েছিল। কিছু শূদ্র এই প্রকাশ্য অবিচারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত বীরত্বের সাথে লড়াই চালিয়েছিল। প্রতিশোধস্বরূপ তাদের একটি পৃথক শ্রেণিতে আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল। ভটরা তাদের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার দুঃসাহসের কারণে, আমরা আজ যাদের মালি, কুনবি (চাষী) ইত্যাদি বলি— তাদের বুঝিয়েছিল যাতে তারা ওই বিদ্রোহী যোদ্ধাদের ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে গণ্য করে। জীবনধারণের উপায় থেকে বঞ্চিত হয়ে সেই বিদ্রোহী শূদ্ররা মৃত পশুর মাংস খাওয়ার মতো চরম অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল। আজ শূদ্র সম্প্রদায়ের কিছু সদস্য অত্যন্ত গর্বের সাথে নিজেদের মালি, কুনবি, স্বর্ণকার, দর্জি, কামার বা ছুতার হিসেবে পরিচয় দেয়— যা মূলত তাদের পেশার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তারা খুব সামান্যই জানে যে, আমাদের পূর্বপুরুষ এবং এই তথাকথিত অস্পৃশ্যদের— মাহার, মাঙ্গ, চণ্ডাল ইত্যাদি— পূর্বপুরুষরা আসলে সহোদর ভাই ছিল— অর্থাৎ তারা একই বংশধারা থেকে উদ্ভূত। তাদের পূর্বপুরুষরা আক্রমণকারী দখলদারদের (ভটদের) হাত থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষা করার জন্য বীরত্বের সাথে লড়াই করেছিল আর সেই কারণেই ধূর্ত ভটরা তাদের চরম দারিদ্র ও দুর্দশার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। এটি অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, এই প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে অসচেতন হওয়ার কারণে, শূদ্ররা তাদের নিজেদের ভাইবোনদেরই ঘৃণা করতে শুরু করেছে।
শূদ্ররা ভটদের প্রতি কেমন আচরণ করছে, তার উপর ভিত্তি করে ভটরা জাতিভেদ বা বর্ণবৈষম্যের একটি বিস্তৃত ও জটিল ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেছিল— যেখানে কাউকে রাখা হয়েছিল একদম নীচের স্তরে, আবার কাউকে রাখা হয়েছিল সামান্য উপরের স্তরে। এইভাবে তারা স্থায়ীভাবে শূদ্রদের নিজেদের অনুগত দাসে পরিণত করেছিল এবং এই ‘অন্যায় জাতিভেদ প্রথারূপী শক্তিশালী অস্ত্রের মাধ্যমে শূদ্রদের মাঝে চিরস্থায়ী বিভেদের দেওয়াল তুলে দিয়েছিল।
এটা ছিল সেই চিরচেনা গল্পের মতো— যেখানে দুই বিড়ালের বিবাদে তৃতীয় পক্ষ— বানর বিচারক সেজে সবটুকু হাতিয়ে নেয়! ভটরা এই নিপীড়িত ও পদদলিত জনসমষ্টির মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করেছিল এবং সেই বিভেদের সুযোগ নিয়েই তারা নিজেরা ফুলে— ফেঁপে উঠছে— অর্থাৎ বিলাসবহুল জীবন যাপন করছে।
ভারতে ব্রিটিশ রাজের আগমনের ফলে এখানকার নিপীড়িত ও পদদলিত জনসমষ্টি শারীরিকভাবে ভটদের দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু আমরা অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, দয়াবান ব্রিটিশ সরকার উক্ত জনসাধারণের জন্য শিক্ষা প্রদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে এখনো মনোনিবেশ করেনি এবং এই কারণেই শূদ্ররা আজও অজ্ঞ রয়ে গেছে; ফলে ভটদের তৈরি মিথ্যা বা ভেজাল ধর্মগ্রন্থগুলোর প্রতি তাদের ‘মানসিক দাসত্ব’ এখনো অব্যাহত রয়েছে। এমনকি তাদের উপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিকারের জন্য তারা সরকারের কাছে আবেদনটুকুও করতে পারে না। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যায় এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভেতরে ভটরা কীভাবে তাদের শোষণ করে, সে বিষয়ে সরকার এখনো অবগত নয়। আমরা সর্বশক্তিমানের কাছে প্রার্থনা করি, সরকার যেন এই জরুরি কাজের প্রতি দয়া করে মনোযোগ এবং জনসাধারণকে ভটদের ষড়যন্ত্রমূলক ‘মানসিক দাসত্ব’ থেকে মুক্ত করে।
এই নিবন্ধটি লেখার ক্ষেত্রে নিরন্তর উৎসাহ প্রদানের জন্য আমি শ্রী বিনায়ক বাবজি ভাণ্ডারকর এবং রাও সাহেব শ্রী রাজান্না লিঙ্গু— র কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।
১ জুন, ১৮৭৩
জ্যোতিরাও গোবিন্দরাও ফুলে
ধোণ্ডিবা: দয়ালু ইংরেজ, ফরাসি ও ইউরোপের অন্যান্য সরকারগুলো সম্মিলিতভাবে তাদের সাম্রাজ্যে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করেছে। এভাবেই তারা কিন্তু ব্রহ্মদেবের আদেশ লঙ্ঘন করেছে। কারণ মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে যে, ব্রহ্মদেব তাঁর মুখ থেকে ব্রাহ্মণ ও পা থেকে শূদ্রদের সৃষ্টি করেছেন এবং শূদ্রদের আদেশ দিয়েছেন তারা যেন অনন্তকাল ব্রাহ্মণদের সেবা করে।
জ্যোতিরাও: তুমি বলছ যে ইংরেজ এবং অন্যান্য ইউরোপীয় সরকারগুলো তাদের নিজ নিজ রাষ্ট্রে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করে ব্রহ্মদেবের আদেশ লঙ্ঘন করেছে। এই পৃথিবীতে ইংরেজদের মতো আরও অনেক জাতি বাস করে। মনুস্মৃতি অনুযায়ী ব্রহ্মদেবের শরীরের কোন অংশ থেকে এই জাতিগুলো সৃষ্টি হয়েছে?
ধোণ্ডিবা: এর উত্তরে শিক্ষিত— অশিক্ষিত সকল ব্রাহ্মণই একযোগে বলে থাকে যে, মনুস্মৃতিতে ইংরেজ কিংবা অন্য কোনো জাতির কোনো উল্লেখ নেই, কারণ তারা হলো অধম ও দুরাচারী।
জ্যোতিরাও: তাহলে তুমি কি মনে করো যে, এখানে কোনো অধম আর দুরাচারী ব্রাহ্মণ নেই?
ধোণ্ডিবা: সতর্কতার সাথে অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে, অন্যসব জাতির তুলনায় ব্রাহ্মণদের মধ্যেই বেশি অধম ও দুরাচারী লোক পাওয়া যাবে।
জ্যোতিরাও: তবে মনুস্মৃতিতে এমন অধম ও দুরাচারী ব্রাহ্মণদের উল্লেখ কীভাবে পাওয়া গেল?
ধোণ্ডিবা: এ থেকে কেবল এটাই প্রমাণ করে যে, ব্রহ্মার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ থেকে ব্রাহ্মণ ও অন্যদের সৃষ্টির এই তত্ত্বটি ভুল; কারণ এটি সমস্ত মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
জ্যোতিরাও: একারণেই শিক্ষিত ইংরেজ লেখক— পণ্ডিতরা ব্রাহ্মণ লেখকদের রচিত মিথ্যা ধর্মগ্রন্থের এই তত্ত্বের ভিত্তিহীনতা বুঝতে পেরেছিলেন এবং দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করেছিলেন। যদি ব্রহ্মা সকল মানুষের সৃষ্টির উৎস হতেন, তবে ইংরেজরা দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করত না। প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী বিচার করলে চার বর্ণের উৎপত্তি ও সৃষ্টি সম্পর্কে মনু যে তত্ত্ব দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ ভুল বলে মনে হয়।
ধোণ্ডিবা: আমি কি জানতে পারি তা কীভাবে?
জ্যোতিরাও: মনুর মতে ব্রাহ্মণরা ব্রহ্মার মুখ থেকে সৃষ্টি হয়েছে। তাহলে ব্রাহ্মণদের আদি মাতার সৃষ্টি সম্পর্কে মনু নীরব কেন? ব্রহ্মার কোন অঙ্গ থেকে তার সৃষ্টি হয়েছিল?
ধোণ্ডিবা: এই শিক্ষিত ব্রাহ্মণদের তত্ত্ব অনুযায়ী, সেও হয়তো অধম ও দুরাচারী ছিল; তাই আপাতত তাকেও আমরা ম্লেচ্ছদের (মুসলিম বা বিদেশি) কাতারে গণ্য করতে পারি।
জ্যোতিরাও: ব্রাহ্মণরা গর্বভরে ঘোষণা করে যে, তারা এই মর্ত্যের দেবতা, চার বর্ণের মধ্যে তারা শ্রেষ্ঠ। তাদের আদি মাতা নিশ্চয়ই একজন ব্রাহ্মণী ছিল। তুমি তাকে ম্লেচ্ছদের সারিতে ফেলার সাহস পাও কী করে? সে মদ আর গোমাংসের গন্ধ সহ্য করত কীভাবে? ধোণ্ডিবা, তুমি তো ঘোর পাষণ্ডের মতো কথা বলছ!
ধোণ্ডিবা: আপনি নিজেই তো জনসভায় প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন যে, ব্রাহ্মণদের আদি পূর্বপুরুষ পূজনীয় ঋষিরা শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে গরু জবাই করত এবং গোমাংসের উপাদেয় খাবার উপভোগ করত। তাহলে আপনি কীভাবে বলছেন যে তাদের আদি মাতা গোমাংস পছন্দ করত না? আপনি প্রার্থনা করুন যেন ব্রিটিশ শাসন এখানে দীর্ঘজীবী হয়। তবেই দেখবেন তথাকথিত ধর্মপ্রাণ ব্রাহ্মণদের অধিকাংশই ইংরেজ শাসকদের তোষণ করছে এবং তাদের টেবিলের গোমাংসের উচ্ছিষ্ট এমনভাবে সাবাড় করছে যে খানসামাদের জন্য একটুও অবশিষ্ট থাকছে না। অনেক মাহার খানসামা ইতিমধ্যেই মনে মনে এই গোমাংসভোজী ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে। মনু নিজেই ব্রাহ্মণদের আদি মাতার উৎপত্তি সম্পর্কে নীরব থেকেছেন। এর জন্য আপনার সরাসরি মনুকেই দোষ দেওয়া উচিত। তবে কেন আপনি আমাকে পাষণ্ড বলছেন? দয়া করে আপনার কথা বলে যান।
জ্যোতিরাও: তোমার ইচ্ছামতোই বলছি! আমাকে বলো ধোণ্ডিবা, যদি ব্রাহ্মণরা ব্রহ্মার মুখ থেকে জন্ম নিয়ে থাকে, তবে ওই মুখই হলো ব্রাহ্মণদের গর্ভাশয়। সেক্ষেত্রে তাকে ঋতুস্রাবের শারীরিক নিয়মের অধীন হতে হবে। তবে ব্রহ্মা কি প্রতি মাসে কয়েকদিন অশুচি হয়ে আলাদা থাকত, নাকি লিঙ্গায়েত নারীদের মতো গায়ে ছাই মেখে অপবিত্রতা থেকে মুক্ত হয়ে দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যেত? এ সম্পর্কে মনু কী বলেছেন?
ধোণ্ডিবা: না, ব্রহ্মা যেহেতু ব্রাহ্মণদের স্রষ্টা, সে কেন লিঙ্গায়েত নারীদের প্রথা সমর্থন করবে? কারণ ব্রাহ্মণরা লিঙ্গায়েতদের ঘৃণা করে, যেহেতু তাদের নারীরা ঋতুস্রাবের সময় আলাদা থাকার নিয়ম পালন করে না।
জ্যোতিরাও: একটু ভেবে দেখো ধোণ্ডিবা। যদি ব্রহ্মার মুখ, হাত, উরু এবং পা থেকে যথাক্রমে চার বর্ণ তৈরি হয়ে থাকে, তবে এই চারটি অঙ্গই যোনি হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা— সেক্ষেত্রে ব্রহ্মাকে মাসে ১৬ দিন আলাদা থাকতে হতো। তবে তখন তার ঘরের কাজ কে দেখাশোনা করত? মনু এ বিষয়ে কী বলেন?
ধোণ্ডিবা: দুর্ভাগ্যবশত মনু এ বিষয়ে কিছুই বলেননি।
জ্যোতিরাও: ব্রাহ্মণ যদি ব্রহ্মার মুখে গর্ভস্থ হয়ে থাকে, তবে সেই ভ্রূণ বড়ো হলো কোথায়? নয় মাস ধরে সেটি ব্রহ্মার কোন অঙ্গে ছিল? মনু কি এ বিষয়ে কিছু বলেছেন?
ধোণ্ডিবা: এ বিষয়েও কিছুই বলেননি।
জ্যোতিরাও: মনু কি এ বিষয়ে কিছু বলেছেন যে, ব্রহ্মা সেই ব্রাহ্মণ শিশুকে কীভাবে খাওয়াতো? সে কি তাকে স্তন্যপান করাতো নাকি বোতলে দুধ খাওয়াতো?
ধোণ্ডিবা: কিছুই বলেননি।
জ্যোতিরাও: এটি সর্বজনবিদিত যে, সাবিত্রী ছিল ব্রহ্মার স্ত্রী। তবে কেন সে নয় মাস ধরে ভ্রূণকে মুখে বহন করা, জন্ম দেওয়া এবং লালন— পালন করার মতো জটিল দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছিল? এটি অত্যন্ত অদ্ভুত বলে মনে হয়!
ধোণ্ডিবা: তার চারটি মুখের মধ্যে তিনটি মুখ তো এই ঝামেলা থেকে মুক্ত ছিল। তবে এই নপুংসক ব্রহ্মা কেন এমন ছেলেমানুষি লুকোচুরি খেলা পছন্দ করলো?
জ্যোতিরাও: আমরা যদি তাকে নপুংসক বলি, তবে সে কীভাবে নিজের মেয়ে বিদ্যার দেবী সরস্বতীর সতীত্ব নষ্ট করেছিল? একারণেই তো সে ‘কন্যাধর্ষণকারী ব্রহ্মা’ হিসেবে পরিচিত! এই জঘন্য কাজের জন্যই কোথাও কেউ তার পূজা করে না।
ধোণ্ডিবা: ব্রহ্মার যদি সত্যিই চারটি মুখ থাকত, তবে তার আটটি স্তন, চারটি নাভি, চারটি মূত্রনালী ও চারটি মলদ্বার থাকা উচিত ছিল। কিন্তু কোথাও এর কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। ব্রাহ্মণদের পুরাণে এও লেখা আছে যে, শেষনাগের উপর শুয়ে থাকা বিষ্ণু তার সঙ্গী হিসেবে লক্ষ্মীকে পাওয়া সত্ত্বেও কীভাবে তার নাভি থেকে এই চার মুখওয়ালা শিশু— ব্রহ্মাকে জন্ম দিল? শেষশায়ী বিষ্ণুও ব্রহ্মার মতোই একই বিভ্রান্তিকর অবস্থায় পড়ে।
জ্যোতিরাও: দীর্ঘ আলোচনার পর একথা বলা যেতে পারে যে, ব্রাহ্মণরা ছিল ইরানের (পারস্য) অধিবাসী, যা আরব সাগরের ওপারে অবস্থিত। অনেক ইংরেজ লেখক তাঁদের বইয়ে এই তত্ত্ব দিয়েছেন এবং প্রমাণ করেছেন যে, এই ব্রাহ্মণদের তখন ‘ইরানি’ বা ‘আর্য’ বলা হতো। এই লুটেরা আর্যদের দল বারবার ভারতের অনেক রাজ্য আক্রমণ করেছে এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। পরবর্তীতে, বামনের পর ব্রহ্মা তাদের প্রধান বা সর্দার হয়। সে ছিল অত্যন্ত একরোখা। সে আমাদের পূর্বপুরুষদের পরাজিত করে এবং তাদের দাসে পরিণত করে। সে অনেক অন্যায় নিয়ম জারি করে যাতে আর্য এবং পরাজিত আদিবাসিন্দাদের মধ্যে চিরস্থায়ী ফাটল তৈরি হয়। ব্রহ্মার মৃত্যুর পর, আর্যরা তাদের পুরোনো নাম পরিবর্তন করে ‘ব্রাহ্মণ’ নামে পরিচিত হয়। ব্রহ্মার পরবর্তী মনুর মতো কর্মকর্তারা ব্রহ্মার তৈরি করা নিয়মের পবিত্রতা বজায় রাখতে উদগ্রীব ছিল। একারণেই তারা পরাজিত মানুষের মনে প্রভাব ফেলার জন্য ব্রহ্মাকে নিয়ে অনেক কাল্পনিক গল্প তৈরি করে এবং সেগুলোকে ঐশ্বরিক ইচ্ছা হিসেবে প্রচার করে। শেষশায়ী বিষ্ণুর কাহিনিটিও এই ধরনের রচনারই একটি অংশ। কালক্রমে ব্রাহ্মণরা এই কাল্পনিক গল্পগুলো বই আকারে সংকলন করে। নারীসুলভ নারদ মুনি এই মিথ্যা বইগুলোর পবিত্রতা সরল আদিবাসিন্দাদের মনে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করে, যার ফলে ব্রাহ্মণদের মাহাত্ম্য আরও বৃদ্ধি পায়। ব্রহ্মার মতো শেষশায়ী বিষ্ণুর উৎপত্তির খোঁজ করা মানে স্রেফ সময়ের অপচয়। ব্রাহ্মণ লেখকরা তাকে শুইয়ে রেখেছে এবং দাবি করেছে যে, সে তার নাভি থেকে এই চার মুখওয়ালা শিশু ব্রহ্মাকে জন্ম দিয়েছে। কোনো মানুষকে, যখন সে অসহায়ভাবে শুয়ে থাকে তখন তাকে আঘাত করে নিজের বীরত্ব প্রমাণ করা কোনোভাবেই মহৎ কাজ হতে পারে না।
ধোণ্ডিবা: বামনের সময়ের আগে আর্যদের কয়টি দল ভারতে এসেছিল?
জ্যোতিরাও: আর্যদের অনেকগুলো দল সমুদ্রপথে ভারতে এসেছিল।
ধোণ্ডিবা: প্রথম দলটি কি যুদ্ধজাহাজে এসেছিল?
জ্যোতিরাও: সেই সময়ে কোনো যুদ্ধজাহাজ ছিল না। তাই তারা ছোটো ছোটো নৌকায় এসেছিল। সেই নৌকাগুলো সমুদ্রের উপর দিয়ে মাছের মতো দ্রুতগতিতে চলত। এজন্যই হয়তো পুরো নাবিক দলের অধিনায়ককে ‘মৎস্য’ বলে ডাকা হতো।
ধোণ্ডিবা: তবে ব্রাহ্মণ ঐতিহাসিকরা তাদের মিথ্যা বইগুলোতে (যেমন ‘ভাগবত’) কেন লিখেছে যে ওই অধিনায়ক একটি মাছের গর্ভে জন্মেছিল?
জ্যোতিরাও: সামান্য চিন্তা করলেই তুমি বুঝতে পারবে যে, মানুষ এবং মাছ তাদের শারীরিক গঠন, খাদ্য, নিদ্রা, যৌন অভ্যাস ও প্রজনন প্রক্রিয়ার দিক থেকে কতটা আলাদা। একইভাবে, তাদের মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড, ফুসফুস, অন্ত্র, জরায়ু ও জননাঙ্গের গঠনও একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানুষ ডাঙ্গায় বাস করে। জলে পড়লে সে সহজেই ডুবে যায় এবং মারা যায়। মাছ একটি জলজ প্রাণী। জল থেকে তুললেই সেটি তৎক্ষণাৎ মারা যায়। একজন নারী সাধারণত একবারে একটি সন্তানের জন্ম দেয়। কিন্তু স্ত্রী মাছ অনেকগুলো ডিম পাড়ে, যা যথাসময়ে ফুটে বাচ্চা বের হয়। স্ত্রী মাছের পক্ষে সমুদ্রের বাইরে এসে ডিম পাড়া বা তা দেওয়া সম্ভব ছিল না, কারণ সে জলের বাইরে বাঁচতে পারত না। ধরা যাক, সে জলেই ডিম ফুটিয়েছিল, তবে মানুষের মতো দেখতে সেই শিশু মাছটি জলের নিচে বেঁচে থাকত কীভাবে? কেউ হয়তো এক নতুন তত্ত্ব দিতে পারেন যে, কোনো দক্ষ ডুবুরি সমুদ্রে ডুব দিয়ে মানুষের ভ্রূণের মতো দেখতে সেই মাছের ভ্রূণটি শনাক্ত করেছিল এবং সেটিকে নিরাপদে ডাঙ্গায় নিয়ে এসেছিল। মানলাম তা-ই হয়েছিল। কিন্তু কোন চতুর ব্যক্তি সেই মাছের ডিম থেকে একটি মানব শিশুর জন্ম দিয়েছিল?
আজকাল ইউরোপ ও আমেরিকায় অনেক নামকরা চিকিৎসক আছেন। আমাদের সন্দেহ আছে যে, তাঁদের কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার একটি নিষিক্ত মাছের ডিম থেকে একটি জীবিত মানুষ বের করে আনার গ্যারান্টি দেবেন কি না। আর কোন চতুর অমর মাছ সেই দক্ষ ডুবুরিকে সমুদ্রের তলদেশে ওই ডিমটির উপস্থিতির কথা জানিয়েছিল? সেই ডুবুরিই বা কীভাবে ওই মৎস্য— দূতের ভাষা বুঝতে পেরেছিল? ব্রাহ্মণদের মিথ্যা বইগুলো পড়ার পরও এমন অনেক সন্দেহ ও প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। তাই আমরা এই সিদ্ধান্তে আসাটাই যুক্তিযুক্ত মনে করি যে, চতুর ব্রাহ্মণরা পরবর্তী সময়ে তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য তাদের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে এই কাল্পনিক কাহিনিটি ঢুকিয়ে দিয়েছে।
ধোণ্ডিবা: মৎস্য দলের সেই অধিনায়ক তার নাবিকদের নিয়ে কোথায় অবতরণ করেছিল?
জ্যোতিরাও: সে পশ্চিম (আরব) সাগর পাড়ি দিয়ে ভারতে এসেছিল এবং পশ্চিম উপকূলের একটি বন্দরে জাহাজ থেকে নেমেছিল।
ধোণ্ডিবা: নামার পর সে কী করেছিল?
জ্যোতিরাও: সে শঙ্খাসুর নামে একজন স্থানীয় প্রধানকে হত্যা করে তাঁর রাজ্য দখল করে। মৎস্য অধিনায়কের মৃত্যু পর্যন্ত সেই রাজ্য আর্যদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। মৎস্য মারা যাওয়ার পর, শঙ্খাসুরের অনুসারী প্রজারা আর্য-বাহিনীর উপর এক ভয়াবহ আক্রমণ চালায়।
ধোণ্ডিবা: তার ফলাফল কী হয়েছিল?
জ্যোতিরাও: আর্য-বাহিনী পরাজিত হয়ে পলায়ন করে। বিজয়ী শঙ্খাসুর- অনুগামীদের হাত থেকে বাঁচতে তারা একটি পাহাড়ের ঢালে ঘন ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকে। ঠিক তখনই ইরান থেকে আর্যদের আরও একটি দল নৌকায় করে পশ্চিম সাগর দিয়ে ওই বন্দরে এসে পৌঁছায়। এই নৌকাগুলো আগের ডিঙিগুলোর চেয়ে কিছুটা বড়ো ছিল এবং জলের উপর কচ্ছপের মতো ভেসে চলত। একারণেই সেই দলের অধিনায়কের ডাকনাম হয়েছিল ‘কচ্ছ’।
ধোণ্ডিবা: গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, মাছ ও কচ্ছপের মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। কিন্তু তাদের জলজ প্রকৃতি, জলে ডিম পাড়া এবং পরবর্তীতে সেখানেই ডিম ফোটানোর অভ্যাসের মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। ‘ভাগবত’-এর মতো বইগুলোতে লেখা আছে যে কচ্ছ একটি কচ্ছপের গর্ভে জন্মেছিল। এই নিয়ে ভেবে মূল্যবান সময় নষ্ট না করাই ভালো, কারণ আগে আলোচিত মাছ ও তাদের ডিম সংক্রান্ত তত্ত্বের মতোই অবাস্তব। আমি এখন জানতে চাই যে, ওই বন্দরে নামার পর কচ্ছ কী করেছিল?
জ্যোতিরাও: যারা মৎস্যের বাহিনীকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল, কচ্ছ সেই সব ক্ষত্রিয়দের তাড়িয়ে দিয়ে নিজের লোকদের মুক্ত করে এবং নিজেকে ‘মর্ত্যের দেবতা’ বা ‘ওই অঞ্চলের রাজা’ হিসেবে ঘোষণা করে আমোদ-প্রমোদে মেতে ওঠে।
ধোণ্ডিবা: কচ্ছের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে ক্ষত্রিয়রা কোথায় গিয়েছিল?
জ্যোতিরাও: ইরান থেকে আর্যদের দ্বিতীয় একটি দল আসার খবর শুনে তারা আতঙ্কিত হয়ে ‘দ্বিজরা এসেছে! দ্বিজরা এসেছে!’ বলে চিৎকার করতে করতে পাহাড় পার হয়ে প্রধান নেতা কশ্যপের শরণাপন্ন হয়। কচ্ছ একটি ছোটো সেনাবাহিনী নিয়ে পাহাড় থেকে নিচে নেমে আসে। সে পাহাড়টিকে নিজের দখলে রেখে কশ্যপের রাজ্যের ক্ষত্রিয়দের উপর ক্রমাগত আক্রমণ চালাতে থাকে, ইরান থেকে আসা নতুন আর্য যোদ্ধারাও তাকে সাহায্য করছিল। কশ্যপ কচ্ছের কাছ থেকে পাহাড়টি পুনরায় দখল করার আপ্রাণ চেষ্টা করে, কিন্তু কচ্ছ তার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। কশ্যপ তার মৃত্যু পর্যন্ত ওই পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়নি, আবার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এক পা পিছিয়েও যায়নি।
ধোণ্ডিবা: কচ্ছের মৃত্যুর পর দ্বিজদের প্রধান কে হয়েছিল?
জ্যোতিরাও: বরাহ।
ধোণ্ডিবা: ভাগবতকারদের মতো ইতিহাসবিদরা লিখেছে যে, বরাহ একটি শূকরের গর্ভে জন্মেছিল। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?
জ্যোতিরাও: আসলে সামান্য চিন্তা করলেই বোঝা যায় যে, মানুষ এবং শূকর একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আমি একটি উদাহরণ দিই— ভাবো তো, সন্তান জন্মের পর মানুষের মা এবং শূকরী তাদের সন্তানদের সাথে কেমন আচরণ করে? মানুষের মা সন্তান জন্মের পরপরই তার যত্ন নিতে শুরু করে এবং তাকে সবরকম ক্ষতি থেকে রক্ষা করে; কিন্তু শূকরী তার প্রথম জন্মানো ছানাটিকে কুকুরের মতো গিলে ফেলে, তারপর বাকি ছানাগুলো প্রসব করে। এটি প্রমাণ করে যে, যে শূকরী বরাহকে জন্ম দিয়েছিল, সে তার প্রথম ছানাটিকে— যেটি শূকর প্রজাতির ছিল— খেয়ে ফেলেছিল, তারপর এই শূকর-মানুষটির জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু ‘ভাগবত’ ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের লেখকরা বরাহকে আদি নারায়ণ বা ঈশ্বরের অবতার হিসেবে গণ্য করে। এটি ঈশ্বরের সর্বব্যাপীতা এবং তাঁর নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচারের বোধের উপর এক বড়ো কলঙ্ক লেপন করে। আমরা অবাক হই যে, আদি নারায়ণের এই অবতার কেন তার শূকরী-মাকে নিজের বড়ো ভাইকে খেয়ে ফেলা থেকে বিরত রাখল না। হায়! পদ্মা নামের ওই শূকরীটিই ছিল আদি নারায়ণের মা! সে কীভাবে শিশুহত্যা করল? শিশুহত্যা মানেই একটি সন্তানের প্রাণ কেড়ে নেওয়া, সে যারই হোক। এখানে আমরা দেখছি পদ্মা নিজের সন্তানকেই খাচ্ছে। পুরো অভিধানে এমন জঘন্য অপরাধের জন্য কোনো উপযুক্ত শব্দ আমরা খুঁজে পাই না। আমাদের তাকে ‘পিশাচী’ ডাকতে ইচ্ছে করে, কিন্তু ‘পিশাচীও নিজের সন্তান খায় না’! এটি অত্যন্ত আশ্চর্যের যে পদ্মার এই ভয়াবহ অপরাধের জন্য কোনো প্রায়শ্চিত্ত বা চরম শাস্তির উল্লেখ বইগুলোতে নেই।
ধোণ্ডিবা: বরাহের শূকরী-মার নাম যদি ‘পদ্মা’ হয়, তবে তার স্বামীরও নিশ্চয়ই কোনো নাম ছিল?
জ্যোতিরাও: হ্যাঁ, তার স্বামীরও একটি নাম ছিল— ব্রহ্মা!
ধোণ্ডিবা: তার মানে প্রাচীনকালের পশুরা নিজেদের ব্রহ্মা, নারদ বা মনু নামে ডাকত! কিন্তু এই মিথ্যাবাদী ইতিহাসবিদরা এসব জানল কীভাবে? দ্বিতীয়ত, শূকরী পদ্মা নিঃসন্দেহে বরাহকে দুধ খাইয়ে বড়ো করেছিল; কিন্তু সে কীভাবে তাকে তার স্বামী ব্রহ্মার সাথে গ্রামের গলিতে ঘুরে বেড়াতে এবং কচি লতাপাতা চিবিয়ে খেতে শিখিয়েছিল? আদি নারায়ণ নিজেই এসবের ব্যাখ্যা দিতে পারেন! কিন্তু তাদের বইগুলোতে এসবের কোনো প্রমাণ মেলে না। যেহেতু কোনো প্রমাণ নেই, তাই আমার সন্দেহ হয় যে, বরাহ একটি শূকরীর গর্ভে জন্মেছিল— এই পুরো বিষয়টিই একগুচ্ছ ডাহা মিথ্যা কথা। এসব লেখার সময় লেখকের কি সামান্যতমও লজ্জা হয়নি?
জ্যোতিরাও: চমৎকার বলেছ! কিন্তু তোমাদের কী হবে? তোমরা তো তাদের ও তাদের সন্তানদের পা ধোয়া জলকে ‘পবিত্র’ মনে করে পান করো! তাহলে বেশি নির্লজ্জ কে? তোমরা নাকি তারা?
ধোণ্ডিবা: ঠিক আছে, ঠিক আছে! কিন্তু আপনার কী মনে হয়, কেন তাকে বরাহ বলা হতো?
জ্যোতিরাও: সম্ভবত তার স্বভাব এবং আচরণ শূকরের মতো কুৎসিত ও বিরক্তিকর ছিল বলে! যেখানেই সে যেত, ধ্বংসলীলা চালাতো। সে শূকরের মতো তেড়ে গিয়ে আক্রমণ করত এবং জয় ছিনিয়ে নিত। সম্ভবত হিরণ্যাক্ষ ও হিরণ্যকশিপুর মতো বীর যোদ্ধাদের অঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষত্রিয়রাই তার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের জন্য এই হাস্যকর ‘বরাহ’ নামটি দিয়েছিল। আর তাতেই সে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হতো। এর প্রতিশোধ নিতেই সে বারবার তাদের রাজ্যে আক্রমণ চালাতো এবং প্রজাদের উত্যক্ত করতো। অবশেষে এমনই এক যুদ্ধে সে হিরণ্যাক্ষকে হত্যা করে। এই ঘটনায় সারা ভারতের ক্ষত্রিয় প্রধানদের মনে ত্রাস সৃষ্টি হয় এবং বেশ কিছুকাল তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। তারপর বরাহ নিজেও একদিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।
ধোণ্ডিবা: বরাহের পর দ্বিজদের প্রধান বা সর্দার কে হয়েছিল?
জ্যোতিরাও: নৃসিংহ।
ধোণ্ডিবা: তার স্বভাব বা মেজাজ কেমন ছিল?
জ্যোতিরাও: নৃসিংহ ছিল লোভী, দুমুখো, বিশ্বাসঘাতক, ধূর্ত, বিপজ্জনক, নিষ্ঠুর ও হৃদয়হীন। তার শারীরিক গঠন ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।
ধোণ্ডিবা: সে কী করেছিল?
জ্যোতিরাও: সে হিরণ্যকশিপুকে হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু করে। সে নিশ্চিত ছিল যে, হিরণ্যকশিপুকে হত্যা না করলে তাঁর রাজ্য দখল করা সম্ভব হবে না। তার এই অসৎ ইচ্ছা পূরণ করার জন্য সে এক দ্বিজ গৃহশিক্ষকের মাধ্যমে হিরণ্যকশিপুর পুত্র প্রহ্লাদের কোমল মনে নিজের ধর্মের মূল নীতিগুলো গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করে। এর ফলে প্রহ্লাদ তার কুলদেবতা ‘হর-হর’-এর পূজা পুরোপুরি অবহেলা করতে শুরু করে।
হিরণ্যকশিপু তখন প্রহ্লাদকে বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেন যাতে সে তার কুলদেবতার উপাসনা করে। কিন্তু কোনো লাভ হয় না, কারণ নৃসিংহ গোপনে প্রহ্লাদের মগজধোলাই করে যাচ্ছিল। নৃসিংহ নাবালক রাজপুত্রের নমনীয় মন নিয়ে খেলা করলো, তাকে কলুষিত করলো এবং কুটিল উপায়ে তাকে নিজের পিতাকে হত্যা করতে প্ররোচিত করলো। কিন্তু রাজপুত্র এই আদেশ পালনে অনিচ্ছুক ছিল। তখন নৃসিংহ এক ভয়ংকর সিংহের ছদ্মবেশ ধরলো; বাঘের মতো উজ্জ্বল রঙ দিয়ে নিজের শরীর রাঙালো, বড়ো বড়ো তীক্ষ্ন দাঁত ও লম্বা দাড়ি লাগালো। নিজের শয়তানি লুকানোর জন্য সে উপরে একটি সুন্দর শাড়ি পরে একজন মার্জিত ও সম্ভ্রান্ত মহিলার বেশ ধরে প্রহ্লাদের সাহায্যে হিরণ্যকশিপুর ঘরে চুপিচুপি প্রবেশ করলো। সেখানে একটি স্তম্ভের পিছনে সে নিজেকে লুকিয়ে রাখলো। সারাদিনের প্রশাসনিক কাজের ব্যস্ততায় ক্লান্ত হয়ে হিরণ্যকশিপু সন্ধ্যায় তাঁর বিশ্রামকক্ষে গিয়ে সবেমাত্র বিছানায় হেলান দিয়েছেন— ঠিক সেই মুহূর্তে ধূর্ত নৃসিংহ স্তম্ভের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে কোমরে শাড়িটি শক্ত করে জড়িয়ে হঠাৎ হিরণ্যকশিপুকে আক্রমণ করলো এবং নিজের বাঘের মতো নখ দিয়ে তাঁর নাড়িভুঁড়ি চিরে ফেললো। হিরণ্যকশিপুকে হত্যার এই পৈশাচিক পরিকল্পনা সফল করে নৃসিংহ তার দ্বিজ অনুসারীদের নিয়ে দ্রুত নিজের দেশে পালিয়ে গেল। ক্ষত্রিয়রা যখন জানতে পারল যে নৃসিংহ প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে হিরণ্যকশিপুকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে, তখন তারা দ্বিজদের ‘বিপ্রিয়’ (অপ্রিয়) বলতে শুরু করল। সেই থেকেই হয়তো তাদের ‘বিপ্র’ বলা শুরু হয়। ক্ষত্রিয়রা নৃসিংহকে অবজ্ঞাসূচক ‘নরসিংহী’ বলতে শুরু করে। পরবর্তীতে হিরণ্যকশিপুর পুত্ররা নৃসিংহের হাতে তাঁদের পিতার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে। হিরণ্যকশিপুর রাজ্য দখল করতে ব্যর্থ হয়ে নৃসিংহ শেষ পর্যন্ত ভগ্নহৃদয়ে মারা যায়।
ধোণ্ডিবা: বিপ্র বা ব্রাহ্মণ ইতিহাসবিদরা অনেক কল্পকাহিনি ফেঁদেছে— যেমন সে একটি স্তম্ভ থেকে আবির্ভূত হয়েছে— যাতে হিরণ্যকশিপুর এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের কলঙ্ক থেকে নৃসিংহের মর্যাদা রক্ষা করা যায়।
জ্যোতিরাও: প্রকৃতপক্ষে তা-ই হয়েছিল। আমরা যদি স্তম্ভ থেকে তার জন্মের কাহিনি বিশ্বাস করি, তবে নিশ্চয়ই কেউ তার নাড়ি কেটেছিল এবং জীবনদায়ী দুধ খাইয়ে পুষ্ট করেছিল। কোনো ধাইমা নিশ্চয়ই তাকে লালনপালন করেছিল। আমরা যে অনুমানই করি না কেন, তা প্রকৃতির নিয়মের পরিপন্থী। গুজব ছড়ানো বিপ্র লেখকরা নৃসিংহকে লম্বা দাড়ি-গোঁফসহ স্তম্ভ থেকে পূর্ণবয়স্ক রূপে আবির্ভূত করেছে, যাতে বাঘের নখ দিয়ে হিরণ্যকশিপুকে হত্যা করা তার জন্য শিশুসুলভ সহজ কাজ মনে হয়। হায়! আদি নারায়ণের অবতার হয়ে রাজা হিরণ্যকশিপুকে হত্যা করা কতই না নীচ কাজ ছিল! অথচ ওই রাজা কেবল তাঁর পুত্র প্রহ্লাদের কোমল মনে প্রকৃত ধর্মের শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তিনি তো কেবল পুত্রের প্রতি পিতার দায়িত্ব পালন করছিলেন। একজন অজ্ঞ ব্যক্তিও এমন কুখ্যাত কাজ করতে দ্বিধা করবে। স্তম্ভ থেকে ঐশ্বরিক অবতার হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর হিরণ্যকশিপুর কাছে তার ঐশ্বরিক পরিচয় অর্থাৎ তিনি যে আদি নারায়ণ, তা প্রমাণ করা উচিত ছিল এবং পিতা-পুত্রের মধ্যে মিলমিশ করে দেওয়া উচিত ছিল। তা না করে সে তাঁকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করল। এটি অত্যন্ত অদ্ভুত! সে যদি হিরণ্যকশিপুকে এভাবে বোঝাতে না পারে, তবে সে কীভাবে মানুষের বুদ্ধিদাতা হিসেবে গণ্য হতে পারে? এই একটি কাজই প্রমাণ করে যে, এই নৃসিংহের বুদ্ধি পুণের সেই তৃতীয় শ্রেণির রক্ষিতার চেয়েও কম ছিল, যে পুণের এক পণ্ডিতকে তার রূপের মোহে আচ্ছন্ন করে সম্পূর্ণ দাসে পরিণত করেছে— যে পণ্ডিত নিজেকে সর্বজ্ঞ (বৃহস্পতি) বলে দাবি করার ধৃষ্টতা দেখায়। বর্তমানে অনেক আমেরিকান এবং ইউরোপীয় মিশনারি অনেক তরুণ ভারতীয়কে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করেছে, কিন্তু তারা এই ধর্মান্তরিতদের কারও পিতাকে হত্যা করার মতো নীচ কাজ করেনি।
ধোণ্ডিবা: নৃসিংহের এই অপমানজনক পরাজয়ের পর বিপ্ররা (ব্রাহ্মণরা) কি প্রহ্লাদের রাজ্য দখলের চেষ্টা করেনি?
