ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামল। তখন পারস্যের এক প্রদেশের শাসক ছিলো- হরমুজান নামের এক অত্যাচারী রাজা। মুসলমানদের সঙ্গে তার প্রায়ই লড়াই হতো। লড়াইয়ে পরাজিত হলে তিনি বিভিন্ন শর্তে সন্ধি করতেন এবং নিজের রাজ্যে ফিরে যেতেন। পরে আবার সুযোগ পেলেই মুসলমানদের ক্ষতি সাধন করতেন।
তার এমন অনৈতিক নীতির ফলে খলিফা হজরত উমর (রা.) আদেশ দিলেন, হরমুজানকে বন্দী করে তার দরবারে হাজির করতে। ইতোমধ্যে এক যুদ্ধে হরমুজান মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। খলিফার হুকুম মতে তাকে বন্দী অবস্থায় খলিফার দরবারে হাজির করা হয়।
তখন খলিফা হজরত উমর (রা.) তাকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘আপনি আমাদের সঙ্গে বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। আপনার বিশ্বাসঘাতকতার কারণে আমাদের বারবার যুদ্ধ-বিগ্রহে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। ফলে অসংখ্য মুসলিম সৈন্যকে অযথা প্রাণ দিতে হচ্ছে। তাদের অর্থ-সম্পদ নষ্ট হচ্ছে।
আপনি অনেকের ঘর-বাড়ি আপনি ধ্বংস করেছেন। নিরীহ অনেক লোকের ওপর অন্যায়ভাবে অত্যাচার চালিয়েছেন। আপনাকে আর সুযোগ দেওয়া যায় না। আপনার একমাত্র শাস্তি হলো- মৃত্যুদণ্ড। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পূর্বে আপনার কোনো কথা থাকলে বলতে পারেন।’
হরমুজান ছিলো খুব সূক্ষ্ম ও কূটবুদ্ধিসম্পন্ন লোক। সুযোগ পেয়ে তিনি এক ফন্দি আঁটেন। তিনি বললেন, মহানুভব খলিফাতুল মুসলিমিন! আমার প্রচণ্ড পিপাসা পেয়েছে, দয়া করে আমাকে একটু পানি পান করতে দিন।
খলিফার নির্দেশে তাকে পানি পান করতে দেওয়া হলো। সুচতুর হরমুজান পানির পাত্র হাতে নিয়ে তা পান না করে ভীতু-ভীতু ভাব নিয়ে ডানে-বামে তাকাতে লাগলেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কি হলো, আপনি পানি পান করছেন না কেন? প্রশ্ন শুনে হরমুজান জবাব দিলো- আমিরুল মুমিনিন, আমার ভয় হচ্ছে যে, পানিটুকু পান করার আগেই আমাকে হত্যা করা হবে।
তার কথার প্রেক্ষিতে হজরত উমর (রা.) বললেন, আপনি নির্ভয়ে পানি পান করুন। হাতের পানি পান করার পূর্বে আপনাকে হত্যা করা হবে না। এ ব্যাপারে আপনাকে আমি নিশ্চয়তা দিলাম।
হরমুজান আমিরুল মুমিনিনের এ কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাতে থাকা পানির পাত্রটি মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললেন, মহামান্য খলিফা! আপনি বলেছেন, হাতের পানিটুকু পান করার আগে আমাকে হত্যা করবেন না। আমি পানি ফেলে দিয়েছি, সে পানি আর পান করবো না। ওয়াদা অনুযায়ী আপনিও আমাকে আর হত্যা করতে পারবেন না।
হরমুজানের এ চালাকির প্রেক্ষিতে মুসলিম সৈন্যরা রেগে গিয়ে বলল, আমিরুল মুমিনিন! আপনি অনুমতি দিন- আমরা এখনই তার এমন অনৈতিক চালাকির শাস্তি দেই।
কিন্তু খলিফা হজরত উমর (রা.) সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, না তা হতে পারে না। মুসলমানের কথার মূল্য অনেক। সুতরাং যে কথা আমি বলে ফেলেছি, যেকোনো মূল্যে আমি তা রক্ষা করবই- ইনশাআল্লাহ।
যেহেতু আমি তাকে বলেছি, তার হাতের পানিটুকু পান করার পূর্বে তাকে আমি হত্যা করবো না, আর সে যখন পানি পান করেনি সুতরাং, বন্দী হরমুজানকে হত্যা করা চলবে না। এ কথা কথা বলে উমর (রা.) হরমুজানকে লক্ষ্য করে বললেন, যান, আপনি মুক্ত। আমার কথার খেলাফ আমি করবো না।
সুবহানাল্লাহ, কথার কি মূল্য। ওয়াদা পালনের কি অপূর্ব নজির। হরমুজান কল্পনাও করতে পারেননি- তিনি এত সহজে মুক্তি লাভ করবেন। রাসূলের প্রিয় সহচর হজরত উমরের মহানুভবতা দেখে তিনি দারুণভাবে প্রভাবিত হলেন। তিনি ভাবলেন, এই যদি হয় ইসলামের আদর্শ; তবে এর থেকে দূরে থাকা হবে আমার জন্যে চরম দুর্ভাগ্যজনক। ইসলামের অতুলনীয় আদর্শে মুগ্ধ হয়ে হরমুজান ইসলাম গ্রহণ করলেন।
এভাবেই যুগে যুগে ইসলামের অতুলনীয় আদর্শে মুগ্ধ হয়ে অসংখ্য মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। বিশ্বব্যাপী ইসলাম ছড়িয়েছে আপন মহিমায়। শক্তির জোরে নয়।
দয়াল নবীজি হুজুর পাক "সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম" এর এক প্রিয় সাহাবি, যার নাম হল, হযরত হামেদ (রা) । এক শুক্রবারের ঘটনা;
জুমার নামাজের আর বেশি সময় বাকী নেই। এই মুহূর্তে বাড়ির পোষ্য গাধাটি অজানা-গন্তব্যে উধাও হয়ে গেল। ওদিকে আটার কলে পড়ে আছে তার একমাত্র খাদ্য আটা। সেটা না আনলে আজ চুলায় আগুনই জ্বলবে না। আবার ফসলের জমিটা পানি শূন্যতায় ফেটে চৌচির হয়ে আছে। তাতে সেচ দেয়া আবশ্যক হয়ে পড়েছে। ত্রিমুখী কাজের চাপ আর অত্যাসন্ন জুমআর নামায উনার মস্তিস্কে মিছিল শুরু করল। তিনি নীরবে কিছুক্ষণ ভাবলেন, এরপর জাগতিক কর্মগুলোকে পদাঘাত করে ছুটে গেলেন মসজিদ পানে; আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আত্মিক প্রশান্তি লাভের উদ্দেশ্যে। নামায শেষ হল। অফুরন্ত প্রশান্তি নিয়ে তিনি মসজিদ থেকে বের হলেন। এরপর প্রথমেই তিনি ক্ষেতের কাছে গেলেন, এবং শুষ্ক জমি পানিতে টইটুম্বুর দেখে বিষ্ময়ে হতবাক হলেন। অনুসন্ধান করে জানতে পারলেন; পাশের জমির মালিক আপন ক্ষেতে পানির লাইন ছেড়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ছিলেন, ফলে পানি উপচে পড়ে তার
জমিটাতেও সেচের কাজ হয়ে গেছে। বাড়িতে এসে
দেখেন গাধাটি আস্তাবলে সুন্দর করে বাধা। আশ্চর্য বটে! ভেতরে প্রবেশ করে দেখেন স্ত্রী রুটি তৈরিতে ব্যস্ত।
আবার অবাক হওয়ার পালা। অবাক হয়ে তিনি স্ত্রীর
কাছে জানতে চাইলেন কীভাবে কী হল। উত্তরে স্ত্রী বলল, হঠাৎ আমি দরজায় একটা শব্দ পেলাম। খুলে দিতেই গাধাটি বাড়িতে ঢুকে পড়ল। ওদিকে এক প্রতিবেশীর আটা কলে পড়ে ছিল সে তার আটা আনতে
গিয়ে ভুলে আমাদের আটা নিয়ে আসে। পরে বুঝতে পেরে আমাদের আটা বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যায়। স্ত্রীর বক্তব্য শোনে হযরত হামেদ রা. আকাশের দিকে মাথা উত্তোলন করে হৃদয়ের গভীর থেকে এক সস্তির নিস্বাস ফেলে আল্লাহ পাকের শুকরিয়াআদায় করলেন।
আর বললেন, হে আল্লাহ! আমি আপনার মাত্র
একটি হুকুম আদায় করলাম মন থেকে, আর আপনি আমার তিন-তিনটি প্রয়োজন সমাধা করে দিয়েছেন। সত্যি আপনি মহান ক্ষমতাবান দয়ালু।
# সুবহানাল্লাহ
[আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া : পৃ. ২৮০, ২৮১]
১টা ছেলে তার মসজিদের এক কোনায় বসে পড়ালেখা করে। হঠাৎ ১দিনরাতে ১টা মেয়ে এসে বলেঃ-
মেয়ে: দেখেন বাইরে ডাকাতি হচ্ছে,আমায় একটু থাকতে দিন। ডাকাতি থেমে গেলেই আমি চলে যাবো।
ছেলে: দেখেন আমি এই এখানে একা থেকে পড়ালেখা করি। আপনার সাথে আমাকে যদি কেউ দেখে,তাহলে আমাকে তাড়িয়ে দেবে। তার চেয়ে আপনি বরং চলে যান।
মেয়ে: আমি এখন চলে গেলে আমার সম্মান হারাতে হবে। কিন্তু এখানে থাকলে আমার হয়তো কোন ক্ষতি হবেনা।ছেলেটি অনেক ভেবে মেয়েটিকে থাকতে দেয়। ডাকাতদের মারামারির পরঃ-
ছেলে: চলেন আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।
মেয়ে: এত রাতে? এত রাতে আমি যাবোনা। আমি সকাল হলেই চলে যাবো।
ছেলে: আপনার সাথে কেউ দেখলে আমার ক্ষতি হবে। মেয়েটি কিছুতেই যেতে রাজি হলো না ।সারা রাত তারা ২ জন ২পাশে জেগে রাত কাটিয়ে দিলো। ........ কিন্তু মেয়েটি খেয়াল করে দেখলো ছেলেটি একটু পর পর আগুনে তার হাত পোড়াচ্ছে। আর যন্ত্রনায় ছটফট করছে। কিছুক্ষন পর পর সে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করছে। আযান দেওয়ার আগেঃ-
ছেলে: চলেন, আর থাকা যাবেনা,আপনাকে পৌছে দিয়ে আসি।
মেয়ে: যাবো, তার আগে বলেন একটু পর পর আপনি আগুনে হাত পোড়াচ্ছিলেন কেন?
ছেলে: এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।
মেয়ে: না বললে যাবোনা।
ছেলে: যখনি আপনার উপর আমার কু-নজর আসছিলো, তখনি আমি হাত পুড়িয়ে বলছিলাম, এ আগুন জাহান্নামের আগুনের কয়েক হাজার ভাগের ১ভাগ মাত্র!!!
--সুবহান-আল্লাহ এই ভয় যেন আজ বিলীন!!! এই ভয় যেন আজ মানুষের অন্তর থেকে মুছে গেছে!!! জাহান্নামের আগুনকে প্রাধান্য দিচ্ছে আজকের সমাজ ওএর মানুষেরা। -হে আল্লাহ আমরা মহা পাপি, আমাদের সঠিক পথ দেখাও।
একজন ব্যক্তি আইয়াস ইবনে মুয়াবিয়ার নিকট এসেছিলেন এবং মুসলিম বিচারক হিসেবে তিনি তাঁর জ্ঞানের জন্য বিখ্যাত ছিলেন এবং তাদের মধ্যে নিম্নলিখিত কথোপকথন ঘটেছিল:
ব্যক্তি: মদ সম্পর্কে ইসলামিক বিধান কি?
বিচারক: এটি হারাম।
ব্যক্তি: পানি কেমন?
বিচারক: এটি হালাল (অনুমতিযোগ্য)।
ব্যক্তি: খেজুর এবং আঙ্গুর কেমন?
বিচারক: এইগুলো হালাল।
ব্যক্তি: কেন এই সমস্ত উপাদান হালাল, এবং যখন এইগুলোকে একত্রিত করেন, তখন সেইসব হারাম হয়ে যায়?
বিচারক লোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন: আমি যদি আপনাকে এই মুষ্টিমেয় ময়লা হাত দিয়ে আঘাত করি তবে আপনি কি মনে করেন এটিতে আপনাকে কোনো ক্ষতি হবে?
ব্যক্তি: এটা হবে না।
বিচারক: এইটা কেমন হয় যদি আমি আপনাকে মুষ্টিমেয় খড় দিয়ে আপনাকে আঘাত করি?
ব্যক্তি: এটা আমার ক্ষতি করবে না।
বিচারক: এক মুঠো পানি দিয়ে করলে কেমন হবে?
ব্যক্তি: এটাতে অবশ্যই আমার ক্ষতি হবে না।
বিচারক: এইটা কেমন হয় যদি আমি এইসবগুলো একসাথে মিশ্রিত করি এবং সেগুলি শুকিয়ে একটি ইট তৈরি করি এবং তারপরে আপনাকে আঘাত করে, তাতে কী আপনার বেথা পাবেন বা ক্ষতি হবে?
ব্যক্তি: এটি দিয়ে আঘাত করলে আমিতো বেথা পাবো এবং এমনকি আমি মারাও যেতে পারি!
বিচারক: আপনি আমাকে যা বলেছিলেন, ঠিক একই যুক্তি আপনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য !!
একদিন নবী করিম (সাঃ)-এর একজন সাহাবী মারা গেলেন। রাসূল পাক (সাঃ) উনার জানাজা পড়ালেনI তারপর একদল সাহাবী মৃতদেহ কবর দেয়ার জন্য কবরস্থানে নিয়ে আসলেনI সবার সাথে আমাদের নবী করিমও (সাঃ) হেঁটে হেঁটে আসলেনI
দুই জন সাহাবী কবর খুঁড়তে শুরু করলেনI
সবাই মৃত দেহকে ঘিরে বসে আছেনI
কবর খনন শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছেনI
সবাই চুপচাপ, নীরব ও শান্ত একটি পরিস্থিতিI
নবীজি গভীর মনোযোগ দিয়ে কবর খোঁড়া দেখছিলেন একটু পর সবার দিকে তাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা কি জানো, মানুষ মারা যাওয়ার পর, তাঁর আত্মার কি হয় ?"
সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে নবীজি কে বললেন,
-ইয়া রাসূলুল্লাহ ! আমাদেরকে বলুনI
নবীজি একটু চুপ করে থাকলেনI সবাই উনার কাছে এসে ঘিরে বসলেনI মৃত্যুর পর আত্মার কি হয়, এই তথ্য তাঁদের জানা ছিল নাI আজ সেটা নবীজির মুখে শুনবেনI কত বড় সৌভাগ্যI শুনার জন্য সবাই অধীর আগ্রহে নবীজির কাছে এসে বসলেনI
তিনি একবার কবরের দিকে তাকিয়ে মাথাটা তুলে আকাশের দিকে তাকালেন
তারপর তিনি গল্পের মত করে বলতে শুরু করলেনI
"শুনো, যখন মানুষ একেবারেই মৃত্যু শয্যায়, তখন সে মৃত্যুর ফেরেস্তাকে দেখে ভয় পেয়ে যায়I কিন্তু যে বিশ্বাসী ও ভালো মানুষ তাকে মৃত্যুর ফেরেস্তা হাসি মুখে সালাম দেনI তাকে অভয় দেন এবং মাথার পাশে এসে ধীরে ও যত্ন করে বসেনI তারপর মৃত প্রায় মানুষটির দিকে তাকিয়ে বলেন,
-হে পবিত্র আত্মা ! তুমি তোমার পালনকর্তার ক্ষমা ও ভালোবাসা গ্রহণ করো এবং এই দেহ থেকে বের হয়ে আসোI
মুমিনের আত্মা যখন বের হয়ে আসে তখন সে কোন ধরণের ব্যথা ও বেদনা অনুভব করে নাI
নবী আরো একটু ভালো করে উদাহরণ দিয়ে বললেন,
-মনে করো একটা পানির জগ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর উপর থেকে এক ফোঁটা পানি যেমন নিঃশব্দে উপর থেকে নিচে নেমে আসে ঠিক তেমনি নীরবে ও কষ্ট ছাড়াই আত্মাটি তার দেহ থেকে বের হয়ে আসেI
সেই সময় দুইজন অন্য ফেরেস্তা বেহেস্ত থেকে খুব সুগন্ধি মাখানো একটা নরম সুতার সাদা চাদর নিয়ে আসেন এবং তারা আত্মাটিকে সেই চাদরে আবৃত করে আকাশের দিকে নিয়ে যান I
তারা যখন আকাশে পৌঁছেন তখন অন্য ফেরেস্তারা সেই আত্মাটিকে দেখার জন্য এগিয়ে আসেনI
কাছে এসে সবাই বলেন, সুবহানাল্লাহ ! কত সুন্দর আত্মা, কি সুন্দর তার ঘ্রান !
তারপর সবাই জানতে চান,
-এই আত্মাটি কার ?
উত্তরে আত্মা বহনকারী ফেরেস্তারা বলেন,
-উনি হলেন, "ফুলান ইবনে ফুলান"
(নবী আরবিতে বলেছেন, বাংলায় হলো, "অমুকের সন্তান অমুক" )
বাকি ফেরেস্তাগন তখন আত্মাটিকে সালাম দেয়, তারপর আবার জিজ্ঞেস করে,
-উনি কি করেছেন ? উনার আত্মায় এতো সুঘ্রাণ কেন ?
আত্মা বহন কারী ফেরেস্তা গন তখন বলেন,
-আমরা শুনেছি মানুষজন নিচে বলা-বলি করছে, উনি একজন ভালো মানুষ ছিলেন, আল্লাহর ভালো বান্দা, অনেক দয়ালু, মানুষের অনেক উপকার করেছেন I
এতটুকু বলার পর নবী একটু থামলেনI
তারপর সবার দিকে ভালো করে দৃষ্টি দিয়ে, উনার কণ্ঠটা একটু বাড়িয়ে বললেন, এই কারণেই বলছি, সাবধান ! তোমরা কিন্তু মানুষের সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার করবে নাI
তুমি মারা যাওয়ার পর মানুষ তোমার সম্পর্কে যা যা বলবে, এই আত্মা বহনকারী ফেরেস্তারাও আকাশে গিয়ে ঠিক একই কথা অন্যদেরকে বলবেI
এই কথা বলে তিনি আবার একটু চুপ করলেন, কবরটার দিকে দৃষ্টি দিলেনI
আবার বলতে শুরু করলেনI
এই সময় মানুষ যখন পৃথিবীতে মৃত দেহকে কবর দেয়ার জন্য গোসল দিয়ে প্রস্তুত করবে তখন আল্লাহ তা'আলা আত্মা বহনকারী ফেরেশতাদেরকে বলবেন, "যাও, এখন তোমরা আবার এই আত্মাকে তার শরীরে দিয়ে আসো, মানুষকে আমি মাটি থেকে বানিয়েছি, মাটির দেহেই তার আত্মাকে আবার রেখে আসো I সময় হলে তাকে আমি আবার পুনরায় জীবন দিবো I"
তারপর মৃতদেহকে কবরে রেখে যাওয়ার পর দুইজন ফেরেস্তা আসবেনI তাদের নাম মুনকার ও নাকিরI
তারা মৃতের সৃষ্টিকর্তা, তার ধর্ম ও নবী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন I
মুনকার নাকির চলে যাওয়ার পর,
আত্মাটি আবার অন্ধকার কবরে একাকী হয়ে যাবেI
সে এক ধরণের অজানা আশংকায় অপেক্ষা করবেI কোথায় আছে? কি করবে? এক অনিশ্চয়তা এসে তাকে ঘিরে ধরবেI
এমন সময় সে দেখবে, খুব সুন্দর একজন তার কবরে তার সাথে দেখা করতে এসেছেনI
তাঁকে দেখার পর আত্মাটি ভীষণ মুগ্ধ হবেI এতো মায়াবী ও সুন্দর তার চেহারা, সে জীবনে কোনদিন দেখেনিI
আত্মাটি তাকে দেখে জিজ্ঞেস করবে,
-তুমি কে ?
সেই লোকটি বলবে,
-আমি তোমার জন্য অনেক বড় সু- সংবাদ নিয়ে এসেছি, তুমি দুনিয়ার পরীক্ষায় উর্তীর্ণ হয়েছো, তোমার জন্য আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের ব্যবস্থা করেছেন, তুমি কি সেটা একটু দেখতে চাও?
আত্মাটি ভীষণ খুশি হয়ে বলবে,
-অবশ্যই আমি দেখতে চাই, আমাকে একটু জান্নাত দেখাওI
লোকটি বলবে,
-তোমার ডান দিকে তাকাওI
আত্মাটি ডানে তাকিয়ে দেখবে কবরের দেয়ালটি সেখানে আর নেইI সেই দেয়ালের দরজা দিয়ে অনেক দূরে সুন্দর বেহেস্ত দেখা যাচ্ছেI
বেহেস্তের এই রূপ দেখে আত্মাটি অনেক মুগ্ধ হবে ও প্রশান্তি লাভ করবেI
এবং সেখানে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে লোকটিকে জিজ্ঞেস করবে,
-আমি সেখানে কখন যাবো? কিভাবে যাবো?
লোকটি মৃদু হেসে বলবেন,
- যখন সময় হবে, তখনই তুমি সেখানে যাবে ও থাকবেI আপাততঃ শেষ দিবস পর্যন্ত তোমাকে অপেক্ষা করতে হবেI ভয় পেও নাI আমি তোমার সাথেই আছিI তোমাকে আমি সেইদিন পর্যন্ত সঙ্গ দিবোI
আত্মাটি তখন তাকে আবারো জিজ্ঞেস করবে,
-কিন্তু তুমি কে ?
তখন লোকটি বলবে,
-আমি তোমার এতদিনের আমল, পৃথিবীতে তোমার সব ভালো কাজের, তোমার সব পুণ্যের রূপ আমি, আজ তুমি আমাকে একজন সঙ্গীর মত করে দেখছোI আমাকে আল্লাহ তা'আলা তোমাকে সঙ্গ দেয়ার জন্যই এখানে পাঠিয়েছেনI
এই কথা বলে, লোকটি আত্মাটির উপর যত্ন করে হাত বুলিয়ে দিবেন
এবং বলবেন,
-হে পবিত্র আত্মা ! এখন তুমি শান্তিতে ঘুমাওI নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নাওI
এই কথা বলার পর, আত্মাটি এক নজরে বেহেস্তের দিকে তাঁকিয়ে থাকবে এবং একসময় এই তাকানো অবস্থায় গভীর প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে পড়বেI
নবীজি এতটুকু বলে আবার একটু থামলেনI
সাহাবীরা তখন গায়ের কাপড় দিয়ে ভেজা চোখ মুছলেনI
(বুখারী ও মুসনাদের দুইটি হাদিস অবলম্বনে)
আল্লাহ আমাদের পবিত্র আত্মা হওয়ার তাওফিক দান করুন.........আমিন।
আসুন আল্লাহ্ হুকুমগুলো নবীর তরীকায় পালন করার চেষ্টা করি।
আমিন।
-আমি একটা হার হারিয়েছি। কোনও দয়ালু ভাই পেয়ে থাকলে, আল্লাহর ওয়াস্তে ফিরিয়ে দেবেন।
যুবকটা বললেন: আমি এগিয়ে গেলাম। বললাম:
-আপনার হারটা কেমম, বর্ণনা দিন তো?
.
বর্ণনা মিলে গেলে, হারটা হস্তান্তর করলাম। আশ্চর্য হয়ে গেলাম, লোকটা হারখানা নিয়ে টু-শব্দও করলো না। সোজা গটগট করে হেঁটে চলে গেলো। সামান্য ধন্যবাদ টুকুও না।
আমি আল্লাহর কাছে বললাম:
-ইয়া আল্লাহ! আমি যদি এই সামান্য কাজটুকু আপনাকে সন্তুষ্ট করার জন্যই করে থাকি, আপনি আমার জন্য এর চেয়েও ভালো প্রতিদান জমা করে রাখুন।
আমীন।
এরপর আমি রুজি-রোজগারের উদ্দেশ্যে, জাহাজে চড়ে বসলাম। তাকদীরের এমনই লিখন, জাহাজ পড়লো ঝড়ের কবলে। পুরো জাহাজ ভেঙে লণ্ডভণ্ড হয় গেলো। হাতের কাছে যে যা পেলো ওটা ধরেই ভেসে রইলো।
.
আমিও ভাসতে ভাসতে একটা দ্বীপে গিয়ে উঠলাম। ওখানে দেখলাম একটা মসজিদ। মন খুশি হয়ে উঠলো। মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করলাম। আমার তো যাওয়ার আপাতত কোনও জায়গা নেই। ভবঘুরে।
মসজিদে একটা কুরআন শরীফ পেলাম। বসে বসে ওটাই তিলাওয়াত করতে শুরু করলাম।
আমাকে কুরআনখানা পড়তে দেখে সবাই আমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরলো। অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো:
-আপনি কুরআন পড়তে পারেন?
-জ্বী, পারি।
তারা বললো:
-আমাদের কাছে এই কুরআন কারীম অনেক দিন ধরে পড়ে আছে। আমরা এটা পড়তে পারি না।
আমরা এটাকে পরম যত্নে রেখে দিয়েছি। এক নাবিকের কাছ থেকেই আমরা এটা কিনেছিলাম।
.
আমাদের এই দ্বীপে, আগে একজন ছিলেন, তিনি এই কুরআন পড়তে পারতেন। ঠিকঠাক করা ছিলো, তিনিই সবাইকে কুরআন শিক্ষা দিবেন। এরপর তিনি হজ্জে গেলেন। আর ফিরে আসেন নি। এখন আপনি আমাদেরকে, আমাদের
সন্তানদেরকে কুরআন শিক্ষা দিন। আমি দ্বীপের বাচ্চাদেরকে কুরআন কারীম শিক্ষা দিতে লাগলাম। তাদেরকে অন্যান্য লেখাপড়াও শেখাতে থাকলাম।
কিছুদিন পর এলাকার মুরুব্বিরা বললেন:
-আমাদের এলাকায় একজন ইয়াতীম মেয়ে আছে। সর্বগুণে গুণান্বিতা। আপনি কি তাকে বিয়ে করতে রাজি হবেন?
.
-আমার কোনও আপত্তি নেই। আমাদের বিয়ে হয়ে গেলো। বাসর রাতে স্ত্রীর সাথে আমার প্রথম দেখা। আমি তাকে দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। দেখলাম তার গলায় মক্কায় কুড়িয়ে পাওয়া সেই হার ঝুলছে। জানতে চাইলাম:
-এই হার তোমার কাছে কিভাবে এলো? নববধূ লাজুক মুখে উত্তর দিলো:
.
-আমার আব্বু সেবার হজে গেলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে হারটা হারিয়ে গেলো। কিন্তু এক মহত ব্যক্তির বদান্যতায় হারটা ফিরে পেলেন। আব্বু সব সময় তার জন্য দু আ করতেন:আর বলতেন
“ইয়া আল্লাহ! আমার মেয়ের জন্য, মক্কার এই মহত ব্যক্তির মতো এমন একজন স্বামী মিলিয়ে দিন”
কেউ জানেনা নবীজি কোথায়। ওমর ফারুক (রাযিঃ) মুক্ত তরবারি হাতে ঘোষণা দিলেন, “যদি নবীজির কোন কিছু হয় তবে
আমি ওমর বলছি মক্কার একটা মুনাফিকও আস্ত
শরীরে থাকবে না।“ এদিকে আবু বকর (রাযিঃ)
বললেন,
থাম ভাই চল নবীজির তালাস করি। দুই জনে মদিনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।
মরুভূমি পেরিয়ে পাহাড়ের এলাকাতে আসলেন। একটু দূরে দেখলেন এক রাখাল দাড়িয়ে আছে।
আবু বকর (রাযিঃ) ও ওমর ফারুক (রাযিঃ) রাখালকে জিজ্ঞেস করলেন,
তুমি কি মুহাম্মদ (সা.) কে দেখেছ?
রাখাল উত্তরে বলল
আমি মুহাম্মদ (সা.) কে চিনি না এবং আপনাদেরও চিনি না।
তবে ঐ পাহাড়ের উপরে একজন লোক ইয়া উম্মাতি, ইয়াউম্মাতি বলে কাঁদছেন।
আবু বকর (রাযিঃ) ও ওমর ফারুক (রাযিঃ)
বুঝতে বাকি ছিলনা ঐ লোক আর কেউ না দয়াল নবীজি হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
রাখাল আবার বলল লোকটির
সাথে সাথে আমার সব উঠ, ভেড়াগুলোও কাঁদতেছে আর খাওয়া বন্ধ করে দিছে।
আপনারা উনাকে নিয়ে যান তা না
হলে আমার সব উঠ, ভেড়াগুলো
কাঁদতে কাঁদতে মরে যাবে।
আবু বকর (রাযিঃ) ও ওমর ফারুক (রাযিঃ) পাহাড়ে গিয়ে দেখলেন দয়াল নবীজি
সেজদা-রত অবস্থায় ইয়া উম্মাতি, ইয়া উম্মাতি বলে কাঁদছেন।
নবীজির কষ্টে আবু বকর (রাযিঃ) বললেন ইয়া রসুলুল্লাহ আমি আবু বকর ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকে যত আমল করেছি সব আপনার উম্মাতকে দিয়ে দিলাম, আপনি দয়া করে
মাথা উঠান। নবীজি মাথা উঠায় না।
এবার ওমর ফারুক (রাযিঃ) বললেন
ইয়া রসুলুল্লাহ আমি ওমর যে আপনার মাথা
নিতে গিয়ে নিজের মাথা দিয়ে দিয়েছি সে আপনার উম্মাতের জন্য সব আমল দিয়ে দিলাম। নবীজি মাথা উঠায় না।
আবু বকর (রাযিঃ) বললেন ওমর কাজ হবে না
রসুলুল্লাহকে একমাত্র ফাতিমা শান্ত করতে পারবে।
তারা দুই জনে মদিনা দিকে ছুটছেন,
পথে হযরত আলী (রাযিঃ) এর সাথে দেখা। আবু বকর ও ওমর (রাযিঃ) বললেন
সামনে গিয়ে লাভ নেই,
রসুলুল্লাহকে শান্ত করতে ফাতিমাকে লাগবে। এবার তিন জনে ফাতিমার বাড়ির সামনে আসলেন আলী (রাযিঃ) ফাতিমাকে ডাক
দিলেন,
ফাতিমা বাইরে আসে স্বামীর চেহারা দেখে
বললেন, আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন,
তবে কি মক্কার মুনাফিকরা আমার আব্বাজানকে মেরে ফেলছে?
হযরত আলী (রাযিঃ) বললেন তুমি তাড়াতাড়ি চলো নবীজি ইয়া উম্মাতি, ইয়া উম্মাতি বলে কাঁদছেন, মাথা উঠাচ্ছেন না।
ফাতিমা দৌরে গেলেন। নবীজির কাছে গিয়ে
বলছেন আব্বাজান আপনি সফরে যাবার আগে এবং সফর থেকে ফিরে প্রথমে আমাকে দেখতেন,
আমার সাথে কথা বলতেন।
কিন্তু আজ তিন দিন হল আপনার কোন
খোঁজ নেই, আপনি কি আমাকে ভুলে গেছেন?
নবীজি তাও মাথা উঠায় না।
ফাতিমা (রাযিঃ) বললেন আব্বাজান আমি আপনার ফাতিমার সব নেকী আপনার
উম্মাতকে দিয়ে দিলাম। নবীজি মাথা উঠায় না।
নবীজির দুই পাশে হাসান, হুছাইন দাড়িয়ে
বলতেছেন নানাজান উঠেন, নানাজান উঠেন। নবীজি মাথা উঠায় না।
হঠাৎ ফাতিমা (রাযিঃ) বলে উঠলেন,
“আব্বাজান আপনি উঠেন আমি আপনার উম্মাতির জন্য আমি হাসান, হুছাইনকে কুরবানি করে দিলাম।“
আল্লাহ্ আকবার, আল্লাহ্ আকবার, আল্লাহ্ আকবার।
এবার নবীজি মাথা উঠালেন আর বললেন ফাতিমা তুমি কি দোয়া করলা আমার আল্লাহ্ তোমার দোয়া কবুল করে ফেলছেন।
নবী-রসূল, সাহাবিদের রক্ত ঝরানোর কারনেই সেই দ্বীন
আজ আপনার, আমার কাছে আসতে পেরেছে।
আসুন আল্লাহ্ হুকুমগুলো নবীর তরীকায় পালন করার চেষ্টা করি। আমিন,
বারসিসা ছিল বনী ঈসরাইলের একজন সুখ্যাত উপাসক, ধর্মযাজক,‘আবিদ’।
তার নিজের মন্দির ছিল আর সেখানে সে একাগ্রভাবে নিজেকে উপাসনায় নিয়োগ করত।
বনী ঈসরাইলের তিন জন পুরুষ জিহাদে যেতে চাচ্ছিল, তাদের একমাত্র বোনকে কোথায় রেখে যাবে বুঝতে পারছিল না।তারা সবাইকে জিজ্ঞেস করতে লাগল, ‘কোথায় আমরা আমাদের বোনকে রেখে যেতে পারি? তাকে তো আমরা একা ফেলে যেতে পারিনা। কোথায় তাকে রেখে যাওয়া যায়?’ তখন তারা তাদেরকে বলল, ‘তাকে রেখে যাওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হবে তাকে ঐ উপাসকের কাছে রেখে যাওয়া, সেই-ই সবচেয়ে ধার্মিক ব্যক্তি, আর সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য। তোমাদের বোনকে তার কাছে রেখে যাও,
সে তার খেয়াল রাখবে’। তারা আবিদের নিকট গেল। তাকে সব বর্ণনা করে বলল, ‘এই হল অবস্থা - আমরা জিহাদে যেতে চাই, আপনি কি কষ্ট করে আমাদের বোনকে দেখে রাখতে পারবেন?’ সে বলল, ‘আমি তোমাদের থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। আমার কাছ থেকে চলে যাও’। তখন শয়তান তাকে প্রলুব্ধ করল, ‘তুমি তাকে কার কাছে রেখে আসবে? তুমি যদি তার খেয়াল না রাখো তাহলে হয়ত কোন দুষ্ট লোক তার খেয়াল রাখবে, আর তারপর তো তুমি জানোই কী ঘটবে! তুমি কি করে এই ভাল কাজটা তোমার হাতছাড়া করে দিতে পার?’
দেখুন ! শয়তান তাকে ভাল কাজে উৎসাহিত করছে! তো সে তাদেরকে আবার ডেকে এনে বলল, ‘ঠিক আছে, আমি তার খেয়াল রাখব, কিন্তু সে আমার সাথে আমার মন্দিরে থাকতে পারবে না,
আমার আরেকটা বাড়ি আছে সে সেই ঘরে থাকবে’। সে মেয়েটিকে বলল, ‘তুমি ওখানে থাক, আমি আমার মন্দিরে থাকব’। তো মেয়েটা সেই বাড়িতে একটা ঘরে থাকত, আর সেই ধর্মযাজক তার জন্য প্রতিদিন খাবার নিয়ে এসে তার নিজের দরজার বাইরে রেখে দিত। সে মেয়েটির বাড়িতে পর্যন্ত যেত না, নিজের দরজার বাইরেই খাবার রেখে দিত আর মেয়েটিকে ঘর থেকে বের হয়ে এসে খাবার নিয়ে যেতে হত; সে মেয়েটির দিতে তাকিয়ে দেখতে পর্যন্ত ও চাইত না। তখন শয়তান আবার তার কাছে এসে বলল, ‘তুমি করছটা কি? তুমি কি জানো না মেয়েটা যখন তার ঘর থেকে বের হবে আর তোমার মন্দির পর্যন্ত আসবে লোকে তাকে দেখতেপাবে? তোমার উচিত তার দরজায় যেয়ে খাবারটা রেখে আসা।’ সে বলল,‘হ্যাঁ, আসলেই’।
শয়তান কিন্তু তার সাথে সামনা-সামনি কথা বলছেনা,তাকে ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা দিচ্ছে। ধর্মযাজক ‘আবিদ তাই এবার খাবার নিয়ে মেয়েটির দরজা পর্যন্ত রেখে আসতে শুরু করল। এভাবে কিছুদিন চলল, এরপর শয়তান তাকে বলল, ‘মেয়েটা এখনও তার দরজা খুলছে আর বাইরে বের হয়ে আসছে প্লেট নেয়ার জন্য, কেউ তাকে দেখে ফেলতেপারে, তোমার উচিত প্লেটটা তার ঘরে গিয়ে দিয়ে আসা’। শয়তান কিনাতাকে বলছে আরো ভাল কাজ করতে! তাই সে খাবারের প্লেটটা ঘরে রাখা আরম্ভ করল, সেখানে রেখেই সে সঙ্গে সঙ্গে চলে আসত। এভাবে আরো কিছুদিন পার হলো। আর ওদিকে জিহাদ চলতে থাকায় ভাইদেরফিরে আসতে বিলম্ব হচ্ছিল। শয়তান আবারো তার কাছে আসল, বলল, ‘আচ্ছা, তুমি তাকে এভাবে একা ছেড়ে দিবে,
কেউ তো নেই যে তার দিকে একটু খেয়াল রাখবে, একটু কথা বলবে।
সে যেন জেলখানায় আবদ্ধ হয়ে আছে, কথা বলার কেউ নেই। তুমি কেন ওর দায়িত্ব নিচ্ছ না? ওর সাথে একটু সামাজিকতা বজায় রেখে তো চলতে পার, যেয়ে একটু কথা বলো যাতে করে তুমি তার খোঁজখবর রাখতে পারো। তা না হলে দেখা যাবে সে বাইরে যেয়ে কোন পরপুরুষের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়বে’। তাই সে মেয়েটির সাথে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলতে শুরু করল,
মেয়েটা ঘরের মধ্য থেকেই কথা বলত; দুজনকেপ্রায় চিৎকার করে কথা বলতে হতো যেন তারা একজন অন্য জনকে শুনতে পায়।
শয়তান এবার তাকে বলল, ‘তুমি এরকম দূর থেকে একজন আরেকজনের উপর চিৎকার না করে কেন ব্যাপারটাকে নিজের জন্য আরেকটু সুবিধাজনক করে নিচ্ছনা? কেন তার সাথে একই ঘরে বসে কথা বলছ না?’ তো এবার সে মেয়েটার সাথে একই ঘরে বসে কিছুসময় ব্যয় করতে শুরু করল।
তারপর ধীরে ধীরে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা একসাথে কাটাতে লাগল,আর আস্তে আস্তে তারা পরস্পরের আরো কাছাকাছি আসতে লাগল। এক সময় এমন হল যখন সেই আবিদ,ধর্মযাজক,উপাসক সেই মেয়ের সাথে যিনায় (ব্যাভিচার) লিপ্ত হল। ফলে মেয়েটা অন্তসত্ত্বাহয়ে পড়ল।
কাহিনী এখানেই শেষ নয়।
মেয়েটি একটি সন্তানের জন্ম দিল। শয়তান ধর্মযাজকের কাছে এসে বলল, ‘একি করেছ তুমি! তুমি কি জানো যখন ওর ভাইরা ফিরে আসবে তখন কি হবে? তারা তোমাকে মেরে ফেলবে, এমনকি তুমি যদি এটাও বলো যে – “এটাআমার বাচ্চা না”,তারা তোমাকে বলবে যে “তোমার বাচ্চা না হলেও তুমি তার দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলে,
তাই এটা এখন তোমারই দায়ভার।
বাচ্চার বাবা কে আমরা তার পরোয়া করি না, তুমিই এর জন্য দায়ী”। সুতরাং এখনএকটাই উপায়,
তুমি বাচ্চাটাকে মেরে তাকে পুঁতে ফেল’। বারসিসাবলল, ‘এটা কি গোপন থাকবে আমি তার ছেলেকে মেরে ফেলার পরে?’
শয়তান বলল, ‘তোমার কি মনেহয় ও এটাকে গোপনে রাখবে? তুমি যদি এরকম ভাব, তাহলে তুমি মস্ত বড় বোকা’। সে জিজ্ঞেসকরল, ‘তাহলে আমি কি করব?’। শয়তান জবাব দিল, ‘তোমার ঐ মেয়েটাকেও মেরে ফেলা উচিত’।
তাই সে মেয়েটা কে আর বাচ্চাকে মেরে ফেলল, এরপর দুজনকে একই ঘরের নিচে কবর দিয়ে দিল।
ভাইয়েরা একসময় ফিরে আসল,
তারপর জানতে চাইল,‘আমাদের বোন কোথায়?’, সে উত্তরে বলল, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন, সেঅসুস্থ হয়ে পড়ে এরপর মারা যায়, তাকে ওখানে কবর দেয়া হয়েছে’ এই বলে সেমনগড়া একটা কবর দেখিয়ে দিল তাদেরকে। তারা বলে উঠল, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহিরাজি’উন’, তারা বোনের জন্য দু’আ করল, আর নিজেদের বাসায় ফিরে গেল।
রাতের বেলা, তিনজনের মাঝে এক ভাই একটা স্বপ্নদেখল, কে তার সেই স্বপ্নে এসেছিল?
শয়তান, সে তাকে বলল, ‘তুমি বারসিসা কে বিশ্বাস করো? তুমি কি তাকে বিশ্বাস করো? সে মিথ্যা বলেছে। সে তোমার বোনের সাথে ব্যাভিচার করেছে,তারপর তাকে আর তার ছেলেকে মেরে ফেলেছে। আর এই কথার প্রমাণ হল সে তোমাদেরকে যেখানে সে কবর দেখিয়েছে তোমাদের বোন সেখানে নেই,
আছে তার ঘরের পাথরের নিচে’।
তার ঘুম ভেঙ্গে গেল আর সে তার বাকি ভাইদেরকে স্বপ্নের কথা জানাল। তারা বলল, ‘আমরাও তো একই স্বপ্নই দেখেছি, তাহলে এটা নিশ্চয়ই সত্যি’। পরদিন তারা সেই মিথ্যা কবরটা খুড়ল কিন্তুকিছুই পেল না, এরপর তারা তাদের বোনের ঘরে যেয়ে মাটি সরাল তখন দেখতে পেল তার বোনের মৃতদেহসাথে একটা শিশু। তারা যেয়ে বারসিসাকে ধরল, ‘মিথ্যুক! এইসব করেছ তুমি?’ তারা তাকে ধরে টেনে হিঁচড়ে রাজার কাছে নিয়ে গেল। এমন সময় শয়তান আসল বারসিসার কাছে, এবারে কিন্তু সে মনের ওয়াসওয়াসা হিসেবে আসেনি, সে আসল মানুষের রূপ ধরে। তাকে বলল, ‘বারসিসা, তুমি কি জানো আমি কে? আমি শয়তান,
আমিই সে, যে তোমাকে এতো ঝামেলার মধ্যে ফেলেছি। আর আমিই সেএকজন, যে তোমাকে এখন এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারব। আমিই এসব ঘটনা ঘটিয়েছি আর আমারকাছেই আছে এসবের সমাধান। এখন তোমার উপর নির্ভর করে, তুমি যদি মরতে চাও তো ঠিক আছে।তুমি যদি চাও আমি তোমাকে রক্ষা করি, তাহলে আমি করতে পারি’। বারসিসাবলল, ‘দয়া করে আমাকে বাঁচাও’।
শয়তান বলল, “আমাকে সিজদাহ করো’। বারসিসা শয়তানের প্রতি সিজদাহ করল। কিন্তু শয়তান কি বলল? সে বলল, ‘তোমাকে অনেক ধন্যবাদ, তোমার সাথে দেখা হয়ে ভাল লাগল’এরপর সে তাকে আর কোনদিন দেখতে পেল না।
বারসিসা শয়তানের উদ্দেশ্যে সিজদাহ করল, আর এটাই ছিল তার জীবনে করা শেষ কাজ, কারণ এর কিছুক্ষণ পরেই তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। সুতরাং তার জীবনের শেষ কাজটা তাহলে ছিল- শয়তানকে সিজদাহ করা, সে ছিল সেই উপাসক যে কিনা ছিল সরল পথের উপর, কিন্তু যেহেতু সে সেপথ থেকে বাঁক নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যদিওখুব খুব ছোট্ট একটা বাঁক, প্রথমদিকে যেটাকে একেবারেই তুচ্ছ মনে হচ্ছিল, একটু সুবিধারনামে,
দ্বীনের মাসলাহার নামেই সে এগুলো করেছিল। সরলপথ থেকে তার বিচ্যুতির পরিমাপটা ছিল একদমই নগণ্য কিন্তু দেখুন তার শেষ পরিণতি!
ﻭَﺿَﺮَﺏَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻣَﺜَﻠًﺎ ﻟِّﻠَّﺬِﻳﻦَ ﺁﻣَﻨُﻮﺍ ﺍِﻣْﺮَﺃَﺓَ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥَ ﺇِﺫْ ﻗَﺎﻟَﺖْ ﺭَﺏِّ ﺍﺑْﻦِ ﻟِﻲ ﻋِﻨﺪَﻙَ ﺑَﻴْﺘًﺎ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺠَﻨَّﺔِ ﻭَﻧَﺠِّﻨِﻲ ﻣِﻦ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥَ ﻭَﻋَﻤَﻠِﻪِ ﻭَﻧَﺠِّﻨِﻲ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡِ ﺍﻟﻈَّﺎﻟِﻤِﻴﻦَ
মুমিনদের জন্যে ফেরাউন-পত্নীর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। সে বললঃ হে আমার পালনকর্তা! আপনার সন্নিকটে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন, আমাকে ফেরাউন ও তার দুস্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং আমাকে যালেম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন।–সুরা—আততাহরীম, আয়াত ১১।
মুসলিম নারীদের জন্য চির বরণীয় ও অনুসরণীয় এক ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন আছিয়া। সবুজ শ্যামলিমায় ঘেরা সুউচ্চ প্রাসাদের আলীশান মহলে তিনি বসবাস করতেন। সবুজ বৃক্ষের তলদেশে প্রাসাদের গা ঘেষে নীল দরিয়ার স্বচ্ছ পানি বয়ে চলত অবিরাম। এমন সব নেয়ামত ও আয়েশের মাঝেও আছিয়া ছলেন অতৃপ্ত, অস্থির। তাহলে কোন সে পিপাসায় তিনি কাতর ছিলেন? কিসের অভাবে ছটফট করতেন তিনি?
আল্লাহ পাকের কাছে আছিয়া কাতর দুয়া করেছিলেন—তিনি যেন তাঁর স্বামীর দুঙ্কর্ম থেকে তাঁকে হেফাজত করেন। তাঁর জুলুমবাজ কওমের হাত থেকে রেহাই দেন তাঁকে। তিনি আরো বলেছিলেন, তাঁর স্বামীর পৃষ্ঠপোষকতায় যে পাপের রাজ্য কায়েম হয়েছে, সেখান থেকে বের হতে তিনি উদগ্রীব হয়ে পড়েছেন। অথচ এক সময় তিনি স্বামীর খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। হৃদয়জুড়ে ছিল তাঁর ভালবাসা। তাহলে তাঁর এ অভিযোগের প্রেক্ষাপট কী?
ফেরাউন তাঁর সুউচ্চ রাজপ্রাসাদ, সুদূর বিস্তৃত সাম্রাজ্যে অপ্রতিদ্বন্ধি বাদশাহ ছিল। সে ছিল ভীষণ কঠোর প্রকৃতির ও পাষাণ দিল। নির্বিচারে প্রজাসাধারণের উপর সে জুলুম করত। অত্যাচারে জর্জরিত করত তাদের। ফেরাউন স্বেচ্ছাচারিতার চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। অত্যন্ত অহংকার ও গর্ব করে বেড়াত সে। বনী ইসরাঈল ছিল তাঁর অবৈধ অত্যাচারের নিশানা। তারা নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে অত্যন্ত কষ্টের ভেতর দিয়ে ফেরাউনি রাজ্যে জীবন যাপন করছিল । বিপদ মুসিবতে ধৈর্য ধরা ছাড়া তাদের কিছুই করার ছিল না।
একদিন রাজদুরবারের প্রধান জ্যোতিষী ফেরাউনের কাছে এসে বলল—বাদশাহ নামদার। অচিরেই বনী ইসরাঈলের মাঝে একজন সন্তান জম্ম নিবে। তাঁর হাতে আপনার সাম্রাজ্যের পতন অনিবার্য। জ্যোতিষীর এ সংবাদ বনী ইসরাঈলের উপর অত্যাচারের আগুনে ঘি ঢেলে দিল। ফেরাউনের পাষণ্ডতা উথলে উঠলো। জ্যোতিষীর এ অসহনীয় কথায় তাঁর উন্মত্ততা বেড়ে গেল কয়েকগুণ। নিজেকে একটু প্রবোধ দেয়ার জন্য, মনটাকে একটু সুস্থির করার জন্য বনী ইস্প্রাঈলের উপর জুলুমের মাত্রা বাড়িয়ে দিল। সে তাদের নবজাতক পুত্র সন্তানদের ধীরে ধীরে নৃশংসভাবে হত্যা করতে লাগল। তবে শুধু কন্যা সন্তানদের জীবিত রাখত। অবশেষে আল্লাহ পাক বনী ইসরাঈলের ভাগ্য লিখনে পরিবর্তন আনলেন। তাদের পর্যাপ্ত শক্তি ও ক্ষমতা দান করলেন। ফলে ফেরাউন যে বিভীষিকার আশংকা করত, তা স্বচক্ষে দেখতে বাধ্য হয় সে।
লোমহর্ষক এ ঘটনার শুরুটা খুবই অম্লমধুর । ফেরাউনের রাজপ্রাসাদের অনতিদূরে ছোট্ট এক ঝুপড়িতে ইউহানিব নাম্নী এক মহিলা বাস করতেন। তাঁর গর্ভধারণের সময় ঘনিয়ে এলে নিজগৃহের এক কোণায় তিনি আবদ্ধ হয়ে রইলেন। প্রসব বেদনা শুরু হলে তিনি মেয়েকে বললেন যাও, জলদি একজন ধাত্রী ডেকে নিয়ে আস। মেয়ে ধাত্রী ডেকে আনল। ইউহানিবের ঘরে একটি সুন্দর ফুটফুটে পুত্রসন্তান ভূমিষ্ট হল। তিনি ফেরাউনের নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতার কথা করে ভয় ও আতংকে শিউরে উঠলেন। নিজেকেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এই নিষ্পাপ ফুলের মত শিশুকে কি মেরে ফেলা হবে? ছেলের প্রতি ভালবাসায় তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে উঠলেন। সিংস্র ফেরাউনের হিংস্রহাত থেকে বাঁচতে একাধারে তিন মাস গৃহভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকলেন তিনি। এজন্য ইউহানিব প্রতিটি মুহূর্তেই চিন্তা ও আতংকের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত করতেন। নিজের প্রতি নয়, ছেলে মূসার প্রতি ভয় ও ভালবাসায় তিনি গভীর চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তবে আল্লাহ পাক তাঁর সহায় ছিলেন। তিনি তাঁকে নির্দেশ দিলেন, এ শিশুটির জন্য একটি কাঠের সিন্দুক তৈরি কর। তারপর তাঁকে সিন্দুকের ভেতর ভরে নীল দরিয়ায় ভাসিয়ে দাও। আর তোমার মেয়েকে সিন্দুকের অনুসরণ করে নীল নুদের পার দিয়ে চক্কর দিতে বল। এ ঐশী আদেশ পেয়ে মুসা জননীর চিত্ত প্রশান্ত হল। মন থেকে সব ডর—ভয় মুছে গিয়ে অনেকটা নিশ্চিন্ত হলেন তিনি। সুন্দর একটি সিন্দুক বানানো হল। ইউহানিব নয়নের মণি মুসাকে সেখানে রেখে দিয়ে মেয়েকে বললেন, সিন্দুকটি মাথায় করে নীল নদের ঘাটে নিয়ে যাও। চতুর মেয়ে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে কাজ সম্পন্ন করল। ইউহানিব সন্তান সমেত সিন্দুকটি নীল নুদে ভাসিয়ে দিলেন। প্রবাহমান নদীর ঢেউয়ের আঘাতে আঘাতে সিন্দুকটা নাচতে নাচতে এগিয়ে চলল। সন্তানকে আল্লাহর হাতে সঁপে দিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে মা জননী ঘরে ফিরলেন। মেয়েকে পাঠিয়ে দিলেন সিন্দুকের পেছনে পেছনে। নদীর ফস্রোতে ভাসতে ভাওতে সিন্দুকটি ফেরাউনের মর্মর নির্মিত সুদৃশ্য সিঁড়ির গোড়ায় এসে থামল। ফেরাউনের স্ত্রী, কন্যা, সেবিকারা এখানে বসেই নদীর শীতল হাওয়ায় গা জুড়াত। প্রাসাদের এক খিড়কি দিয়ে আছিয়া এ সিন্দুকটি দেখতে পেলেন। বাচ্ছাসহ সিন্দুকটি উপরে তুলে আনা হল। ফেরাউনের সিপাহী ও প্রহরীরা আশাপাশেই ছিল। তাদের সবার হাতেই শিশু হননের যাবতীয় অস্ত্র ও হাতিয়ার উন্মুখ হয়ে রয়েছে। তাদের কাজই ছিল, বনী ইসরাঈলের ঘরে কোন নবজাতকের সন্ধান পেলে তাঁকে বধ করে নীল নদে সেই লাশটা ভাসিয়ে দিবে কিংবা দূরের কোন মরু উপত্যকায় ফেলে আসবে। শিশুটিকে প্রথম দর্শনেই ফেরাউনের মনে একটি ভালবাসা জেগে উঠল। কিন্তু তাঁর আশ পাশের লোকেরা শিশুটিকে হত্যা কুরে ফেলতে তাঁকে নানাভাবে উত্তেজিত করতে লাগল। কেউ একজন বলেও ফেলল, মহারাজ! সিন্দুকে বাচ্ছা রেখে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া আসলে আপনার বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র। জ্যোতিষীর কথা অনুযায়ী হতে পারে এই বাচ্ছাটিই আপনার রাজ্য পতনের কারণ হবে। তাদের এই কথোপকথনের মাঝে আছিয়া এক কদম সামনে এসে বললেন,
ﻭَﻗَﺎﻟَﺖِ ﺍﻣْﺮَﺃَﺕُ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥَ ﻗُﺮَّﺕُ ﻋَﻴْﻦٍ ﻟِّﻲ ﻭَﻟَﻚَ ﻟَﺎ ﺗَﻘْﺘُﻠُﻮﻩُ ﻋَﺴَﻰ ﺃَﻥ ﻳَﻨﻔَﻌَﻨَﺎ ﺃَﻭْ ﻧَﺘَّﺨِﺬَﻩُ ﻭَﻟَﺪًﺍ ﻭَﻫُﻢْ ﻟَﺎ ﻳَﺸْﻌُﺮُﻭﻥَ
এ শিশু আমার ও তোমার নয়নমণি, তাকে হত্যা করো না। এ আমাদের উপকারে আসতে পারে অথবা আমরা তাকে পুত্র করে নিতে পারি। প্রকৃতপক্ষে পরিণাম সম্পর্কে তাদের কোন খবর ছিল না।–সুরা কাসাস, আয়াত ৯।
আছিয়া স্বামীর কাছে এ শিশুটির ব্যাপারে তাঁর সাধারণ হুকুম বলবৎ না করার জন্য উপর্যুপরি অনুরোধ করতে লাগ্লেন। প্রত্যাশা নিয়ে তিনি বললেন, হতে পারে এ শিশু বড় হয়ে আমার একান্ত বাধ্যগত হবে আর আমরা তাঁকে আমাদের সন্তানরূপে গ্রহণ করবো। এক পর্যায়ে ফেরাউন তাঁর কোথা মেনে নিল। রাজপ্রাসাদে মূসা তখন ফেরাউনের পুত্রবৎ হয়ে গেল। মানস সন্তানের প্রতি অগাধ ভালবাসায় আছিয়ার দিল টইটম্বুর। আনন্দের দোলায় তিনি দুলতে লাগলেন।
প্রাসাদের লোকেরা এ শিশুর জন্য একজন ধাত্রী খুঁজতে লাগল। হাজার হলেও এতো এখন রাজপুত্র। আর ফেরাউন তো শুধু বাদশাই নয়। প্রজাসাধারণের স্বকল্পিত প্রভুও সে। কাজেই চতুর্দিক থেকে ধাত্রীদের আগমন্ব প্রাসাদ ভরে উঠলো। ফেরাউন ও আছিয়া বাচ্ছার জন্য একজন যুৎসই ধাত্রীর জন্য প্রতীক্ষমান। কিন্তু রজোপ্রাসাদে আগত কোন মহিলার স্তনই মুখে নিচ্ছে না বাচ্চাটি। প্রধানমন্ত্রী হাসান তাঁর অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে ধ্রল চারদিকে। ইত্যবসরে মূসার সহোদরা বোন সামনে এগিয়ে এসে বলল আমি একজন ধাত্রীর সন্ধান দিতে পারি তোমাদের, আশা করা যায় এ বাচ্চা তাঁর দুধ পান করবে। বাচ্চাটির অবিরাম কান্না আমার মনে খুবকরুণ হয়ে বিঁধছে, তাই আমি তোমাদের সাহায্যে এগিয়ে এলাম। অন্যথায় এতে আমার কোন গরজ নেই। আছিয়া বললেন—জলদি গিয়ে তাঁকে নিয়ে আস, দেখছো না সে কেমন জোরে জোরে চিৎকার করছে। ক্ষুধার তাড়নায় মুখটা একেবারে পাংশু হয়ে গেছে ছেলেটির। মেয়েটি বলল আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না রাণী মা! আমি এক্ষুণি তাঁকে নিয়ে হাজির হচ্ছি।
মূসার বোন মারিয়াম দৌড়ে মায়ের কাছে গেল। মাকে বলল—আম্মা!সসুসংবাদ শুনুন। তাঁকে নিয়ে অবাক কাণ্ড ঘটে গেছে। মূসা আগত কোন মহিলার দুধই পান করছে না। সকলেই হতাশ হয়ে ফিরে গেছে। আমি তাদেরকে আপনার কথা বলে এসেছি। চলুন, চলুন জলদি চলুন।
ইউহানিব বলতে লাগলেন, আমার প্রচন্ড ভয় হচ্ছে, যদি তারা কোনভাবে বুঝে ফেলেয়ামি তাঁর মা, তাহলে কী হবে? কিন্তু আমার তো আর তর সইছে না। সেই কখন থেকে যে অবিরাম দুধ ঝরে পড়ছে।মারয়াম বলল, আম্মা! তাড়াতাড়ি চলুন, আমাদের অনেক দেরি হয়্ব যাচ্ছে। তারা উভয়ে রাজপ্রাসাদে রওয়ানা হলেন। সেখানে পৌঁছে দেখলেন মূসার কান্নার আওয়া উচ্ছে উঠে গেছে। আছিয়া তাঁকে কোলে তুলে হেলিয়ে দুলিয়ে প্রবোধ দিচ্ছে আর আদর করছে। কিন্তু কান্না থামছে না কিছুতেই। ইউহানিব তাঁর কাছে গিয়ে বললেন—রাণী মা! একে আমার কাছে দিন। আছিয়া মারয়ামকে লক্ষ্য করে বললেন—এই ক্লি সেই ধাত্রী? মারয়াম বলল জি হ্যাঁ—রাণী মা ! আপনি নিশ্চিন্তে বাচ্ছাকে তাঁর হাতে দিন। মনে হচ্ছে অবশ্যই সে এর দুধ পান করবে এবং কান্নাও বন্ধ করবে। ইউহানিব বাচ্ছাকে কোলে নিতেই সে নীরব হয়ে গেল। তাঁর চোখে ফুটে উঠল একটি খুশীর ঝিলিক। নিতান্ত শান্ত ভঙ্গিতে সে তাঁর দুধ পান করতে লাগল। পাশে দাঁড়ানো আছিয়ার খুশি আর ধরে না। প্রশান্তির একটি নিঃশ্বাস ছাড়লেন তিনি। কিন্তু চতুর ফেরাউনের মনের ভেতর একটি সন্দেহ দানা বেঁধে উঠল।
ফেরাউন তাঁকে জিজ্ঞেস করল আচ্ছা, বলতো কে তুমি? এ বাচ্ছা আর সব মহিলা থেকে মুখ থেকে মুখ ফিরিয়ে তোমার দিধই বা কেন মুখে নিল? ইউহানিব বললেন আসলে আমার পেশাই হচ্ছে দুধ পান করানো। আমার দুধ বড়ই সুমিষ্ট ও সুপেয়। সব ধরণের শিশুরাই আগ্রহ ভরে আমার দুধ পান করে। আর যে একবার আমার দুধ খায় সে অন্যদের দুধ মুখেই নিতে চায় না। ফেরাউন প্রধানমন্ত্রী হামানের দিকে ইশারা করে বলল এ মহিলার ভাতা দ্বিগুণ করে দাও আর তাঁর থাকার সুবন্দোবস্ত করে দাও। মূসা জননী এসব কথা শুনে এবং পুরিস্থিতির অনুকূলতা অনুভব করে অত্যন্ত খুশী হলেন। আল্লাহ পাকের ওয়াদা যে এত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে, তা তিনি ভাবতেই পারেননি।
আছিয়া তাঁকে বললেন—তুমি আমাদের এই প্রাসাদেই অবস্থান করো। আমি তোমার থাকার জন্য মনোরম একটি কামরা এবং উপযোগী খাবার—দাবারের ব্যবস্থা করে দিব। ইউহানিব বললেন—রাণী মা! আপনাকে অনেক অনেক শুকরিয়া। আমি চাচ্ছি এ বাচ্ছাকে আমার ঘরেই দুধ পান করাবো। সেখানকার পুঅরিবেশ খুব মনোরম। আর আমিও অবলীলায় সেখানে চলা—ফেরা করতে পারবো। এ বাচ্চারও বোধহয় কোন কষ্ট হবে না। আছিয়া বললেন—তোমার যা ইচ্ছে তা করো। মূসা জননী সন্তান নিয়ে ঘরে ফিরলেন। আল্লাহর শুকরিয়া ও কৃতজ্ঞতায় মুখর হয়ে উঠলেন তিনি। তিনিই তো তাঁর দিলে প্রশান্তি দিয়েছেন। মনের অস্থিরতা দূর করেছেন । আর আদরে দুলালকে তাঁর কোলেই ফিরিয়ে দিয়েছেন। খুব বেশি আওময় তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়নি। আদরে যত্নে মা ছেলেকে লালন পালন করতে লাগলেন। আছিয়ার যখনই বাচ্ছাটিকে দেখতে মন চাইত তিনি কাউকে পাঠিয়ে তাঁকে রাজপ্রাসাফে নিয়ে আসতেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে তৃপ্তি ভরে দেখতেন। একটু একটু করে মূসা হাঁটুতে ভর দিয়ে চলতে শিখলেন। কখনো কখনো দু—পায়ে ভর করে থাকতেন কিছুক্ষণ। ভাঙ্গা ভাঙ্গা করে অল্প—সল্প কথাও বলতেন মাঝে মধ্যে। যখনই আছিয়া মুসার সাথে একটু আমোদ—আহ্লাদ করতেন সে অত্যধিক আনন্দিত হয়ে উঠত। তবে আর কোন মহিলার সামনে সে এতটা আনন্দিত, এতটা অকৃত্রিম হত না।
কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের সিঁড়িতে পদার্পণ করলেন মূসা। আছিয়ার হৃদয় কন্দরে স্নেহের বৃক্ষটি এখন পত্র পল্লবে সুশোভিত। মানস পুত্র মুসাকে না দেখে থাকতে পারেনা তিনি। দুগ্ধপানের মেয়াদ শেষ হতেই মূসাকে রাজপ্রাসাদে দিয়ে গিয়েছিলেন ইউহানিব। জ্যোতিষীর কথা শুনে ফেরাউনের মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া নিষ্ঠুরতা তাঁর চোখের সামনে ছিল অহেতুক ঝামেলা এড়িয়ে চলাই সমীচীন মনে করেছেন তিনি। কিন্তু ফেরাউন জানত না, তাঁর গৃহেই আগ্নেয়গিরির এক ভয়ঙ্গকর লাভা বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য ধীরে ধীরে স্ফীত হচ্ছে।
খোদাকে পরিত্যাগ করে হামানসহ যারা ফেরাউনের সামনে সেজদায় লুটিয়ে পড়ত, আছিয়া সাদের প্রতি ভীষণ রুষ্ট ছিলেন। ভীতি ও ভক্তি নিয়ে তারা অসম্ভব সব উপাধিতে ভূষিত করত ফেরাউনকে। এগুলো দেখে আছিয়া সিমাহীন অস্থির হয়ে উঠতেন। তাঁর স্বামী যখন অহংকারে মদমত্ত হয়ে বলত আমিই তোমাদের ভমহান প্রভু; তিনি মনে মনে বলতেন, হায়রে কপাল! কোন শয়তানের পাল্লায় যে পড়েছি। এ অন্ধ অহমিকায় আর কতকাল সে ডুবে থাকবে। কিসের নেশায় সে এ মহা মুসিবতকে বরণ করে নিচ্ছে? ফেরাউনের স্বকল্পিত প্রভুত্বকে প্রচন্ড ভাবে ঘৃণা করতেন তিনি।
তাঁর ভক্তদের ভাঁড়ামিপূর্ণ কার্যকলাপ দেখে দূর থেকে শুধু আফসোস করে বলতেন—সবগুলো একেকটা উম্মাদ।
হৃদয়ের মনিকোঠায় মূসাকে ধারণ করতেন আছিয়া। প্রগাঢ় ভালবাসায় ভরিয়ে রাখতেন তাঁকে। হঠাৎ একদিন একটি লোক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে তাঁকে সংবাদ দিল মূসা জনৈক কিবতীকে হত্যা করে ফেলেছে। স্বগোষ্ঠীয় এক লোকের পক্ষাবলম্বন করেই এ কাজটা সে করেছে। আছিয়ার কন্যাদের সেবা করত যারা, তাদের একজনের স্বামী হিজকীল এসে তাঁকে জানালেন, শহরে দুজন লোক ঝগড়া করছিল। একজন মূসার স্বগোত্রীয় অপরজন কিবতী। কিবতী লোকটির বিরুদ্ধে অপরজন মূসার সহযোগিতা চাইলে মূসা তাঁকে প্রচন্ড ঘুষি মারে। আর এতেই লোকটির ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যায়। আছিয়া মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথাগুলো শুনছিলেন, হঠাৎ দূর থেকে ফেরাউনের ক্রোধান্বিত চিৎকারে তিনি সচকিত হয়ে উঠলেন। তাঁর বিকট আওয়াজে প্রাসাদ যেন কাঁপতে লাগল। কোথায় মূসা? এখনো কেন তাঁকে বন্দী করা হচ্ছে না। সিপাহী! ঐ কুলাঙ্গারকে এক্ষুণি আমার সামনে হাজির কর। আমি নিহত কিবতীর প্রতিশোধ নিতে চাই। এক্ষুণি। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় আছিয়া খুব শংকিত হয়ে উঠলেন। মূসার প্রতি উৎকন্ঠায় তাঁর প্রাণ ব্যাকুল হয়ে উঠল। অনন্ত অসীম পরমসত্তার কাছে মিনতির দু’হাত তুলে ধরলেন তিনি। ভক্তি গদগদ কণ্ঠে মহান মা;বুদের কাছে তিনি মুসার কল্যাণের জন্য প্রার্থনা শুরু করে দিলেন। ইলাহী! মূঊসাকে ফেরাউন আর তাঁর সাঙ্গপাঙ্গাদের অনিষ্ট থেকে তুমি হেফাজত করো। তাদের বর্বরতা থেকে তুমি নিরাপদ রাখো।
হিজকীল সেখান থেকে চলে গেলেন। নিজের স্বভাবশুদ্ধতার বদৌলতে তিনিও এক আল্লাহয় বিশ্বাস করতেন এবং দাম্ভিক ফেরাউনের প্রভুত্বকে প্রত্যাখ্যান করতেন। দ্রুত মূসার কাছে গিয়ে তাঁকে সর্তক করে দিয়ে তিনি বললেন—
ﻭَﺟَﺎﺀ ﺭَﺟُﻞٌ ﻣِّﻦْ ﺃَﻗْﺼَﻰ ﺍﻟْﻤَﺪِﻳﻨَﺔِ ﻳَﺴْﻌَﻰ ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻣُﻮﺳَﻰ ﺇِﻥَّ ﺍﻟْﻤَﻠَﺄَ ﻳَﺄْﺗَﻤِﺮُﻭﻥَ ﺑِﻚَ ﻟِﻴَﻘْﺘُﻠُﻮﻙَ ﻓَﺎﺧْﺮُﺝْ ﺇِﻧِّﻲ ﻟَﻚَ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻨَّﺎﺻِﺤِﻴﻦَ
হে মূসা, রাজ্যের পরিষদবর্গ তোমাকে হত্যা করার পরমর্শ করছে। অতএব, তুমি বের হয়ে যাও। আমি তোমার হিতাকাঙ্ক্ষী।–সুরা কাসাস, আয়াত ২০।
মূসা হিজকীলের কথা আমলে নিয়ে তখনই ফেরাউনবাহিনী থেকে আত্মরক্ষার জন্য একদিকে পালিয়ে গেলেন। হিজকীল প্রাসাদে ফিরে এসে দেখলেন আছিয়া মূসার জীবনাশংকায় কম্পমান। তিনি কিছুটা নিচু আওয়াজে বললেন—রাণী মা! আর ভয়ের কোন কারণ নেই। আমি মূসা পর্যন্ত সব কোথা পৌঁছে দিয়েছি এবং আসন্ন বিপদ সম্পর্কেও সর্তক করেছি ত্তাকে। শহর ছেড়ে দূরে কোথাও—যেখানে ফেরাউনের সিপাহীরা তাঁর নাগাল পাবে না। চলে যাওয়ার জন্য সুপারিশ করেছি আমি। আছিয়া বললেন—মহান প্রভুর শুকরিয়া। তিনি মূসাকে ফেরাউনের হিংস্রতা ও নিষ্ঠুরতা থেকে হেফাজত করুন। কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতি আমাকে কুড়ে কুড়ে খাবে। সে তো আমার সন্তান সমতুল্য। আমার কোলে পিঠেই সে বড় হয়ে উঠেছে। তাঁকে ছাড়া আমি থাকব কেমন করে? আচ্ছা একটু খোঁজ নিয়ে দেখ না সে কোথায় গেছে। হিজকীল বললেন, রাণী মা! আসুন! মহিমান্বিত স্রষ্টার কাছে আমরা তাঁর কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করি।
একে একে কয়েক বছর কেটে গেল। মূসা আর মিসরে ফিরে এলেন না। মূসাকে এক নজর দেখার অধীর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আছিয়া প্রায় নিরাশ হয়ে গেলেন। কারো কাছে মূসার কোনো সংবাদ নেই। সবাই যেন মূসাকে ভুলে গেল। সময় গড়িয়ে চলল। ফেরাউন ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের মুনে বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গেল যে, মূসা কস্মিনকালেও আর ফিরে আসবে না। তবে কয়েক বছর মূসা ঠিকই ফিরে এলেন। এবার তিনি আল্লাহ পাকের একজন নবী ও পয়গম্বর হয়ে এলেন। মূসা (আঃ) হকের দাওয়াত আর খোদায়ী শিক্ষার মহা সওগাত নিয়ে এলেন। আল্লাহ পাক তাঁকে ফেরাউনের কাছে এ দাওয়াত নিতে যেতে বলেছেন। যার অসহনীয় অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মানবেতর জীবন—যাপন করছে বনী ইসরাঈলের লোকগুলো। জীবনে ন্যূনতম অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে পরাধীনতার শৃংখলে তারা আষ্টে পৃষ্ঠে বাঁধা। তাদের মুক্তির পয়গাম নিয়েই মূসা (আঃ) এসেছেন। নীল দরিয়ার জোয়ার ভাটা আসে কিন্তু উদ্ধত ফেরাউনের নির্মম নিষ্ঠুরতায় কোন ভাটা নেই। মানুষকে মাবুদ বানানো দুরাচার কিবতীদের লাগামহীন উস্কানীতে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে ফেরাউন। এ পাগলা ঘোড়াকে নিবৃত্ত করার জন্যই ইনসাফেরচাবুক নিয়ে মূসা (আঃ) এলেন। কিন্তু অনাকাঙ্গিত সেই কিবতী হত্যা স্মৃতিটি তাঁর মনে একতি ভয় ধরিয়ে দিল। প্রভুর শরণাপন্ন হয়ে তিনি বললেন
“পরওয়ারদেগার! আমি তাদের এক ব্যক্তিকে (অনিচ্ছায়) হত্যা করেছিলাম। আমি আশংকা করছি, তারাও আমাকে হত্যা করে ফেলবে। আল্লাহ পাক তাঁকে আশ্বস্ত করলেন, এবার তিনি আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে বললেন,
সহযোগীদের সত্য বিনাশী ষড়যন্ত্র আমি বরদাশত করতে পারি।
আমার যাবতীয় কাজ আসান করে দিন। সব বাঁধা বিপত্তিকে নস্যাৎ করে দিয়ে দাওয়াতের পথকে সুগম করে দিন।
আমার মুখের জড়তা দূর করে দিন যেন মাধুর্যপূর্ণ ভাষায় হৃদয়গ্রাহী করে আমি তাদের সত্যের পথে ডাকতে পারি। এবং আমার দাওয়াতের মুগ্ধ হয়ে এর প্রতি তারা উৎসাহী হয়।
আর আমার পরিবারের একজনকে আমার সহযোগি বানিয়ে দিন, যে আমার মত একই চিন্তার অনুগামী হয়ে আমার সহযোগিতা করবে।
আমার ভাই হারুনের পৃষ্ঠপোষকতায় আমার শক্তি সুদৃঢ় করুন এবং তাঁকে আম,আর কাজে সহযোগী বানান।
আছিয়া এসবের কিছুই জানতেন না। ফেরাউনের দুর্দম শক্তির মোকাবেলায় মূসা (আঃ) কী হাতিয়ার ব্যবহার করবেন, কার থেকে সাহায্য নিবেন তাও তাঁর অজ্ঞাত ছিল। তিনি মূসা (আঃ) ও হারুন (আঃ) এর আগমন সংবাদ শুনে ভাবনায় পড়ে গেলেন যে, ফেরাউনের কাছে তারা বলবেটা কী? আর কিভাবেই বা বলবে? কাছাকাছি থাকার কারণে স্বামীর নিষ্ঠুর স্বভাব সম্পর্কে তিনি খুন ভালভাবেই ওয়াকিফহাল। এই ভাবনা ও দুর্ভাবনায় তিনি ডুবে ছিলেন হঠাৎ কানে আওয়াজ এল, মূসা (আঃ) রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করছেন। অল্পক্ষণ পরেই তিনি সবার সামনে এক মহাসত্যের পয়গাম তুলে ধরবেন। তাদের কথাবার্তা শোনার জন্য আছিয়া দরবারের একপার্শ্বে বেলকনিতে আসন গ্রহণ করলেন। যাতে গোটা দরবারীদের অবস্থান সহজেই তাঁর নজরে আসে।
আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নের জন্য মুসা (আঃ) অত্যন্ত অনাড়ম্বরভাবে রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করলেন। সঙ্গে সহোদর ভাই হারুন (আঃ) ও আছেন। তাদের প্রতি আল্লাহর আদেশ ছিল। তোমরা ফেরাউনের কাছে গিয়ে বলবে ‘আমরা তোমার প্রভুর প্রেরিত পয়গাম্বর। তোমার অত্যাচার ও অমানুষিক নির্যাতনের হাত থেকে বনী ইসরাঈলকে মুক্ত করার জন্যই আমরা এসেছি। পাশেই গ্যালারি থেকে আছিয়া মনোযোগ সহকারে দরবারের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ভাবগম্ভীর কণ্ঠে মূসা (আঃ) ফেরাউনকে বললেন—আমরা আল্লাহ পাকের প্রেরিত পয়গাম্বর।
ﻓَﺄْﺗِﻴَﺎﻩُ ﻓَﻘُﻮﻟَﺎ ﺇِﻧَّﺎ ﺭَﺳُﻮﻟَﺎ ﺭَﺑِّﻚَ ﻓَﺄَﺭْﺳِﻞْ ﻣَﻌَﻨَﺎ ﺑَﻨِﻲ ﺇِﺳْﺮَﺍﺋِﻴﻞَ ﻭَﻟَﺎ ﺗُﻌَﺬِّﺑْﻬُﻢْ ﻗَﺪْ ﺟِﺌْﻨَﺎﻙَ ﺑِﺂﻳَﺔٍ ﻣِّﻦ ﺭَّﺑِّﻚَ ﻭَﺍﻟﺴَّﻠَﺎﻡُ ﻋَﻠَﻰ ﻣَﻦِ ﺍﺗَّﺒَﻊَ ﺍﻟْﻬُﺪَﻯ
বনী ইসরাঈলকে আমাদের সাথে যেতে দাও। তাদ্রেকে অযথা নির্যাতন করো না।–সুরা ত্বহা, আয়াত ৪৭।
ফেরাউন কথাটিকে কোনই গুরুত্ব দিল না। উল্টো সে গোস্বা ভরে বলল মূসা! আজ তুমি আমাকে এ কথা বলছ? আমি কি তোমাকে লালন করিনি? বছুরের পর বছর আমার ঘরে খেয়ে পড়েই তুমি বড় হয়েছ। ব্যালকনি থেকে আছিয়া অত্যন্ত আআগ্রহভরে ধ্যানসহকারে মূসা (আঃ) এর কোথা শুনছিলেন। তিনি দেখলেন ফেরাউন ক্রোধান্বিত হয়ে উঠছে। এটা চরমে উঠতে হয়তো খুব বেশি সময় লাগবে না। কিন্তু মূসা (আঃ) নির্বিকার ভঙ্গিতে মুহূর্তেই এক সাংঘাতিক বাক্য নির্মাণ করলেন আরে! বাল্যকালে আমার লালন—পালনের অনুগ্রহের কথা বলে আমাকে তুমি খোটা দিচ্ছ? শুনে রাখ! এটাও ছিল তোমার বর্বরতা আর পাষণ্ডতার পরণতি। যদি তোমার পাশবিকতা সীমা ছাড়িয়ে না যেত তাহলে নিজ ঘরেই আমি সুখে শান্ততে প্রতিপালিত হতাম, এখানে আসার পরও তো আমার জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছিল। আল্লাহ পাকের সীমাহীন মেহেরবাণীই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। অন্যথায় তোমার অভিপ্রায় তো ছিল অন্য কিছু। তোমার প্প্রাসাদে আমার প্রতিপালিত হওয়াও কি বনী ইসরাঈলের উপর অমানবিক অত্যাচারের প্রমাণ বহন করে না?
