জলপাইগুড়ি ডিস্ট্রিক্ট ফটোগ্রাফিক অ্যাসোসিয়েশন আমার কাছে একটি গর্ব । JDPA তৈরি হওয়ার সময় থেকেই সংগঠনের সঙ্গে আমি ভীষণভাবে জড়িত। তিলে তিলে সংগঠনকে সমৃদ্ধ হতে দেখেছি।
সাল ২০১৮, যখন নামীদামী মিউজিক কোম্পানিগুলি ভিডিও এডিটর এবং প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারদের ওপর রয়্যালটি দাবী করে চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করছিল ঠিক সেই সময়ই সমস্ত প্রফেশনাল ফটোগ্রাফাররা ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে । জলপাইগুড়ি জেলার প্রফেশনাল ফটোগ্রাফাররা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য প্রথমে সম্মিলিত হয়ে একটি কমিটি তৈরি করে বৃহত্তর জেলা কমিটি তৈরি করার জন্য প্রচার শুরু করেন ।
দিনটি ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ শনিবার। সময় দুপুর ৩ টা থেকে ৫টা। স্থান রাজবাড়ী দিঘির পাশে পুরনো মন্দিরের বারান্দা। এই দিন জেলার প্রফেশনাল ফটোগ্রাফাররা একত্রিত হয়ে একটি কমিটি তৈরি করে। যার নাম জলপাইগুড়ি ডিস্ট্রিক্ট ফটোগ্রাফিক অ্যাসোসিয়েশন রাখা হয়। মাত্র ৩৯ জন সদস্যকে নিয়ে এই কমিটি তৈরি হয়।
শুরু হয় সংগঠনের প্রথম ধাপ, সংগঠনটি নিবন্ধীকরণের কাজ। যোগ্য নেতৃত্বের ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সরকারি মান্যতা পাওয়া যায়। West Bengal Societies Registration Act xxx61 of 1961 অনুসারে আমাদের এই প্রিয় সংগঠনটি রেজিস্ট্রেশন নাম্বার পেয়ে যায় S0002353 of 2018-2019 . দিনটি ১৬ই জানুয়ারি ২০১৯
ঠিক ওই একই পরিস্থিতিতে এবং একই পদ্ধতিতে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিভিন্ন জেলাগুলোতে সংগঠনগুলি গড়ে ওঠে। সাল ২০২০, তৎকালীন সময় স্বর্গীয় সুবীর সামন্ত মহাশয়ের নেতৃত্বে এই সকল জেলা সংগঠনগুলিকে একত্রিত করে একটি রাজ্য সংগঠন তৈরি করার কাজ শুরু হয়।
সৃষ্টি হয় "ওয়েস্ট বেঙ্গল ফটোগ্রাফি ওয়েল ফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন"। জলপাইগুড়ি ডিস্ট্রিক্ট ফটোগ্রাফিক অ্যাসোসিয়েশনের অভিভাবক শ্রী মানবেশ চক্রবর্তী মহাশয়ের নেতৃত্বে জেলা সংগঠনকে যুক্ত করা হয় রাজ্য সংগঠনের সঙ্গে।
এরপরে শুরু হয় সংগঠনের সদস্য ফটোগ্রাফারদের স্কিল ডেভেলপমেন্ট ওপর বিভিন্ন ধরনের ওয়ার্কসপের কাজ ।
এই উদ্দেশ্যে এবং সঠিক নেতৃত্বের উদ্যোগে নর্থ বেঙ্গলে প্রথম স্কিল ইন্ডিয়ার প্রজেক্ট জলপাইগুড়ির বুকে আয়োজন করা হয়। পার্শ্ববর্তী ৩টি জেলা এবং জলপাইগুড়ি জেলা থেকে 400 জন ফটোগ্রাফারদের নিয়ে এই প্রজেক্ট এর কাজ হয়েছিল। সাথে নতুন সদস্যপদ গ্রহণ। সমস্ত জেলা এবং রাজ্যের মধ্যে একটি আলোড়ন সৃষ্টি করে দৃষ্টান্তমূলক নজির তৈরি করে জলপাইগুড়ি ডিস্ট্রিক্ট ফটোগ্রাফিক অ্যাসোসিয়েশন।
এরপর দুটি নামীদামী ক্যামেরা কোম্পানির ওয়ার্কশপ আয়োজন করা হয়েছিল সংগঠনের দ্বারা । সাংগঠনিকভাবে যেটা জলপাইগুড়ি জেলাতেই প্রথম হয়েছিল।