জ্যোতিরাও: বিপ্ররা প্রহ্লাদের রাজ্য দখলের অনেক গোপন চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। কারণ প্রহ্লাদ তাদের শয়তানি চাল সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তিনি তাদের মোটেও বিশ্বাস করতেন না। তিনি অন্য সবাইকে আস্থাভাজন করেছিলেন, ন্যায়বিচারের সাথে রাজ্য শাসন করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন। প্রহ্লাদের পরে তাঁর পুত্র বিরোচন উত্তরাধিকারী হন, তিনিও একই রকম ন্যায়নিষ্ঠভাবে রাজ্য পরিচালনা করেন এবং রাজ্যকে আরও শক্তিশালী করেন। তিনি শীঘ্রই মারা যান। বিরোচনের পর উত্তরাধিকারী হন বলী, তিনি ছিলেন একজন পরাক্রমশালী যোদ্ধা। তিনি অনেক করদ রাজ্যকে সন্ত্রাসবাদী ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের হাত থেকে মুক্ত করেন এবং তাঁর রাজ্যকে একটি সুসংগঠিত কাঠামোয় রূপ দেন। এরপর তিনি তাঁর রাজ্যের সীমানা বিস্তার করতে শুরু করেন। তখন বিপ্রদের নেতা বামন সে বিষয়টি মোটেও পছন্দ করেনি। তাই সে গোপনে এক বিশাল বাহিনী গঠন করে এবং রাজ্য জয়ের উদ্দেশ্যে বলীর রাজ্যের সীমানার কাছে গিয়ে উপস্থিত হয়। বামন ছিল অত্যন্ত লোভী, উচ্চাকাঙক্ষী ও উদ্ধত স্বভাবের।
ধোণ্ডিবা: তবে বলীরাজা তখন কী করেছিলেন?
জ্যোতিরাও: তিনি তাঁর অধীনস্থ সকল প্রাদেশিক শাসনকর্তা ও উচ্চপদস্থ রাজন্যবর্গদের কাছে দ্রুতগামী দূত পাঠালেন এবং এই বিপদের সময়ে তাদের নিজ নিজ সেনাবাহিনী নিয়ে অবিলম্বে সাহায্যের জন্য আসার নির্দেশ দিলেন।
ধোণ্ডিবা: বলীর রাজ্য কতটা বিস্তৃত ছিল?
জ্যোতিরাও: বলীর রাজ্য ছিল বিশাল। ধারণা করা হয় যে, সিংহলের আশপাশের কিছু দ্বীপও (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল, কারণ সেখানকার একটি দ্বীপের নাম আজও ‘বালি’ (ইন্দোনেশিয়া)। তাঁর রাজ্যের মধ্যে কোলাপুরের পশ্চিমে কোঙ্কণ ও মাওয়াল অঞ্চলও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ‘জ্যোতিবা’ ছিলেন সেই অঞ্চলের প্রধান। তাঁর সদর দপ্তর ছিল কোলাপুর থেকে আট মাইল উত্তর-পশ্চিমে ওয়াড়ি রত্নগিরি নামক পাহাড়ে। তিনি দক্ষিণে মহারাষ্ট্রও শাসন করতেন। এই অঞ্চলের অধিবাসীদের বলা হতো ‘মহারাষ্ট্রীয়’, যার অপভ্রংশ রূপ হলো ‘মারাঠা’। তিনি এই বিশাল রাজ্যকে নয়টি বিভাগে (খণ্ড) ভাগ করেছিলেন। প্রতিটি বিভাগের প্রধানকে বলা হতো ‘খণ্ডোবা’। তাঁদের সহায়তায় থাকতেন এক বা দুইজন প্রধানমন্ত্রী। প্রত্যেক খণ্ডোবা একদল শক্তিশালী কুস্তিগীর পুষতেন, একারণে তাঁর আরেক নাম ছিল ‘মল্লু খাঁ’। জেজুরির খণ্ডোবা ছিলেন তাঁদের একজন। তিনি প্রতিবেশী সামন্তদের বিদ্রোহী মল্লদের দমন করতেন বলে তাঁকে ‘মল্ল— অরি’ অর্থাৎ মল্লদের শত্রু বলা হতো, যার অপভ্রংশ হলো ‘মলহারি’। তিনি যুদ্ধের নিয়ম কঠোরভাবে পালন করতেন, যেমন পলায়নরত শত্রুর পিঠে আঘাত না করে সর্বদা সামনে বা মুখে আঘাত করতেন। তাই তিনি ‘মার্তণ্ড’ (মারাঠি ‘মার-তোণ্ড’ বা মুখে আঘাত করা থেকে আসা) নামে পরিচিত হন। তিনি ছিলেন আর্তের বন্ধু এবং সংগীতপ্রেমী। তিনি ‘মলহার’ নামক একটি রাগ সৃষ্টি করেছিলেন। পরবর্তীতে মিঞা তানসেন এই মলহারের আদলে ‘মিঞা কি মলহার’ তৈরি করেন। বলীরাজা তাঁর বিশাল রাজ্যের রাজস্ব এবং বিচার বিভাগ দেখাশোনার জন্য যথাক্রমে ‘মহা-সুভা’ ও ‘প্রধান বিচারপতি’ নামক দুইজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন।
তাঁদের অধীনে অনেক অধস্তন কর্মচারী ছিল। ‘মহা-সুভা’ শব্দের অপভ্রংশ হলো ‘মহসোবা’। এই মহা-সুভারা ফসলের জরিপ করতেন এবং কৃষকদের প্রয়োজনমতো ছাড় দিয়ে তাদের সন্তুষ্ট রাখতেন। একারণেই আজও মারাঠা কৃষকরা তাদের খেতের এক কোণে মহসোবার পাথরের মূর্তিতে সিঁদুর মাখিয়ে পূজা করে এবং ধূপ জ্বালায়। ফসল বোনা বা কাটার আগে তাঁর আশীর্বাদ নেওয়া তাদের চিরন্তন প্রথা। বলীরাজার এই ‘সুভা’ বা প্রশাসনিক বিভাগ বণ্টন করার পদ্ধতিটি সম্ভবত পরবর্তীকালে মুসলিম শাসকরাও অনুসরণ করেছিলেন। নথিপত্র থেকে জানা যায় যে কেবল মুসলিম নয়, মিশরীয় পণ্ডিতরাও বলীরাজার রাজ্যে পড়াশোনা করতে আসতেন।
অযোধ্যা ও কাশীর কিছু অংশও বলীরাজার দশম খণ্ডের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেখানকার শাসক ছিলেন ‘ভৈরোবা’ (কাল-ভৈরব)। তিনি সংগীতে এতটাই দক্ষ ছিলেন যে ‘ভৈরব’ রাগ আবিষ্কার করেন। তিনি ‘ডৌর’ নামক একটি বাদ্যযন্ত্র তৈরি করেন যার সুর মৃদঙ্গ বা তবলার চেয়েও মধুর ছিল। দুর্ভাগ্যবশত এটি তেমন প্রচার পায়নি। ভৈরোবার ভক্তদের বলা হতো ‘ভৈরওয়াড়ি’ (বর্তমানে ‘ভরাড়ি’)। বলীরাজার রাজ্য দশরথের পিতা অজপাল বা সমসাময়িক অন্য যেকোনো রাজার চেয়ে বড়ো ছিল। সাতজন সামন্তরাজা তাঁকে নিয়মিত কর দিত, তাদের ‘সাত আশ্রিত’ বলা হতো। মারাঠিতে একটি প্রবাদ আছে— ‘বলী তো কান পিড়ি’ (যার জোর বেশি, সেই কান মলে দেয়— অর্থাৎ বীরেরই জয় হয়)। বলীরাজা যখন তাঁর বীরদের কোনো কঠিন মিশনে পাঠাতেন, তখন সভায় নারকেল, পান-সুপারি ও হলুদ গুঁড়ো (ভাণ্ডারা) রাখা হতো। তিনি বলতেন, ‘কার সাহস আছে এই বিপজ্জনক কাজ করার, সে এসে এই ‘বিড়া’ (পান-সুপারি) তুলে নিক।’ তখন সাহসী বীররা সামনে এসে ‘হর হর মহাদেব’ রবে আকাশ কাঁপিয়ে কপালে ভাণ্ডারা মেখে নারকেল ও বিড়া মাথায় ঠেকিয়ে উত্তরীয়তে সযত্নে বেঁধে নিতেন।২
খুব সম্ভবত ‘হুররে’ শব্দটি যুদ্ধকালীন রণধ্বনি ‘হর-হর’-এর একটি পরিবর্তিত রূপ। ইংরেজদের মধ্যে একটি প্রাচীন প্রথা রয়েছে যে, তারা খেলাধুলা বা যুদ্ধের ময়দানে গভীর আনন্দ প্রকাশ করতে ‘হুররে! হুররে!!’ ধ্বনি ব্যবহার করে। তাদের সেনাপতিরা ‘হুররে! হুররে!’ মন্ত্রে উজ্জীবিত করে সৈন্যদের শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে উৎসাহিত করে। তাদের সেই রণধ্বনিটি বেশ পরিচিত— ‘হুররে ছেলেরা! হয় ঘোড়া জেতো, নয়তো জিন হারাবে!’ অর্থাৎ, হয় জয়ী হও, নয়তো সব হারিয়ে নিঃস্ব হও!”
সেই সাহসী রাজন্যবর্গ তখন তাঁদের অধিপতি— বলীরাজার আশীর্বাদ প্রার্থনা করতেন, ছাউনি গুটিয়ে নিতেন এবং তাঁদের বাহিনীকে শত্রুর উপর প্রবল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দিতেন। শত্রুকে আক্রমণের প্রস্তুতির এই যে শিবির বা ছাউনি গুটিয়ে নেওয়া, তা থেকেই সম্ভবত ‘ছাউনি তোলো এবং শত্রুকে আক্রমণ করো’— এই অভিব্যক্তির উৎপত্তি হয়েছে। বলীরাজার বিখ্যাত সেনাপ্রধানগণ— ভৈরোবা, জ্যোতিবা ও নয়জন খণ্ডোবা তাঁদের জনহিতকর শাসনের মাধ্যমে প্রজাদের সন্তুষ্ট রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। এই কারণেই, যে কোনো পবিত্র বা শুভ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘পবিত্র থালা’ (যাতে নারকেল, পান ও সুপারি থাকে) তুলে ধরার একটি রীতি মারাঠাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। এই আচারটি পালনের সময় মারাঠাদের নিয়ম ছিল পবিত্র থালাটি তোলার আগে প্রধান সেনাপতি বা উপাস্য দেবতা হিসেবে ভৈরোবা, জ্যোতিবা কিংবা খণ্ডোবার নাম স্মরণ করা। তাদের সেই আবাহনগুলো ছিল অনেকটা এরকম— ‘হর হর মহাদেব! ভৈরোবার জয় হোক! বা জ্যোতিবার জয় হোক!’ আক্ষরিক অর্থে, ‘ভৈরোবা বা জ্যোতিবা আমাদের সমৃদ্ধ করুন!!’। ‘চাঙ্গো ভালো’ হচ্ছে একটি সিন্ধি অভিব্যক্তি যার অর্থ ‘তোমার মঙ্গল হোক’। ‘সদানন্দ (শিব) বিজয়ী হোন এবং মল্লুখান জয়যুক্ত হোন’। বলীরাজা তাঁর প্রজাদের নিয়ে রবিবারকে একটি পবিত্র দিন হিসেবে পালন করতেন, কারণ দিনটি ছিল দেবতা মহাদেবের (শঙ্কর) উদ্দেশে নিবেদিত। এই কারণেই বর্তমান যুগের মারাঠারা— যাদের মধ্যে রয়েছে মাহার, মাং, কৃষক (কুনবি) ও মালি সম্প্রদায়— স্নান সেরে পবিত্র অর্ঘ্য নিবেদনের মাধ্যমে, সামান্য শুকনো রুটি দিয়ে হলেও তাঁদের কুলদেবতা ভগবান শঙ্করের পূজা করে। এই পবিত্র আচার সম্পন্ন করার আগে তারা এক ফোঁটা জলও খায় না।
ধোণ্ডিবা: বলীরাজার সীমানায় সসৈন্যে পৌঁছে বামন কী করল?
জ্যোতিরাও: বামন তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে বলীরাজার রাজ্যে প্রবেশ করে প্রজাদের নানাভাবে নির্যাতন করে এবং তাঁর রাজধানীর কাছে পৌঁছে যায়। ফলে, বলীরাজার অনুগত সামন্ত রাজাদের সৈন্যরা মূল বাহিনীর সাথে যোগ দেওয়ার আগেই, তিনি তাঁর সীমিত ব্যক্তিগত সেনাবাহিনী নিয়ে বামনের সাথে যুদ্ধের মোকাবিলা করতে বাধ্য হন। ভাদ্রমাসের দ্বিতীয় পক্ষ জুড়ে বলীরাজার সৈন্যরা প্রতিদিন বামনের সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করত, সূর্যাস্তের সময় যুদ্ধ বন্ধ রেখে প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও শক্তি সঞ্চয়ের জন্য রাতে শিবিরে ফিরে আসত। তাই, উভয় পক্ষের সৈন্যরা কোন দিনগুলোতে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল, তা মনে রাখা সহজ ছিল, অর্থাৎ ভাদ্রমাসের সেই দ্বিতীয় পক্ষ। সম্ভবত এটিই হলো সেই পাক্ষিক সময়ে যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুবরণকারী বীর সৈন্যদের উদ্দেশে বর্তমানে প্রচলিত সাধারণ বা সম্মিলিত মৃত্যুবার্ষিকী পালনের যৌক্তিক ভিত্তি। এই প্রথাটিই ‘পক্ষ’ বা ‘মহাল পক্ষ’ (মহালয়া বা পিতৃপক্ষ) নামে পরিচিত।
আশ্বিন মাসের প্রথম আট দিন বামনের সাথে যুদ্ধে বলীরাজা এতটাই গভীরভাবে মগ্ন ছিলেন যে, রাতের বিশ্রামের জন্যও তিনি তাঁর প্রাসাদে ফিরতে পারেননি। তাঁর রানি বিন্ধ্যাবতী তাঁর খোঁজা পরিচারক এবং অন্যান্য সেবকদের একটি গর্ত খনন করে তাতে জ্বালানি কাঠ মজুত করার নির্দেশ দেন। রানি সেই গর্তের পাশে একটি জলপূর্ণ মাটির কলস রেখে টানা আটদিন আটরাত অন্নজল ত্যাগ করে পাশে বসে সারাক্ষণ দুষ্ট বামনের বিরুদ্ধে তাঁর স্বামী বলীরাজার বিজয় কামনায় ভগবান শিবের কাছে একাগ্রচিত্তে প্রার্থনা করতে থাকেন। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টম দিনে বলীরাজার পরাজয় ও মৃত্যুর মর্মান্তিক সংবাদ তাঁর কাছে পৌঁছায়। এই সংবাদ শুনে শোকবিহ্বলা রানি গর্তের সেই জ্বালানি কাঠে আগুন ধরিয়ে দেন এবং জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নেন। সম্ভবত এটিই ছিল ‘সতীদাহ’ প্রথার সূচনা। যখন রানির ব্যক্তিগত অনুচর ও সেবিকারা তাদের রানিকে আগুনে ভস্মীভূত হতে দেখে, তখন তারা শোকের আতিশয্যে নিজেদের বস্ত্র ছিঁড়ে আগুনে পুড়িয়ে দেয় এবং বুক চাপড়ে তাদের প্রিয় বিদেহী রানির জন্য সেই কুণ্ডের চারপাশে দীর্ঘক্ষণ উচ্চস্বরে বিলাপ করতে থাকে— ‘হে দয়াময়ী রানি, আপনার গুণাবলি এবং খ্যাতি এই পৃথিবীতে চিরকাল প্রতিধ্বনিত হবে।’ পরবর্তীতে নিষ্ঠুর ব্রাহ্মণ ও অন্যরা এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার গর্তটিকে একটি ‘যজ্ঞকুণ্ডে’ রূপান্তরিত করে দেয়, যাতে এই করুণ ঘটনাটি দীর্ঘকাল মানুষের মনে না থাকে। তারা সম্ভবত তাদের মিথ্যা ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে এই ঘটনা সম্পর্কে অনেক কাল্পনিক কাহিনীও লিখে রেখেছিল।
আশ্বিন মাসের দশম রাত্রিতে (বিজয়াদশমী) বাণাসুরের সেনাবাহিনীর বেঁচে যাওয়া সৈন্যরা যখন ঘরে ফিরল, তখন তাদের নারীরা অন্তরে বিশ্বাস করত যে— পৃথিবীতে শান্তি ও সমৃদ্ধির এক স্বর্গীয় শাসন ফিরিয়ে আনতে দ্বিতীয় বলীরাজার আবির্ভাব নিশ্চিত। তারা তাদের দরজায় দাঁড়িয়ে মাঙ্গলিক প্রথা অনুযায়ী পুরুষদের বরণ করে নিত; তাদের সমৃদ্ধি কামনায় মুখের সামনে দুটি প্রদীপযুক্ত থালা ঘুরিয়ে আরতি করতো এবং এই শব্দগুলো উচ্চারণ করতো— ‘অশুভ দ্বিজ-বামনের শাসন দূর হোক, বলীরাজার রাজ্য ফিরে আসুক!’ বলীরাজার প্রজাদের মধ্যে এই প্রথাটি শত শত বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে আসছে। বলীরাজ্যের ক্ষত্রিয় রমণীরা আশ্বিনের দশম রাতে (দশেরা) তাদের স্বামী ও পুত্রদের মাথার চারদিকে মাঙ্গলিক প্রদীপ ঘুরিয়ে আরতি করে এবং দ্বিতীয় বলীরাজার রাজ্যের আগমনের জন্য ঈশ্বরের কাছে আকুল প্রার্থনা জানায়— বলীরাজার রাজ্য ফিরে আসুক! এটি আমাদের দ্বিতীয় বলীরাজার মহানুভবতা সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। ধন্য সেই বলীরাজা এবং ধন্য তাঁর প্রজাদের এই আনুগত্য! এর বিপরীতে বর্তমানের গোঁড়া হিন্দুদের (ব্রাহ্মণদের) প্রথার কথা ভাবুন, যারা মহারানি ভিক্টোরিয়ার জন্মদিনে তাঁর অতিশয় প্রশংসা করে এবং তাঁর দীর্ঘস্থায়ী সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করে। তাদের এই আনুগত্য প্রদর্শনের পিছনে সবসময় এই গোপন প্রত্যাশা থাকে যে— এই চাটুকারিতার মাধ্যমে তারা সাম্রাজ্যবাদী রাজকীয় টেবিল থেকে উপযুক্ত চাকরি, পদোন্নতি বা খেতাবের মতো কিছু উচ্ছিষ্ট লাভ করতে পারবে; অথচ তারা তাদের ব্যক্তিগত আলোচনা এবং সংবাদপত্রের নিবন্ধে এই ‘দেখানো’ আনুগত্যের সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলে।
ধোণ্ডিবা: বলীরাজার আদেশে তাঁর রাজন্যবর্গ কি তাঁর উদ্ধারে এগিয়ে আসেননি?
জ্যোতিরাও: হ্যাঁ, তাঁরা এসেছিলেন। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্দশ দিনে যখন তাঁর রাজন্যবর্গ ও তাঁদের অধীনস্থ শাসনকর্তারা সসৈন্যে বাণাসুরের বাহিনীর সাথে যোগ দেয়, তখন বলীরাজ্যের বিপ্ররা (ব্রাহ্মণরা) ভীত হয়ে প্রাণভয়ে বামনের কাছে আশ্রয় নিতে পালিয়ে যায়। পরিস্থিতির এই পরিবর্তনে বামন এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে যে, সে তার সমস্ত ‘বিপ্র’ ভাইদের একত্রিত করে বাণাসুরের সৈন্যদের হাত থেকে কীভাবে নিজেদের রক্ষা করা যায়, তা নিয়ে পরামর্শ করতে থাকে। বামন তার নিজের সাফল্যের জন্য আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা রাতে সারারাত জেগে তার কুলদেবতার আরাধনা বা তুষ্টিসাধন করতে শুরু করে। এরপর সে তার সমস্ত সৈন্য ও তাদের নারীদের একত্রিত করে নিজের রাজ্যের সীমানায় নিয়ে যায় এবং বাণাসুরের সৈন্যদের জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে থাকে। কেউ কেউ এই রাতটিকে ‘কুজাগরী’ বা ‘কোজাগরী’ পূর্ণিমা বলে থাকেন।
ধোণ্ডিবা: বাণাসুর তখন কী করলেন?
জ্যোতিরাও: বাণাসুর বামনকে হঠাৎ আক্রমণ করে পরাজিত করে তার সমস্ত ধনসম্পদ লুটে নেন। তিনি বামনের বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে হিমালয়ের দিকে তাড়িয়ে দেন। এরপর তিনি হিমালয়ের পাদদেশে শিবির স্থাপন করে তাদের খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দিলেন, ফলে বামনের অধিকাংশ সৈন্য অনাহারে মারা যায়। এভাবেই বামনের রাজত্বের অবসান ঘটে, অর্থাৎ বামন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। বাণাসুরের অনুসারীরা এই ঘটনায় অত্যন্ত আনন্দিত হয়। তারা বামনকে একটি বিশাল ‘উপাধি’ (মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি) মনে করত, যা বামনের মৃত্যুর সাথে সাথেই দূর হয়ে যায়। সেই থেকেই ব্রাহ্মণরা ‘উপাধ্যায়’ নামে পরিচিত হতে শুরু করে। উপাধ্যায়রা যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের মৃতদেহগুলো সংগ্রহ করে একটি বিশাল সম্মিলিত চিতায় দাহ করে, যা ‘হোলি’ নামে পরিচিত হয়। মনে হয়, তাদের মধ্যে মৃতদেহ দাহ করার এক প্রাচীন প্রথা ছিল।
একইভাবে, বাণাসুর ও তাঁর সমস্ত ক্ষত্রিয় সৈন্যরা ফালগুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের প্রথম দিনে বীরদের পোশাক পরিধান করেন এবং উন্মুক্ত তলোয়ার প্রদর্শন করে তাঁদের সহযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের স্মৃতি উদযাপন করেন। ক্ষত্রিয়দের মধ্যে মৃতদেহ সমাহিত করার এক প্রাচীন প্রথা প্রচলিত ছিল।
যুদ্ধক্ষেত্রে বলীরাজার মৃত্যুর পর, তাঁর অনুচর বাণাসুর পুরো একদিন বামনের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড যুদ্ধ চালিয়েছিলেন; কিন্তু আশ্বিন মাসের নবম দিনে (মহানবমী) তিনি তাঁর অবশিষ্ট সৈন্যবাহিনী নিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হন। এই বিজয়ে বামন এতটাই উল্লসিত ও মদমত্ত হয়ে পড়েছিল যে, বলীরাজার রাজধানীতে তখন কোনো পুরুষ সৈন্য অবশিষ্ট নেই বুঝতে পেরে সে আশ্বিনের দশম দিনে (বিজয়াদশমী) তার বিজয়ী বাহিনী নিয়ে সেই শহরে প্রবেশ করে এবং শহরের সমস্ত স্বর্ণ লুটে নেয়। বর্তমানে আশ্বিন মাসের দশম দিনে শমীবৃক্ষের পাতা (স্বর্ণপত্র হিসেবে) ছিঁড়ে প্রতিবেশী ও পরিচিতদের মধ্যে বিনিময় করার যে প্রথা— যা ‘দশেরার সোনা’ বিতরণ নামে পরিচিত— তার উৎপত্তি সম্ভবত এই লুটপাটের ঘটনা থেকেই।৩ এরপর বামন তার নিজস্ব অঞ্চলে ফিরে যায়।
বামন যখন তার নিজ বাসভবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছিল, তখন তার স্ত্রী আটার মণ্ড দিয়ে পরিহাসচ্ছলে বলীরাজার একটি মূর্তি তৈরি করেছিল এবং সেটি ঘরের চৌকাঠে রেখে বামনকে বলেছিল, ‘দেখুন স্বামী, আপনার শত্রু বলী আপনার সাথে যুদ্ধ করতে আবারও এখানে চলে এসেছে।’ বামন অত্যন্ত অবজ্ঞার সাথে বলীর সেই আটার মূর্তিকে লাথি মেরে ঘরে প্রবেশ করে। বিপ্র (ব্রাহ্মণ) নারীদের মধ্যে এই প্রথা আজও প্রচলিত রয়েছে। আশ্বিন মাসের দশম দিনে, যা দশেরা বা বিজয়াদশমী নামে পরিচিত, বিপ্র মহিলারা চাল বা আটার মণ্ড দিয়ে বলীর একটি মূর্তি তৈরি করে এবং বলীর বুকের উপর পা রাখে। এরপর তারা শমীবৃক্ষের একটি কচি ডাল দিয়ে তার পেট বিদ্ধ করে তারপর ঘরে প্রবেশ করে। অনেক ব্রাহ্মণ পরিবারের মধ্যেই এই আচারটি দেখতে পাওয়া যায়।
বাণাসুর তাঁর কিছু সৈন্যকে হিমালয়ের পাদদেশে মোতায়েন করলেন যাতে সেখানে অবরুদ্ধ বামন ও তার অনুসারী সৈন্যদের উপর নজর রাখা যায়। এরপর তিনি তাঁর প্রধান সেনাপতিদের নিয়ে রাজধানীতে ফিরে আসেন। তাঁদের বিজয় উপলক্ষ্যে আয়োজিত উৎসবের বর্ণনা দিতে গেলে তা অনেক দীর্ঘ হবে, তাই সংক্ষেপে বলছি— তিনি শত্রুপক্ষ থেকে প্রাপ্ত সমস্ত ধনসম্পদ ও যুদ্ধলব্ধ দ্রব্যের একটি নিখুঁত তালিকা তৈরি করে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে সেগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে পূজা করলেন। আশ্বিন মাসের চতুর্দশী এবং অমাবস্যার রাতে তিনি বিজয় উদযাপনের জন্য তাঁর সমস্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য এক বিশাল ভোজসভার আয়োজন করলেন। কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের প্রথম দিনে— ‘বলী প্রতিপদ’ বা নববর্ষ হিসেবে পরিচিত— তিনি তাঁর কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা অনুযায়ী প্রচুর অর্থ ও উপহার প্রদান করলেন এবং তাঁদের নিজ নিজ জেলায় ফিরে গিয়ে দায়িত্বভার গ্রহণ করার নির্দেশ দিলেন। এই শুভ ঘটনায় সমস্ত নারীসমাজ এতটাই আনন্দিত হয়েছিল যে, তারা তাদের ভাইদের জন্য ভোজের আয়োজন করলো; তারা প্রদীপযুক্ত পবিত্র থালা তাদের ভাইদের মুখের সামনে ঘুরিয়ে আরতি করলো এবং এই পবিত্র মন্ত্র উচ্চারণ করলো— ‘সকল অশুভ দূরে যাক, বলীরাজার রাজত্ব ফিরে আসুক!’ এভাবেই বোনেরা তাদের ভাইদের দ্বিতীয় বলীরাজার আগমনের শুভ বার্তার কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত আমরা দেখতে পাই যে, ক্ষত্রিয়-কন্যারা কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয় দিনে— যা জনপ্রিয়ভাবে ‘ভাউ বিজ’ বা ভাইফোঁটা নামে পরিচিত) তাদের ভাইদের এভাবে সম্মান জানায় এবং বলীরাজার রাজ্যের প্রত্যাশায় তাদের আশীর্বাদ করে। এই ধরনের কোনো প্রথা উপাধ্যায়দের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না।
ধোণ্ডিবা: তাহলে আমাদের বলা হয় যে, আদি নারায়ণ বামন হিসেবে অবতার গ্রহণ করেছিল এবং একজন বামন ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে বলীরাজাকে নির্বাসিত করতে গিয়েছিল; সে বলীরাজার কাছে মাত্র তিন পা ভূমি দান চেয়ে তাঁকে প্রতারিত করেছিল। এরপর সে তার সেই ক্ষুদ্র ভিক্ষুক রূপ ত্যাগ করে এক বিশাল দানবীয় রূপ ধারণ করে প্রথম দুই পদক্ষেপে সমগ্র পৃথিবী ও আকাশমণ্ডল আবৃত করে ফেলে। তখন সে বলীরাজার কাছে প্রশ্ন রাখে যে, তার তৃতীয় পদক্ষেপটি সে কোথায় রাখবে? পরম দাতা বলীরাজা তখন সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়লেও, সেই বিশালকায় রূপকে তাঁর নিজের মাথার উপর তৃতীয় পদক্ষেপটি রাখার অনুমতি দেন। এই সুযোগে সেই উল্লসিত ও দুষ্ট দানবীয় রূপটি বলীরাজার মাথার উপর পা রেখে তাঁকে পাতালপুরীতে নির্বাসিত করে। এভাবেই সেই চাতুর্যপূর্ণ পরিকল্পনা সফল হয়েছিল। এই সমস্ত কাল্পনিক কথা ব্রাহ্মণরা তাদের ‘ভাগবত’-এর মতো সব সাজানো ধর্মগ্রন্থে লিখে রেখেছে। আপনার বর্ণনা চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করে যে, এই সমস্তই নিছক গাঁজাখুরি গল্প এবং আজেবাজে কথা। তো, এই পুরো বিষয়টি নিয়ে এখন আপনার কী বলার আছে?
জ্যোতিরাও: এখন একটু ভেবে দেখো— সেই দানবীয় রূপ যখন তার প্রথম দুই পদক্ষেপে সমগ্র পৃথিবী ও আকাশমণ্ডল আবৃত করে ফেলল, তখন তো এটা ধরে নেওয়াই যুক্তিযুক্ত যে— তার সেই প্রথম পদতলে আস্ত সব গ্রাম পিষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা। বলীরাজা কীভাবে অক্ষত অবস্থায় বেঁচে গেলেন, তা আমাদের কাছে এক রহস্য। সেখানে তো আর এমনটা বলা নেই যে, বলীরাজাকে আলতো করে তুলে নিয়ে সেই দানবের পায়ের উপর রাখা হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, সেই বিশালকার রূপ যখন তার দ্বিতীয় পদক্ষেপটি আকাশে (স্বর্গে) রাখে, তখন তো বহু নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি (ছায়াপথ) একে অপরের সাথে ধাক্কা খেয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাওয়ার কথা। তৃতীয়ত, সে যদি তার দ্বিতীয় পদক্ষেপ দিয়ে পুরো আকাশ দখল করে নিত, তবে তার শরীরের বাকি অংশ (ধড়) কোথায় ছিল? একজন মানুষ বড়োজোর তার নাভি পর্যন্ত পা তুলতে পারে। সুতরাং তার ধড় তো আকাশের চূড়ান্ত সীমানায় পৌঁছে যাওয়ার কথা। সে চাইলে তার নিজের মাথার উপর পা রেখেও (তিন পা ভূমির) সেই চুক্তি পূরণ করতে পারত। কিন্তু তা না করে সে বলীরাজার মাথার উপর পা রাখল (যা এক চরম বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজ!) এবং তাঁকে পিষে পাতালপুরীতে পাঠিয়ে দিল। তুমি এর ব্যাখ্যা কীভাবে দেবে?
ধোণ্ডিবা: সেই বিশালকায় রূপ নিজেকে আদি নারায়ণের অবতার বলে দাবি করেছিল। তার এত বড়ো সাহস যে, সে এমন জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতায় লিপ্ত হলো? সেইসব ভট লেখকদের ধিক্কার জানাই, যারা এই মিথ্যা ধর্মগ্রন্থগুলো রচনা করেছে এবং এই দানবকে আদিনারায়ণের অবতার বলে অভিহিত করেছে! তাদের নিজেদের রচনাই প্রমাণ করে যে— বামন ছিল নীচ, ধূর্ত, বিশ্বাসঘাতক ও অকৃতজ্ঞ; কারণ সে তার পরম উপকারকারীকেই পাতালপুরীতে নিক্ষেপ করে দণ্ড দিয়েছিল।
জ্যোতিরাও: চতুর্থত, সেই দানবীয় রূপের মস্তক যখন আকাশ ফুঁড়ে একেবারে স্বর্গলোকে পৌঁছে গিয়েছিল, তখন তো তার সেখান থেকেই চিৎকার করে বলীরাজাকে জিজ্ঞেস করার কথা— ‘যেহেতু আমার দুই পদক্ষেপে পৃথিবী ও আকাশ পূর্ণ হয়ে গেছে, এখন আমি আমার তৃতীয় পদক্ষেপটি কোথায় রাখব?’ (যাতে তার সেই মূল প্রতারণামূলক চুক্তিটি সম্পন্ন হয়)। আকাশের সেই দানবীয় মুখমণ্ডল এবং মাটির পৃথিবীর বলীরাজার মধ্যে তখন এক বিশাল দূরত্ব তৈরি হওয়ার কথা। এটা কীভাবে সম্ভব যে, একজন রুশ, ফরাসি, ইংরেজ বা আমেরিকানও তাদের এই কথোপকথনের একটি শব্দও শুনতে পায়নি? তাছাড়া, বলা হয়ে থাকে যে বলীরাজা বামনকে তাঁর পৃথিবীতে থাকা মাথার উপর তৃতীয় পদক্ষেপটি রাখতে বলেছিলেন। বামন সেই উত্তর শুনলই বা কী করে? কারণ বলীরাজা তো আর বামনের মতো এমন কোনো অলৌকিক অতিপ্রাকৃত সত্তায় রূপান্তরিত হননি। পঞ্চমত, সেই দানবীয় রূপের বিশাল ভারে পৃথিবী কেন পাতালপুরীতে দেবে গেল না? এই পুরো ব্যাপারটিই অত্যন্ত অদ্ভুত!
ধোণ্ডিবা: এটি একটি অলৌকিক ঘটনা যে, আমরা আজকের এই জাগতিক ঘটনাগুলো দেখার জন্য বেঁচে আছি। কিন্তু সেই বিশাল দানবীয় সত্তাটি কী খেয়ে বেঁচে ছিল? তার মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার জন্য চারজন কাঁধ দেওয়ার মতো মানুষ (শববাহক) কোথায় পাওয়া গিয়েছিল? তার সেই বিশাল দেহ দাহ করার জন্য এত বিপুল পরিমাণ কাঠ বা ঘুঁটে তারা কোত্থেকে সংগ্রহ করেছিল? যদি তার দাহ করার জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি কাঠ না পাওয়া গিয়ে থাকে, তবে হয়তো বেওয়ারিশ কুকুর আর শেয়ালেরাই তার সেই মৃতদেহ ভক্ষণ করেছিল। যেহেতু আমাদের মনে উদয় হওয়া এই সব সন্দেহের কোনো সন্তোষজনক সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না, তাই আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য যে, আমাদের সকলকে প্রতারিত করার জন্য এই মূল কল্পকাহিনীগুলোই ছিল পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণদের রচিত সেই মিথ্যা ধর্মগ্রন্থগুলোর ভিত্তি।
জ্যোতিরাও: ধোণ্ডিবা, তুমি যদি ‘ভাগবত’ মনোযোগ দিয়ে পড়ো, তবে তুমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে যে, ঈশপের ‘উপকথা’গুলো (Aesop's Fables) ব্রাহ্মণদের ‘ভাগবত'-এর চেয়ে অনেক বেশি উন্নত এবং বিশ্বাসযোগ্য।
ধোণ্ডিবা: বামনের মৃত্যুর পর উপাধ্যায়দের নেতৃত্ব কে গ্রহণ করেছিল?
জ্যোতিরাও: উচ্চবর্গের কোনো কর্মকর্তাকে সেই পদে নিযুক্ত করা তখন সুবিধাজনক ছিল না। তাই বামনের একজন দক্ষ কেরানি— ব্রহ্মা, নিজে থেকেই প্রশাসনের দায়িত্বভার গ্রহণ করে। সে ছিল অত্যন্ত ধূর্ত এবং পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে নিজের রূপ বদলাতে পারত। সে এতটাই অবিশ্বাস্য বা অবিশ্বস্ত ছিল যে, তাকে ‘চতুরানন’ বা ‘চারমুখো ব্রহ্মা’ বলা হতো। সংক্ষেপে বলতে গেলে, সে স্বভাবগতভাবে অত্যন্ত পরিশ্রমী, জেদি, চতুর, দুঃসাহসী ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির মানুষ ছিল।
ধোণ্ডিবা: ব্রহ্মার প্রথম কাজ কী ছিল?