এ কথা শুনে ফেরাউন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে বলতে লাগল—ইতোপূর্বে তুমি আরো অনেক কিছু করেছ। আমাদের নিরপরাধ একজন লোককে হত্যা পর্যন্ত করেছে। আর এখন আমাদের অবদানকে অস্বীকার করছ? মূশা (আঃ) বললেন—ঐ কাজটি তো একান্তই আমার অনিচ্ছায় সংঘটিত হয়েছে। পরে তোমাদের ভয়ে আমি দেশ ছাড়াও হয়েছিলাম। এখন তো রাব্বুল আলামীনের রহমত ও নেয়ামতে আমি অভিষিক্ত। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মহাসম্পদ তিনি আমাকে দান করেছেন। আমাকে তিনি তাঁর পয়গাম্বর বানিয়েছেন। অল্প সময় গম্ভীর থেকে কিছুটা অবজ্ঞার সুরে ফেরাউন বলল—তোমাদের রাব্বুল আলামীন আবার কে? জবাবে মূসা (আঃ) বললেন—যদি তুমি নিজের চারপাশের সৃষ্টিজগত নিয়ে একটু গভীর চিন্তা কর, পৃথিবীর গতি প্রকৃতি অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ কর, এমনকি নিজের জীবন ও এর সুশৃঙ্খল প্রবাহ নিয়ে, ভোগ বিলাসের সমূহ সম্ভাব নিয়ে সুষ্ঠুভাবে একাগ্রচিত্তে একটু ধ্যানমগ্ন হও তাহলে তুমি নিজেই উপলদ্ধি করতে পারবে রাব্বুল আলামীন হচ্ছেন আসমান—জমিন ও এতদুভয়ের মাঝে যা কিছু আছে সবার সৃষ্টিকর্তা ও প্রতিপালক।
এ জবাব শুনে ফেরাউনের ক্রোধ কয়েকগুণ বেড়ে গেল। তাঁর আওয়াজে ক্ষিপ্রতা এসে গেল। দরবারের কথাবার্তা শুনে আছিয়া নিজ কামরায় ফিরে এসে বলতে লাগলেন—মূসার উপর এবং যে দ্বীনের দাওয়াত তারা নিয়ে এসেছে আমি তাঁর উপর পূর্ণ ঈমান আনলাম। রাব্বুল আলামীনের সমীপে নিজেকে সর্বোতভাবে সমর্পণ করলাম। এ দিকে ফেরাউনের বিকট আওয়াজ দরবার ছাড়িয়ে বাইরে এসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। সে বলছে, তোমরা কি এর কথা শুনছ? এদের জিজ্ঞেস কর, কাকে তারা প্রভু মানে, তাদের রব কে? মূসা (আঃ) বললেন—যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্বপুরুষের প্রভু, তিনিই আমাদের প্রভু। নিখিল পৃথিবী ও এর মধ্যকার সবকিছুর যিনি স্রষ্টা তিনিই আমাদের রব। তোমাদের সুস্থ বিবেক থাকলে তোমরাও এটা বুঝতে পারবে।
ফেরাউন রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল, যদি আমি ভিন্ন অন্য কাউকে তোমরা মাবুদ মনে কর তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদের কঠিন শাস্তির সম্মুখীন করব। একান্ত ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে প্রশান্ত চিত্তে মূসা (আঃ) বললেন, যদি আমার দাবীর স্বপক্ষে সুস্পষত কোন দলীল কিংবা অলৌকিক কোন
প্রমাণ পেশ করতে পারি তাহলে কি আমার কথার সত্যায়ন তোমরা করবে? তাপরেও কি তোমাদের মনের অমূলক সন্দেহ—সংশয় দূর হবে না। ফেরাউন বলল, আচ্ছা তুমি যদি নিজ দাবীতে সত্যবাদী হয়ে থাক তাহলে আমাদেরকে কোন মুজিযা দেখাও।
আছিয়া আবার আগের জায়গায় ফিরে এসেছেন। এবার তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে ভাবতে লাগলেন—মূসা কি কোন জাদুকর? নাকি সত্যিই সে একজন মুজিজাধারী যে,তাঁর স্বেচ্ছাচারী স্বামীর অহংকার ও দম্ভকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারবে। তিনি মনে মনে বলতে লাগলেন, মূসা! তুমি যদি জাদুকর হয়ে থাক তাহলে কস্মিনকালেও বিজয়ের নাগাল পাবে না তুমি। এরাই বিজয়ী হবে। এদের ঔদ্ধত্য বেড়ে যাবে আরো কয়েকগুণ। তিনি নিজেই আবার এ ধারণা প্রত্যাখ্যান করে বললেন—এমন তো নাও হতে পারে! সর্বোপরি তিনি নিরাশ ছিলেন না। আছিয়ার ভাবতন্ময়তা কাটতে না কাটতেই তিনি দেখতে পেলেন মূসা (আঃ) তাঁর হাতের লাঠিটি বৃত্তাকারে হাওয়ায় ভাসিয়ে জমিনে ছেড়ে দিলেন। কোন আওয়াজ হল না ঠিকই কিন্তু বিশালকায় এক অজগরে পরিণত হল লাঠিটি। প্রকান্ড মাথাটি উঁচুতে তুলে বিষাক্ত দাঁতগুলো বের করে সে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। ফেরাউন ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। সাপটি এমনভাবে ফেরাউনের দিকে এগুতে লাগল যেন, এক্ষুণি তাঁকে গিলে খাবে। ফেরাউন আত্মসংবরণ করে বলল—মূসা! তোমার সামর্থ কি এটুকুই। নাকি আরো কোন ভেল্কি তোমার ভান্ডারে আছে? মূসা (আঃ) নিজের ডানহাত বাম বগলের নিচে থেকে বের করে প্রলম্বিত করে মেলে ধরলেন। অপরূপ শুভ্র জ্যোতির বিচ্ছুরণ শুরু হল সেখান থেকে। রশ্মির তীব্রতায় সকলের চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার উপক্রম হল। গোটা দরবার আলোকিত হয়ে সুদূর দিগন্ত পর্যন্ত সে আলো ছড়িয়ে পড়ল।
এসব কল্পনাতীত বাস্তবতা চাক্ষুষ দেখতে পেয়ে আছিয়া বলতে লাগলেন নিশ্চয় আল্লাহ পাক মুসাকে সহায়তা করবেন। তাঁকে বিজয়ী আর ফেরাউনকে পরাজিত করবেন। কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে গিয়েছিল তাঁর হৃৎপিণ্ডে। তবুও তিনি আশান্বিত হয়ে উঠলেন; হয়তো এবার তাঁর স্বামীর মনে ভীতির সঞ্চার হয়ে মূসা (আঃ) এর দাওয়াতের সামনে মাথানত করবে সে। নিজের জুলুম—নির্যাতনের ঘৃণ্য পথ থেকে ফিরে আসবে। আছিয়া তাঁর স্বামীর অজ্ঞতা আর বর্বরতাকে ভীষণ অপছন্দ করতেন, ষন্ডামার্কা মন্ত্রীদের প্ররোচনায় তাঁর নিষ্ঠুরতার মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যেত। আছিয়া তখন খুবই মর্মাহত হয়ে পড়তেন। কৃত্রিম প্রভুত্বের অন্ধ—অহমিকার ফেরাউন মাঝে মাঝে তুলকালাম অকান্ড ঘটিয়ে ফেলত। আর তাঁর নির্মমতার যুপকাষ্ঠের বলি হত বেচারা বনী ইসরাঈল। সব কিছুর পরও আছিয়া এবার আশান্বিত হয়ে উঠলেন।
কিন্তু তাঁর আশার ব্যর্থ হতে খুব বেশী সময় লাগল না। ফেরাউন তাঁর সভাসদকে সম্বোধন করে বলল—তোমরা জেনে রাখ, মূসা ও তাঁর ভাই হচ্ছে আস্ত জাদুকর। জাদু বলে তারা তোমাদেরকে তোমাদের ভীখন্ড থেকে বের করে নিতে চায়। তোমাদের করণীয় সম্পর্কে তোমরাই এবার সিদ্ধান্ত নাও। জনৈক মন্ত্রী পরামর্শ দিল বাদশাহ সালামত! মূসা ও তাঁর ভাইয়ের যাদুর যথোচিত জবাব দেয়া দরকার। আপনি সমগ্র মিসরে আপনার প্রতিনিধি পাঠিয়ে দিন। তারা দেশের সব অভিজ্ঞ জাদুকরদের আপনার দরবারে এনে উপস্থিত করবে। তারাই মূসাকে সমুচিত শিক্ষা দিবে। পরামর্শটি ফেরাউনের খুবই মনঃপূত হল। সে দেশের চতুর্দিকে থেকে জাদুকরদের একত্রিত করায় ব্যস্ত হয়ে উঠল। আছিয়া জাদুকরদের তেলেসমাতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতেন। কাজেই মূসা (আঃ) কে নিয়ে তিনি মহাভাবনায় ডুবে গেলেন। সেই যে, ফেরাউনকে সম্বোধন করে তিনি বলেছিলেন,
ﻓَﺄْﺗِﻴَﺎﻩُ ﻓَﻘُﻮﻟَﺎ ﺇِﻧَّﺎ ﺭَﺳُﻮﻟَﺎ ﺭَﺑِّﻚَ ﻓَﺄَﺭْﺳِﻞْ ﻣَﻌَﻨَﺎ ﺑَﻨِﻲ ﺇِﺳْﺮَﺍﺋِﻴﻞَ ﻭَﻟَﺎ ﺗُﻌَﺬِّﺑْﻬُﻢْ ﻗَﺪْ ﺟِﺌْﻨَﺎﻙَ ﺑِﺂﻳَﺔٍ ﻣِّﻦ ﺭَّﺑِّﻚَ ﻭَﺍﻟﺴَّﻠَﺎﻡُ ﻋَﻠَﻰ ﻣَﻦِ ﺍﺗَّﺒَﻊَ ﺍﻟْﻬُﺪَﻯ
আমরা উভয়েই তোমার পালনকর্তার প্রেরিত রসূল, অতএব আমাদের সাথে বনী ইসরাঈলকে যেতে দাও এবং তাদেরকে নিপীড়ন করো না। আমরা তোমার পালনকর্তার কাছ থেকে নিদর্শন নিয়ে তোমার কাছে আগমন করেছি। এবং যে সৎপথ অনুসরণ করে, তার প্রতি শান্তি।–সুরা ত্ব-হা, আয়াত ৪৭।
আছিয়া তাদের নিম্মোক্ত বক্তব্যটি নিয়েও বিস্তর ভাবতে থাকলেন—
ﺇِﻧَّﺎ ﻗَﺪْ ﺃُﻭﺣِﻲَ ﺇِﻟَﻴْﻨَﺎ ﺃَﻥَّ ﺍﻟْﻌَﺬَﺍﺏَ ﻋَﻠَﻰ ﻣَﻦ ﻛَﺬَّﺏَ ﻭَﺗَﻮَﻟَّﻰ
আমাদের এ মর্মেও ওহী পাঠানো হয়েছে যে, যারা মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং সঠিক দ্বীন থেকে বিমুখ হয়ে যায় তাদের উপর আল্লাহর আজাব অবধারিত ।–সুরা ত্ব-হা, আয়াত ৪৮।
এসব কথাবার্তা নিয়ে গভীর চিন্তা—ভাবনা করে আছিয়া মূসা (আঃ) এর অকপট উপস্থাপন ও সাবলীল বর্ণনাভঙ্গিতে বেশ চমৎকৃত হলেন। কত ছোট্ট অথচ পূর্ণাঙ্গভাবে তিনি মহান প্রভুর গুণাবলীর পরিচয় তুলে ধরে বলেছিলেন—
ﻗَﺎﻝَ ﺭَﺑُّﻨَﺎ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺃَﻋْﻄَﻰ ﻛُﻞَّ ﺷَﻲْﺀٍ ﺧَﻠْﻘَﻪُ ﺛُﻢَّ ﻫَﺪَﻯ
আমাদের পালনকর্তা তিনি, যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার যোগ্য আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর পথপ্রদর্শন করেছেন।–সুরা ত্ব-হা, আয়াত ৫০।
আছিয়া মূসা (আঃ) এর প্রশকৃত সব কিছুর উপর ঈমান এনে মনে মনে ফেরাউনকে বললেন—মূসার সাথে বিতর্কে তুমি হেরে গেছ। বিশেষ করে যখন তুমি মূসাকে বলেছিলে,
ﻗَﺎﻝَ ﻓَﻤَﺎ ﺑَﺎﻝُ ﺍﻟْﻘُﺮُﻭﻥِ ﺍﻟْﺄُﻭﻟَﻰ
তাহলে অতীত যুগের লোকদের অবস্থা কি? আর তৎক্ষণাৎ মূসা এর যুৎসই উত্তর দিয়ে বলেছিল,
ﻗَﺎﻝَ ﻋِﻠْﻤُﻬَﺎ ﻋِﻨﺪَ ﺭَﺑِّﻲ ﻓِﻲ ﻛِﺘَﺎﺏٍ ﻟَّﺎ ﻳَﻀِﻞُّ ﺭَﺑِّﻲ ﻭَﻟَﺎ ﻳَﻨﺴَﻰ
ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺟَﻌَﻞَ ﻟَﻜُﻢُ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽَ ﻣَﻬْﺪًﺍ ﻭَﺳَﻠَﻚَ ﻟَﻜُﻢْ ﻓِﻴﻬَﺎ ﺳُﺒُﻠًﺎ ﻭَﺃَﻧﺰَﻝَ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﺀ ﻣَﺎﺀ ﻓَﺄَﺧْﺮَﺟْﻨَﺎ ﺑِﻪِ ﺃَﺯْﻭَﺍﺟًﺎ ﻣِّﻦ ﻧَّﺒَﺎﺕٍ ﺷَﺘَّﻰ
ﻛُﻠُﻮﺍ ﻭَﺍﺭْﻋَﻮْﺍ ﺃَﻧْﻌَﺎﻣَﻜُﻢْ ﺇِﻥَّ ﻓِﻲ ﺫَﻟِﻚَ ﻟَﺂﻳَﺎﺕٍ ﻟِّﺄُﻭْﻟِﻲ ﺍﻟﻨُّﻬَﻰ
তাদের খবর আমার পালনকর্তার কাছে লিখিত আছে। আমার পালনকর্তা ভ্রান্ত হন না এং বিস্মৃতও হন না।
তিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে শয্যা করেছেন এবং তাতে চলার পথ করেছেন, আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেছেন এবং তা দ্বারা আমি বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি।
তোমরা আহার কর এবং তোমাদের চতুস্পদ জন্তু চরাও। নিশ্চয় এতে বিবেক বানদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে।–সুরা—ত্ব-হা, আয়াত ৫২—৫৪।
গভীর ভাবনায় সীমানা পেরিয়ে ঈমানের ভূখন্ডে ঢুকে পড়লেন আছিয়া। নারীদের মাঝে তিনিই সর্ব প্রথম মূসা (আঃ) এর উপর ঈমান আনেন। নিজের এ আবেগ ও অনুভূতি তিনি হিজকীলের স্ত্রীর (এ মহিলা তাঁর সেবিকা ছিলেন–) সামনে তুলে ধরলেন। হিজকীল ইতিপূর্বেই ঈমান এনেছিলেন কিন্তু ফেরাউনের ভয়ে তিনি ঈমান গোপন রেখেছিলেন হঠাৎ ফেরাউনের চিৎকারের বিকট আওয়াজ শোনা গেল। দরবারের বিশাল পরিসর পেরিয়ে বাহিরের প্রশস্ত আঙ্গিনাজুড়ে সে আওয়াজ ছড়িয়ে পড়েছে। আত্মম্ভরিতার সুরে সে বলছে—কালই মূসা তাঁর জাদুর চূড়ান্ত পরিণাম দেখতে পাবে। তাঁর জাদুর ক্ষমতা চিরতরে নস্যাৎ করে দেয়া হবে কাল।
পরের দিন শহরের সকল লোক ফেরাউনের জাদুকরদের দেখার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে সমবেত হল। জাদুকররা তাদের ঐন্দ্রজালিক খেল দেখাতে শুরু করল। হাতের রশিগুলোকে তারা জাদুবলে চলন্ত সাপে পরিণত করল। এ দেখে ফেরাউন ও তাঁর সঙ্গিরাও তো খুশিতে আটখানা। এ দিকে মূসা (আঃ) এর কপালে একটি চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেল। আমার লাঠিও যদি সাপ হয় তাহলে লোকেরা জাদু ও মুজিজার পার্থক্য করবে কিভাবে। সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহ পাক সান্ত্বনা দিয়ে নিশ্চিন্ত করলেন। ও দিকে আছিয়া জাদুকরদের অভিনব কীর্তি দেখে ভয়ে এতটুকন হয়ে গেলেন। দুশ্চিন্তায় কালো হয়ে গেল তাঁর চেহারা। এতক্ষণে মূসা (আঃ) তাঁর হাতে লাঠি জমীনে ছেড়ে দিয়েছেন। মুহূর্তেই এক প্রকান্ড সাপ হয়ে তা নড়েচড়ে উঠল। জাদুকরদের সাপের বিপরীত পার্শ্বে দাঁড়িয়ে এগিয়ে প্রতিটি সাপকেই গিলে খেতে লাগল। সামান্য সময়ের ব্যবধানে গোটা ময়দান খালি হয়ে গেল। এ অভাবিত দৃশ্য দেখে আছিয়া তো আনন্দে আত্মহারা প্রায়। অজ্ঞাতেই ভেতর থেকে কৃতজ্ঞতার আওয়াজ বেরিয়ে এল। আরেকটু হলেই সে আওয়াজ সকলের কানে চলে যেত। কিন্তু নিজেকে সংবরণ করে তিনি শুধু বললেন—আলহামদুলিল্লাহ! অবশেষে মূশাকেই তিনি বিজয়ী করলেন। অল্প কিছুক্ষণ পরেই তাঁর খুশির জোয়ার আর বাঁধ মানল না। যখন তিনি দেখলেন, পরাজিত জাদুকররা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে মূসা (আঃ) এরপ্রতি ঈমানের প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে আল্লাহর সমীপে সেজদায় লুটিয়ে পড়েছে। পাষন্ড ফেরাউন তাদের অমানুষিক শাস্তি দিয়ে চোখের সামনে নির্মমভাবে হত্যা করে ফেলল। কিন্তু তারা সফলকাম। কিয়ামতের দিন অবশ্যই আল্লাহ পাক তাদের মহা পুরস্কারে ভূষিত করবেন।
পরাজয়ের চরম গ্লানি মাথায় নিয়ে নিদারুণ লাঞ্ছিত ও অপদস্ত হয়ে ফেরাউন প্রাসাদে ফিরল। আছিয়াও ফিরে এলেন প্রাসাদে। স্বামীর সাথে কোন কথা হল না তাঁর। কারণ ঘটে যাওয়া কোন কিছুই তাঁর অগোচরে ছিল না। নিজের আলীশান সিংহাসনে বসে ভরা মজলিসে দিশেহারা ফেরাউন গম্ভীর হয়ে বলতে লাগল,
ﻭَﻗَﺎﻝَ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥُ ﺫَﺭُﻭﻧِﻲ ﺃَﻗْﺘُﻞْ ﻣُﻮﺳَﻰ ﻭَﻟْﻴَﺪْﻉُ ﺭَﺑَّﻪُ ﺇِﻧِّﻲ ﺃَﺧَﺎﻑُ ﺃَﻥ ﻳُﺒَﺪِّﻝَ ﺩِﻳﻨَﻜُﻢْ ﺃَﻭْ ﺃَﻥ ﻳُﻈْﻬِﺮَ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﺍﻟْﻔَﺴَﺎﺩَ
তোমরা আমাকে ছাড়, মূসাকে হত্যা করতে দাও, ডাকুক সে তার পালনকর্তাকে! আমি আশংকা করি যে, সে তোমাদের ধর্ম পরিবর্তন করে দেবে অথবা সে দেশময় বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।–সুরা মুমিন, আয়াত ২৬।
আছিয়া দূর থেকে দেখতে পেলেন ভরা মজলিস থেকে এক লোক উঠে দাঁড়িয়ে এর প্রতিবাদ করছেন, ভাল করে তাকিয়ে দেখলেন তিনি হিজকীল। ফেরাউনের নিষ্ঠুর চরিত্রের কথা চিন্তা করে মনে মনে তিনি বললেন—লোকটি এক্লহানে এভাবে না বললেই হয়তো ভাল করতো। হিজকীল তাঁর ভরাট গলায় বলতে লাগলেন—
ﻭَﻗَﺎﻝَ ﺭَﺟُﻞٌ ﻣُّﺆْﻣِﻦٌ ﻣِّﻦْ ﺁﻝِ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥَ ﻳَﻜْﺘُﻢُ ﺇِﻳﻤَﺎﻧَﻪُ ﺃَﺗَﻘْﺘُﻠُﻮﻥَ ﺭَﺟُﻠًﺎ ﺃَﻥ ﻳَﻘُﻮﻝَ ﺭَﺑِّﻲَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻭَﻗَﺪْ ﺟَﺎﺀﻛُﻢ ﺑِﺎﻟْﺒَﻴِّﻨَﺎﺕِ ﻣِﻦ ﺭَّﺑِّﻜُﻢْ ﻭَﺇِﻥ ﻳَﻚُ ﻛَﺎﺫِﺑًﺎ ﻓَﻌَﻠَﻴْﻪِ ﻛَﺬِﺑُﻪُ ﻭَﺇِﻥ ﻳَﻚُ ﺻَﺎﺩِﻗًﺎ ﻳُﺼِﺒْﻜُﻢ ﺑَﻌْﺾُ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﻳَﻌِﺪُﻛُﻢْ ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻟَﺎ ﻳَﻬْﺪِﻱ ﻣَﻦْ ﻫُﻮَ ﻣُﺴْﺮِﻑٌ ﻛَﺬَّﺍﺏٌ
ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﻟَﻜُﻢُ ﺍﻟْﻤُﻠْﻚُ ﺍﻟْﻴَﻮْﻡَ ﻇَﺎﻫِﺮِﻳﻦَ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﻓَﻤَﻦ ﻳَﻨﺼُﺮُﻧَﺎ ﻣِﻦ ﺑَﺄْﺱِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺇِﻥْ ﺟَﺎﺀﻧَﺎ ﻗَﺎﻝَ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥُ ﻣَﺎ ﺃُﺭِﻳﻜُﻢْ ﺇِﻟَّﺎ ﻣَﺎ ﺃَﺭَﻯ ﻭَﻣَﺎ ﺃَﻫْﺪِﻳﻜُﻢْ ﺇِﻟَّﺎ ﺳَﺒِﻴﻞَ ﺍﻟﺮَّﺷَﺎﺩِ
তোমরা কি একজনকে এজন্যে হত্যা করবে যে, সে বলে, আমার পালনকর্তা আল্লাহ, অথচ সে তোমাদের পালনকর্তার নিকট থেকে স্পষ্ট প্রমাণসহ তোমাদের নিকট আগমন করেছে? যদি সে মিথ্যাবাদী হয়, তবে তার মিথ্যাবাদিতা তার উপরই চাপবে, আর যদি সে সত্যবাদী হয়, তবে সে যে শাস্তির কথা বলছে, তার কিছু না কিছু তোমাদের উপর পড়বেই। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালংঘনকারী, মিথ্যাবাদীকে পথ প্রদর্শন করেন না।
হে আমার কওম, আজ এদেশে তোমাদেরই রাজত্ব, দেশময় তোমরাই বিচরণ করছ; কিন্তু আমাদের আল্লাহর শাস্তি এসে গেলে কে আমাদেরকে সাহায্য করবে? –সুরা—মুমিন, আয়াত ২৮—২৯।
হিজকীলের কথা শুনে ফেরাউন রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল। পেরেশান হয়ে সে ভাবতে লাগল—আমার সামনে এভাবে কথা বলার দুঃসাহস সে পেল কোথায়? কতটা অবলীলায় সে মূসার পক্ষ সমর্থন করে তাঁকে আমার উপর প্রাধান্য দিচ্ছে। প্রকাশ্যে জনসম্মুখে মূসার সাথে একাত্মতার ঘোষণা দিতে তাঁর বুকটা একটুও কাঁপল না? এটা কিভাবে সম্ভব হল? অথচ আমিই তো তাঁর প্রভু ও মালিক। হিজকীল কিন্তু তখনো থেমে নেই। এক নাগাড়ে তিনি বলেই চলেছেন। সকল সভাসদকে উপদেশমূলক পরামর্শ দিয়ে তিনি বলতে লাগলেন—
ﻭَﻗَﺎﻝَ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺁﻣَﻦَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺇِﻧِّﻲ ﺃَﺧَﺎﻑُ ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢ ﻣِّﺜْﻞَ ﻳَﻮْﻡِ ﺍﻟْﺄَﺣْﺰَﺍﺏِ
ﻣِﺜْﻞَ ﺩَﺃْﺏِ ﻗَﻮْﻡِ ﻧُﻮﺡٍ ﻭَﻋَﺎﺩٍ ﻭَﺛَﻤُﻮﺩَ ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻣِﻦ ﺑَﻌْﺪِﻫِﻢْ ﻭَﻣَﺎ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻳُﺮِﻳﺪُ ﻇُﻠْﻤًﺎ ﻟِّﻠْﻌِﺒَﺎﺩِ
ﻭَﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺇِﻧِّﻲ ﺃَﺧَﺎﻑُ ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢْ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟﺘَّﻨَﺎﺩِ
ﻳَﻮْﻡَ ﺗُﻮَﻟُّﻮﻥَ ﻣُﺪْﺑِﺮِﻳﻦَ ﻣَﺎ ﻟَﻜُﻢ ﻣِّﻦَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻣِﻦْ ﻋَﺎﺻِﻢٍ ﻭَﻣَﻦ ﻳُﻀْﻠِﻞِ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻓَﻤَﺎ ﻟَﻪُ ﻣِﻦْ ﻫَﺎﺩٍ
হে আমার কওম, আমি তোমাদের জন্যে পূর্ববর্তী সম্প্রদায়সমূহের মতই বিপদসঙ্কুল দিনের আশংকা করি।
যেমন, কওমে নূহ, আদ, সামুদ ও তাদের পরবর্তীদের অবস্থা হয়েছিল। আল্লাহ বান্দাদের প্রতি কোন যুলুম করার ইচ্ছা করেন না।
হে আমার কওম, আমি তোমাদের জন্যে প্রচন্ড হাঁক-ডাকের দিনের আশংকা করি।
যেদিন তোমরা পেছনে ফিরে পলায়ন করবে; কিন্তু আল্লাহ থেকে তোমাদেরকে রক্ষাকারী কেউ থাকবে না। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার কোন পথপ্রদর্শক নেই।–সুরা—মুমিন, আয়াত ৩০—৩৩।
আছিয়া হিজকীলের কথাগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন এবং তাঁকে নিয়ে প্রবল উৎকণ্ঠায়ও ভোগছিলেন। হয়তো এখনি সে ফেরাউনের রোষানলে দগ্ধ হয় কিনা? যা ভাবনা তাই। ফেরাউন অনতিবিলম্বে হিজকীলকে বন্দী করে হত্যা করে ফেলার নির্দেশ জারী করল। কেননা ফেরাউনের স্বগোত্র কিংবা সভাসদদের কেউই আজ পর্যন্ত এমন দুঃসাহস কখনো দেখাতে পারেনি। যে ফেরাউনের জন্য এ দুঃসাহস সে ফেরাউনের সামান্য পরিবর্তনও হল না। উল্টো তাঁর হিংস্রতা ও শয়তানী বেড়ে গেল কয়েকগুণ। হিজকীল কিন্তু সহজে ধরা দিলেন না। পালিয়ে আত্মগোপন করলেন তিনি; বরং বলা উচিৎ, আল্লাহ পাকই তাঁকে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করলেন। কারণ তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ ও সত্যানুরাগী একজন মানুষ। মানুষকে কল্যাণের পথ দেখাতে গিয়ে কখনোই কারো নন্দা ও ভর্ৎসনার পরোয়া করতেন না।
ফেরাউন নিজের খাস কামরায় বসে মূসা (আঃ) সম্পর্কে সীমাহীন উদ্বেগ নিয়ে আছিয়ার সাথে আলোচনায় প্রবৃত্ত হল। বলতে লাগল—এই মূসাকে আমরা আদর যত্ন করে প্রতিপালন করলাম। আর সে কি না আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা উঁচিয়ে ধরছে। কিসের এক নতুন ধর্মের দাওয়াত দিচ্ছে মানুষকে। দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পুষেছি আমরা। একথা বলে জ্যোতিষীর সেই কথাকে স্মরণ করিয়ে দিল সে। অচিরেই বনী ইসরাঈলের ঘরে এক সন্তান জম্ম নিবে যে আপনার রাজত্বের পতন ঘন্টা বাজাবে। সে লক্ষ্য করল আছিয়া এই ভাবনানুভূতি ও আবেগকে মোটেও গুরুত্ব দিচ্ছে না। তেমন একটি মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথাগুলো শুনছে না। ফেরাউন চিৎকার করে বলল মূসাকে নিয়ে আমি দুশ্চিন্তায় পাথর হয়ে যাচ্ছি আর আমাকে সহানুভূতি জানানো তো দূরে থাক আমার কথার সামান্য গুরুত্ব্বও তুমি দিচ্ছ না। তুমি কি ভুলে গেছ যে, তুমি আমার স্ত্রী? আছিয়া নিজের পথ ধরে এগুলেন। পাল্টা প্রশ্ন করলেন তিনি। তুমি মূসাকে অপছন্দ কর কেন? বিস্মিত হয়ে ফেরাউন জবাব দিল সে আমার প্রভুত্ব অস্বীকার করে অন্য কাউকে প্রভু বলে বিশ্বাস করে। আছিয়া বললেন—মূসাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা ও বাড়াবাড়ি করো না। যে ঘটনা ও বাস্তবতা আজ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করলে তা নিয়ে একটু ভেবে দেখ, গভীর চিন্তায় একটু ডুব দাও, তারপর বলো কী অন্যায়টা মূসা করেছে। কেন সৎ পথের দিশারী বলে তাঁকে স্বীকার করবে না?
তুমি তো প্রবঞ্চক হামানের নির্জলা মিথ্যা কথাগুলোকেই প্রত্যাদেশের মত গুরুত্ব দাও। আর হামান মূসাকে শুরু থেকেই অপছন্দ করে। সে চায় তুমি মূসার সাথে শত্রুতা কর। তাঁর প্রত্যাশা তোমার অন্তরে কেবল সে একাই বসবাস করবে। তুমি কখনো একথা বলছ না কেন যে, মূসা হকের পথেই আমাদের ডেকে যাচ্ছে আর হামানই মূলতঃ ভুলের পসরা বিকিনি করছে?
আছিয়ার নতুন মূর্তি দেখে এবং তাঁর কথাগুলো শুনে ফেরাউন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। আশ্চর্য হয়ে সে ভাবতে লাগল এ হতভাগী এ কী কথা বলছে আমাকে? এরপর থেকে সে আছিয়াকে সন্দেহজনক চোখে দেখতে লাগল। তাঁর চাল চলন, কথাবার্তা সব কিছু সন্দেহজনক মনে হতে লাগল। এমনকি তাঁর কন্যাদের পরিচারিকা হিযকীলের স্ত্রীকেও সন্দেহের আওতায় নিয়ে আসল সে, তাঁর সব কাজকর্ম গতিবিধি লক্ষ্য রাখার জন্য গোয়েন্দা নিযুক্ত করল সে, অবশেষে তাঁর কাছে নিশ্চিত সূত্রে সংবাদ পৌঁছল এ পরিচারিকাটি মূসা (আঃ) এর একান্ত ভক্ত ও অনুসারী। এবার ফেরাউনের ক্রোধের কোন সীমা পরিসীমা রইল না। তারই রাজ প্রাসাদে মূসার ধর্ম ঢুকে গেছে। তাঁর স্ত্রী, দাস দাসী, পরিচারিকা, সিপাহী প্রহরী, কর্মচারী এবং তাঁকে প্রভুত্বের আসনে সমাসীনকারী লোকগুলোক ও আজ মূসার দ্বীনের সামনে মাথা নুইয়ে দিয়েছে। নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে বজ্রের মত গর্জন করে উঠল সে। আছিয়া! এ পরিচারিকা ও তাঁর স্বামীর মরণই একমাত্র প্রাপ্য। তাদেরকে এমন ভয়ানক শাস্তি দাও, যার প্রচন্ডতায় তারা যেন মৃত্যু বরণ করতে বাধ্য হয়। আছিয়া তাঁর পরিচারিকার ব্যাপারে চরম উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। কিছুটা প্রকৃতিস্থ হয়ে তিনি বললেন—এ মেয়েটি আসলে এসব কিছু সুঝে না। কথাগুলো তিনি মূলতঃ নিরাপরাধ মেয়েটিকে ফেরাউনের কবল থেকে বাঁচানোর জন্যই বললেন। কিন্তু ফেরাউন আছিয়ার কথার দিকে সামান্য ভ্রূক্ষেপও করল না; বরং কিছুটা রাগচটা হয়ে আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিল তুমিও কিন্তু সন্দেহভাজনদের মাঝে আছ। মূসার পক্ষপাতিত্বে তুমিও কিন্তু কম যাও না। বিরক্তি ও আক্রমণাত্মক দৃষ্টিতে তাঁর দিকে এক নজর তাকিয়ে ফেরাউন উঠে দাঁড়াল। তাঁর কড়া নির্দেশ হিজকীলের স্ত্রী কোথায়? এক্ষুণি তাঁকে আমার সামনে হাজির কর।
ফেরাউনের প্রহরীরা বেরিয়ে এল। তাঁর কন্যাদের কেশ পরিপাটি ক্লরার দায়িত্ব নিযুক্ত পরিচারিকা হিজকীলের স্ত্রীকে আটক করল তারা। কেউ বাহু ধরে, কেউ চুলের মুঠি ধরে নির্মমভাবে টেনে হিঁচড়ে ফেরাউনের সামনে হাজির করল তাঁকে। প্রশ্ন প্রস্তত করাই ছিল। সরাসরি বলে ফেলল সে আরে কুলাঙ্গার মহিলা! তোর প্রভু কে! নিঃশঙ্ক ভঙ্গিতে সে উত্তর দিল—আমার ও তোমাদের সকলের প্রভু একমাত্র আল্লাহ। যিনি আমাদের সকলকে সৃষ্টি করেছেন। বিকট গর্জন করে উঠল ফেরাউন। বদবখত! এত বড় স্পর্ধা তোর। মুখের উপর আমাকে অপমান। প্রহরী! পুড়িয়ে মেরে ফেল এ নেমকহারামীটাকে। আর শোন! এর ছেলেটাকে আগে ওর সামনে জ্বালিয়ে দাও। বুঝুক আমাকে অবজ্ঞা করার মজা কাকে বলে।
প্রহরীরা আগুনের এক বিশাল কুণ্ড তৈয়ার করল। এক আল্লাহকে প্রভু মেনে ফেরাউনকে কষ্ট দেয়ার পরিণতিতে আগুণে পুড়তে হচ্ছে এক নারীকে। শুধু তাই নয়। কোলের শিশুটির পর্যন্ত রেহাই নেই। মায়ের চোখের সামনে জ্বলে ভস্মীভূত হচ্ছে নিষ্পাপ বাচ্ছাটা। সে যেন মায়ের দিকে ফিরে অব্যক্ত ভাষায় বলছিল—আম্মিজান! আপনি সঠিক পথে আছেন। বিচলিত হওয়ার কোন কারণ নেই। হৃদয়ে ঝড়তোলা নির্মম এ দৃশ্য দেখে অশ্রুতে চোখ মুখ একাকার করে ফেললেন আছিয়া। কান্নাভরা কণ্ঠে গলা উঁচিয়ে তিনি বললেন, ফেরাউন তোর নিস্তার নেই। আমার প্রভুর মর্মন্তদ শাস্তি তোকে ভোগ করতে হবে। তাঁর দিকে মুখ ফিরিয়ে ফেরাউন বলল—আছিয়া বদলে গেছে। পাগল হয়ে গেছে। শয়তান পেয়ে বসেছে ওকে। আছিয়া জবাব দিলেন কিছুই হয়নি আমার। আমাকে শয়তানেও পায়নি। আমি পাগল নই। আমার জ্ঞান বুদ্ধি সব ঠিক আছে। আমি এক আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি। যিনি আমার তোমার সকলের প্রভু। গোটা সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা তিনি। একথা শুনে ফেরাউন আর নিজেকে নিয়ন্ত্রোন করতে পারল না। ঐ পরিচারিকার মত আছিয়াকেও কথিন শাস্তি দেয়ার হুকুম দিল। তবে এর আগে তাঁর মাকে বিষয়টা অবগত করল সে। যেন সে এসে মেয়ের কর্মকাণ্ড স্বচক্ষে দেখে যায়।
আছিয়ার মা এসে সব কিছু ভাল্ভাবে জেনে শুনে আছিয়ার কাছে গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করল লোকেরা তোমার ব্যাপারে যে আবোল—তাবোল কথা বলছে, সবই কি ঠিক? তুমি কি সত্যিই মূসার প্রতি ঈমান এনেছ? এক বুক আত্মতৃপ্তি নিয়ে আছিয়া বললেন—সব কথাই ঠিক। মূসা সঠিক পথে আছে। যে দ্বীন মূসা নিয়ে এসেছে সেটাই প্রকৃত সত্য। তাঁর মা তাঁকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ফেরাউনের কথা মেনে নিতে প্রাণান্তকর চেষ্টা করল। কিন্তু কোনই ফায়দা হল না। ফেরাউন এবার তাঁর শাস্তির চূড়ান্ত ফয়সালা জানিয়ে দিল। প্রহরীরা তাঁকে চাবুক দিয়ে আঘাতের পর আঘাত করতে লাগল। ফেরাউন এ তাঁর সভাসদ সকলেই এ নিদারুণ দৃশ্য উপভোগ করছিল। যখনই আছিয়া ব্যথায় ককিয়ে উঠতেন, ফেরাউন আরো বেশি করে প্রচন্ডভাবে প্রহার করার হুকুম দিত। যেন ফেরাউনকে তিনি প্রভু বলে স্বীকার করেন। কিন্তু ঈমানের অটল পাহাড় আছিয়া সমানে মার খাচ্ছেন আর আল্লাহ তাআলার দরবারে কাতরকণ্ঠে প্রার্থনা করছেন—
ﻭَﺿَﺮَﺏَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻣَﺜَﻠًﺎ ﻟِّﻠَّﺬِﻳﻦَ ﺁﻣَﻨُﻮﺍ ﺍِﻣْﺮَﺃَﺓَ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥَ ﺇِﺫْ ﻗَﺎﻟَﺖْ ﺭَﺏِّ ﺍﺑْﻦِ ﻟِﻲ ﻋِﻨﺪَﻙَ ﺑَﻴْﺘًﺎ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺠَﻨَّﺔِ ﻭَﻧَﺠِّﻨِﻲ ﻣِﻦ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥَ ﻭَﻋَﻤَﻠِﻪِ ﻭَﻧَﺠِّﻨِﻲ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡِ ﺍﻟﻈَّﺎﻟِﻤِﻴﻦَ
হে আমার পালনকর্তা! আপনার সন্নিকটে জান্নাতে আমার জন্যে একটি গৃহ নির্মাণ করুন, আমাকে ফেরাউন ও তার দুস্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং আমাকে যালেম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন।–সুরা তাহরীম, আয়াত ১১।
আল্লাহ পাক তাঁর দুআ কবুল করলেন। সিদ্দিক ও শহীদদের অনন্য মর্যাদায় অভিষিক্ত করলেন তাঁকে। জান্নাতের অকল্পনীয় সব নেয়ামত দান করলেন। আর ফেরাউন! বিশাল সৈন্যবহরসহ নীল দরিয়ায় ডুবে মরল। পৃথিবীবাসীর কাছে এখন সে শুধু এক মর্মান্তিক ইতিহাস।
ঠিক কত বছর বয়সে দাস হিসেবে বিক্রির জন্য আবীসিনিয়া থেকে মক্কায় আনা হয়েছিল তাকে তা আমাদের জানা নেই। জানা নেই কে তার মা, কে তার বাবা, বা কি তার বংশ পরিচয়। সেই সময় তার মত অনেককেই বিভিন্ন জায়গা থকে ধরে আনা হত দাস দাসী হিসেবে মক্কার বাজারে বিক্রির জন্য। আর নিষ্ঠুর মনিবদের কাছে বিক্রি হত যারা তাদের জন্য অপেক্ষা করত নির্মম অত্যাচার আর অমানবিক আচরণ। তবে সবার ক্ষেত্রেই যে এমনটা হত তা কিন্তু নয়; এদের মাঝে অনেক সৌভাগ্যবানও ছিল, যাদের মনিবেরা ছিল অনেক ভাল আর দয়াবান।
আবীসিনিয় কিশোরী বারাকাহ ছিল সেই সৌভাগ্যবানদের একজন। কারণ তার মনিব ছিল আব্দুল মুতালিবের ছেলে আব্দুল্লাহ্। যিনি ছিলেন মক্কার সুদর্শন আর দয়াবান যুবকদের একজন। বারাকাহ ছিল আব্দুল্লাহ্র গৃহে একমাত্র কাজের লোক যে কিনা আমিনার সাথে আব্দুল্লাহর বিয়ের পর তাদের পারিবারিক কাজে সাহায্য সহযোগিতা করত।
বারাকাহর ভাষ্যমতে, বিয়ের দুই সপ্তাহ হতে না হতেই পিতা আব্দুল মুতালিবের নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবসার কাজে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হতে হয়েছিল সদ্যবিবাহিত আব্দুল্লাহকে। ব্যাপারটাতে নববধূ আমিনা খুব হতাশ হয়ে বললঃ
যতদিন আব্দুল্লাহ দূরে ছিল, আমিনা বেশ বিষণ্ণ ও বিষাদগ্রস্ত হয়ে ছিল। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বারাকাহ প্রায়সময় তার পাশে থেকে বিভিন্ন গালগল্প করতেন এবং বিভিন্ন কথাবার্তা বলে তাকে হাসিখুশি উৎফুল্ল রাখার চেষ্টা করতেন সবসময়। কিন্তু তিনি আরও বেশি বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিলেন যখন একদিন শ্বশুর আব্দুল মুতালিব এসে বললেন, তাদের সবাইকে ঘর ছেড়ে পাহাড়ে আশ্রয় নিতে হবে, কারণ ইয়েমেনের তৎকালীন শাসক আব্রাহাহ তার শক্তিশালী দলবল নিয়ে মক্কা আক্রমণ করতে আসছিল। তখন আমিনা তাকে বললেন, তিনি এতই দুর্বল আর বিষণ্ণ যে তার পক্ষে ঘর ছেড়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেওয়া সম্ভব না। আমিনা আরও বললেন যে আব্রাহাহ কখনোই মক্কায় প্রবেশ করতে পারবে না আর পবিত্র কাবা গৃহ ধ্বংস করতে পারবেনা। কেননা, স্বয়ং আল্লাহ্ ওটাকে রক্ষা করবেন। কথাটা শুনে শ্বশুর আব্দুল মুতালিব বেশ রাগান্বিত হয়ে পরলেন; কিন্তু পুত্রবধূ আমিনাকে বেশ নির্ভীক দেখাচ্ছিল এব্যাপারে। তার চোখে মুখে বিন্দুমাত্র ভয়ের লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছিল না। আর আমিনার কথাই সত্যি হয়েছিল শেষ পর্যন্ত। আমিনার কথামত মক্কায় প্রবেশের পূর্বেই আব্রাহাহ তার হস্তী-বাহিনীসহ পরাজিত আর ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা বারাকাহ আমিনার পাশে থাকত। তার ভাষ্যমতে, “ আমি তার পায়ের কাছে ঘুমাতাম আর তার ঘুমের মাঝে স্বামীর জন্য তার বিলাপ আর কান্না শুনতে পেতাম নিয়মিত। মাঝে মাঝে তার কান্নার শব্দে আমার ঘুম পর্যন্ত ভেঙ্গে যেত, তখন আমি বিছানা থেকে উঠে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতাম”।
ইতিমধ্যে সিরিয়া যাওয়া বণিকদের অনেকেই ফিরে এসেছে এবং তাদের পরিবার-পরিজন তাদের আনন্দের সহিত অভ্যর্থনা দিল। কিন্তু আব্দুল্লাহর কোন খবর জানা গেল না। বারাকাহগোপনে আব্দুল্লাহর খবর নেওয়ার জন্য আব্দুল মুতালিবের বাসায় গেল, কিন্তু কোন খবর পেল না। শুনলে কষ্ট পাবে ভেবে বারাকাহ আমিনাকে খবরটা জানাল না। ইতিমধ্যে সিরিয়া যাত্রী বণিকদের সবাই ফিরে এলো, শুধু মাত্র আব্দুল্লাহ ছাড়া!