সদস্যদের ফটোগ্রাফির মান আরো উন্নত করার উদ্দেশ্যে সংগঠন থেকে মাননীয় সভাপতি মানবেশ চক্রবর্তী মহাশয় ও মাননীয় সম্পাদক পিন্টু রায় মহাশয় এর তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফটো আড্ডার আয়োজন করা হয়েছে।
ফটোগ্রাফি চর্চা এবং ফটোগ্রাফির মান উন্নত করার উদ্দেশ্যে Jal চিত্র নামে একটি পেজ সোশ্যাল সাইটে তৈরী করা হয়েছে। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসে আমাদের রাজ্যের ৩জন বিশিষ্ট ফটোগ্রাফার মাননীয় রণজিৎ চট্টোপাধ্যায়, রথীন হালদার ও বিমল বসাক মহাশয়দের নিয়ে বিচারক মন্ডলী তৈরি করে সাপ্তাহিক লাইভ এর মাধ্যমে ফটোগ্রাফি চর্চা মাধ্যম দিয়ে ফটোগ্রাফি কনটেস্ট আয়োজন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে এই প্রয়াস Jal চিত্র পেজের নামে সারা উত্তরবঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে । ফটোগ্রাফাররা তাদের ফটোগ্রাফির মান এবং ত্রুটি সম্বন্ধে সহজেই জানতে পারছেন এবং এই Jal চিত্র পেজের মাধ্যমে লাভবান হচ্ছেন।
সামাজিকভাবেও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জলপাইগুড়ির ডিস্ট্রিক্ট ফটোগ্রাফিক অ্যাসোসিয়েশন পিছিয়ে নেই ।
শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে সদস্যরা স্বতস্ফূর্ত ভাবে দুই দুইবার রক্তদান শিবির করেছেন । এর সাথে জেলার দোমোহনি রেল দুর্ঘটনার সময়ও JDPA সদস্যরা স্বেচ্ছায় রক্তদান করেছেন। এ ছাড়াও 24 ঘন্টা সদস্যরা সদস্যদের বা তাদের পরিবারের কারোর বিশেষ প্রয়োজনে পাশে থেকে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন ।
অরণ্য সপ্তাহ কে উপলক্ষ্য করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বৃক্ষ দান ও বৃক্ষরোপণ প্রয়োজনীয়তার প্রচার করা হয়েছে ।সংগঠনের আর্থিক অবস্থা খুব সচ্ছল না হলেও জেলার দুস্থ ও মেধাবী ছাত্র ছাত্রীর পাশে দাঁড়িয়েছি আমরা । এই ধরনের প্রতিদিন কিছু না কিছু সামাজিক কাজ করেই চলেছে আমাদের প্রিয় সংগঠন জলপাইগুড়ি ডিস্ট্রিক্ট ফটোগ্রাফিক অ্যাসোসিয়েশন।
আরেকটি বিষয় আলোকপাত না করলে হয়তো নিজেকে অকৃতজ্ঞ মনে হবে। আমার বাবার যে দিন ব্রেন স্টোক করে আমি কর্মসূত্রে জলপাইগুড়ি শহরে বাইরে ছিলাম। আমি ফোন করার সাথে সাথেই সংগঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য শ্রী পার্থ চক্রবর্তী মহাশয় এবং জয়দীপ দাস খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বাবার প্রাথমিক চিকিৎসা করে শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে রওনা করিয়ে দেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে চিকিৎসা শুরু হওয়ার ফলে সেই যাত্রায় আমার বাবা বেঁচে যান। এর পর থেকেই সংগঠনের প্রতি আস্থা আর ভালবাসা আমার আরো অনেক বেড়ে যায়।