জ্যোতিরাও: প্রথমে সে তালপাতার ওপর নখ দিয়ে অক্ষর খোদাই করার শিল্প উদ্ভাবন করে; নিজের জানা কিছু আদি ইরানি জাদুমন্ত্রের সাথে তৎকালীন প্রচলিত অদ্ভুত সব কাল্পনিক কাহিনী অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মিশ্রিত করে। তারপর সেই সময়ের মানুষের ব্যবহৃত ভাষায় সেগুলো নখকে কলম হিসেবে ব্যবহার করে তালপাতায় খোদাই করে— যাকে ‘সর্ব-কৃত’ বলা হতো, পরবর্তীতে যা বিকৃত হয়ে ‘সংস্কৃত’ নাম পায়। সে ফারসি কবিতার মতো ছোটো ছোটো পদ্য রচনা করে সেগুলোর সারমর্ম ওই তালপাতায় খোদাই করে রাখে।
তার অনুসারীদের কাছে এই রচনাগুলো অত্যন্ত পূজনীয় হয়ে ওঠে এবং সম্ভবত সেগুলোকেই কাল্পনিক কাহিনী, জাদুমন্ত্র এবং পবিত্র রহস্যময় জ্ঞান বা বিদ্যার এক সংকলন অর্থাৎ ‘বেদ’ হিসেবে গণ্য করা হতে থাকে— যা ব্রহ্মার মুখ থেকে সরাসরি নিঃসৃত হয়েছে বলে প্রচার করা হয়। পরবর্তীকালে, কিছু উপাধ্যায় অনাহারে মারা যেতে শুরু করলে তাদের মধ্যে কেউ কেউ গোপনে ইরানে পালিয়ে যেতে উদ্যত হয়। এই পলায়ন রোধ করার জন্য চতুর ব্রহ্মা এক কঠোর আদেশ জারি করে, যা উপাধ্যায়দের জন্য ‘অটক’ নদী পার হওয়া বা পশ্চিমের সমুদ্র পাড়ি দেওয়া নিষিদ্ধ করে দেয়।
ধোণ্ডিবা: বনে থাকাকালীন উপাধ্যায়রা কী খেয়ে জীবনধারণ করত?
জ্যোতিরাও: তারা মূলত গাছের ফল, পাতা আর লতাগুল্মের বুনো মূল খেয়ে বেঁচে থাকতো। শুধু তাই নয়, তারা বিভিন্ন পশুপাখির মাংসও খেত; এমনকি নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে অনেক সময় তারা ঘোড়ার মাংস আগুনে ঝলসে খেতে বাধ্য হতো। এই কারণে, তাদের ‘রক্ষক’রা তাদের ‘ভ্রষ্ট’ (যে মর্যাদা বা শুদ্ধি থেকে বিচ্যুত হয়েছে) বলে উপহাস করতে শুরু করে। পরবর্তীকালে এই ‘রক্ষক’ শব্দটি বিকৃত হয়ে ‘রাক্ষস’ এবং ‘ভ্রষ্ট’ শব্দটি ‘ভট’ (Bhatt) শব্দে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু মনের গভীরে তারা ঘোড়ার মাংস খাওয়ার জন্য লজ্জিত ছিল, তাই তারা মাংসাহার নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করে। তবে যেসব ভট পশুর মাংসের স্বাদ পেয়েছিল, তারা এই অভ্যাসে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে, তা ত্যাগ করা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। এই জঘন্য কাজের কলঙ্ক ঢাকতে তারা পশুহত্যা ও মাংস ভক্ষণকে একটি পুণ্য কাজ হিসেবে মহিমান্বিত করতে শুরু করে। এই উদ্দেশ্যেই তারা পশুহত্যাকে ‘পশুযজ্ঞ’ ও ঘোড়া হত্যাকে ‘অশ্বমেধ যজ্ঞ’— এই গালভরা নাম হিসেবে অভিহিত করে এবং এই প্রথাগুলোকে তাদের তথাকথিত পবিত্র গ্রন্থসমূহে অন্তর্ভুক্ত করে।
ধোণ্ডিবা: পরবর্তীকালে ব্রহ্মা কী করেছিল?
জ্যোতিরাও: বলীরাজার পুত্র বাণাসুরের মৃত্যুর পর, কোনো সেনাপতি বা নেতা না থাকায় তাঁর রাজ্যে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। প্রত্যেকেই নিজেকে অধিপতি মনে করতে থাকে এবং অলস বিলাসিতায় মত্ত হয়ে অন্যের ওপর প্রভুত্ব করতে শুরু করে। ব্রহ্মা অত্যন্ত চতুরতার সাথে এই অরাজক পরিস্থিতির সুযোগ নেয়। সে তার নিজের ঘনিষ্ঠ ও ক্ষুধার্ত আত্মীয়স্বজনদের [যাদের বিকৃত নাম হলো ‘পরওয়ারী’ (Parvaaris)] একত্রিত করে ও গভীর রাতে অতর্কিতে রক্ষক বা রাক্ষসদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের নির্মূল করে।
সে একটি নতুন উপায় উদ্ভাবন করে যাতে তার স্বজনরা আক্রান্ত হলে বা বিপদে পড়লে কিংবা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও একে অপরকে চিনতে পারে। সে তাদের গলায় একটি সাদা পবিত্র সুতোর গুচ্ছ বা যজ্ঞোপবীত ধারণ করতে বাধ্য করে, যা আজ তাদের জাতের প্রতীক ‘ব্রহ্মসূত্র’ (পইতা) নামে পরিচিত। এছাড়া সে তাদের একটি মৌলিক জাদুমন্ত্র (বীজ মন্ত্র) শিক্ষা দেয় যা বর্তমানে ‘গায়ত্রী মন্ত্র’ নামে পরিচিত এবং কঠোর নির্দেশ দেয় যে, কোনো অবস্থাতেই যেন এটি ক্ষত্রিয়দের শেখানো বা তাদের কাছে প্রকাশ করা না হয়। এটি ছিল সত্যিই এক ধূর্ত নিষেধাজ্ঞা! এই কৌশলের মাধ্যমেই ভটরা (ব্রাহ্মণরা) খুব সহজে নিজেদের স্বজনদের শনাক্ত করতে সক্ষম হতো।
ধোণ্ডিবা: তারপর ব্রহ্মা কী করলো?
জ্যোতিরাও: সে তার সমস্ত ভট আত্মীয়স্বজন যোদ্ধাদের একত্রিত করে বাণাসুরের রাজ্য আক্রমণ করলো, তাঁর অধিকাংশ অভিজাতদের পরাজিত করে রাজ্যটি নিজের দখলে নিল। যারা তার বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, সেই মহা— অরি ক্ষত্রিয়দের— যাদের বিকৃত নাম ‘মাহার’ এবং আরও কিছু যোদ্ধাকে বন্দি করলো। সে তাদের সমস্ত ধনসম্পদ লুঠ করে তাদের ‘ক্ষুদ্র’ (তুচ্ছ বা অস্তিত্বহীন মানুষ— পরবর্তীতে ‘শূদ্র') আখ্যা দিয়ে দাসে পরিণত করলো; এবং নির্দেশ দিল যেন তারা তার আত্মীয়স্বজনদের দাস ও ভৃত্য হিসেবে সেবা করে। সে প্রতিটি গ্রামে একজন করে ক্ষুদ্র ভট কর্মকর্তা নিযুক্ত করলো, চাষি শূদ্রদের একটি তালিকা তৈরি করে তাদের যৎসামান্য খাবারের বিনিময়ে খেতমজুর হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করলো।
এই ক্ষুদ্র (রাজস্ব) কর্মকর্তারা ‘কুলকার্নি’ নামে পরিচিত হলো এবং শূদ্র চাষিরা ‘কুলওয়াড়ি’ (যার বিকৃত রূপ ‘কুলাম্বি’ বা ‘কুনবি') নামে পরিচিত হলো। শূদ্র নারীদের সবসময় খেতমজুর হিসেবে কাজ দেওয়া সম্ভব হতো না, তাই তারা বাধ্য হয়ে ভটদের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করতে শুরু করে। এভাবেই ‘কুনবিন’ (কুনবি নারী) ও পরিচারিকা বা দাসী শব্দ দুটি একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে, ভটরা ক্ষমতার দম্ভে আরও বেশি উদ্ধত হয়ে ওঠে এবং শূদ্রদের দাসের চেয়েও অধম মনে করতে শুরু করে। এই কলঙ্কময় ইতিহাসের সম্পূর্ণ বিবরণ যদি আমি তোমাকে দিতে যাই, তবে তা একটি বিশাল গ্রন্থেও শেষ হবে না।
আমি তাদের সম্পর্কে মাত্র কয়েকটি উল্লেখযোগ্য তথ্য বর্ণনা করেই শেষ করব। আধুনিক যুগের কিছু ভট, যারা এমনকি শূদ্রদের (মাঙ্গ ও মাহার) মতোই অক্ষরজ্ঞানহীন ও অজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও, অনাহারের সম্মুখীন হয়ে অত্যন্ত নীচ কৌশলের আশ্রয় নেয়। দরিদ্র শূদ্রদের সাথে প্রতারণা করার জন্য তারা যতটা সম্ভব পাপপূর্ণ পথ বেছে নিতেও দ্বিধাবোধ করে না। যখন তারা চরম অভাবের তাড়নায় পড়ে, তখন এই অজ্ঞ ভটরা নিজেদের পণ্ডিত বা জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে জাহির করে এবং শূদ্রদের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতে বের হয়। তারা ধর্মীয় পুণ্য বা কৃপা করার অজুহাতে শূদ্রদের দান দিতে বাধ্য করে। এভাবে অত্যন্ত জঘন্য উপায়ে তারা তাদের শোচনীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। কিন্তু তারা (ভটরা) শূদ্রদের সেবা করে সৎভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে লজ্জিত— যেমন খামারে তাদের গবাদি পশুর যত্ন নেওয়া, গোয়ালঘর পরিষ্কার করে গাদায় গোবর ফেলা; কৃষি কাজে লাঙল চষা, জমিতে নিড়ানি দেওয়া; তাদের বলদগাড়ি চালানো বা ফসলের খেতে সেচের জন্য কুয়ো থেকে জল তোলা; মাথায় করে মলমূত্রের ঝুড়ি বয়ে নিয়ে যাওয়া ও গাছের সার হিসেবে তা বাগানে রাখা; খড়ের আঁটি বয়ে নিয়ে গিয়ে গাদা তৈরি করা; লাঠি হাতে খেত পাহারা দেওয়া এবং শস্যের বস্তা ও সবজির ঝুড়ি মাথায় করে শূদ্রদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া।
একইভাবে তারা শূদ্রদের ভৃত্য হিসেবে কাজ করতেও লজ্জিত ছিল— যেমন তাদের ঘোড়া পরিষ্কার করা, সহিস হিসেবে কাজ করা, পথে ঘোড়ার আগে আগে দৌড়ানো; শূদ্রদের জুতো হাতে করে বয়ে নিয়ে যাওয়া; তাদের ঘর ঝাড়ু দেওয়া; খাওয়ার পর তাদের নোংরা বাসনপত্র মাজা; পিতলের প্রদীপ পরিষ্কার করা ও জ্বালানো এবং সাধারণ মজুর হিসেবে কাজ করা। এই অজ্ঞ ও দরিদ্র ভট মহিলারাও (ব্রাহ্মণ মহিলারা) শূদ্রদের পরিচারিকা বা দাসী হিসেবে কাজ করতে লজ্জিত বোধ করে; যেমন— শোয়ার আগে তাদের শরীর ম্যাসাজ বা মালিশ করে দেওয়া; শূদ্র মহিলাদের শাড়ি ধুয়ে দেওয়া ও তাদের জুতো ঠিকঠাক গুছিয়ে রাখা।
এরপর মহা-অরিরা (মাহাররা) তাদের শূদ্র ভাইদের ভটদের কবল থেকে মুক্ত করার জন্য তাদের ওপর আক্রমণ করতে শুরু করে। এইজন্যই ভটরা শূদ্রদের এতটা তীব্রভাবে ঘৃণা করতে শুরু করেছিল যে, তারা শূদ্রদের স্পর্শ করা অন্ন গ্রহণ করা বর্জন করে। আধুনিক ভটরা সেই মূর্খতাপূর্ণ প্রথা বজায় রেখে আজও বিশ্বাস করে যে, শূদ্রদের স্পর্শ করা খাবার বা জল অপবিত্র বা দূষিত; তাই তারা তা গ্রহণ করে না। তারা শূদ্রদের সংস্পর্শ বা স্পর্শ এড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট কিছু বাছবিচার বা শুচিবায়ুগ্রস্ত নিয়ম পালন করার প্রথা উদ্ভাবন করেছে।
পরবর্তীকালে, শূদ্রদের প্রতি বিশ্বাসঘাতক কিছু ভট লেখক সমস্ত শালীনতা বিসর্জন দিয়ে এই ছোঁয়াছুঁয়ির বিধিনিষেধগুলোকে একটি বিস্তৃত ও জঘন্য আচারে পরিণত করে। তারা এই গল্প ছড়িয়ে দেয় যে, যদি কোনো পবিত্রতা রক্ষা করা ভটকে কোনো শূদ্র স্পর্শ করে, তবে সেই স্পর্শে সে অপবিত্র হয়ে যাবে। তাদের অধার্মিক ও মিথ্যা শাস্ত্রসমূহ এই ধরনের অনেক হাস্যকর গালগল্পে ভরপুর। ভটরা এই আশঙ্কায় আতঙ্কিত ছিল যে, শূদ্ররা যদি তাদের প্রাচীন গৌরবময় ইতিহাস স্মরণ করতে পারে, তবে তারা ভটদের ওপর প্রতিশোধ নিতে দ্বিধা করবে না। এই ভয়ে ভীত হয়ে তারা শূদ্রদের জন্য শিক্ষার সমস্ত পথ বন্ধ করে দেয় এবং তাদের চিরন্তন অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত করে রাখে।
তারা আরও এক ধাপ এগিয়ে এমন এক নিয়ম জারি করে যা শূদ্রদের জন্য তথাকথিত পণ্ডিত ভটদের দ্বারা উচ্চারিত সেই মিথ্যা শাস্ত্রের একটি অক্ষর শোনাও নিষিদ্ধ করে দেয়। ‘মনুস্মৃতি’তে এই ধরনের অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। এই অন্ধবিশ্বাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আধুনিক যুগের অনেক গোঁড়া ভট আজও কোনো শূদ্রের উপস্থিতিতে এই ধরনের শাস্ত্র পাঠ করে না। যদিও বর্তমানের স্বার্থান্বেষী ব্রাহ্মণ শিক্ষকরা ব্রিটিশ সরকারের ভয়ে সরাসরি এ কথা বলার সাহস পায় না যে, তারা শূদ্রদের শিক্ষা দেবে না; তবুও তারা তাদের পূর্বপুরুষদের দ্বারা শূদ্রদের ওপর করা প্রতারণাগুলো ফাঁস করার মতো বা সত্য ঘটনা প্রকাশ করার মতো যথেষ্ট সৎ নয়। তারা ভয় পায় যে, এই সত্য প্রকাশ পেলে তারা শূদ্রদের চোখে ঘৃণিত ও তুচ্ছ হয়ে পড়বে। তারা শূদ্র শিশুদের এমনকি প্রাথমিক ব্যবহারিক শিক্ষাও দেয় না, বরং তাদের নির্দোষ মনকে এক ধরণের অবাস্তব দেশপ্রেমের কথায় পূর্ণ করে দেয় এবং ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে তাদের উগ্র-দেশপ্রেমে দীক্ষিত করার চেষ্টা করে।
তারা এই শিশুদের কচি মনে এই গল্পটিও গেঁথে দেয় যে, কীভাবে ধর্মপ্রাণ শূদ্র রাজা শিবাজি মহারাজ তাঁর মাতৃভূমিকে ম্লেচ্ছদের হাত থেকে মুক্ত করেছিলেন এবং ব্রাহ্মণ ও গাভীদের পূর্ণ সুরক্ষা প্রদান করেছিলেন। এভাবে ছেলেরা এক ধরণের কৃত্রিম দেশপ্রেম এবং তাদের ধর্মের প্রতি অন্তরে শ্রদ্ধা লালন করে। এই কারণেই, শূদ্রদের বিশাল জনসমষ্টির তুলনায় তাদের মধ্য থেকে দায়িত্বশীল পদে বসার মতো যোগ্য ও শিক্ষিত ব্যক্তি যথেষ্ট সংখ্যায় তৈরি হচ্ছে না। তারা অত্যন্ত চতুর এবং সূক্ষ্ম উপায়ে শূদ্রদের ওপর অত্যাচার চালায়। আমরা যদি তাদের এই নিপীড়নের একটি বাস্তবসম্মত বিবরণ তুলে ধরি এবং তার সাথে বাংলার ইংরেজ নীলকরদের অত্যাচারের তুলনা করি, তবে ভটদের অত্যাচার নীলকরদের অত্যাচারকে সহজেই হার মানাবে। যদিও ব্রিটিশরা ভারতের আইনত শাসক, কিন্তু জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রকৃত ক্ষমতা এই ভটদের হাতেই ন্যস্ত। ফলে, ভটরা শুধু শূদ্রদের স্বার্থেরই ক্ষতি করছে না, বরং ব্রিটিশ শাসকদের স্বার্থেরও ক্ষতি করছে। ভবিষ্যতে তারা যে সরকারের স্বার্থহানি করবে না, তার কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না।
যদিও সরকারি কর্মকর্তারা শূদ্রদের প্রতি ভটদের এই চরম ক্ষতি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন, তবুও তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এদিকে নজর দিচ্ছে না; পরিবর্তে তারা এই প্রতারণা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ভটদের সাথে একমত হচ্ছে এবং তাদের উৎসাহিত করছে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে, সরকারের এই অবিবেচনাপ্রসূত নীতি ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনবে। পরিশেষে বলা যায়, ব্রহ্মা— যে এই ভূখণ্ডের আদি অধিবাসীদের দাসে পরিণত করেছিল— ক্ষমতা, সম্পদ ও অত্যধিক অহঙ্কারে এতটাই মত্ত ছিল যে, সহজেই অনুমান করা যায় যে মহা-অরিরা (ভারতের সাহসী অধিবাসীরা) বিদ্রূপ করে তাঁকে ‘প্রজাপতি’ (প্রজাদের সৃষ্টিকর্তা) নাম দিয়েছিল। ব্রহ্মার মৃত্যুর পর আর্যরা তাদের ‘ভট’ উপাধি ব্যবহার করতে শুরু করে এবং তারা ব্রহ্মার সন্তান— ‘ব্রাহ্মণ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
ধোণ্ডিবা: প্রজাপতি ব্রহ্মার মৃত্যুর পর ব্রাহ্মণদের নেতৃত্ব কে গ্রহণ করেছিল?
জ্যোতিরাও: পরশুরাম।
ধোণ্ডিবা: পরশুরামের স্বভাব কেমন ছিল?
জ্যোতিরাও: স্বভাবগতভাবে পরশুরাম ছিল বিশৃঙ্খল, দুঃসাহসী, পাপিষ্ঠ, হৃদয়হীন, মূর্খ ও চরম নীচ। সে নিজের মা রেণুকার শিরশ্ছেদ করতেও দ্বিধা করেনি। সে ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও দক্ষ তীরন্দাজ।
ধোণ্ডিবা: তার শাসনামলে কী ঘটেছিল?
জ্যোতিরাও: প্রজাপতির মৃত্যুর পর, অবশিষ্ট মহা-অরিরা (মাহাররা) তাদের স্বজাতিকে ব্রাহ্মণদের দাসত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য পরশুরামের বিরুদ্ধে একুশবার এমন বীরত্বপূর্ণ ও সংকল্পবদ্ধ লড়াই চালিয়েছিল যে তারা ‘দ্বৈতী’ নামে পরিচিত হয়। ‘দৈত্য’ শব্দটি এরই বিকৃত রূপ। পরশুরামের কাছে পরাজিত হওয়ার পর, অনেক মহা-অরি এতটাই হতাশ হয়ে পড়েছিল যে তারা তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের রাজ্যে গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং সেখানেই জীবনের শেষ দিনগুলো কাটায়। জেজুরির খণ্ডেরাও রাবণের কাছে আশ্রয় নিয়েছিল এবং নয়টি বিভাগের (খণ্ড) প্রধান বিচারপতি ও সাতজন সামন্ত গোপনে কোঙ্কণ অঞ্চলে গিয়ে আত্মগোপন করে। এজন্যই ব্রাহ্মণরা অবজ্ঞার সাথে নয় খণ্ডের বিচারপতির একটি স্ত্রীবাচক নাম দেয়— ‘জনাঈ’ এবং সাতজন সামন্তকেও অবজ্ঞাসূচক স্ত্রীবাচক ‘সতী আসরা’ (ধঢ়ংধৎধং — জল থেকে উৎপন্ন সাত বোন) নাম দেয়। পরশুরাম যুদ্ধে পরাজিত মহা-অরিদের এই শর্তে মুক্তি দেয় যে, তারা ভবিষ্যতে আর কখনো ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে না। সে তাদের গলায় অপমানের চিহ্ন হিসেবে কালো সুতো বেঁধে দেয় এবং তাদের শূদ্র ভাইদের আদেশ দেয়, তারা যেন এই পরাজিত যোদ্ধাদের স্পর্শ না করে।৪ পরশুরামই বীর মহা-অরি ক্ষত্রিয়দের ‘অতিশূদ্র’, ‘মাহার’, ‘পারিয়া’, ‘মাং’ এবং ‘চণ্ডাল’ নামে ডাকা শুরু করে এবং তাদের উপর এমন অমানবিক নির্যাতন চালায় যার তুলনা পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। একটি উদাহরণ দিই— এই নিষ্ঠুর স্বৈরাচারী মাহার ও মাংদের উপর প্রতিশোধ নিতে তাদের এবং তাদের স্ত্রীদের নতুন বিশাল অট্টালিকার ভিত্তির মধ্যে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে দিত; তারপর তাদের গলায় ফুটন্ত তেল ও সিঁদুর ঢেলে দিত যাতে তাদের আর্তনাদ কেউ শুনতে না পায়। এভাবেই তাদের জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। এই নৃশংস প্রথা মুসলিম শাসনামল শুরু হওয়ার পর বিলুপ্ত হয়।
মহা-অরিদের সঙ্গে যুদ্ধে পরশুরামের বিশাল সংখ্যক ব্রাহ্মণ সৈন্য মারা যাওয়ায় ব্রাহ্মণ বিধবাদের সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে তাদের ভরণপোষণ একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তখন পরশুরাম কঠোর হাতে ব্রাহ্মণ বিধবাদের পুনর্বিবাহ নিষিদ্ধ করে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করে। মাহারদের হাতে ব্রাহ্মণ নিধনে পরশুরাম এতটাই ক্ষুব্ধ ছিল যে, সে মহা— অরিদের বংশ নির্মূল করতে এক নিষ্ঠুর পরিকল্পনা করে। অনেক গর্ভবতী মহা— অরি নারী যারা পরশুরামের হাত থেকে বাঁচতে লুকিয়ে ছিল, তাদের গণহারে বন্দি করা হয়। তার উদ্দেশ্য ছিল অভাগী বিধবাদের গর্ভজাত সন্তানদের হত্যা করা। কিছু শিশু এই নিষ্ঠুর পরিণতি থেকে রক্ষা পেয়েছিল। তারা বড়ো হয়ে নতুন নতুন বংশের জন্ম দেয়, যাদের বংশধরদের আজ কায়স্থ সম্প্রদায়ের মধ্যে পাওয়া যায়। এছাড়াও কিছু রামোশি, জুতোর কারিগর, বৈদ্য, কুম্ভকার ও সমগোত্রীয় লোকজনও সম্ভবত এই গণহত্যা থেকে বেঁচে গিয়েছিল। এই মানুষগুলোর রীতিনীতি ও ঐতিহ্যের সাথে শূদ্রদের অনেক মিল রয়েছে। এভাবে ব্রাহ্মণরা পরশুরামের নেতৃত্বে হিরণ্যাক্ষ থেকে শুরু করে বলীরাজা ও বাণাসুরের বংশধরদের উপর ধারাবাহিক গণহত্যা চালিয়ে তাদের পুরোপুরি ধ্বংস ও পঙ্গু করে দেয়। এই দেশের অজ্ঞ অধিবাসীরা তখন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, ব্রাহ্মণরা জাদুবিদ্যায় পারদর্শী; ফলে তাদের মন্ত্রশক্তির ভয়ে তারা তটস্থ থাকত। পরশুরামের অদূরদর্শিতা ও মূর্খতার কারণে তার নিজের বাহিনীরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, ফলে ব্রাহ্মণরাও তাকে অভিশাপ দিতে শুরু করে। ইতিমধ্যে, জনৈক স্থানীয় রাজা দশরথের পুত্র রামচন্দ্র পরশুরামের সেই বিখ্যাত ধনুতে গুণ পরিয়ে তা ভেঙে ফেলে এবং জানকীকে (সীতা) বিয়ে করে। এতে পরশুরাম ঈর্ষান্বিত হয়। রামচন্দ্র যখন নববধূকে নিয়ে ফিরছিল, তখন পরশুরাম পথ আটকে তাকে যুদ্ধের আহ্বান জানায়। রামচন্দ্র সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে পরশুরামকে অনায়াসেই পরাজিত করে। এই পরাজয়ে পরশুরাম এতটাই ভেঙে পড়ে যে, সে রাজ্য ছেড়ে পরিবার ও কিছু অনুসারী নিয়ে দক্ষিণ কোঙ্কণে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। বলা হয় যে, সেখানে সে তার অতীতের নিষ্ঠুরতার জন্য অনুতপ্ত হয়ে আত্মহত্যা করে। তার আত্মহত্যার সময় ও স্থান আজও অজানা।
ধোণ্ডিবা: সকল ব্রাহ্মণ একসঙ্গেই দাবি করে যে, পরশুরাম আদি নারায়ণের অবতার এবং সে অমর। তবে আপনি কেন বলছেন সে আত্মহত্যা করেছে?
জ্যোতিরাও: দুই বছর আগে (১৮৭০ সালে) আমি রাজা শিবাজীকে নিয়ে একটি গাথার প্রথম ভাগে লিখেছিলাম— “আমি ব্রাহ্মণদের আহ্বান জানাচ্ছি যে, তারা যেন তাদের প্রভু পরশুরামকে খুঁজে বের করে। তাকে এখানে নিয়ে আসুক এবং সোজাসুজি প্রশ্ন করুক যে, পরশুরামের সাথে একুশবার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করা সেই বীর মহা-অরিরা প্রকৃত ক্ষত্রিয় বংশজাত ছিল কি না। পরশুরামের উপস্থিতিতেই তারা যেন আমার সামনে এই সত্য স্বীকার করে।” কিন্তু আমার কথায় কেউ কান দেয়নি। তারা পরশুরামকে হাজির করতে পারেনি। পরশুরাম যদি সত্যিই আদি নারায়ণের অবতার ও অমর হতো, তবে ব্রাহ্মণরা অবশ্যই তাকে আমার সামনে হাজির করে আমাকে এবং সারা বিশ্বের খ্রিস্টান ও মুসলমানদের প্রমাণ করে দিত যে তাদের অবতারতত্ত্ব সত্য।
‘এই ক্ষত্রিয় সন্তান ছিলেন এক মহান বীর ও সাহসী যোদ্ধা। ত্রেতা যুগে (চারযুগের একটি) তিনি মুসলিমদের কাছে ছিলেন এক মূর্তিমান আতঙ্ক। জন্মগতভাবেই তিনি ছিলেন নির্ভীক এবং যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করাটাই ছিল তাঁর স্বভাব। মাতৃভূমি রক্ষার জন্য এই মহানায়ক বীরত্বের সাথে লড়াই করে গেছেন। তিনি পরশুরামের সাথে পর পর একুশবার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে— লড়েছিলেন। ব্রাহ্মণরা তাঁকে ‘মহা-অরি’ আখ্যা দিয়েছিল; তাঁর নাম উচ্চারিত হওয়া মাত্রই ব্রাহ্মণ-সন্তানদের হৃদয়ে ত্রাসের সঞ্চার হয়।’
‘ব্রাহ্মণরা শূদ্রদের শিক্ষা দেয় তারা যেন এই ‘মহা-অরি’দের স্পর্শ না করে; অথচ যুদ্ধক্ষেত্রে যখন এই বীররা পরাজিত হতো, তখন তারা তাদের ‘মাহার’, ‘মাং’ বলে উপহাস ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত। কাপুরুষরাই পরাজিত শত্রুর উপর এমনভাবে প্রতিশোধ নেয়, যা অকৃতজ্ঞ সন্তানের মতো হীন ও বিষধর সাপের মতো ভয়ংকর। যদি (পরশুরাম) সত্যিই অমর হয়ে থাকে, তবে তাকে আমার সামনে নিয়ে এসে হাজির করো এবং আমার সামনেই তার ওই আস্ফালন ও দাবিগুলো প্রমাণ করে দেখাও।’
ধোণ্ডিবা: আমার পরামর্শ হচ্ছে— আপনি পরশুরামকে আবার আপনার সামনে আবির্ভূত হওয়ার আহ্বান জানান। সে যদি জীবিত থাকে, তবে আপনার ডাকে সাড়া দেবে। এখনকার ব্রাহ্মণরা নিজেদের বিশাল পণ্ডিত মনে করতে পারে, কিন্তু পরশুরামের কাছে তারা নস্যি, তাদের বরং ‘ধর্মচ্যুত’ বা ‘ভ্রষ্ট’ বলা উচিত। আমি এজন্যই বলছি যে, কিছু ব্রাহ্মণ এখন ‘করলা’ খাওয়ার মতো পবিত্র প্রথা বর্জন করে গাজর, পেঁয়াজ ও রসুনের মতো ফল ও শাকসবজি খাওয়া শুরু করেছে— শাস্ত্র অনুযায়ী যা নিষিদ্ধ।
জোতিরাও: বেশ, তবে তোমার ইচ্ছা মতোই হোক!
“সর্বস্থানে বিরাজমান অমর ও আদি নারায়ণের পুত্র পরশুরাম সমীপে, হে বড়োভাই পরশুরাম! ব্রাহ্মণরা তাদের শাস্ত্রে আপনাকে অমর হিসেবে চিত্রিত করেছে। আপনি ব্রাহ্মণদের ‘করলা’ খাওয়ার অভ্যাসের নিন্দা করেননি। কোনো এক জেলের মৃতদেহ থেকে নতুন করে আর ব্রাহ্মণ জাতি সৃষ্টি করার হয়তো আপনার প্রয়োজন নেই, কারণ আপনার তৈরি সেই ব্রাহ্মণদের মধ্যেই কেউ কেউ এখন অনেক গুহ্য বিদ্যায় পারদর্শী বলে দাবি করছে। (উপরে উল্লেখিত মারাঠি ম্যাগাজিনটির একটি সূত্র)। তাদের আর কোনো উপদেশ দেওয়ার আপনার প্রয়োজন নেই। দয়া করে আপনি এখানে আবির্ভূত হন এবং শূদ্রদের গাজর খাওয়ার যে পাপ তারা করেছে, তার জন্য তাদের ‘চান্দ্রায়ণ’ ব্রত বা প্রায়শ্চিত্ত করতে বাধ্য করুন। আপনার উচিত ব্রাহ্মণদের মাধ্যমে প্রদর্শিত আপনার সেই বিখ্যাত জাদুকরী মন্ত্রের অলৌকিক ক্ষমতার দ্বারা ইংরেজ এবং ফরাসিদেরও স্তম্ভিত করে দেওয়া। আমাকে এড়িয়ে চলার বা আমার থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। এই নোটিশ পাওয়ার তারিখ থেকে ছয় মাসের মধ্যে আপনি যদি আমার সামনে উপস্থিত হন, তবে শুধু আমিই নই, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষও বিশ্বাস করবে যে আপনিই সর্বব্যাপী আদি নারায়ণের প্রকৃত অবতার। যদি আপনি তা করতে ব্যর্থ হন, তবে মনে রাখবেন যে এই দেশের মাহার ও মাঙ্গরা আপনার সেই তথাকথিত বহুমুখী প্রতিভাধর ব্রাহ্মণ অনুসারীদের প্রকাশ্য দিবালোকে টেনেহিঁচড়ে বের করতে এবং তাদের আসল রূপ উন্মোচন করতে দ্বিধা করবে না। তারা সম্পূর্ণভাবে নাস্তানাবুদ হবে; ভিক্ষার অভাবে তারা অনাহারে দিন কাটাবে— তারা রুটি চাইবে কিন্তু তার বদলে পাবে পাথর— এবং শেষ পর্যন্ত প্রাচীনকালের বিশ্বামিত্রের মতোই কুকুরের পা কিংবা মাছ খেতে বাধ্য হতে পারে।
১ আগস্ট, ১৮৭২ জ্যোতিরাও গোবিন্দরাও ফুলে
(যিনি আপনার অমরত্বের দাবি পরীক্ষা করতে চান)”
ধোণ্ডিবা: আপনি একদম সঠিক জায়গায় আঘাত করেছেন। আপনার বক্তব্য অনুযায়ী পরশুরাম তো অনেক আগেই মারা গিয়ে ধুলোয় মিশে গেছে। এখন দয়া করে আমাকে বলুন যে, অন্যান্য (ক্ষত্রিয়) সামন্ত শাসকরা কীভাবে ব্রাহ্মণদের জাদুমন্ত্রের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল?
জ্যোতিরাও: সেই সময় ব্রাহ্মণদের মধ্যে একটি সাধারণ প্রথা ছিল যে, যুদ্ধের সময় তারা তাদের অস্ত্রগুলোকে তথাকথিত পবিত্র জাদুমন্ত্র দিয়ে অভিমন্ত্রিত করত এবং সেগুলোকে শত্রুদের বিরুদ্ধে নিক্ষেপ করত। এই ধরনের ছলনাময় কৌশলের মাধ্যমে ব্রাহ্মণরা বাণাসুরের প্রজাদের, তাঁর রাজ্য ও রাজপরিবারকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য কুসংস্কারাচ্ছন্ন রাজারা ব্রাহ্মণদের এই অদ্ভুত ক্ষমতার ভয়ে তটস্থ থাকত। ব্রাহ্মণরা তাদের একটি মিথ্যা শাস্ত্রে লিখে রেখেছে যে, ঋষি ভৃগু যখন ভগবান বিষ্ণুর (আদি নারায়ণ) বুকে লাথি মেরেছিল, তখন বিষ্ণু ভৃগুর পায়ে হয়তো চোট লেগেছে, এই ভয়ে তার পা মালিশ করে দিতে শুরু করেছিল! এই গল্পের পেছনের চালাকিটা পরিষ্কার। বিষ্ণুর মতো দেবতা ভৃগুর লাথি সয়ে নিল এবং তার পা মালিশ করে নিজেকে ছোটো করল— এই গল্পটি শূদ্রদের মনে গেঁথে দেওয়ার জন্যই তৈরি করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল শূদ্রদের এটা বোঝানো যে, ব্রাহ্মণরা যদি তাদের লাথি মারে বা পিটিয়ে মেরেও ফেলে, তবুও তাদের মুখ বুজে তা সহ্য করা উচিত। এটিই ছিল ব্রাহ্মণদের আসল মতলব।
ধোণ্ডিবা: আজকের যুগের কিছু নিচুতলার মানুষ এই জাদুমন্ত্রের ক্ষমতা কোথা থেকে পেল?