পরে ইয়াত্রিব থেকে যখন আব্দুলাহ’র মৃত্যুর খবর আসল বারাকাহ তখন আব্দুল মুতালিবের ঘরেই ছিল। বারাকাহ বললঃ “মক্কার সবচাইতে সুদর্শন যুবক, কুরাইশদের গর্ব আব্দুল্লাহ, যার ফেরার জন্য এত অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলাম আমরা সবাই, সেই আব্দুল্লাহ ফিরবে না কখনোই আর। খবরটা শুনা মাত্রই জোরে একটা চিৎকার দিলাম আমি আর চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে আমিনার কাছে ছুটে গেলাম আমি।
দুঃসংবাদটা শোনামাত্রই অজ্ঞান হয়ে গেল আমিনা। এই জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে তার পাশেই ছিলাম আমি। আমিনার ঘরে আমি ছাড়া আর কেউই ছিল না তখন। এইভাবে আসমান জমিন আলোকিত করে মুহাম্মদ (সঃ) এর জন্ম পর্যন্ত দিবারাত্রি সর্বক্ষণ আমিনার সেবায় নিয়োজিত ছিলাম আমি”। মুহাম্মদ (সঃ) যখন জন্মগ্রহণ করেছিল বারাকাহ সর্বপ্রথম তাকে কোলে তুলে নিয়েছিল। তারপর দাদা আব্দুল মুতালিব এসে ক্বাবায় নিয়ে গেল তাকে, সেখানে সমগ্র মক্কাবাসী উৎসবের মাধ্যমে বরন করে নিলো তাকে। এরপর মুহাম্মদ(সঃ) কে যখন সুস্বাস্থ্যকর উত্তম পরিবেশে লালনপালনের জন্য হালিমার সাথে ‘বাদিয়াতে’ (মরুভূমি) পাঠানো হয়েছিল বেশ কয়েক বছরের জন্য। তখনও বারাকাহ আমিনার সাথে থেকে তাকে সাহায্য সহযোগিতা করত। পাঁচ বছর বয়সে মুহাম্মদ(সঃ) কে যখন মক্কায় ফিরিয়ে আনা হল তখন মা আমিনা ও বারাকাহ তাকে পরম আনন্দে গ্রহণ করে নিলো। আর মুহাম্মদ(সঃ) এর বয়স যখন ছয় তখন মা আমিনা তার স্বামীর কবর যিয়ারতের মনস্থির করল। শ্বশুর আব্দুল মুতালিব আর বারাকাহ দুজনেই তাকে নিরুৎসাহিত করতে চাইল এব্যাপারে। কিন্তু কোনভাবেই নিরুৎসাহিত করা গেল না আমিনাকে। সুতরাং একদিন সকালে বড় একটি উটে চড়ে সিরিয়া-গামী মরুযাত্রীদের সাথে আমিনা বারাকাহ ও শিশু মুহাম্মদ (সঃ) কে সাথে নিয়ে ইয়াত্রিবের উদ্দ্যশ্যে রওনা দিল। ব্যাপারটা জানলে শিশু মুহাম্মদ(সঃ) মানসিকভাবে ভেঙ্গে পরতে পারে তাই তারা যে তার বাবার কবর যিয়ারত করতে যাচ্ছিল সেটা মুহাম্মদ(সঃ) কে জানানো হয়নি তখন”।
তাদের কাফেলাতি বেশ দ্রুতই আগাচ্ছিল। বারাকাহ আমিনাকে অন্ততপক্ষে তার সন্তানের স্বার্থে হলেও শান্ত থাকতে বলছিল বারবার। আর এদিকে শিশু মুহাম্মদ(সঃ) যাত্রার প্রায় পুরো সময় জুড়েই বারাকার গলা জড়িয়ে কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়েছিল।
ইয়াত্রিব পৌছাতে প্রায় দশদিনের মত লেগেছিল তাদের। প্রতিদিন আব্দুল্লাহর কবরে যাবার সময় আমিনা শিশু মুহাম্মদ(সঃ) কে তার বানু নাজ্জার গোত্রীয় ভাইদের কাছে রেখে যেতেন। এভাবে প্রায় কয়েক সপ্তাহ যাবত প্রতিদিন আমিনা আব্দুল্লাহর কবরে যেতেন। এসময় আমিনা আরও বেশি শোকার্ত হয়ে পড়েছিল।
এরপর মক্কা ফেরার পথে আমিনা মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ল হঠাৎ। মক্কা আর ইয়াত্রিবের মাঝামাঝি আল-আবওয়া নামক একটা জায়গায় যাত্রা-বিরতি করতে বাধ্য হল তারা। আমিনার অবস্থা আরও বেশি খারাপ হতে লাগল। এক অমাবস্যার রাতে, তার জ্বর মারাত্মক রকম বেড়ে গেল। এমন সময় আমিনা বারাকাহকে কাছে ডেকে কান্না-বিজড়িত কণ্ঠে কানে কানে বললেনঃ “বারাকাহ, আমি তো আর বেশিক্ষণ বাঁচব না। আমি আমার সন্তান মুহাম্মদ (সঃ) কে তোমার দায়িত্বে দিয়ে গেলাম। পেটে থাকা অবস্থায় বাবাকে হারিয়েছে সে। আর এখন তার চোখের সামনেই তার মাকে হারাতে যাচ্ছে সে। তার মা হয়েই থেকো তুমি, বারাকাহ। কখনোই ছেড়ে যেওনা তাকে তুমি”।
বারাকার কান্না থামল না আর। কাঁদতেই থাকল সে অঝোর ধারায়। ধূধূ মরুর বুকে নিজ হাতেই কবর খুঁড়ল সে। আর নিজ হাতেই প্রিয় আমিনাকে দাফন করল সে। বারাকার চোখের জলে ভিজল আমিনার কবর। মা-বাবা হারানো এতিম শিশু মুহাম্মদ(সঃ) কে নিয়ে দাফন শেষে মক্কায় তার দাদা আব্দুল মুতালিবের কাছে ফিরল সে। শিশু মুহাম্মদ (সঃ) কে দেখাশুনা করবার জন্য সেও তাদের সাথে থেকে গেল। এর দুই বছর পর দাদা আব্দুল মুতালিবও যখন মারা গেল তখন সে চাচা আবু তালিবের বাসায় শিশু মুহাম্মদ(সঃ) দেখাশুনা করতে লাগল। এভাবে মুহাম্মদ(সঃ) বড় হওয়া এবং খাদিজার সাথে তার বিয়ে পর্যন্ত আমাদের প্রিয় নবীর সেবায় নিয়োজিত ছিলেন বারাকাহ।
তখন খাদিজা বলল, “বারাকাহ, আপনি আপনার যৌবন বিসর্জন দিয়েছেন আপনার প্রিয় মুহাম্মদ(সঃ) এর জন্য। সে আপনার প্রতি তার দায়িত্ব সম্পাদন করতে চাচ্ছে। তাই আমার আর আপনার প্রিয় মুহাম্মদ(সঃ) এর স্বার্থে বৃদ্ধ হয়ে যাবার আগেই এই বিয়েতে রাজি হয়ে যান আপনি”।
বারাকাহ বলল, “কে আমাকে বিয়ে করবে, খাদিজা?” “ ওই যে… ইয়াত্রিবের খাযরায গোত্রের উবাইদ ঈবনে যায়েদ আমাদের কাছে এসেছিল আপনার বিয়ের ব্যাপারে। দয়া করে না বলবেন না ”।
বারাকাহ রাজি হয়ে গেল। বিয়ের পর উবাইদ ঈবনে যায়েদের সাথে ইয়াত্রিব চলে গেল সে। সেখানে তাদের সন্তান ও হয়েছিল একটি। যার নাম ছিল আইমান। এরপর থেকে লোকে তাকে ‘উম্মে আইমান’ অর্থাৎ আইমানের মা বলেই ডাকত।
তার বিয়ে অবশ্য বেশিদিন ঠেকেনি। হঠাৎ স্বামী মারা গেল তার। আবার সে মক্কায় ফিরে এলো, তার ‘ছেলে’ মুহাম্মদ (সঃ) এর কাছে। তখন মুহাম্মদ(সঃ) ও খাদিজার সাথে আলী বিন আবু তালিব, খাদিজার প্রথম স্বামীর কন্যা হিন্দ, আর যায়েদ বিন হারিথাহও থাকত।
যায়েদ ছিল আরবের কাল্ব গোত্রের লোক। যাকে তার ছেলেবেলায় মক্কায় দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। তখন খাদিজার ভাইপো কিনে নিয়েছিল তাকে খাদিজার সেবা করার জন্য। খাদিজার গৃহে যায়েদ মুহাম্মদ(সঃ) এর সংস্পর্শে আসার পর তার সেবায় নিয়োজিত করল নিজেকে সে। তাদের দুজনের সম্পর্ক ছিল বাবা-ছেলের মতই। সম্পর্কটা এতই সুন্দর ছিল যে যায়েদের বাবা যখন তার ছেলে খোঁজে মক্কায় আসল একদিন তখন মুহাম্মদ(সঃ) যায়েদকে বললেন, তুমি স্বাধীন, ইচ্ছা হলে আমার সাথে থাকতে পার তুমি অথবা তোমার বাবার সাথে চলে যেতে পার। তখন যায়েদ তার বাবাকে বললঃ
মুহাম্মদ(সঃ) পরে প্রকাশ্যে মুক্ত ঘোষণা করেছিলেন যায়েদকে। কিন্তু তারপরও যায়েদ উনাকে ছেড়ে যায়নি। বরং তার সাথে থেকে তার সেবায় আরও বেশি মনোনিবেশ করেছিল সে।
পরে মুহাম্মদ(সঃ) যখন নবুয়ত প্রাপ্ত হলেন, তাতে প্রথম বিশ্বাস স্থাপনকারীদের মধ্যে যায়েদ এবং বারাকাহ ছিল অন্যতম। প্রথম মুসলিম হিসেবে কুরাইশদের অমানুষিক নির্যাতনও সহ্য করতে হয়েছিল তাদের।
নবী করিম(সঃ) এর ইসলাম প্রচারের মিশনে তাদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। সেসময় ইসলামের বিরুদ্ধে মুশরিকদের ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা সম্পর্কে গোপনে তথ্য সংগ্রহের জন্য নিজেদের জীবন পর্যন্ত বাজি রেখেছিল তারা।
এক রাতে মুশরিকরা যখন আল-আরকাম [যে গৃহে নবী করিম(সঃ) তার সাহাবীদের ইসলামের শিক্ষা দিতেন] যাবার পথ অবরোধ করে বসল, বারাকাহ সেই অবরোধের মধ্যেই তার জীবন বাজি রেখে খাদিজার পাঠানো গোপন বার্তা নিয়ে আল-আরকামে নবী(সঃ) এর কাছে এসে হাজির হয়েছিলেন। যখন তিনি মুহাম্মদ(সঃ) এর কাছে এসে খবরটা জানালেন, তখন নবী করিম(সঃ) মৃদু হেসে বললেনঃ
এই কথা শুনার পর সব সাহাবীরাই নীরব হয়ে গেলেন হঠাৎ। কোন সাড়া পাওয়া গেল না কারো কাছ থেকে। কেননা উম্মে আইমান না ছিলেন সুন্দরী না ছিলেন আকর্ষণীয়। বয়স ইতিমধ্যেই পঞ্চাশের কাছাকাছি হয়ে গেছে তার, দেখতেও বৃদ্ধ বৃদ্ধ লাগত তাকে। কিন্তু যায়েদ ইবনে হারিথাহ এগিয়ে এসে বললঃ
“হে আল্লাহ্র নবী, আমিই বিয়ে করব উম্মে আইমান কে। আল্লাহ্র কসম, সুন্দরী রূপবতী মহিলাদের চাইতে তিনিই উত্তম”।
এরপর যথারীতি বিয়ে হয়ে গেল তাদের দুজনের। একটা সন্তানও জন্ম নিয়েছিল তাদের সংসারে। তার নাম ছিল ঊসামা। উসামাকে নিজের সন্তানের মতই ভালবাসতেন নবী করিম(সঃ)। তিনি প্রায়সময়ই খেলাধুলা করতেন তার সাথে,আদর করতেন তাকে চুমু দিয়ে আর খাইয়ে দিতেন তাকে নিজ হাতে। একারণে মুসলিমরা ‘প্রিয় নবীর প্রিয় সন্তান’ হিসেবেই জানত তাকে। অল্প বয়স থেকেই উসামা নিজেকে ইসলামের খেদমতে নিয়োজিত করেন। পরে নবী করিম(সঃ) ইসলামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেন তার উপর।
পরে নবী করিম(সঃ) যখন ইয়াত্রিবে (মদীনায়) হিজরত করলেন তখন তিনি উম্মে আইমান কে রেখে গিয়েছিলেন মক্কায় তার ঘরের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ দেখাশুনা করবার জন্য। পরবর্তীতে উম্মে আইমান একা একায় ‘পুত্র’ মুহাম্মদ(সঃ) এর কাছে মদীনায় গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। উঁচু পর্বত আর উত্তপ্ত বালি আর মরুঝড় পাড়ি দিয়ে এই কঠিন দীর্ঘ পথ অতিক্রমের কাজটি একা পায়ে হেটেই সম্পন্ন করেছিলেন তিনি। শেষপর্যন্ত মদীনায় যখন পৌঁছালেন তিনি তখন তার মুখমণ্ডল ও শরীর ছিল ধুলো আবৃত, ফোসকা পড়ে পা গিয়েছিল ছিঁড়ে আর ফুলে। এত কিছুর পরও তার সেই কঠিন যাত্রাটিকে একমাত্র সম্ভব করে তুলেছিল ‘পুত্র’ মুহাম্মদ(সঃ) এর প্রতি তার অপরিসীম মমতা ও ভালবাসা।
উম্মে আইমান মদীনায় গিয়েও ইসলামের সেবায় পরিপূর্ণভাবে সমর্পণ করেন নিজেকে তিনি। উহুদের যুদ্ধে তৃষ্ণার্তদের মাঝে পানি বিতরণ করেন তিনি এবং আহত সৈনিকদের সেবা শুশ্রূষা করেন। খাইবার ও হুনাইনের মত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিযানেও নবী করিম(সঃ) এর পাশে ছিলেন তিনি।
রসূল (সঃ) এর প্রিয় সাহাবী বারাকাহর পুত্র আইমান হিজরি অষ্টম বর্ষে হুনাইনের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। তার স্বামী যায়েদও মুতাহ’র যুদ্ধে শহীদ হন। ইতিমধ্যে বারাকাহর বয়স সত্তরের কাছাকাছি হয়ে গিয়েছিল। বার্ধক্যের কারণে বেশীরভাগ সময় ঘরে বসেই কাটাতে হত তার। আবু বকর আর উমর কে সাথে নিয়ে নবী করিম(সঃ) প্রায়সময় তাকে দেখতে যেতেন এবং জিজ্ঞাস করতেন, “ইয়া উম্মি! (ও আমার মা!) কেমন আছেন আপনি?” প্রত্যুত্তরে তিনি বলতেন, “ হে আল্লাহ্র নবী, ইসলাম যতক্ষণ ভাল, আমিও ভাল ততক্ষণ”।
নবী করিম(সঃ) এর ইন্তেকালের পর প্রায়সময়ই কাঁদতে দেখা যেত বারাকাহকে। তাকে যখন একবার জিজ্ঞাস করা হয়েছিল, “কেন কাঁদছেন এত আপনি?” তিনি বলেছিলেন, “আল্লাহর কসম, নবী(সঃ) যে ইন্তেকাল করবেন তা আমি জানতাম, কিন্তু আমি একারণে কাঁদি যে তার মৃত্যুর পর আমাদের প্রতি আল্লাহ্র ওহী নাযিল হবেনা কখনোই আর”।
বারাকাহই হল একমাত্র ব্যক্তি/ মহিলা যে কিনা মুহাম্মদ(সঃ) এর জন্ম থেকে শুরু করে ইন্তেকাল পর্যন্ত পাশে ছিলেন তার। মুহাম্মদ(সঃ) এর পরিবারের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালবাসা ও শ্রম দিয়ে গেছেন সারাজীবন তিনি। নিয়োজিত ছিলেন প্রিয় নবী মুহাম্মদ(সঃ) এর সেবায়। সর্বোপরি ইসলামের ক্রান্তি-লগ্নে, ইসলামের আবির্ভাবের সময়ে ইসলামের প্রতি তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। পরবর্তীতে হযরত উসমানের খিলাফতের সময় মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
যদিও কিনা তার বংশ পরিচয় নিয়ে নিশ্চিত হতে পারিনি আজও আমরা, সে যে জান্নাতের অধিবাসী হবে সে ব্যাপারে পুরাপুরি নিশ্চিত আজ আমরা। আল্লাহ্ এভাবেই সৎকাজের প্রতিদান দেন!!
আপনি কীভাবে জিব্রাইল আঃ এর নাম বলেন, কীভাবে উচ্চারণ করেন তার নাম? জিব্রীল, জিব্রাই–ল, জিব্রাইল, জিব্রাই’ল, জিব্রিইল এই পাঁচ ভাবে তার নাম উচ্চারণ করা হয়। আর এটা বিভিন্ন কিরাতের মাধ্যমে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে বার বার কি শোনা যাচ্ছে? ই-ল। ই-ল মানে আল্লাহ সুব হানাহু ওয়া তায়ালা। এ নিয়ে কোন মতপার্থক্য নেই। জিবরা মানে বান্দাহ, দাস। তাহলে জিব্রাইল অর্থ- আল্লাহর দাস। সুতরাং এটা হলো তার নাম এবং নামের অর্থ।
রাসূল সঃ এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কিভাবে তাঁকে সম্বোধন করতেন? এটা আসলেই একটা মজার বিষয়। যখন আমি এই বিষয়ে গবেষণা করা শুরু করলাম, প্রথম দিন এটা দেখে খুব অবাক হলাম যে- কারণ আমি বুখারি শরীফ থেকে শুরু করেছিলাম। আমি বুখারি শরীফ থেকে জিব্রাইল আঃ সম্পর্কে বর্ণিত সকল হাদিস সংগ্রহ করলাম। প্রথম যে হাদিসে জিব্রাইল আঃ এর নাম উল্লেখ আছে, রাসুল সঃ বলেন, জিব্রিল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আমরা সাধারণত জিব্রিলকে আলাইহিস সালাম হিসেবে সম্বোধন করি। যার অর্থ তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হউক। কিন্তু রাসুল সঃ তাঁর উপর সালাওয়াত ও পেশ করলেন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে। রাসুল সঃ এটা করলেন জিব্রাইল আ এর উচ্চ মর্যাদার কারণে।
আরেকটা ব্যাপার, রাসুল সঃ প্রায়ই তাঁর নাম বলে তাঁকে সম্বোধন করতেন না। জানেন, কিভাবে করতেন? তিনি বলতেন, যিনি আমার রবের নিকটে থাকেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বিভিন্ন উপায়ে তাঁকে সম্বোধন করতেন। সব গুলো আমার পক্ষে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। এটা আরেকটা বিশাল অধ্যয়নের ব্যাপার। ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আলোচনা করা যাবে। তবে সবচেয়ে কমন যে বিষয়টি আপনি পাবেন তা হলো ‘রুহ’ শব্দটি, আত্মা, স্পিরিট। আল্লাহ তাঁকে বলেন আর রুহুল কুদুস(পবিত্র আত্মা), আর রুহুল আমিন(বিশ্বাসী আত্মা), রুহানা(আমাদের আত্মা), আল্লাহ তাঁকে আরও ডাকেন ‘রাসুলুন কারীম (সম্মানিত বার্তাবাহক) বলে। সর্বশেষ আর একটি নাম বলেই আমরা অগ্রসর হব, সময় স্বল্পতার কারণে। এই নামটি আল্লাহ বা রাসূল সঃ এর পক্ষ থেকে নয় বরং ওয়ারাকা ইবনে নাওফেলের কাছ থেকে, যিনি ছিলেন খাদিজা রা এর চাচাতো ভাই। ওয়ারাকা বলেছিলেন, ইনি হলেন ‘আন নামুস’, যাকে মূসা আঃ এর কাছে প্রেরণ করা হয়েছিল।
জিব্রাইল আঃ দেখতে কেমন ছিলেন?
তিনি দেখতে কেমন ছিলেন? জিব্রাইল আঃ বিভিন্ন রকম আকৃতি ধারণ করতেন। তিনি মানুষের আকৃতি ধারণ করতেন। আবার কখনো কখনো তিনি ফেরেশতার আকৃতিও ধারণ করতেন কিন্তু সেটা তাঁর পূর্ণাঙ্গ আকৃতি ছিল না। রাসূল সঃ বলেন, আমি জিব্রাইল আঃ কে দেখেছি আর তাঁর ছিল ৬০০ ডানা। রাসূল সঃ বলেন, তিনি আল্লাহ প্রদত্ত একটি বিশাল সিংহাসনে উপবিষ্ট হয়ে সম্পূর্ণ দিগন্তকে ঢেকে ফেলতেন। রাসূল সঃ আরও বলেন, ঐ ৬০০ ডানা শুধু ছড়ানোই থাকতো না, তাঁর ডানাগুলো থেকে প্রতিনিয়ত মনি মুক্তা ঝরতে থাকতো। আর তাঁর ডানার রং ছিল সবুজ, তাঁর পায়ের পাতার রং ও ছিল সবুজ। ফেরেশতার আকৃতিতে তাঁকে এমন দেখাতো, আর তিনি হলেন অন্য সকল ফেরেশতাদের চেয়ে আলাদা।
মনুষ্য আকৃতিতে তাঁকে কেমন দেখাতো? জিব্রাইল আ কয়েকজন মানুষের আকৃতি ধারণ করতেন। তাঁকে বিভিন্ন রকম দেখাতো। কিন্তু যখন তিনি রাসূল সঃ এর নিকটে আসতেন তিনি সুনির্দিষ্ট একটি রূপ নিয়ে আসতেন। রাসূল সঃ বলেন, জিব্রিল আ কে দিহইয়াহ ইবন খালিফা আল কালবি রা এর মত দেখাতো। দিহইয়াহ রা কে বলা হতো বনু কালবের ইউসুফ। ইউসুফ আ সম্পর্কে মহিলারা কি বলেছিল – ইনি একজন সুন্দর ফেরেশতা। তো দিহইয়াহ কে বলা হতো বনি কালবের ইউসুফ। মহিলারা দিহইয়াহকে পছন্দ করতো।
জিব্রিল আ এর সাথে নবী রাসুলদের সম্পর্ক।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এবং জিব্রিল আ এর সম্পর্ক কেমন? প্রথমত- তিনি হলেন ‘কালিমুল্লাহ মিনাল মালাইকা’। ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে যার সাথে আল্লাহ কথা বলেন তিনি হলেন জিব্রিল আ। আপনি হয়ত ভাবতে পারেন আল্লাহ কি সকল ফেরেশতার সাথে কথা বলেন না? উত্তর হলো – না। মানুষের মাঝ থেকে যেমন নির্দিষ্ট কয়েকজনের সাথে আল্লাহ সরাসরি কথা বলেন ঠিক তেমনি ফেরেশতাদের মাঝ থেকেও নির্দিষ্ট কয়েকজনের সাথে আল্লাহ সরাসরি কথা বলে থাকেন। আল্লাহ চারজন ফেরেশতার সাথে কথা বলে থাকেন। ‘মুকাসসিমাতে আমরা’ যারা আল্লাহর বিভিন্ন নির্দেশের বাস্তবায়ন ঘটান, এই চারজনের সাথে আল্লাহর সরাসরি কথা বলার বর্ণনা পাওয়া যায়। কিন্তু আল্লাহ সবসময় সরাসরি জিব্রিল আ এর সাথে কথা বলে থাকেন। এমন একজন নবীর কাহিনী আপনি পাবেন না যেখানে জিব্রিল আ এর আলোচনা নেই। আপনি যদি ‘কাসাসুল আম্বিয়া’ পড়েন প্রত্যেক নবীর আলোচনায় কোন না কোন ভাবে জিব্রাইল আ এর নাম উঠে আসবেই। তাঁর উল্লেখ থাকবেই। কারণ তাঁকে এক লাখ চব্বিশ হাজার পয়গম্বরের কাছে পাঠানো হয়েছিল। মুসনাদে ইমাম আহমাদের একটি হাদিসে এক লাখ চব্বিশ হাজার নবীর কথা উল্লেখ আছে। তাঁদের মাঝে তিনশত পঞ্চাশ জন ছিলেন রাসূল। তাঁদের প্রত্যেকের কাছে জিব্রিল আ কে পাঠানো হয়েছিল তাঁদেরকে শিক্ষা দেয়ার জন্য, গড়ে তোলার জন্য, সমর্থন দেয়ার জন্য, প্রতিরক্ষার জন্য। তিনি প্রথম থেকেই তাঁদের সাথে ছিলেন। তাঁর আরেকটি উপাধি কি ছিল? নাসুরুল আম্বিয়া। তিনি ছিলেন নবীদের সাহায্যকারী। জিব্রাইল আঃ ই ইব্রাহীম আঃ কে শয়তানের প্রতি পাথর ছুঁড়তে বলেছিলেন। আর আমরা সেই ঘটনার স্মরণে শয়তানের প্রতি পাথর নিক্ষেপ করি। সুব হানাল্লাহ! দেখুন, সেই ঘটনার কত চমৎকার ঐতিহ্য আমাদের! জিব্রাইল আঃ ই ইব্রাহীম আঃ কে হজ্বের নিয়ম কানুন শিখিয়েছিলেন।
কখনো কখনো জিব্রাইল আঃ এর ভূমিকাকে স্পষ্টরূপে উল্লেখ করা হয় না। ইয়ুসুফ আঃ এর গল্পে কখনো কি জিব্রাইল আঃ এর উল্লেখ পেয়েছেন? আপনি ইয়ুসুফ আঃ এর উপর বিশাল আলোচনা শুনতে পারেন, সেখানে হয়তো জিব্রাইল আঃ এর কথা কখনো বলা হয় না। কিন্তু তিনি সেখানে আছেন।
আয়াত —–
যখন তিনি প্রাপ্ত বয়স্ক হলেন তখন আমরা তাঁকে প্রজ্ঞা এবং জ্ঞান দিয়েছি। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে তাঁর নবুয়ত অনেক কম বয়সে শুরু হয়। আল্লাহ এবং জিব্রাইল আঃ এর সাথে তাঁর সম্পর্ক অনেক কম বয়স থেকে শুরু হয়। জিব্রাইল আঃ এর সাথে হযরত ইউসুফের কখন প্রথম দেখা হয়? যখন তাঁর ভাইরা তাঁকে সেই কূপে নিক্ষেপ করেছিল, আর তিনি কূপের তলায় পড়তে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি এমন এক লোকের হাতের উপর ল্যান্ড করেন যাকে তিনি আগে কখনো দেখেননি। তিনি ছিলেন জিব্রিল আ। জিব্রিল তাঁকে ধরে ফেলেন যেন ইউসুফ আ পড়ে গিয়ে ব্যাথা না পান। সুবহান আল্লাহ, চিন্তা করে দেখুন। ইবনেল কাইয়েম র এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, এই ঘটনায় নিদর্শন রয়েছে যে- কোন সৃষ্টি আল্লাহর রজ্জু ধারণ করলে আল্লাহ অবশ্যই তাকেও ধারণ করেন, তিনি আপনাকে পড়ে যেতে দিবেন না। তিনি আপনাকে নষ্ট হয়ে যেতে দিবেন না।
মাঝে মাঝে এই উল্লেখটা খুবই সূক্ষ্ম। আপনি হয়তো কোন লক্ষণীয় উল্লেখের কথা শুনেন না। এখানে জিব্রাইল আঃ এর ভূমিকাটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ইয়সুফ আঃ যেন পড়ে গিয়ে ব্যাথা না পান সে জন্য আল্লাহ তাঁকে পাঠালেন ধরে ফেলার জন্য।
কখনো কখনো বর্ণীত গল্পের নবীর সাথে নয় বরং নবীর শত্রুদের সাথে জিব্রিল আঃ এর উল্লেখ পাওয়া যায়। তো মূসা আঃ এর ঘটনায় তিনি মূসা আঃ এর সাথে বহুবার ছিলেন। কিন্তু মূসা আঃ এর ঘটনায় আমরা জিব্রিল আঃ এর উল্লেখের যে সহিহ বর্ণনা পাই, তা আসলে তাঁর শত্রু ফেরাওনের সাথে। তিরমিজি শরীফের একটি সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে- জিবরাইল আঃ নবী করিম সঃ এর নিকট আসলেন এবং তাঁকে বললেন, ”ফেরাওনের মৃত্যুর দিন যদি আপনি আমাকে দেখতেন! সে যখন সমুদ্রের তলায় ডুবে মারা যাচ্ছিল, আমি গিয়ে তাকে পেলাম এবং তার মুখে কাদা নিক্ষেপ করতে লাগলাম। আমি ভয় পাচ্ছিলাম যে সে হয়তো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে ফেলবে আর ফলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন।” কারণ আমি ভয় পাচ্ছিলাম সে হয়তো অনুশোচনা করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে ফেলবে আর আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে জিব্রিল আ এর চেয়ে বেশি কে চেনে? জিব্রিল আ জানেন, আল্লাহ এতোই দয়ালু যে এমনকি ফেরাওনের মত পাপিষ্ঠরও সুযোগ আছে। আর তিনি আশংখা করছিলেন যে, ফেরাওনের এক মুহূর্তের অনুশোচনা তার হয়তো সারা জিন্দেগীর অপরাধ মুছে দিতে পারে। জিব্রিল আ চিন্তিত ছিলেন যে, ফেরাউনের জন্য হয়তো একটা সুযোগ তৈরি হতে পারে। এখন, জিব্রিল আ কি ফেরাউনের ভাগ্য নষ্ট করে দিলেন? না। এরপর, আল্লাহ জিব্রিল আঃ কে বলেন, হে জিব্রিল! আমার ইজ্জত এবং গৌরবের কসম! যদি সে আন্তরিকতার সাথে ক্ষমা চাইতো, আমি তাকে ক্ষমা করে দিতাম! তার মুখে তোমার কাদা নিক্ষেপ কোন কাজে আসতো না। আমি তবু তাকে ক্ষমা করে দিতাম! এখন দেখুন, আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, মুখে কাদা মারার কারণ কি? যখন কোন পাপি ব্যক্তি মারা যায়, ফেরেশতারা তার মুখে আঘাত করতে থাকে। জিব্রিল আঃ কেন ফেরাউন কে এত ঘ্রণা করতেন? তিনি বলেন, আমি সে দিন থেকে তাকে ঘৃণা করতাম যেদিন সে বলেছিল- আমি তোমাদের শ্রেষ্ঠ প্রভু। হাদিসে আমরা জিব্রাইল আঃ এর একটা বিষয় দেখতে পাই, মাঝে মাঝে যখন জিব্রিল আঃ রাসূল সঃ এর কাছে আসতেন তিনি বলতেন না- আল্লাহ এটা বলেছেন। বরং তিনি বলতেন, আল আ’লা (সর্বোত্তম প্রভু)বলেছেন। এতে আল্লাহ সুব হানাহু ওয়া তায়ালার প্রতি জিব্রিল আ এর অপরিসীম শ্রদ্ধার প্রকাশ পায়।
পরিশেষে, ইমরানের পরিবারের সাথে। কোন কোন সময় জিব্রিল (আঃ) কে নবীর সাথে উল্লেখ না করে নবীর পরিবারের সাথে উল্লেখ করা হয়। তো, আমরা মারিয়াম (আঃ) এর ঘটনা জানি। মারিয়াম (আঃ) মসজিদের বাইরে পূর্বে দিকের কোন এক স্থানে যেতেন ﻣَﻜَﺎﻧًﺎ ﺷَﺮْﻗِﻴًّﺎ
। তিনি মাসে একবার মসজিদের বাইরে পূর্ব দিকের কোন এক জায়গায় যেতেন। অনেক আলেমের মতে, সেটা ছিল সূর্যোদয় দেখার উদ্দেশ্যে। তিনি সেখানে গিয়ে সূর্যোদয় দেখতেন আর আল্লাহর জিকর করতেন। তিনি সেখানে মাটিতে দুটি লাঠি গেঁড়ে পর্দা টাঙিয়ে দিতেন, যেন এই খোলা জায়গায় মানুষ বুঝতে পারে এটা তাঁর বসার জায়গা। কেউ যেন এটার নিকটে না আসে। তিনি অল্প বয়স্ক মেয়ে ছিলেন, ১৪- ১৮ বছর বয়সের। মোটকথা তিনি একজন টিনেজার ছিলেন। আর তিনি একা আল্লাহর উপাসনা করছেন, আল্লাহকে একা একা স্মরণ করছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ﻓَﺄَﺭْﺳَﻠْﻨَﺎ ﺇِﻟَﻴْﻬَﺎ ﺭُﻭﺣَﻨَﺎ আমরা তাঁর কাছে আমাদের রুহকে (জিবরাইল আঃ ) পাঠালাম। ﻓَﺘَﻤَﺜَّﻞَ ﻟَﻬَﺎ ﺑَﺸَﺮًﺍ ﺳَﻮِﻳًّﺎ জিব্রিল (আঃ) তাঁর নিকট একজন সুন্দর পুরুষের আকৃতিতে আবির্ভূত হলেন। জিব্রিল (আঃ) মুখ খুলে কিছু বলার আগেই মারিয়াম (আঃ) তাকে দেখে বললেন, ﺃَﻋُﻮﺫُ ﺑِﺎﻟﺮَّﺣْﻤَٰﻦِ ﻣِﻨﻚَ ﺇِﻥ ﻛُﻨﺖَ ﺗَﻘِﻴًّﺎ ”আমি পরম করুণাময়ের কাছে তোমার থেকে আশ্রয় চাচ্ছি, যদি তোমার অন্তরে আল্লাহর কোন ভয় থেকে থাকে।”
মানে – যদি তোমার নূন্যতম কোন শালীনতা থেকে থাকে ভাগ এখান থেকে। কোন কথা বলতে যেও না। মনে কর যে এটা কখনো ঘটে নি। যাও, আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। তাই প্রিয় বোনেরা, যদি কোন ভাই আপনার নিকট এগিয়ে আসে, তাদের সাথে এভাবে আচরণ করার চেষ্টা করে দেখুন(আরবিতে এই কথাটা বলেন)। দেখুন, কি ঘটে। যদি তিনি আরবি নাও বুঝেন তিনি ভাববেন, না এই আপুর থেকে দূরে থাকাই উত্তম। আমরা এই গল্পে যদি আবার ফেরত যাই, তাহলে দেখবো যে মারিয়াম (আঃ) জিবরাইল (আঃ) এর সাথে পরে কথা বলেছিলেন। কিন্তু কেন? কারণ মারিয়াম (আঃ)এর এভাবে কঠিন স্বরে কথা বলা দেখে জিবরাইল (আঃ) সাথে সাথে মনুষ্য আকৃতি থেকে ফেরেশতার আকৃতি ধারণ করেন। তিনি তাঁর মনুষ্য আকৃতি ত্যাগ করেন এবং ফেরেশতার আকৃতি ধারণ করেন। আর সেটা ৬০০ ডানার পূর্ণ আকৃতি ছিল না। ছোট-হালকা কণ্ঠসহ বা অন্য কোন রূপ যেটাই হউক সে আকৃতি ধারণ করে তিনি কথা চালিয়ে যান।
আমি আল্লাহর একজন দূত। আপনার নিকট একজন পবিত্র সন্তানের সুসংবাদ নিয়ে এসেছি। আল্লাহ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এবং ﻛَﺬَٰﻟِﻚِ এটা ইতিমধ্যে করা হয়েছে । ﻭَﻟِﻨَﺠْﻌَﻠَﻪُ ﺁﻳَﺔً ﻟِّﻠﻨَّﺎﺱِ ﻭَﺭَﺣْﻤَﺔً ﻣِّﻨَّﺎ ‘’আমি তাকে মানুষের জন্যে একটি নিদর্শন ও আমার পক্ষ থেকে অনুগ্রহ স্বরূপ করতে চাই।’’ ﻭَﻛَﺎﻥَ ﺃَﻣْﺮًﺍ ﻣَّﻘْﻀِﻴًّﺎ আর এই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে। এখানে ‘কাদা’ মানে সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন। আর ‘কানা আমরান মাকদিইয়া’ মানে আপনি ইতিমধ্যে গর্ভবতী হয়ে গেছেন। ﻓَﺤَﻤَﻠَﺘْﻪُ অতঃপর তিনি গর্ভে সন্তান ধারণ করলেন ﻓَﺎﻧﺘَﺒَﺬَﺕْ ﺑِﻪِ ﻣَﻜَﺎﻧًﺎ ﻗَﺼِﻴًّﺎ ঐ অবস্থায় এক দূরবর্তী স্থানে চলে গেলেন। গর্ভকালীন পুরো সময়টা তিনি লুকিয়ে থাকলেন। আর যখন সন্তান জন্ম দানের সময় আসলো… মনে রাখবেন, তিনি ছিলেন একজন অনভিজ্ঞ তরুণী। তাঁর পাশে সাহায্য করার মতো কেউ ছিল না। তিনি পূর্বে কখনো সন্তান জন্ম দেন নি। প্রসব বেদনা তাঁকে এক খেজুর বৃক্ষ-মূলে আশ্রয় নিতে বাধ্য করল। তিনি বললেনঃ হায়, আমি যদি কোনরূপে এর পূর্বে মরে যেতাম এবং মানুষের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে, যেতাম!
যেহেতু মারিয়াম (আঃ) এর গর্ভ ধারণ বা সন্তান জন্ম দানের কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। আর গর্ভ ধারণ এবং সন্তান জন্ম দান একজন মেয়েকে প্রায় মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে যায়। মহিলারা যারা শুনছেন তারা হয়তো ভাবছেন- হ্যাঁ, আমরা জানি। কিন্তু আমাদের পুরুষদের এ বিষয়ে কোন ধারনাই নেই। আমরা শুধু দেখতে পাই। যেহেতু গর্ভ ধারণ এবং সন্তান জন্ম দান একজন মেয়েকে প্রায় মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে যায়, মারিয়াম (আঃ) মনে করছিলেন তিনি মারা যাচ্ছেন।
আর ঠিক এমন সময়ে কে তাঁর সাথে কথা বলা শুরু করলো? ﻓَﻨَﺎﺩَﺍﻫَﺎ ﻣِﻦ ﺗَﺤْﺘِﻬَﺎ ﺃَﻟَّﺎ ﺗَﺤْﺰَﻧِﻲ জিব্রিল (আঃ) তাঁকে বললেন, দুঃখ পাবেন না, – জিব্রিল (আঃ) এই সময়টাতে তাঁকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন। আপনি মনে করছেন যে মানুষ আপনাকে নিয়ে কুৎসা রটনা করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো – একসময় মানব জাতির কাছে ওহী পাঠানো হবে আর তাতে উল্লেখ থাকবে যে, ﻭَﺍﺫْﻛُﺮْ ﻓِﻲ ﺍﻟْﻜِﺘَﺎﺏِ ﻣَﺮْﻳَﻢَ এ কিতাবে (উল্লেখিত) মারিয়ামের কাহিনী বর্ণনা করুন। আর দেখ ﻗَﺪْ ﺟَﻌَﻞَ ﺭَﺑُّﻚِ ﺗَﺤْﺘَﻚِ ﺳَﺮِﻳًّﺎ তোমার পালনকর্তা তোমার পায়ের তলায় একটি নহর জারি করেছেন। ﻭَﻫُﺰِّﻱ ﺇِﻟَﻴْﻚِ ﺑِﺠِﺬْﻉِ ﺍﻟﻨَّﺨْﻠَﺔِ আর তুমি খেজুর গাছের কান্ড ধরে তোমার দিকে নাড়া দাও, ﺗُﺴَﺎﻗِﻂْ ﻋَﻠَﻴْﻚِ ﺭُﻃَﺒًﺎ ﺟَﻨِﻴًّﺎ তাহলে তা তোমার উপর তাজা-পাকা খেজুর ফেলবে’। ﻓَﻜُﻠِﻲ ﻭَﺍﺷْﺮَﺑِﻲ ﻭَﻗَﺮِّﻱ ﻋَﻴْﻨًﺎ ”অতঃপর তুমি খাও, পান কর এবং চোখ জুড়াও।” তোমার বাচ্চা তোমার চক্ষু শীতলকারী হওয়ার কথা। তোমার বাচ্চার দিকে তাকাও, কষ্টের দৃষ্টিতে নয়, বরং সুখের দৃষ্টিতে।
অতঃপর দ্বিতীয় পরীক্ষা আসলো, যখন তোমার সম্প্রদায় তোমার সন্তান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে তখন তুমি নিজের সমর্থনে কোন কথা বলতে পারবে না। ইতিমধ্যে, মারিয়াম (আঃ) এর পূর্ণ বিশ্বাস তৈরি হয়ে গেল যে আল্লাহর সাহায্য তাঁর সাথে রয়েছে। তাই মারিয়াম (আঃ) যখন তাঁর সম্প্রদায়ের সম্মুখীন হলেন – তিনি জানতেন না যে আল্লাহ কিভাবে তাঁকে রক্ষা করবেন, তিনি জানতেন না আল্লাহ কি করতে যাচ্ছেন। কিন্তু যেহেতু তাঁকে সঠিক উপায়ে প্রশিক্ষিত করা হয়েছে, আল্লাহর উপর তাঁর নির্ভরতা চূড়ান্ত রূপে আবির্ভূত হলো। তিনি ভাবলেন, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।
আর ঠিকই আল্লাহ সুবহা হানাহু ওয়া তায়ালা তাঁকে পুরস্কৃত করলেন। তাঁর সমর্থনে তাঁর নতুন জন্ম গ্রহণ করা সন্তান ঈসা (আঃ) কথা বললেন। এখানে জিবরাইল (আঃ) ঈসা (আঃ) এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আল্লাহ সুব হা নাহু ওয়া তায়ালা বলেন, আমরা তাঁকে পবিত্র আত্মার (জিব্রিল আঃ) মাধ্যমে সাহায্য করেছি। এমনকি আল্লাহ এটাকে ঈসা আঃ এর প্রতি একটি অনুগ্রহ হিসেবেও উল্লেখ করেন। ”আমি তোমাকে পবিত্র আত্মার মাধ্যমে সাহায্য করেছি।” ঈসা আঃ কে জিবরাইল (আঃ) এর মাধ্যমে তাঁর সারা জীবন জুড়ে সাহায্য করা হয়। আর শুধু এটা নয়, বরং আলেমদের মতে, একমাত্র ফেরেশতা যিনি কোন নবীকে আকাশে নিয়ে যেতে পারেন তিনি হলেন জিব্রিল (আঃ) ।
তো, যখন ঈসা (আঃ) কে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করা হয়, তখন তাঁকে জীবিত অবস্থায় আকাশে উঠিয়ে নেয়ার জন্য একজন ফেরেশতা পাঠানো হয়। আর ঈসা আ একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আকাশে অপবস্থান করবেন। কিয়ামতের পূর্বে আল্লাহর হকুমে তাঁকে আবার পৃথিবীতে পাঠানো হবে। আর সে ফেরেশতা ছিলেন জিব্রিল (আঃ)। আমি এর তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করছিলাম যে, কেন আল্লাহ এই কথাটি কেন সূরা মারিয়ামে বলেছেন, ﻭَﻣَﺎ ﻧَﺘَﻨَﺰَّﻝُ ﺇِﻟَّﺎ ﺑِﺄَﻣْﺮِ ﺭَﺑِّﻚَ ”(জিব্রাইল বললঃ) আমি আপনার পালনকর্তার আদেশ ব্যতীত অবতরণ করি না।” এই আয়াতটি আসলে কি সম্পর্কে? বেশ কিছু দিনের জন্য জিব্রিল আঃ দেখা না দিলে রাসূল (সঃ) মনে মনে দুঃখ পেতেন।
আর তাই জিব্রিল আ রাসূল (সঃ) কে বললেন, দেখুন, আল্লাহর নির্দেশ পেলেই কেবল আমরা আপনার কাছে আসি। আমরা নিজেদের ইচ্ছামত আসতে পারি না, আমরা এই সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। আর এই কথাটি খুবই ব্যক্তিগত শোনায় যে, জিব্রিল (আঃ) বলছেন- ﻭَﻣَﺎ ﻧَﺘَﻨَﺰَّﻝُ ﺇِﻟَّﺎ ﺑِﺄَﻣْﺮِ ﺭَﺑِّﻚَ
কেন সূরা মারিয়মে? ইসলামি পণ্ডিতদের মতে, এই সূরায় বর্ণিত প্রত্যেক নবীর ঘটনায় জিব্রিল আ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। চিন্তা করে দেখুন, জাকারিয়া, মারিয়াম থেকে ঈসা, ইব্রাহীম, মূসা, ইদ্রিস, ইসমাইল (আঃ) – ওনাদের সবার জীবনে জিবরাইল (আঃ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই এই সূরাতেই রাসূল সঃ কে বলা হয়েছে, দেখুন, আমরা শুধু আল্লাহর হুকুমেই অবতরণ করি, জ্ঞান নিয়ে। আর তখন জিব্রিল (আঃ) এর আগমনে আপনি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন।
আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (সঃ) এর সাথী
ফেরেশতাদের মাঝে যিনি রাসূল (সঃ) এর সবচেয়ে নিকটবর্তী ছিলেন, যিনি রাসূল (সঃ) কে সহযোগিতা করেছেন, তাঁর প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করেছেন তিনি ছিলেন জিব্রিল আঃ। অন্য একটি বর্ণনায় রাসূল (সঃ) আরও বলেছেন, …… প্রত্যেক নবীকেই আল্লাহ সুব হানাহু ওয়া তায়ালা দুনিয়া থেকে দুইজন এবং আকাশ থেকে দুইজন মন্ত্রী দান করেছেন। আমাকে দেয়া আকাশের দুইজন মন্ত্রী হলেন – জিব্রিল এবং মিকাল। আর দুনিয়া থেকে প্রদত্ত দুইজন হলেন- আবু বকর এবং ওমর (রা)। জিব্রিল আ এবং রাসূল সঃ এর প্রথম সাক্ষাৎকারটি কেমন ছিল? আনাস ইবনে মালিক (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (সঃ) এর ছেলেবেলায় তিনি অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলছিলেন, দৌড়াদৌড়ি করছিলেন – ঠিক সকল বাচ্চার মত। হঠাৎ করে এক ব্যক্তির আবির্ভাব হলো। তিনি রাসূল (সঃ) কে ধরে মাটিতে শুইয়ে দিলেন। এটা দেখে অন্য বাচ্চারা তাদের পিতা-মাতার কাছে দৌড়ে চলে গেল আর বলতে লাগলো – মুহাম্মাদ (সঃ) কে হত্যা করা হয়েছে। অন্য বাচ্চারা যখন দৌড়ে পালাতে লাগলো, তখন রাসূল (সঃ) দেখছিলেন যে এই লোকটি তাঁকে কি করতে যাচ্ছে। আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেন, তিনি আমার বুক কেটে ফেললেন, তিনি আমার বুক খুলে ফেললেন। তিনি রাসূল (সঃ) এর হার্ট ধরলেন এবং তা থেকে কিছু একটা বের করে নিলেন আর বললেন- এটা হলো তোমার অন্তরের শয়তানের অংশ। তারপর তিনি এটাকে ফেলে দিলেন। তারপর তিনি সোনালি বর্ণের একটি পাত্রে রাখা জমজমের পানিতে আমার হার্ট ধুয়ে ফেললেন। আর এই বাচ্চাবস্থায় রাসূল (সঃ) সবকিছু অবলোকন করছেন। এরপর রাসূল (সঃ) এর হার্টকে আবার যথাস্থানে রেখে দেয়া হলো। অন্য বাচ্চারা ফিরে এসে দেখল যে রাসূল (সঃ) এর বুক সেলাই করে দেয়া হয়েছে। আর তাঁর মুখমণ্ডল নীল বর্ণ ধারণ করলো। রাসূল (সঃ) এর হার্ট বের করে পবিত্র করা হলো। সে সময় তিনি এই ঘটনার কোন ব্যাখ্যা খুঁজে পেলেন না। তিনি এই ঘটনায় চরম কষ্ট পেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন না যে এটা কি হল!!
