উচ্চশিক্ষা ও স্কলারশিপ সমাচার (জাপান পর্ব)
আজকে স্কলারশিপ নিয়ে আলোচনা শুরু করার মুহূর্তে তোমাদের অনুপ্রেরণা দেওয়ার জন্য ছোট্ট একটি ঘটনা শেয়ার করতে চাই। কিছুদিন আগে উচ্চ শিক্ষা সংক্রান্ত একটা সেমিনারে গিয়েছিলাম। তো সেখানে এক ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন তুমি না প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় পড়ো, তুমি তো সরকারি বা ফুলি ফান্ডেড স্কলারশিপ পাবা না (আসলে ওই ভাই তখনো আমার বিষয়ে কিছুই জানতেন না)। এখন এই ঘটনাটা শেয়ার করার কারণ তোমরা পোস্টটা সম্পূর্ণ ও শেষ পর্যন্ত পড়লেই বুঝতে পারবা।
তো আর কালক্ষেপণ না করে আসো আজকে আমরা শুরু করি আমাদের নিয়মিত আলোচনা। উচ্চশিক্ষা ও বিভিন্ন দেশে স্কলারশিপ নিয়ে ধারাবাহিক লিখনের গত পর্বে আমরা আলোচনা করেছিলাম চাইনিজ গভ:মেন্ট এর স্কলারশিপ নিয়ে। তার ধারাবাহিকতায় আজকে আমরা আলোচনা করব জাপানের MEXT ও অন্যান্য স্কলারশিপ নিয়ে। মূলত জাপান সরকারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সরকারি স্কলারশিপ বলতে বুঝায় এই MEXT স্কলারশিপ কে। বিশেষ করে এই স্কলারশিপ আওতায় থাকা সুযোগ সুবিধা গুলোর জন্য বর্তমানে এ স্কলারশিপ ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে তুমুল জনপ্রিয়।
MEXT Scholarship:
জাপানের এই গভ:মেন্ট স্কলারশিপ টা আসলে রিসার্চ ব্যাসিস। তাই একজন স্টুডেন্ট কে অবশ্যই এইদিক দিয়ে এক্সপেরিয়েন্স হতে হবে। মাস্টার্স ও পিএইচডি তে এই স্কলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন। সাধারণত মাস্টার্সে ১৬ বছরে এবং পি এইচ ডি তে ১৮ বছর যারা অধ্যায়ন করেছে তারাই এই স্কলারশিপ এর জন্য উপযুক্ত হয়। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো, বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স পড়ানো হয় ১ বছরের অথচ দেশের বাইরে তা দুই বছর। তাই এই দিক বিবেচনা করলে বাংলাদেশী স্টুডেন্ট দের একটু সমস্যায় পড়তে হয় পি এইচ ডি তে আবেদনের ক্ষেত্রে। জাপানের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স ও পি এইচ ডির মেজর ইংরেজি মাধমে পড়ানো হয়। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স লিডিং পিএইচডি বা মাস্টার্স এর সাথে পি এইচ ডি যোগ করা হয়। জাপানে সাধারণত বছরে দুটি সেশনে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। এপ্রিলে & অক্টোবর সেশন। বাংলাদেশের এডুকেশন মিনিস্ট্রি থেকে MEXT Scholarship নিয়ে সার্কুলার দেওয়া হয় প্রত্যেক বছরের মার্চ-এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে।
সাধারণত পিএইচডি বা মাস্টার্সের জন্য সরকারি MEXT স্কলারশিপ পাওয়া যায় দু’ভাবে। এক বাংলাদেশে জাপান দূতাবাসের মাধ্যমে (যেটি স্নাতক ও টেকনিক্যাল ক্যাটাগরিতে) আর দুই জাপানে কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশে। ধরো, তুমি জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চাও। তাহলে প্রথমে তোমাকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের অধ্যাপককে খুঁজে বের করতে হবে। অধ্যাপককে ব্যক্তিগত ইমেইল (CV, Research Proposal) পাঠিয়ে তাকে রাজি করাতে হবে যে তুমি মেক্সট বা অন্যান্য স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে আগ্রহী। সেই ক্ষেত্রে ওই অধ্যাপকের সম্মতি থাকতে হবে। অধ্যাপক সম্মতি দিলে তোমাকে ওই অধ্যাপকই আবেদনের বিস্তারিত প্রক্রিয়া বলে দিবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনপত্র জমা দেওয়ার পর তোমার অধ্যাপক বা তোমার যে সুপারভাইজার বা তত্ত্ববধায়ক হতে চান, তা আবেদনপত্রে উল্লেখ করতে হয়। আবেদনপত্র সাবমিট করার পর ওই অধ্যাপক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তোমার সাথে যোগাযোগ করবে। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ে সুপারিশে বৃত্তি পাওয়ার আবেদন নভেম্বরের শুরুতে শুরু হয়। আবেদনপত্র জমার পর স্বীয় বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অধ্যাপক তোমার স্কাইপে মৌখিক পরীক্ষা নেবেন। সেখানে তোমার পরিচয়, কোন মেজরে পড়াশোনা করেছো, সে বিষয়ের কিছু মৌলিক প্রশ্ন, রিসার্চ অভিজ্ঞতা, তুমি কীভাবে এই অধ্যাপকের খোঁজ পেলে ইত্যাদি জিজ্ঞসা করা হয়।