জ্যোতিরাও: আজও কিছু মানুষের মধ্যে কালো জাদু কিংবা কাউকে হত্যার উদ্দেশ্যে জাদুমন্ত্র প্রয়োগ করে ‘বাণ মারা’ ও সম্মোহন করার মতো ক্ষতিকর ক্ষমতা দেখা যায়; খুব সম্ভবত তারা এগুলো বেদ থেকেই শিখেছে। যদিও এই আদি জাদুমন্ত্রগুলো এখন অনেক বিকৃত হয়ে গেছে, তবুও বৈদিক মন্ত্রের সাথে এগুলোর অনেক মিল পাওয়া যায়। যেমন— ‘ওঁ নমঃ’, ‘ওঁ হ্রীং ক্লীং’ ইত্যাদি শব্দগুলো সরাসরি বেদ থেকে নেওয়া। আর্যদের আদি পূর্বপুরুষরা হয়তো প্রথমে বাংলায় বসতি স্থাপন করেছিল, যেখান থেকে তাদের এই জাদুবিদ্যা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। একারণেই মানুষ একে ‘বেঙ্গলি ম্যাজিক’ বা ‘বাংলার জাদু’ বলে থাকে। শুধু তাই নয়, আর্যদের এই পূর্বপুরুষদের মধ্যে ‘ভর’ হওয়া বা দেবতার ভর পাওয়ার মতো ভণ্ডামিও ছিল।৫
এরকম ‘ভর হওয়া’ ব্যক্তিদেরই ব্রাহ্মণ বলা হতো যারা ‘সোমরস’ পান করে মাতাল হয়ে আবোল— তাবোল বকত এবং দাবি করত যে, তারা সরাসরি ঈশ্বরের সাথে কথা বলছে। এই ধূর্ত কৌশলটি তারা সাধারণ মানুষকে ঠকানোর জন্য ব্যবহার করত। বেদের বিভিন্ন বর্ণনাতেও এর প্রমাণ মেলে। অনেক ইউরোপীয় লেখকও একই মত প্রকাশ করেছেন। এই জঘন্য প্রথাকে পুঁজি করে আজকের কিছু ভট বা ব্রাহ্মণরা দরিদ্র মালি ও কৃষকদের জাদুমন্ত্র ও তুকতাকের ভয় দেখিয়ে অন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জন করে। বড়োই পরিতাপের বিষয় যে, এই দরিদ্র ও অজ্ঞ মানুষগুলো ব্রাহ্মণদের এই নির্লজ্জ প্রতারণার গভীরতা বুঝতে পারে না। তারা সারাদিন মাঠে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে অতি কষ্টে সরকারকে কর দেয়, আর ব্রাহ্মণরা তাদের ঠকিয়ে খায়।
ধোণ্ডিবা: অনেক ব্রাহ্মণ তো বড়াই করে বলে যে, চারটি বেদই ব্রহ্মার মুখ থেকে বেরিয়েছে। যদি আপনার কথা সত্য হয়, তবে ব্রহ্মার মৃত্যুর অনেক পরে জন্মানো ঋষিদের লেখা স্তোত্রগুলো বেদের মধ্যে এল কীভাবে? ইউরোপীয় পণ্ডিতরা তো প্রমাণ করেছেন যে, চারটি বেদ একই সময়ে বা একজন লেখকের দ্বারা রচিত হয়নি।
জ্যোতিরাও: ব্রহ্মার মৃত্যুর পর তৎকালীন ঋষিরা ব্রহ্মার রচনাগুলোকে তিন ভাগে বা তিনটি বেদে ভাগ করে। পরে কিছু বিখ্যাত ঋষি এই রচনাগুলোতে অনেক পরিবর্তন ও কাটছাঁট করে। তারা তাদের মনে থাকা কিছু লোককথা আর গল্পের সাথে এই রচনাগুলো মিশিয়ে চতুর্থ বেদ (অথর্ববেদ) তৈরি করে। পরশুরাম যখন বাণাসুরের প্রজাদের ধ্বংস করে, তখন থেকেই রাজারা ব্রাহ্মণদের জাদুমন্ত্রের ভয়ে ভীত ছিল। চতুর নারদ প্রায়ই রামচন্দ্র, রাবণ, কৃষ্ণ, কংস বা কৌরব-পাণ্ডবদের প্রাসাদে যেত। সে বীণা বাজিয়ে নেচে গেয়ে রানি ও শিশুদের আনন্দ দিত। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতো সে তাদের জ্ঞান দান করছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে তাদের মনে একে অপরের বিরুদ্ধে বিষিয়ে দিয়ে ঝগড়া লাগিয়ে দিত। এভাবেই সে রাজাদের দুর্বল করে দিত এবং ব্রাহ্মণদের আধিপত্য মজবুত করত। সেই সময়েই ব্রাহ্মণ লেখকরা জাদুমন্ত্র ও উদ্ভট সব গল্প একত্র করে ‘স্মৃতি’, ‘সংহিতা’, ‘শাস্ত্র’ ও ‘পুরাণ’ নামে গাদা গাদা নতুন ধর্মগ্রন্থ তৈরি করে, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল শূদ্রদের উপর স্থায়ী আধিপত্য বিস্তার করা। তারা শূদ্রদের মগজধোলাই করে এটা বোঝাতে সক্ষম হয় যে, আর্যদের দাসত্ব করাই হলো তাদের জন্য ‘প্রকৃত ধর্ম’। তারা আরও নিয়ম করে দেয় যে, অজ্ঞানতার নরকে থাকা শূদ্রদের যেন কোনোভাবেই জ্ঞান অর্জন করতে দেওয়া না হয়। মনুস্মৃতির মতো অপবিত্র বইগুলোতে এই কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যাতে শূদ্ররা আর্যদের এই জোচ্চুরির কথা কোনোদিন জানতে না পারে।
ধোণ্ডিবা: ‘ভাগবত’ কি সেই সময়েই রচিত হয়েছিল?
জ্যোতিরাও: তা অসম্ভব। যদি ভাগবত সেই সময় রচিত হতো, তবে অর্জুনের নাতি জনমেজয়— যে অনেক পরে জন্মেছিল— তার কাহিনি ভাগবতে থাকত না।
ধোণ্ডিবা: আপনার কথা যুক্তিযুক্ত। ভাগবত এত আষাঢ়ে গল্পে ভরা যে, ঈশপের গল্প (Aesop's Fables) ভাগবতের চেয়ে হাজার গুণ ভালো। অন্তত ঈশপের গল্পে এমন কিছু নেই যা পাঠকদের মন কলুষিত করে।
জ্যোতিরাও: এটিও প্রমাণ করা যায় যে ‘মনুসংহিতা’ আসলে ভাগবতেরও পরে লেখা হয়েছে। কারণ মনুসংহিতার অষ্টম অধ্যায়ের ১১০ নম্বর শ্লোকে বশিষ্ঠ ঋষির খুনের দায় থেকে মুক্তির জন্য শপথ করার গল্প আছে, যা ভাগবতে বর্ণিত। আবার দশম অধ্যায়ের ১০৮ নম্বর শ্লোকে বিপদে পড়ে বিশ্বামিত্রের কুকুরের মাংস খাওয়ার গল্পটিও আছে। এরকম আরও অনেক পরস্পরবিরোধী গল্প সেই বইতে পাওয়া যায়।
ধোণ্ডিবা: এ তো সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে! আপনি আপনার ‘রাজা শিবাজী’র গাথার প্রস্তাবনায় যা লিখেছেন, তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ভট লেখকদের এই সমস্ত রচনা আসলে একদল অবোধ বালিকার পুতুল খেলার চেয়ে বেশি কিছু নয়।
জ্যোতিরাও: আমাদের সকলের পরম পিতা বিশ্বস্রষ্টা সর্বশক্তিমান ঈশ্বর এমন বিধান দিয়েছেন যে, তিনি আমাদের যে সত্যের জ্ঞান ও মানবাধিকার প্রদান করেছেন, তা যেন আমরা সকলে মিলেমিশে এবং শান্তিতে ভোগ করি। ঈশ্বরের এই ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিতেই, অত্যাচারিতের বন্ধু, পরম পবিত্র, বিধবাদের আশ্রয়দাতা সত্যবাদী ‘বলীরাজা’ কয়েক বছর পর পুনরায় এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হলেন। তিনি তাঁর দমিত, নিপীড়িত দুর্বল ভাইদের ধূর্ত ও কুটিল ভটদের (ব্রাহ্মণ) ফাঁদ থেকে মুক্ত করার মহান ব্রত গ্রহণ করেন এবং এই দেশে ‘ঈশ্বরের রাজ্য’ স্থাপনের চেষ্টা করেন। এভাবেই আমাদের শ্রদ্ধেয় বৃদ্ধাদের সেই ভবিষ্যদ্বাণী— “বলীর রাজ্য ফিরে আসুক” আংশিকভাবে সত্য হতে শুরু করে।
যখন সেই বলীরাজাকে (যিশু খ্রিস্টকে) কিছু পাপিষ্ঠ ও নিষ্ঠুর লোক ক্রুশবিদ্ধ করে, তখন ইউরোপে মুক্তির জন্য এক বিশাল আন্দোলন শুরু হয়। কোটি কোটি মানুষ তাঁর অনুসারী হয় এবং স্রষ্টার নির্দেশ অনুযায়ী পৃথিবীতে তাঁর রাজ্য স্থাপনের জন্য নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে যায়। টমাস পেইনের মতো মহান পণ্ডিতদের পূর্বপুরুষরা এই বলীরাজার (যিশু) শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়েছিলেন এবং পৃথিবী থেকে সমস্ত দুঃখকষ্ট দূর করে সুখে শান্তিতে বাস করতে শুরু করেছিলেন। যখন এই বলীরাজার আগমনে আমাদের দেশেও শান্তিও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে, তখন অনেক চতুর ও বুদ্ধিমান পণ্ডিতগণ ওই অজ্ঞ লেখকদের সাজানো পুতুল খেলা ভেঙে চুরমার করে দেন। এরপর শাক্যমুনি গৌতম বুদ্ধ ও অন্যান্য মহাপুরুষরা এসে— যেসব ব্রাহ্মণরা ‘দেবতার ভর’ হওয়ার ভণ্ডামি করত, ধর্মীয় উৎসবের নামে অবলা পশুদের হত্যা করত, গরুর মাংস খেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হতো— অহংকারী, ভণ্ড, লম্পট এবং সকল রকমের অনিষ্টের প্রতীক সেইসব ব্রাহ্মণদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিলেন। গৌতম বুদ্ধ তাদের মিথ্যা শাস্ত্রের সমস্ত জালিয়াতি ও চালাকি ফাঁস করে দিলেন, তাদের অনেককে সুবুদ্ধি ও মানবতার পথে ফিরিয়ে আনলেন ও নিজের অনুসারী করলেন। কিন্তু কিছু যুক্তিহীন ব্রাহ্মণ পালিয়ে কর্ণাটকে চলে গেল। সেই সময় সেই সম্প্রদায়ের মধ্য থেকেই এমন একজন বড়ো পণ্ডিতের (শংকরাচার্যের) আবির্ভাব ঘটেছিল— যে তার অদ্ভুত, কুটিল ও বিকৃত পাণ্ডিত্যের জন্য সুপরিচিত ছিল। ব্রাহ্মণদের কুপরামর্শ ও কুকর্মের কারণে তাদের চরম বিপর্যয় ও অবমাননা, এবং এই দেশে বৌদ্ধধর্মের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ও প্রসার সে সহ্য করতে পারেনি। সে উপলব্ধি করেছিল যে, ব্রাহ্মণরা তখন জীবনধারণের জন্য কঠিন সংগ্রামের সম্মুখীন। সে আরও বুঝতে পেরেছিল যে, বুদ্ধ ব্রাহ্মণদের ‘বেদ’— এর মতো মিথ্যা শাস্ত্রগুলোতে নিহিত অশুভ শিক্ষাগুলোর নিন্দা করেছেন ও পরবর্তীতে তা পরাস্ত করেছেন। তাই সে গোমাংস ভক্ষণ ও মদ্যপানকে মহাপাপ হিসেবে নিষিদ্ধ করে; সমসাময়িক জনমত ও পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে বেদের কিছু শিক্ষাকে ছাঁটাই করে এবং মূল শাস্ত্রের শিক্ষাগুলোকে শক্তিশালী করতে এক নতুন ধরণের ‘নিরিশ্বরবাদ’ প্রচার করে— যা আজ ‘বেদান্ত’ বা ‘জ্ঞানযোগ’ নামে পরিচিত। এরপর সে ভারতের বিভিন্ন মঠে শিবলিঙ্গ স্থাপন করে। তৎকালীন ভারতে বসতি স্থাপনকারী তুর্কিদেরও সে এখানকার ক্ষত্রিয়দের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। এরপর, মুসলিমদের ব্যবহৃত কৌশল অনুসরণ করে সে তলোয়ারের মুখে বৌদ্ধদের পরাজিত করে এবং সহজ-সরল, অজ্ঞ শূদ্রদের মনে তাদের ‘ভাগবতে’ বর্ণিত জাদুকরী মন্ত্র, অসার উপাখ্যান ও কল্পকাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে সৃষ্ট ব্যাপক অরাজকতার মধ্যে শংকরাচার্যের অনুসারীরা বৌদ্ধদের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালায়; তারা বৌদ্ধদের ঘানিতে পিষে হত্যা করে এবং তাঁদের অমূল্য ধর্মীয় গ্রন্থগুলো অগ্নিদগ্ধ করে। নিজেদের ব্যবহারের জন্য তারা কেবল ‘অমরকোষ’ গ্রন্থটিকে রক্ষা করেছিল।
পরবর্তীতে শঙ্করাচার্যের পেঁচার মতো শিষ্যরা দিনের উজ্জ্বল আলোতেও মশাল জ্বালিয়ে পালকিতে চড়ে ঘুরে বেড়াতে শুরু করল এবং মুণ্ডিত মস্তক বিধবাদের মতো পবিত্রতা প্রদর্শনের ভণ্ডামি করতে থাকল। এরপরে মুকুন্দরাজ, জ্ঞানেশ্বর, রামদাসের মতো গণ্ডায় গণ্ডায় ব্রাহ্মণ লেখক এলো। তারা তাদের সমস্ত প্রতিভা নষ্ট করলো অর্থহীন রচনা তৈরিতে। মনে রাখবে, সেই তথাকথিত বিখ্যাত লেখকদের মধ্যে একজনেরও তাদের ভট-ভাইদের পরানো শূদ্রদের গলায় ঝোলানো সেই ‘দাসত্বের শিকল’ বা কুকুরের কলারটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস ছিল না। তারা ব্রাহ্মণদের এই পৈশাচিক কাজের নিন্দা করার সাহস দেখায়নি। উল্টো তারা অত্যন্ত চতুরতার সাথে কুপ্রথাগুলোকে ‘কর্মমার্গ’ ও নাস্তিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ‘জ্ঞানমার্গ’ বলে অভিহিত করলো। তারা দেশি ভাষায় এই দুই পথের উপর গাদা গাদা বই লিখল, যাতে তাদের স্বার্থপর ব্রাহ্মণ ভাইরা অতি সহজে অজ্ঞ ও অসহায় শূদ্রদের শোষণ করতে পারে।
রাওবাজি (দ্বিতীয় বাজিরাও) রাতেরবেলা নানারকম পাপকাজে লিপ্ত থাকত, কিন্তু সকাল হলে, বিশ্বস্ততার সাথে তাদের স্রষ্টা আল্লার উপাসনা করা মুসলমানদের ছায়া পর্যন্ত মাড়াতো না সে। দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের সেই কলঙ্কিত শাসনের শেষের দিকে ব্রাহ্মণদের দুর্দিন ঘনিয়ে এল এবং সারা ভারতে ইংরেজদের পতাকা, ইউনিয়ন জ্যাক উড়তে শুরু করল। সেই দ্বিতীয় বলীরাজার (যিশু খ্রিস্ট) অনুসারী আমেরিকান ও স্কটিশ মিশনারিরা সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে ভারতে এসে শূদ্রদের মধ্যে তাঁদের মসিহার প্রকৃত শিক্ষা প্রচার করতে শুরু করলেন। তাঁরাই শূদ্রদের উপর দুষ্ট ব্রাহ্মণদের চাপিয়ে দেওয়া সেই অমানবিক দাসত্ব থেকে তাদের মুক্ত করলেন। তাঁরা শূদ্রদের গলা থেকে দাসত্বের কলার ছিঁড়ে ফেলে তা সরাসরি ব্রাহ্মণদের মুখে ছুড়ে মারলেন। দেরিতে হলেও ধূর্ত ব্রাহ্মণদের তখন বোধোদয় হলো। তারা মনে মনে বুঝল যে, এই বিদেশি মিশনারিরা শূদ্রদের উপর তাদের এই অনৈতিক আধিপত্য চিরতরে শেষ করে দেবেন। সেই ভয় থেকেই কিছু ধূর্ত ব্রাহ্মণের মনে ব্রিটিশ সরকারকে এদেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার তীব্র ইচ্ছা জাগল— পাছে দ্বিতীয় বলীরাজার (যিশু খ্রিস্ট) অনুসারী মিশনারি ও এই দেশের নিপীড়িত শূদ্রদের মধ্যে কোনো মজবুত বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে! সেই লক্ষ্য হাসিলের জন্য তারা পুরোনো চাল চালতে শুরু করলো— তারা তাদের মিথ্যা শাস্ত্র থেকে শেখা পুরোনো কৌশল ব্যবহার করে অজ্ঞ শূদ্রদের ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে উসকে দিতে লাগলো।৬ অন্যদিকে কিছু ভট (ব্রাহ্মণ) সরকারি করণিক এবং কেউ কেউ ছোটোখাটো সরকারি বা আধা-সরকারি কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে ঢুকে পড়লো। পরিস্থিতি এমন হলো যে, সরকারের প্রতিটি বিভাগ এবং বেসরকারি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে ব্রাহ্মণ কর্মচারীদের ভিড় জমে গেল।
ধোণ্ডিবা: এই ধূর্ত ভট ভোজবাজিকরদের পূর্বপুরুষরা দস্যুর মতো আমাদের দেশে এসেছিল, আমাদের আদি পূর্বপুরুষদের আক্রমণ করেছিল এবং তাঁদের দাসে পরিণত করেছিল। তারা গায়ের জোরে তাদের দস্যুবৃত্তিপূর্ণ ধর্মের নিয়মগুলো আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল। যদি কোনোক্রমে আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই ভটদের পূর্বপুরুষদের পরাজিত করতে পারতেন, তবে কি তাঁরা নিষ্ঠুর বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাদের দাসে পরিণত করতেন না? আমার মতে, এটি গর্ব করার মতো কিছু নয়। পরে, তারা তাদের পূর্বপুরুষদের এই দস্যুবৃত্তিকে একটি উপযুক্ত সময়ে ঐশ্বরিকভাবে ধর্মের পবিত্রতায় ভূষিত করেছিল। আজ তারা আমাদের পরম দয়ালু ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে সাধারণ অজ্ঞ শূদ্রদের মনে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। এই ষড়যন্ত্রের স্বরূপ আসলে কী?
জ্যোতিরাও: কিছু ভট রাতে গ্রামের হনুমান মন্দিরে জড়ো হতো এবং ধর্ম প্রচারের নামে ‘ভাগবত’- এর মতো অপবিত্র গ্রন্থ থেকে উদ্ভট সব গল্প শুনিয়ে শূদ্রদের মগজধোলাই করত। তারা শূদ্রদের বোঝাত— তারা যেন খ্রিস্টান মিশনারিদের থেকে দূরে থাকে। তদুপরি, তারা এই সরল লোকদের মনে এই কল্পকাহিনীগুলিকে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করত এবং ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে তাদের মনে অসন্তোষ ছড়িয়ে দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করত। সেই লক্ষ্যে, তারা সরকারের বিরুদ্ধে অনেক সহিংস বিদ্রোহ সংগঠিত করার ষড়যন্ত্রও করত।
ধোণ্ডিবা: আপনি ঠিকই বলেছেন, এইসব বিদ্রোহগুলি ব্রাহ্মণ দালালদের উস্কানিদাতাদের দ্বারা পরিকল্পিত ও সংগঠিত হয়েছিল, কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গোপনে। উদাহরণস্বরূপ উমাজি (নায়েক) রামোশির বিদ্রোহে একজন ধোণ্ডোপান্ত জড়িত ছিল যাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। আপনি আরও দেখতে পাবেন যে, ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ১৮৫৭ সালের চাপাতি বিদ্রোহের সাথে কোঙ্কণের নানা সাহেব, তাতিয়া টোপি এবং এই প্রেসিডেন্সির আরো অনেক বহিরাগত উত্তর ভারতের ভট-পাণ্ডেরা সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল।
জোতিরাও: গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া এবং ইন্দোরের হোলকারের মতো ভারতীয় শূদ্র রাজারা নানাসাহেবের (পেশোয়া) কাছে সেবার দায়বদ্ধতা ও অন্যান্য আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও, বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহীদের সাথে যোগ দেননি; বরং চরম সংকটের মুহূর্তে তাঁরা ব্রিটিশ সরকারের প্রতি অনুগত ছিলেন। ১৮৫৭-র বিদ্রোহ দমন করতে ব্রিটিশ সরকারকে প্রচুর ঋণ নিতে হয়েছিল। সেই ঋণ শোধ করার জন্য তাদের কঠোর কর আরোপ করতে হয়। কিন্তু পর্বতীর মন্দিরের মতো নিরর্থক ধর্মীয় সংস্থার উপর চাপ না দিয়ে সরকার কাদের উপর কর আরোপ করেছিল? তারা দোষী-নির্দোষ নির্বিশেষে সমস্ত কৃষকদের উপর এই কর চাপিয়ে দিয়েছিল। সরকার অজ্ঞ শূদ্রদের উপর কর নির্ধারণের ভার কাদের হাতে দিয়েছিল? তারা এই দায়িত্ব দিয়েছিল সেই লোভী ব্রহ্ম-উপাসক ভট কুলকার্নিদের (ব্রাহ্মণ হিসাবরক্ষক) উপর— যারা অন্তরে শূদ্র রাজাদের প্রতি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ ছিল এবং তাদের প্রতি অশ্লীল ও জঘন্য গালিগালাজ করত। এই ভটরা— যারা দিনে তিনবার স্নান করে নিজেদের পবিত্র বলে দাবি করত— সিন্ধিয়া ও হোলকার কেন ব্রাহ্মণ নানা পেশোয়ার বিদ্রোহে সমর্থন দেননি, সেই রাগে ফুঁসছিল। যেদিন থেকে সরকার রাজস্ব সংক্রান্ত দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজগুলো গ্রামের দরিদ্র শূদ্রদের উপর অত্যাচার করা এই দুষ্ট গ্রামের দানব, অর্থপিশাচ ও লোভী ব্রাহ্মণদের হাতে তুলে দিয়েছে, সেদিন থেকেই তারা শূদ্রদের এক ঘাট থেকে অন্য ঘাটে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। মুসলমান শাসকরা পশুপাখি জবাই করার কাজ তাদের স্বধর্মী কশাইদের উপর ন্যস্ত করত। কিন্তু এই চতুর দক্ষ ভট কর্মকর্তারা সেই কশাইদেরও ছাড়িয়ে গেছে; তারা দরিদ্র শূদ্রদের গলা কাটছিল কোনো ছুরি দিয়ে নয়, তাদের কলম দিয়ে। তাই নির্যাতিত রায়তরা সরকারের অনুমোদনের তোয়াক্কা না করেই এই গ্রাম্য দানবদের ‘কলমধারী কসাই’ উপাধিতে ভূষিত করেছে। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় এই যে, সরকার এই নিষ্ঠুর কর্মকর্তাদের বদলি করে না; বরং অজ্ঞ শূদ্রদের কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্তের উপরেই আস্থা রাখে। শুধু তাই নয়, শূদ্রদের বাড়িতে করের নোটিশ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও দেওয়া হয় দানব কুলকার্নিদের উপর। পরে যখন কুলকার্নিরা নোটিশ পাঠানোর কাজ শেষ করে, তখন সরকার তাদের সাথে পরামর্শ করেই কিছু নোটিশ বাতিল করে এবং কিছু শূদ্রকে কর প্রদান থেকে অব্যাহতি দেয়। কী অদ্ভুত এই লেনদেন!
ধোণ্ডিবা: কুলকার্নিরা কি এতে কোনোভাবে লাভবান হয়?
জ্যোতিরাও: এই লেনদেনে কুলকার্নিদের আদৌ কোনো লাভ হয় কি না, তা কেবল তারাই জানে। একজন অজ্ঞ গেঁয়ো চাষিকে হয়রানি করে হয়তো তারা আর্থিকভবে সরাসরি লাভবান হতে পারে না, কিন্তু তার নামে এমন একটি নোটিশ জারি করে তারা তাকে অন্তত এক সপ্তাহের জন্য রাজস্ব অফিসে হাজিরা দিতে বাধ্য করে। এর ফলে সেই দরিদ্র মানুষটি তার এক সপ্তাহের মজুরি হারায় এবং প্রতিদিন অফিসে যাতায়াত করে চরম হেনস্তার শিকার হয়। এভাবে কুলকার্নিরা তার মনে ভীতির সঞ্চার করে তাকে একটি শিক্ষা দেয়। হয়তো এই লেনদেন থেকে তারা একটি পয়সাও পায় না, কিন্তু তারা অত্যন্ত ধূর্ততা ও নিষ্ঠার সাথে তাদের সরকারি কাজ সম্পাদন করে। এই কারণেই শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ছোটো-বড়ো সবাই ধনদেবী লক্ষ্মীর স্তবগান করে, ঠিক যেমনটি প্রাচীনকালে শঙ্করাচার্য করেছিল। (হে সরকারি অফিসের সরস্বতী দেবী! তুমি ধন্য, কারণ তুমি ঘুষখোর ও নিরুপায় হয়ে ঘুষ প্রদানকারী— উভয়কেই সমানভাবে দণ্ড প্রদান করো!) তবে সেই সময় ব্যাপকভাবে রটে গিয়েছিল যে, এই দেবী কিছু কুলকার্নিদের উপর এতটাই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন যে, তাদের বাড়িতে নাকি রাতের পর রাত রুপোর টাকার বৃষ্টি হয়েছিল। সরকারের উচিত এই গুজবের সত্যতা যাচাই করা, পুনের সেই কুলকার্নিদের শনাক্ত করা এবং অবিলম্বে তাদের পালকিতে চড়িয়ে শোভাযাত্রা বের করার ব্যবস্থা করা; আর যদি পালকি পাওয়া না যায়, তবে পুনের রাস্তায় গাধার পিঠে চড়িয়ে তাদের ঘোরানো উচিত।
ধোণ্ডিবা: কিছু বুদ্ধিমান ব্যক্তি কিছু ঘুষখোর ব্রাহ্মণকে ধরে আইনের রক্ষকদের হাতে তুলে দিয়েছিল। কিন্তু ইদানীং সেই একই ব্যক্তিরা আবার এই কলমধারী কসাইদের পক্ষ নিচ্ছে। ফলে এই ভট কর্মকর্তারা শূদ্রদের ঘাম ঝরানো উপার্জনের করের টাকায় নিজেদের পকেট ভারি করেছে, নিজেদের মস্ত বড়ো পণ্ডিত হিসেবে জাহির করেছে এবং মনের সুখে বিলাসিতা করেছে; তারা কখনো ভেবে দেখেনি যে, তাদের এই সৌভাগ্যের মূলে রয়েছে শূদ্রদের অবদান। অবশেষে, চরম ধার্মিকতার ভান করে স্নান, জপ ইত্যাদি ধর্মীয় আচার পালন করে তারা শূদ্রদের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দিতে পেরেছে যে, তাদের বৈদিক মন্ত্র ও তুকতাক বা জাদুটোনা সত্যিই অত্যন্ত শক্তিশালী এবং কার্যকর। শূদ্ররা চাঁদা তুলে ভাড়াটে ভট পুরোহিতদের দিয়ে পুনের শাদাওয়ালা পীরের সামনে বা পেছনের মহাদেব মন্দিরের শিবলিঙ্গে দিনরাত অবিরাম জপ ও যজ্ঞের আয়োজন করালো। ধূর্ত ভট পুরোহিতরা অজ্ঞ শূদ্রদের মগজ ধোলাই করে বিশ্বাস করালো যে, তাদের এই ধর্মীয় আচার ও অনুষ্ঠানের গুণেই সে বছর ভালো বৃষ্টি হয়েছে বা কলেরার প্রকোপ কমেছে। শেষ দিনে তারা হাতে টানা ছোটো গাড়িতে সিঁদুর ও ভুষোমাখা চালের পিণ্ড রাখে, চাতুর্যপূর্ণ কথা ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে অজ্ঞ শূদ্রদের প্রতারিত করে এবং অনেক ধর্মীয় মেলার আয়োজন করে। সেই উপলক্ষ্যে এলাহি ভোজের আয়োজন করা হলো যেখানে অকর্মণ্য ভট পুরোহিতরা পেট পুরে খেল— ভোজে তাদেরই দেওয়া হলো অগ্রাধিকার; আর খাবারের অবশিষ্টাংশ পরিবেশন করা হলো সেই অজ্ঞ শূদ্রদের, যারা উঠোনে লম্বা লাইনে বসে খাবারের অপেক্ষায় ছিল— কাউকে শুধু ভাত দেওয়া হলো, কাউকে শুধু ডাল, আর কাউকে কোনো খাবার না দিয়েই তাড়িয়ে দেওয়া হলো। এভাবেই শূদ্রদের সেই ‘ভোজ’ দিয়ে আপ্যায়িত করা হলো। এরপর ভট পুরোহিতরা অজ্ঞ শূদ্রদের মনে তাদের জাদুমন্ত্র ও বৈদিক বিদ্যার মাহাত্ম্য গেঁথে দেওয়ার জন্য এক সুপরিকল্পিত প্রচার অভিযান শুরু করল। তারা কেন ইংরেজদের এই গণভোজে আমন্ত্রণ জানায় না, তা এক রহস্যই রয়ে গেল।
জোতিরাও: শিয়ালের মতো ধূর্ত এই ভট পুরোহিতরা এবং ধর্মের এই ভাড়াটে কারবারিরা— যারা সামান্য কিছু খাবারের টুকরোর আশায় কুকুরের মতো লেজ নাড়ায়— তাদের অসংখ্য দেবতার মূর্তির সামনে যদি অসংখ্যবার অবিরাম জপ এবং যজ্ঞও করে— যে জপগুলো আসলে কুকুরের ঘেউঘেউয়ের মতোই শোনায়— তবুও কি তারা এই ভোজের একটি অংশও সেই সাহসী ইংরেজদের তাদের ইষ্টদেবতার প্রসাদ হিসেবে অর্পণ করার সাহস দেখাবে?
ধোণ্ডিবা: যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়! একটি কচি ঘোড়াকে বাগে আনতে তার পাছায় সামান্য খোঁচাই যথেষ্ট, একটি তেজি ঘোড়াকে দ্রুত ছোটানোর জন্য একটি সংকেতই যথেষ্ট। ঠিক একইভাবে, এই কথাগুলোই সেই অর্থপিশাচ ভট পুরোহিতদের জন্য পর্যাপ্ত সতর্কতা হওয়া উচিত— যেমনটি সেই বিজ্ঞ প্রবাদে বলা হয়েছে, ‘একবার যার চুন খেয়ে গাল পুড়েছে, সে দই দেখলেও ভয় পায়!’
জোতিরাও: তোমার যেমন ইচ্ছা! নিজেদের আলোকিত বলে দাবি করা আধুনিক কালের ভটরা তাদের জাদুমন্ত্র, জপ ও বৈদিক বিদ্যাকে যেভাবে খুশি সাজিয়ে পুনের গলিতে গলিতে ফেরি করে বেড়াতে পারে। তাতে কারো কিছু যায় আসে না। এই সম্প্রদায়েরই একজন— নির্লজ্জ, বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞ, নপুংসক ও অপদার্থ দ্বিতীয় বাজিরাও সাতারা দুর্গে ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের বংশধরকে বন্দি করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল। সে দিনরাত মাঠে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটা দরিদ্র ও অজ্ঞ শূদ্রদের রক্তঘাম দিয়ে অর্জিত অর্থ থেকে নির্লজ্জভাবে কর আদায় করত এবং সেই টাকা থেকে ধামধেরের মতো কাপুরুষকে সর্দার হিসেবে সনদ প্রদান করেছিল। এমনকি যখন কমিশনার সাহেব এই সনদ দিচ্ছিলেন, তিনিও হয়তো মনে মনে আনন্দিত হয়েছিলেন; অন্যদের কথা আর কী বলব! পেশোয়া ও তার উপদেষ্টারা পর্বতীর মতো অনেক ধর্মীয় কম্প্লেক্স ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল এবং সেখানে প্রতিদিন তাদের নিজ জাতের (ভট) স্থূলকায় ও অলস ব্যক্তিদের জন্য এলাহি ভোজের ব্যবস্থা করত। অথচ তারা অন্ধ, খোঁড়া, অসহায় মানুষ, শূদ্র বিধবা বা তাদের ছোটো সন্তানদের কথা মনেও করত না। কী নিদারুণ উদাসীনতা ও নিষ্ঠুরতা!৭ যারা তাদের মিথ্যা ও চাতুর্যপূর্ণ ধর্মীয় বইগুলো পাঠ করত সেইসব ভটদের বার্ষিক আর্থিক দক্ষিণা দেওয়ার প্রথাও তারা চালু করেছিল। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় যে, ভটদের এই প্রকাশ্য অন্যায় ও অবিচারগুলো আজও সরকার নির্বিঘ্নে চলতে দিচ্ছে। সরকারের এই উদাসীনতা কি তাদের ন্যায়বিচার, প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক প্রশাসনের উপর কলঙ্ক লেপন করছে না? এই সমস্ত অপব্যয় আসলে নিরর্থক এবং এতে ভট সম্প্রদায় ছাড়া আর কারো কোনো উপকার হয় না। এই অকৃতজ্ঞ, হৃষ্টপুষ্ট ও অলস ষাঁড়ের মতো গুণ্ডারা তাদের অন্নদাতা অজ্ঞ শূদ্রদের বাধ্য করে তাদের নোংরা পা ধুয়ে সেই জল পান করতে। তারা কালোজাদু ও কুসংস্কারে ভরা মিথ্যা ধর্মীয় গল্পের মাধ্যমে তাদের মনকে বিভ্রান্ত করে। এই রক্ষণশীল ভটদের পূর্বপুরুষরা তাদের নিজেদের আধ্যাত্মিক গ্রন্থ বিখ্যাত ‘মনুসংহিতা’র নীতিগুলো লঙ্ঘন করে কীভাবে এমন চরম অভদ্রতা ও ধর্মদ্রোহিতা করার সাহস পেয়েছিল? যদি তাদের মধ্যে দেরিতে হলেও শুভবুদ্ধির উদয় হয়, তবে সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষা না করেই তাদের উচিত ‘সর্বজনিক ভট সভা’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলা, যাতে অলস ভটরা শূদ্রদের ঘাম ঝরানো আয়ে পেট ভরানো বন্ধ করে। তবেই হয়তো তাদের ধর্মীয় শিক্ষা ‘বিধবা বিবাহ’ (১৮৬৫ সালে পুনেতে শুরু হওয়া আন্দোলন) প্রচারের ক্ষেত্রে কিছুটা কাজে লাগবে। কিন্তু বড়ো বড়ো নামে জনহিতকর প্রতিষ্ঠান খুলে তুচ্ছ বিষয়ে মাথা ঘামানো আর আসল বিষয় এড়িয়ে গিয়ে অজ্ঞ শূদ্রদের প্রতারিত করা ভটদের উচিত নয়। মারাঠিতে একটি উপযুক্ত প্রবাদ আছে— ‘গরু খোঁড়া, অথচ সে গ্রামের পাশের চারণভূমিতেও ঘাস খেতে অস্বীকার করে’। এসবই অত্যন্ত অদ্ভুত। ইংরেজ, স্কটিশ ও আমেরিকান মিশনারিরা তাদের প্রভু যিশু খ্রিস্টের (তাদের বলীরাজা) পবিত্র নির্দেশে অনুপ্রাণিত হয়ে এক মহান কাজ করছেন— তা হলো আমাদের অজ্ঞ শূদ্র ভাইদের ভটদের চাপিয়ে দেওয়া অমানবিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করা। এই মিশনারিরা ও আমাদের শূদ্র ভাইয়েরা নিশ্চিতভাবেই একে অপরকে রক্ত সম্পর্কের ভাইয়ের মতো আলিঙ্গন করবে। ভটদের জন্য এটাই মঙ্গলজনক হবে যে, তারা যেন এই শুভ পরিণতির পথে কোনো বাধা সৃষ্টি না করে। অনেক হয়েছে তাদের শয়তানি! ধিক্কার জানাই তাদের খাদ্য, রুটি, ভাত আর ডালের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রহস্যকে!৮
ধোণ্ডিবা: স্যার, আপনি আগে বলেছিলেন যে, এমন কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি বিভাগ নেই, যেখানে ভটরা (ব্রাহ্মণ) নেই। যদি তাই হয়, তবে তাদের প্রধান কর্মকর্তা কে?