ঠিক ৩৪ বছর পর, তিনি যখন ৪০ বছর বয়সে পদার্পণ করেন- আয়েশা রা বলেন, তিনি (সঃ) সত্য ভাল স্বপ্ন দেখতে লাগলেন। এটা তিনি একাধারে ৬ মাস যাবত দেখতে লাগলেন। তিনি রাতে যা স্বপ্নে দেখতেন তাই দিনের বেলায় সত্যে পরিণত হতো। তিনি উপলব্ধি করলেন যে, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। এ থেকে আমরা কিছুটা বুঝতে পারি যে, কেন হঠাৎ করে রাসূল (সঃ) গুহায় গিয়ে ধ্যানমগ্ন হতে লাগলেন এবং প্রার্থনা করতে লাগলেন। তিনি এবং খাদিজা (রা) বুঝতে পারলেন যে, অতি প্রাকৃতিক কিছু ঘটছে। ঐশ্বরিক কেউ একজন তাদের সাথে যোগাযোগ করছে। কোন এক ধরণের বিশেষ সৃষ্টি তাদের সাথে যোগাযোগ করছে। এ অবস্থা ৬ মাস যাবত চলল।
আয়েশা (রা) বলেন, তারপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নির্জনতাকে রাসূল (সঃ) এর নিকট প্রিয় করে দিলেন। হঠাৎ করেই তিনি একা থাকতে পছন্দ করা শুরু করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) হেরা গুহায় আরোহণ করতেন। হেরা গুহায় আরোহণ করতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। আপনারা যদি কখনো হেরা গুহায় উঠেন তাহলে সম্পূর্ণ মক্কাকে দৃষ্টি সীমায় দেখতে পাবেন। সুবহান আল্লাহ! আপনি সবকিছু দেখতে পাবেন।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) দিনের পর দিন, কখনো পুরো সপ্তাহ জুড়ে, অবশেষে পুরো রমজান মাস সেখানে অবস্থান করেন। তিনি সেখানে দ্বীনে হানিফ তথা ইব্রাহীম আঃ এর শেখানো পন্থায় এক আল্লাহর ইবাদাত করতেন। অর্থাৎ তিনি সেখানে গিয়ে যেভাবে পারতেন আল্লাহর ইবাদাত করতেন, সুশৃঙ্খল কোন নামাজের নিয়ম তখন জানা ছিল না। তিনি ইব্রাহীম আঃ এর রেখে যাওয়া নিয়মে আল্লাহকে ডাকতেন, ঠিক এটাই বর্ণিত আছে। তো, হঠাৎ করে একদিন তিনি জিব্রিল আঃ কে দেখতে পান। আপনাদের কি মনে হয়, তখন জিব্রিল আঃ কি ফেরেশতার আকৃতিতে দেখা দেন, না মানুষের আকৃতিতে? মানুষের আকৃতিতে।
আপনারা হয়তো ভাবছেন, রাসূল (সঃ) তাহলে ভয় পেলেন কেন? চিন্তা করে দেখুন, আপনি হয়তো দুই ঘণ্টা ধরে সেখানে অবস্থান করছেন, আশে পাশে কেউ নেই। তারপর আচমকা গুহার মুখে এক অপরিচিত লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন, আর সে লোকটি আপনার দিকে এক নজরে তাকিয়ে রইলো, কোন কথা বলছে না। আপনি যদি রাসূল (সঃ) এর জায়গায় থাকতেন, আপনি কি ভাবতেন? তাছাড়া পরবর্তী কালের বর্ণনা থেকে আমরা ধারণা পাই তখন কি ঘটেছিল রাসূল (সঃ) এর প্রতি? রাসূল (সঃ) যখন খাদিজা (রা) এর নিকট ঘটনা বর্ণনা করছিলেন, তিনি বলেন- ”যাকে আমি স্বপ্নে দেখি সে আমার নিকট এসেছিল।” সুতরাং আমরা আরও বুঝলাম যে, রাসূল (সঃ) ইতিমধ্যে জিব্রিল (আঃ) কে স্বপ্নে দেখেছিলেন। তো, তিনি চিন্তা করছিলেন – আজব তো, আমি তো এখন ঘুমাচ্ছি না। আমি তো স্বপ্নে নই, বাস্তবে!! এর থেকে জিবরাইল (আঃ) কেন রাসূল (সঃ) কে জড়িয়ে ধরেছিলেন তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এটা স্বপ্ন নয়, বাস্তব। ‘ইকরা’ পড়ুন। পড়ুন, আপনি কল্পিত কিছু দেখছেন না। এটা কল্পিত কোন ছায়ামূর্তি নয়। আমি বাস্তবেই আপনার সামনে। আমি আপনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরছি শুধু আমার বাস্তবতা বুঝাতে নয়, ﺇِﻧَّﺎ ﺳَﻨُﻠْﻘِﻲ ﻋَﻠَﻴْﻚَ ﻗَﻮْﻟًﺎ ﺛَﻘِﻴﻠًﺎ যে ওহী আপনার উপর নাযিল হতে যাচ্ছে তা হবে অত্যন্ত ভারী।
এ বাণী ধারণ করার জন্য আপনাকে প্রস্তুত হতে হবে। অতঃপর তিনি তাঁকে আদেশ করলেন, পড়ুন। তারপর রাসূল সঃ কে ছেড়ে দিলেন। রাসূল (সঃ) বললেন – আমি পড়তে জানি না। জিব্রিল (আঃ) তাঁকে আবার আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন এবং বললেন- পড়ুন। রাসূল (সঃ) বললেন – আমি পড়তে জানি না। জিব্রিল (আঃ) রাসূল (সঃ) কে তৃতীয়বারের মত শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। (পরবর্তী কালে রাসূল সঃ বর্ণনা করেন) জিব্রিল (আ) আমাকে এতো শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন যে আমি মনে করছিলাম আমি মারা যাবো। তিনি বললেন- পড়ুন। রাসূল (সঃ) বললেন- কি পড়বো? ঠিক তখন জিব্রিল (আঃ) বললেন- ﺍﻗْﺮَﺃْ ﺑِﺎﺳْﻢِ ﺭَﺑِّﻚَ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺧَﻠَﻖَ পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন ﺧَﻠَﻖَ ﺍﻟْﺈِﻧﺴَﺎﻥَ ﻣِﻦْ ﻋَﻠَﻖٍ যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন ‘আলাকা’ থেকে। ﺍﻗْﺮَﺃْ ﻭَﺭَﺑُّﻚَ ﺍﻟْﺄَﻛْﺮَﻡُ পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না। রাসূল (সঃ) যখন ওহী গ্রহন করছিলেন- জিব্রিল (আঃ) তাঁকে আর জড়িয়ে ধরলেন না। আবার চলেও গেলেন না। রাসূল (সঃ) গুহা ত্যাগ করে তাড়াতাড়ি নেমে গেলেন।
খাদিজা (রা) বলেন- কি হয়েছে? এখন দেখুন, রাসূল (সঃ) যখন তাঁকে বললেন কি ঘটেছে খাদিজা (রা) সহজেই তাঁকে বলতে পারতেন- আপনি ঐ গুহায় যাওয়া বন্ধ করুন। আপনার মনে হয় বাসায় থাকা উচিত। ভুলে যান সবকিছু। আপনি ঘরের ঐ কোণায় ধ্যান করতে পারেন। কেউ আপনাকে ডিস্টার্ব করবে না। ইনশাআল্লাহ, এ রকম কিছু আর ঘটবে না। কিন্তু তিনি এসবের কিছুই বললেন না। দেখুন, কেমন চমৎকার ছিলেন তিনি। সুব হানাল্লাহ! রাসূল সঃ নিজে নিজের উপর বিশ্বাস করার আগে খাদিজা তাঁর উপর বিশ্বাস করেন। সত্যিই। তিনিই রাসূল সঃ কে বলেন …… আল্লাহ কখনই আপনাকে অপমানিত করবেন না। তিনি আমাদের রাসূল সঃ এর গত ১৫ বছরের জীবনী বর্ণনা করতে লাগলেন। আপনি এমন মানুষ যিনি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করেন। আপনি এতিমদের, গরীবদের যত্ন নেন। আপনি আপনার প্রতিবেশী এবং মেহমানদের প্রতি উদার। কেউ কোন সমস্যায় পড়লে আপনি তার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। আল্লাহ কখনই আপনাকে অপমানিত করবেন না।
খাদিজা (রা) বললেন – চলুন, ওয়ারাকার কাছে যাই। তো, তাঁরা তার নিকট গেলেন। রাসূল (সঃ) যা দেখলেন তা ওয়ারাকার নিকট বর্ণনা করলেন। ওয়ারাকা সাথে সাথে বলে উঠলেন – ”ইনি নামুস! (আপনিই সেই রাসূল যার জন্য সবাই অপেক্ষা করছে।) এই ফেরেশতাই (নামুস বা জিব্রিল) মূসার (আঃ) কাছে এসেছিলেন। ইস! আমি যদি যুবক হতাম! তাহলে আপনাকে সাহায্য করতে পারতাম! যখন আপনার সম্প্রদায় আপনার বিরোধিতা করবে।”
এরপর কি ঘটেছিল? আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন – এরপর বহুদিন যাবত ওহী অবতীর্ণ হওয়া বন্ধ থাকে। রাসূল (সঃ) অপেক্ষা করতে লাগলেন যেন সেই ফেরেশতা আবার দেখা দেন। রাসূল (সঃ) আবার ওইসব পাহাড়ে ঘুরতে লাগলেন। রাসূল (সঃ) নিজের ভাষায় তা এভাবে বর্ণনা করেন যে, ”(তাঁর মানসিক অবস্থা এমন ছিল যে) তিনি যেন চাইতেন নিজেকে পাহাড় থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে!” তিনি স্পষ্টরূপে জানতে চান কি ঘটছে! প্রতিবার রাসূল (সঃ) পাহাড়ে গেলে জিব্রিল (আঃ) এর কণ্ঠ শুনতে পেতেন। ”ও মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহর সত্য রাসূল।” এতে রাসূল (সঃ) কিছুটা সান্ত্বনা পেতেন এবং ঘরে ফিরে আসতেন।
এরপর পরবর্তীতে তিনি শুধু যে ”ও মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহর সত্য রাসূল।” এ কথা বলতেন তা নয়, তিনি আরও বলতেন – ”আর আমি জিব্রিল”। তো, তিনি রাসূল (সঃ) এর নিকট বিষয়টা পরিষ্কার করলেন যে তিনি জিব্রিল (আঃ)। কিন্তু তবু কোন কুরআন বা ওহী অবতীর্ণ হয়নি। অবশেষে, অন্য একদিন রাসূল (সঃ) হাঁটছিলেন – আর এবার ‘ইয়া মুহাম্মাদ ইন্নাকা রাসূলুল্লাহি হাক্কা’- ”ও মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহর সত্য রাসূল” এ বাক্য নয়। বুখারি শরীফে জাবির (রা) থেকে বর্ণিত আছে- রাসূল (সঃ) হাঁটছিলেন তারপর হঠাৎ উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলেন – জিব্রিল আলাইহিস সালাম তাঁর পরিপূর্ণ ফেরেশতার আকৃতি ধারণ করে সম্পূর্ণ আকাশ ঢেকে আছেন, সম্পূর্ণ দিগন্তকে ঢেকে আছেন।
আল্লাহ জিব্রিল (আঃ) সম্পর্কে বলেছেন – ﺫُﻭ ﻣِﺮَّﺓٍ ﻓَﺎﺳْﺘَﻮَﻯٰ প্রজ্ঞার অধিকারী, সে নিজ আকৃতিতে স্থির হয়েছিল। জিব্রিল (আঃ) পুরো আকাশ জুড়ে আবির্ভূত হলেন। রাসূল (সঃ) জিব্রিল (আঃ) কে তাঁর সকল ডানা সমেত, পরিপূর্ণ আকৃতিতে দেখতে পেলেন। ﺛُﻢَّ ﺩَﻧَﺎ ﻓَﺘَﺪَﻟَّﻰٰ তিনি রাসূল (সঃ) এর নিকটবর্তী হতে লাগলেন। তিনি রাসূল (সঃ) থেকে মাত্র দুই ধনুকের দূরত্বে ছিলেন। তিনি রাসূল (সঃ) এর কাছাকাছি আসলেন। রাসূল (সঃ) জমিনে পড়ে গেলেন। তিনি নিজেই বলেছেন যে – ”তিনি আমার অতি নিকটবর্তী হওয়াতে আমি এত ভয় পেয়েছিলাম যে আমি মাটিতে পড়ে গেলাম।”
রাসূল (সঃ) দ্রুত বাড়িতে ফিরে গেলেন আর খাদিজা (রা) কে বলতে লাগলেন – আমাকে ঢেকে দাও, আমাকে ঢেকে দাও। আর ঠিক তখন পরবর্তী ওহী অবতীর্ণ হয় – ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟْﻤُﺪَّﺛِّﺮُ – ﻗُﻢْ ﻓَﺄَﻧﺬِﺭْ – ﻭَﺭَﺑَّﻚَ ﻓَﻜَﺒِّﺮْ – ﻭَﺛِﻴَﺎﺑَﻚَ ﻓَﻄَﻬِّﺮْ
হে চাদরাবৃত! উঠুন, সতর্ক করুন, আপন পালনকর্তার মাহাত্ম্য ঘোষনা করুন, আপন পোশাক পবিত্র করুন। সুবহানাল্লাহ, চিন্তা করে দেখুন, প্রথম ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় তিনি হেরা গুহায় ছিলেন আর দ্বিতীয়বার তিনি যখন খাদিজা (রা) কাছে ছিলেন তখন ওহী অবতীর্ণ হয়। ”হে চাদরাবৃত! উঠুন, সতর্ক করুন, আপন পালনকর্তার মাহাত্ম্য ঘোষনা করুন, আপন পোশাক পবিত্র করুন।” মূর্তি পরিত্যাগ করুন। এই হলো প্রথমদিকের ওহী অবতীর্ণ হওয়ার ঘটনা। আয়েশা (রা) বলেন- এর পর থেকে একটির পর একটি ওহী অবতীর্ণ হতে থাকে। অর্থাৎ দীর্ঘ বিরতির পর আসে সূরা মুদ্দাসসির, সূরা মুজ্জাম্মিল, সূরা দোহা এবং আরও অনেক সূরা ক্রমাগত রাসূল (সঃ) এর নিকট অবতীর্ণ হতে থাকে। এভাবেই শুরু।
রাসূল (সঃ) এখন বুঝতে পারলেন কি ঘটছে, তিনি বুঝতে পারলেন যে তিনি আল্লাহর রাসূল। রাসূল (সঃ) এখন আর জিব্রিল (আ) এর উপস্থিতিকে ভয় পান না। বিষয়টা তাঁর (সঃ) কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল।
জিব্রীল (আ) এবং রাসূল (সঃ) এর মাঝে ব্যক্তিগত কথোপকথন। জিব্রিল (আঃ) রাসূল (সঃ) এর ঘরে বহুবার এসেছিলেন, তাঁর সাথে কথা বলতেন। বিভিন্ন সময় কোন কোন সাহাবী তাঁকে দেখতে পেতেন আবার কেউ কেউ দেখতে পেতেন না। একদিন আব্বাস (রা) তার সন্তান আব্দুল্লাহ (রা) কে নিয়ে রাসূল (সঃ) এর সাথে সাক্ষাত করতে আসেন। আব্বাস (রা) রাসূল (সঃ) কে সম্বোধন করে কথা বলছিলেন, কিন্তু তিনি সাড়া দিচ্ছিলেন না। রাসূল (সঃ) কোন কথা না বলাতে আব্বাস (রা) চলে যান। চলার পথে আব্বাস (রা) আব্দুল্লাহ (রা) কে বললেন, তোমার চাচাতো ভাই কেন আমার সাথে কথা বলল না। তিনি মনে হয়ে যেন আমাকে দূরে ঠেলে দিলেন! আব্দুল্লাহ (রা) বললেন – আপনি কি দেখেন নি যে রাসূল (সঃ) তাঁর সামনে বসা এক লোকের সাথে কথা বলছিলেন। আব্বাস (রা) বললেন- কোন মানুষ? আমি তো কাউকে দেখলাম না। তো, আব্বাস (রা) আবার রাসূল (সঃ) এর কাছে ফিরে আসলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন- তখন কেউ কি আপনার সাথে কথা বলছিল? রাসূল (সঃ) বললেন- আপনি কেন এটা জিজ্ঞেস করছেন? আব্বাস (রা) বললেন- কারণ আব্দুল্লাহ তাঁকে দেখতে পেয়েছিল। রাসূল (সঃ) বললেন- ‘রাআ’- সে দেখেছে? আব্বাস (রা) বললেন- জী, দেখেছি। তারপর রাসূল (সঃ) আব্দুল্লাহ (রা) এর জন্য দোয়া করেন যেন আল্লাহ তাঁর জ্ঞান বাড়িয়ে দেন।
তো, রাসূল (সঃ) এর সাথে জিব্রিলের ব্যক্তিগত কথোপকথন টা কেমন ছিল? রাসূল (সঃ) জিব্রিল (আ) কে বললেন – আল্লাহ বলেছেন যে – আমি আপনাকে (রাসূল সঃ কে) সকল জগতবাসীর জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন- আমার রহমতের কোন অংশ কি আপনার পর্যন্ত পৌঁছেছে? মানে, আপনিও তো জগতের অংশ, আপনি ফেরেশতাদের জগত থেকে, কোন রহমা কি আপনার পর্যন্ত পৌঁছেছে? জবাবে জিব্রিল (আ) বললেন- ”আল্লাহর শপথ! ও মুহাম্মাদ! আপনি আমার সবচেয়ে প্রিয় নবী।” মানে, আমাকে আজ পর্যন্ত এমন কারো কাছে পাঠানো হয়নি, যাকে আমি আপনার থেকে বেশি ভালবাসি। তিনি আরও বললেন- ”আপনার মাধ্যমেই আমি নিরাপত্তা লাভ করেছি।” এটা দ্বারা তিনি আসলে কি বুঝালেন? তিনি বললেন- আমি আমার ভাগ্য নিয়ে চিন্তায় থাকতাম, যতক্ষণ না আপনার নিকট এই আয়াত অবতীর্ণ হলো – ﺫِﻱ ﻗُﻮَّﺓٍ ﻋِﻨْﺪَ ﺫِﻱ ﺍﻟْﻌَﺮْﺵِ ﻣَﻜِﻴﻦٍ – যে শক্তিশালী, আরশের মালিকের নিকট মর্যাদাসম্পন্ন, প্রতিষ্ঠিত। secure [in position]।
জিব্রিল (আঃ) রাসূল (সঃ) কে ক্রমাগত আশ্বস্ত করতে লাগলেন। মাদানী জীবনের অনেক ব্যক্তিগত আলোচনায় জিব্রিল (আঃ) বারবার রাসূল (সঃ) কে আশ্বস্ত করার ব্যাপারটা দেখা যায়। কেন? কারণ, দেখুন, রাসূল (সঃ) জানলেন যে, তিনি এবং বিশ্বাসীরা নিরাপদ। কিন্তু রাসূল (সঃ) এখন কাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন? আমাদের নিয়ে – যারা পরবর্তীতে আসবে। তাই তিনি উম্মাতি, উম্মাতি বলে কাঁদতেন। তাই, আল্লাহ জিব্রিল (আঃ) কে পাঠালেন। জিব্রিল (আঃ) বললেন- ইয়া, মুহাম্মাদ! আমরা আপনার উম্মাতের বিষয়ে আপনাকে সন্তুষ্ট করে দিব, আমরা আপনাকে হতাশ করবো না। আপনার উম্মত ঠিক থাকবে।
তিনি মদিনায় রাসূল (সঃ) কে বার বার নিশ্চয়তা দিতেন। কারণ রাসূল (সঃ) পরবর্তীতে আসা উম্মাত নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতেন। সাহাবীরা নিরাপদ। কিন্তু যারা পরবর্তীতে আসবে তাদের কি হবে? আরেকবার, ওমার (রা) বলেন, আর এটা বুখারিতে বর্ণিত আছে- আমি একবার মদিনাতে রাসূল (সঃ) এর সাথে হাঁটছিলাম, হাঁটতে হাঁটতে আমরা মদিনার ‘হাররা’ নামক এক জায়গায় উপস্থিত হলাম। তিনি আমাকে এখানে বসতে বললেন। হঠাৎ তিনি হাঁটতে লাগলেন, আর তখন স্পষ্টত তিনি জিব্রিল (আ) এর সাথে কথা বলছিলেন। আমি আপনাদের বলতে পারি তিনি জিব্রিল (আঃ) এর সাথে কথা বলছিলেন। তারা কিছুক্ষণের জন্য হাঁটলেন আর আমি বসে থাকলাম। আর এই হাটাবস্থায় রাসূল (সঃ) বলছেন- ‘ও ইন যানা ওয়া সারাক’ ‘ও ইন যানা ওয়া সারাক’ ‘ও ইন যানা ওয়া সারাক’ এমনকি যদি সে জিনা করে বা চুরি করে? এমনকি যদি সে জিনা করে বা চুরি করে? আর ওমর (রা) উত্তর শুনতে পাচ্ছিলেন না। তো, ওমর (রা) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ঐটা কি ছিল? রাসূল (সঃ) বললেন, তিনি ছিলেন জিব্রিল (আঃ)। তিনি এসেছিলেন আমাকে সুসংবাদ দিতে যে, এই উম্মতের প্রত্যেক ব্যক্তি অবশেষে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাই রাসূল (সঃ) বললেন, এমনকি যদি সে জিনা করে বা চুরি করে? – হ্যাঁ, এমনকি যদি জিনা বা চুরি করে। অবশেষে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তো, তিনি রাসূল (সঃ) কে এভাবে সান্ত্বনা দিলেন।
রাসূল ﷺ যখন শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন জিব্রিল কিভাবে সান্ত্বনা দিতেন? রাসূল ﷺ যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, তিনি বলেন, জিব্রিল আমার কাছে আসলেন এবং বললেন- ও মুহাম্মাদ! আপনি কি অসুস্থ? আমি বললাম – হ্যাঁ। তখন জিব্রিল তাঁর হাত দিয়ে আমার মুখমণ্ডল এবং বক্ষ মুছে দিলেন এবং বললেন- ‘বিসমিল্লাহি আরকিকা মিন কুল্লি শাইয়িন ইয়ুজিকা’। আল্লাহর নামে আমি আপনার জন্য আরোগ্য প্রার্থনা করছি সবকিছু থেকে যা আপনার ক্ষতি করছে – ”মিন সাররি কুল্লি নাফসিন আও আইনিন, আও হা-সিদ।” সকল খারাপ জিনিস থেকে অথবা বদ নজর থেকে বা হিংসা থেকে। আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দান করুন। আল্লাহর নামে আমি আপনার জন্য আরোগ্য প্রার্থনা করছি। কিন্তু তখন ব্যাপারটা কেমন ছিল যখন জিব্রিল (আঃ) রাসূল ﷺ কে জীবন সম্পর্কে কোন উপদেশ দিতেন! এখন আমি আপনাদেরকে যে বিষয়টি বলবো সেটি রাসূল ﷺ এর জীবনের শেষ দিককার। জিব্রীল (আলাইহিস সালাম) রাসূল ﷺ এর নিকট এসে বললেনঃ হে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), আচ্ছা, আল্লাহ কি কুরআনে কখনও এভাবে বলেছেন ‘হে মুহাম্মাদ’? না। ইয়া নাবিয়াল্লাহ, ইয়া রাসূলাল্লাহ – ও আল্লাহর নবী, ও আল্লাহর রাসূল (এভাবে বলেছেন)। তাহলে জিব্রীল (আলাইহিস সালাম) কি করে ‘ইয়া মুহাম্মাদ’ বলার সাহস করলেন? আলেমরা বলেন যে, যখন জিব্রীল (আলাইহিস সালাম) বলেন, ‘ইয়া মুহাম্মাদ’, এর মানে হলোঃ তিনি নবীﷺ কে এটা বুঝাতে চাচ্ছেন যে, এখনকার বিষয়টি ওহীর বাইরের বিষয়। যখন আমি আপনাকে ‘ইয়া মুহাম্মাদ’ বলি, তার মানে বিষয়টি আপনি মুহাম্মাদ আর আমার মধ্যকার। সুতরাং এটা হলো কেবল এমন একক সময় যখন জিব্রাইল ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ বলে সম্বোধন করলেন না। কারণ এখন আমি এমন কথা বলবো যা কেবল আপনার আর আমার মাঝে। বিষয়টি বুঝতে পারছেন আশা করি।
সুতরাং তিনি বলেনঃ হে মুহাম্মাদ, ৫টি উপদেশ দিচ্ছি আপনাকে।
১। আপনি যেভাবে খুশি জীবন যাপন করুন। কিন্তু একথা মনে রাখবেন যে আপনি একদিন মৃত্যুবরণ করতে যাচ্ছেন। একদিন আপনি মরবেনই।
২। তিনি আরো বলেন, আপনি যাকে খুশি ভালোবাসেন। কিন্তু মনে রাখবেন যে একদিন আপনি তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন।
৩। আপনি যা খুশি তাই করতে পারেন। কিন্তু একথা স্মরণে রাখবেন যে, আপনার কর্ম অনুযায়ী আপনাকে প্রতিফল দেয়া হবে। প্রতিদান আখিরাতেই পাবেন।
এর মানে কি? মানে হলো, প্রত্যেকটি বিষয় আখিরাতে আসবে, প্রত্যেকটি পুরষ্কারই আখিরাতে দেওয়া হবে। আপনি যা করেন তা করতে থাকুন আর মনে রাখবেন যে এর বদলা আখিরাতে পাবেন।
৪। জেনে রাখুন, একজন বিশ্বাসীর জন্য সত্যিকারের আভিজাত্য রাত্রি বেলা নামাজে দাঁড়ানোর মাঝে।
৫। আর তার প্রকৃত মর্যাদা আত্মনির্ভরশীলতার মাঝে।
আর্থিকভাবে, আবেগের দিক থেকে, মানসিকভাবে বা শারীরিকভাবেই হোক, একজন মানুষ হিসেবে আপনার সম্মান ও মর্যাদা অন্য মানুষের উপর নির্ভর না হওয়ার প্রচেষ্টার মাঝে। যে কোন ব্যাপারেই হোক না কেন নিজেকে মানুষের প্রয়োজন থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করুন।
এরপর রাসূল ﷺ জীবনের অন্তিম সময় অনুভব করতে থাকেন। আর যখন অবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপ হতে থাকে… আবু সাইদ খুদরী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করে বলেনঃ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবাদের মাঝে অবস্থান করছিলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুব সাধারণভাবে বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর এক বান্দাকে এ এখতিয়ার দিয়েছেন যে বান্দাহ হয় দুনিয়ার শান শওকত থেকে পছন্দ করবে অথবা যা কিছু আল্লাহর কাছে রয়েছে তা থেকে পছন্দ করতে পারবে। তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাড়িতে সবাই কাঁদছিল, কারণ সবাই জানতো যে রাসূল ﷺ এর অন্তিম সময় চলে এসেছে, তিনি শেষ সময়ের নিটকবর্তী হয়েছেন। বিশেষ করে ফাতিমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) ভীষণভাবে বিধ্বস্ত হলেন।
তাঁর কন্যা, উম্মু আবিহা, তাঁর পিতার মা, (বাবারা নিজ কন্যাদের আদর করে মা বলে ডাকেন) সর্বদা তাঁর ﷺ সাথে ছিলেন ঐ সময়ে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার প্রতি ভালবাসা দেখালেন, মমতা দেখালেন। এমনকি যখন তিনি কোনোরকমভাবে কথাও বলতে পারছিলেন না, তখনও তিনি হাতের ইশারায় ফাতিমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)-কে ডাকলেন। ফাতিমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) কাছে আসলেন, রাসূল ﷺ তাকে আরো নিকটে আসতে বললেন এবং চুপিসারে তার কানে কিছু বললেন। ফলে ফাতিমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) আরো বেশি কাঁদতে লাগলেন। রাসূল ﷺ তাকে পুনরায় কাছে আসতে বললেন এবং চুপিসারে আরো কিছু কথা বললেন। এবার একথা শুনে ফাতিমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) হাসিতে ফেটে পড়লেন! আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) এগুলো দেখে হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন যে একবার ফাতিমা কাঁদলো আবার হঠাৎ করেই হাসিতে ফেটে পড়লো! সুতরাং তিনি ফাতিমা কে চাপাচাপি করছিলেন যে- বলো না কি বলেছেন তিনি? বলছো না কেন?! কি বলেছেন তিনি? শেষে ফাতিমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা)জোরারোপের কারণে বলতে বাধ্য হলেন যে, তিনি বলেছেন, জিব্রীল সাধারণত প্রতি রামাদানে আমাকে নিয়ে পুরো কুরআন একবার ঝালিয়ে নেন। আর এই বছর রামাদানে তিনি দুইবার পুন:পাঠ করেছেন। তাঁর মানে হলো, জিব্রীল (আলাইহিস সালাম) ওহীকে শক্তিশালী করে দিলেন। আর আমার মনে হয় না আমি আর রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করতে পারবো।
আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) রাসূল ﷺ – কে যেখানে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন সেখানে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে দৃঢ় হতে সাহায্য করেন আর এমতাবস্থায় রাসূল ﷺ তার শরীরে হেলান দিয়ে আছেন। তাঁর দৃষ্টি পড়লো আব্দুর রাহমান ইবনে আবু বাকার (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) এর ওপর, যিনি আয়েশার (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) এর ভাই। তিনি দেখলেন তার পকেটে একটি মিসওয়াক রয়েছে এবং আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন যে আমি বুঝতে পারছিলাম যে রাসূল ﷺ এটি পেতে চাচ্ছেন। আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) রাসূল ﷺ কে বললেন, আপনি মিসওয়াক চান? রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাথা নাড়িয়ে স্বীকৃতি জানালেন। আব্দুর রাহমান তাঁর অব্যবহৃত মিসওয়াকটি আয়েশা(রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) কে দিলেন। তিনি এটাকে চিবিয়ে নরম করলেন এবং রাসূল ﷺ এর মুখে পুরে দিলেন। এর সাংকেতিক অর্থ হলো, রাসূল ﷺ প্রত্যেক ওয়াক্ত সালাতের পূর্বে মিসওয়াক করতেন। কারণ তিনি চাইতেন যে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতকালে যেন তাঁর শ্বাস প্রশ্বাস বিশুদ্ধ থাকে, প্রতিদিনই ৫ বার। তিনি বললেন, তিনি এটিকে ফরজ করতে পারতেন, যদি উম্মাতের জন্য কষ্টকর না হতো। তিনি আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের পূর্বে প্রত্যেকবারই মিসওয়াক করতেন।
আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, যখন তিনি মিসওয়াক করা সমাপ্ত করলেন, তখনই জিব্রীল (আলাইহিস সালাম) আমাদের মাঝে প্রবেশ করলেন। তিনি (আয়েশা) রাসূল এর দিকে তাকালেন আর দেখতে পেলেন তাঁর চেহারা আলোয় উদ্ভাসিত হলো। জিব্রীল (আলাইহিস সালাম); যিনি নবীকে ওপরের উপদেশগুলো দিয়েছিলেন, তিনি নবী ﷺ কে বললেন, শুনুন, আমি আপনাকে একটি বিষয়ে পছন্দ করতে বলবো। হয়তো আপনি আপনার সাহাবীদের সাথে থাকবেন এবং সুন্দরভাবে জীবন-যাপন করবেন অথবা আপনি “সর্বোচ্চ” (আল-আ’লা); আল্লাহ এর সাহচর্যে থাকবেন। জিব্রীল (আলাইহিস সালাম) যখন এই কথাটি বললেন, তখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার উত্তরে বললেন, ‘বালা, রাফিকিল আ’লা’, ‘আল্লাহুম্মা রাফিকিল আ’লা’- ওহ আল্লাহ, আমি সর্বোচ্চ (আল্লাহ) এর সাহচর্য কামনা করি। আয়িশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, যখন তিনি ‘আর রাফিকিল আ’লা’ বলছেন, তিনি যেন তাঁর সমস্ত শরীরকেই ছেড়ে দিচ্ছেন! ”ওহ আল্লাহ, আল্লাহর সাহচর্য!” বলতে বলতে তাঁর হাত পড়ে গেলো এবং নবী ﷺ মৃত্যুবরণ করলেন।
যখন এই ঘটনা হলো, আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) চিৎকার করে উঠলেন। ফাতিমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) যখন আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) এর চিৎকার শুনতে পেলেন, তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ইয়া আবাতা, মান রাব্বিহি মা আদনা’ – হে আমার পিতা, আপনি আপনার রবের কতটা সন্নিকটে আছেন এখন! হে আমার পিতা, আমরা জিব্রীলের (আলাইহিস সালাম) এর নিকট আপনার মৃত্যুর সংবাদ ঘোষণা দিচ্ছি। ‘ইয়া আবাতা, জান্নাতুল ফিরদাউসি মা’ওয়া’ – হে আমার পিতা, জান্নাতই আপনার বর্তমান ঠিকানা! এবং একথাটিই তিনি বারবার বলতে থাকলেন, বলতেই থাকলেন, বলতেই থাকলেন। ”আপনি আপনার রবের কতটা নৈকট্যে আছেন, জিব্রীলের নিকট আপনার প্রস্থানের ঘোষণা দিচ্ছি এবং জান্নাতুল ফিরদাউস-ই আপনার আবাসস্থল।”
জিব্রাইল আলাইহিস সালামের মৃত্যু।
সুবহানাল্লাহ, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মৃত্যুবরণ করেছেন এবং প্রত্যেকেই মৃত্যুবরণ করবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, এমনকি জিব্রীল-ও মৃত্যুবরণ করবে। চিন্তা করতে পারেন, জিব্রীল (আলাইহিস সালাম)- ও মারা যাবেন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, সিংগায় ফুতকার দেওয়ার পর আল্লাহ যাদের চান তারা ছাড়া আর কেউ স্থির থাকতে পারবে না (অন্য সবাই মৃত্যুবরণ করবে)। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা তাদেরকে তাঁর সম্মুখে নিয়ে আসবেন, তারা হলেনঃ জিব্রীল, ইস্রাফিল, মিকাল ও মৃত্যুর ফেরেশতা … যারা আল্লাহর আদেশ সমূহের বাস্তবায়ন করে থাকেন। আল্লাহ মৃত্যুর ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস করবেন, আর কারা কারা বাকী আছে? মৃত্যুর ফেরেশতা বলবেন, ওহ আল্লাহ, আপনার সম্মানিত পবিত্র চেহারা (পূর্ণ সত্ত্বা), আপনার বান্দা আমি, আপনার বান্দা জিব্রীল, আপনার বান্দা মিকাল, আপনার বান্দা ইস্রাফিল। আল্লাহ বলবেন, মিকালের আত্মা নিয়ে নাও। তখন মিকালের আত্মা নিয়ে নেওয়া হবে। তখন আল্লাহ পূনরায় বলবেন, আর কে কে বাকী আছে? তিনি বলবেন, ওহ আল্লাহ, আপনি, আমি, জিব্রীল এবং ইস্রাফিল। আল্লাহ বলবেন, ইস্রাফিলের আত্মা নিয়ে নাও। ইস্রাফিলের আত্মা তাঁর থেকে নিয়ে নেওয়া হবে। আল্লাহ আবারও বলবেন, আর কারা বাকী আছে? তিনি বলবেন, ওয়াজহুকাল বাকিল কারিম – ওহ আল্লাহ, আপনার পবিত্র চেহারা, আপনার এই বান্দা এবং আপনার বান্দা জিব্রীল। আমরা দুই বান্দা সবশেষে বাকী রয়েছি। আল্লাহ বলবেন, জিব্রীলের আত্মা নিয়ে নাও। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, জিব্রীল তাঁর চেহারা নিয়ে পতিত হবেন এমন অবস্থায় যে তাঁর ডানাগুলো বিস্তৃত অবস্থায় থাকবে আর সেগুলো আল্লাহর প্রশংসা করতে থাকবে। তিনি তাসবিহ (আল্লাহর প্রশংসা)-রত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবেন। তাঁর চেহারা নিম্নে পতিত হবে এমতাবস্থায় তিনি আল্লাহর প্রশংসারত থাকবেন। এরপর আল্লাহ বলবেন, আর কে বাকী আছে? তখন মৃত্যুর ফেরেশতা বলবেন, ইয়া আল্লাহ, কেবল আপনি আর আমিই বাকী আছি। আল্লাহ মৃত্যুর ফেরেশতাকে আদেশ করবেন মৃত্যুবরণ করার জন্য। আর মৃত্যুর ফেরেশতা মারা যাবেন। আর আল্লাহ বলবেন, “কুল্লু মান আলাইহা ফান, প্রত্যেক ব্যক্তিই ধবংসপ্রাপ্ত হবেন, ওয়া ইয়াবকা ওয়াজহু রাব্বিকা জুলজালালি ওয়াল ইকরাম”- আর কেবল আপনার মহাসম্মানিত রবের চেহারাই (পূর্ণ সত্ত্বা) বাকী থাকবে” (সূরা আর-রাহমান)। আল্লাহ নিজেকেই তখন জিজ্ঞেস করবেন, ‘লিমানিল মুলকিল ইয়াউম’ – আজকের রাজত্ব কার? আল্লাহ নিজেকেই প্রতিউত্তরে বলবেন, ‘লিল্লাহিল ওয়াহিদিল কাহহার’- “কেবলই অদ্বিতীয় নিয়ন্ত্রণকারী আল্লাহর”।
রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, যখন আখিরাতে আমরা সবাই হাজির হবো, তখন সমস্ত জমিন আল্লাহর আনুগতের প্রশংসায় একদম সমতল হবে। তিনি বলেন, হাশরের ময়দানে প্রত্যেকেই যে জায়গায় রয়েছে সে জায়গা থেকে একটুও নড়তে পারবে না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আল্লাহর নিকট আমাকেই প্রথম আহবান করা হবে। অতএব তিনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা এর নিকটে প্রবেশ করবেন। ”আমি সিজদায় পড়ে যাবো।” তিনি বলেন, অতঃপর আমি আমার মস্তক উত্তোলন করবো এবং আকস্মিকভাবে আমি সর্বোচ্চ দয়াময় (আল্লাহ) এর ডান পাশে জিব্রীলকে দেখতে পাবো! নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীসে বলেন, আল্লাহর কসম, ইতোপূর্বে জিব্রীল (আলাইহিস সালাম) আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা-কে কোনো দিনই দেখেনি! জিব্রীল আল্লাহকে আগে কখনই দেখেনি। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিব্রীলের দিকে ইশারা করে বলবেন, হে আমার রব, এই ব্যক্তি আমাকে বলেছিলো যে আপনিই তাকে আমার নিকটে পাঠিয়েছিলেন। তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি সত্য বলেছো। একইভাবে জিব্রীল-ও নবীকে বলবেন, আপনি সত্য বলেছেন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কেন প্রতিদান দিবসে এই বিষয়টি করতে পছন্দ করলেন? তিনি কেন এটি ইচ্ছা পোষণ করলেন? কারণ হলো, প্রতিদান দিবসের দিন প্রত্যেক নবী-রাসূলকেই জিজ্ঞেস করা হবে যে সে (জিব্রীল) কি নবুওয়াতের বার্তাকে ঠিক মতো পৌছে দিয়েছে কিনা। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিব্রিলের পক্ষে সাক্ষ্য দিলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করার পূর্বেই তিনি নিজেই বললেন যে, উনি বলেছেন যে তাঁকে আপনি আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন? তিনি তাঁর কাজ ঠিকমত করেছিলেন। আল্লাহ বলবেন, তুমি সত্য বলেছো।
ইবরাহীম (আঃ)-এর পরীক্ষা সমূহ ছিল দু’ভাগে বিভক্ত।
(এক) বাবেল জীবনের পরীক্ষা সমূহ এবং
(দুই) কেন‘আন জীবনের পরীক্ষা সমূহ। শেষনবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর জীবনের সঙ্গে পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবনের সুন্দর একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। মুহাম্মাদী জীবনের প্রথমাংশ কেটেছে মক্কায় ও শেষাংশ কেটেছে মদীনায় এবং সেখানেই তিনি পূর্ণতা লাভ করেন ও মৃত্যুবরণ করেন।
ইবরাহীমী জীবনের প্রথমাংশ কেটেছে বাবেল শহরে এবং শেষাংশ কেটেছে কেন‘আনে। সেখানেই তিনি পূর্ণতা পেয়েছেন ও সেখানেই মৃত্যুবরণ করেছেন।
বাবেল জীবনের পরীক্ষা সমূহ :
ইবরাহীম (আঃ)-এর বাবেল জীবনের পরীক্ষা সমূহের মধ্যে
(১) মূর্তিপূজারী নেতাদের সাথে তর্কযুদ্ধের পরীক্ষা
(২) পিতার পক্ষ থেকে বহিষ্কারাদেশ প্রাপ্তির পরীক্ষা
(৩) স্ত্রী ও ভাতিজা ব্যতীত কেউ তাঁর দাওয়াত কবুল না করা সত্ত্বেও তীব্র সামাজিক বিরোধিতার মুখে একাকী দাওয়াত চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অটল থাকার মাধ্যমে আদর্শ নিষ্ঠার কঠিন পরীক্ষা
(৪) তারকাপূজারীদের সাথে যুক্তিগর্ভ তর্কযুদ্ধের পরীক্ষা
(৫) কেন্দ্রীয় দেবমন্দিরে ঢুকে মূর্তি ভাঙ্গার মত দুঃসাহসিক পরীক্ষা
(৬) অবশেষে রাজদরবারে পৌঁছে সরাসরি সম্রাটের সাথে তর্কযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার পরীক্ষা এবং বিনিময়ে