অধ্যাপক (সুপারভাইজার) অনুসন্ধান:
ইতোমধ্যে আশা করি অধ্যাপক ম্যানেজ করার গুরুত্ব কতটুকু তা উপলব্ধি করতে পেরেছো। জাপানি দূতাবাসের মাধ্যমে আবেদনটা কিছুটা কষ্টকর ও সাথে প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়। এর চেয়ে যদি তুমি জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধ্যাপক ম্যানেজ করে আবেদন করতে পারো, সেক্ষেত্রে স্কলারশিপ পাওয়া সুবিধা হয়। বিদেশে একজন অধ্যাপকের ক্ষমতাই সব। তিনি যা করেন, সেটি অগ্রধিকারযোগ্য। তাই স্কলারশিপ পেতে হলে সুপারভাইজার বা অধ্যাপকের অনুসন্ধান ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। একজন সুপারভাইজার যখন পেয়ে যাবা, তখন মনে রাখবা- তোমার সুযোগ ৯৫ শতাংশ হয়ে গেছে।
অধ্যাপকদের ইমেইল আইডি হলো অধ্যাপকদের সাথে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। তাই এই ইমেইল আইডিটি তুমি বিভিন্নভাবে পেতে পারো। অধ্যাপকদের ইমেইল আইডি সাধারণত জার্নাল পেপারগুলোতে থাকে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের লিংকে গিয়ে সেখানে দেখো, ফ্যাকাল্টি ও ডিপার্টমেন্ট অপশন রয়েছে। ওই অপশনে গিয়ে ক্লিক করলে পেয়ে যাবা এ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য। অনেক সময় অধ্যাপকদের ল্যাব ঠিকানাও পাওয়া যায়। আর সেখানে গিয়ে খুঁজে নাও অধ্যাপকদের ইমেইল আইডি।
MEXT স্কলারশিপে প্রদত্ত সুযোগ সুবিধা:
২০১১ শিক্ষাবর্ষের ঘোষণা অনুযায়ী প্রত্যেক গবেষণা শিক্ষার্থীকে ১৫০,০০০ ইয়েন, মাস্টার্স প্রোগ্রাম ও প্রফেশনাল ডিগ্রী প্রোগ্রামের জন্য ১৫২,০০০ ইয়েন, ডক্টরেট প্রোগ্রামের জন্য ১৫৩,০০০ ইয়েন প্রদান করা হবে। গবেষণার জন্য প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত ২০০০ বা ৩০০০ ইয়েন বৃত্তি প্রদানের বিষয় বিবেচনা করা হয় (এখন বাংলাদেশি টাকায় উক্ত বৃত্তি কত সমমানের হবে তা জানতে চেয়ে আমাকে লজ্জা দিওনা, কারন সেটা শুনলে তোমার চোখ নির্ঘাত কপালে উঠতে বাধ্য)।
Private (প্রাইভেট) স্কলারশিপ:
জাপানে বিভিন্ন ধরনের প্রাইভেট স্কলারশিপ রয়েছে। হামাসু, প্যানাসনিকসহ বিভিন্ন কোম্পানির নামে উচ্চশিক্ষার স্কলারশিপ চালু রয়েছে। তবে এইসব স্কলারশিপ মাস্টার্স বা পিএইচডির জন্য। তুমি যদি অধ্যাপককে ম্যানেজ করতে পারো, তাহলে অধ্যাপক তার চলমান বিভিন্ন প্রজক্টের ফান্ড থেকে তোমাকে স্কলারশিপের সমমূল্যে ভাতা দেবেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব স্কলারশিপও তোমার পড়াশোনার জন্য কাজে দেয়। তাই প্রাইভেট ফান্ডিং পড়াশোনার জন্য অধ্যাপক ম্যানেজ করা ছাড়া কোনো বিকল্প থাকে না। এছাড়াও তুমি সেল্ফ ফান্ডে পড়াশোনা করতে পারো। সেক্ষেত্রে তোমার জাপানে অবস্থানরত কোনো গ্যারান্টর থাকতে হয়, যিনি তোমার পড়াশোনার খরচ চালাতে আগ্রহী হবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পর তুমি স্কলারশিপ পাবা, তবে প্রাইভেট ফান্ডিং-এ তোমাকে টিউশন ফি দিতে হবে। আর MEXT স্কলারশিপে টিউশন ফি জাপান সরকারই বহন করে।
লোকাল গভ:মেন্ট স্কলারশিপ:
উপরে উল্লেখিত স্কলারশিপ গুলো ছাড়াও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য কিছুসংখ্যক লোকাল গভর্নমেন্ট ও বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের স্কলারশিপ বরাদ্দ থাকে। এটির পরিমাণ বিশ্ববিদ্যালয় অনুযায়ী নির্ভর করে। জাপানের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ ধরনের স্কলারশিপ বেশি থাকে (যেমন টোকিও ইউনিভার্সিটি, কিয়োটো ইউনিভার্সিটি ও ওসাকা ইউনিভার্সিটি ইত্যাদি)। এই সব স্কলারশিপের মধ্যে Rotary, Mitsubishi, Panasonic, Toshiba scholarship অন্যতম। এই স্কলারশিপেরও প্রথম শর্ত হচ্ছে অধ্যাপকের সঙ্গে যোগাযোগ করা। যেসব অধ্যাপক ইউনিভার্সিটি রিকোমেনডেড MEXT স্কলারশিপে শিক্ষার্থী নিতে অপারগতা প্রকাশ করে সেসব অধ্যাপককে উপরিউক্ত স্কলারশিপের জন্য অনুরোধ করা যেতে পারে। এসব স্কলারশিপে বিপুলসংখ্যক চাইনিজ, ভিয়েতনামি ও ইন্দোনেশিয়ান শিক্ষার্থী থাকলেও সঠিক তথ্যের অভাবে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই নগণ্য।
অধ্যাপকের নিজস্ব ফান্ডিং:
কিছু কিছু অধ্যাপক তার নিজস্ব প্রকল্প থেকে বিদেশি শিক্ষার্থীদের স্কলারশিপ প্রদান করে থাকেন, এটাও ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য অনেক সহায়ক হয়।
নিচে জাপানের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের ঠিকানা উল্লেখ করা হলো, যাতে তোমরা সহজেই এই লিংক থেকে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে পারো:
• http://www.u-tokyo.ac.jp/index.html
• http://www.kyoto-u.ac.jp/en
• http://www.osaka-u.ac.jp/en
• http://www.titech.ac.jp/english
• http://www.keio.ac.jp
• http://www.kyushu-u.ac.jp/english/index.php
• http://www.nagoya-u.ac.jp/en
• http://www.hokudai.ac.jp/en/index.html
• http://www.tsukuba.ac.jp/english
• http://www.kobe-u.ac.jp/en
• http://www.chiba-u.ac.jp/e/
• http://www.waseda.jp/top/index-e.html
• htp://www.hiroshima-u.ac.jp/index.html
• http://www.okayama-u.ac.jp/index.ehtml
• http://www.sut.ac.jp/en/
• http://www.metro-u.ac.jp/index-e.html
• http://www.tmd.ac.jp/TMDU-e
• http://www.ynu.ac.jp/index en.html
• http://www.tokushima-u.ac.jp/english
আর আরো বিস্তারিত জানার জন্য- http://www.mext.go.jp/component/a_menu/education/detail/__icsFiles/afieldfile/2017/04/21/1384516_02.pdf
পরিশেষে, তোমাদের প্রতি সাজেশন একটাই থাকবে। যারা দেশের বাইরে Higher Study তে যেতে আগ্রহী তোমরা এখন থেকেই নিজেদের প্রোফাইল আর স্কলারশিপ এর সাথে নিজেদের রিকোয়ারমেন্ট ম্যাচিং করে প্রস্তুতি নিতে শুরু করো, বিশেষ করে IELTS ও রিসার্চ/ পাবলিকেশন এর প্রতি গূরুত্ব দাও।
ছোট ভাইয়া এবং আপুরা একটি ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ কিন্তু তোমার আগ্রহ আর তোমার সুন্দর চেহারা দেখে দিবে না আর দেখবে না যে তুমি ভার্সিটি লাইফে কত কত বেশি প্রোগ্রামে অ্যাটেন্ড করেছিলে। তোমাকে স্কলারশিপ পাওয়ার জন্য পরিশ্রম করতে হবে। আমরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি আর পোস্ট এর শুরুতে বলা ঘটনার মূহুর্ত ও ঐ Uncomfort Barrier থেকে ক্রস করার দায়িত্ব আমাদের, তোমাদের সবার। তাই আবারও বলছি তোমরা যারা Particularly বাইরে যাবার প্ল্যান করেছো তারা এখন থেকেই সময় নষ্ট না করে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে দাও। আর যেকোনো জিজ্ঞাসায় বা যে কোন প্রয়োজনে আমি তো আছিই।
সামনে হয়তোবা কিছু সময় ব্যস্ত থাকব তারপরও চেষ্টা করবো তোমাদের জন্য সময় বের করে বিভিন্ন দেশের স্কলারশিপ এর তথ্য দিতে। ইনশাআল্লাহ, "উচ্চশিক্ষা ও স্কলারশিপ সমাচার পর্ব-৩" থেকে চেষ্টা করবো ইউরোপিয়ান বেস ও নর্থ-আমেরিকান স্কলারশিপ ও এর আপ্লিকেশন্স প্রসেস নিয়ে আলোচনা করতে। সকলের জন্য শুভকামনা থাকলো, আমার জন্য সকলেই দোয়া করবা, আজকে এই পর্যন্তই। আল্লাহ হাফেজ।
Md. Al-Amin
5th Batch, Dept. of Pharmacy
Varendra University.