কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন শুধু নিজের জন্য বাঁচতে নয়, বরং অন্যের জীবনে আলো জ্বালাতে। কিছু মানুষ তাঁদের সম্পদ দিয়ে প্রাসাদ গড়েন না — গড়েন মসজিদ, মাদ্রাসা, জ্ঞানের ঘর। কিছু মানুষ শরীরে অসুস্থ হয়েও হৃদয়ে এতটাই দৃঢ় থাকেন যে কোনো বাধা, কোনো বিরোধিতা, কোনো কষ্ট তাঁদের থামাতে পারে না।
মোঃ মমিনুর রহমান খসরু ছিলেন ঠিক তেমনই একজন মানুষ।
তিনি আমাদের মাদ্রাসার স্বপ্নদ্রষ্টা, প্রতিষ্ঠাতা এবং সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক। তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি, গভীর দ্বীনপ্রেম এবং নিঃস্বার্থ ত্যাগের ফসল হলো আজকের কাদিরাবাদ মমিনুর রহমান খসরু দারুল উলুম ইসলামিয়া একাডেমী মাদ্রাসা। তিনি হয়তো আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া এই প্রতিষ্ঠান প্রতিটি দিন তাঁর স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখছে।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
আল্লাহ তা'আলা তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।
পূর্ণ নাম: মোঃ মমিনুর রহমান খসরু
পিতার নাম: মৃত মোঃ মোজাফফর হোসেন সরকার
মাতার নাম: মৃত মোছাঃ রেজিয়া খাতুন
জন্ম তারিখ: ১ মার্চ, ১৯৪৮ ইং
ইন্তেকাল: ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ইং
এলাকা: কাদিরাবাদ, পীরগঞ্জ, রংপুর
পেশা: ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার
কর্মক্ষেত্র: দেশে-বিদেশে বিভিন্ন স্থানে প্রকৌশল কাজে নিযুক্ত ছিলেন
প্রবাস জীবন: জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় আমেরিকাসহ বিদেশে অতিবাহিত করেছেন
সন্তান: তিন সন্তান — দুই পুত্র ও এক কন্যা, যাঁরা বর্তমানে আমেরিকায় বসবাস করছেন
মোঃ মমিনুর রহমান খসরু পেশায় ছিলেন একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার । নির্মাণকাজ ছিল তাঁর রক্তে যে দক্ষতা দিয়ে তিনি পেশাগত জীবনে সাফল্য অর্জন করেছেন, সেই একই দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা তিনি পরবর্তীতে মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণে কাজে লাগিয়েছেন।
তিনি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রকৌশল খাতে কাজ করেছেন। জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তিনি আমেরিকায় কাটিয়েছেন, যেখানে তিনি পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি, শিক্ষাব্যবস্থা ও জীবনধারা কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছেন।
এই বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাই তাঁর চিন্তাধারাকে প্রসারিত করেছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে শুধু দ্বীনি শিক্ষা বা শুধু দুনিয়াবি শিক্ষা কোনোটিই একা যথেষ্ট নয়। দুটোর সমন্বয়ই একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে সফল ও সম্মানিত করতে পারে।
দীর্ঘ প্রবাস জীবনে তিনি যথেষ্ট আর্থিক সচ্ছলতা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু এই সম্পদ তিনি ব্যক্তিগত বিলাসিতা বা আরাম-আয়েশে ব্যয় করেননি। তাঁর হৃদয়ে সর্বদা একটিই স্বপ্ন জ্বলত নিজের এলাকায় দ্বীনের জন্য কিছু করে যাওয়া, যা তাঁর মৃত্যুর পরেও সদকায়ে জারিয়া হিসেবে তাঁর আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে।