(৭) জ্বলন্ত হুতাশনে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করার মর্মান্তিক শাস্তি হাসিমুখে বরণ করে নেবার অতুলনীয় অগ্নি পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়া। এছাড়াও সমাজ সংস্কারক হিসাবে জীবনের প্রতি পদে পদে যে অসংখ্য পরীক্ষার সম্মুখীন তাঁকে হর-হামেশা হ’তে হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
কেন‘আনী জীবনের পরীক্ষা সমূহ :
১ম পরীক্ষা: দুর্ভিক্ষে পতিত হয়ে মিসর গমন : কেন‘আনী জীবনে তাঁর প্রথম পরীক্ষা হ’ল কঠিন দুর্ভিক্ষে তাড়িত হয়ে জীবিকার সন্ধানে মিসরে হিজরত করা। এ বিষয়ে পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে।
২য় পরীক্ষা: সারাকে অপহরণ : মিসরে গিয়ে সেখানকার লম্পট সম্রাট ফেরাঊনের কুদৃষ্টিতে পড়ে স্ত্রী সারাকে অপহরণের মর্মান্তিক পরীক্ষা। এ বিষয়ে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।
৩য় পরীক্ষা: হাজেরাকে মক্কায় নির্বাসন : মিসর থেকে ফিরে কেন‘আনে আসার বৎসরাধিককাল পরে প্রথম সন্তান ইসমাঈলের জন্ম লাভ হয়। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই তিনি শিশু সন্তান ও তার মা হাজেরাকে মক্কার বিজন পাহাড়ী উপত্যকায় নিঃসঙ্গভাবে রেখে আসার এলাহী নির্দেশ লাভ করেন। বস্ত্ততঃ এটা ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক পরীক্ষা। এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নরূপ:
হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে শিশু পুত্র ইসমাঈল ও তার মাকে মক্কায় নির্বাসনে রেখে আসার নির্দেশ পান, তখনই তার অন্তরে বিশ্বাস জন্মেছিল যে, নিশ্চয়ই এ নির্দেশের মধ্যে আল্লাহর কোন মহতী পরিকল্পনা লুক্কায়িত আছে এবং নিশ্চয়ই তিনি ইসমাঈল ও তার মাকে ধ্বংস করবেন না।
অতঃপর এক থলে খেজুর ও এক মশক পানি সহ তাদের বিজনভূমিতে রেখে যখন ইবরাহীম (আঃ) একাকী ফিরে আসতে থাকেন, তখন বেদনা-বিস্মিত স্ত্রী হাজেরা ব্যাকুলভাবে তার পিছে পিছে আসতে লাগলেন। আর স্বামীকে এর কারণ জিজ্ঞেস করতে থাকেন। কিন্তু বুকে বেদনার পাষাণ বাঁধা ইবরাহীমের মুখ দিয়ে কোন কথা বেরুলো না। তখন হাজেরা বললেন, আপনি কি আল্লাহর হুকুমে আমাদেরকে এভাবে ফেলে যাচ্ছেন? ইবরাহীম ইশারায় বললেন, হ্যাঁ। তখন সম্বিৎ ফিরে পেয়ে অটল বিশ্বাস ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে হাজেরা বলে উঠলেন, ﺇﺫَﻥْ ﻻﻳُﻀَﻴِّﻌُﻨَﺎ ﺍﻟﻠﻪُ ‘তাহ’লে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করবেন না’। ফিরে এলেন তিনি সন্তানের কাছে। দু’একদিনের মধ্যেই ফুরিয়ে যাবে পানি ও খেজুর। কি হবে উপায়? খাদ্য ও পানি বিহনে বুকের দুধ শুকিয়ে গেলে কচি বাচ্চা কি খেয়ে বাঁচবে। পাগলপরা হয়ে তিনি মানুষের সন্ধানে দৌঁড়াতে থাকেন ছাফা ও মারওয়া পাহাড়ের এ মাথা আর ও মাথায়। এভাবে সপ্তমবারে তিনি দূর থেকে দেখেন যে, বাচ্চার পায়ের কাছ থেকে মাটির বুক চিরে বেরিয়ে আসছে ঝর্ণার ফল্গুধারা, জিব্রীলের পায়ের গোড়ালি বা তার পাখার আঘাতে যা সৃষ্টি হয়েছিল। ছুটে এসে বাচ্চাকে কোলে নিলেন অসীম মমতায়। স্নিগ্ধ পানি পান করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। হঠাৎ অদূরে একটি আওয়ায শুনে তিনি চমকে উঠলেন। উনি জিবরীল। বলে উঠলেন, ﻻ ﺗﺨﺎﻓﻮﺍ ﺍﻟﻀَّﻴﻌﺔَ، ﺇﻥَّ ﻫﺬﺍ ﺑﻴﺖُ ﺍﻟﻠﻪ ﻳَﺒْﻨﻰ ﻫﺬﺍ ﺍﻟﻐﻼﻡُ ﻭ ﺃﺑﻮﻩ ﻭﺇﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﻻﻳُﻀﻴﻊُ ﺃﻫﻠَﻪ - ‘আপনারা ভয় পাবেন না। এখানেই আল্লাহর ঘর। এই সন্তান ও তার পিতা এ ঘর সত্বর পুনর্নির্মান করবেন। আল্লাহ তাঁর ঘরের বাসিন্দাদের ধ্বংস করবেন না’। বলেই শব্দ মিলিয়ে গেল’।
অতঃপর শুরু হ’ল ইসমাঈলী জীবনের নব অধ্যায়। পানি দেখে পাখি আসলো। পাখি ওড়া দেখে ব্যবসায়ী কাফেলা আসলো। তারা এসে পানির মালিক হিসাবে হাজেরার নিকটে অনুমতি চাইলে তিনি এই শর্তে মনযুর করলেন যে, আপনাদের এখানে বসতি স্থাপন করতে হবে। বিনা পয়সায় এই প্রস্তাব তারা সাগ্রহে কবুল করল। এরাই হ’ল ইয়ামন থেকে আগত বনু জুরহুম গোত্র। বড় হয়ে ইসমাঈল এই গোত্রে বিয়ে করেন। এঁরাই কা‘বা গৃহের খাদেম হন এবং এদের শাখা গোত্র কুরায়েশ বংশে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আগমন ঘটে।
ওদিকে ইবরাহীম (আঃ) যখন স্ত্রী ও সন্তানকে রেখে যান তখন হাজেরার দৃষ্টির আড়ালে গিয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন এই বলে,
ﺭَّﺑَّﻨَﺎ ﺇِﻧِّﻲْ ﺃَﺳْﻜَﻨْﺖُ ﻣِﻦْ ﺫُﺭِّﻳَّﺘِﻲْ ﺑِﻮَﺍﺩٍ ﻏَﻴْﺮِ ﺫِﻱْ ﺯَﺭْﻉٍ ﻋِﻨْﺪَ ﺑَﻴْﺘِﻚَ ﺍﻟْﻤُﺤَﺮَّﻡِ ﺭَﺑَّﻨَﺎ ﻟِﻴُﻘِﻴْﻤُﻮﺍ ﺍﻟﺼَّﻼَﺓَ ﻓَﺎﺟْﻌَﻞْ ﺃَﻓْﺌِﺪَﺓً ﻣِّﻦَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ﺗَﻬْﻮِﻱْ ﺇِﻟَﻴْﻬِﻢْ ﻭَﺍﺭْﺯُﻗْﻬُﻢ ﻣِّﻦَ ﺍﻟﺜَّﻤَﺮَﺍﺕِ ﻟَﻌَﻠَّﻬُﻢْ ﻳَﺸْﻜُﺮُﻭْﻥَ - ( ﺍﺑﺮﺍﻫﻴﻢ ৩৭ ) -
‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমি আমার পরিবারের কিছু সদস্যকে তোমার মর্যাদামন্ডিত গৃহের সন্নিকটে চাষাবাদহীন উপত্যকায় বসবাসের জন্য রেখে যাচ্ছি। প্রভুহে! যাতে তারা ছালাত কায়েম করে। অতএব কিছু লোকের অন্তরকে তুমি এদের প্রতি আকৃষ্ট করে দাও এবং তাদেরকে ফল-ফলাদি দ্বারা রূযী দান কর। সম্ভবত: তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে’।
শিক্ষণীয় বিষয়:
(১) ইবরাহীম (আঃ) তাঁর স্ত্রী ও দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে জনমানব শূন্য ও চাষাবাদহীন এক শুষ্ক মরু উপত্যকায় রেখে আসলেন, কোন সুস্থ বিবেক এ কাজকে সমর্থন করতে পারে না। কিন্তু যারা আল্লাহতে বিশ্বাসী, তাদের জন্য বিষয়টি মোটেই আশ্চর্যজনক নয়। আর সেকারণেই হাজেরা গভীর প্রত্যয়ে বলে উঠেছিলেন, ﺇﺫَﻥْ ﻻ ﻳُﻀَﻴِّﻌُﻨِﻲَ ﺍﻟﻠﻪُ ‘তাহ’লে আল্লাহ আমাকে ধ্বংস করবেন না’। আল্লাহ যে কেবল বিশ্বাসের বস্ত্ত নয়, বরং তিনি সার্বক্ষণিকভাবে বান্দার তত্ত্বাবধায়ক, ইবরাহীমের উক্ত কর্মনীতির মধ্যে তার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। অতি যুক্তিবাদী ও বস্ত্তবাদীদের জন্য এর মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের এক শিক্ষণীয় বিষয়।
(২) ইবরাহীমের দো‘আ আল্লাহ এমন দ্রুত কবুল করেছিলেন যে, দু’একদিনের মধ্যেই সেখানে সৃষ্টি হয় পানির ফোয়ারা, যা যমযম কূয়া নামে পরিচিত হয় এবং যার উৎসধারা বিগত প্রায় সোয়া চার হাযার বছর ধরে আজও সমভাবে বহমান। কিন্তু এই পানির রূপ-রস-গন্ধ কিছুরই কোন পরিবর্তন হয়নি। এ পানির কোন হ্রাস-বৃদ্ধি নেই। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, এ পানিতে এমন সব উপাদান রয়েছে, যা মানুষের জন্য খাদ্য ও পানীয় উভয় চাহিদা মেটাতে সক্ষম। পৃথিবীর অন্য কোন পানিতে এ গুণ নেই। দৈনিক লাখ লাখ গ্যালন পানি ব্যয় হওয়া সত্ত্বেও এ পানির কোন ক্ষয় নেই, লয় নেই, কমতি নেই। এর কারণ অনুসন্ধানে বছরের পর বছর চেষ্টা করেও বৈজ্ঞানিকেরা ব্যর্থ হয়েছেন। ফালিল্লা-হিল হাম্দ।
(৩) তখন থেকে অদ্যাবধি মক্কা মু‘আয্যমায় চাষাবাদের তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। কিন্তু সারা পৃথিবী হ’তে তাবৎ ফল-ফলাদি সর্বদা সেখানে আমদানী হয়ে থাকে এবং সর্বদা অধিকহারে মওজূদ থাকে। আধুনিক বিশ্বের কোন শহরই এর সাথে তুলনীয় নয়। নিঃসন্দেহে এটা হ’ল ইবরাহীমের দো‘আর অন্যতম ফসল।
(৪) ইবরাহীম (আঃ)-এর দো‘আয় বলা হয়েছিল, ‘আমি আমার সন্তানকে এখানে রেখে যাচ্ছি যেন তারা এখানে ছালাত কায়েম করে’। আল্লাহর রহমতে সেদিন থেকে অদ্যাবধি এখানে ছালাত, ত্বাওয়াফ ও অন্যান্য ইবাদত সর্বদা জারি আছে।
(৫) দো‘আয় তিনি বলেছিলেন, ‘মানব সমাজের কিছু অংশের হৃদয়কে তুমি এদের প্রতি ঝুঁকিয়ে দাও’। নিঃসন্দেহে সেই অংশটি হ’ল সারা বিশ্বের মুসলিম সমাজ। ইবরাহীম (আঃ) জানতেন যে, বিশ্বের সমস্ত লোক কখনো মুমিন হবে না। তাছাড়া তাবৎ বিশ্ব যদি কা‘বার প্রতি ঝুঁকে পড়ত, তাহ’লে সেখানে বসবাস, স্থান সংকুলান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংকট দেখা দেওয়া অবশ্যম্ভাবী ছিল। তখন থেকে এযাবত সর্বদা একদল শক্তিশালী ও ধর্মপরায়ণ মানুষ মক্কার সুরক্ষা ও নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। দেড় হাযার বছর পূর্বে খৃষ্টান গভর্ণর আবরাহার সকল প্রচেষ্টা যেমন ব্যর্থ হয়েছিল, ক্বিয়ামত অবধি শত্রুদের সকল চক্রান্ত এভাবেই ব্যর্থ হবে ইনশাআল্লাহ।
৪র্থ পরীক্ষা: খাৎনা করণ :
ইবরাহীমের প্রতি আদেশ হ’ল খাৎনা করার জন্য।
এসময় তাঁর বয়স ছিল অন্যূন ৮০ বছর।
হুকুম পাওয়ার সাথে সাথে দেরী না করে নিজেই নিজের খাৎনার কাজ সম্পন্ন করলেন।
বিনা দ্বিধায় এই কঠিন ও বেদনাদায়ক কাজ সম্পন্ন করার মধ্যে আল্লাহর হুকুম দ্রুত পালন করার ও এ ব্যাপারে তাঁর কঠোর নিষ্ঠার প্রমাণ পাওয়া যায়।
খাৎনার এই প্রথা ইবরাহীমের অনুসারী সকল ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে আজও চালু আছে।
বস্ত্ততঃ খাৎনার মধ্যে যে অফুরন্ত কল্যাণ নিহিত রয়েছে, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীগণ তা অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করেছেন।
এর ফলে খাৎনাকারীগণ অসংখ্য অজানা রোগ-ব্যাধি হ’তে মুক্ত রয়েছেন এবং সুস্থ জীবন লাভে ধন্য হয়েছেন।
এটি মুসলিম এবং অমুসলিমের মধ্যে একটি স্থায়ী পার্থক্যও বটে।
৫ম পরীক্ষা: পুত্র কুরবানী :
একমাত্র শিশু পুত্র ও তার মাকে মক্কায় রেখে এলেও ইবরাহীম (আঃ) মাঝে-মধ্যে সেখানে যেতেন ও দেখা-শুনা করতেন।
এভাবে ইসমাঈল ১৩/১৪ বছর বয়সে উপনীত হ’লেন এবং পিতার সঙ্গে চলাফেরা করার উপযুক্ত হ’লেন।
বলা চলে যে, ইসমাঈল যখন বৃদ্ধ পিতার সহযোগী হ’তে চলেছেন এবং পিতৃহৃদয় পুরোপুরি জুড়ে বসেছেন, ঠিক সেই সময় আল্লাহ ইবরাহীমের মহববতের কুরবানী কামনা করলেন।
বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র নয়নের পুত্তলী ইসমাঈলের মহববত ইবরাহীমকে কাবু করে ফেলল কি-না, আল্লাহ যেন সেটাই যাচাই করতে চাইলেন।
ইতিপূর্বে অগ্নিপরীক্ষা দেবার সময় ইবরাহীমের কোন পিছুটান ছিল না। কিন্তু এবার রয়েছে প্রচন্ড রক্তের টান।
দ্বিতীয়তঃ অগ্নি পরীক্ষায় বাদশাহ তাকে বাধ্য করেছিল। কিন্তু এবারের পরীক্ষা স্বেচ্ছায় ও স্বহস্তে সম্পন্ন করতে হবে। তাই এ পরীক্ষাটি ছিল পূর্বের কঠিন অগ্নি পরীক্ষার চেয়ে নিঃসন্দেহে কঠিনতর। সূরা ছাফফাত ১০২ আয়াত হ’তে ১০৯ আয়াত পর্যন্ত এ বিষয়ে বর্ণিত ঘটনাটি নিম্নরূপ:
ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺑَﻠَﻎَ ﻣَﻌَﻪُ ﺍﻟﺴَّﻌْﻲَ ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﺑُﻨَﻲَّ ﺇِﻧِّﻲ ﺃَﺭَﻯ ﻓِﻲ ﺍﻟْﻤَﻨَﺎﻡِ ﺃَﻧِّﻲ ﺃَﺫْﺑَﺤُﻚَ ﻓَﺎﻧﻈُﺮْ ﻣَﺎﺫَﺍ ﺗَﺮَﻯ ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﺃَﺑَﺖِ ﺍﻓْﻌَﻞْ ﻣَﺎ ﺗُﺆْﻣَﺮُ ﺳَﺘَﺠِﺪُﻧِﻲ ﺇِﻥ ﺷَﺂﺀَ ﺍﻟﻠﻪُ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺼَّﺎﺑِﺮِﻳﻦَ - ( ﺍﻟﺼﺎﻓﺎﺕ ১০২ ) -
‘যখন (ইসমাঈল) পিতার সাথে চলাফেরা করার মত বয়সে উপনীত হ’ল, তখন (ইবরাহীম) তাকে বললেন, হে আমার বেটা! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবহ করছি। এখন বল তোমার অভিমত কি? সে বলল, হে পিতা! আপনাকে যা নির্দেশ করা হয়েছে, আপনি তা কার্যকর করুন। আল্লাহ চাহেন তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত দেখতে পাবেন’ (ছাফফাত ৩৭/১০২) ।
ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত হয়েছে যে, মক্কা থেকে বের করে ৮ কি: মি: দক্ষিণ-পূর্বে মিনা প্রান্তরে নিয়ে যাওয়ার পথে বর্তমানে যে তিন স্থানে হাজীগণ শয়তানকে পাথর মেরে থাকেন, ঐ তিন স্থানে ইবলীস তিনবার ইবরাহীম (আঃ)-কে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। আর তিনবারই ইবরাহীম (আঃ) শয়তানের প্রতি ৭টি করে কংকর নিক্ষেপ করেছিলেন।
সেই স্মৃতিকে জাগরুক রাখার জন্য এবং শয়তানের প্রতারণার বিরুদ্ধে মুমিনকে বাস্তবে উদ্বুদ্ধ করার জন্য এ বিষয়টিকে হজ্জ অনুষ্ঠানের ওয়াজিবাতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখানেই অনতিদূরে পূর্ব দিকে ‘মসজিদে খায়েফ’ অবস্থিত।
অতঃপর পিতা-পুত্র আল্লাহ নির্দেশিত কুরবানগাহ ‘মিনায়’ উপস্থিত হ’লেন। সেখানে পৌঁছে পিতা পুত্রকে তাঁর স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলেন এবং পুত্রের অভিমত চাইলেন। পুত্র তার অভিমত ব্যক্ত করার সময় বললেন, ‘ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ছবরকারীদের অন্তর্ভুক্ত দেখতে পাবেন’। ইনশাআল্লাহ না বললে হয়ত তিনি ধৈর্য ধারণের তাওফীক পেতেন না।
এরপর তিনি নিজেকে ‘ছবরকারী’ না বলে ‘ছবরকারীদের অন্তর্ভুক্ত’ বলেছেন এবং এর মাধ্যমে নিজের পিতা সহ পূর্বেকার বড় বড় আত্মোৎসর্গকারীদের মধ্যে নিজেকে শামিল করে নিজেকে অহমিকা মুক্ত করেছেন। যদিও তাঁর ন্যায় তরুণের এরূপ স্বেচ্ছায় আত্মোৎসর্গের ঘটনা ইতিপূর্বে ঘটেছিল বলে জানা যায় না। আল্লাহ বলেন,
ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺃَﺳْﻠَﻤَﺎ ﻭَ ﺗَﻠَّﻪُ ﻟِﻠْﺠَﺒِﻴﻦِ، ﻭَﻧَﺎﺩَﻳْﻨَﺎﻩُ ﺃَﻥ ﻳَّﺂ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢُ، ﻗَﺪْ ﺻَﺪَّﻗْﺖَ ﺍﻟﺮُّﺅْﻳَﺎ ﺇِﻧَّﺎ ﻛَﺬَﺍﻟِﻚَ ﻧَﺠْﺰِﻱ ﺍﻟْﻤُﺤْﺴِﻨِﻴْﻦَ، ﺇِﻥَّ ﻫَﺬَﺍ ﻟَﻬُﻮَ ﺍﻟْﺒَﻶﺀُ ﺍﻟْﻤُﺒِﻴْﻦُ، ﻭَﻓَﺪَﻳْﻨَﺎﻩُ ﺑِﺬِﺑْﺢٍ ﻋَﻈِﻴْﻢٍ، ﻭَﺗَﺮَﻛْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺂﺧِﺮِﻳْﻦَ، ﺳَﻼَﻡٌ ﻋَﻠَﻰ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَ - ( ﺍﻟﺼﺎﻓﺎﺕ ১০৩-১০৯ ) -
‘অতঃপর (পিতা-পুত্র) উভয়ে যখন আত্মসমর্পণ করল এবং পিতা পুত্রকে উপুড় করে শায়িত করল’। ‘তখন আমরা তাকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইবরাহীম’! ‘তুমি তোমার স্বপ্ন সত্যে পরিণত করেছ। আমরা এভাবেই সৎকর্মশীলগণের প্রতিদান দিয়ে থাকি’। ‘নিশ্চয়ই এটি একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা’। ‘আর আমরা তার পরিবর্তে একটি মহান যবহ প্রদান করলাম’ ‘এবং আমরা এ বিষয়টি পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিলাম’। ‘ইবরাহীমের উপর শান্তি বর্ষিত হৌক’ (ছাফফাত ৩৭/১০৩-১০৯) ।
বর্তমানে উক্ত মিনা প্রান্তরেই হাজীগণ কুরবানী করে থাকেন এবং বিশ্ব মুসলিম ঐ সুন্নাত অনুসরণে ১০ই যুলহিজ্জাহ বিশ্বব্যাপী শরী‘আত নির্ধারিত পশু কুরবানী করে থাকেন।
শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ :
(১) ইবরাহীমকে আল্লাহ স্বপ্নাদেশ করেছিলেন, সরাসরি আদেশ করেননি। এর মধ্যে পরীক্ষা ছিল এই যে, স্বপ্নের বিভিন্ন ব্যাখ্যা হ’তে পারত। যেমন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা মহাপাপ। অধিকন্তু পিতা হয়ে নির্দোষ পুত্রকে নিজ হাতে হত্যা করা আরও বড় মহাপাপ। নিশ্চয়ই এমন অন্যায় কাজের নির্দেশ আল্লাহ দিতে পারেন না। অতএব এটা মনের কল্পনা-নির্ভর স্বপ্ন ( ﺃﺿﻐﺎﺙ ﺃﺣﻼﻡ ) হ’তে পারে। কিন্তু ইবরাহীম ঐসব ব্যাখ্যায় যাননি। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, এটা ‘অহি’। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি পরপর তিনদিন একই স্বপ্ন দেখেন। প্রশ্ন হ’তে পারে, আল্লাহ জিব্রীল মারফত সরাসরি নির্দেশ না পাঠিয়ে স্বপ্নের মাধ্যমে নির্দেশ পাঠালেন কেন? এর জবাব এই যে, তাহ’লে তো পরীক্ষা হ’ত না, কেবল নির্দেশ পালন হ’ত। ইবরাহীমকে তার স্বপ্নের কাল্পনিক ব্যাখ্যার ফাঁদে ফেলার জন্যই তো শয়তান মাঝপথে বন্ধু সেজে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। এর দ্বারা আরেকটি বিষয় প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর নির্দেশ পালনের সময় অহেতুক প্রশ্ন সমূহ উত্থাপন ও অধিক যুক্তিবাদের আশ্রয় নেওয়া যাবে না। বরং সর্বদা তার প্রকাশ্য অর্থের উপরে সহজ-সরলভাবে আমল করে যেতে হবে।
(২) আল্লাহর মহববত ও দুনিয়াবী কোন মহববত একত্রিত হ’লে সর্বদা আল্লাহর মহববতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং দুনিয়াবী মহববতকে কুরবানী দিতে হবে। ইবরাহীম এখানে সন্তানের গলায় ছুরি চালাননি। বরং সন্তানের মহববতের গলায় ছুরি চালিয়েছিলেন। আর এটাই ছিল পরীক্ষা। যদি কেউ আল্লাহর মহববতের উপরে দুনিয়াবী মহববতকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন সেটা হয়ে যায় ﺍﻹﺷﺮﺍﻙ ﻓﻲ ﺍﻟﻤﺤﺒﺔ বা ভালোবাসায় শিরক। ইবরাহীম ও ইসমাঈল দু’জনেই উক্ত শিরক হ’তে মুক্ত ছিলেন।
(৩) পিতা ও পুত্রের বিশ্বাসগত সমন্বয় ব্যতীত কুরবানীর এই গৌরবময় ইতিহাস রচিত হ’ত না। ইসমাঈল যদি পিতার অবাধ্য হ’তেন এবং দৌড়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে যেতেন, তাহ’লে আল্লাহর হুকুম পালন করা ইবরাহীমের পক্ষে হয়তবা আদৌ সম্ভব হ’ত না। তাই এ ঘটনার মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, সমাজের প্রবীণদের কল্যাণময় নির্দেশনা এবং নবীনদের আনুগত্য ও উদ্দীপনা একত্রিত ও সমন্বিত না হ’লে কখনোই কোন উন্নত সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়।
(৪) এখানে মা হাজেরার অবদানও ছিল অসামান্য। যদি তিনি ঐ বিজন ভূমিতে কচি সন্তানকে তিলে তিলে মানুষ করে না তুলতেন এবং স্রেফ আল্লাহর উপরে ভরসা করে বুকে অসীম সাহস নিয়ে সেখানে বসবাস না করতেন, তাহ’লে পৃথিবী পিতা-পুত্রের এই মহান দৃশ্য অবলোকন করতে পারত না। এজন্যেই বাংলার বুলবুল কাজী নজরুল ইসলাম গেয়েছেন,
মা হাজেরা হৌক মায়েরা সব
যবীহুল্লাহ হৌক ছেলেরা সব
সবকিছু যাক সত্য রৌক
বিধির বিধান সত্য হৌক।
বলা চলে যে, এই কঠিনতম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর ইবরাহীম (আঃ) বিশ্ব নেতৃত্বের সম্মানে ভূষিত হন।
যেমন আল্লাহ বলেন,
ﻭَﺇِﺫِ ﺍﺑْﺘَﻠَﻰ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَ ﺭَﺑُّﻪُ ﺑِﻜَﻠِﻤَﺎﺕٍ ﻓَﺄَﺗَﻤَّﻬُﻦَّ ﻗَﺎﻝَ ﺇِﻧِّﻲْ ﺟَﺎﻋِﻠُﻚَ ﻟِﻠﻨَّﺎﺱِ ﺇِﻣَﺎﻣﺎً، ( ﺑﻘﺮﺓ ১২৪ ) -
‘যখন ইবরাহীমকে তার পালনকর্তা কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষা করলেন, অতঃপর তিনি তাতে উত্তীর্ণ হ’লেন, তখন আল্লাহ বললেন, আমি তোমাকে মানবজাতির নেতা করলাম’
(বাক্বারাহ ২/১২৪) ।
উপরোক্ত আয়াতে পরীক্ষাগুলির সংখ্যা কত ছিল, তা বলা হয়নি।
তবে ইবরাহীমের পুরো জীবনটাই যে ছিল পরীক্ষাময়, তা ইতিপূর্বেকার আলোচনায় প্রতিভাত হয়েছে।
এক ব্যক্তি পাহাড়ের উচ্চ চূড়ায় পাঁচশ বছর ধরে আল্লাহ পাকের ইবাদতে মশগুল ছিল। ঐ পাহাড়ের চারদিক লবণাক্ত পানি দ্বারা বেষ্টিত ছিল। আল্লাহ তা’আলা তার জন্য পাহাড়ের অভ্যন্তরে সুপেয় পানির ঝর্ণা এবং একটি আনার গাছের সৃষ্টি করেন। . প্রতিদিন সেই ব্যক্তি আনার ফল খেত এবং পানি পান করত। আর পানি দিয়ে অযূ করত। সে ব্যক্তি আল্লাহ্তা’আলার কাছে এই দু’আ করল- "হে আল্লাহ্! আমার দেহ থেকে রূহ যেন সেজদারত অবস্থায় কবয করার ব্যবস্থা করা হয়। আল্লাহ্ তা’আলা তার এই দু’আ কবুল করেন।" . হযরত জিবরাঈল (আঃ)বলেন- "আমি আসমানে আসা যাওয়ার সময় তাকে সেজদারত দেখতাম। কিয়ামতের দিন আল্লাহ্তা’আলা তার সম্পর্কে বলবেনঃ আমার এই বান্দাকে আমার রহমতে জান্নাতে প্রবেশ করাও।" . ঐ ব্যক্তি বলবে না, বরং আমার আমলের বরকতে। তখন নির্দেশ আসবে- "আমার নিয়ামতের বিপরীতে তার কৃত আমল পরিমাপ কর। পরিমাপ করে দেখা যাবে, পাঁচশ বছরের ইবাদাত খতম হয়ে গেছে একটি চোখের নিয়ামতের বিনিময়ে।" . তখন আল্লাহ্ পাক নির্দেশ দিবেনঃ "আমার বান্দাকে জাহান্নামে নিয়ে যাও। ফেরেশতারা তখন তাকে নিয়ে রওয়ানা হবে। কিছুদূর যাওয়ার পর ঐ ব্যক্তি আরয করবে "হে আল্লাহ্! আমাকে তোমার রহমতে জান্নাতে প্রবেশ করাও।" নির্দেশ আসবে তাকে ফিরত নিয়ে আস। আল্লাহ্ পাকের নিকট ফিরিয়ে আনার পর তাকে নিচের প্রশ্নগুলো করা হবে আর সে বলবেঃ- . – "তোমাকে কে সৃষ্টি করেছেন?" – "আল্লাহ, আপনি।" – "এই কাজটা তোমার আমল না আমার রহমতের বরকতে হয়েছে?" – "আপনার রহমতে।" – "তোমাকে পাঁচশ বছর ইবাদাত করার শক্তি ও তাওফীক কে দিয়েছে?" – "হে আল্লাহ্!আপনি।" . – "সমুদ্রের মাঝে পাহাড়ের উপর তোমাকে কে পৌঁছিয়েছে? লবণাক্ত পানির মাঝে সুপেয় পানির ব্যবস্থা কে করেছে? আনার গাছ কে সৃষ্টি করেছে? তোমার দরখাস্ত মুতাবেক সেজদার মাঝে কে তোমার রূহ কবয করার ব্যবস্থা করেছে?" . -হে পরওয়ারদিগার! আপনি। তখন ইরশাদ হবেঃ "এই সব কিছু আমার রহমতে হয়েছে এবং আমার রহমতেই তোমাকে জান্নাতে দাখিল করছি।" -( রিয়াদুস সালেহীনঃ ২/৫৩,৫৪)
নাম তাঁর হামযা, আবু ইয়ালা ও আবু ’আম্মারা কুনিয়াত এবং আসাদুল্লাহ উপাধি।
তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা. আপন চাচা। হযরত হামযার জননী হালা বিনতু উহাইব রসূলুল্লাহর সা. জননী হযরত আমিনার চাচাতো বোন। তাছাড়া হামযা ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা. দুধ ভাই। আবু লাহাবের দাসী ‘সুওয়াইবা’ তাঁদের দু’জনকে দুধ পান করিয়েছিল।
বয়সে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. অপেক্ষা দু’বছর মতান্তরে চার বছর বড়।
ছোট বেলা থেকেই তরবারি চালনা, তীরন্দাযী ও কুস্তির প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ।
ভ্রমণ ও শিকারে ছিল তাঁর সীমাহীন আকর্ষণ। জীবনের বিরাট এক অংশ তিনি এ কাজে ব্যয় করেন।
বেশ কিছুকাল যাবত মক্কার অলি গলিতে তাওহীদের দাওয়াত উচ্চারিত হচ্ছিলো।
তবে হামযার মত সিপাহী-স্বভাব মানুষের এ দাওয়াতের প্রতি তেমন মনোযোগ ছিল না।
একদিন তিনি শিকার থেকে ফিরছিলেন। সাফা পাহাড়ের কাছাকাছি এলে আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের এক দাসী তাঁকে ডেকে খবরটি দিল। বললোঃ ‘আবু আম্মারা, ইস্, কিছুক্ষণ আগে এসে আপনার ভাতিজার অবস্থা যদি একটু দেখতেন! তিনি কা’বার পাশে মানুষকে উপদেশ দিচ্ছিলেন। আবু জাহল তাঁকে শক্ত গালি দিয়েছে, ভীষণ কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু মুহাম্মদ কোন প্রত্যুত্তর না করে নিতান্ত অসহায়ভাবে ফিরে গেছে।’ একথা শুনে তাঁর সৈনিকসুলভ রক্ত টগবগ করে উঠলো। দ্রুত তিনি কা’বার দিকে এগিয়ে গেলেন।
তাঁর অভ্যাস ছিল, শিকার থেকে ফেরার পথে কারো সংগে সাক্ষাৎ হলে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তার সংগে দু’চারটি কথা বলা। কিন্তু আজ তিনি প্রতিশোধ স্পৃহায় উন্মাদ হয়ে পড়লেন। রাস্তায় কারো দিকে কোন রকম ভ্রুক্ষেপ না করে সোজা কা’বার কাছে গিয়ে আবু জাহলের মাথায় ধনুক দিয়ে সজোরে এক আঘাত বসিয়ে দিরেন। আবু জাহলের মাথা কেটে গেল।
অবস্থা বেগতিক দেখে বনু মাখযুমের কিছু লোক আবু জাহলের সাহায্যে ছুটে এলো।
তারা বললোঃ ‘হামযা, সম্ভবতঃ তুমি ধর্মত্যাগী হয়েছো।’ জবাবে বললেনঃ ‘যখন তার সত্যতা আমার নিকট প্রকাশ হয়ে পড়েছে, তখন তা থেকে আমাকে বিরত রাখবে কে? হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।
যা কিছু তিনি বলেন সবই সত্যি। আল্লাহর কসম আমি তা থেকে আর ফিরে আসতে পারিনে।
যদি তোমরা সত্যবাদী হও, আমাকে একটু বাধা দিয়েই দেখ।’ আবু জাহল তার সাহায্যে এগিয়ে আসা লেকাদের বললোঃ ‘তোমরা আবু আম্মারকে ছেড়ে দাও। আল্লাহর কসম, কিছুক্ষণ আগেই আমি তাঁর ভাতিজাকে মারাত্মক গাল দিয়েছি।’
পরবর্তীকালে হযরত হামযা বলেছেন, আমি ক্রোধে উত্তেজিত হয়ে কথাগুলি তো বলে ফেললাম; কিন্তু আমার পূর্বপুরুষ ও গোত্রের ধর্মত্যাগের জন্য আমি অনুশোচনায় দগ্ঘিভূত হতে লাগলাম। একটা সন্দেহ ও সংশয়ের আবর্তে পড়ে সারা রাত ঘুমোতে পারলাম না। কা’বায় এসে অত্যন্ত বিনীতভাবে আল্লাহর কাছে দুআ করলাম, যেন আমার অন্তর-দুয়ার সত্যের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়, অন্তর থেকে সংশয় বিদূরিত হয়। দুআর পর আমার অন্তর দৃঢ় প্রত্যয়ে পূর্ণ হয়ে যায়। তারপর আমি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট উপস্থিত হয়ে আমার অবস্থা বর্ণনা করলাম। তিনি আমার অন্তরের স্থিতির জন্য দুআ করলেন।
এটা মুসলমানদের সেই দুঃসময়ের কথা যখন রাসূল সা. আরকাম ইবন আবিল আরকামের গৃহে আশ্রয় নিয়ে গোপনে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছেন। মুসলমান বলতে তখন ছিলেন মুষ্টিমেয় কিছু নিরাশ্রয় মানুষ।
এ অবস্থায় আকস্মিকভাবে হযরত হামযার ইসলাম গ্রহণে অবস্থা ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।
মুমিনদের সাথে কাফিরদের অহেতুক বাড়াবাড়ি ও বেপরোয়া ভাব অনেকটা বন্ধ হয়ে যায়।
কারণ, তাঁর দুঃসাহস ও বীরত্বের কথা মক্কার প্রতিটি লোকই জানতো।
হযরত হামযার ইসলাম গ্রহণের পর একদিন হযরত উমার রা. তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দানের জন্য গেলেন রাসূলুল্লাহর সা. নিকট। তিনি তখন হযরত আরকামের গৃহে কতিপয় সাহাবীর সাথে অবস্থান করছেন। হযরত হামযাও তখন সেখানে। হযরত উমার ছিলেন সশস্ত্র। তাঁকে দেখেই উপস্থিত সকলে প্রমাদ গুণলো। কিন্তু হযরত হামযা বলে উঠলেনঃ ‘তাকে আসতে দাও। যদি সে ভালো উদ্দেশ্যে এসে থাকে, আমরাও তার সাথে ভালো ব্যবহার করবো। অন্যথায় তারই তরবারি দিয়ে তাকে হত্যা করা হবে।’
হযরত উমার ভেতরে ঢুকেই কালেমা তাওহীদ পাঠ করতে শুরু করেন।
তখন উপস্থিত মুসলমানদের তাকবীর ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠে।
এই দুই মনীষীর ইসলাম গ্রহণের পর ইসলাম এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়।
মক্কার মুশরিকরা উপলব্ধি করে, মুহাম্মাদের সা. গায়ে আঁচড় কাটা আর সহজ হবে না।
মক্কায় অবস্থানকালে রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর প্রিয় খাদেম যায়িদ ইবন হারিসার সাথে হামযার ভ্রাতৃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন।
যায়িদের প্রতি তাঁর ভক্তি ও ভালোবাসা এত প্রগাঢ় হয় যে, যখন তিনি বাইরে কোথাও যেতেন তাঁকেই সব ব্যাপারে অসীয়াত করে যেতেন।
নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বছরে আরো অনেকের সংগে হযরত হামযাও মদীনায় হিজরাত করলেন।
এখানে তাঁর খোদা প্রদত্ত শক্তি ও সাহসিকতা প্রকাশ করার বাস্তব সুযোগ এসে যায়।
হিজরাতের সপ্তম মাসে রাসূল সা. ‘ঈস’ অঞ্চলের সমুদ্র উপকূলের দিকে তিরিশ সদস্যের মুহাজিরদের একটি ক্ষুদ্র বাহিনী পাঠান। উদ্দেশ্য, কুরাইশদের গতিবিধি লক্ষ্য করা। এ বাহিনীতে আনসারদের কেউ ছিল না।
এখানে তাঁরা সমুদ্র উপকূলে আবু জাহলের নেতৃত্বে মক্কার তিনশো অশ্বারোহীর একটি বাহিনীর মুখোমুখি হন। তারা সিরিয়া থেকে ফিরছিল। কিন্তু মাজদী ইবন ’আমর জুহানীর প্রচেষ্টায় এ যাত্রা সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়। মাজদীর সাথে দু’পক্ষের সন্ধিচুক্তি ছিল।
মদীনা থেকে যাত্রার প্রাক্কালে রাসূল সা. হযরত হামযার হাতে ইসলামী ঝাণ্ডা তুলে দেন।
ইবন আবদিল বারসহ কোন কোন ঐতিহাসিক মনে করেন, এটাই ছিল রাসূল সা. কর্তৃক কোন মুসলমানের হাতে তুলে দেওয়া প্রথম ঝাণ্ডা।
দ্বিতীয় হিজরীর সফর মাসে রাসূলুল্লাহ সা. নিজে ষাট জন সশস্ত্র সাহাবী নিয়ে কুরাইশদের বাণিজ্য চলাচল পথে ‘আবওয়া’ অভিযান পরিচালনা করেন। এ অভিযানেও হযরত হামযা ছিলেন পতাকাবাহী এবং গোটা বাহিনীর কমাণ্ডও ছিল তাঁর হাতে।
মুসলিম বাহিনী পৌঁছার আগেই কুরাইশ কাফিলা অতিক্রম করায় এ যাত্রাও কোন সংঘর্ষ ঘটেনি।
এমনিভাবে হিজরী দ্বিতীয় সনের ‘উশায়রা’ অভিযানেও হযরত হামযা মুসলিম বাহিনীর পতাকাবাহীর গৌরব লাভ করেন।
হিজরী দ্বিতীয় সনে ইসলামের ইতিহাসে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
এ যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। রণক্ষেত্রে উভয়পক্ষ কাতারবন্দী হওয়ার পর কুরাইশ পক্ষের উতবা, শাইবা ও ওয়ালিদ সারি থেকে বেরিয়ে এসে মুসলিম বাহিনীর কাউকে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের আহ্বান জানায়।
দ্বীনের সিপাহীদের মধ্য থেকে তিনজন আনসার জওয়ান তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এগিয়ে যান। কিন্তু উতবা চিৎকার করে বলে উঠেঃ ‘মুহাম্মাদ, আমাদের সমকক্ষ লোকদের পাঠাও। এসব অনুপযুক্ত লোকদের সাথে আমরা লড়তে চাই না। রাসূলুল্লাহ সা. আদেশ দিলেনঃ হামযা, আলী ও উবাইদা ওঠো, সামনে এগিয়ে যাও।’ তাঁরা শুধু আদেশের প্রতীক্ষায় ছিলেন।
এ তিন বাহাদুর আপন আপন নিযা ও বর্শা নিয়ে তাঁদের প্রতিপক্ষের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। প্রথম আক্রমণেই হযরত হামযা জাহান্নামে পাঠালেন উতবাকে। হযরত আলীও বিজয়ী হলেন তাঁর প্রতিপক্ষের ওপর। কিন্তু আবু উবাইদা ও ওয়ালিদের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ ধস্তাধস্তি চলতে লাগলো। অতঃপর আলীর সহযোগিতায় আবু উবাইদা তাকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলেন। শত্রুপক্ষের এ বেগতিক অবস্থা দেখে তুয়াইমা ইবন আদী’ তাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসে। হামযার সহযোগিতায় আলী রা. তরবারির এক আঘাতে তাকে ধরাশায়ী করে ফেলেন। এরপর মুশরিক বাহিনী সর্বাত্মক আক্রমণ চালায়। মুসলিম মুজাহিদরাও ঝাঁপিয়ে পড়েন। তুমুল লড়াই শুরু হয়ে যায়।
এ যুদ্ধে হযরত হামযা পাগড়ীর ওপর উটপাখির পালক গুঁজে রেখেছিলেন। এ কারণে যে দিকে তিনি যাচ্ছিলেন সুস্পষ্টভাবে তাকে দেখা যাচ্ছিল। দু’হাতে বজ্রমুষ্টিতে তরবারি ধরে বীরত্বের সাথে কাফিরদের ব্যুহ তছনছ করে দিচ্ছিলেন।
এ যুদ্ধে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সা. দুশমনরা শোচনীয় পরাজয় বরণ করে।
উমাইয়্যা ইবন খালাফ হযরত আবদুর রহমান ইবন ’আউফকে জিজ্ঞেস করেছিলঃ উটপাখির পালক লাগানো এ লোকটি কে? তিনি যখন বললেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. চাচা হামযা, তখন সে বলেছিলঃ ‘এ ব্যক্তিই আজ আমাদের সবচেয়ে বেশী সর্বনাশ করেছে।’
মদীনার উপকণ্ঠেই ছিল ইয়াহুদী গোত্র বনু কাইনুকা’র বসতি। রাসূলুল্লাহ সা. মদীনায় আসার পর তাদের সাথে একটি মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। কিন্তু বদর যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় লাভে তাদের হিংসার আগুন জ্বলে ওঠে।
তারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। এ চুক্তি ভংগের কারণে রাসূল সা. দ্বিতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসে তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালন করেন। এ অভিযানেও হযরত হামযা পতাকাবাহীর দায়িত্ব পালন করেন।
বদরের শোচনীয় পরাজয়ে কুরাইশদের আত্ম অভিমান দারুণভাবে আহত হয়। প্রতিশোধ স্পৃহায় উন্মত্ত বিশাল কুরাইশ বাহিনী হিজরী তৃতীয় সনে মদীনার দিকে ধাবিত হলো। আল্লাহর রাসূল সা. সংগীদের নিয়ে উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে তাদের গতিরোধ করেন।
শাওয়াল মাসে যুদ্ধ শুরু হয়। কাফিরদের পক্ষ থেকে ‘সিবা’ নামক এক বাহাদুর সিপাহী এগিয়ে এসে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের আহ্বান জানায়।