সংগঠনের সময়োচিত সিদ্ধান্ত এবং যোগ্য নেতৃত্বের ফলে ধীরে ধীরে সংগঠন আরো শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এভাবেই জেলার বিভিন্ন ব্লকে যেমন ধুপগুড়ি ইউনিট, ময়নাগুড়ি ইউনিট, মালবাজার ইউনিট, হলদিবাড়ি ইউনিট ও মেখলিগঞ্জ ইউনিট এর মতো পালক গুলি একে একে জুড়ে যায় সংগঠনের সাথে এবং সংগঠন শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আমাদের বর্তমান সদস্য সংখ্যা অনবরত বেড়েই চলেছে।
বর্তমান বছরে সংগঠনকে আরো সমৃদ্ধ এবং শক্তিশালী করার জন্য বিভিন্ন কমিটি তৈরি করা হয়েছে । যোগ্য নেতৃত্ব দ্বারা সোশ্যাল ওয়ার্ক কমিটি, কালচারাল কমিটি, ওয়ার্কশপ কমিটি, জলচিত্র কমিটি, গ্রিভেন্স সেল কমিটি, লিগাল টিম কমিটি, সাথে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কমিটি মিডিয়া সেল , এই কমিটির ওপর সংগঠনের সম্বন্ধে ও সংগঠনের কর্মকাণ্ড জনসাধারণের কাছে তুলে ধরার বিশেষ দায়িত্ব পড়েছে।
উপরে উল্লেখিত কমিটিগুলির প্রত্যেকে ভালোভাবে কাজ করছেন। আগামীতে জলপাইগুড়ি জেলাবাসীর সামনে আরো সুন্দর সুন্দর পরিকল্পনা বাস্তবরূপে তুলে ধরতে পারব এই আশা রাখছি।
সর্বশেষে সমস্ত শহরবাসীর উদ্দেশ্যে একটি বার্তা সংগঠনের পক্ষ থেকে জানাই।
"আপনার বাড়ির শুভ কাজের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য ফটোগ্রাফার নির্ধারণ করার পূর্বে, অবশ্যই সংগঠনের পরিচয় পত্র দেখে নেবেন এবং তার কাজের মান যাচাই করে নেবেন। সঙ্গে অবশ্যই চুক্তিপত্র করে নেবেন।"
সংগঠন শুধু তার সদস্য নয় জেলার সকল মানুষের ফটোগ্রাফিক সমস্যার সমাধানে সর্বদা জাগ্রত রয়েছে।
সাংগঠনিক দিক থেকে জলপাইগুড়ি ডিস্ট্রিক্ট ফটোগ্রাফিক অ্যাসোসিয়েশন শুরু থেকেই যথেষ্ট সক্রিয় ভাবে জেলার সমস্ত ফটোগ্রাফার দের এক ছাদের তলায় আনতে তৎপর ছিল। কালের ব্যবধানে আজ আমাদের সংগঠন যথেষ্ট মজবুত এবং সেই একই সক্রিয়তা বজায় রেখে বছরের বিভিন্ন সময়ে নানাবিধ সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে । সংগঠন এর সদস্য দের সহযোগিতায় এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে শহরের বুকে বিভিন্ন ক্যামেরা, লাইট এবং লেন্স কোম্পানির ওয়ার্কশপ সংগঠিত হয়েছে বহুবার, যা একাধারে সদস্যদের ফটোগ্রাফির খুঁটিনাটি জানতে সাহায্য করেছে এবং একই সাথে পেশাদারী মনোভাব নিয়ে কিভাবে ক্রেতা দের সাথে সুন্দর সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে সেই প্রশিক্ষণও দিয়েছে। এছাড়াও বছরের বিভিন্ন সময়ে আউটডোর ওয়ার্কশপ, ফটো ওয়াক, ইত্যাদির মাধ্যমে সংগঠনের সদস্যরা পারস্পরিক জ্ঞান বিনিময় এর মাধ্যমে নিজেদের কর্মদক্ষতা বাড়িয়েছেন। প্রজাতন্ত্র দিবসের শুভক্ষণে রক্তদান শিবিরের আয়োজন এবং বার্ষিক সাধারণ সভা আয়োজিত হয়েছে। এছাড়াও পুজো শেষে বিজয়া সম্মিলনী অনুষ্ঠান ও পারস্পরিক সৌজন্যের আদান প্রদান আমাদের সংগঠনকে করে তুলেছে সমৃদ্ধ। এই সমৃদ্ধি আমাদের ভবিষ্যতের বন্ধন আরো মজবুত করুক আমরা এই লক্ষ্যে ব্রতী।