জ্যোতিরাও: বংশানুক্রমিক ওয়াতানদাররা— (ভট কুলকার্নিরা— যাদের কাজের বিনিময়ে, অর্থাৎ হিসাবরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য কিছু জমি দেওয়া হয়েছিল এবং সেই জমির উৎপাদিত ফসল ভোগ করার অধিকার ছিল)— তারাই হলো সকল কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রধান। অধিকাংশ ইংরেজ কালেক্টররা দয়ালু ছিলেন; তাঁরা এই ভট কর্মকর্তাদের দ্বারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে নির্যাতিত অজ্ঞ শূদ্রদের প্রতি করুণা বোধ করতেন। তাই, কুলকার্নিরা যেভাবে শূদ্রদের উপর অত্যাচার চালাত, সে বিষয়ে তাঁরা তাঁদের ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে অনেক রিপোর্ট জমা দিয়েছিলেন। তাঁরা আইনের মাধ্যমে কুলকার্নিদের অধিকার সংকুচিত করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন নিয়মের বেড়াজালে তাদের হাত-পা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। অনেকভাবেই কালেক্টরদের দ্বারা তাদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শূদ্রদের উপর কলমধারী কসাই কুলকার্নিদের দাপট তাদের কুৎসিত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আজও অবাধে চলছে। এই কসাইরা শয়তানের মতো গ্রামের ‘চৌড়িতে’ (গ্রামের সরকারি বিশ্রামাগার বা অফিস) জেঁকে বসে আছে এবং নিজেদের কলঙ্কিত ধর্মের আড়ালে থেকে বলীরাজার (খ্রিস্টের) আদর্শ ও শিক্ষার বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া ও সমালোচনা করার জঘন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এভাবে তারা কুৎসিত উপায়ে অজ্ঞ শূদ্রদের মন কলুষিত করার চেষ্টা করে। অন্যথায়, নিরক্ষর শূদ্ররা কীভাবে খ্রিস্টের এই শিক্ষার তীব্র সমালোচনা ও ঘৃণা করতে শিখত? তোমার কাছে যদি অন্য কোনো কারণ জানা থাকে, তবে আমাকে বলো। এও সম্ভব যে, এই কুলকার্নিরা গ্রামের ‘চৌড়িতে’ বসে সরকারের যে কোনো নিয়মকে যথেচ্ছভাবে ভুল ব্যাখ্যা করছে অথবা তাদের ধূর্তামিপূর্ণ ও অনিষ্টকারী কুযুক্তি দিয়ে সেটিকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে বিকৃত ব্যাখ্যা করছে। তারা সবসময় এ ধরনের অজুহাতের সন্ধানে থাকে। এও হতে পারে যে, কুলকার্নিরা গোপনে শূদ্রদের ইংরেজি সরকারকে ঘৃণা করতে শেখাচ্ছে। এই ধূর্ত কুলকার্নিদের দ্বারা শূদ্ররা এতটাই আতঙ্কিত ও বশীভূত যে, তারা সজাগ থেকে তাদের উপর হওয়া অন্যায়ের এক ভগ্নাংশও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে রিপোর্ট করার সাহস পায় না। কালেক্টরেট থেকে শুরু করে উচ্চতর সরকারি দপ্তরের সমস্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাই তো ব্রাহ্মণ— অর্থাৎ কুলকার্নিদেরই স্বজাতীয়! (তথ্য: হেনরি মিড রচিত ‘দ্য সিপয় রিভল্ট’, অধ্যায় ৪)
সরকারের উচিত শূদ্রদের উপর করা এই অনিষ্টের বিষয়ে সজাগ হওয়া ও প্রতিটি গ্রামে অন্তত একজন ইংরেজ বা স্কটিশ ধর্মপ্রচারক নিয়োগ করা এবং তাঁদের জীবিকা নির্বাহের জন্য সেখানে নিষ্কর জমি ‘ইনাম’ হিসেবে বরাদ্দ করা। সরকারকে আরও বাধ্যতামূলক করতে হবে যে, উক্ত ধর্মপ্রচারক বছরে অন্তত একবার সেই গ্রামের প্রকৃত অবস্থা— কীভাবে কুলকার্নিরা শূদ্রদের মন কলুষিত করছে ইত্যাদি— সম্পর্কে রিপোর্ট পেশ করবেন। এই ব্যবস্থা ভবিষ্যতে নানার (পেশোয়া) মতো কোনো ভটকে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংগঠিত করা থেকে বিরত রাখবে। সে শাহ দাওয়াল পীরের সামনে শিবের লিঙ্গমূর্তি নিয়ে গ্রামীণ মেলার আয়োজন করার যতই চেষ্টা করুক না কেন, কিংবা একই সময়ে প্রতিটি ঘরে ঘরে ঐশ্বরিক ‘প্রসাদ’ হিসেবে চাপাতি (চ্যাপ্টা রুটি), চাল-তরকারি পৌঁছে দিয়ে শূদ্রদের গলায় সেই প্রসাদ জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুক না কেন, ঐতিহ্যবাহী কুলকার্নিদের একতা ভবিষ্যতে এমন কোনো দুঃসাহসী ব্যক্তিকে বিন্দুমাত্র সাহায্য করতে পারবে না। যতক্ষণ না এটি করা হচ্ছে, ততক্ষণ অজ্ঞ শূদ্রদের স্বার্থ নিশ্চিত ও সুরক্ষিত হবে না। যখন এই বিদেশি মিশনারিরা অজ্ঞ শূদ্রদের প্রকৃত জীবনদায়ী জ্ঞান দিয়ে তাদের চোখ খুলে দেবেন, তখন শূদ্ররা নিশ্চিতভাবেই এই গ্রাম্য দানবদের প্লেগ রোগীর মতো এড়িয়ে চলবে। সরকারের উচিত একটি বিশেষ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেখানে পাতিল ও কুলকার্নি পদের প্রার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে এবং যোগ্যতার ভিত্তিতেই তাদের নির্বাচন করতে হবে। আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ করছি— কুলকার্নিদের কাজ যেন শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ প্রার্থীদের হাতেই ন্যস্ত করা না হয়। এর ফলে কোনো বাড়তি ঝামেলা ছাড়াই কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব হবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহ তৈরি হবে। প্রয়োজনে আমাদের দয়ালু ও উদার সরকারের উচিত শিক্ষা বিভাগের সমস্ত অনুদান বন্ধ করে দেওয়া, কারণ সেগুলো কোনো কার্যকর উদ্দেশ্যে কাজে আসছে না। পরিবর্তে সেই অর্থ সমস্ত কালেক্টরদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা উচিত। সরকারের উচিত নিরপেক্ষভাবে সকল সম্প্রদায় থেকে মেধাবী ছেলেদের বেছে নেওয়া, তাদের সাধারণ খাবার ও পোশাকের ব্যবস্থা করা এবং কালেক্টরদের নির্দেশ দেওয়া যাতে তাঁরা তাঁদের বাংলোর কাছেই অন্তত একটি সরকারি স্কুল খোলেন (যেমনটি পুনের কালেক্টর মিস্টার জার্ভিস ইতিপূর্বেই করেছেন)। তাদের এমনভাবে শিক্ষা দিতে হবে যাতে তারা পাতিল, কুলকার্নি ও গ্রাম্য শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করতে পারে। এই বিষয়গুলোতে তাদের পরীক্ষা নিতে হবে এবং সফলভাবে কোর্স সম্পন্ন করার পর সরকার তাদের অবিলম্বে এই পদগুলোতে নিযুক্ত করবে। এই অভিনব পদ্ধতিটি নীতিহীন কুলকার্নিদের গোষ্ঠীকে নানার (পেশোয়া) মতো বদমাশদের জঘন্য পরিকল্পনায় সাহায্য ও প্ররোচনা দেওয়া থেকে বিরত রাখবে। তারা অজ্ঞ শূদ্রদের তাদের জমি থেকে বঞ্চিত করতে ও তাদের পরস্পরের মধ্যে বিবাদের বীজ বপন করতেও সক্ষম হবে না। সরকার এ পর্যন্ত শিক্ষা বিভাগে কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে, কিন্তু সেই তুলনায় শিক্ষিত শূদ্রদের সংখ্যা তাদের জনসংখ্যার অনুপাতে খুবই নগণ্য। মাহার, মাং ও মুচিদের মধ্যে কোনো শিক্ষিত কর্মকর্তা নেই। তাহলে তাদের মধ্য থেকে একজন স্নাতক খুঁজে পাওয়া কতটা কঠিন! এই কুখ্যাত ভট শিক্ষকরা শিক্ষা বিভাগের মতো একটি মহৎ বিভাগের উজ্জ্বল ভাবমূর্তিতে কতই না কলঙ্ক লেপন করেছে। তারা ঠিক তেতো করলার মতো, সরকার সিরাপে ডুবিয়ে বা ভেজে তাকে মিষ্টি করার যতই চেষ্টা করুক না কেন, তা যেমন ছিল তেমনই তেতো রয়ে গেছে। অর্থাৎ, ভট শিক্ষক সমাজ তাদের পুরোনো পৈশাচিক চরিত্রই ধরে রেখেছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, মানুষের স্বভাব অপরিবর্তনীয়!
ধোণ্ডিবা: এই কুলকার্নিরা কীভাবে অজ্ঞ শূদ্রদের তাদের পৈত্রিক জমি থেকে বঞ্চিত করে?
জ্যোতিরাও: অনেক কুলকার্নি চরম বিপদে পড়া কোনো নিরক্ষর শূদ্রকে পাকড়াও করে, তাদের টাকা ধার দেয় এবং নিজেদের অনুকূলে বন্ধকি দলিলে সই করিয়ে নেয়। কুলকার্নিরা সেই নিরক্ষর শূদ্রদের কাছে দলিলটি যেভাবে পড়ে শোনায়, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক কঠিন ও জটিল সব শর্ত সেই দলিলে ঢুকিয়ে দেয়। তাদের এই জঘন্য কাজে সাহায্য করে তাদেরই স্বজাতীয় অন্য কুলকার্নিরা। সহজ-সরল নিরক্ষর শূদ্ররা এই বন্ধকি দলিলে তাদের টিপসই দিয়ে দেয়। সময়ের সাথে সাথে এই লোলুপ কুলকার্নিরা শূদ্রদের সেই জমি আত্মসাৎ করে নেয়, যা শূদ্রদের জন্য চিরস্থায়ী অনুতাপ ও চরম দারিদ্র বয়ে আনে।
ধোণ্ডিবা: এই ‘কলমধারী কসাই’ কুলকার্নিরা নিরক্ষর শূদ্রদের ঠিক কী ধরনের বিবাদে জড়িয়ে ফেলে?
জ্যোতিরাও: এমন বিবাদের সংখ্যা অসংখ্য। এগুলি মূলত তাদের খেত বা খেতের সীমানা নিয়ে। এছাড়া শূদ্ররা বছরে নির্দিষ্ট কিছু উৎসব পালন করে, যেমন— ‘বেন্দুর’ (বুনো ষাঁড় বা বলদের উৎসব) বা ‘শিরাল শেঠ’-এর বার্ষিকী।৯ সাধারণত এই উপলক্ষ্যে শোভাযাত্রা বের করা হয় এবং রাস্তার বাম পাশ দিয়ে নাকি ডান পাশ দিয়ে শোভাযাত্রা যাবে, তা নিয়ে প্রায়ই বিবাদ বাধে। ফালগুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে সম্মিলিত ‘হোলি’ বা ন্যাড়াপোড়া উৎসব পালিত হয়। গ্রামবাসীরা এই উৎসবে অংশ নেয়। সাধারণত হোলির আগুনে পিঠের মতো মিষ্টি খাবার নিবেদন করে। শূদ্রদের মধ্যে প্রায়ই এই নিয়ে বিবাদ বাধে যে, কার আচারগত পিঠা আগে নিবেদন করার অগ্রাধিকার থাকবে। ধোণ্ডিবা, তুমি যদি এই ধরনের সমস্ত ঘটনা খতিয়ে দেখো, তবে দেখতে পাবে যে এই বিবাদগুলোর মূলে সব সময়ই থাকে কুলকার্নিরা। তারাই নিরক্ষর শূদ্রদের মধ্যে এই বিবাদগুলো বাঁধিয়ে দেয়।
ধোণ্ডিবা: শূদ্রদের মধ্যে এই বিবাদ বাঁধিয়ে দিয়ে এই কসাইদের কী লাভ হয়?
জ্যোতিরাও: এমন উদাহরণের অভাব নেই যেখানে অনেক নিরক্ষর শূদ্র নিজেদের মর্যাদাপূর্ণ বংশের দাবি করে স্রেফ তুচ্ছ আভিজাত্যের লড়াইয়ে একে অপরের সাথে তিক্ত বিবাদে লিপ্ত হয়। এই বিবাদের ফলে তারা পুরোপুরি দেউলিয়া হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত যারা তাদের সর্বস্বান্ত করেছে— সেই কলমধারী কসাইদের ঘরের চাল ছাইবার মতো চরম দুর্দশার কাজে নামতে বাধ্য হয়। এই কলমধারী কসাইদের (যারা অনিষ্টকারী নারদের একনিষ্ঠ অনুসারী) চক্রান্তের কারণে দেওয়ানি, ফৌজদারি ও রাজস্ব আদালতে ঝুলে থাকা মামলার খরচ মেটাতে শূদ্রদের বিশাল ঋণের জালে জড়িয়ে পড়তে হয়। এই লোভী ভট কেরানি, তহশিলদার ও কালেক্টরদের ব্যক্তিগত সচিবরা— যারা চিটনিস নামে পরিচিত— তাদের পবিত্র গায়ত্রী মন্ত্রের মহৎ অর্থ ও শিক্ষাকে পুরোপুরি লঙ্ঘন করে। ‘আসুন আমরা সূর্যদেবতার সেই পরম তেজকে প্রার্থনা করি যা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতাকে উদ্দীপিত করবে’— এই মন্ত্রের বদলে তারা শূদ্রদের শেষ সম্বলটুকু লুট করার চেষ্টা করে। তারা হয়তো নিজেদের ধর্মাবলম্বীদের সর্বস্বান্ত করা মুসলিম মোল্লাদের কাছ থেকে ঘুষের দীক্ষা নিয়েছে , যাদের মন্ত্র হলো— ‘দয়া করে আমাদের আপনার যৎসামান্য দানটুকু অর্পণ করুন’। সে হিন্দু হোক বা মুসলমান— এই লোভী রাজস্ব কর্মকর্তারা পদ্ধতিগতভাবে নিজেদের ধর্মাবলম্বীদেরই লুণ্ঠন করে। এই সব কিছুই আসলে ভট উকিল ও আদালতের অন্যান্য দালালদের স্বার্থসিদ্ধি করে, যারা প্রচুর ধনসম্পদ পুঞ্জীভূত করে রাজকীয় ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে তাদের দরিদ্র ও নিরক্ষর ভাইদের উপর প্রভুত্ব করে। তুমি সিভিল জজদের হাবভাবও লক্ষ করো, যারা এমন আচরণ করে তারা যেন এক-একজন মস্ত নবাব। এই বিচারিক ব্যবস্থা সচল থাকায় কেউ হয়তো আশা করতে পারেন যে, গরিব কৃষকরা সস্তায় এবং দ্রুত বিচার পাবে। কিন্তু বাস্তব তার ঠিক উল্টো! এই কারণেই মফস্বল এলাকায় একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে যে, ‘যতক্ষণ না ভট কর্মকর্তাদের হাত গরম (ঘুষ দেওয়া) করছো, তারা আমাদের মামলা ছুঁয়েও দেখবে না’। তোমাকে অবশ্যই ব্রাহ্মণ কর্মকর্তাদের (তাদের নাম অভিশপ্ত হোক!) ঘুষ দেওয়ার জন্য সাথে কিছু টাকা নিয়ে যেতে হবে, তবেই তুমি তাদের কাছে যাওয়ার সাহস করতে পারো।
ধোণ্ডিবা: যদি পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় হয়, তবে শূদ্ররা কেন ইংরেজ কালেক্টরদের সাথে দেখা করে তাঁদের কাছে নিজেদের অভিযোগগুলো তুলে ধরে না?
জ্যোতিরাও: যারা একটি অক্ষরও পড়তে পারে না, চরম অজ্ঞতার কারণে যারা ভয়ে কুঁকড়ে থাকে এবং বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়, সেই শূদ্রদের কাছ থেকে তুমি কীভাবে আশা করো যে, তারা ইংরেজ কর্মকর্তাদের সামনে সাহসের সাথে দাঁড়াবে এবং ধারাবাহিকভাবে ও সুশৃঙ্খলভাবে তাদের অভিযোগগুলো জানাবে? ধরো, কোনো এক অর্ধনগ্ন শূদ্র যদি দুই হাতে সাহস সঞ্চয় করে তাঁর ব্যক্তিগত পরিচারকের মূল্যবান সহায়তায় গোপনে ইংরেজ কালেক্টরের সামনে হাজির হয় এবং কালেক্টরকে মিনতি করে জানায় যে, তার মামলাটি সঠিকভাবে দেখা হচ্ছে না, তবে সেই মুহূর্তেই আকাশ ভেঙে তার মাথার উপর পড়বে। কারণ, কালেক্টরের অফিসের ভট কর্মকর্তাদের (ব্যক্তিগত সচিব থেকে শুরু করে নিচের তলা পর্যন্ত) সাথে রাজস্ব বিভাগ ও বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের একটি নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। তারা অবিলম্বে নিজেদের মধ্যে গোপনে এই খবরটি ছড়িয়ে দেয় (সেই মোল্লাদের ঘুষ খাওয়ার অভ্যাসের মতোই...)। এরপর তারা উপযুক্ত নথিপত্র ও দলিলের সাহায্যে জালিয়াতি করে মিথ্যা প্রমাণ তৈরি করে। এই কসাইদের কেউ কেউ বাদীর পক্ষে সাক্ষী হয়, আর বাকিরা হয় বিবাদীর পক্ষে। তারা এটা নিশ্চিত করে যেন মামলাটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায় (যাতে বিভ্রান্তি আরও চরম আকার ধারণ করে)। এর ফলে জট ও বিভ্রান্তি এতটাই বেড়ে যায় যে, অত্যন্ত বুদ্ধিমান ইংরেজ কালেক্টর ও ইংরেজ বিচারকরাও সেই দুর্বোধ্য প্রমাণের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যান। তাঁরা প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য যতই চেষ্টা করুন না কেন, সঠিক সত্যের তল খুঁজে পেতে ব্যর্থ হন। এমনকি সদিচ্ছা থাকা ইংরেজ কর্মকর্তারাও তখন সেই অর্ধনগ্ন শূদ্রটিকে একজন ঝগড়াটে ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করতে বাধ্য হন এবং তাকে খালি হাতে বিদায় করে দেন যাতে সে নিজের গ্রামে গিয়ে সবার কাছে নিজের দুঃখের কথা বলে বেড়ায়। আদালত ও সরকারি দফতরগুলোতে এই ভট কসাইদের অশুভ চক্রান্তের দ্বারা প্রতারিত ও প্রবঞ্চিত হয়ে চরম হতাশায় অনেক শূদ্র আত্মহত্যা করতেও বাধ্য হয়েছে। কেউ কেউ অক্ষম ক্রোধ ও অসহায়ত্বের কারণে পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে; আবার এমন অনেকেই আছে যারা উসকোখুসকো চুলে, না-কামানো দাড়িতে আধপাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় এবং পথে যার সাথেই দেখা হয় তাকেই নিজের দুর্ভাগ্য ও দুঃখ-দুর্দশার কথা জানানোর চেষ্টা করে। এটা কত বড়ো এক করুণ দৃশ্য!
ধোণ্ডিবা: মামলতদাররা যদি ভট সম্প্রদায়ের হয়, তবে তারাও কি অজ্ঞ শূদ্রদের শোষণ করে?
জ্যোতিরাও: এমন অনেক ভট মামলতদার ছিল যারা তাদের অসদাচরণের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েছে এবং তাদের অপরাধের জন্য সরকার কর্তৃক শাস্তিও পেয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে তারা এতটাই জঘন্য আচরণ করতো এবং গরিব কৃষকদের উপর এত বেশি অত্যাচার চালাতো যে, তাদের কুকর্মের কথা লিখতে গেলে একটি আস্ত বই হয়ে যাবে। এমনকি পুনের মতো শহরেও ভট মামলতদাররা আবেদনকারীদের সামাজিক মর্যাদা বা বিশ্বস্ততা বিষয়ে স্বনামধন্য মহাজনদের দেওয়া গ্যারান্টি-পত্র গ্রহণ করতে অস্বীকার করে, অথচ কুলকার্নিদের দেওয়া শংসাপত্র সানন্দে গ্রহণ করে। তাহলে গরিব শূদ্রদের দশা কী হবে, একবার ভেবে দেখো! এটা বলাই বাহুল্য যে, কুলকার্নিরা মোটা অঙ্কের ঘুষ পাওয়ার পরই মানুষের যোগ্যতার বা মর্যাদার এ ধরনের শংসাপত্র ইস্যু করে। পুনের পৌর কর্তৃপক্ষ কোনো বাড়ির মালিককে পুরনো শৌচাগারের জায়গায় নতুন শৌচাগার নির্মাণ করতে দেয় না, যতক্ষণ না সে মামলতদারের অনুমোদনের চিঠি জমা দিচ্ছে— যে চিঠিটি আবার আগে কুলকার্নি কর্তৃক সুপারিশকৃত হতে হয়। কুলকার্নির অফিসে ওই এলাকার কোনো ম্যাপ থাকে না এবং সম্প্রতি ওই এলাকায় সম্পত্তি কেনা নতুন নাগরিকদের নাম সম্বলিত কোনো রেজিস্টার রাখার ব্যবস্থাও সেখানে নেই; এমনকি এমন কোনো রেজিস্টারের অনুলিপি মামলতদারের অফিসেও রাখা হয় না। এই পরিস্থিতিতে, সেই সম্পত্তি— বাড়ি সম্পর্কে কুলকার্নির অনুমোদনের চিঠিকে কেউ কীভাবে নির্ভরযোগ্য বলে মেনে নিতে পারে? তাই কেউ যদি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ভট মামলতদাররা কেবল তাদের নিজস্ব সম্প্রদায়ের এই কলমধারী কসাইদের সুবিধা করে দেওয়ার হীন উদ্দেশ্যেই এই অবৈধ প্রক্রিয়া চালু করেছে এবং তা বজায় রেখেছে, তবে তা ন্যায়সঙ্গত হবে। এখন ধোণ্ডিবা, একটু ভেবে দেখো— যেখানে অনেক ইংরেজ কর্মকর্তা বসবাস করেন, সেই পুনের মতো শহরেই যদি ভট মামলতদাররা এমন স্বৈরাচারী ও নিপীড়কের মতো আচরণ করে আর নিজেদের স্বজাতীয় কলমধারী কসাইদের উপর করুণা বর্ষণ করে, তবে মফস্বল এলাকাগুলোতে তারা সাধারণ মানুষের উপর কতটা বেশি স্বৈরাচারী আচরণ (অত্যাচার) করে! তুমি বলতে পারো না যে আমার এই ধারণা ভুল। তা না হলে, আমরা কেন গ্রামের পর গ্রাম থেকে গরিব শূদ্রদের খাজনার রেকর্ড হাতে কাজ হাসিল করার জন্য এই ভট কর্মকর্তাদের পিছনে উন্মত্তের মতো ছুটতে দেখি? সুতরাং, এটিই প্রমাণ করে যে আমার ধারণা সঠিক।
একজন আবেদনকারী বলেছে— ‘কুলকার্নির হস্তক্ষেপের কারণে ভট মামলতদার সময়মতো আমার আবেদন গ্রহণ করেনি। ফলে বিবাদী পক্ষ আমার সমস্ত সাক্ষীকে ভয় দেখিয়ে ও প্রলোভন দিয়ে বিরুদ্ধাচরণ করতে প্ররোচিত করে, যার পরিণতিতে আমার মামলার জন্য আমাকে জামানত দিতে হয়।’ অন্য একজন দাবি করেছে যে, ভট মামলতদার তার আবেদনটি সময়মতো গ্রহণ করলেও সেটি আজ পর্যন্ত চেপে রেখেছে, অথচ পরদিনই সে বিবাদী পক্ষের আবেদনটি চটজলদি গ্রহণ করে নিয়েছে এবং তার নিজের জমিতে চাষাবাদ করার অধিকারকে চ্যালেঞ্জ করে তাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে।
আরেকজন বলেছে— ভট মামলতদার আমার জবানবন্দি— আমি যা বলেছিলাম সেভাবে রেকর্ড করেনি এবং পরে আমার সেই জবানবন্দি ব্যবহার করেই আমার মামলাটি নিয়ে এমন এক বিভ্রান্তি তৈরি করেছে যা আমাকে প্রায় পাগল করে দিয়েছে।’ অন্য একজন বলেছে— ‘আমার প্রতিপক্ষ ভট মামলতদারের সাথে যোগসাজশ করে আমার নিজের জমিতে চাষ করার অধিকারকে চ্যালেঞ্জ করেছিল এবং অননুমোদিতভাবে আমার চাষের খেতে নতুন মৌসুমের বীজ বপন করেছিল। এর প্রতিবাদে আমি মামলতদারের অফিসে গিয়েছিলাম, তাকে পরম শ্রদ্ধায় নমস্কার করেছিলাম, একটি শব্দও উচ্চারণ না করে আমার আবেদনটি তার হাতে তুলে দিয়েছিলাম এবং ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে হাত জোড় করে তার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। এতে মামলতদার স্বয়ং মৃত্যুর দেবতা যমের রূপ ধারণ করে আমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো, তারপর অবজ্ঞার সাথে আমার আবেদনটি আমার দিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আদালত অবমাননার দায়ে আমাকে জরিমানা করলো। জরিমানা দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় আমাকে কয়েক দিন কারাবাস করতে হয়েছিল।’ কী অদ্ভুত বিচার!
একজন বলেছে— ‘আমার প্রতিপক্ষ বেআইনিভাবে আমার অনেক যত্নে চাষ করা— আগাছা পরিষ্কার করে বীজ বোনা খেতটি দখল করে নিয়েছে। এই বিষয়ে আমি ইংরেজ কালেক্টরের কাছে দুই— তিনটি আবেদন পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু কালেক্টরের ভট সচিব সেই সবকটি আবেদন চেপে রেখেছিল, ফলে সেগুলোর আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এখন আমি কী করব?’ কেউ একজন বলেছে— ‘কালেক্টরের ভট সচিব ইংরেজ কালেক্টরের সামনে আমার আবেদনটি পড়ার সময় তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দিয়ে পড়েছিল, যার ফলে কালেক্টর সেই ভট মামলতদারের রায়কেই বহাল রাখেন।’ অন্য একজন বলেছে— ‘ইংরেজ কালেক্টর আমার আবেদনের পক্ষেই রায় দিয়েছিলেন, কিন্তু ভট সচিব তা বদলে দেয়। সে কালেক্টরের সামনে তার মৌখিক আদেশটি সঠিকভাবে পড়ে শোনায় ঠিকই, কিন্তু আবেদনের কাগজে আমার বিরুদ্ধে একটি বিপরীত রায় লিখে রাখে, যা কালেক্টর সরল বিশ্বাসে স্বাক্ষর করে দেন। যখন আমি কালেক্টরের সেই লিখিত রায় হাতে পেলাম, তখন আমি নিজের ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়ে বললাম যে, এই ব্রাহ্মণ কর্মকর্তারা যে কোনো মূল্যে তাদের অসৎ উদ্দেশ্যগুলোকে ইংরেজ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মঞ্জুর করিয়ে নেওয়াটা নিশ্চিত করে ছাড়ে।’
অন্য একজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বলেছে, যখন সে কালেক্টরের কাছ থেকে বিচার পেতে ব্যর্থ হয়, তখন সে রাজস্ব কমিশনারের কাছে দু-তিনবার আবেদন করে। কিন্তু সেই অফিসে কর্মরত ভট কর্মকর্তারা তার মামলাটিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে। কমিশনার সেই নথিপত্রগুলো কালেক্টরের মতামতের জন্য পুনরায় তার কাছে পাঠিয়ে দেয়। কালেক্টরের অফিসের ভট কর্মকর্তারা তার নথিপত্রগুলো কালেক্টরের সামনে কারসাজি করে তার মূল আবেদনটিই বদলে দেয় এবং তার সম্পর্কে এমন ধারণা দেয় যে, সে একজন খুব ঝগড়াটে মামলাবাজ; ফলে কালেক্টর সেই ভট কর্মকর্তাদের কথামতোই আবেদনের উপর একটি রায় লিখে তা রাজস্ব কমিশনারের কাছে ফেরত পাঠিয়ে দেন। এমন এক নিদারুণ পরিস্থিতিতে একজন মানুষ কী-ই বা করতে পারে? আরেকজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বলেছে— ‘যখন আদালতে আমার মামলার শুনানি শুরু হলো, আদালতের কেরানি সেই কাজে নাক গলাতে চেষ্টা করে, যার ফলে বিচারক তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন— চুপ করুন, বাধা দেবেন না! এরপর বিচারক ব্যক্তিগতভাবে আমার নথিপত্রগুলো খুঁটিয়ে দেখেন। কিন্তু সেই বেচারা বিচারকই বা কী করবেন, যখন কালেক্টর অফিসের ভট কর্মকর্তারা কুলকার্নির পরামর্শ অনুযায়ী আমার মামলার আবেদনটিকেই সম্পূর্ণ বিকৃত করে রেখেছে?’
আরেকজন ক্ষতিগ্রস্ত শূদ্র বলেছে যে, সে ভট কর্মকর্তাদের ঘুষ হিসেবে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়েছে যে তার ফলে সে তার ঘরবাড়ি, খেতখামার, জমির ফসল এবং ঘরের সমস্ত অলঙ্কার হারিয়েছে। তার স্ত্রীর গায়ে একটিও সোনার গয়না অবশিষ্ট নেই। ‘যখন আমরা না খেয়ে মরতে বসলাম, তখন আমার ছোটো ভাইরা রাস্তা তৈরির কাজে মজুর হিসেবে কাজ করতে শুরু করে।’ সেখানেও ভট সুপারভাইজাররা নিজের হাতে কোনো কায়িক শ্রম করে হাত নোংরা করে না; তারা কেবল হাজিরা খাতায় সই করার জন্য প্রতিদিন সকাল-বিকেল একবার করে কাজ পরিদর্শনে আসে। সেই নামমাত্র কাজটুকু করে তারা বাড়ি ফেরার আগে শ্রমিকদের মারাঠি সংবাদপত্রের খবরগুলো পড়ে শোনায়, যেখানে ব্রিটিশ সরকার বা খ্রিস্টান ধর্ম সম্পর্কে নানা কুৎসা রটানো থাকে। কতই না আশ্চর্যের বিষয় যে, সরকার এই ভট সুপারভাইজারদের একজন অদক্ষ শ্রমিকের তুলনায় দ্বিগুণ বেতন দেয়! কোনো মজুর যদি তার অতি সামান্য মজুরি থেকে সেই ভট সুপারভাইজারকে ভাগ (ঘুষ) দিতে ব্যর্থ হয়, তবে ওই সুপারভাইজার তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে মজুরের বিরুদ্ধে নালিশ জানায় আর হাজিরা খাতায় তাকে ওই দিনের জন্য অনুপস্থিত দেখিয়ে দেয়।
কোনো ভট কর্মকর্তা দিনের কাজ শেষ হওয়ার পর দিনমজুরকে আদেশ দেয় তার বাড়িতে বটের পাতা ও কঞ্চি পৌঁছে দিতে, যাতে সেগুলোর সাহায্যে খাবারের জন্য ‘পত্রাবলী’১০ (পাতার থালা) তৈরি করা যায়। অন্য একজন তাকে সন্ধ্যায় নিজের বাড়িতে ডেকে পাঠায়। তৃতীয় একজন তাকে হুকুম দেয় পান বিক্রেতার কাছ থেকে পান চুরি করে আনতে। চতুর্থ ভট কর্মকর্তা তাকে বলে যে, রাতে তার এক লম্পট বিধবার বাড়িতে আমোদ-প্রমোদের পরিকল্পনা আছে, তাই ওই মজুর যেন ডিনারের পর ভাটের বাড়িতে গিয়ে রাতভর তার পরিবারের সদস্যদের পাহারা দেয়। সে সেই মজুরকে এও বলে যে, পরদিন সকালে সে যেন সময়মতো কাজের জায়গায় হাজির থাকে, কারণ বড়ো ইঞ্জিনিয়ারসন্ধ্যায় রাস্তা তৈরির কাজ দেখতে আসবেন। মামলতদার রাওসাহেবের কাছ থেকে সে এই খবর পেয়েছে। আমার ভাইয়েরা প্রতিদিন সন্ধ্যায় কাজের জায়গার এই সব যন্ত্রণা ও ঝামেলার কথা আমাকে শোনায় আর অঝোরে চোখের জল ফেলে। (পাঠকগণ, এই প্রবন্ধের শেষে প্রকৌশল বিভাগের ভট কর্মকর্তাদের নিয়ে লেখা আমার গাথাটি অনুগ্রহ করে পড়বেন— লেখক)। ‘বড়ো ভাই, আমি এখন কী করি? এই সব ভটরাই তো আঠারোটি বর্ণের১১ গুরু বলে দাবি করে। ভটরা আমাদের উপর যতই অত্যাচার করুক না কেন, তাদের সমস্ত জালিয়াতিপূর্ণ ধর্মশাস্ত্র একস্বরে ঘোষণা করে যে, আমরা শূদ্ররা তাদের বা তাদের কুপ্রথাগুলোর সমালোচনা কিংবা বিরোধিতা করতে পারব না। এই কারণেই আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছি। তা না হলে, আমি ইংরেজি শিখতাম এবং নিশ্চিতভাবেই ইংরেজ কর্মকর্তাদের এই ভটদের কুকর্ম ও আমাদের উপর তাদের করা দুর্ব্যবহারের কথা জানাতাম। এর ফলে ভটদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা যেত।’ প্রকৌশল বিভাগে বর্তমানে চলমান কাজের ঠিকাদাররা ভট কর্মকর্তাদের এত অনিয়ম, প্রতারণা ও কুকর্মের কথা রিপোর্ট করে যে, সেগুলোর বর্ণনা করলে অনায়াসেই একটি আস্ত বই হয়ে যাবে। এই বর্ণনায় আজ এখানেই থামছি। সরকারের কর্তব্য হলো প্রকৌশল বিভাগের কাজের উপর কড়া নজর রাখা— যাতে শূদ্রদের উত্থাপিত উপরোক্ত অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা যায় এবং এই অশুভকে ফুলফলসহ নির্মূল করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যায়!
ধোণ্ডিবা: যদি সমস্ত সরকারি দপ্তর মূলত ভট কর্মকর্তাদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণে এই ধরনের অনিয়ম আর অত্যাচার চলতে থাকে, তবে প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক যে, ইংরেজ কালেক্টর সেখানে কী করছেন? কেন তিনি ব্রাহ্মণ কর্মকর্তাদের এই অপকর্মের কথা সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে রিপোর্ট করেন না?
জ্যোতিরাও: লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং ভট কর্মকর্তারা অত্যন্ত ‘দক্ষতার’ সাথে যেভাবে ফাইলগুলো নাড়াচাড়া করে, তাতে ইংরেজ কালেক্টরদের টেবিল নথিপত্রের স্তুপে এতটাই চাপা পড়ে থাকে যে, তাঁদের সময়ের বেশিরভাগটাই অতি জরুরি মামলাগুলোর ফয়সালা করতে এবং সেগুলোতে সই করতেই ব্যয় হয়ে যায়। এই বেচারা অসহায় কালেক্টররা ভট কর্মকর্তাদের অপকর্মগুলো খুঁজে বের করে সরকারের ঊর্ধ্বতনদের কাছে রিপোর্ট করার সময় আর কখন পাবেন?১২ কোঙ্কন অঞ্চলের ব্রাহ্মণ জমিদার বিবাদীরা তাদের শূদ্র প্রজাদের বিরোধিতা করছিল। কিছু দয়ালু ইংরেজ কালেক্টর এই শূদ্র প্রজাদের পক্ষ নিয়ে ব্রাহ্মণ জমিদারদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন এবং শূদ্রদের ন্যায়বিচার পাইয়ে দিতে নিজেদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন। কিন্তু সেই ব্রাহ্মণ ভূস্বামীরা, আমেরিকান ক্রীতদাস মালিকদের থেকে শিক্ষা নিয়ে, তাদের ধূর্ত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ধর্মীয় বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে অজ্ঞ শূদ্রদের মন ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে বিষিয়ে তুলেছে। দয়ালু কালেক্টররা প্রকৃতপক্ষে তাদের হিতাকাঙক্ষী হওয়া সত্ত্বেও, শূদ্ররা তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সেই কালেক্টরদের অনুরোধ করতে শুরু করে যে, তাদের যেন ওই ভট জমিদারদের শাসনেই থাকতে দেওয়া হয়। এই ভট জমিদাররা তাদের শয়তানি চক্রান্তের মাধ্যমে অজ্ঞ শূদ্রদের ভ্রান্ত ধারণাগুলোকে সরকারের সদিচ্ছাসম্পন্ন ও বিশ্বাসপ্রবণ কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেয় আর দাবার চালের মতো অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ইংরেজ কালেক্টরদের চাল রুখে দেওয়ার চেষ্টা করে।
ধোণ্ডিবা: অজ্ঞ শূদ্ররা ধূর্ত ভটদের মিথ্যা ও স্বার্থান্বেষী অপপ্রচারে কান দিয়ে নিজেদের বড়ো বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। তারা যদি এতটাই বোকা হয় যে সরকারের উপর আঘাত হানার জন্য হাত তোলে, তবে তারা নিশ্চিতভাবেই নিজেদের স্বার্থের ক্ষতি করবে। ভটদের দাসত্ব থেকে নিজেদের মুক্ত করার এমন সুবর্ণ সুযোগ শূদ্ররা হয়তো আর কখনোই পাবে না। এই বিপথে চালিত শূদ্রদের বোঝানোর চেষ্টা করা বৃথা। তাই শূদ্ররা যাতে এমন কোনো আত্মঘাতী পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, সেজন্য দয়া করে আমাদের দয়ালু সরকারকে এই বিষয়ের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করুন। এই অজ্ঞ শূদ্রদের উপদেশ দেওয়া এখন নিষ্ফল বলে মনে হচ্ছে। শূদ্রদের কপালে যদি তাদেরই মূর্খতার জন্য নিজেদের ক্ষতি করা লেখা থাকে, তাহলে আপনারই বা কী করার আছে?
জ্যোতিরাও: আমার বক্তব্য কখনোই এমন নয় যে, সরকার ব্রাহ্মণ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেবে না; তবে তাদের সংখ্যা হওয়া উচিত তাদের জনসংখ্যার সংখ্যানুপাতিক। যদি সরকার অ-ব্রাহ্মণ জাতিগুলো থেকে পর্যাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করতে না পারে, তবে আমি সরকারের কাছে এই আর্জি জানাতে চাই যে, তাঁরা যেন সরকারি দপ্তরগুলোতে ইংরেজ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেন। এতে ওই দপ্তরগুলোতে ব্রাহ্মণ কর্মকর্তাদের দ্বারা সরকার এবং শূদ্র— উভয় পক্ষের স্বার্থের সম্ভাব্য অনিষ্ট রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এটি হলো একটি প্রতিকার। দ্বিতীয়ত, আমি সরকারের কাছে সুপারিশ করতে চাই যে, তারা যেন এমন ইংরেজ কালেক্টরদের নিয়োগ করে, যাঁরা সাবলীল মারাঠি বলতে পারেন। তাঁদের আজীবনের জন্য পূর্ণ পেনশনের ব্যবস্থা করে এই নির্দেশ দেওয়া উচিত যেন তাঁরা এই অজ্ঞ পুতুলসদৃশ শূদ্রদের মাঝে গ্রামগুলোতে বসবাস করেন এবং ব্রাহ্মণ কর্মকর্তাদের কার্যক্রমের উপর কড়া নজর রাখেন— যাতে তাদের অনিষ্ট করার প্রবণতা কার্যকরভাবে দমন করা যায়। যদি ইংরেজ কর্মকর্তারা শূদ্রদের দুর্দশা সম্পর্কে নিয়মিতভাবে তাঁদের ঊর্ধ্বতনদের কাছে রিপোর্ট পেশ করেন, তবে শিক্ষা বিভাগের ব্রাহ্মণ কর্মকর্তাদের অপকর্মগুলো ফাঁস হয়ে যাবে এবং সেখানকার নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। তখনই কেবল নির্যাতিত শূদ্ররা প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করতে পারবে এবং ভট কর্মকর্তাদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অপব্যবহারের নিন্দা জানাবে; আমি একথাও বলতে পারি যে, এই অজ্ঞ শূদ্ররা মহারানি ভিক্টোরিয়ার কাছে চিরঋণী হয়ে থাকবে। কারণ এই ধূর্ত ব্রাহ্মণদের দ্বারা শূদ্রদের গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া দাসত্বের শিকল ছুড়ে ফেলার বিষয়ে আর কেউ আগ্রহী নয়!