হযরত হামযা কোষমুক্ত তরবারি হাতে নিয়ে ময়দানে এসে হুংকার ছেড়ে বললেনঃ ওরে উম্মে আনমারের অপবিত্র পানির সন্তান, তুই এসেছিস আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে লড়তে? এ কথা বলে তিনি এমন প্রচণ্ড আক্রমণ চালালেন যে, এক আঘাতেই সিবার কাজ শেষ।
তারপর সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।
হযরত হামযার ক্ষিপ্র আক্রমণে কাফিরদের ব্যুহ তছনছ হয়ে গেল।
এ যুদ্ধে তিনি একাই তিরিশ জন কাফির সৈন্যকে হত্যা করেন।
যেহেতু হযরত হামযা বদর যুদ্ধে কুরাইশদের বাছাবাছা নেতৃবৃন্দকে হত্যা করেছিলেন, এ কারণে কুরাইশদের সকলেই তাঁরই খুনের পিয়াসী ছিল সবচেয়ে বেশী।
হযরত হামযার হত্যাকারী ওয়াহশী উহুদ ময়দানে হামযার হত্যা ঘটনাটি পরবর্তীকালে বর্ণনা করেছেন।
ইবন হিশাম তাঁর ‘সীরাত’ গ্রন্থে তা উল্লেখ করেছেন।
ওয়াহশী বলেনঃ ‘আমি ছিলাম জুবাইর ইবন মুতয়িমের এক হাবশী ক্রীতদাস।
বদর যুদ্ধে জুবাইরের চাচা তুয়াইম ইবন ’আদী হামযার হাতে নিহত হয়।
মক্কায় ফিরে জুবাইর আমাকে বললোঃ যদি তুমি মুহাম্মাদের চাচা হামযাকে হত্যা করে আমার চাচার হত্যার বদলা নিতে পার, আমি তোমাকে মুক্ত করে দেব।
আমাকে সে বিশেষভাবে ট্রেনিং দিল। আমি শুধু হামযাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই উহুদের দিকে রওয়ানা হলাম।
যুদ্ধ শুরু হলো। একটা পাথরের আড়ালে লুকিয়ে হামযার প্রতীক্ষা করতে লাগলাম। এক পর্যায়ে আমার কাছাকাছি উপস্থিত হলে অতর্কিতে আক্রমণ করে হত্যা করলাম। তারপর আমার স্বপক্ষ সৈন্যদের নিকট ফিরে এসে নিষ্কর্মা হয়ে বসে থাকলাম।
যুদ্ধে আর অংশগ্রহণ করলাম না। কারণ, আমার উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে গেছে। আমি মক্কায় ফিরে এলে আমাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।’
এ মর্মান্তিক ঘটনা সংঘটিত হয় তৃতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসের মাঝামাঝি। হযরত হামযার বয়স তখন ষাটের কাছাকাছি।
হযরত হামযার শাহাদাত লাভের পর কুরাইশ রমণীরা আনন্দ সংগীত গেয়েছিল।
আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতু উতবা হামযার নাক-কান কেটে অলংকার বানিয়েছিল, বুক, পেট চিরে কলিজা বের করে চিবিয়ে থুথু নিক্ষেপ করেছিল। একথা শুনে রাসূল সা. জিজ্ঞেস করেছিলেন, সে কি তার কিছু অংশ খেয়েও ফেলেছে? লোকেরা বলেছিলঃ না। তিনি বলেছিলেনঃ হামযার দেহের কোন একটি অংশও আল্লাহ জাহান্নামে যেতে দেবেন না।
যুদ্ধ শেষে শহীদের দাফন-কাফনের পালা শুরু হলো। রাসুল সা. সম্মানিত চাচার লাশের কাছে এলেন। যেহেতু হিন্দা তাঁর নাক-কান কে বিকৃত করে ফেলেছিল, তাই এ দৃশ্য দেখে তিনি কেঁদে ফেললেন। তিনি বললেনঃ কিয়ামাতের দিন হামযা হবে ‘সাইয়্যেদুশ শুহাদা’ বা সকল শহীদের নেতা। তিনি আরো বললেনঃ তোমার ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। আমার জানামতে তুমি ছিলে আত্মীয়তার সম্পর্কের ব্যাপারে অধিক সচেতন, অতিশয় সৎকর্মশীল। যদি সাফিয়্যার শোক ও দুঃখের কথা আমার মনে না থাকতো তাহলে এভাবেই তোমাকে ফেলে রেখে যেতাম, যাতে পশু-পাখী তোমাকে খেয়ে ফেলতো এবং কিয়ামাতের দিন তাদের পেট থেকে আল্লাহ তোমাকে জীবিত করতেন।
আল্লাহর কসম, তোমার প্রতিশোধ নেওয়া আমার ওপর ওয়াজিব।
আমি তাদের সত্তর জনকে তোমার মত নাক-কান কেটে বিকৃত করবো।’ রাসূলুল্লাহর সা. এ কসমের পর জীবরীল আ. সূরা নাহলের নিম্নোক্ত আয়াত দু’টি নিয়ে অবতীর্ণ হলেনঃ
‘যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ কর, তবে ঠিক ততখানি করবে যতখানি অন্যায় তোমাদের প্রতি করা হয়েছে। তবে তোমরা ধৈর্যধারণ করলে, ধৈর্যশীলদের জন্য তাই-ই তো উত্তম। ধৈর্য ধারণ কর।
তোমার ধৈর্য তো হবে আল্লাহরই সাহায্যে।
তাদের জন্য দুঃখ করো না এবং তাদের ষড়যন্ত্রে তুমি মনঃক্ষুণ্ন হয়োনা।’ (সূরা নাহল/১২৬–২৭)
এ আয়াত নাযিলের পর রাসূল সা. কসমের কাফ্ফারা আদায় করেন।
(তাবাকাতে ইবন সাদ)
হযরত সাফিয়্যা ছিলেন হযরত হামযার সহোদরা। ভায়ের শাহাদাতের খবর শুনে তাঁকে এক নজর দেখার জন্য দৌড়ে আসেন। কিন্তু রাসূল সা. তাঁকে দেখতে না দিয়ে কিছু সান্ত্বনা দিয়ে ফিরিয়ে দেন। ভায়ের কাফনের জন্য হযরত সাফিয়্যা দু’খানি চাদর পাঠান। কিন্তু হযরত হামযারই পাশে আরেকটি লাশও কাফনহীন অবস্থায় পড়ে ছিল। তাই চাদর দু’খানি দু’জনের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।
হযরত খাব্বাব ইবনূল আরাত রা. বলেন, একটি চাদর ছাড়া হামযাকে কাফন দেওয়ার জন্য আর কোন কাপড় আমরা পেলাম না। তা দিয়ে পা ঢাকলে মাথা এবং মাথা ঢাকলে পা বেরিয়ে যাচ্ছিল।
তাই আমরা চাদর দিয়ে মাথা এবং ‘ইজখির’ ঘাস দিয়ে পা ঢেকে দিলাম। (হায়তুস সাহাবা– ১/১৩৬) সাইয়্যেদুশ শুহাদা হযরত হামযাকে উহুদের ময়দানে দাফন করা হয়।
ইমাম বুখারী হযরত জাবির থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সা. উহুদ যুদ্ধের শহীদদের দু’জন করে একটি কবরে দাফন করেছিলেন।
হামযা ও আবদুল্লাহ ইবন জাহাশকে এক কবরে দাফন করা হয়।
ইবন হাজার ‘আল-ইসাবা’ গ্রন্থে ‘ফাওয়ায়েদে আবিত তাহিরের’ সূত্রে উল্লেখ করেছেন যে, হযরত জাবির রা. বলেনঃ মুয়াবিয়া যে দিন উহুদে কূপ খনন করেছিলেন সেদিন আমরা উহুদের শহীদদের জন্য কান্নাকাটি করেছিলাম।
শহীদদের আমরা সম্পূর্ণ তাজা অবস্থায় পেয়েছিলাম।
এক ব্যক্তি হযরত হামযার পায়ে আঘাত করলে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে পড়ে।
হযরত হামযার হত্যাকারী হযরত ওয়াহশী রা. মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহর সা. খেদমতে হাজির হলেন। রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি কি ওয়াহশী? জবাব দিলেনঃ হাঁ। ‘তুমিই কি হামযাকে হত্যা করেছো?’ জবাব দিলেনঃ ‘আল্লাহর রাসূল যা শুনেছেন, তা সত্য।’ রাসূল সা. বললেনঃ ‘তুমি কি তোমার চেহারা আমার নিকট একটু গোপন করতে পার?’ তক্ষুনি তিনি বাইরে বেরিয়ে যান এবং জীবনে আর কখনো রাসূলুল্লাহর সা. মুখোমুখি হননি।
রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের পর হযরত আবু বকর সিদ্দিকের রা. খিলাফত কালে ভণ্ড নবী মুসাইলামার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয। তিনিও সে অভিযানে অংশ নিলেন এই উদ্দেশ্যে যে, মুসাইলামাকে হত্যা করে হযরত হামযার হত্যার কাফ্ফারা আদায় করবেন।
তিনি সফল হলেন। এভাবে আল্লাহতাআলা তাঁকে দিয়ে ইসলামের যতটুকু ক্ষতি করেন তার চেয়ে বেশী উপকার সাধন করেন।
হযরত হামযার মধ্যে কাব্য প্রতিভাও ছিল।
ইসলাম গ্রহণ করার পর তখনকার অনুভূতি তিনি কাব্যের মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন।
সীরাতে ইবনে হিশামে ‘‘হামযার ইসলাম গ্রহণ’’ অধ্যায়ের টীকায় তার কিছু অংশ উদ্ধৃত হয়েছে।
হযরত সাঈদ বিন জুবায়ের (রাঃ) হ’তে বর্ণিত,তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন,একদা হযরত ইবরাহীম(আঃ) শিশুপুত্র ইসমাঈল ও তাঁর মা হাযেরাকে নিয়ে বের হ’লেন এমন অবস্থায় যে,হাযেরা তাকে দুধ পান করাতেন। অবশেষে যেখানে কা‘বাঘর অবস্থিত ইবরাহীম (আঃ) তাঁদের উভয়কে সেখানে নিয়ে এসে মসজিদের উঁচু অংশে যমযম কূপের উপর অবস্থিত একটি বিরাট গাছের নীচে রাখলেন। সে সময় মক্কায় ছিল না কোন জন-মানব, ছিল না কোন পানির ব্যবস্থা। তিনি একটি থলিতে খেজুর ও একটি মশকে সামান্য পানিসহ তাদেরকে সেখানে রেখে ফিরে চললেন। তখন ইসমাঈল (আঃ)-এর মা পিছনে চলতে লাগলেন এবং বললেন,‘হে ইবরাহীম! এই উপত্যকায় আমাদের রেখে আপনি কোথায় যাচেছন?এখানে না আছে কোন মানুষ,না আছে পানাহারের ব্যবস্থা’। তিনি এ কথাটি তাঁকে বার বার বলতে থাকলেন। ইবরাহীম (আঃ) তাঁর কথায় কান না দিয়ে চলতেই থাকলেন। অতঃপর হযরত হাযেরা
জানতে চাইলেন,‘আল্লাহ কি আপনাকে এ কাজের নির্দেশ দিয়েছেন? তিনি বললেন,হ্যা। তখন হাযেরা বললেন,‘তাহ’লে আল্লাহ আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না’।অতঃপর তিনি ফিরে আসলেন। আর ইবরাহীম (আঃ) সামনে চললেন।চলতে চলতে যখন তিনি গিরিপথের বাঁকে পৌঁছালেন,যেখান থেকে স্ত্রী-পুত্র তাকে দেখতে পাচেছ না। সে সময় তিনি কা‘বার দিকে মুখ করে দু’হাত তুলে এ দো‘আ করলেন,‘হে প্রভু আমি আমার স্ত্রী ও পুত্রকে চাষাবাদহীন বিরান ভূমিতে তোমার সম্মানিত গৃহের সন্নিকটে রেখে গেলাম। যাতে তারা ছালাত আদায় করতে পারে। তুমি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করে দাও এবং তাদেরকে ফলাদি দারা রূযী দান কর, যাতে তারা তোমার শুকরিয়া আদায় করতে পারে’ (ইবরাহীম ৩৭)।
(এ দো‘আ করে ইবরাহীম (আঃ) চলে গেলেন)। আর ইসমাঈল (আঃ)- এর মা তাঁকে তার বুকের দুধ পান করাতেন আর নিজে সেই মশক থেকে পানি পান করতেন। অবশেষে মশকের পানি ফুরিয়ে গেলে তিনি পিপাসিত হ’লেন এবং তাঁর শিশুপুত্রটিও পিপাসায় কাতর হয়ে পড়ল। তিনি শিশুটির দিকে দেখতে লাগলেন। তৃষ্ণায় তার বুক ধড়ফড় করছে অথবা বর্ণনাকারী বলেন,সে মাটিতে পড়ে ছটফট করছে। শিশুপুত্রের এ করুণ অবস্থার প্রতি তাকানো অসহনীয় হওয়ায় তিনি সরে গেলেন আর তাঁর অবস্থানের নিকটবর্তী পর্বত ‘ছাফা’-কে একমাত্র তাঁর নিকটতম পর্বত হিসাবে পেলেন। অতঃপর তিনি উপরে উঠে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় কি-না তা দেখতে লাগলেন। কাউকে না পেয়ে ছাফা পর্বত থেকে নেমে পড়লেন। এমনকি যখন তিনি নীচু ময়দান পর্যন্ত পৌঁউছালে, তখন তিনি তাঁর কামিজের এক প্রান্ত তুলে ধরে একজন ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষের মতো ছুটে চললেন। অবশেষে ময়দান অতিক্রম করে ‘মারওয়া’ পাহাড়ের নিকট এসে তাঁর উপর উঠে দাঁড়ালেন। অতঃপর এদিকে সেদিকে তাকালেন,কাউকে দেখতে পান কি-না? কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলেন না। এমনিভাবে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করলেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন,নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন‘এজন্যই মানুষ হজ্জ ও ওমরাহ্ এর সময় উক্ত পাহাড়দ্বয়ের মধ্যে সাতবার সাঈ করে থাকে’। এরপর তিনি যখন ‘মারওয়া’ পাহাড়ে উঠলেন,তখন একটি শব্দ শুনতে পেলেন এবং তিনি নিজেকেই নিজে বললেন,একটু অপেক্ষা কর।তিনি একাগ্রচিত্তে মনোযোগ দিয়ে শুনে বললেন,‘তুমি তো তোমার শব্দ শুনিয়েছ। তোমার কাছে কোন সাহায্যকারী থাকলে আমাকে সাহায্য কর’। অতঃপর তিনি যমযমের নিকট একজন ফেরেশতা দেখতে পেলেন। যিনি নিজের পায়ের গোড়ালি বা ডানা দ্বারা মাটিতে আঘাত করলেন, আর অমনি মাটি ফেটে পানি বের হ’তে লাগল। তখন হাযেরা (আঃ) চারপাশে নিজ হাতে বাঁধ দিয়ে একে হাউযের ন্যায় করে দিলেন এবং কোষ দ্বারা মশকটি ভরে নিলেন। কিন্তু তখনও পানি উপচে উঠতে থাকল।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন,নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,‘ইসমাঈলের মাকে আল্লাহ রহম করুন! যদি তিনি বাঁধ না দিয়ে বা কোষে ভরে পানি মশকে জমা না করে যমযমকে ঐভাবে ছেড়ে দিতেন,তবে উহা একটি কূপ না হয়ে প্রবাহমান ঝর্ণায় পরিণত হ’ত’। রাবী বলেন, অতঃপর তিনি পান করলেন এবং তার পুত্রকে দুধ পান করালেন।
ফেরেশতা তাকে (হাযেরা) বললেন,‘আপনি ধ্বংসের ভয় করবেন না। কারণ এখানে রয়েছে আল্লাহর ঘর। এ শিশুটি এবং তার পিতা দু’জনে মিলে এখানে ঘর নির্মাণ করবে এবং আল্লাহ তাঁর আপনজনকে ধ্বংস করবেন না’। ঐ সময় আল্লাহর ঘরের স্থানটি যমীন থেকে টিলার মত উঁচু ছিল। বন্যা আসার ফলে তার ডানে বামে ভেঙ্গে যাচিছল। এরপর হাযেরা এভাবেই এখানে দিন যাপন করতে থাকেন।
অতঃপর এক সময় ‘জুরহুম’ গোত্রের একদল লোক তাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিল অথবা রাবী বলেন ‘জুরহুম’ পরিবারের কিছু লোক ‘কাদা’ নামক উঁচু ভূমির পথ ধরে এদিকে আসছিল। তারা মক্কার নীচু ভূমিতে অবতরণ করল এবং একঝাঁক পাখিকে চক্রাকারে উড়তে দেখতে পেল । তখন তারা বলল,নিশ্চয় এ পাখিগুলো পানির উপর উড়ছে। আমরা এ ময়দানের পথ হয়ে বহুবার অতিক্রম করেছি। কিন্তু এখানে কোন পানি ছিল না। তখন তারা একজন কি দু’জন লোক সেখানে পাঠালো। তারা সেখানে গিয়েই পানি দেখতে পেল। তারা সেখান থেকে ফিরে এসে সকলকে পানির সংবাদ দিল। সংবাদ শুনে সবাই সেদিকে অগ্রসর হ’ল। রাবী বলেন, ইসমাঈল (আঃ)-এর মা পানির নিকট ছিলেন। তারা তাঁকে বলল,আমরা আপনার নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করতে চাই। আপনি আমাদেরকে অনুমতি দিবেন কি? তিনি জবাব দিলেন,হ্যা। তবে,এ পানির উপর তোমাদের কোন অধিকার থাকবে না। তারা হ্যা বলে তাদের মত প্রকাশ করল।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন,এ ঘটনা হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মাকে মানুষের সাহচর্যে থাকার সুযোগ করে দিল। অতঃপর তারা সেখানে বসতি স্থাপন করল এবং তাদের পরিবার-পরিজনের নিকটও সংবাদ পাঠাল। তারপর তারাও এসে তাদের সাথে বসবাস করতে লাগল। অবশেষে সেখানে তাদেরও কয়েকটি পরিবারের বসতি স্থাপিত হ’ল। আর ইসমাঈল (আঃ)ও যৌবনে উপনীত হলেন এবং তাদের কাছ থেকে আরবী ভাষা শিখলেন। যৌবনে পদার্পণ করে তিনি তাদের কাছে অধিক আকর্ষণীয় ও প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন। অতঃপর যখন তিনি পূর্ণ যৌবন লাভ করলেন,তখন তারা তাদেরই একটি মেয়ের সাথে ইসমাঈল (আঃ)-এর বিবাহ দিলেন।ইতিমধ্যে হাযেরা মারা গেলেন।ইসমাঈলের বিবাহের পর ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পরিত্যক্ত পরিজনের অবস্থা দেখার জন্য এখানে আসলেন। কিন্তু তিনি ইসমাঈল (আঃ)-কে পেলেন না।তিনি ইসমাঈল(আঃ)-এর স্ত্রীর নিকট তার অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলেন। পুত্রবধূ বলল, ‘তিনি আমাদের জীবিকার খোঁজে বেরিয়ে গেছেন। অতঃপর তিনি তাদের জীবিকা ও অবস্থা জানতে চাইলেন। তখন ইসমাঈলের স্ত্রী দুর্দশার অভিযোগ করে বলল,আমরা অতি দূরবস্থায়, অতি টানাটানি ও খুব কষ্টে আছি’। এ কথা শুনে ইবরাহীম (আঃ) বললেন,‘তোমার স্বামী বাড়ী আসলে আমার সালাম দিয়ে তার ঘরের চৌকাঠ বদলিয়ে নিতে বলবে’।
এরপর যখন হযরত ইসমাঈল(আঃ) বাড়ী আসলেন,তখন যেন তিনি কিছু আঁচ করতে পারলেন। তিনি বললেন, তোমার নিকট কোন ব্যক্তি এসেছিল কি?স্ত্রী বলল,হ্যা। আমাদের নিকট এরূপ একজন বৃদ্ধ এসেছিলেন এবং আমাকে আপনার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছিলেন। আমি তাকে আপনার খবর দেই। তিনি আমাদের জীবন-জীবিকা কিভাবে চলছে তা জিজ্ঞেস করেন। তখন আমি তাকে বলি,আমরা খুব কষ্টে ও অভাবে আছি। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, তিনি কি তোমাকে কোন বিষয়ের অছিয়ত করেছেন? তিনি বললেন,হ্যা। তিনি তার সালাম আপনাকে দেয়ার নিদের্শ প্রদান করেছেন এবং বলেছেন,তোমার দরজার চৌকাঠ পরিবতর্ন করে নিও। ইসমাঈল (আঃ) বললেন,‘উনি আমার পিতা। তিনি আমাকে তোমাকে পৃথক করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।তুমি তোমার আপনজনদের কাছে চলে যাও’। অতঃপর তিনি তাকে তালাক দিয়ে অপর একটি মেয়েকে বিবাহ করলেন।
অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) এদের থেকে আল্লাহ যতদিন চাইলেন ততদিন দূরে থাকলেন। অতঃপর তিনি আবার তাদের দেখতে আসলেন। এবারেও তিনি পুত্রকে দেখতে পেলেন না। পুত্রবধূকে তার পুত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি উত্তর দিলেন,তিনি আমাদের জীবিকার খোঁজে বেরিয়ে পড়েছেন। এরপর ইবরাহীম (আঃ) বললেন,তোমরা কেমন আছ? অতঃপর তিনি তাদের জীবন যাপন ও অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তিনি বললেন,আমরা ভাল ও সচছল আছি এবং তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন। ইবরাহীম (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন,‘তোমাদের প্রধান খাদ্য কি? সে বলল,গোশত। তিনি আবার বললেন,‘তোমাদের পানীয় কি?সে বলল,পানি।ইবরাহীম (আঃ) দো‘আ করলেন,‘হে আল্লাহ্! তাদের গোশত ও পানিতে বরকত দিন। রাসূল (ছাঃ) বলেন,তাদের জন্য তখন শস্য ছিল না। যদি থাকত তাহলে তিনি তাতে বরকত দানের জন্য দো‘আ করতেন। রাবী বলেন,মক্কা ব্যতীত অন্য কোথাও কেউ শুধু পানি ও গোশত দ্বারা জীবন ধারণ করতে পারে না। কেননা শুধু গোশত ও পানি জীবন যাপনের অনুকলূ হ’তে পারে না।
ইবরাহীম (আঃ) বললেন,‘তোমার স্বামী ঘরে ফিরে আসলে আমার সালাম দিয়ে তার ঘরের চৌকাঠ ঠিক রাখার কথা বলবে’। অতঃপর ইসমাঈল (আঃ) বাড়ী এসে বললেন, তোমাদের নিকট কেউ এসেছিলেন কি?স্ত্রী বলল,হ্যা। একজন সুন্দর চেহারার বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন এবং সে তাঁর প্রশংসা করল,তিনি আমাকে আপনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছেন। আমি তাঁকে আপনার সংবাদ জানিয়েছি। অতঃপর তিনি আমার নিকট আমাদের জীবন যাপন সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। আমি তাঁ কে জানিয়েছি যে,আমরা ভাল আছি। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, তিনি কি তোমাকে কোন বিষয়ের অছিয়ত করে গেছেন? সে বলল,হ্যা। তিনি আপনার প্রতি সালাম জানিয়ে আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে,আপনি যেন আপনার ঘরের চৌকাঠ ঠিক রাখেন। ইসমাঈল (আঃ) বললেন,ইনি আমার পিতা,আর তুমিআমার ঘরের চৌকাঠ। তিনি আমাকে তোমাকে স্ত্রী হিসাবে বহাল রাখার নিদের্শ দিয়েছেন।
আল্লাহর ইচ্ছায় হযরত ইবরাহীম (আঃ) বহুদিন পর এসে দেখেন তার পুত্র যমযম কূপের নিকটে একটি বড় গাছের নীচে বসে তীর মেরামত করছেন। পিতাকে দেখে তিনি দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। অতঃপর পিতা ছেলের সাথে বা ছেলে পিতার সাথে সাক্ষাৎ হ’লে যেমন করে থাকে তাঁরা উভয়ে তাই করলেন। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) বললেন,‘হে ইসমাঈল! আল্লাহ আমাকে একটি বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন। ইসমাঈল (আঃ) বললেন,আপনার প্রভু আপনাকে যে নির্দেশ দিয়েছেন তা পালন করুন। তিনি বললেন, তুমি কি আমাকে সাহায্য করবে? ইসমাঈল বললেন,আমি আপনাকে সাহায্য করব। ইবরাহীম (আঃ) বললেন,আল্লাহ এখানে আমাকে একটি ঘর নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন। একথা বলে তিনি উঁচু টিলাটির দিকে ইঙ্গিত করলেন যে, এর চারপাশে ঘেরাও দিয়ে। তখনি বাপ-বেটা কা‘বাঘরের দেয়াল তুলতে লেগে গেলেন। ইসমাঈল (আঃ) পাথর আনতেন,আর ইবরাহীম (আঃ) নির্মাণ করতেন। পরিশেষে যখন দেওয়াল উঁচু হয়ে গেল,তখন ইসমাঈল (আঃ) (মাকবামে ইবরাহীম নামক) পাথরটি আনলেন এবং যথাস্থানে রাখলেন। ইবরাহীম (আঃ) তার উপর দাঁড়িয়ে নির্মাণ কাজ করতে লাগলেন। আর ইসমাঈল (আঃ) তাকে পাথর যোগান দিতে থাকেন। তারা উভয়ে আল্লাহর কাছে দো‘আ করলেন যে,‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এ কাজ কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাত’ (বাকবারাহ ১২৭)। তাঁরা উভয়ে আবার কা‘বাঘর তৈরি করতে থাকেন এবং কা‘বাঘরের চারিদিকে ঘুরে ঘুরে এ দো‘আ করতে থাকেন,‘হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে কবলুকরুন। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছু শুনেন ও জানেন’
(বাকবারাহ ১২৭; ছহীহ বুখারী হা/৩৩৬৪ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়, অনুচেছদ-৯)।
শিক্ষা :
১. আললাহর হুকুমকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর সন্তুষ্টির জন্য প্রয়োজনে স্ত্রী-পুত্রসহ সবকিছু ত্যাগ করতে হবে।
২. সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে হবে ও তাঁর উপর ভরসা করতে হবে। কোন অবস্থাতেই ধৈর্যহারা হওয়া চলবে না।
৩. পরিবার ও সন্তান সন্ততির জন্য দো‘আ করতে হবে।
৪. একক নয়; বরং যৌথ উদ্যোগে সামাজিক কাজ সম্পাদন করতে হবে।
৫. হাযেরার মতো সুদৃঢ় ঈমানের অধিকারীণী হওয়ার জন্য মা-বোনদের সচেষ্ট হ’তে হবে।
৬. আল্লাহর আনুগত্য ও ধৈর্যের পরিণাম সর্বদা কল্যাণকরই হয়।
"আমি তোমাদের প্রত্যেককে একটি আইন ও পথ দিয়েছি। যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে তোমাদের সবাইকে এক উম্মত করে দিতেন, কিন্তু এরূপ করেননি- যাতে তোমাদের যে ধর্ম দিয়েছেন, তাতে তোমাদের পরীক্ষা নেন। অতএব দৌঁড়ে কল্যাণকর বিষয়াদি অর্জন কর। তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তণ করতে হবে। অতঃপর তিনি অবহিত করবেন সে বিষয়, যাতে তোমরা মতবিরোধ করতে।"-(৫:৪৮)
"..‘ঐ গ্রন্থ কে নাযিল করেছেন, যা মূসা নিয়ে এসেছিল? যা জ্যোতি বিশেষ এবং মানবমন্ডলীর জন্যে হেদায়েতস্বরূপ, যা তোমরা বিক্ষিপ্ত পত্রে রেখে লোকদের জন্যে প্রকাশ করছ এবং বহুলাংশকে গোপন করছ। তোমাদেরকে এমন অনেক বিষয় শিক্ষা দেয়া হয়েছে যা তোমরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা জানত না।’
বলে দাও, ‘আল্লাহ নাযিল করেছেন।..’" -(৬:৯১)
"আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছি। এতে হেদায়েত ও আলো রয়েছে। আল্লাহর আজ্ঞাবহ পয়গম্বর, দরবেশ ও আলেমরা এর মাধ্যমে ইহুদিদের ফয়সালা দিতেন। কেননা তাদেরকে এই খোদায়ী গ্রন্থের দেখা শোনা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল এবং তারা এর রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত ছিল।.. আমি এই গ্রন্থে তাদের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিময়ে চক্ষু, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং যখমসমূহের বিনিময় সমান যখম। অতঃপর যে ক্ষমা করে, সে পাপ থেকে পবিত্র হয়ে যায়। যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদানুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই অত্যাচারী।" -(৫:৪৪-৪৫)
তাওরাত খোদায়ী গ্রন্থ। সর্বশেষ ঐশী গ্রন্থ কোরআনে এ গ্রন্থ সম্পর্কে অনেক বর্ণনা আছে এবং আমরা উপরের আয়াতসমূহ থেকে জানছি যে এই গ্রন্থ এখন আর অবিকৃত নেই। তদুপরি ঐ গ্রন্থে কি নির্দেশ ছিল তা আমাদের কৌতুহল। যদিও কোরআন থেকে আমরা জানি মূল আইনসমূহের কোন পরিবর্তন নেই- কোন কিতাবেই । "..তুমি আল্লাহর বিধানে পরিবর্তণ পাবে না এবং আল্লাহর রীতিনীতিতে কোনরকম বিচ্যুতিও পাবে না।" -(৩৫:৪৩) যাইহোক, এখন আমরা দেখি তাওরাতে কি ছিল।
খোদা মূসাকে যে ব্যবস্থা (Torah) দিয়েছিলেন তা ছিল পূর্ণ এক কিতাব। Actually,Torah consists of five books (Pentateuch). In the first, the beginning of the creation and history from Adam to Joseph are recorded. Tn the second the enslaving of the Israelite's by the Egyptians, the coming of Moses, the destruction of Pharaoh, the establish of the Arc of the covenant, the event in the wilderness, the Imamship of Aaron, the promulgation of the Decalogue, and the hearing by the people of the words of Allah the Most High., are related. The third book contains a summary of the commandments. The fourth the number of the people, the distribution of the land to them, the circumstances of the envoys sent by Moses to Syria, the history of the Mannah-Salwah, and of the cloud for guiding, shedding and lighting them..The fifth contains the numbers of the commandments of the Torah to elucidate the summary account, it also records the decease of Aaron and of Moses, and the succession of Joshua.
তবে যে তৌরাত বর্তমান রয়েছে তা মূল অাসমানী কিতাব নয়, নেবু চাঁদ নেজ্জার জেরুজালেম আক্রমণের পর ইহুদিদেরকে নাঙ্গা করে শিকলে বেঁধে নিয়ে গিয়ে তার রাজ্যের নানান স্থানে বসিয়ে দেন। ফলে ইহুদিরা কিতাবহীন হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে নবী ওজায়ের (Ezra) নির্বাসনের সময় তার পিতা কর্তৃক মাটিতে প্রোথিত করে রেখে যাওয়া পাঠের অনুপোযুক্ত হয়ে পড়া তৌরাত থেকে যতটুকু সম্ভব উদ্ধার ও বাকীটা তার মেমরী থেকে নিয়ে কিতাবটিকে আবারো লিখিত আকার দেন। তার সংকলিত ঐ গ্রন্থে ৬১৩টি শরিয়া আইন বা ব্যবস্থা ছিল।বিস্তারিত ঐ ব্যবস্থার সংক্ষিপ্তসার আমরা বোঝার সুবিধার্থে তিনভাগে বিভক্ত করেছি, যথা- নীতিগত ব্যবস্থা তথা দশ আজ্ঞা, সামাজিক বিচার ব্যবস্থা এবং ধর্মীয় আচার-বিধি ও উৎসবাদি-
ক). নীতিগত ব্যবস্থা তথা দশ আজ্ঞা:
-খোদা ব্যতিত অপর কাউকে উপাস্য স্থির কোরও না। (আমি ব্যতিত অন্য কোন উপাস্য নেই।)
-প্রতিমার পূজা কোরও না। (এক্ষেত্রে পিতার অপরাধের প্রতিফল সন্তানদের উপর বর্তিবে, যারা আমাকে দ্বেষ করে, তাদের উপর তৃতীয় ও চতুর্থ পুরুষ পর্যন্ত তা বর্ত্তিবে; কিন্তু যারা আমাকে প্রেম করে ও আমার আজ্ঞাসমূহ পালন করে, তাদের সহস্র পুরুষ পর্যন্ত আমার আশীর্বাদে ধন্য হবে।)
-অনর্থক (অসৎ উদ্দেশ্যে) খোদার নাম নিও না।
-বিশ্রামবারকে পবিত্ররূপে মান্য কোরও। (তোমরা সপ্তাহের ছয়দিন কাজ করবে এবং সপ্তমদিন বিশ্রামবার হিসেবে পালন করবে। এতে তোমাদের হালের ও ভারবাহী পশু, তোমাদের গৃহে জন্ম নেয়া দাস-দাসী আর অন্যান্য জাতির লোকেরাও পরিশ্রম থেকে রেহাই পাবে।)
-পিতা-মাতাকে সমাদর কোরও।
-নরহত্যা কোরও না।
-ব্যভিচার কোরও না।
-চুরি কোরও না।
-প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে মিথ্যে সাক্ষ্য -প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে মিথ্যে সাক্ষ্য দিও না।
-প্রতিবেশীর কোন বস্তুতে (প্রতিবেশীর স্ত্রী, তার দাস-দাসী, তার পশু কিম্বা অন্য যে কোন বস্তু) লোভ -প্রতিবেশীর কোন বস্তুতে (প্রতিবেশীর স্ত্রী, তার দাস-দাসী, তার পশু কিম্বা অন্য যে কোন বস্তু) লোভ কোরও না।
খ) সামাজিক বিচার ব্যবস্থা:
০১. খোদার একত্ব ও পবিত্রতা: খোদা এক এবং অদ্বিতীয়। তোমার সমস্ত অন্তর, সমস্ত প্রাণ, সমস্ত মন এবং সমস্ত শক্তি দিয়ে, তাকে মহব্বত করবে। উপাসনায় কাউকে তাঁর অংশীদার সাব্যস্ত করবে না। স্বর্ণ বা রৌপ্য দ্বারা নিজেদের জন্যে কোন দেবদেবতাও তৈরী করে নেবে না।
খোদাকে অপমান কোরও না। তাঁকে যা দেবার তা দিতে দেরী কোরও না। তাঁর পবিত্র নামের পবিত্রতা নষ্ট কোরও না। তাকে ভক্তিপূর্ণ ভয় করবে।
খোদার নামে মিথ্যে কসম খেও না। এতে খোদার পবিত্র নামকে অপবিত্র করা হয়।
০২. সামাজিক আইন-কানুন বা বিধি-বিধান: ক্রয়কৃত কোন দাস ছয় বৎসর তার মালিকের অধীনে কাজ করবে, কিন্তু সপ্তম বৎসরে তাকে কোন বিনিময় ছাড়াই মুক্তি দিতে হবে। যদি সে একা এসে থাকে তবে একাই চলে যাবে, কিন্তু যদি সে তার স্ত্রীকেও সঙ্গে এনে থাকে তবে তাকেও তার সঙ্গে যেতে দিতে হবে। কিন্তু ঐ দাসের বিবাহ যদি তার মনিবই দিয়ে থাকে আর তার সন্তানাদি হয়ে থাকে, তবে সেই স্ত্রী ও সন্তানেরা মনিবেরই থেকে যাবে। কিন্তু যদি ঐ দাস স্পষ্ট করে জানায় যে, সে তার মনিব, তার স্ত্রী ও সন্তানদেরকে ভালবাসে এবং তাদের ছেড়ে চলে যাবার ইচ্ছে তার নেই, তবে তার মনিব তাকে স্বাক্ষ্য তাম্বুর সম্মুখে উপস্থিত করবে। তারপর তাম্বুর দ্বারদেশে তুরপুন দিয়ে তার কান ফুঁটো করে দেবে। এতে সে সারাজীবন ঐ মালিকের দাস হয়ে থাকবে।
যদি কেউ তার কন্যাকে দাসী হিসেবে বিক্রি করে, তবে তার মনিব তাকে দাসের মত মুক্ত করে দিতে পারবে না। কিন্তু যে মনিব তাকে নিজের জন্যে পছন্দ করে নিয়েছে অতঃপর সে যদি তার উপর খুশী হতে না পারে, তবে তাকে মুক্ত করে দেবে। কিন্তু তার সাথে প্রবঞ্চনা করতে বা অন্য কারও কাছে তাকে বিক্রি করতে পারবে না। আর যদি মনিব তার পুত্রের জন্যে তাকে পছন্দ করে নিয়ে থাকে তবে নিজকন্যার মত সব অধিকার তাকে দিতে হবে। আর যদি মনিব সেই দাসীকে বিবাহ করার পরেও অন্য কাউকে বিবাহ করে তবুও সে তার খোরাক পোষাক দিতে বাধ্য থাকবে এবং তার দৈহিক চাহিদাও তাকে পূরণ করতে হবে। কারণ স্ত্রী হিসেবে এটা তার প্রাপ্য। সে যদি এই কর্তব্য না করে তবে কোন অর্থের বিনিময় ছাড়াই তাকে মুক্তি দিতে হবে।’
কারও আঘাতের ফলে যদি কারও মৃত্যু হয়, তবে আঘাতকারীর প্রাণদন্ড হবে। কিন্তু খুনের উদ্দেশ্য যদি তার না থেকে থাকে- যদি এটা হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা হয়, তবে তাকে হত্যা করা যাবে না। যদি কেউ সুপরিকল্পিতভাবে কাউকে হত্যা করে বেদীর কাছে গিয়েও আশ্রয় নেয়, তবে সেখান থেকেও তাকে ধরে এনে হত্যা করতে হবে।
পিতা বা মাতার প্রহারকারীকে হত্যা করতে হবে। পিতামাতার শাপদাতাও মৃত্যূদন্ডে দন্ডিত হবে।
যদি কারও আঘাতের ফলে কারও অঙ্গহানী হয়, তবে সেই আঘাতকারীকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং তাকে সুস্থ্য করার সব ব্যবস্থা এবং যাবতীয় ব্যয় ভারও বহন করতে হবে। আর দাস বা দাসীর ক্ষেত্রে সে মুক্ত হয়ে যাবে। আর যদি কারও আঘাতের দ্বারা তার দাস বা দাসীর মৃত্যু হয়, তবে আঘাতকারীকে হত্যা করতে হবে। কিন্তু যদি সে দু-একদিন বেঁচে থাকে অতঃপর তার মৃত্যু হয়, তবে আঘাতকারী কোন শাস্তি পাবে না, কারণ সে তার নিজেরই সম্পত্তি।
যদি কারও আঘাতের দ্বারা কোন গর্ভবতী স্ত্রীলোকের গর্ভ নষ্ট হয়ে যায়, তবে সেই স্ত্রীলোকের স্বামীর দাবী অথবা বিচারকের রায় অনুসারে অবশ্যই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কিন্তু এছাড়া যদি অন্য কোন ক্ষতি হয় তবে আঘাতকারীকে শাস্তি পেতে হবে। যেমন- প্রাণের বদলে প্রাণ, দাঁতের বদলে দাঁত, হাতের বদলে হাত, পায়ের বদলে পা, জখমের বদলে সমান জখম ইত্যাদি।
যদি কেউ তার জমির কোন গর্তের মুখ খুলে রাখে, কিম্বা কোন গর্ত খুঁড়ে ঠিকমত তার মুখ ঢাকা দিয়ে না রাখে আর সেই গর্তে পড়ে যদি কোন পশুর মৃত্যু হয়, তবে তাকেই তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তবে মৃত পশুটা তার হয়ে যাবে।
যদি কোন গরুর শিং এর আঘাতে কারও মৃত্যু হয় তবে পাথর নিক্ষেপে সেই গরুকে অবশ্যই হত্যা করতে হবে। সেই গরুর মাংস কেউ খাবে না এবং গরুর মালিকও কোন শাস্তি পাবে না। তবে গরুটার যদি গুঁতানোর অভ্যাস থাকে আর তার মালিককে সাবধান করে দেবার পরেও সে যদি তাকে আঁটকে না রাখে আর সেই গরুটার দ্বারা কারও মৃত্যু হয়, তবে পাথর নিক্ষেপে গরু এবং তার মালিককেও হত্যা করতে হবে। কিন্তু নিহতের ওয়ারিশরা যদি মালিকের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবী করে, তবে তা পরিশোধ করে সে তার জীবন রক্ষা করতে পারবে।
কোন গরু যদি কোন দাস বা দাসীকে হত্যা করে ফেলে তবে তার মনিবকে গরুর মালিক ক্ষতিপূরণ বাবদ তিন‘শ ষাট গ্রাম রূপা দেবে, আর সেই গরুটাকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করবে। আবার যদি কারও গরু অন্য কারও গরুকে হত্যা করে, তবে ঐ গরুর বিক্রয় লব্ধ অর্থ এবং মৃত গরুটাকে তারা দু‘জনে ভাগ করে নেবে। কিন্তু যদি একথা জানা যায় যে, গরুটা হিংস্র স্বভাবের মালিক তা পূর্ব থেকেই জ্ঞাত কিন্তু সে তাকে বেঁধে রাখেনি তবে সেই মালিককে গরুর বদলে গরু দিতে হবে এবং মৃত গরুটা তার হয়ে যাবে।