মোঃ মমিনুর রহমান খসরু শুধু একজন প্রতিষ্ঠাতা বা দাতা ছিলেন না তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁকে দেখলেই শ্রদ্ধা জাগত, যাঁর কথা শুনলেই মানতে ইচ্ছে করত। তাঁর উপস্থিতিতে একটি স্বাভাবিক গাম্ভীর্য ও কর্তৃত্ব ছিল, যা মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর প্রতি আস্থা রাখতে এবং তাঁর নেতৃত্ব মেনে নিতে অনুপ্রাণিত করত।
তিনি ছিলেন একাধারে কঠোর এবং স্নেহশীল একটি বিরল সমন্বয় যা খুব কম মানুষের মধ্যে দেখা যায়। প্রশাসনিক বিষয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ় ও নীতিনিষ্ঠ, কিন্তু শিশু ও ছাত্রদের কাছে তিনি ছিলেন এক স্নেহময় অভিভাবক। মাদ্রাসার ছোট ছোট শিক্ষার্থী এবং বিশেষ করে হিফজ বিভাগের ছাত্ররা তাঁকে আদর করে "দাদুভাই" বলে ডাকত এবং তিনিও এই সম্বোধনে আনন্দ পেতেন। এবং তিনি নিজেও ছোট বড় প্রায় সকল শিক্ষার্থীদেরকে "দাদুভাই" বলেই সম্বোধন করতেন।
মাদ্রাসার কমিটিতে অনেক সদস্য থাকলেও বাস্তবে তাঁর একক সিদ্ধান্তেই প্রতিষ্ঠানের সকল কার্যক্রম পরিচালিত হতো। কিন্তু এই একক নেতৃত্ব কখনো স্বেচ্ছাচারিতা ছিল না বরং তাঁর দূরদর্শিতা, অভিজ্ঞতা ও সততার কারণে সকলেই স্বেচ্ছায় তাঁর সিদ্ধান্তকে সম্মান করত এবং মেনে চলত। তাঁর নেতৃত্বে মাদ্রাসার কার্যক্রম সুশৃঙ্খলভাবে চলত যা আজও স্মরণীয়।
মোঃ মমিনুর রহমান খসরু মাদ্রাসা শিক্ষাকে সমাজের প্রচলিত সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে দেখতেন। যেখানে অনেকে মনে করেন মাদ্রাসায় পড়া শিক্ষার্থীরা শুধু কুরআন মুখস্থ করে বসে থাকে এবং জীবনে ভালো কিছু করতে পারে না সেই চিন্তাধারার তিনি ছিলেন ঘোর বিরোধী।
তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে কুরআন হিফজ করার পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, গণিতসহ সাধারণ শিক্ষা অর্জন করা একজন হাফেজের জন্যও অত্যন্ত জরুরি। কারণ তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরে নিজ চোখে দেখেছেন যে, ভাষাজ্ঞান ও দুনিয়াবি শিক্ষা ছাড়া একজন মানুষ সে যতই ধার্মিক হোক সমাজে নিজেকে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না এবং দ্বীনের সেবায়ও পূর্ণভাবে কাজ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে।
তাঁর এই চিন্তা কতটা গভীর ও দৃঢ় ছিল তা বোঝা যায় তাঁর একটি কথা থেকে তিনি একবার স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, "যদি কোনোদিন মাদ্রাসায় বাংলা, ইংরেজি ও গণিত পড়ানো বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে আমি এই মাদ্রাসা রাখব না।" এই একটি বাক্যই প্রমাণ করে যে তিনি কতটা সময়ের চেয়ে এগিয়ে চিন্তা করতে পারতেন এবং শিক্ষার প্রকৃত অর্থ কী তা তিনি হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছিলেন।
এই দূরদর্শী চিন্তাধারার বাস্তব প্রতিফলনই হলো আমাদের মাদ্রাসার বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে কুরআন শিক্ষা বিভাগের পাশাপাশি একটি সমৃদ্ধ একাডেমী বিভাগ পরিচালিত হয় এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীকে দ্বীন ও দুনিয়া উভয় ক্ষেত্রে প্রস্তুত করে তোলা হয়।