ধোণ্ডিবা: তবে শৈশবে আপনি ঠিক কী উদ্দেশ্যে ‘দণ্ড পট্টা’ (এক ধরণের তলোয়ার খেলা বা লাঠিখেলা) এবং বন্দুক চালনার শিক্ষা নিচ্ছিলেন?
জ্যোতিরাও: আমাদের এই দয়ালু ইংরেজ সরকারকে পরাস্ত করার জন্য!
ধোণ্ডিবা: শৈশবে এমন বিষাক্ত চিন্তাভাবনা আপনার মাথায় কোথা থেকে এসেছিল?
জ্যোতিরাও: আমি সেইসব ধারণা পেয়েছিলাম কিছু ‘আলোকিত’(?) ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের কাছ থেকে। তারা তাদের অন্দরমহলে নিজেদের বিশ্বাসগুলো প্রচার করে ও দাবি করে যে, আমাদের মধ্যে ঐক্যের অভাবের মূল কারণ হলো আমাদের প্রাচীন ও খাঁটি ধর্মের প্রকৃত নীতি ও শিক্ষা সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতা। আমাদের সমাজ নানাবিধ জাতিভেদে বিভক্ত ছিল, আমরা ঐক্যবদ্ধ ছিলাম না, আর সেই কারণেই ইংরেজরা আমাদের শাসক হতে পেরেছে। আমাদের দেশের অজ্ঞ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন জনসাধারণের দেশপ্রেমের তাড়না ও অনুভূতিকে ধ্বংস করার জন্য ইংরেজরা তাদের ধূর্ত ধর্মের সমর্থন জোগাড় করার চেষ্টা করছে এবং শূদ্রদের সাথে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে তাদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করার চেষ্টা করছে। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা আরও প্রচার করে যে, যতক্ষণ না ভারতের বিভিন্ন জাতি ও সামাজিক স্তরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে, ততক্ষণ আমরা ইংরেজ শাসকদের ভারত থেকে বিতাড়িত করার অবস্থানে আসতে পারব না। আর যতক্ষণ না আমরা আমাদের প্রাচীন ও দৈববাণী-লব্ধ ধর্মকে পরিবর্তন ও পরিমার্জন করছি এবং যতক্ষণ না আমরা এক হয়ে দাঁড়াচ্ছি, ততক্ষণ আমরা কখনোই আমেরিকা, ফ্রান্স বা রাশিয়ার সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারব না। এই তথাকথিত আলোকিত মানুষগুলো টমাস পেইন ও অন্যান্য বিখ্যাত লেখকদের উদ্ধৃতি দিয়ে তাঁদর এই প্রিয় থিসিসটি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিল। সেইসব ‘আলোকিত’ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে আমি আমার শৈশবে ভুল পথে পরিচালিত হয়েছিলাম। কিন্তু যখন আমি উপরে উল্লেখিত বইগুলোর শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘ ও গভীরভাবে চিন্তা করলাম, তখন ওই ‘আলোকিত’ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার প্রকৃত অর্থ আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। যদি সমস্ত শূদ্র নিজেদের দ্বিতীয় বলীরাজার (যিশু খ্রিস্ট) সহশিষ্য হিসেবে গণ্য করে, তবে আমরা ভটদের পূর্বপুরুষদের মিথ্যা বই ও ধর্মশাস্ত্র ঘৃণা করতে বাধ্য হব। অন্য শূদ্রদের তুলনায় নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করার যে অহংকারী প্রবণতা তাদের রয়েছে, তা উন্মোচিত হয়ে পড়বে এবং তাদের অলস পুরোহিত শ্রেণি শূদ্রদের রক্ত জল করা উপার্জনে আর নিজেদের মোটাতাজা করতে পারবে না। তখন এমনকি সর্বশক্তিমান ব্রহ্মা বা তার বাপও শূদ্রদের উপর ভটদের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করার সাহস পাবে না। ওইসব আর্যদের আদি পূর্বপুরুষরা এমনকি ‘দেশপ্রেম’ শব্দের অর্থও জানতো না। তাই তারা যে ‘দেশপ্রেম’ শব্দটিকে এমন অদ্ভুতভাবে ব্যাখ্যা করেছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বলীরাজার (অর্থাৎ যিশু খ্রিস্টের) আবির্ভাবের অনেক আগেই ইংরেজরা গ্রিকদের কাছ থেকে দেশপ্রেমের শিক্ষা নিয়েছিল। খ্রিস্টধর্মে (বলীরাজার ধর্ম) দীক্ষিত হওয়ার পর তারা এই দেশপ্রেমের গুণটিকে এতটাই আত্মস্থ করে এমন নিখুঁত পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, দেশপ্রেমের বিচারে অন্য কোনো জাতি তাদের সমকক্ষ হতে পারেনি। সম্ভবত কেউ তাদের আমেরিকার বলীরাজার অনুসারী জর্জ ওয়াশিংটনের সাথে তুলনা করতে পারেন। তুমি যদি এমন মহান নেতাদের সাথে ইংরেজদের তুলনা করতে না চাও, তবে তুমি তাদের বলীরাজার ফরাসি অনুসারী লাফায়েত-এর সাথে তুলনা করতে পারো। সেটাই হবে একটি যৌক্তিক তুলনা। এই ‘আলোকিত’ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের আদি পূর্বপুরুষরা যদি সত্যিই দেশপ্রেমিক হতো, তবে তারা তাদের ধর্মীয় বইগুলোতে এমন সব বিধান লিখে রাখত না যেখানে তাদের নিজেদের স্বদেশবাসীদের পশুর চেয়েও অধম বলে গণ্য করা হয়েছে। কতই না আশ্চর্যের বিষয় যে, এই ব্রাহ্মণরা যখন মানুষের বিষ্ঠা ভক্ষণকারী পশুর (গরুর) মলমূত্র পানাহার করে, তখন নিজেদের পবিত্র বা উন্নত মনে করে; অথচ একজন শুদ্রের হাত থেকে ঝরনার জল খেতে অস্বীকার করে! এই ‘আলোকিত’ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের সেই একই আদি পূর্বপুরুষরা গ্রিকদের দেশপ্রেমের বিপরীতে এক ধরনের অশুভ দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছিল। আমরা কার সৌজন্যে এই প্রকৃত পার্থক্যটি জানতে পেরেছি? এটি সম্ভব হয়েছে ইংরেজদের মাধ্যমে। এই জনহিতৈষী ইংরেজরা— যারা আমাদের ব্রাহ্মণদের দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছে, তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করার জন্য এই সব পণ্ডিতদের পরামর্শ কে শুনবে? সে অবশ্যই একজন অকৃতজ্ঞ মূর্খ হবে, যে তার নিজের মুক্তিদাতার দিকে হাত তুলবে। ধোণ্ডিবা, আমি তোমাকে বলছি, এই ইংরেজরা আমাদের এই প্রাচীন দেশে কেবল ক্ষণস্থায়ী অতিথি মাত্র। তারা আজ আছেন, কাল নেই! কে গ্যারান্টি দিতে পারে যে, তাঁরা চিরকাল আমাদের সাথে থাকবেন? তাই প্রকৃত প্রজ্ঞা এটাই বলে যে, আমাদের দেশের এই ইংরেজ শাসন চলাকালীনই আমরা সমস্ত শূদ্ররা যেন অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ব্রাহ্মণদের চাপিয়ে দেওয়া এই বংশপরম্পরাগত দাসত্ব থেকে নিজেদের মুক্ত করার চেষ্টা করি। আসলে এটা বিধাতারই বিধান ছিল যে, ভট পেশোয়া নানা ও তার অনুচরদের দ্বারা সংগঠিত বিদ্রোহ সাহসী ইংরেজ শাসকরা দমন করতে পেরেছিলেন। তা না হলে, তথাকথিত ‘মুক্ত’ ব্রাহ্মণরা— যারা শাহ দাওয়ালের সামনে মহাদেবের মন্দিরের১৩ শিবলিঙ্গে নিরন্তর জল ঢালার মতো ধর্মীয় আচার পালন করে— তারা নিশ্চিতভাবেই অনেক মাহারকে স্রেফ ধুতি একপাশে গুঁজে পরার অপরাধে কিংবা ধর্মীয় আলোচনার সময় সংস্কৃত শ্লোক উচ্চারণ করার ‘অপরাধে’ যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের দণ্ড দিত।
ধোণ্ডিবা: সরকারি শিক্ষা বিভাগে কর্মরত ভট (ব্রাহ্মণ) কর্মচারীরা ঠিক কীভাবে ভণ্ডামি করে?
জ্যোতিরাও: এমন একটি বই ছিল যা মনোযোগ দিয়ে পড়লে ভটদের ভণ্ডামিপূর্ণ ধর্মীয় বইগুলোর সমস্ত প্রতারণা ফাঁস হয়ে যেত এবং তাদের পূর্বপুরুষদের চরম দুর্নাম হতো। এই পরিণতি এড়ানোর জন্য চতুর ব্রাহ্মণরা ব্যক্তিগতভাবে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করে কিংবা মারাঠি সংবাদপত্রগুলোতে অত্যন্ত সুকৌশলী ও মসৃণ সব প্রবন্ধ লিখে সরকারকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত তারা সরকারকে রাজি করিয়ে ফেলে যাতে ওই বইটি সরকারি স্কুলগুলোতে নিষিদ্ধ করা হয়। এখন ধোণ্ডিবা, সরকারের এই পদক্ষেপটি নিয়ে একটু ভাবো। কিছু তথাকথিত শিক্ষিত ব্রাহ্মণের দেওয়া প্রতারণামূলক ও মিথ্যা অজুহাতে যদি জ্ঞানালোকিত ব্রিটিশ সরকার এখানকার সরকারি স্কুলগুলোতে সেই পবিত্র বইটি নিষিদ্ধ করাকে সঠিক মনে করে, তবে এতে কি কোনো বিস্ময় আছে যে, রোমান সাম্রাজ্যের কিছু অজ্ঞ উচ্চপদস্থ ব্যক্তি সেই ধর্মগ্রন্থের রচয়িতাকে (বলীরাজা দ্বিতীয়/যিশু) কিছু অধপতিত, ধর্মহীন ভণ্ডদের প্ররোচনায় ক্রুশবিদ্ধ করেছিল? এতে মোটেও অবাক হওয়ার কিছু নেই!
ধোণ্ডিবা: এই বিষয়ে সরকারকে কীভাবে দোষারোপ করা যায়?
জ্যোতিরাও: এই বিষয়ে সরকার নিশ্চিতভাবেই দোষ এড়াতে পারে না। কিছু তথাকথিত প্রগতিশীল ভাটের (ব্রাহ্মণ) প্ররোচনায় সরকারি স্কুলগুলোতে ওই বইটি সরকার নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যে, যারা ওই পবিত্র বইটির সমালোচনা করল, সরকার তাদের লেখা বইগুলোকেই পাঠ্যবই হিসেবে নির্ধারণ করল! এমনকি সরকার এই ব্যক্তিদেরই শূদ্রদের জন্য তৈরি স্কুলগুলোতে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিল! আমি বুঝতে পারছি না কেন সরকার এই নীচমনা ভট লেখকদের নতুন বইগুলো নিষিদ্ধ করার বদলে পাঠ্যবই হিসেবে গ্রহণ করছে— আবার তার উপর তাদের বড়ো অংকের পুরস্কারও দিচ্ছে। কেন সরকার এই ভটদেরই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করছে আর ওই পবিত্র গ্রন্থের বিরুদ্ধে তাদের বিষোদগার সহ্য করছে? যদি এই বিশ্বাসপ্রবণ সরকার পবিত্র বইটির ক্ষেত্রে যেমন কঠোর হয়েছে, তেমনই এই ভটদের লেখা পাঠ্যবই ও তাদের লেখকদের স্কুল থেকে বহিষ্কার করতে না পারে, তবে সরকারের উচিত হবে এক কলমের খোঁচায় পুরো শিক্ষা বিভাগটিই বন্ধ করে দেওয়া। এতে আমাদের বড়ো উপকার হবে, কারণ অন্তত শূদ্ররা করের বোঝা থেকে মুক্তি পাবে। শিক্ষা বিভাগের একজন ব্রাহ্মণ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মাসে অন্তত ছয়শো চকচকে রুপালি টাকা— যা বছরে সাত হাজার দুশো টাকা গিলে ফেলে। এখন সরকারি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের হাতে অন্তত হয়রানির ভয় নেই। কিন্তু একবার ভেবে দেখো, সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় এই পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে কতগুলো শূদ্র পরিবারকে দিনরাত জমিতে খাটতে হবে? আমার ধারণা, অন্তত এক হাজার পরিবারকে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হবে এই পরিমাণ অর্থের সমান হওয়ার জন্য। শূদ্ররা এই তথাকথিত ‘বিদ্বান’ পণ্ডিতদের কাছ থেকে কী সুবিধা পায়? একজন শূদ্র শ্রমিককে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাথায় মাটি ও পাথরের ঝুড়ি বয়ে মাত্র চার আনা আয় করতে হয়। এক মিনিটের জন্য কাজ ছাড়ার উপায় তার নেই। অন্যদিকে, শিক্ষা বিভাগের একজন ব্রাহ্মণ কর্মকর্তা আরামদায়ক চেয়ারে বসে একটি সুবাতাসযুক্ত ঘরে বসে দিনে বিশ টাকা আয় করে। আর এটা কি অদ্ভুত নয় যে, ওই ব্রাহ্মণ কর্মকর্তা পৌরসভার খরচে একজন বরের মতো ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে সকাল-সন্ধ্যার হিমেল হাওয়ায় পূর্ণ মহিমায় ঘুরে বেড়ানোর অবসর পায়? সে এখানে-সেখানে উঁকিঝুঁকি মারে আর নাগরিকদের বসার ঘর থেকে শুরু করে শৌচাগার পর্যন্ত নাক গলিয়ে তাদের আতঙ্কিত ও বিস্মিত করে। প্রকৃতপক্ষে, তাদের উচিত ছিল এই অবসরে গলিতে গলিতে গিয়ে গরিব মানুষদের শিক্ষার উপকারিতা বোঝানো আর সন্তানদের শিক্ষিত করতে উৎসাহিত করা। তার বদলে তারা বরের মতো কুচকাওয়াজ করাকেই নিজেদের বিশেষ অধিকার বলে মনে করে। তাই এটা বলা সংগত হবে যে, মাসে দশ টাকা বেতনের একজন মিশনারি এমন একজন অপদার্থ ব্রাহ্মণ শিক্ষা কর্মকর্তার চেয়ে হাজার গুণ ভালো। একজন নিষ্ঠাবান প্রচারককে ওই শহরের ছোটো-বড়ো সবাই চেনে, অথচ এই স্বঘোষিত পণ্ডিতকে তার পাশের বাড়ির প্রতিবেশীও চেনে না। তার কাজ হলো নিজের খেয়ালখুশি মতো দিনে এক— আধ ঘণ্টা স্কুলে পড়ানো, ইংরেজ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আড্ডা দেওয়া ও বছরে গোটা তিন— চারেক গালগল্পে ভরা রিপোর্ট শিক্ষা বিভাগে জমা দেওয়া— এই হলো তার ‘কঠোর’ পরিশ্রমের নমুনা। কিছু তথাকথিত ভদ্রলোক আবার এই ব্রাহ্মণ কর্মকর্তাদের সৎ, বিবেকবান ও দেশপ্রেমিক হিসেবে বর্ণনা করে। এমন ‘সৎ’ ব্রাহ্মণ কর্মকর্তারা শিক্ষা বিভাগের লাখ লাখ টাকা গিলে ফেলেছে। কিন্তু কী আশ্চর্যের বিষয়! একজন ব্রাহ্মণ কর্মকর্তাও আজ পর্যন্ত একজন শূদ্র ছাত্রকেও এমনভাবে শিক্ষিত বা যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারেনি, যে পুনা পৌরসভার সদস্য হতে পারে। এই একটি উদাহরণই শিক্ষা বিভাগের এই ব্রাহ্মণ কর্মকর্তাদের দলিত শ্রেণির কল্যাণের প্রতি চরম উদাসীনতার প্রমাণ দেয়। তুমি জেনে অবাক হবে যে, যখন এমন একজন দেশপ্রেমিক ও ‘জ্ঞানালোকিত’ ব্রাহ্মণ পুনা পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিল, তখন গত বছরের গ্রীষ্মে পানীয় জলের সংকট প্রকট আকার ধারণ করলে এই দলিত মানুষদের সাধারণ সরকারি জলাধার থেকে জল খাওয়ার অনুমতি দেওয়ার মতো ন্যূনতম সৌজন্যটুকুও সে দেখায়নি। এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে, মিউনিসিপ্যাল কমিটিতে অতিশূদ্র সম্প্রদায় থেকে একজন সদস্য থাকা কতটা জরুরি।
ধোণ্ডিবা: আপনার কথা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু আমি জানতে পেরেছি যে, মিউনিসিপ্যাল কমিটিতে এমন কিছু শূদ্র সদস্য আছে যারা এতটাই অজ্ঞ যে তারা সভার কোনো কার্যবিবরণীই বুঝতে পারে না। তারা তাদের সম্মতি বা অসম্মতি কেবল জোরেশোরে মাথা নেড়েই প্রকাশ করে, ঠিক যেমন শিক্ষিত ষাঁড় ‘ভোলানাথ’ করে থাকে। তারা কেবলই ‘জো-হুজুর’ বলা লোক। এমনকি রেজিস্টারে স্বাক্ষর করার ক্ষমতাও তাদের নেই। অতিশূদ্রদের মধ্যেও নিশ্চয়ই এমন লোক থাকবে যারা ওই শূদ্র সদস্যদের মতো কেবল মাথা নেড়েই হ্যাঁ বা না বলবে?
জ্যোতিরাও: হ্যাঁ, আমি স্বীকার করছি যে এমন অনেক অতিশূদ্র থাকতে পারে যারা এমনকি কিছু শূদ্র সদস্যের চেয়েও পড়ালেখা ও লেখালেখিতে বেশি পারদর্শী। কিন্তু ব্রাহ্মণদের ভণ্ডামিপূর্ণ ধর্মীয় বইগুলোর মাধ্যমে আরোপিত নানা বিধিনিষেধের কারণে অতিশূদ্রদের ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে তারা সমাজের অন্যান্য স্তরের মানুষের সাথে অবাধে মেলামেশা করার বা নিজেদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এইজন্যই তারা তাদের গাধাদের সাথে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে কোনোমতে খেয়েপরে বেঁচে থাকতে বাধ্য হয়।
ধোণ্ডিবা: আমরা যদি পুনা পৌরসভার সম্প্রদায়ভিত্তিক সদস্যপদ পর্যালোচনা করি, তবে কোন সম্প্রদায় সদস্যপদের সিংহভাগ দখল করে আছে?
জ্যোতিরাও: অবশ্যই ভটরাই (ব্রাহ্মণ) প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সবখানে।
ধোণ্ডিবা: এই কারণেই আমরা দেখতে পাই যে, অদক্ষ শ্রমিক ও ঝাড়ুদার ছাড়া পৌরসভার বাকি সমস্ত কর্মচারীদের মধ্যে ভটদেরই (ব্রাহ্মণ) আধিপত্য। যেহেতু জল— সরবরাহ বিভাগের অধিকাংশ কর্মচারীই ছিল ভট, তাই তারা মে মাসের গ্রীষ্মে শুধুমাত্র ভটদের জন্য নির্দিষ্ট জলের ট্যাঙ্কগুলোতে এত প্রচুর পরিমাণে জল ছেড়ে দিত যে, তাদের কাপড়চোপড়, বাসনকোসন ধোয়ার পরেও প্রচুর জল উদ্বৃত্ত থাকত। এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর জল অপচয় হতো। অন্যদিকে, শূদ্র অধ্যুষিত এলাকাগুলোর জলের ট্যাঙ্কগুলো দুপুরের পর পাথরের মতো শুকিয়ে কাঠ হয়ে থাকত, ফলে একজন পথচারীও সেখানে নিজের তৃষ্ণা মেটাতে পারত না। যখন শূদ্রদের স্নান করা বা কাপড় ধোয়ার জন্যও কোনো জল থাকত না, তখন তাদের পরিস্থিতি কতটা কঠিন ছিল তা একবার ভাবো! পৌরসভা প্রধানত ব্রাহ্মণ অধ্যুষিত ওয়ার্ডগুলোতে অনেক নতুন জলের ট্যাঙ্ক তৈরি করেছে; অথচ ওল্ডগঞ্জ-এর মতো ওয়ার্ডগুলোতে— যেখানে শূদ্ররা দীর্ঘদিন ধরে জলের ট্যাঙ্কের জন্য কান্নাকাটি করছে, সেখানে ব্রাহ্মণ সদস্যদের আধিপত্য থাকা মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল বছরের পর বছর শূদ্রদের এই নিরন্তর দাবিতে কর্ণপাতই করছে না। অবশেষে, গত বছরের গ্রীষ্মে যখন জলের তীব্র সংকট দেখা দেয়, তখন পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায় যখন (মিঠ গঞ্জি পেঠের)১৪ মাহার ও মাং সম্প্রদায়ের লোকেরা ব্রাহ্মণদের জন্য নির্দিষ্ট ‘কালো জলাধার’ থেকে জল নিতে শুরু করে। কেবল তখনই মিউনিসিপ্যাল কমিটি শূদ্রদের প্রকৃত সমস্যাগুলো আমলে নিতে বাধ্য হয় এবং ওই এলাকায় তাদের জন্য একটি নতুন ট্যাঙ্ক তৈরি করে। কিন্তু ওই ট্যাঙ্ক তৈরিতে কমিটি এত বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় করেছে যে, আমরা বলতে বাধ্য হচ্ছি— এটি জল সরবরাহ কমিটির চেয়ারম্যানের— যে তার পাণ্ডিত্য ও আড়ম্বরের জন্য পরিচিত— পদের জন্য মোটেও শোভনীয় ছিল না। যদি ওই কমিটির কার্যকলাপে এমন লাগামহীন অব্যবস্থাপনা চলে, তবে মারাঠি সংবাদপত্রের সাংবাদিকরা চুপ থাকছে কেন? কেন তারা এই অব্যবস্থাপনার দিকে ইংরেজ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে না?
জ্যোতিরাও: পুনার সমস্ত মারাঠি সংবাদপত্রের সম্পাদকরা হলো ব্রাহ্মণ। স্বাভাবিকভাবেই তারা নিজেদের জাতভাইদের বিরুদ্ধে কিছু লিখতে চায় না। পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন একজন ইংরেজ এবং তিনি ব্রাহ্মণদের কোনো রকম চাতুরি বা কারসাজি সহ্য করতেন না। তখন সমস্ত ব্রাহ্মণরা মিলে তাঁর বিরুদ্ধে একযোগে সমালোচনার ঝড় তুলল এই বলে যে, তাঁর নীতিগুলো প্রজাদের স্বার্থের পরিপন্থী, যা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা। তারা সবাই মিলে তাঁর বিরুদ্ধে জোট বাঁধেল এবং তাঁকে চরম হেনস্থা করে। পরিশেষে, এই নোংরা পরিস্থিতিতে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে মিউনিসিপ্যাল কমিটির সাথে সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলেন। এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, আমাদের হিতৈষী কিন্তু অতি-বিশ্বাসী সরকার এটাই ধরে নিল যে, চতুর ভট সাংবাদিকরা তাদের মারাঠি কাগজে যা লিখেছে তাই সত্য, সেটাই নাকি শূদ্র ও অতিশূদ্রদের প্রকৃত মতামত। এখানে সরকার এক মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্তের পরিচয় দিয়েছে। সরকার নিশ্চিতভাবেই সচেতন নয় যে, ব্রাহ্মণ সাংবাদিকদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং শূদ্র ও অতিশূদ্রদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রায় সব অতিশূদ্ররাই এতটাই অজ্ঞ যে তারা সংবাদপত্র জিনিসটা কী, তা-ই ঠিকমতো জানে না। তাহলে এই গোঁড়া ও বিধিনিষেধগ্রস্ত ব্রাহ্মণ সাংবাদিকরা কীভাবে দাবি করতে পারে যে, তারা অতিশূদ্রদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝে এবং প্রতিনিধিত্ব করে? অথচ তাদের সাথে তো এই অতিশূদ্রদের ন্যূনতম জানাশোনাও নেই! ভট সাংবাদিকরা এই নতুন চতুর কৌশলটি বের করেছে সাধারণ অজ্ঞ মানুষকে তোয়াজ করার জন্য, যাতে সরকারকে কলঙ্কিত ও অসম্মানিত করা যায়। এর একমাত্র উদ্দেশ্য হলো নিজেদের আখের গুছিয়ে নেওয়া এবং অন্যায়ভাবে লাভবান হওয়া। সরকারের অধিকাংশ বিভাগই এখন ব্রাহ্মণ কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের দ্বারা কানায় কানায় পূর্ণ; এই বাস্তবতাটিই সাধারণ মানুষের (শূদ্র ও অতিশূদ্রদের) স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করছে। কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, এ বিষয়ে সাধারণ মানুষের প্রকৃত অবস্থা যাচাই করার মতো অবসর তারা খুব কমই পান; তাহলে তারা কীভাবে সাগর পাড়ি দিয়ে ছয় হাজার মাইল দূরে লণ্ডনে ব্রিটিশ রানি সম্রাজ্ঞীর প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ, মতামত— এমনকি তাঁর স্বপ্নের প্রলাপ পর্যন্ত জানার অবসর খুঁজে পান? যদি খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত কোনো মারাঠি সাংবাদিক তার পত্রিকায় এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করে যে, পৌরসভার সভাগুলোতে ভটরা (ব্রাহ্মণরা) দরিদ্র প্রজাদের স্বার্থে কোনো কর্ণপাত করে না, তবে সেই কথাগুলো কেবল অরণ্যে রোদনই হয়। সেগুলো ইংরেজ কর্মকর্তাদের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না; কারণ মারাঠি পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত সংবাদের ইংরেজি অনুবাদ করে রিপোর্ট করার দায়িত্ব পৌরসভার একজন ব্রাহ্মণ সদস্যের উপর ন্যস্ত থাকে। আমরা কীভাবে আশা করতে পারি যে, সেই ব্রাহ্মণ কর্মকর্তা তাদের সম্মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করে তার নিজের জাতভাইদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করবে? এই সমস্ত ব্রাহ্মণরা জাতিভেদের বন্ধন ও পৌরসভার সাধারণ সদস্যপদ— উভয় দিক থেকেই একসূত্রে গাঁথা। ফলে, এই প্রতিকূল রিপোর্টগুলো কখনোই সরকারের সামনে পেশ করা হয় না।
ধোণ্ডিবা: সমস্ত সরকারি ও আধা-সরকারি বিভাগগুলো ভট (ব্রাহ্মণ) কর্মকর্তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যা অন্যান্য সমস্ত সম্প্রদায়ের স্বার্থের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। আপনি কেন ব্রাহ্মণদের এই সমস্ত অপকর্ম এবং শূদ্র-অতিশূদ্রদের দুর্দশা ও হাড়ভাঙা খাটুনির কথা বিস্তারিত বর্ণনা করে একটি সংক্ষিপ্ত পুস্তিকা লেখেন না? নিশ্চিতভাবেই তা ইংরেজ সরকারের চোখ খুলে দেবে।
জ্যোতিরাও: এটি ধ্রুব সত্য যে, ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা তাদের নীতিহীন ধর্মের শিক্ষা দিয়ে অজ্ঞ শূদ্রদের প্রতারিত করে। অন্যদিকে, খ্রিস্টান মিশনারিরা তাদের নিরপেক্ষ ধর্মের উপর ভিত্তি করে শূদ্রদের প্রকৃত জ্ঞান দান করে সত্যের পথে পরিচালিত করে। আমি এই কুপ্রথাটি নিয়ে একটি ছোটো নাটক লিখে ১৮৫৫ সালে ‘দক্ষিণা প্রাইজ কমিটি’তে জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানেও সেই কমিটির কুসংস্কারাচ্ছন্ন ব্রাহ্মণ সদস্যের অনড় অবস্থানের সামনে ইংরেজ সদস্যের কোনো যুক্তিই টেকেনি; ফলে কমিটি আমার নাটকটি প্রত্যাখ্যান করে। প্রকৃতপক্ষে, এই পৌরসভা ও দক্ষিণা প্রাইজ কমিটি— উভয়ই তাদের মানসিকতা ও গঠনের দিক থেকে অভিন্ন। শূদ্রদের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য খুব সামান্যই কাজ করা হয়েছে। তাই আমি আমার নাটকটি সরিয়ে রেখে কয়েক বছর পর ব্রাহ্মণদের চতুর প্রকৃতি বর্ণনা করে একটি বই লিখি এবং নিজের খরচে তা প্রকাশ করি। পুনার আমার এক ব্যক্তিগত বন্ধু শিক্ষা বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি লিখে আমার এই পুস্তিকাটির কিছু কপি কেনার অনুরোধ জানাবার জন্য আমাকে প্ররোচিত করেন। কিন্তু লক্ষণীয় যে, একজন কর্মকর্তাও ব্রাহ্মণদের ভয়ে আমার বইয়ের একটি কপিও কেনার সাহস দেখাননি।
ধোণ্ডিবা: আপনি এই কর্মকর্তাদের তোষামোদ করতে অস্বীকার করেন, সেইজন্যই আপনার বই বিক্রি হয় না।
জ্যোতিরাও: ধোণ্ডিবা, আমি মহৎ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কখনোই অন্যায় পথ অবলম্বন করি না। তাতে মূল লক্ষ্যটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কর্মকর্তারা আমার বই না কিনলেও ঈশ্বর আমার প্রতি সর্বদা সদয় আছেন। তাদের সামনে মাথা নত না করে আমি একটি মূল্যবান শিক্ষা পেয়েছি; কারণ আমি আমাদের সকলের পিতা সৃষ্টিকর্তার উপর নির্ভর করতে শিখেছি। তাই আমি তাঁর কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।
ধোণ্ডিবা: এরপর আপনি ১৮৪৮ সালে ব্রাহ্মণ ও সমজাতীয় সম্প্রদায়ের মেয়েদের জন্য একটি স্কুল খুললেন। শিক্ষা বিভাগ আপনাকে প্রকাশ্যে সম্মান জানাতে একটি আনুষ্ঠানিক শাল উপহার দিয়েছিল। আপনি আপনার কিছু পরোপকারী ব্রাহ্মণ বন্ধুর সহায়তায় ১৮৫১ সালে দলিত শ্রেণির শিশুদের জন্যও আরেকটি স্কুল খুলেছিলেন। আপনি নিজেও সেই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। এর মাধ্যমে আপনি অতিশূদ্রদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে এক বিশাল উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিলেন, কিন্তু পরে আপনি হঠাৎ করেই সেই কাজ ছেড়ে দিলেন। কয়েক বছর পর আপনি আপনার ইংরেজ বন্ধুদের বাড়িতে যাওয়াও বন্ধ করে দিলেন। এর কারণগুলো কি জানতে পারি?
জ্যোতিরাও: আমি যখন ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মেয়েদের জন্য স্কুল খুললাম, তখন সরকার সত্যিই খুব খুশি হয়েছিল এবং আনুষ্ঠানিকভাবে আমাকে একটি শাল উপহার দিয়ে সম্মানিত করেছিল। কিন্তু পরে আমি অতিশূদ্র ছেলেমেয়েদের জন্য স্কুল খোলার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করলাম। তাই আমি বিপুল সংখ্যক ব্রাহ্মণ সদস্যকে এই কাজে যুক্ত করলাম, তাদের সহযোগিতা নিশ্চিত করলাম এবং ওই স্কুলগুলোর দায়িত্ব তাদের হাতে তুলে দিলাম। এরপর, ১৮৫১ সালে আমি অতিশূদ্র সম্প্রদায়ের ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা স্কুল স্থাপন করলাম। অনেক ইংরেজ ভদ্রলোক উদারভাবে অনুদান দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছিলেন। রেভিনিউ কমিশনার মি. রিভস (Mr. Reeves) আমার এই মহৎ উদ্দেশ্যে যে অমূল্য সহায়তা করেছিলেন, তা আমি কোনোদিন ভুলব না। এই পরোপকারী ইংরেজ ব্যক্তিটি কেবল সময়মতো প্রয়োজনীয় অর্থ সাহায্যই করতেন না, তাঁর ব্যস্ত সূচির মধ্য থেকেও সময় বের করে অতিশূদ্র শিশুদের স্কুলে আসতেন এবং পরম মমতায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অগ্রগতির খোঁজখবর নিতেন। অতিশূদ্র শিশুদের শিক্ষিত করার এই মহৎ কাজটিকে উৎসাহিত করতে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। তাঁর এই মহৎ সহায়তা শিক্ষার্থীদের হাড়-মজ্জায় গেঁথে রয়েছে। এই ঈশ্বরপ্রদত্ত ভালো কাজে মি. রিভসের সময়োপযোগী সাহায্য ও উৎসাহের জন্য শিক্ষার্থীরা চিরকাল তাঁর কাছে ঋণী থাকবে। এছাড়া আরও কিছু পরোপকারী ইংরেজ ব্যক্তি যাঁরা আমার শিক্ষা বিস্তারের কাজে সম্ভাব্য সকল প্রকার সাহায্য করেছিলেন, তাঁদের প্রতিও আমি আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমি আমার এই উদ্দেশ্যে কিছু ব্রাহ্মণ বন্ধুর সহযোগিতা নিয়েছিলাম, তার কারণ আমি তোমাকে পরে ব্যাখ্যা করব। কিন্তু যখন আমি আমার স্কুলের শিক্ষার্থীদের কাছে ব্রাহ্মণদের পূর্বপুরুষদের লেখা ভণ্ডামিপূর্ণ ধর্মীয় বইগুলোর চাতুরি ও প্রতারণা ব্যাখ্যা করতে শুরু করলাম, তখন আমার এবং আমার ব্রাহ্মণ সহকর্মীদের মধ্যে সূক্ষ্ম মতপার্থক্য দেখা দিল। তাদের মূল যুক্তি ছিল যে, প্রথমত, শূদ্রদের সন্তানদের কোনো শিক্ষাই দেওয়া উচিত নয়। আর যদি তাদের শিক্ষা দেওয়া একান্তই প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে, তবে তাদের শুধুমাত্র প্রাথমিক পড়ালেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। অন্যদিকে, আমার মত ছিল যে, আমাদের উচিত তাদের এমন কার্যকরী শিক্ষা প্রদান করা, যা তাদের নিজেদের জীবন ও জীবিকা গড়তে সক্ষম করে তুলবে। সেই শিক্ষা হওয়া উচিত প্রকৃত অর্থেই মানসম্মত। এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, ব্রাহ্মণরা কি এই ভয়ে ভীত ছিল যে, শূদ্ররা যদি সুশিক্ষা পায় তবে তারা বুঝতে পারবে যে এই সুযোগটি সম্ভব হয়েছে হিতৈষী সরকারের কারণে, এর ফলে তারা সত্য ও মিথ্যার মধ্যে তফাৎ বুঝতে শিখবে। সম্ভবত ব্রাহ্মণরা এই ভয় পাচ্ছিল যে, এভাবে শিক্ষিত হয়ে অতিশূদ্ররা সরকারের প্রতি অনুগত ও বিশ্বস্ত সেবকে পরিণত হবে; তারা অতিশূদ্রদের উপর ব্রাহ্মণদের পূর্বপুরুষদের করা চরম অবিচারের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারবে, ফলে তারা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ব্রাহ্মণদের নিন্দা জানাবে।
যখন মতপার্থক্যের কারণে আমাদের মধ্যে ফাটল ধরল, তখন আমি তাদের বিরোধিতার আসল কারণ বুঝতে পারলাম এবং ব্রাহ্মণ ছাত্রদের জন্য ও অতিশূদ্র ছাত্রদের জন্য— উভয় ধরণের স্কুল থেকেই নিজেকে সরিয়ে নিলাম। এর কয়েক বছর পর ১৮৫৭ সালে অসন্তুষ্ট ব্রাহ্মণদের দ্বারা পরিকল্পিত মহাবিদ্রোহ শুরু হয়। আমার অনেক প্রাক্তন অকৃত্রিম ইংরেজ বন্ধু আমার প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েন এবং আমার সাথে দেখা করার সময় অসন্তোষের লক্ষণ দেখাতে শুরু করেন। তখন থেকেই আমি তাদের বাড়িতে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।
ধোণ্ডিবা: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী ব্রাহ্মণদের বিশ্বাসঘাতকতা ও ঔদ্ধত্যের জন্যই আপনার ইংরেজ বন্ধুরা আপনার থেকে দূরে সরে গিয়েছেন, অথচ এই ঘটনার সাথে আপনার কোনো সম্পর্কই ছিল না। বিজ্ঞ ইংরেজ কর্মকর্তাদের এমন আচরণ মোটেও শোভন ছিল না। কিছু ব্রাহ্মণ বিধবা দুর্বল মুহূর্তের বশবর্তী হয়ে পুরুষদের সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হতো এবং সামাজিক বহিষ্কার এড়ানোর জন্য তারা গর্ভপাত করাতো, যা প্রায়ই তাদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠত। আপনি আপনার নিজের বাড়িতেই একটি অনাথ আশ্রম খুলেছেন এবং আপনার বাড়িতে খোলা একটি অনানুষ্ঠানিক প্রসূতি সদনে এই বিধবাদের সন্তানদের নিরাপদ প্রসবের জন্য সমস্ত সম্ভাব্য ব্যবস্থাও করেছেন; সেখানে আপনার স্ত্রী সাবিত্রীবাই সেই দুর্ভাগা শিশুদের অত্যন্ত মমতায় দেখাশোনা করেন। আপনি এর জন্য সরকারের কাছে কোনো অনুদান চাননি, বরং নিজের খরচেই এই মহৎ সামাজিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি আপনার এই অগ্রণী কাজে আপনি কোনো ব্রাহ্মণের সহায়তাও চাননি।
জ্যোতিরাও: আমাদের ইংরেজ সরকারের নীতি অনেকটা এমন মনে হয়— ‘যিনি অন্নদাতা তাঁর প্রতিই অনুগত থাকো’, ‘যে পয়সা দেয় সেই বায়না ধরে’ অর্থাৎ যে শক্তিশালী তার ইচ্ছাই আইন, এবং ‘বাতাস যেদিকে বয় সেদিকেই পাল তোলা’। যেহেতু অতিশূদ্রদেরকে ব্রাহ্মণরা অস্পৃশ্য বলে গণ্য করে, তাই তাদের জন্য উপার্জনের বা কর্মসংস্থানের সমস্ত পথ বন্ধ। পেটের দায়ে তারা ছোটোখাটো চুরি বা ডাকাতি করতে বাধ্য হয়। সরকার এই অপরাধীদের জন্য প্রতিদিন নিকটস্থ থানায় হাজিরা দেওয়া বাধ্যতামূলক করেছে। এটি একটি ভালো নিয়ম। অন্যদিকে, যেহেতু ব্রাহ্মণ বিধবাদের পুনর্বিবাহের উপর সামাজিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই এই দুর্ভাগা ও অসহায় নারীদের মধ্যে কেউ কেউ পাপের পথে পা বাড়িয়ে ফেলে এবং সামাজিক কলঙ্ক এড়াতে গর্ভপাত ও শিশুহত্যার আশ্রয় নেয়। আমাদের ন্যায়পরায়ণ সরকার এই ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের কথা জানলেও সেদিকে চোখ বুজে থাকে। অতিশূদ্র মাং ও রামোশীদের ক্ষেত্রে যেমন তদন্ত করা হয়, ব্রাহ্মণ বিধবাদের এই গর্ভপাত বা শিশুহত্যার মতো অপকর্মের ক্ষেত্রে সরকার তেমন কোনো গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে না। আমাদের সরকার কি মনে করে যে, এই মাং সম্প্রদায় সেইসব ব্রাহ্মণ বিধবাদের চেয়ে বেশি দোষী যারা গর্ভপাত ও শিশুহত্যা করে? ব্রাহ্মণরা কেবল নিজেদের ঢাক পেটাতে ওস্তাদ। এমন সব কাপুরুষদের সহযোগিতা নিয়ে কী লাভ হবে, যাদের নিজেদের দুর্ভাগা বিধবা কন্যা বা বোনদের মাথা মুণ্ডন করা থেকে নাপিতদের থামানোর মতো ন্যূনতম নৈতিক সাহস নেই? (ব্রাহ্মণদের সেকেলে ও পশ্চাৎমুখী ধর্ম অনুযায়ী এই বর্বর প্রথাটি পালন করা বাধ্যতামূলক বলে মনে করা হয়)।
ধোণ্ডিবা: সে কথা যাক। আপনি বলছিলেন যে শিক্ষা বিভাগে ব্যাপক অনিয়ম দেখা যায়? আমি কি জানতে পারি সেগুলো কী কী?