প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ছিল প্রশাসনিক কিন্তু তিনি সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। মাঝেমধ্যে তিনি নিজেই ছাত্রদের সামনে দাঁড়িয়ে ক্লাস নিতেন। একজন ইঞ্জিনিয়ার, একজন বিশ্ব ভ্রমণকারী মানুষ যখন ছোট ছোট শিশুদের সামনে বসে তাদের পৃথিবী চেনাতেন সেটি ছিল এক অনন্য দৃশ্য।
তাঁর পাঠদানে বিশেষভাবে ঝোঁক ছিল ভূগোল ও বিশ্ব পরিচিতির প্রতি। বিভিন্ন দেশের নাম, তাদের রাজধানী, ভৌগোলিক অবস্থান, সংস্কৃতি এসব বিষয়ে তিনি ছাত্রদের জানাতেন। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে নিজ চোখে দেখা অভিজ্ঞতা তাঁর পাঠদানকে জীবন্ত ও আকর্ষণীয় করে তুলত।
ইংরেজি ভাষা শিক্ষার প্রতিও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। বিদেশে দীর্ঘকাল কাটানোর অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানতেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেকে প্রকাশ করতে এবং জ্ঞানের বিশাল জগতে প্রবেশ করতে ইংরেজি ভাষার দক্ষতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই তিনি চাইতেন মাদ্রাসার ছাত্ররাও যেন ইংরেজিতে মৌলিক দক্ষতা অর্জন করে।
ছোট শিক্ষার্থীরা তাঁকে শুধু প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে নয়, বরং একজন স্নেহময় দাদু হিসেবে চিনত। তিনি তাদের "দাদুভাই" সম্বোধনে ডাকতেন, তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, তাদের পড়ার খোঁজ নিতেন। একজন কঠোর প্রশাসকের ভেতরে যে কোমল হৃদয় লুকিয়ে ছিল ছাত্রদের সান্নিধ্যে সেটি সবচেয়ে সুন্দরভাবে প্রকাশ পেত।
মোঃ মমিনুর রহমান খসরুর দ্বীনি কাজের প্রথম ও সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ ছিল কাদিরাবাদ বাজারে একটি মসজিদ নির্মাণ। তাঁর স্বপ্ন ছিল এমন একটি মসজিদ গড়ে তোলা, যা শুধু নামাজের ঘর নয় বরং একটি ইসলামিক সেন্টার হিসেবে গড়ে উঠবে।
সেই স্বপ্ন তিনি বাস্তবায়ন করেছিলেন। তিনি নির্মাণ করেন "কাদিরাবাদ বায়তুল মামুর জামে মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার" একটি তিন তলা বিশিষ্ট মসজিদ, যা আজও কাদিরাবাদ এলাকার জামে মসজিদ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
এই মসজিদ নির্মাণের পথ মোটেও সহজ ছিল না। এলাকার অনেকেই এই কাজে বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু তিনি কোনো বিরোধিতারই তোয়াক্কা করেননি। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল এই কাজ আল্লাহর জন্য, এবং আল্লাহ চাইলে কোনো বাধাই টিকতে পারে না।
সবচেয়ে অসাধারণ বিষয় হলো, এই বিশাল মসজিদ নির্মাণের প্রায় আনুমানিক ৯০% খরচ তিনি একাই বহন করেছেন। কোনো চাঁদা তোলা হয়নি, কারো কাছে হাত পাতা হয়নি। হয়তো দু-একজন ব্যক্তি কিছু সহায়তা করেছেন কিন্তু প্রকৃত অর্থে এই মসজিদ তাঁর ত্যাগ ও শ্রমের ফসল।
মসজিদ নির্মাণের পর মমিনুর রহমান খসরুর মনে আরেকটি স্বপ্ন জাগলো এলাকার শিশুদের কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা করা। তিনি চাইলেন, মসজিদটি শুধু নামাজের জায়গা হিসেবে নয়, বরং ইলমের কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করুক।
এই চিন্তা থেকেই তিনি মসজিদের দ্বিতীয় তলায় একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম দেওয়া হয় "কাদিরাবাদ তাহফিজুল কুরআন মডেল মাদ্রাসা"। এটি মূলত একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসা ছিল, যেখানে ছেলে শিক্ষার্থীদের কুরআন শরীফ তিলাওয়াত ও হিফজ শেখানো হতো। পাশাপাশি তাঁর দূরদর্শী চিন্তার প্রতিফলন হিসেবে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো সাধারণ শিক্ষাও প্রদান করা হতো।
মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়ে যখন কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস ছিল না, তখন প্রায় দুই থেকে তিন বছর তিনি নিজের পকেট থেকে শিক্ষকদের বেতন প্রদান করেছেন। কোনো সরকারি সাহায্য ছিল না, কোনো বাহ্যিক তহবিল ছিল না ছিল শুধু তাঁর নিজের সম্পদ এবং আল্লাহর ওপর অবিচল ভরসা।
মসজিদের দ্বিতীয় তলায় মাদ্রাসা চালানোর পর একপর্যায়ে তিনি অনুভব করলেন যে মাদ্রাসার জন্য একটি স্বতন্ত্র ও স্থায়ী জায়গা প্রয়োজন, যেখানে প্রতিষ্ঠানটি আরও পরিকল্পিতভাবে ও বৃহৎ পরিসরে পরিচালনা করা যায়।
এই লক্ষ্যে তিনি কাদিরাবাদ বাজারের উত্তর পার্শ্বে তাঁর নিজের জমিতে মাদ্রাসার স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে তাঁর একটি খামারবাড়ি ছিল তিনি সেই খামারবাড়ি ভেঙে মাদ্রাসার ভবন নির্মাণ শুরু করেন। শুধু তাই নয়, তিনি এই জমি মাদ্রাসার নামে ওয়াকফ করে দেন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এই জমি অন্য কাজে ব্যবহার করতে না পারে এবং এটি চিরকাল দ্বীনি শিক্ষার কাজেই ব্যবহৃত হয়।
মাদ্রাসা নির্মাণের সম্পূর্ণ ব্যয় তিনি নিজে একাই বহন করেছেন। মিস্ত্রি নিয়োগ থেকে শুরু করে নির্মাণ কাজের তদারকি সবকিছু তিনি নিজে পরিচালনা করেছেন। একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তাঁর পেশাগত দক্ষতা এই নির্মাণ কাজে অমূল্য ভূমিকা পালন করেছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই পুরো নির্মাণ কাজটি তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ অবস্থায় সম্পন্ন করেছেন। তখন তাঁর শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে তীব্র ব্যথা ছিল, চলাফেরায় প্রচণ্ড কষ্ট হতো, লাঠি ভর করে হাঁটতে হতো কিন্তু তিনি থামেননি। তাঁর ভেতরের অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং আল্লাহর প্রতি গভীর ভরসা তাঁকে শক্তি জুগিয়েছে, সামনে এগিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা দিয়েছে।
এই মাদ্রাসাটিই পরবর্তীতে কাদিরাবাদ মমিনুর রহমান খসরু দারুল উলুম ইসলামিয়া একাডেমী মাদ্রাসা নামে পরিচিতি লাভ করে এবং আজ (১৪-০৭-২০২৬ যেইদিন আমি ব্লগটি লিখছি) পর্যন্ত সফলভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
ভালো কাজের পথে বাধা আসবেই এই সত্য মমিনুর রহমান খসরু জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে উপলব্ধি করেছেন। মসজিদ নির্মাণ থেকে শুরু করে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা প্রতিটি ধাপে তাঁকে এলাকার একাংশের মানুষের বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