জ্যোতিরাও: এই অনিয়মগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা দিলে আস্ত একটা বই হয়ে যাবে। আমি এখানে মাত্র দু-একটি উদাহরণ দিচ্ছি। প্রথম বিষয়টি হলো— শূদ্র ও অতিশূদ্রদের সন্তানদের জন্য নির্ধারিত স্কুলগুলোতে শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যাপারে সরকারের চরম উদাসীনতা।
ধোণ্ডিবা: সকল ব্রাহ্মণ শিক্ষকরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে, যদি অতিশূদ্রদের সন্তানদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়, তবে ভারতে এক মহা-বিপর্যয় বা প্রলয় ঘটে যাবে। সরকারও এই পরিণতির ভয়ে ভীত।
জ্যোতিরাও: সেনাবাহিনীতে যখন সমস্ত জাতের প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন তো মানুষ কোনো গোলমাল সৃষ্টি করে না। আসলে অতিশূদ্রদের শিক্ষার ব্যাপারে এই উদাসীনতার জন্য সরকারই দায়ী। সামরিক কর্মকর্তারা নিয়োগের কাজে ব্যক্তিগতভাবে মনোযোগ দেন, তাই সেখানে বৈষম্য কম, কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটে না।
কিন্তু আমি দুঃখের সঙ্গে বলছি যে, সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজটির দায়িত্ব এমন কিছু অযোগ্য মানুষের হাতে সঁপে দেয় যারা কেবল আনুষ্ঠানিকতাই জানে। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজের গুরুত্ব সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই নেই। যদি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এই পদের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হতেন, তবে অতিশূদ্র সম্প্রদায় থেকে শিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য প্রার্থী বাছাই করার কাজে তিনি এমন উদাসীন হতেন না। তাহলে ওই শিক্ষক প্রশিক্ষণ স্কুলটি কেবল ব্রাহ্মণ প্রার্থীতেই ঠাসা থাকত না।
ধোণ্ডিবা: তাহলে এই পরিস্থিতির প্রতিকারের জন্য সরকারের কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?
জ্যোতিরাও: আমার মতে, এর একমাত্র প্রতিকার হলো— সরকার যদি এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব ইংরেজ কালেক্টরদের (District Collectors) হাতে তুলে দেয়, তবেই ভালো ফলাফল পাওয়া সম্ভব। এই কালেক্টররা তাঁদের দায়িত্ব পালনের সময় শূদ্র ও অতিশূদ্রদের খুব কাছাকাছি আসেন। তাঁদের উচিত হবে না ব্রাহ্মণ কর্মকর্তাদের উপর ভরসা করা; বরং তাঁদের উচিত পর্যায়ক্রমে ব্যক্তিগতভাবে গ্রামগুলো পরিদর্শন করা, কুলকার্নিদের (ব্রাহ্মণ গ্রাম-হিসাবরক্ষক) উপেক্ষা করা এবং গ্রামের ছোটো-বড়ো নির্বিশেষে সকলকে শিক্ষার সুফল সম্পর্কে বুঝিয়ে বলা। তাহলে গ্রামবাসীরা নিজেরাই গ্রাম থেকে চতুর ও বুদ্ধিমান ছেলেদের বেছে নেবে এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য সানন্দে তাদের কালেক্টরদের হাতে তুলে দেবে। আমি আত্মবিশ্বাসী যে, কালেক্টরের উৎসাহ পেলে এই কাজ সন্তোষজনকভাবে এগিয়ে যাবে। আমরা খুব ভালো করেই জানি যে, এই অপ্রশিক্ষিত ও ভুল তথ্যে ভরা ব্রাহ্মণ কর্মকর্তাদের অধীনে এই কাজের কোনো অগ্রগতিই হয়নি, আর ভবিষ্যতেও আদৌ কোনো উন্নতি হবে কি না, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এ প্রসঙ্গে একটি উপযুক্ত প্রবাদ আছে— ‘যে যার কাজে দক্ষ, তারই সেই কাজ করা সাজে’। অর্থাৎ, কোনো নির্দিষ্ট কাজে যে ব্যক্তি পারদর্শী, তাকে দিয়েই সেই কাজ করানো উচিত; অন্য কেউ তাতে হাত দিতে গেলে হয় সে বিপদে পড়বে, না হয় পুরো বিষয়টি লেজেগোবরে করে ফেলবে। ধোণ্ডিবা, একবার ভেবে দেখ— শূদ্র ও অতিশূদ্র সম্প্রদায় থেকে প্রশিক্ষিত শিক্ষক তৈরি করা কতটা জরুরি। যখন এই ধরণের শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজের জন্য তৈরি হবে, তখন তারা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নিজেদের কাজে আত্মনিয়োগ করবে; কারণ নিজ সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের ভাগ্য পরিবর্তনের এক তীব্র আকাঙক্ষা তাদের পরিচালিত করবে। সাধারণত এই সম্প্রদায়ের ছোটো শিশুদের তাদের বাবা-মা গ্রামের চারণভূমিতে গবাদি পশু চরাতে পাঠিয়ে দেয়। এই উদ্বুদ্ধ শিক্ষকরা শিশুদের মধ্যে শিক্ষা গ্রহণের প্রতি এমন আগ্রহ ও সচেতনতা তৈরি করবে যে, তারা যখন বড়ো হবে, তখন তারা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে পর্যায়ক্রমে চারণভূমিতে গবাদি পশু চরানোর জন্য নিযুক্ত করবে; যাতে বাকি সমস্ত ছেলেরা স্কুলে ভিড় করতে পারে এবং বানরের মতো নিপুণভাবে গাছে চড়ার মতো খেলাধুলা বা আমোদ-প্রমোদে লিপ্ত না হয়ে শিক্ষকের পায়ের কাছে বসে জীবনদায়ী শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। আমরা দেখতে পাই, এমনকি আধুনিক যুগেও আমেরিকার অর্ধেক আলোকিত মানুষকে তাদেরই স্বদেশবাসীদের বিরুদ্ধে তিন বছর (১৮৬২— ৬৫) ধরে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়েছিল শুধুমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসদের দাসত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য। তবে তুমি কীভাবে আশা করো যে, আমাদের এই ব্রাহ্মণ শিক্ষকরা স্কুলে শূদ্র ও অতিশূদ্র শিশুদের এমন প্রকৃত জ্ঞান দান করবে, যা তাদের ব্রাহ্মণদের এই যুগ-যুগান্তরের দাসত্ব থেকে নিজেদের মুক্ত করতে অনুপ্রাণিত করবে? একজন ব্রাহ্মণ অধ্যাপক এত মোটা অঙ্কের বেতন পায় যে, সেই একই পরিমাণ বেতনের টাকা দিয়ে সরকার ছয়জন শূদ্র অধ্যাপক অথবা নয়জন অতিশূদ্র অধ্যাপককে নিয়োগ করতে পারে। শূদ্ররা তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সরকারি কোষাগারে যে মূল্যবান অর্থ জমা দেয়, সেই টাকা সরকার যদি আবার সেই ব্রাহ্মণদের পরামর্শেই এই ব্রাহ্মণ শিক্ষকদের বেতনের পিছনে অপচয় করে— আর আমরা যদি সরকারকে এই বিষয়ে বোঝাতে না পারি, তবে তার জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী থাকব। এখন আমাকে বলো তো, মি. চৌধুরী তাঁর বিশাল বাড়িতে যে বোর্ডিং স্কুলটি চালাচ্ছেন, সেখানে কতজন অতিশূদ্র শিশু পড়াশোনা করছে?
ধোণ্ডিবা: যদি ওই স্কুলে শূদ্র শিশুদের জন্যই ভর্তি হওয়া কঠিন হয়, তবে অতিশূদ্র শিশুদের জন্য তা কতটা বেশি কঠিন হবে, তা বোঝাই যাচ্ছে।
জ্যোতিরাও: তুমি নিজেই তো কিছুক্ষণ আগে বললে যে, সরকার ছাত্রদের মধ্যে কোনো বৈষম্য করে না, জাতপাত নির্বিশেষে সবার সাথে ন্যায্য আচরণ করে। তাহলে কেন এই শোচনীয় অবস্থা?
ধোণ্ডিবা: এই শোচনীয় অবস্থার কারণ হলো— ব্যতিক্রমহীনভাবে সব শিক্ষকই হলো ব্রাহ্মণ; আপরি নিজেই আমাকে এর একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়েছিলেন। আপনি অতিশূদ্র শিশুদের জন্য আপনার একটি স্কুলে একজন ব্রাহ্মণ শিক্ষককে নিয়োগ করেছিলেন, যে শিশুদের জাতপাতের তোয়াক্কা না করেই সকাল-বিকেল সেই স্কুলে পড়াতো। পরবর্তীতে সে আপনার কাজ ছেড়ে একটি ব্রাহ্মণ বোর্ডিং স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেয়। সেখানে সে এতটাই অসহিষ্ণু ও গোঁড়া হয়ে ওঠে যে, একজন দরিদ্র স্বর্ণকারকে তার ‘জঘন্য’ অপরাধের জন্য ‘চাওড়ি’-তে (গ্রামের বিচারসভা বা জনসমক্ষে) হাজির হতে বাধ্য করেছিল। সেই লোকটির অপরাধ ছিল— ভয়াবহ গরমে তৃষ্ণা মেটাতে ওই স্কুলের জলের চৌবাচ্চা থেকে জল খেয়ে তা ‘অপবিত্র’ করেছিল।
জ্যোতিরাও: এমন একজন অত্যন্ত বিখ্যাত ব্রাহ্মণের উদাহরণও আছে। সে অনেক গান রচনা করেছে, যা সমাজের সকল স্তরের মানুষের জন্য গাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অথচ সেই স্বনামধন্য ব্যক্তিটি নিজের বাড়িতে মূর্তিপূজার মতো গোঁড়া প্রথা ত্যাগ করতে পারেনি। তার বিশাল বাসভবনে কেবল ব্রাহ্মণদের ব্যবহারের জন্য একটি ব্যক্তিগত জলের চৌবাচ্চা ছিল। শূদ্রদের দ্বারা সেই চৌবাচ্চাটি ‘অপবিত্র’ হওয়ার ভয়ে সে সেটির চারপাশে দেয়াল গেঁথে দিয়েছিল যাতে তারা সেখানে যেতে না পারে। আমি জানতে পেরেছি যে, সে কাশী তীর্থে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে, হয়তো সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করবে। পুনের সেই ‘নিরপেক্ষ’ মিউনিসিপ্যালিটি, যা মূলত ব্রাহ্মণ সদস্যদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল— তারা ওই স্বনামধন্য ব্রাহ্মণের তৈরি করা জলের চৌবাচ্চার চারপাশের নতুন দেয়ালটি নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য বা আপত্তি করেনি। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, ‘শুক্রবার পাড়া’র জলের চৌবাচ্চার চারপাশে শূদ্ররা যখন একই রকম একটি দেয়াল তৈরি করেছিল, তখন তারা তা ভেঙে ফেলতে অত্যন্ত তড়িৎ ব্যবস্থা নিয়েছিল।
অনেক ব্রাহ্মণ আবার চুপিচুপি পুরনো চৌবাচ্চাটির কাছে তাদের একচেটিয়া ব্যবহারের জন্য আরেকটি ছোটো চৌবাচ্চা তৈরি করে নিয়েছে। সেখানে তারা নিজেদের স্নান ও কাপড়কাচার কাজে নির্দ্বিধায় বিপুল পরিমাণ মূল্যবান জল অপচয় করে। অথচ শূদ্ররা তখন একফোঁটা জলের জন্য হাহাকার করে! একজন ব্রাহ্মণের পক্ষে কতই না স্বাভাবিক যে, সে অত্যন্ত মসৃণভাবে নির্বিকার চিত্তে নিজের চাতুরি ও কূটকৌশল প্রয়োগ করে যাবে! এভাবেই সে তার তথাকথিত ‘ধন্য’ ব্রাহ্মণ জন্মের সার্থকতা প্রমাণ করে!
ধোণ্ডিবা: আমাদের এযাবৎকাল হওয়া আলোচনাগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়লে এটা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এই ধূর্ত ব্রাহ্মণরা তাদের সেকেলে ও মিথ্যা ধর্মের অচল শিক্ষার উপর ভিত্তি করে আমাদের বিশ্বাসপ্রবণ ইংরেজ সরকারের চোখে ধুলো দিচ্ছে। তারা ভারতের শূদ্র ও অতিশূদ্রদের উপর আমেরিকার ক্রীতদাস মালিকদের কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসদের প্রতি করা আচরণের চেয়েও বেশি নিষ্ঠুরভাবে অত্যাচার করছে। তাহলে কেন আপনি, ব্রাহ্মণদের এই মিথ্যা ও ধূর্ত ধর্মকে নিন্দা করছেন না এবং এর মাধ্যমে আমাদের অজ্ঞ ও দীর্ঘকাল ধরে নির্যাতিত দেশবাসী ভাইদের জাগ্রত করছেন না?
জ্যোতিরাও: আমি গত সন্ধ্যায় এই বিষয়ে একটি চিঠি লিখে আমার এক ব্যক্তিগত বন্ধুর কাছে দিয়েছি। আমি তাকে অনুরোধ করেছি, তিনি যেন চিঠিটির ভুলত্রুটি সংশোধন করে তার একটি করে কপি ব্রাহ্মণ ও খ্রিস্টান সম্পাদকদের কাছে তাদের (মূল্যবান) মতামতের জন্য পাঠায়। চিঠিটি নিম্নরূপ—
শূদ্ররা কীভাবে এই ব্রাহ্মণ রাক্ষসদের দাসত্ব থেকে নিজেদের মুক্ত করবে?
ব্রাহ্মণদের আদি পুরুষরা ইরান থেকে (যারা ছিল ইরানি) এখানে এসে এই দেশের আদি বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চালিয়ে তাদের পরাজিত ও দাসে পরিণত করে। পরবর্তীকালে, সুযোগ বুঝে ক্ষমতার নেশায় মত্ত হয়ে এই ‘ভট’রা (ব্রাহ্মণরা) অনেক চতুর, দুষ্ট ও মিথ্যা ধর্মগ্রন্থ রচনা করে, যা অভেদ্য দুর্গের মতো। তারপর তারা এই অত্যন্ত কৃত্রিম ও অন্যায়পূর্ণ জাতিপ্রথার দুর্গে সেই ‘দাস’দের বংশপরম্পরায় হাত— পা বেঁধে বন্দি করে ফেলে। এভাবেই তারা দীর্ঘকাল ধরে এই অভাগা দাসদের উপর নির্যাতন চালিয়ে আসছে এবং তাদের শ্রমের বিনিময়ে নিজেরা সীমাহীন ভোগবিলাসে মত্ত রয়েছে। এরপর ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হলো। ভারতে ব্রিটিশদের আগমনের পর, কিছু দয়ালু ইংরেজ ও আমেরিকান— যাঁরা সৎচরিত্রের মানুষ— আমাদের দেশবাসীদের (শূদ্র ও অতিশূদ্রদের) শোচনীয় দুর্দশা দেখে গভীরভাবে ব্যথিত হন। তাই এই মহৎপ্রাণ ব্যক্তিরা সেই বিশাল কারাগারে (কারণ ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে ভারত তখন এমনই এক কারাগারে পরিণত হয়েছিল) প্রবেশ করে আমাদের নিম্নোক্ত মূল্যবান উপদেশ প্রদান করলেন—
‘বন্ধুরা, আমরা সবাই সমান মানুষ। আমাদের সবার স্রষ্টা ও পালনকর্তা সেই এক ঈশ্বর। যখন আপনারা আমাদের মতোই মানবাধিকার পাওয়ার যোগ্য, তখন কেন আপনারা এই ব্রাহ্মণদের মিথ্যা কর্তৃত্ব মেনে চলছেন?’
তাঁরা আমার সামনে অনেক নতুন ও ভিন্নধর্মী চিন্তাধারা তুলে ধরলেন। যখন গভীর চিন্তার পর আমি আমার ন্যায্য অধিকার ও নীতি বুঝতে পারলাম, তখন আমি ব্রাহ্মণদের চাতুর্য ও অত্যাচারের সেই বিশাল মিথ্যা কারাগারের সদর দরজা লাথি মেরে ভেঙে ফেললাম এবং স্বাধীনতার আলোয় বেরিয়ে এলাম। আর আমার হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে আমাদের সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানালাম।
এখন, পরোপকারী ইংরেজ মিশনারিদের আঙিনায় কিছু সময়ের বিশ্রামের জন্য তাঁবু খাটানোর আগে, আমি নিম্নোক্ত পবিত্র প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করছি—
‘আমি এই মর্মে ব্রাহ্মণদের সেই সমস্ত প্রধান ধর্মগ্রন্থকে তীব্রভাবে নিন্দা করছি যা আমাদের তাদের অনুগত ভৃত্য বা দাস বলে ঘোষণা করে। সেই সাথে তাদের লেখা অন্যান্য বইয়ের সেই সমস্ত অংশ বা সমরূপ অন্য যেকোনো ধর্মীয় গ্রন্থ— যা এই ধরনের আপত্তিকর মতবাদ প্রচার করে, তাকেও আমি প্রত্যাখ্যান করছি। আমি সেই সব গ্রন্থকে শ্রদ্ধা করি যা প্রচার করে যে, সমস্ত মানুষ সমানভাবে মানবাধিকার ভোগের অধিকারী; সেই বইগুলো পৃথিবীর যে কোনো দেশের বা যে কোনো ধর্মের চিন্তাবিদদের দ্বারা লেখা হয়ে থাক না কেন। আমি নিজেকে এই ধরনের অমূল্য গ্রন্থসমূহের লেখকদের ছোটো ভাই হিসেবে গণ্য করব— যেহেতু আমরা সকলেই সেই এক সৃষ্টিকর্তার সন্তান— এখন থেকে সেই অনুযায়ী আচরণ করব।
‘দ্বিতীয়ত, ভারতে এমন কিছু মানুষ (ব্রাহ্মণ) আছে, যারা তাদের নিজস্ব ভ্রান্ত ধর্মীয় গোঁড়ামির অহংকারী কর্তৃত্ব অন্যদের উপর একতরফাভাবে চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের দেশবাসীকে নীচ, অধম ও অমানুষ হিসেবে গণ্য করে। আমি তাদের অন্যদের প্রতি এমন আচরণ করার স্বাধীনতা দেব না। আমি যদি এ বিষয়ে তাদের কর্তৃত্ব স্বীকার করে নিই, তবে আমাদের সৃষ্টিকর্তার তৈরি করা পবিত্র অধিকারগুলো লঙ্ঘন করার অপরাধে আমি অপরাধী সাব্যস্ত হব। তৃতীয়ত, এমন অনেক অনুগত ভৃত্য বা দাস (শূদ্র) থাকতে পারে, যারা আমাদের সৃষ্টিকর্তাকে শ্রদ্ধা করে, যারা নৈতিকভাবে জীবনযাপন করে এবং যারা স্বচ্ছ ও সৎ পেশায় নিয়োজিত থেকে এই মহৎ আদর্শগুলোকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে— যখনই আমি তাদের সততা ও আন্তরিকতা সম্পর্কে নিশ্চিত হব, তারা পৃথিবীর যে কোনো দেশের নাগরিকই হোক না কেন, আমি তাদের আমার নিজের পরিবারের সদস্য হিসেবে গণ্য করব এবং তাদের সাথে কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই এক পাতে বসে অন্ন গ্রহণ করব।
‘ভবিষ্যতে আমার কোনো শূদ্র ভাই, যে অজ্ঞতার কারণে নিপীড়িত হচ্ছে, যদি কখনো ব্রাহ্মণদের এই দাসত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চায় এবং চিঠির মাধ্যমে আমাকে তার নাম জানায়, তবে তা আমার প্রচেষ্টাকে আনন্দিত ও উৎসাহিত করবে। আমি সেই ব্যক্তির কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব।’
৫ই ডিসেম্বর, ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দ জ্যোতিরাও গোবিন্দরাও ফুলে
পুনা, ওল্ড গঞ্জ নং ৫২৭।
ধোণ্ডিবা: আপনার উপরোক্ত ঘোষণাপত্রে আপনি যে সমস্ত বিষয় উল্লেখ করেছেন, আমি তার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত, আমিও সেই অনুযায়ী চলব। হাজার হাজার বছর আগে ব্রাহ্মণদের উদ্ভাবিত সেই মিথ্যা ও যন্ত্রণাদায়ক কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে আমি মনেপ্রাণে আনন্দিত। আমি আপনার কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ! আপনার প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা এবং উপদেশ আমাকে ধূর্ত ব্রাহ্মণদের দ্বারা প্রচারিত হিন্দুধর্মের অসারতা ও অযৌক্তিকতা সম্পর্কে নিশ্চিত করেছে। কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব যে, সর্বব্যাপী ও সর্বজ্ঞ ঈশ্বর— যাঁকে আমরা এবং অন্যান্য সমস্ত বিবেকবান ও শিক্ষিত মানুষ অকুণ্ঠচিত্তে বিশ্বাস করি— তিনি ভারতে আমাদের মতো শূদ্র ও অতিশূদ্রদের উপর চলা এই অন্তহীন পরীক্ষা এবং চরম দুর্দশা লক্ষ করছেন না?
জ্যোতিরাও: আমি অন্য কোনো সময় তোমার কাছে এই জটিল সমস্যাটি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করব, তখন তুমি আমার এই তত্ত্বের সত্যতা সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারবে।
[মারাঠি সাংবাদিকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত মতামতগুলোর মধ্যে দুটি নিচে ছাপা হলো। বিজ্ঞ পাঠকরা নিজেরাই সেগুলোর গুরুত্ব বিচার করে নেবেন। — লেখক]
পুনা, শনিবার, ৪ জানুয়ারি, ১৮৭২
আমাদের বিজ্ঞ বন্ধু জ্যোতিরাও গোবিন্দরাও ফুলে— যিনি একজন গভীর পণ্ডিত, মহান চিন্তাবিদ, শ্রেষ্ঠ দার্শনিক এবং গবেষক— একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সুপারিশে আমাদের কাছে একটি অনুপযুক্ত পত্র পাঠিয়েছেন। সেই পত্রটি আত্মপ্রশংসায় পরিপূর্ণ এবং ব্রাহ্মণদের প্রতি তীব্র সমালোচনা ও কুৎসাযুক্ত। আমাদের সংবাদপত্রে এর স্থান হওয়ার সম্ভাবনা নেই। উক্ত পণ্ডিত ফুলে যেন আমাদের এই অক্ষমতার জন্য আমাদের ক্ষমা করেন।
একটি দর্পণ, কোলহাপুর ১ ফেব্রুয়ারি, ১৮৭৩
সম্পাদকের সমীপে পত্রাবলি
পুনের মারাঠি সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকরা নিচের বিষয়বস্তুটি ছাপাতে অস্বীকার করায় তা আমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। যেহেতু জ্যোতিরাও গোবিন্দ ফুলে এটি ব্যাপকভাবে প্রচার করতে ইচ্ছুক, তাই আমরা এটি আমাদের পত্রিকায় প্রকাশ করছি। যদিও আমাদের হিন্দু বন্ধুরা এটিকে কিছুটা সমালোচনাপূর্ণ বা মানহানিকর মনে করতে পারেন, তবে আমাদের মতে এই চিঠির মূল সুরটি প্রশংসনীয়। ব্রাহ্মণদের দ্বারা প্রচারিত জাতিভেদ প্রথার কোনো ভিত্তি নেই— এই বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে তিনি সাহসের সাথে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি যে কোনো ব্যক্তির সাথে (জাতপাত নির্বিশেষে) অন্ন গ্রহণ করতে প্রস্তুত। এই দেশে এমন বীরদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাক।
জয় হোক হে জ্যোতি— লুথার! পবিত্র— আধার সন্ধানী,
‘আর্য’— অন্যায় প্রতিকারকারী ভ্রাম্যমাণ বীর,
অবহেলিতের অকুতোভয় রক্ষাকর্তা,
পুরোহিততন্ত্র আর ধনমত্ততাকে হঠিয়ে মহিমান্বিত পথ উন্মোচনকারী।
ভবিষ্যদ্রষ্টা আত্মা, মহান উদ্যান— পালক,
শূদ্র— বিবাদ নিরাময়কারী, ত্রাণকর্তা,
মূর্তিপূজা— ভঞ্জক, ‘চাষির চাবুক’,
জল স্থল জুড়ে এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা।
অনাগত প্রজন্মের পালক— পিতা,
সত্যসন্ধানী, উদার ও মুক্তমনা,
শ্রমিকগণের ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধকারী
‘মাধুর্য— দীপ্তি’র এক উজ্জ্বল প্রভাত।
‘পি.জি.পি’
[মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে ব্রাহ্মণদের দ্বারা শূদ্র— অতিশূদ্রদের শোষণের বিতর্কিত বিষয়ের উপর মারাঠি ভাষায় চারটি কবিতা রচনা করেছিলেন। সেই চারটি কবিতার গদ্যানুবাদ নিচে দেওয়া হলো।]
প্রকৌশল বিভাগে ব্রাহ্মণদের জন্য যেন পেশোয়াদের সেই অঢেল ‘রমণা’১৫ (দক্ষিণা বিতরণ) চলছে। ব্রাহ্মণ লুণ্ঠনকারীরা ঝোলা ভরে ভিক্ষা গ্রহণ করছে (ঠিক যেমন ১৮০৩ সালে যশবন্তরাও হোলকার পুনে লুণ্ঠনের সময় করেছিল)১৬। এই ব্রাহ্মণ ভিক্ষুকরা দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতে বিন্দুমাত্র লজ্জিত হয় না। অলসরা তথাকথিত ধর্মের আশ্রয় নেয়। আর ধূর্তরা কায়িক পরিশ্রমী মানুষদের নীচ ও তুচ্ছ জ্ঞান করে। তারা চরম তোষামোদে লিপ্ত থাকে। লিখনে দক্ষ হওয়ায় ব্রাহ্মণরা কেরানির চাকরিতে এমনভাবে জেঁকে বসে (যেমন হাঁস অনায়াসে জলে নামে) আর দিনের আলোয় কৃষকের সর্বস্ব লুট করে। ব্রাহ্মণ কর্মকর্তারা হাতে হাজিরা খাতা নিয়ে কাজের জায়গায় যায়, অত্যন্ত আয়েশ করে অবহেলার সাথে রোল— কল করে। মাঝেমধ্যে কোনো কারণ ছাড়াই কিছু শ্রমিককে মজুরি না দিয়ে তাড়িয়ে দেয় এবং তাদের অস্তিত্বহীন ত্রুটির জন্য দোষারোপ করে। মাথায় তারা সেই চেনা পুনেরি পাগড়ি পরে, তারা কাজের সুপারভাইজারকে ধমক দেয় এবং সাধারণ কর্মীদের উপর প্রভুত্ব ফলাবার চেষ্টা করে। তারা কাজের জায়গা থেকে দূরে দাঁড়িয়ে চোখ পাকায়, দাঁত কিড়মিড় করে। তারা সুপারভাইজারকে কাজের জায়গা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে কানে কানে ধূর্ততাপূর্ণ কুমন্ত্রণা দেয়। এরপর তারা শ্রমিকদের ভুয়া হাজিরা নথিভুক্ত করে আর কিছু কল্পিত নাম পড়ে শোনায়। তারা সময়ে সময়ে কাজের হিসাব নেয়। শ্রমিকরা যখন গরমে ঘামতে থাকে, তখন এই ব্রাহ্মণ কর্মকর্তারা শ্রমিকদের পেতে দেওয়া কম্বলের উপর বসে থাকে। এভাবেই এই ব্রাহ্মণ লুণ্ঠনকারীরা ঝোলা ভরে ভিক্ষা (দক্ষিণা) হাতিয়ে নেয়, ঠিক যেমন ১৮০৩ সালে পুনে লুণ্ঠনের সময় হোলকার করেছিল।
যদিও পাণ্ড্যা (শ্রমিক পাণ্ডুরং— কে তাচ্ছিল্যসূচক সম্বোধন) পুরো এক মাস কাজ করেছে, তবুও ব্রাহ্মণ কর্মকর্তারা তাকে মাত্র বারো দিনের হাজিরা দেখায়, বাকি আঠারো দিনের মজুরি নিজেদের পকেটে ভরে। তারা খাণ্ড্যা (খাণ্ডোবা) ও তার সাতজন সহকর্মীকে মাসে মাত্র আট দিনের জন্য হাজিরা দেখায় এবং বাকি বাইশ দিনের মজুরি নিজেরা আত্মসাৎ করে। শ্রমিকের পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা যারা তার সাথে কাজের সাইটে কাজ করে, তারা প্রত্যেকে মজুরি হিসেবে চার আনা করে পায়। নারী ও শিশুদের মাসে মাত্র চার দিনের জন্য হাজিরা দেখানো হয় এবং ছাব্বিশ দিন অনুপস্থিত দেখানো হয়। কর্মকর্তারা বাকি দিনগুলোর মজুরি পকেটস্থ করে। রাণ্যা ও নাড়্যা নামে দুই বালকের হাজিরা দেখানো হয় মাত্র দুই দিনের। তাদের দেওয়া এই হাজিরা মূলত অগ্রিম নেওয়া মজুরির হিসেবে দেখানো হয়। দৈনিক মজুরির চুক্তিতে থাকা কিংবা রোড— রোলার টানা বলদগুলো মাসে মাত্র দশ দিনের মজুরি পায়, এবং সেই অবস্থাও জলবাহক ভিস্তির মজুরির মতোই শোচনীয়।
‘আমরা জাতিতে ব্রাহ্মণ, উচ্চতর বংশ’— এই বলে তারা নিজেদের জাহির করে। তারা অত্যন্ত নম্র ও বিনয়ী হওয়ার ভান করে এবং ধর্মের বিধানের দোহাই দেয়। এভাবেই তারা এমন সব কথার জালে শ্রমিকদের মোহাবিষ্ট করে রাখে, যাতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ না হয়। ‘তোমাদের (শূদ্রদের) উচিত আমাদের ভরণপোষণ করা’— এই তাদের দাবি। তারা কোমরে শক্ত করে ধুতি গুঁজে কঠোর পরিশ্রমের অভিনয় করে; এটাই তাদের প্রতিদিনের রুটিন। এরপর তারা ঘোড়ায় চড়ে রাত আটটার সময় বাড়ি ফেরে এবং ফেরার পথে শূদ্রদের সেচ দেওয়া খামারে হানা দিয়ে বিনামূল্যে শাকসবজি নিয়ে যায়। এভাবেই এই ব্রাহ্মণ লুণ্ঠনকারীরা ঝোলা ভরে দক্ষিণা (ভিক্ষা) হাতিয়ে নেয়, ঠিক যেমন ১৮০৩ সালে পুনে লুণ্ঠনের সময় হোলকার করেছিল।
ব্রাহ্মণ কর্মকর্তারা সেইসব নারী শ্রমিকদের খুঁজে বের করে, যারা সুপারভাইজারের বিশেষ প্রিয় এবং তাদের পুরো সময়ের জন্য হাজিরা হিসেবে নথিবদ্ধ করে। তারা কোনো নিম্নপদস্ত কর্মীকে দিয়ে সুপারভাইজারের ঘোড়ার যত্ন নেওয়ার ব্যবস্থা করে তাকে খুশি রাখে। এইভাবে সেই শয়তানকে (সুপারভাইজারকে) সন্তুষ্ট করে। তারা চতুর কথার মাধ্যমে সেইসব অযোগ্য ব্যক্তিদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে আকাশে তুলে দেয়। মাঝেমধ্যে তাকে ভুরিভোজও করানো হয়, যাতে সুযোগ বুঝে তাকে ঋণের জালে বা কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করা যায়। যখন সুপারভাইজার সেই ব্রাহ্মণ কর্মকর্তার বাড়িতে ভোজনরত থাকে, তখন কর্মকর্তার স্ত্রী সুযোগ বুঝে (অবশ্যই তার স্বামীর অজান্তে হওয়ার ভান করে) তাকে বাড়িতে জ্বালানি কাঠের সংকটের কথা জানায় এবং সেই গ্রামে শাকসবজি পাওয়া কতটা কঠিন, তা সবিস্তারে বলে। হতভাগ্য সুপারভাইজার সেই ইঙ্গিত বুঝতে পারে এবং বিনামূল্যে শাকসবজি ও আচার তৈরির উপযুক্ত সময়ে টাটকা লেবু সরবরাহ করে। তাকে খাবার পরিবেশন করা হয় দূর থেকে, যাতে ছোঁয়া লেগে জাত না যায়, কঠোরভাবে অস্পৃশ্যতা পালন করা হয় এবং মিষ্টি কথায় তাকে ভুলিয়ে রাখা হয়। নিজেদের বাড়িতে খাইয়ে তারা তাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করে ও অত্যন্ত চতুরতার সাথে তাকে বোকা বানায়; কারণ খাওয়ার শেষে তারা তাকে দিয়েই মেঝে ঝাড়ু দেওয়ায় ও গোবর দিয়ে লেপন করায়, যাতে তার ছোঁয়ায় লাগা অপবিত্রতা দূর হয়। ওহে ধূর্ত ব্রাহ্মণেরা! আমি এই সব কুপ্রথার তীব্র নিন্দা জানাই। দয়া করে তোমাদের এই অপবিত্র, অধার্মিক পথ ও কর্ম ত্যাগ করো। তোমাদের এই তথাকথিত ধর্ম নরকের আগুনে ভস্মীভূত হোক!