অনেকেই তাঁর এই মহৎ উদ্যোগকে ভালো চোখে দেখেননি, অনেকে সরাসরি বাধা দিয়েছেন, অনেকে নিরুৎসাহিত করেছেন। কিন্তু তিনি কখনো এসবের তোয়াক্কা করেননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল — এই কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, এবং আল্লাহই এর সর্বোত্তম হিফাজতকারী।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতাও ছিল তাঁর জীবনের শেষ বছরগুলোতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশালদেহী এই মানুষটি জয়েন্টের তীব্র ব্যথায় কাতর হয়েও, লাঠি ভর করে হেঁটেও, মাদ্রাসা ও মসজিদের কাজ ছাড়েননি। শারীরিক দুর্বলতা তাঁর দেহকে দুর্বল করেছিল কিন্তু তাঁর মনোবল ও ঈমান ছিল পাহাড়ের মতো অটল।
দ্বীনের প্রতি তাঁর এই অটল নিষ্ঠা, প্রতিকূলতার মধ্যেও হাল না ছাড়ার এই দৃঢ়তা আমাদের সকলের জন্য অনুপ্রেরণা ও শিক্ষণীয়।
মোঃ মমিনুর রহমান খসরুর দুই পুত্র ও এক কন্যা বর্তমানে আমেরিকায় বসবাস করেন। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফল এবং সম্মানজনক অবস্থানে রয়েছেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, পিতার মতোই তাঁর সন্তানেরাও ধার্মিক ও দ্বীনমনা। তাঁর ছোট ছেলে পিতার আদর্শ অনুসরণ করে ইসলামি জীবনযাপন করেন ইসলামিক পোশাক ও আচার-আচরণে পিতার প্রতিচ্ছবি স্পষ্টভাবে দেখা যায়। বড় ছেলেও দ্বীনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং ইসলামকে ভালোবাসেন যা তাঁদের চলাফেরা ও জীবনধারায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
পিতার রেখে যাওয়া এই মসজিদ ও মাদ্রাসার দায়িত্ব তাঁরা গ্রহণ করেছেন। তিন সন্তানই বর্তমানে মাদ্রাসার কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং প্রতিষ্ঠানের খোঁজখবর রাখছেন। তাঁর বড় ছেলে কাদিরাবাদ বায়তুল মামুর জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
পিতার প্রতিষ্ঠিত মসজিদ ও মাদ্রাসার ধারাবাহিকতা তাঁর সন্তানদের হাতে সুরক্ষিত রয়েছে এটি প্রমাণ করে যে মমিনুর রহমান খসরু শুধু ইট-পাথরের প্রতিষ্ঠান নয়, বরং পরবর্তী প্রজন্মের হৃদয়েও দ্বীনের বীজ বপন করে গেছেন।
মোঃ মমিনুর রহমান খসরু ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি পৃথিবীতে থাকতেই ইসলামের জন্য এমন কিছু করে যেতে চেয়েছিলেন, যা তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁর জন্য সদকায়ে জারিয়া হয়ে থাকবে। আলহামদুলিল্লাহ, তিনি সেই স্বপ্ন পূরণে অনেকাংশেই সফল হয়েছেন।
আজ যখন এই মাদ্রাসায় একটি শিশু কুরআনের আয়াত শেখে, যখন একটি ছেলে বাংলা-ইংরেজি-গণিত শিখে একজন দায়িত্বশীল মানুষ হওয়ার পথে এগিয়ে যায়, যখন কাদিরাবাদ বায়তুল মামুর মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত আজান ধ্বনিত হয় তখন মমিনুর রহমান খসরুর আমলনামায় সওয়াব যুক্ত হতে থাকে, ইনশাআল্লাহ।
তিনি আমাদের মাঝে নেই কিন্তু তাঁর স্বপ্ন, তাঁর ত্যাগ, তাঁর প্রতিষ্ঠান আমাদের মাঝে বেঁচে আছে এবং আল্লাহর ইচ্ছায় বেঁচে থাকবে।
اللهم اغفر له وارحمه وعافه واعف عنه
"হে আল্লাহ, তাঁকে ক্ষমা করুন, তাঁর ওপর রহম করুন, তাঁকে শান্তি দিন এবং তাঁকে মাফ করে দিন।"
—---- মোঃ সাব্বির হোসাইন --------(মাদ্রাসার একজন শুভানুধ্যায়ী ও উক্ত মাদ্রাসার একজন শিক্ষক এবং এই পেজের লেখক)