ব্রাহ্মণ কর্মকর্তারা যখন নিজেদের অপকর্মের কারণে কোনো বিপদে পড়ে, তখন তারা কাজের সুপারভাইজারকে বলির পাঁঠা বানিয়ে নিজেদের চামড়া বাঁচায়। তারা মিষ্টি কথার ছদ্মবেশে বিশ্বাসঘাতকতা করে সুপারভাইজারের গলা কাটে। এভাবেই এই ব্রাহ্মণ লুণ্ঠনকারীরা ঝোলা ভরে দক্ষিণা (ভিক্ষা) হাতিয়ে নেয়, ঠিক যেমন ১৮০৩ সালে পুনে লুণ্ঠনের সময় হোলকার করেছিল।
অদক্ষ শ্রমিকদের বাধ্য করা হয় ব্রাহ্মণ কর্মকর্তাদের ঘোড়ার জন্য সবুজ কাঁচাঘাস জোগাড় করতে। এমনকি তারা ঘোড়ার সহিস হিসেবেও কাজ করে। কাজের সাইটে কর্মরত নারী শ্রমিকদের ব্রাহ্মণের ঘরের নোংরা বাসনপত্র পরিষ্কার করতে বলা হয়; অন্যদিকে পুরুষ শ্রমিকরা তাদের বিছানা পেতে দেয় এবং কোনো এক সরলমনা কৃষক পরম মমতায় সেই কর্মকর্তার পা টিপে দেয়, আর সেই অবসরে ব্রাহ্মণ কর্মকর্তা সুখনিদ্রায় ঢলে পড়ে। ওই কর্মকর্তা কিছু ব্রাহ্মণ ভিক্ষুককে কাজের সাইটে নিয়ে আসে ও শ্রমিকদের বাধ্য করে তাদের দান— দক্ষিণা দিতে (এই অজুহাতে যে, এমন কাজ অত্যন্ত পুণ্যময়)। এই অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থের ভাগ তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও দেয়। তারা প্রকৌশল বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অবৈধ উপঢৌকন বা ঘুষ প্রদান করে আর নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের কাছ থেকে পান খায়। আর ঠিক তখনই আসে শ্বেতাঙ্গ ইংরেজ অফিসাররা, তাদের প্রশাসন এবং তাঁবু নিয়ে। ইংরেজ কর্মকর্তারা শিকার অভিযান করে বড়ো ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তারা কেবল কাগজপত্রে সই করে আর প্রশাসনের বাকি যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সেই ব্রাহ্মণ কর্মকর্তাদের উপর ছেড়ে দিয়ে হাতে মদের গ্লাস নিয়ে আয়েশ করে। সোফায় হেলান দিয়ে ইংরেজি সংবাদপত্র পড়ার সময় তাদের কী চমৎকারই না দেখায়, আর মাঝেমধ্যে তারা সোফাতেই ঝিমিয়ে পড়ে। এই গরিব শ্রমিকদেরই বাধ্য করা হয় তাদের জন্য মুরগির মাংস জোগাড় করে দিতে। ব্রাহ্মণরা কৃষকদের অর্থ আত্মসাৎ করে। তারা ইংরেজ কর্মকর্তাদের খানসামাদের মাধ্যমে সাহেবদের খুশি রাখার চেষ্টা করে। এভাবেই এই ব্রাহ্মণ লুণ্ঠনকারীরা ঝোলা ভরে দক্ষিণা (ভিক্ষা) হাতিয়ে নেয়, ঠিক যেমন ১৮০৩ সালে পুনে লুণ্ঠনের সময় হোলকার করেছিল।
যদি কোনো লোকসান হয়, তবে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ খাতা থেকে বাদ দিয়ে দেয় এবং মিথ্যা সংখ্যা দিয়ে ভুয়া নথিপত্র তৈরি করে। জনগণের অর্থের এই যে চুরির মহোৎসব, তা আমাদের পেশোয়াদের সেই ‘রমণা’র কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ব্রাহ্মণদের ভোজন করানো ও দুহাতে অর্থ বিলিয়ে অঢেল সম্পদ অপচয় করা হতো। তারা যে কোনোভাবে সরকারি প্রতিবেদনে হিসাবগুলো মিলিয়ে দেয়। যখন সরকারি কোষাগার শূন্য হয়ে পড়ে, তখন তারা দরিদ্র জনসাধারণের উপর নতুন করে কর আরোপ করে। এই সমস্ত নিষ্ঠুর পদক্ষেপের ফলে শেষ পর্যন্ত কৃষকদের হাড়গোড় ভেঙে যায়, তারা নিঃস্ব হয়ে পড়ে। এই ধূর্ত কর্মচারীরা অবৈধ উপায়ে লাখ লাখ টাকা জমিয়েছে। অন্যদিকে, কৃষকের তেলের চামড়ার পাত্রটি আজ পুরোপুরি শূন্য। (অর্থাৎ, জমি চাষকরা কৃষক আজ চরম দারিদ্রে নিমজ্জিত)।
ইংরেজ কর্মকর্তারা যখন ব্রাহ্মণ কর্মকর্তাদের অবৈধ লেনদেনের কথা জেনে ফেলে, তখন তারা তড়িঘড়ি করে পদত্যাগ করে। তারা নিজেদের জন্য প্রাসাদোপম তিনতলা অট্টালিকা তৈরি করেছে। ওহে ইংরেজ শাসককুল! আপনারা নিজেদের ন্যায়পরায়ণ ও নিরপেক্ষ বলে অত্যন্ত গর্ব বোধ করেন, কিন্তু আপনাদের হৃদয়ে শূদ্রদের জন্য বিন্দুমাত্র করুণা নেই। আমি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ঘোষণা করছি এবং ইংরেজ শাসকদের ন্যায়বোধ ও সুবিচারের কাছে এই আবেদন জানাচ্ছি— জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে সমস্ত সম্প্রদায় থেকে সরকারি কর্মচারী নিয়োগ করুন এবং সমস্ত প্রশাসনিক ও সংশ্লিষ্ট কাজের দায়িত্ব সেই কর্মচারীদের হাতে ন্যস্ত করুন। আপনারা যদি এই সংস্কার প্রবর্তন করেন, তবে তা শূদ্রদের সুখ ও সমৃদ্ধির বড়ো হাতিয়ার হয়ে উঠবে। আমি এই সমস্ত অন্যায়ের জন্য আপনাদেরই দায়ী করছি; কারণ আপনারা কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় (ব্রাহ্মণ) থেকে আমলা নিয়োগ করেছেন, বাকি শূদ্র ও অতিশূদ্রদের বাদ দিয়েছেন।
একটি মাত্র সম্প্রদায় থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত এই ভট (ব্রাহ্মণ) কর্মচারীরা গোটা দেশকে— এই দেশের নিরক্ষর জনতাকে লুণ্ঠন করে পালাচ্ছে; অথচ সরকারি চাকুরিতে সুযোগ না পাওয়া অন্য সবাই অসহায়ভাবে এই পুরো তামাশা দেখতে বাধ্য হচ্ছে। তাই জ্যোতিরাও (ইংরেজ সরকারকে) এই পরামর্শ দিচ্ছে যে, সরকারি কর্মচারী যেন কেবল একটি সম্প্রদায় (ব্রাহ্মণ) থেকে নিয়োগ করা না হয়— যারা কেবল নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত এবং ঝোলা ভরে অর্থ আত্মসাৎ করছে (ঠিক যেমন ১৮০৩ সালে পুনে লুণ্ঠনের সময় হোলকার করেছিল)।
গরিব শূদ্র কৃষক এক টুকরো সামান্য কাপড় কোমরে পেঁচিয়ে সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে লাঙল চষে। তার পরিবারের নারীদের জন্য ছেঁড়া কাঁথা ছাড়া আর কোনো বিছানা নেই। তার সন্তানরা সারাদিন গবাদি পশু চরাতে মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়ায়। তার প্রধান খাদ্য— ঘোল আর মোটা দানার যবের জাউ খেয়েই তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। সে আক্ষেপ করে বলে— ‘কী ধন্য জীবন!’
পর্যাপ্ত পোশাক না থাকায় শীতের হাত থেকে বাঁচতে তারা একে অপরের শরীরের উত্তাপ নিতে জড়োসড়ো হয়ে ঘুমায়! যখন গ্রামের হিসাবরক্ষক (কুলকার্নি) তাকে খাজনা দেওয়ার জন্য হয়রান করে, তখন সেই দরিদ্র কৃষক তিন গোছা চুল বিশিষ্ট ব্যক্তির (অর্থাৎ কানের দুপাশে দুই গুচ্ছ এবং মাথায় এক গুচ্ছ চুল রাখা মাড়োয়ারি মহাজন) সাহায্য নিতে বাধ্য হয়। মহাজন সেই কৃষককে অত্যন্ত কঠোর শর্তে একটি চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে। মাড়োয়ারিদের লেনদেন বড়ো হৃদয়হীন। গরিব নিরক্ষর কৃষক বুঝতেই পারে না, কুলকার্নি সেই চুক্তিনামায় কী লিখছে। আইনজীবী তার কাছ থেকে চড়া ফি আদায় করে এবং বিচারকও প্রমাণিত হন অত্যন্ত নিষ্ঠুর হিসেবে। সেখানে পাপপুণ্যের কোনো বিচার নেই। সবাই কেবল সুসময়ের বন্ধু হিসেবে প্রমাণিত হয়। শোষকদের সবাই প্রতিদিন একত্রিত হয়, কিন্তু কেউ শূদ্রদের দিকে নজর দেয় না। আমাদের ইংরেজ শাসকরা নিজেদের ধার্মিক ও নীতিবান বলে গর্ব করে; তাহলে এখন কেন তারা পিছিয়ে যাচ্ছে? সরকার আমাদের সেই ‘লোকাল ফাণ্ড'— এর (ভূমি রাজস্বের প্রতি টাকায় এক আনা হারে শূদ্রদের কাছ থেকে নেওয়া কর) সমমূল্যের শিক্ষা প্রদান করুক। জ্যোতি অত্যন্ত নিন্দাসূচক স্বরে এই ঘোষণা করছে।
ব্রাহ্মণ তার তুলোর নরম লেপ মুড়ি দিয়ে আরামদায়ক নরম বিছানায় গড়াগড়ি খায়। সেই অলস ব্যক্তিটির চোখে ঘুম আসে না, বিছানায় সে এপাশ— ওপাশ করে। ওদিকে, হতভাগ্য কৃষক তার খেতের পাশে ঘুমোতে বাধ্য হয়, তার শরীর শিশির— জলে ভিজে যায়; তাকে খুব ভোরে— ভোরের তারা— শুকতারা ওঠার সাথে সাথেই— জেগে উঠতে হয় তার বলদগুলোকে খাওয়াতে।
ব্রাহ্মণ প্রতিদিন আড়ম্বরের সাথে গরম জলে শাস্ত্রীয় স্নান সারে, কাঠের পিঁড়িতে বসে পরম শান্তিতে নিমগ্ন হয়ে সকালের প্রার্থনা পাঠ করে। অন্যদিকে, গরিব কৃষককে সর্বদা খেয়াল রাখতে হয় ঠিকঠাক আছে কি না তার গাড়ি আর চাষের সরঞ্জামগুলো— লাঙল ও বীজ বপনের যন্ত্র; এমনকি তার দড়িটিও অসংখ্য গিঁটে ভরা জীর্ণ। ব্রাহ্মণ চামড়ার জুতো পরে কোমরে মিহি সুতোর ধুতি পরিপাটি করে গুজে রাখে। তার মাথায় থাকে পুনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লাল পাগড়ি, গায়ে থাকে আরও নানা পোশাকের বাহার। গরিব কৃষক অর্ধনগ্ন অবস্থায় কোমরে একটুকরো সামান্য কাপড় জড়িয়ে থাকে, তার মাথা ঢাকা থাকে ছেঁড়াখোঁড়া এক মোটা কম্বলে। ব্রাহ্মণ তার ভাতের থালায় অনেক ঘি ঢেলে দেয়, অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে থালার চারদিকে তিনবার জল ছিটিয়ে আচার পালন করে। আর গরিব কৃষককে মোটা দানার জাউ আর প্রচুর পরিমাণে ঘোল খেয়ে পেট ভরিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এই হলো একজন কৃষকের ‘আয়েশ’!
ব্রাহ্মণ চাউড়িতে নরম তাকিয়ায় আরাম করে হেলান দিয়ে তার হিসাবের খাতা লেখে। সে পোপের মতো গাম্ভীর্য নিয়ে কথা বলে, আর দেখতে— অনেকটা হৃষ্টপুষ্ট শণ্ডামার্কা মোষের মতো। ওদিকে, দরিদ্র কৃষক খালি পায়ে লাঙল চালায়, একজোড়া বলদ ছুটিয়ে মনের আনন্দে গান গায়। ব্রাহ্মণের সামনে থাকে একটি সুন্দর থালা, পিতলের পিকদানি। মাজাঘষা উজ্জ্বল প্রদীপের মৃদু আলোয় সে নরম বিছানায় সুখনিদ্রায় মধুর স্বপ্নের দেশে হারিয়ে যায়। আর গরিব কৃষক এক চিমটি শুকনো তামাকের সাথে সামান্য চুন মিশিয়ে মুখে দেয়, এরই জোরে একটি খসখসে কাঁথা মুড়ি দিয়ে পরম শান্তিতে ঘুমানোর চেষ্টা করে। যখন উভয়েই একই বুদ্ধিমত্তা, একই শারীরিক গঠন নিয়ে জন্মেছে, তখন কেন এমন হয় যে, ব্রাহ্মণ বিলাসিতার শয্যায় গড়াগড়ি খায় আর দরিদ্র কৃষককে দুঃসহ কষ্টের অভিশাপ সইতে হয়? ক্ষমতার মদমত্ততায় অন্ধ হয়ে ব্রাহ্মণরা শূদ্রদের শিক্ষা গ্রহণ নিষিদ্ধ করেছিল। আর শূদ্ররাও যুগ যুগ ধরে এই অন্যায় নিষেধাজ্ঞা মেনে নিয়ে কষ্ট ভোগ করেছে। এখন মনুস্মৃতিকে অগ্নিদগ্ধ করা হয়েছে, ইংরেজি ভাষা আমাদের পালক মাতা হয়ে উঠেছে, যে আমাদের সকলকে শিক্ষার নিরাময়কারী প্রলেপ বিলিয়ে দিচ্ছে। (আমাদের পালক মাতা ইংরেজি আমাদের পরম মমতায় স্তন্যদান করছে)। ওহে শূদ্রগণ, এখন আর পিছিয়ে যেয়ো না! মনুর এই অভিশপ্ত মতবাদকে নিন্দা করো আর চিরতরে নির্বাসিত করো; তোমরা যখন শিক্ষা গ্রহণ করবে, তখনই প্রকৃত সুখী হবে। জ্যোতি ঘোষণা করছে— একে আমার ‘নতুন সুসমাচার’ (New Gospel) হিসেবে গ্রহণ করো।
ভণ্ড ব্রাহ্মণ তার প্রতিবেশীর বিপদে মায়াকান্না কাঁদে আর নিজের শুকনো চোখ মোছে, যদিও তাতে এক ফোঁটা জলও নেই। সে দালালের মতো ‘ভাড়ায় কাঁদে’। সে আসলে একজন ভাঁড় (একদিকে সে প্রবঞ্চক, অন্যদিকে অন্যের ছদ্মবেশ ধারণ করে মানুষকে বিনোদন দিয়ে টাকা উপার্জনে পটু)। প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বর সর্বব্যাপী, তাঁর ও মানবজাতির মাঝখানে কোনো মধ্যস্থতাকারী বা দালালের প্রয়োজন নেই। যদিও সে (ব্রাহ্মণ) নিজে হাজারো কুসংস্কারে আচ্ছন্ন, তবুও সে দম্ভভরে পাড়া মাথায় করে বেড়ায়। সে কেবল অর্থের লোভেই পূজারি বা পুরোহিতের অভিনয় করে। সে (ব্রাহ্মণ) আজগুবি রূপকথার গল্প শুনিয়ে বোকা ও সরলমনা মানুষকে ধোঁকা দেয় এবং তপস্যা করার ভান করেই মনে মনে নতুন নতুন পাপের ফন্দি আঁটে। (পাপিষ্ঠ ব্যক্তিটি কেবল জপমালার দানাগুলোই গুনে চলে)। ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে কোনো উকিল বা মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন নেই। আমাদের সর্বশক্তিমান স্রষ্টা হলেন ন্যায়বিচারের মূর্ত প্রতীক! তিনি আমাদের সকলেরই এক নিরপেক্ষ রক্ষাকর্তা। তিনি কারো কাছেই অপরিচিত নন (তিনি কাউকে প্রত্যাখ্যান করেন না)। ভণ্ড ব্রাহ্মণরা নিজের ডেরায় বসে তাদের মনমতো গাঁজাখুরি গল্প শুনিয়ে গরিব শূদ্রদের চোখে ধুলো দেয়। পরম দয়াময় ঈশ্বরের উপর ভরসা রাখো (নিজেকে নিঃশর্তভাবে তাঁর কাছে সমর্পণ করো!)। অনুগ্রহ করে জ্যোতিরাও ফুলের শিক্ষার এই সারমর্মটুকু মেনে চলো!
রমণা ইত্যাদি: শিবাজী ও শাহুর আমলের সময়কে পুনেতে পেশোয়াদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার পরবর্তী সময় থেকে আলাদা করার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো— পূর্ববর্তী সময়ে বড়ো বড়ো সামরিক সেনাপতিদের অধিকাংশই ছিল মারাঠা। অন্যদিকে, আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যারা বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিল, তাদের বেশিরভাগই ছিল ব্রাহ্মণ। সাতারা থেকে পুনেতে রাজধানী স্থানান্তরিত হওয়ার পর এই নীতিতে পরিবর্তন ঘটে। আমরা দেখতে পাই, ১৭৬০ সালের পর দাক্ষিণাত্যে যে সকল বিখ্যাত সেনাপতি খ্যাতি ও ভূখণ্ড অর্জন করেছে, তারা প্রায় একচেটিয়াভাবে ব্রাহ্মণ ছিল। এমনকি প্রভু (কায়স্থ) সম্প্রদায়ের প্রভাবও পুনে দরবারে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছিল। দলগুলোর ভেতরে দল ছিল, শিবাজি, রাজারাম ও শাহু কর্তৃক এত সফল ফলাফলের সাথে একত্রিত সমস্ত শ্রেণির মধ্যে একটি সাধারণ ও সক্রিয় সহানুভূতির সম্ভাবনা খুবই কম ছিল।
ওই সময়ে ব্রাহ্মণরা নিজেদের একটি বিশেষ সুযোগসুবিধা ও ছাড়প্রাপ্ত শাসক জাতি হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে— শিবাজীর প্রবর্তিত ব্যবস্থায় যা ছিল অজানা। কোঙ্কনের ব্রাহ্মণ কারকুনরা সমস্ত দপ্তরগুলোর একচেটিয়া অধিকার লাভ করে। তারা যেমন সম্মানজনক বেতন পেত, তেমনি বাইরে থেকে শস্য বা অন্যান্য পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ও খেয়া পারাপারের মাশুল থেকে অব্যাহতির বিশেষ সুবিধাও ভোগ করত।
কল্যাণ ও মাভাল অঞ্চলের ব্রাহ্মণ জমিদারদের জমির কর অন্যান্য শ্রেণির তুলনায় অর্ধেক বা তারও কম হারে নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফৌজদারি আদালতের ক্ষেত্রেও ব্রাহ্মণরা সর্বদা আইনের কঠোরতম দণ্ড থেকে অব্যাহতির বিশেষ সুবিধা ভোগ করত; এমনকি যখন তাদের দুর্গে বন্দি করা হতো, তখনো অন্যান্য শ্রেণির তুলনায় তাদের সাথে অনেক বেশি উদার আচরণ করা হতো। এসব সুবিধার পাশাপাশি, এই শ্রেণির ধর্মীয় পবিত্রতা বিবেচনা করে রাষ্ট্র কর্তৃক যে দান— খয়রাত করা হতো, তাতেও ছিল তাদের একচেটিয়া আধিপত্য। ‘দক্ষিণা’, দান— খয়রাত— যা মূলত পাণ্ডিত্য বা শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে সাধারণভাবে সকল ব্রাহ্মণদের জন্য অনুদানে পরিণত হয় এবং পুনে শহরটি এক বিশাল নিঃস্ব ও পরনির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর কেন্দ্রে পরিণত হয়। বড়ো বড়ো উৎসবগুলোতে রাষ্ট্রের ব্যয়ে একটানা বহু দিন ধরে ৩০ থেকে ৪০ হাজার ব্রাহ্মণকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও উপাদেয় খাদ্য দ্বারা আপ্যায়ন করা হতো। নিছক যাজকতন্ত্র বা বর্ণভিত্তিক আধিপত্যের এই সমস্ত বৈশিষ্ট্য আঠারো শতকের শেষভাগে প্রকট হয়ে ওঠে এবং এমন এক নৈতিক অবক্ষয়ের সূচনা করে, যে সম্পর্কে খুব কম মানুষেরই সঠিক ধারণা আছে। ‘মহারাষ্ট্র ধর্মের’ প্রতি রামদাসের যে উচ্চ আদর্শ ছিল, তা সংকুচিত হয়ে কেবল ‘গো— ব্রাহ্মণ রক্ষা’ করার বিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। আর সদ্গুণের এই ধরনের পতনের ফলে যা হওয়ার কথা, অনিবার্যভাবে সেই পরিণতিই ঘনিয়ে এসেছিল।
— জাস্টিস এম. জি. রানাডে, ‘দ্য মিসলেনিয়াস রাইটিংস’ (১৯১৫), পৃষ্ঠা ৩৫০— ৩৫২।
১৯১১ সালের ১৭ এপ্রিল পুনেতে শ্রী রামাইয়া ভেঙ্কাইয়া আয়্যাওয়ারু-র সভাপতিত্বে সত্যশোধক সমাজপন্থীদের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। উক্ত সভায় নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয়—
১। এই ‘সমাজ’-কে ‘সত্য সমাজ’ হিসেবে অভিহিত করা হবে।
২। (ক) সকল মানুষই এক ঈশ্বরের সন্তান। তিনি আমাদের সকলের পিতা।
(খ) নিজের মায়ের কাছে বিনতি করতে বা বাবাকে সন্তুষ্ট করতে যেমন কোনো মধ্যস্থতাকারী বা দালালের প্রয়োজন হয় না, ঠিক তেমনি একজন ভক্তের পক্ষে ঈশ্বরকে তাঁর প্রকৃত রূপে জানতে এবং তাঁকে আরাধনা বা সন্তুষ্ট করতে কোনো মধ্যস্থতাকারী বা দালালের— যেমন পুরোহিত, ধর্মীয় উপদেষ্টা বা গুরুর প্রয়োজন নেই।
(গ) যিনি এই নীতি বা মতবাদ মেনে নেন, তিনিই একজন ‘সত্য সমাজী’।
৩। প্রত্যেক সত্য সমাজীকে নিম্নলিখিত শপথ গ্রহণ করতে হবে—
‘সকল মানুষই এক ঈশ্বরের সন্তান। আমি সর্বদা আমাদের সকলের মধ্যকার সাধারণ ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা মাথায় রেখে নিজেকে পরিচালিত করব।
‘ঈশ্বরের উপাসনা করার সময় বা তাঁকে ভক্তিভরে প্রার্থনা করার সময় অথবা কোনো ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার সময়, আমি কোনো মধ্যস্থতাকারী বা দালালের সাহায্য গ্রহণ করব না। আমি অন্যদেরও এইভাবে চলার জন্য উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করব। আমি আমার সন্তানদের শিক্ষিত করতে ব্যর্থ হব না। আমি আমার শাসকদের প্রতি অনুগত থাকব। আমি সর্বব্যাপী ও সত্যের মূর্ত প্রতীক সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে স্মরণ করে এই পবিত্র শপথ গ্রহণ করছি। সর্বশক্তিমান ঈশ্বর আমাকে আমার এই পবিত্র সংকল্প উপলব্ধি করার এবং আমার জীবনের পরম কল্যাণ সাধন করার শক্তি দান করুন।'
শাদাওয়াল— শাহ দাওয়াল— শাদাওয়াল মালিক একজন মুসলিম সুফি সাধক। শাহ দাওয়াল মালিক নামে একজন ‘পীর’। তাঁর পবিত্র ও পুণ্যময় জীবনের জন্য তিনি হিন্দু— মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ছিলেন। রামদাস পর্যবেক্ষণ করেছেন— হিন্দুসহ অনেক মানুষই দাওয়াল মালিকের উপাসনা করে!
শাহ দাওয়ালের পিছনে ও সামনে দুটি ‘লিঙ্গম’ (ভগবান শিবের প্রতীক)— এর উল্লেখ আমাকে বিশেষভাবে কৌতূহলী করে তুলেছিল। আমি ডক্টর এস. জি. মালশে, ডক্টর ওয়াই. ডি. ফাড়কে, অধ্যাপক আর. বি. জোশী ও পুনের মহারাষ্ট্র সাহিত্য পরিষদের শ্রী এম. এস. দীক্ষিতের মতো পণ্ডিতদের কাছে এই বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান চালাই। তাঁরা সকলেই একমত হন যে, এটি নিশ্চিতভাবেই পুনের একজন মুসলিম পীর (শাদাওয়াল)— এর প্রসঙ্গ। অধ্যাপক জোশী তৎক্ষণাৎ জানান যে, এটি মূলত ‘শাহ দাওয়াল মালিক’— কে নির্দেশ করছে এবং তিনি রামদাসের সেই পঙ্ক্তিটি উদ্ধৃত করেন।
আমি সম্প্রতি এই রহস্যটি তদন্ত করতে পুনে গিয়েছিলাম। সেখানে এক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি আমাকে শনিওয়ার ওয়াদার সামনে (কসবা পেঠে) অবস্থিত একটি দরগাহের পথ দেখিয়ে দেন। আমি যখন সেই দরগাহে পৌঁছলাম, তখন দেখলাম সেটি আসলে খাজা মখদুম সৈয়দ শাহ জোনজানি চিস্তির দরগাহ। একজন হিন্দু ভক্ত আমাকে দরগাহের প্রধান কর্মকর্তার কাছে নিয়ে গেলেন। যখন আমি তাঁকে ‘শাহ দাওয়াল দরগাহ’— এর পথ দেখিয়ে দিতে অনুরোধ করলাম, তিনি আমাকে বললেন, ‘যারবেদার (Yeravada) দিকে এগিয়ে যান, বুন্দ গার্ডেন ব্রিজ পার হয়ে বাম দিকে মোড় নিন। প্রায় দুই ফার্লং চলার পর আপনি সরাসরি শাহ দাওয়াল দরগাহে পৌঁছে যাবেন।’
সেই হিন্দু ভক্তটি এও উল্লেখ করলেন যে, দরগাহের ঠিক পিছনে একটি ছোটো পাহাড়ের উপর শিবের একটি মন্দির আছে। একে ‘মহাদেব পাহাড়’ বলা হয়।
আমি সেই নির্দেশনা অনুসরণ করে সেখানে দরগাহটি খুঁজে পেলাম। দরগাহের একটি বৃত্তাকার বোর্ডে সাধকের নাম এভাবে লেখা ছিল— ‘হযরত শাহ দাওয়াল বাবা রহমতুল্লাহ আলাইহি দরগাহ শরীফ’। সেখানকার প্রধান খাদেম আমাকে স্বাগত জানালেন এবং জানালেন যে, দরগাহটি ১২৩৪ থেকে ১২৩৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। তিনি দরগাহের পিছনে সেই ‘মহাদেব পাহাড়’— টিও দেখিয়ে দিলেন যেখানে একটি শিবমন্দির অবস্থিত। এ ছাড়াও তিনি দরগাহের সামনে, প্রায় দুই ফার্লং দূরে বুন্দ গার্ডেন ব্রিজের কাছে মুলা নদীর তীরে একটি ছোটো শিবমন্দিরও দেখিয়ে দিলেন।
এভাবেই শাহ দাওয়াল দরগাহটি কেন্দ্রে অবস্থিত, এবং এর পিছনে ও সামনে দুটি মহাদেব মন্দির (যেখানে ‘পিণ্ডি’ বা শিবের প্রতীক শিবলিঙ্গ রয়েছে) অবস্থিত। এখন, দরগাহের পেছনের ও সামনের দুটি লিঙ্গমে পূজা ও অভিষেকের যে প্রাসঙ্গিকতা— তা দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল।
গ্রামীণ এলাকার মানুষের মধ্যে একটি বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে, প্রচণ্ড খরা বা অনাবৃষ্টির সময়ে যদি তারা ‘পিণ্ডি’ (শিবের প্রতীক) জলে নিমজ্জিত করে, তবে ভগবান শিব সন্তুষ্ট হন এবং খরাকবলিত অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটান। প্রতি বছর শিবরাত্রি একাদশীর দিনে এখানে বার্ষিক উৎসব পালন করা হয়।
দরগাহ এবং দুটি মহাদেব মন্দিরের এই সহাবস্থান নিশ্চয়ই অনন্য হিসেবে বিবেচিত হতো এবং এই কারণেই হিন্দু ও মুসলিম— উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই এটি সমভাবে শ্রদ্ধেয় ছিল। মহাত্মা ফুলের সময়ে (তাঁর ‘গোলামগিরি’ বা ”Slavery” বইটি ১৮৭৩ সালে প্রকাশিত হয়েছিল) এখানকার মেলাগুলো নিশ্চয়ই অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সুপরিচিত ছিল।
১। এই মতামতের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং আকর্ষণীয় সমর্থন পাওয়া যায় ধর্মীয় আচার— অনুষ্ঠানে— কিছু মহোৎসবে দেখা যায় যেখানে বলিরাজের উল্লেখ রয়েছে, যিনি একসময় শূদ্রদের হৃদয় ও স্নেহে রাজত্ব করেছিলেন এবং যাদের ব্রাহ্মণ শাসকরা স্থানচ্যুত করেছিলেন। দশেরার দিন, একজন শূদ্রের স্ত্রী এবং বোনেরা, যখন শমিবৃক্ষের পূজা করে ফিরে আসে এবং সেই দিনে সোনার সমতুল্য বলে বিবেচিত তার পাতা তার বন্ধু, আত্মীয় এবং পরিচিতদের মধ্যে বিতরণের পরে, তাকে বাড়িতে স্বাগত জানানো হয়— “সমস্ত ঝামেলা ও দুর্দশা দূর হোক এবং বলির রাজ্য আসুক।” অন্যদিকে, একজন ব্রাহ্মণের স্ত্রী এবং বোনেরা সেই দিন বাড়ির সামনের দিকে বালির একটি মূর্তি স্থাপন করে, যা সাধারণত গম বা অন্যান্য ময়দা দিয়ে তৈরি হয়, এবং যখন ব্রাহ্মণ শমিবৃক্ষের পূজা থেকে ফিরে আসে তখন সে তার ডাঁটা নেয়, মূর্তির পেট খোঁচায় এবং তারপর ঘরে প্রবেশ করে। শূদ্র ও ব্রাহ্মণদের মধ্যে প্রচলিত ধর্মীয় রীতিনীতি ও রীতিনীতির এই বৈপরীত্য, যার আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, অন্য কোনো অনুমানের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, যা আমি এই পৃষ্ঠাগুলিতে নিশ্চিত করার এবং ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি।
২। একটি নারকেল, একগুচ্ছ পান পাতা, একটি সুপারি, শুকনো খেজুর ও হলুদ গুঁড়ো (ভাণ্ডারা) একটি গোলাকার আনুষ্ঠানিক থালায় সাজিয়ে পূজা ঘরের খাণ্ডোবা (Khandoba) দেবতার মূর্তির সামনে রাখা হতো। এরপর পরিবারের সদস্যরা সেই থালাটির চারপাশে দাঁড়াতেন, সেটি আলতো করে স্পর্শ করতেন এবং তারপর সম্মিলিতভাবে ‘খাণ্ডোবা’র নাম জপ করতে করতে থালাটি উপরে তুলতেন। এই প্রথাটিকে বলা হতো ‘থালি উচলনে’ বা ‘থালা তোলা’।
৩। সোনে লুটনে— মারাঠারা সাধারণত বর্ষা—পরবর্তী সময়ে দশহরার দিনে সামরিক অভিযানে বের হতেন। তাঁরা তাঁদের গ্রাম বা শহরের সীমানা অতিক্রম করতেন, যা ‘সীমোল্লঙ্ঘন’ নামে পরিচিত ছিল। তাঁদের মধ্যে গ্রামের বাইরে গিয়ে ‘শমিবৃক্ষের’ পাতা (যা ‘সোনার পাতা’ হিসেবে গণ্য হতো) সংগ্রহ করার এবং দশহরার দিনে বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে সেই শমিপত্র বিনিময় করার প্রথা ছিল। এই আচারটিকেই বলা হয় ‘দশহরার দিনে সোনা বিতরণ বা বিনিময়’।
৪। ভারাড়িদের (Bharadi) ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র এবং ওয়াঘেদের (WaghyaÑ খাণ্ডোবার উপাসক) কাছে থাকা পবিত্র হলুদ গুঁড়ো বা ভাণ্ডারার (Bhandara) ছোট থলিটি কালো সুতির সুতো দিয়ে বেষ্টন বা পেঁচিয়ে রাখা হতো।
৫। দেবহারা ঘুমবিণে— একজন ব্যক্তি যখন এভাবে ‘আবিষ্ট’ হয়, তখন সে গোঙানির মতো শব্দ করে, তার শরীর মোচড়াতে থাকে, অসংলগ্ন কথা বলে এবং সেই অবস্থায় অস্বাভাবিক শারীরিক শক্তি প্রদর্শন করে।
৬। রামোশি (Ramoshi) উমাজি নায়েক এবং নানার (পেশোয়া) ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করুন। উমাজি ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে বহু বিদ্রোহ সংগঠিত করেছিলেন। অবশেষে তিনি ধরা পড়েন এবং ১৮৩২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পুনের যারবেদা কেন্দ্রীয় কারাগারে (Yervada Central Prison) তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। কারাগারের উত্তর প্রান্তে তৃতীয় সার্কেলের তৃতীয় ব্যারাকের কাছে অবস্থিত ‘উমাজি নায়েক গেট’ উমাজির এই মহান আত্মত্যাগের এক নীরব স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
৭। পরিশিষ্ট— ক দেখুন।
৮। এটি ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের (Great Rebellion) একটি স্পষ্ট উল্লেখ, যাকে মহাত্মা ফুলে এই বইয়ের শুরুর দিকে ‘চাপাতি বিদ্রোহ’ (Chapati Revolt) বলে অভিহিত করেছেন।
৯। একজন কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব, যিনি কথিত আছে যে মাত্র সাড়ে তিন দিনের জন্য রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু সেই অল্প সময়েই তিনি কৃষকদের কল্যাণে এত বেশি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন যে, আজও কৃষকরা অত্যন্ত মর্যাদা ও গাম্ভীর্যের সাথে শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে শিরাল শেঠের বার্ষিকী পালন করেন।
১০। দ্রোণ ও পত্রাবলি তৈরি করা হয় বটগাছ বা এই জাতীয় গাছের বড় বড় পাতাগুলো কিছু নমনীয় কাঠি দিয়ে সেলাই করে। ‘পত্রাবলি’ সেলাই করা হয় একটি থালার আকারে, অন্যদিকে ‘দ্রোণ’ সেলাই করা হয় একটি বৃত্তাকার বাটির আকারে। এগুলো মূলত সামাজিক ভোজসভায় খাবার রাখার পাত্র (থালা ও বাটি) হিসেবে ব্যবহৃত হয়। (এখানে ‘দ্রোণ’— এর আকৃতিটি লক্ষ করুন, যাকে পৌরাণিক দ্রোণাচার্যের জন্মদাত্রী বা উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়।)
১১। এগুলো হচ্ছে— ১) ব্রাহ্মণ, ২) ক্ষত্রিয়, ৩) বৈশ্য, ৪) শূদ্র, ৫) কুমোর, ৬) গোপাল, ৭) তেল ব্যবসায়ী, ৮) পাঞ্চাল, ৯) তাঁতি, ১০) রঙ্গারী (ডায়ার), ১১) দর্জি, ১২) নাপিত, ১৩) ছোট শিকারী (পার্থি), ১৪) মহার, ১৫) রাখাল, ১৬) ধোপা, ১৭) মাং এবং ১৮) জুতা তৈরিকারী (চামার)। পাঞ্চাল: পাঁচজন কারিগরের একটি দল। একজন লৌহশিল্পী, একজন ছুতোরশিল্পী, একজন চুড়িশিল্পী, একজন পাথর কাটার শিল্পী এবং একজন স্বর্ণকার।
১২। ‘কালেক্টর’— এর ‘চিটনিস’ বা সচিবের ধূর্ত ও অনিষ্টকারী কার্যকলাপ সম্পর্কে মহাত্মা ফুলে নিচের দুই ছত্রের কবিতাটি লিখেছিলেন—
“ধূর্ত চিপণীসাপুঢ়ে কায় করিল কালেক্টর বাপুড়োঁ” (অর্থাৎ যখন সামনে এমন এক ধূর্ত ও চতুর ‘চিটনিস’ থাকে, তখন বেচারা কালেক্টর আর কী-ই বা করতে পারেন?)
১৩। শাহ দাওয়াল — শাহ দাওয়াল ছিলেন একজন মুসলিম সুফি সন্ত বা ‘পীর’। হিন্দু ও মুসলিম— উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই তাঁকে শ্রদ্ধা করত। সপ্তদশ শতাব্দীতে ব্রাহ্মণ সাধু রামদাস আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, অনেক হিন্দুও এই পীরকে পূজা করে। মূল গ্রন্থের ৮৭ পৃষ্ঠায় অনুবাদক উল্লেখ করেছেন যে, আজও পুনের বাণ্ড গার্ডেনের কাছে তাঁর দরগাহ অবস্থিত।
১৪. শূদ্র অধ্যুষিত এলাকা— এই ওয়ার্ড বা এলাকাটি মূলত শূদ্রদের দ্বারা জনবহুল ছিল এবং মহাত্মা ফুলের নিজস্ব বাড়িটিও এই রাস্তার মধ্যেই অবস্থিত ছিল।
১৫. রমণা— ‘রমণা’ বলতে বোঝায় বিনোদনের জায়গা বা বাগান। পেশোয়া শাসনামলে শ্রাবণ মাসে ‘বেদ— পাঠী’ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের আর্থিক উপহার দেওয়া হতো, যাকে বলা হতো ‘দক্ষিণা’। এর পাশাপাশি তাঁদের বিশাল ভোজও দেওয়া হতো। এই অনুষ্ঠানটি পুনের পার্বতী পাহাড়ের পাদদেশে বিশাল বাগান বা ঘেরা জায়গায় অনুষ্ঠিত হতো।
ফুলের সমালোচনা— পরবর্তীকালে এই প্রথার মান নিচে নেমে যায় এবং পণ্ডিত— অপণ্ডিত নির্বিশেষে সকল ব্রাহ্মণকেই পেশোয়ারা অঢেল অর্থ দান করতে শুরু করে। মহাত্মা ফুলে এই অলস এবং অশিক্ষিত ব্রাহ্মণদের ওপর জনগণের অর্থের এই বেহিসাবি অপচয়ের কঠোর সমালোচনা করেছেন।
১৬। হোলকার, পুনে লুণ্ঠন— এটি ১৮০৩ সালে যশবন্তরাও হোলকার কর্তৃক পুনে শহর লুণ্ঠনের একটি ঐতিহাসিক উল্লেখ। ১৮০১ সালের ১৬ এপ্রিল পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের আদেশে যশবন্তরাওয়ের ভাইকে হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই হত্যার প্রতিশোধ নিতেই যশবন্তরাও পুনে আক্রমণ করেন। তিনি লুণ্ঠন করে বস্তা ভর্তি টাকা নিয়ে গিয়েছিলেন, যার ফলে একে ‘হোলকার (বস্তা)’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়।