যদি কারও পালিত পশু অন্যকারও ক্ষেতের ফসল নষ্ট করে, তবে তাকে নিজের ক্ষেতের সর্বোৎকৃষ্ট ফসল দিয়ে তার ক্ষতিপূরণ করতে হবে।
কারও কাছ থেকে ধার স্বরূপ আনা কোন পশু যদি মালিকের অনুপস্থিতিতে আহত হয় বা মৃত্যুবরণ করে, তবে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কিন্তু মালিকের সম্মুখেই যদি তা হয় তবে তাকে কোন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। কিন্তু পশুটা যদি অর্থের বিনিময়ে ভাড়া করে আনা হয়ে থাকে তবে সেই পরিমান অর্থই তার ক্ষতিপূরণ হবে।
যদি কারও জ্বালান আগুন দ্বারা অন্য কারও ফসল বা অন্য কোন সম্পদের ক্ষতি সাধিত হয়, তবে আগুনটা যে জ্বালিয়েছিল তাকেই তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
যদি কেউ গরু বা ভেড়া চুরি করে এনে জবেহ করে, কিম্বা বিক্রি করে দেয়, তবে একটা গরুর পরিবর্তে পাঁচটা এবং একটা ভেড়ার পরিবর্তে চারটা ভেড়া ফিরিয়ে দিতে হবে।
চোরকে চুরি করা জিনিষের জন্যে অবশ্যই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, কিন্তু যদি সে সম্বলহীন হয় তবে তাকেই বিক্রি করে সেই অর্থ আদায় করে দিতে হবে। চুরি করা পশু যদি চোরের কাছে পাওয়া যায় তবে চোরকে সেগুলোর দ্বিগুণ ফিরিয়ে দিতে হবে। আবার যদি কোন চোর রাতে চুরি করার সময় ধরা পড়ে আহত হয়ে মারা যায়, তবে আঘাতকারী হত্যার দায়ে দায়ী হবে না। কিন্তু যদি সূর্য্য উঠবার পরে তা হয় তবে সে সেই খুনের জন্যে দায়ী হবে।
যদি কেউ কাউকে চুরি করে নিয়ে এসে বিক্রি করে দেয় কিংবা যদি তাকে তার সঙ্গে পাওয়া যায়, তবে তাকে হত্যা করতে হবে।
যদি কেউ কারও কাছে অর্থ সম্পদ রাখতে দেয় আর তার গৃহ থেকে তা চুরি হয়ে যায় এবং চোর ধরা পড়ে, তবে চোর তার দ্বিগুণ ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু যদি চোর ধরা না পড়ে তবে গৃহকর্তা নিজেই সেইসব নিয়েছে কিনা তা স্থির করার জন্যে তাকে বেদীর সম্মুখে উপস্থিত হতে হবে।
অন্যের দখলে আছে এমন কোন পশু বা পরিধেয় বস্ত্র কিম্বা অন্য কোন হারান জিনিষ দেখে যদি কেউ নিজের বলে দাবী করে, তবে তা মীমাংসার জন্যে দু‘পক্ষকেই বেদীর সম্মুখে উপস্থিত হতে হবে। সেখানে খোদা যাকে দোষী বলে স্থির করবেন সে অন্যজনকে তার দ্বিগুণ ফিরিয়ে দেবে।
যদি কেউ তার কোন পশু কারও কাছে পালনার্থে রাখতে দেয়, আর তা মরে যায় বা আঘাত পায়, কিম্বা ছিনতাই হয় অথচ কেউ এসব হতে দেখেনি, তবে তাকে বেদীর সম্মুখে উপস্থিত হতে হবে ব্যাপারটার মীমাংসার জন্যে। আর ঐ ব্যক্তি খোদাকে সাক্ষী করে বলবে-‘আমি প্রতিবেশীর দ্রব্যে হস্তার্পণ করিনি।’ আর সেই পশুর মালিককে তা মেনে নিতে হবে এবং কোন ক্ষতিপূরণ সে দাবি করতে পারবে না। কিন্তু সেই ব্যক্তির কাছ থেকে যদি সেটা চুরি হয়ে যায় তবে তাকেই ক্ষতিপূরণ দিতেই হবে। আর যদি কোন হিংস্র জন্তু সেই পশুটাকে ছিঁড়ে ফেলে তবে তা প্রমান করার জন্যে তাকে পড়ে থাকা অংশগুলো নিয়ে এসে দেখাতে হবে। এ অবস্থায় তাকে আর ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না।
কোন কুমারীকে যদি কেউ ভুলিয়ে এনে তার সঙ্গে ব্যভিচার করে, তবে সেই ব্যক্তিকে তার বিয়ের পণ দিতে হবে এবং মেয়েটা তার স্ত্রী হবে। কিন্তু যদি মেয়েটির পিতা কিছুতেই তার কাছে কন্যাদানে সম্মত না হয় তাহলেও ঐ ব্যক্তিকে ঐ মেয়েটির বিয়ের পণ দিতে হবে।
কোন ব্যক্তি যদি ব্যভিচারে লিপ্ত অবস্থায় ধরা পড়ে, তবে তাদের উভয়কেই দেহের অর্ধাংশ মাটিতে প্রোথিত করে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করতে হবে।
ইস্রায়েলী হোক বা তাদের মধ্যে বসবাসকারী কোন বিদেশী হোক, তাদের কেউ যদি তার সন্তানকে বা বংশের কাউকে মোলক দেবের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে, তবে তার প্রাণদন্ড হবে, লোকেরা তাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করবে। আর যদি তারা তা না করে সেইসময় চক্ষু মুদিত রাখে, তবে তাদের সকলে অপরাধী সাব্যস্ত হবে এবং আমি তাদের সকলকে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন করব।
মায়াবিনী কিম্বা গণকের বিদ্যা ব্যবহার কোরও না। মায়াবিনী মৃত্যুদন্ডের সাজা পাবে। জ্যোতিষ বা গণকের কাছে ভাগ্য অন্বেষণে যাবে না। আর পুরুষ কিম্বা স্ত্রীলোকের মধ্যে যে কেউ ভূতাড়িয়া বা গুণী হয়, তার প্রাণদন্ড হবে। লোকে তাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করবে এবং তার রক্ত তারই উপর বর্তিবে।
কোন পশুর সঙ্গে যৌন সঙ্গমকারীকে এবং ঐ পশুটিকে অবশ্যই হত্যা করতে হবে।
কোন ঈমাম কন্যা যদি বেশ্যা হয়, তবে তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করবে।
সন্তানদের পাপের জন্যে পিতাকে কিম্বা পিতার পাপের জন্যে সন্তানকে হত্যা করা যাবে না। প্রত্যেকে তার নিজের পাপের ভার বহন করবে।
০৩. সম্পত্তি আইন: ভূমি চিরকালের নিমিত্ত বিক্রীত হবে না, কেননা ভূমি আমারই; তোমরা তো আমার সাথে বিদেশী ও প্রবাসী। আর তোমরা নিজেদের অধিকৃত দেশের সর্বত্র ভুমি মুক্ত করতে দেবে।
কেউ যদি দরিদ্র হয়ে আপন অধিকারের কিঞ্চিত বিক্রয় করে, তবে তার মুক্তিকর্তা নিকটস্থ জ্ঞাতি এসে নিজ ভ্রাতার বিক্রীত ভূমি মুক্ত করে নেবে। যার মুক্তিকর্তা নেই, সে যদি ধনবান হয়ে নিজে তা মুক্ত করতে সমর্থ হয়, তবে সে তার বিক্রয়ের বৎসর গণনা করে তদনুসারে অতিরিক্ত মূল্য ক্রেতাকে ফিরিয়ে দেবে; এরূপে সে নিজ অধিকারে ফিরে যাবে। কিন্তু যদি সে তা ফিরিয়ে নিতে অসমর্থ হয়, তবে সেই বিক্রীত অধিকার যোবেল বৎসর পর্যন্ত ক্রেতার হস্তে থাকবে; অত:পর যোবেল বৎসরে তা মুক্ত হবে এবং সে আপন অধিকারে ফিরে যাবে।
প্রাচীর বেষ্টিত কোন শহরের কোন বাড়ী যদি কেউ বিক্রি করে, তবে বিক্রি করার পর এক বৎসর পর্যন্ত তা ছাড়িয়ে নেবার অধিকার তার থাকবে। বাড়ীটা যদি এক বৎসরের মধ্যে ছাড়িয়ে নেয়া না হয় তবে যে তা কিনেছে, স্থায়ীভাবে সেটা তার ও তার বংশধরদের হয়ে যাবে। ফিরে পাওয়ার বৎসর তথা যোবেল বৎসরেও সেটা ফিরিয়ে দিতে হবে না। কিন্তু প্রাচীর বেষ্টিত নয় এমন গ্রামের বাড়ীগুলো খোলা জমি জায়গার মতই ধরে নিতে হবে। সেগুলো ছাড়িয়ে নেয়া যাবে এবং যোবেল বৎসরে সেগুলো ফেরতও দিতে হবে। তবে সম্পত্তি হিসেবে পাওয়া লেবীয়দের সব গ্রাম ও শহর এবং সেগুলোর মধ্যেকার বাড়ীগুলো তাদের সবসময়ই ছাড়িয়ে নেবার অধিকার থাকবে। যদি লেবীয়দের বিক্রি করা সম্পত্তি, কোন লেবীয় ছাড়িয়ে নেয়, তবে সেই বিক্রীত গৃহ এবং তার অধিকারস্থ নগর যোবেল বৎসরে মুক্ত হবে, কারণ ইস্রায়েলীদের মধ্যে লেবীয়দের গ্রাম ও শহরের বাড়ী-ঘর তাদেরই সম্পত্তি। কিন্তু তাদের গ্রাম ও শহরের পশু চরাবার মাঠ বিক্রিত হবে না; কেননা তা তাদের চিরকালের সম্পত্তি।
আর যদি তোমার ভ্রাতা দরিদ্র ও শুন্যহস্ত হয়, তবে তাকে সাহায্য করবে; সে বিদেশী ও প্রবাসীর ন্যায় তোমার সাথে জীবন ধারণ করবে। আর তোমার ভ্রাতা যদি দরিদ্র হয়ে তোমার নিকট নিজেকে বিক্রয় করে, তবে তুমি তার উপর কঠিন কর্তৃত্ব কোরও না। সে বেতনজীবি ভৃত্যের ন্যায় কিম্বা প্রবাসীর ন্যায় তোমার সঙ্গে থাকবে এবং দাস্যকর্ম করবে। অত:পর সে যোবেল বৎসরে মুক্ত হবে।
আর যদি কোন ইস্রায়েলী নিজেকে তোমাদের মধ্যে বসবাসকারী কোন ধনবান বিদেশী কিম্বা প্রবাসীর কাছে নিজেকে বিক্রয় করে, তবে বৎসর বৈতনিক ভৃত্যের ন্যয় সে তার সাথে থাকবে। আর তার থাকবার সময় বেতনজীবির দিনের ন্যায় হবে। তবে সে নিজে অথবা তার জ্ঞাতিদের কেউ তাকে ছাড়িয়ে নিতে পারবে এবং সেক্ষেত্রে ছাড়িয়ে নেবার দিন থেকে যোবেল বৎসর পর্যন্ত সময় গণনা করে ক্রয়কারীকে তার মোচনের মূল্য ফিরিয়ে দেবে।
০৪. বৈধ-অবৈধ তথা হারাম হালাল: ভূমির উপর বাসকরা জীব-জন্তুর যেগুলি জাবর কাটে এবং যেগুলোর খুর পুরোপুরি দু‘ভাগে চেরা কেবল সেগুলোর মাংস তোমাদের জন্যে হালাল। কিন্তু উষ্ট্র, শাফন, খরগোষ প্রভৃতি তোমাদের খাওয়া চলবে না, কেননা তারা জবর কাটলেও তাদের খুর পুরোপুরি দ্বিখন্ডিত নয়। তেমনি শূকর হারাম, কেননা তার খুর দ্বি-খন্ড বিশিষ্ট হলেও সে জাবর কাটে না।
পানিতে যেসব প্রাণী বাস করে তাদের মধ্যে যাদের ডানা এবং গায়ে আঁশ আছে সেগুলো তোমাদের জন্যে হালাল।
ঈগল, শকুন, চিল, বাজপাখি, কাক, উটপাখি, পেঁচা, গাংচিল, হাঁড়গিলা, সিন্দুবাজ, হুপ্পু আর বাঁদুড় তোমরা খেতে পারবে না।
ভূচর প্রাণীদের মধ্যে বেজি, ইঁদুর, গিরগিটি, তক্ষক, গোসাপ, টিকটিকি, রক্তচোষা, কাঁকলাস তোমাদের পক্ষে অশুচি।
ভূচর প্রত্যেক কীট এবং চতুষ্পদ উড্ডীয়মান পতঙ্গ তোমাদের পক্ষে ঘৃণার্হ।
অধিক পানি আছে এমন জলাধার বা ঝর্ণার পানি মৃত প্রাণীর দরুণ অশুচি হবে না।
এমন কোন পশুর মাংস তোমরা খাবে না যা কোন হিংস্র জানোয়ারে ছিঁড়ে ফেলে রেখেছে।
মৃত পশুর মাংস হারাম।
রক্ত খাওয়া হারাম। কারণ, সমস্ত প্রাণীর প্রাণ রয়েছে তার জীবন্ত দেহের রক্তে। রক্তসুদ্ধ কোন মাংস খাওয়া যাবে না।
মেদ বা চর্বি তোমাদের জন্যে নিষিদ্ধ। কেননা যে কোন পশু হতে খোদার উদ্দেশ্যে অগ্নিকৃত উপহার উৎসর্গ করা যায়, সেই পশুর মেদ ভোজনকারী আপন লোকদের মধ্য হতে উচ্ছিন্ন হবে।
কোন পশুর মা এবং বাচ্চা একই দিনে জবেহ করবে না। আর কোন পশুর বাচ্চার মাংস তার মায়ের দুধে রান্না করবে না।
নিকট সম্বন্ধ আছে এমন কোন আত্মীয়ের সাথে বিবাহ অবৈধ। যেমন-সৎমা, আপন ভগ্নি বা সৎবোন, নিজের কন্যা, পুত্র বা কন্যা পক্ষের নাতনি, পুত্রবধূ, ফুফু, খালা, চাচী, মামী। একই সঙ্গে কোন স্ত্রীলোক ও তার কন্যাকে বিবাহ করা হারাম। স্ত্রী বর্তমানে তার ভগ্নিকে বিবাহ করা অবৈধ। এই ধরণের অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনকারীদের উভয়ে প্রাণদন্ডে দন্ডিত হবে। আর যদি কেউ স্ত্রীকে ও তার মাতাকে রাখে তবে তাদেরকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করতে হবে।
০৫. সামাজিক আচার-আচরণ ও বিধি-বিধান: পুং মৈথুন চলবে না। এটা ঘৃণার্হ কর্ম। এই কর্ম সাধনকারী উভয়ই প্রাণদন্ডে দন্ডিত হবে।
মিথ্যে গুজব রটাবে না।
অন্যায়ের পক্ষ নিয়ে দুষ্ট লোককে সাহায্য করবে না। দশজনে অন্যায় করছে বলে তুমিও তা করতে যেয়ো না।
কোন মোকদ্দমায় সাক্ষ্য দিতে দিয়ে গিয়ে অধিকাংশের সাথে যোগ দিয়ে ন্যায়বিচারে বাঁধা দিয়ো না। কেউ গরীব বলেই বিচারের সময় তার পক্ষ নেবে না।
সাজান মামলা থেকে দূরে থাকবে।
কোন নির্দোষীকে মৃত্যুর শাস্তি দিয়ো না। এই অন্যায়কারী শেষ বিচারে আমার করুণা লাভে সমর্থ হবে না।
ঘুষ খেয়ো না, কারণ ঘুষ মানুষকে অন্ধ করে দেয়-সৎলোকের কথায়ও প্যাঁচ লাগিয়ে দেয়।
কারও নিকট থেকে অন্যায় সুবিধা নেবে না, কিম্বা জুলুম করে তার জিনিস নেবে না। মুজুরের দিনের মুজুরী দিনে পরিশোধ করতে হবে- তা সকাল পর্যন্ত আটকে রাখবে না।
বধিরকে অভিশাপ দেবে না। অন্ধের পথে উঁচোট খাবার মত কিছু রাখবে না।
কারও নিন্দা করবে না। কোন মানুষের প্রাণের ক্ষতি হতে পারে এমনকিছু করবে না।
বিভিন্ন জাতের পশুর মধ্যে মিলন ঘটানো যাবে না।
কাউকে ঠকাবে না। মাপে কিম্বা ওজনে কম করবে না।
নিজের কন্যাকে বেশ্যা বানানো যাবে না। এতে সে অপবিত্র হয়ে পড়বে এবং দেশ ব্যভিচারী হয়ে যাবে ও সকল কূ-কার্য্যে পূর্ণ হবে।
তোমার শত্রুর কোন পশুকে যদি অন্য কোথাও চলে যেতে দেখ তবে সেটা অবশ্যই তার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। তোমাকে ঘৃণা করে এমন কোন ব্যক্তির গাধাকে যদি বোঝার ভারে পড়ে যেতে দেখ তবে সেই ব্যক্তিকে সেই অবস্থায় রেখে চলে চলে যাবে না, তাকে অবশ্যই সাহায্য করতে হবে।
বলদ আর গাধা একসঙ্গে জুড়ে চাষ করবে না।
শস্য মাড়াই করার সময়ে বলদের মুখে জালতি বেঁধ না।
মৃতলোকের জন্যে শোক প্রকাশ করতে গিয়ে দেহের কোন স্থান ক্ষত করবে না।
দেহে উল্কি আঁকবে না।
অন্যের প্রতি ঘৃণা পোষণ করবে না। অন্যের দোষ অবশ্যই দেখিয়ে দেবে যাতে শেষ বিচারে নিজে দোষী সাব্যস্ত না হও। তোমাদের মধ্যে বাস করা অন্য জাতির লোকদের সঙ্গে দূর্ব্যাবহার করবে না। কারও বিরুদ্ধে মনের মধ্যে হিংসার ভাব পুষে রাখবে না। প্রত্যেক মানুষকে নিজেরমত করে ভালবাসবে।
কোন বিদেশীর সঙ্গে দূর্ব্যাবহার বা তার উপর কোন অত্যাচার কোরও না, কারণ মিসরে তোমরাও একদিন বিদেশী ছিলে।
প্রাচীনকে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান করবে এবং বয়স্ককে সমাদর করবে।
প্রতিবেশীকে মহব্বত করবে এবং শত্রুকে ঘৃণা।
কোন বিধবা বা অনাথকে কষ্ট দিও না। যদি তা কর এবং সে আমার কাছে কাঁদে তবে নিশ্চয়ই আমি তার কান্নায় কান দেব।
ঈমামেরা মাথা কামাবে না। তারা বেশ্যা, বিধবা বা স্বামী পরিত্যাক্তা কোন স্ত্রীলোককে বিবাহ করবে না।
মাথার দু‘পাশের চুল কাটা বা দাঁড়ির আগা ছাঁটবে না।
কোন স্ত্রীলোক যেন পুরুষের, কিম্বা কোন পুরুষ যেন স্ত্রীলোকের সাঁজ-পোশাক পরিধান না করে।
সদ্য বিবাহিত কাউকে যুদ্ধে পাঠান যাবে না, কিম্বা তার উপর অন্য কোন কাজের বোঝা চাপিয়ে দেয়া যাবে না। স্ত্রীর সন্তুষ্টির জন্যে এক বৎসর পর্যন্ত এসব কাজ থেকে তাকে রেহাই দিতে হবে।
এক পরিবার হয়ে বাস করার সময়ে যদি কোন এক ভাই পুত্রসন্তান না রেখে মারা যায়, তবে তার বিধবা স্ত্রী পরিবারের বাইরের কাউকে বিবাহ করতে পারবে না।
কাউকে কিছু ঋণ দিয়ে বন্ধক হিসেবে কোন জিনিষ নেবার জন্যে তার গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করবে না। আর ঋণের বন্ধক হিসেবে কারও যাঁতা কিম্বা তার উপরের পাথরটা নেবে না।
কাউকে ধার দিয়ে মহাজনের মত করে তার কাছ থেকে সুদ নিও না।
কারও গায়ের চাদর বন্ধক রাখলে সূর্য্য ডুবে যাবার আগেই তা ফিরিয়ে দিতে হবে, কারণ ওটাই তার গায়ে দেবার জন্যে একমাত্র কাপড়। আর যদি তা ফিরিয়ে দেয়া না হয়, যদি সে এজন্যে আমার কাছে কাঁদে, তবে আমি তার কান্নায় কান দেব।
ঈমামের কোন বংশধর দেহে খুঁত নিয়ে খাবার উৎসর্গ করতে বেদীর কাছে যেতে পারবে না বা খোদার উদ্দেশ্যে পোড়ান উৎসর্গের অনুষ্ঠান করতে পারবে না।
ঈমামের পরিবারের লোক ছাড়া আর কেউ উৎসর্গ করা পবিত্র জিনিস খেতে পারবে না। তবে ঈমামের ক্রয়কৃত বা গৃহে জন্ম গ্রহণ করেছে এমন দাস তা খেতে পারবে। তবে তার কন্যা যদি ঈমাম ছাড়া অন্য কাউকে বিবাহ করে, তবে সে তা খেতে পারবে না। তবে তার বিধবা বা স্বামী পরিত্যাক্তা কন্যারা তা খেতে পারবে। অন্য কেউ ভুল করে তা খেয়ে ফেললে ঈমামকে তার মূল্য দিয়ে দেবে। এই মূল্য হবে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে এক পঞ্চমাংশ বেশী।
প্রথম জন্মেছে এমন প্রতিটি পুরুষ সন্তান তা মানুষের হোক বা পশুর-প্রভুর বলে ধরা হবে। সাতদিন পর্যন্ত বাচ্চারা তার মায়ের কাছে থাকবে, তারপর আট দিনের দিন সেগুলো খোদাকে দিতে হবে।
প্রথমজাত পশুকে কেউই খোদার উদ্দেশ্যে উৎসর্গের জন্যে দান করতে পারবে না, কেননা তা খোদারই। কিন্তু যদি এই পশু অশুচি
জিলক্বদ মাসের ২৫
তারিখে (৬৩২ খ্রী. ২৩শে ফেব্রুয়ারী) তিনি লক্ষাধিক শিষ্য সঙ্গে করে মক্কার পথে রওনা হলেন। মক্কায় পৌঁছে এবং হজ্জের সকল বিধি পালন শেষে সমবেত জনতার উদ্দেশ্য নিম্নোক্ত ভাষণ দিলেন (৮ই জিলহজ্জ ৭ই মার্চ)। কেয়ামত পর্যন্ত এই ভাষণ মুসলমানদের মনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
--‘হে মানবমন্ডলী! আমার কথা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর, কেননা এই বৎসরের পর আমি আর তোমাদের মাঝে এখানে মিলিত হতে পারব কিনা জানিনে। এই দিন, এই মাস যেমন সকলের জন্যে পবিত্র; তোমাদের জানমাল তেমনি তোমাদের জন্যে পবিত্র ও অলংঘী যতদিন না তোমাদের প্রভুর সমক্ষে উপস্থিত হচ্ছ; আর স্মরণ রেখ যে, তোমাদের প্রভুর সামনে তোমাদের উপস্থিত হতে হবে এবং তিনি তোমাদের কাজের হিসাব নিকাশ গ্রহণ করবেন।
--হে জনমন্ডলী! তোমাদের স্ত্রীদের উপর যেমন তোমাদের অধিকার রয়েছে, তোমাদের স্ত্রীদেরও তেমনি তোমাদের উপর অধিকার আছে। দয়া ও ভালবাসার সঙ্গে তাদের সাথে আচরণ করবে নিশ্চয়ই আল্লাহর জামিনে তোমরা তাদের গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর কালামের মাধ্যমে তারা তোমাদের জন্যে বৈধ হয়েছে।
--তোমাদের উপর যে বিশ্বাস ন্যস্ত হয়েছে তার প্রতি সর্বদা বিশ্বস্ত থাকবে এবং পাপ পরিহার করবে।
--সুদ অবৈধ ঘোষিত হল। অর্ধমণ শুধু মূল দেয়টাই ফেরত দেবে, আর আব্দুল মুত্তালিবের পুত্র, আমার চাচা আব্বাসের কাছ থেকে গৃহীত ঋণ পরিশোধ দিয়েই হবে এর শুরু।
--এদিন থেকে অন্ধকার যুগের অনুশীলিত রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ নিষিদ্ধ হল এবং আব্দুল মুত্তালিবের পুত্র হারিস তস্যপুত্র ইবনে রাবিয়ার হত্যাকান্ড থেকে সবধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অবসান ঘটল।’ (ইবনে রাবিয়া ছিল মুহম্মদের চাচাত ভাই। শৈশবে তাকে বনি লাইস গোত্রের একটি পরিবারের কাছে প্রতিপালনের জন্যে দেয়া হয়েছিল। হুজাইল গোত্রের সদস্যরা নির্মমভাবে তাকে হত্যা করেছিল। কিন্তু এপর্যন্ত ঐ হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয়নি।)
--‘আর তোমাদের দাসরা! তোমরা যে আহার্য গ্রহণ করবে তাদেরকেও সেই আহার্য প্রদান করবে, আর তোমরা যে বস্ত্র পরিধান করবে তাদেরকেও সেই বস্ত্র পরিধান করতে দেবে। যদি তোমাদের কোন দাস এমন অপরাধ করে ফেলে যা তোমরা ক্ষমা করতে পারছ না, তবে তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন কর,কিন্তু তার প্রতি রূঢ় আচরণ কোরও না, কেননা তারা প্রভূর দাস এবং রূঢ় আচরণের যোগ্য নয়।
--হে জনমন্ডলী! আমার কথা শ্রবণ কর আর তা বুঝতে চেষ্টা কর। জেন যে, এক মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই। তোমরা এক ভ্রাতৃসংঘের অন্তর্ভূক্ত। কারও দ্রব্য অন্যের জন্যে বৈধ নয় যদি সে তা সদিচ্ছা প্রণোদিত হয়ে দান না করে। অন্যায় করা থেকে বিরত থাকবে।
--হে আমার উম্মতেরা! আমি যা রেখে যাচ্ছি, তা যদি তোমরা দৃঢ়ভাবে ধারণ করে থাক, তবে কিছুতেই তোমাদের পতন হবে না। সেই গচ্ছিত সম্পদ কি? তা আল্লাহর কোরআন। নিশ্চয় জানিও ‘আমার পরে আর কোন নবী আসবে না। আমিই শেষ নবী। যারা এখানে উপস্থিত আছ তারা- যারা এখানে অনুপস্থিত, তাদেরকে সব বলবে। সম্ভবতঃ যে শুনবে সে, যে শুনছে তার চেয়ে অধিক স্মরণ রাখতে পারবে।’
প্রত্যেক বাক্য শেষ হলে মুহম্মদ থামছিলেন এবং তা খলফের পুত্র উমাইয়া তস্যপুত্র রাবিয়া উচ্চ নিণাদী কন্ঠে পুনঃরাবৃত্তি করছিল যাতে সমগ্র শ্রোতৃমন্ডলী তা শুনতে পারে।
আরাফাত পর্বত প্রান্তরে দেয়া বিদায় হজ্জ্বের ( Hajj) এই ভাষণ মুহম্মদের অন্যান্য ভাষণ এর তুলনায় নিতান্ত সাধারণ ও কম মরমীবাদী হলেও এটি ছিল প্রচন্ড আবেদনশীল। ভাষণ সমাপ্তির সময় জনতার উদ্বেলচিত্ততার দিকে লক্ষ্য করে মুহম্মদ বিস্ময়ে অভিভুত হয়ে বললেন, ‘হে আমার প্রভু! আমি আমার পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি ও আমার কাজ সম্পন্ন করেছি।’
সমবেত বিশাল জনতা সমস্বরে উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আপনি আপনার দায়িত্ব সম্পাদন করেছেন।’
--‘হে আমার প্রভু! আমি মিনতি করছি, তুমি এই বিষয়ে স্বাক্ষী থাক।’ -এ কথা বলে মুহম্মদ তার ভাষণ সমাপ্ত করলেন। আরবের ঐতিহ্য অনুসারে এই ভাষণ বিস্তার, বাগ্মিতা ও প্রাণবন্ততার জন্যে উল্লেখযোগ্য।
অতঃপর কোরআনের শেষ আয়াত নাযিল হল- ‘হে মুহম্মদ! আজ আমি তোমার দ্বীনকে সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমার উপর আমার নেয়ামত পূর্ণ করে দিলাম। ইসলামকে তোমার ধর্ম বলে মনোনীত করলাম।’- (৫:১৩)
হজ্জ্বের আবশ্যিক বিধি পালন করেই মুহম্মদ তার অনুসারীদের সঙ্গে নিয়ে মদিনায় ফিরে এলেন।
বি:দ্র: বিদায় হজ্জ্বে নবীজীর দেয়া সর্বশেষ এই ভাষণটি আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত থেকে স্ব-কর্ণে শুনেছিলেন প্রায় ৬০ হাজার মুসলিম। তদুপরি এই ভাষণ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে মুসলিমদের মধ্যেও এবং দারুণ কৌতুহলী যাকিছু, তা হচ্ছে এসব বক্তব্যের সবগুলির যথোপযুক্ত প্রমান ও স্বীকৃত দলিল রয়েছে। যেমন-
শিয়া মতে- “আমি তোমাদের জন্যে যা রেখে গেলাম যদি তা তোমরা ধরে থাক, তবে তোমরা কখন্ই বিচ্যূত হবে না, তা হল- আল্লাহর কিতাব ও আমার পরিবার।” -সহীহ মুসলিম ৪৪/৪, নাম্বার ২৪০৮; ইবনে হাম্বল ৪/৩৬৬; দারিমী ২৩/১, নাম্বার ৩৩১৯।
সুন্নী মতে-“আমি তোমাদের জন্যে যা রেখে গেলাম যদি তা তোমরা ধরে থাক, তবে তোমরা কখন্ই বিচ্যূত হবে না, তা হল- আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাহ।” -আল মুয়াত্তা, মালিক ইবনে আনাস, ৪৬/৩।
অন্য মতে- “আমি তোমাদের জন্যে যা রেখে গেলাম যদি তা তোমরা ধরে থাক, তবে তোমরা কখন্ই বিচ্যূত হবে না, তা হল- আল্লাহর কিতাব।” -সহীহ মুসলিম ১৫/১৯, নাম্বার ১২১৮; ইবনে মা’যা ২৫/৮৪; আবু দাউদ ১১/৫৬।
কোডেক্স গিগাস (ল্যাটিন অর্থে বিশাল বই) বিশ্বের বৃহত্তম মধ্যযুগীয় পান্ডুলিপি। ধারণা করা হয়ে থাকে, ১৩’শ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বোহেমিয়ার (বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্র) চরুদিম এর নিকটে পডলাজাইসের আশ্রমে এটি লিখিত হয়েছিল। এতে আছে- ভালগেট বাইবেল, ইসিদোরে অব সেভিল’স এনসাইক্লোপিডিয়া এটাইমোলজি, জোসেফাসের এন্টিকুইটিজ অব দা জিউজ, কসমাস অব প্রাগ এর ক্রোনিকেল অব বোহেমিয়া, চ্যাপ্টারস অব হিস্টিরি, এটাইমোলজি এন্ড ফিজিওলজি, এ ক্যালেন্ডার উইথ নেক্রোলোজিয়াম, এ লিস্ট অব ব্রাদারস ফ্রম দা পডলাজাইস মনস্টারী ও ডিটেইলস অব ম্যাজিক ফর্মূলা, স্পেলস, মেডিসিন ও অন্যান্য লোকাল রেকর্ডস। এটি “শয়তানের বাইবেল” হিসেবেও পরিচিত, কারণ এর ভিতর (২৯০ নম্বর পৃষ্ঠাজুড়ে) তার একটি প্রতিকৃতি রয়েছে এবং পৌরাণিক কাহিনী মতে এর লেখকও সে। বর্তমানে এটি সুইডেনের স্টকহোমে জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত রয়েছে।
কোডেক্স গিগাস চামড়া এবং ধাতুর অলংকারে সজ্জ্বিত একটি কাষ্ঠ নির্মিত বাক্সে বিশেষভাবে রক্ষিত। এ্ই পুস্তকটি ৩৬.২ ইঞ্চি লম্বা, ১৯.৭ ইঞ্চি চওড়া এবং ৮.৬ ইঞ্চি পুরু এবং এর ওজন ৭৫ কেজি। এতে রয়েছে ৩১০টি পার্চমেন্ট কাগজ যা তৈরীতে সম্ভবত: ১৬০টি গাধা বা গোচর্ম লেগেছে। প্রথমদিকে এতে ৩২০টি পাতা ছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে এর থেকে ৮টি পাতা হারিয়ে যায়। ৭ই মে, ১৬৯৭ সনে আগুন লাগে সুইডেনের রাজপ্রাসাদে যেখানকার এক লাইব্রেরীতে এটি সংরক্ষিত ছিল। আগুনে পুড়ে যাবার আগেই জানালা দিয়ে উদ্ধার কর্মীরা বইটি নীচে ফেলে দিতে সমর্থ হয়। কিন্তু ততক্ষণে যথেষ্ট ক্ষতি হয়ে গেছে। কিছু পাতা পুড়ে যায় এবং কিছু পাতা নীচে পড়ার সময় বাতাসে উড়ে যায় যা আর পাওয়া যায়নি। অবশ্য অনেকের ধারণা, এই আট পৃষ্ঠা অনেক আগেই কেউ সরিয়ে নিয়েছে যাতে ষষ্ঠ শতকে লেখা সাধু বেনিডিক্ট প্রণীত সন্যাস জীবন-যাপনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় নিয়ম কানুনগুলো ছিল।
প্রকৃতপক্ষে মধ্যযুগের সেই সময়ে নানান রং ব্যবহার করে অদ্ভুত সব ছবি সম্বলিত এই পুস্তকটি কেন রচিত হয়েছিল এবং কে তা রচনা করেছিল তা এখনও রহস্যাবৃত। একটি পৌরাণিক কাহিনী মতে এটি লেখার পরিকল্পণা করে হারম্যান রিকুলাস নামের একজন বেনিডিক্টাইন পাদ্রী (ইতালির সাধু বেনিডিক্টের অনুসারীরাই হচ্ছে বেনিডিক্টাইন)। সে অন্য সাধুদের সাথে পরমপিতার নাম-গান গেয়ে জীবন কাটাচ্ছিল, কিন্তু এক দূর্বল মুহুর্তে সে মঠের নিয়ম ভঙ্গ করে বসে।এতে শাস্তি হিসেবে পরদিন তাকে জীবন্ত অবস্থায় মঠের দেয়ালে গেঁথে ফেলার আদেশ দেন মঠাধক্ষ্য।
যাহোক, এই কঠোর শাস্তির ঘোষণা শুনে হারমান মঠাধক্ষ্যকে জানায় যে, সে তার জীবনের অবশিষ্ট রাতটি মানব কল্যাণে ব্যয় করতে চায়। সে তার অর্জিত জ্ঞান দিয়ে তার জীবনের ঐ শেষরাতে এমন এক কিতাব লিখে যাবে, যাতে মানুষের প্রয়োজনীয় সমস্ত জ্ঞান থাকবে, আর তা চিরকালের জন্য ঐ আশ্রমের নামের সুখ্যাতি বয়ে বেড়াবে। সে মঠাধক্ষ্যের কাছে প্রয়োজনীয় উপকরণের আবেদন করলে তাকে তার চাহিদা মত সমস্তকিছু সরবরাহ করা হয়।
এদিকে হারমান মধ্যরাত্রির কাছাকাছি নিশ্চিত হয় যে, সে স্বল্প ঐ সময়ে তার কাজ সম্পূর্ণ করতে পারবে না। এতে হতাশার চরমে পৌঁছে যায় সে। ঈশ্বরের সেবাকাজে জীবন-যৌবণ উৎসর্গ করার পর আজ তার এই পরিণতি। সে এক কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়। বিশেষ পদ্ধতিতে শয়তানকে হাজির করে সে (জ্বিণ ছাড়ানোর পূর্ণ পদ্ধতি গিগাসেও বর্ণনা করা হয়েছে) এবং তার কাছে নিজ আত্মা উৎসর্গের অঙ্গীকার করে বইটি সম্পূর্ণ করে দেবার প্রস্তাব রাখে। শয়তান তার প্রস্তাবে সাড়া দেয়,শুরু হয় কোডেক্স গিগাস লেখা।
উষার আলো ফুটে ওঠার অনেক আগেই পুরো কিতাব লেখা শেষ করে শয়তান চলে যায় এবং প্রমান স্বরূপ তার ছবি একে রেখে যায় ঐ কিতাবের ২৯০ নম্বর পৃষ্ঠা জুড়ে। তার ঐ প্রতিকৃতি ছিল পশুর মত খুর, ধারালো নখ ও সাপের মতো লকলকে জিহ্বা বিশিষ্ট অর্ধমানব অর্ধপশুর দানবীয় এক চিত্ররূপ। ঐ চিত্রে দেখা যায়, সে এক বদ্ধ ঘরের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যে পৃষ্ঠায় শয়তান তার ছবি এঁকেছে ঠিক তার উল্টো পৃষ্ঠায় এঁকেছে স্বর্গের ছবি। কেন এমনটা সে করেছে তা এক অজানা রহস্য।
বইটিতে এমন কিছু লেখা আছে যা থেকে রশ্মি নির্গত হয়! আর এসব বিচ্ছুরিত রশ্মির বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে রয়েছে লাল, নীল, সবুজ ও সোনালী। বইয়ের পুরো পাতা জুড়ে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা বড় হাতের অক্ষরগুলো এমনি রশ্মির বিচ্ছুরণ করছে। এর প্রতিটি পাতা দেখতে একই রকম কেননা লেখার ধরণ আগাগোড়া অপরিবর্তিত যা লেখার ব্যাপ্তিকাল, লেখকের মর্জি মেজাজের কিছুরই নির্দেশক নয়। আর এটাই বিশ্বাস এনে দেয় যে, পুরো বইটি খুব অল্পসময়ে একজনের দ্বারাই লেখা হয়েছে।
কোডেক্স গিগাস নিয়ে প্রচুর গবেষণা চলছে। তবে, আধুনিক হস্তলেখা বিশারদগণ নিশ্চিত করেছেন যে সেটি একক হাতে লেখা। আর লেখার ব্যপ্তিকাল সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, একজন দক্ষ মানুষের এটা লিখতে প্রতি লাইন ২০ সেকেন্ড হিসেবে লাগবে ২০ বৎসরেরও অধিক। পাণ্ডুলিপিতে ব্যবহার করা হয়েছে একই ধরনের কালি, যা তৈরি হয়েছে পোকামাকড়ের ঝুলকালি দিয়ে। আর রং হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন কীটের শরীরের নানান রং এর তরল। এতে প্রমানিত হয় যে, লেখকের কীট-পতঙ্গ সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা ছিল, আর তাই সে তাদের শরীর থেকে প্রয়োজনীয় রংগুলো সংগ্রহ করে নিতে পেরেছে।
এই পুস্তকটি ১২২৯ সনের শেষার্ধে লেখা সম্পন্ন হয়েছে। বোহেমিয়ার পডলাজাইসের ঐ মঠ, যেখানে এটি লিখিত হয়েছিল তা ১৫ শতকের হুসাইট বিদ্রোহের সময় ধ্বংস হয়ে যায়। অবশ্য পূর্বেই কোন একসময় অর্থ সংকটে পড়ে মঠাধক্ষ্য বইটি বিক্রি করে দিয়েছিলেন। এরপর এ বই ১৪৭৭-১৫৯৩ পর্যন্ত ব্রোমভ মনাষ্টারিতে ছিল। অত:পর ১৫৯৪ সনে প্যারাগুয়ের সম্রাট রুডলফ দ্বিতীয় এটি তার সংগ্রহশালায় নিয়ে যান। আর প্যারাগুয়ের সাথে ত্রিশ বৎসর ব্যাপী যুদ্ধ শেষে ১৬৪৮ সনে সুইডিশ সেনারা এটি লুন্ঠন করে নিয়ে গিয়ে ষ্টকহোমের সুইডিশ রয়্যাল লাইব্রেরীতে রেখে দেয়।১৬৪৯ থেকে ২০০৭ সন পর্যন্ত বইটি সেখানেই সংরক্ষিত ছিল। অার ৩৫৯ বৎসর পর ২০০৭ সনে এটি এক বৎসরের চুক্তিতে প্রদর্শনীর জন্য আবার প্যারাগুয়েতে আনা হয় এবং ২০০৮ সনে সুইডেন কর্তৃপক্ষ পুন:রায় তাদের বই ফিরিয়ে নিয়ে যায়। বইটি বর্তমানে সুইডেন রয়াল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।
এই পুস্তকটি নিয়ে নানা কুসংস্কার চালু রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, যারা এটিকে নিজেদের অধিকারে এনেছে, তাদের উপর ভর করেছে অশুভ শক্তি। হয় তাদের মস্তিস্ক বিকার ঘটেছে অথবা তারা ধ্বংস হয়েছে যুদ্ধে, অপঘাতে অথবা মড়কে।সম্রাট রুডলফই তো জলজ্যান্ত প্রমান।
কি আছে কোডেক্স গিগাসে?
এতে রয়েছে পূর্ণাঙ্গ বাইবেল ছাড়া্ও পাঁচটি বড় রচনা। পাণ্ডুলিপির শুরু হয়েছে বাইবেল (পুরাতন নিয়ম) দিয়ে এরপর রয়েছে প্রথম শতক এডির ঐতিহাসিক ফ্লভিয়াস যোসেফাসের লেখা-দা এন্টিকুইটিজ অব দা জিউজ ও দা জিউইশ ওয়ার।
যোসেফাসের পরে রয়েছে মধ্যযুগের সর্বাধিক জনপ্রিয় ইসিদোর এর বিশ্বকোষ। এই ইসিদোর ৬ষ্ঠ শতকে স্পেনের সেভিলে বসবাস করতেন। এরপর রয়েছে চিকিৎসা শাস্ত্রের উপর সংগৃহীত কিছু লেখা এবং তারপর বাইবেল নূতন নিয়ম। এরপর রয়েছে বড় রচনার সর্বশেষ কাজ- প্রাগ এর কসমাস [সিএ ১০৪৫-১১২৫] এর “ক্রোনিকেল অব বোহেমিয়া”। আর এটাই বোহেমিয়ার প্রথম ইতিহাস।
পান্ডুলিপি ছাড়াও কিছু ছোট রচনাও রয়েছে। প্রথমটি অনুশোচনা বা প্রায়শ্চিত্তের উপর লেখা আর এটা রয়েছে স্বর্গচিত্রের ঠিক আগে। দ্বিতীয়টি জ্বিন ছাড়ানোর উপর, আর এর অবস্থান শয়তানের প্রতিকৃতির ঠিক পরে। ছোট রচনার সবশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে একটা বর্ষপঞ্জিকা, যাতে রয়েছে সাধু ও স্থানীয় বোহেমিয়ান ব্যক্তির তালিকা যাদেরকে ঐ সময় স্মরণ (স্মরণার্থে উৎসব পালন) করা হত। কিছু হারিয়ে যাওয়া বা পান্ডুলিপি থেকে সরিয়ে ফেলা কাজও রয়েছে। সম্ভবত: সেগুলো ছিল ৬ষ্ঠ শতকে লেখা সাধু বেনেডিক্টের আইন, সন্যাস জীবন-যাপনের জন্যে অত্যাবশ্যকীয় পথ নির্দেশিকা।
দৃশ্যত: এসব ছাড়া একটা শব্দ “inclusion” ব্যতিত সমগ্র রচনা সম্পূর্ণ নিখূঁত ও ত্রুটিমুক্ত এবং কোন শব্দটি আপনি ব্যবহারে বেঁছে নেবেন, তার উপর ৩২০ পৃষ্ঠার সমগ্র রচনার পুরোপুরি ভিন্ন অর্থ দাঁড়াবে। Is this a conspiracy to dumb down, separate and segregate religious belief from reality by modern religion?, maybe just simply a blind, closed minded approach to the translation of the text?, or is it really the incorrect understanding of the original scribes meaning. বড়ই রহস্য নয় কি? একটা শব্দ বেঁছে নাও, আর নিজে পরীক্ষা কর! ওয়াও...
বিষয়টি কি সত্যিই ইন্টারেস্টিং না? -a universal scripture within the bindings of a single book approaching the subjects of historic fact, magic and religion all together and all in line?
সমাপ্ত।
সংশোধিত নয়।
উৎস:
উইকিপিডিয়া,
“কোডেক্স গিগাস”-ন্যাশনাল জিওগ্রাফি।
এম গুল্লিক, দ্যা কোডেক্স গিগাস।
রাজেন্দ্রন, সেজিন; স্যাটানিক ইন্সপাইরেশন।
মহাপ্লাবন সম্পর্কে কোরাণিক কাহিনী: সময়ের সাথে সাথে শীষ এবং আদমের অন্যান্য পুত্রদের বংশধরদের দ্বারা পরিবার ও গোত্রে হয়ে ব্যাকটেরিয়ায় বা উম্মুল বিলাদের সমতলভূমিতে ক্রমশঃ বিস্তার লাভ করতে থাকে। একসময় এরা সম্ভবত: তাদের পূর্ব পুরুষদের উপাস্য এক আল্লাহর স্বরূপ সম্পর্কে সম্যক ধারণা না করতে পেরে তাঁর ভয়ে ভীত হয়ে মাধ্যম হিসেবে পয়গম্বরদের মাঝে আশ্রয় নেয়। আর পয়গম্বরদের মৃত্যুর পর শয়তানের প্ররোচনায় তাদের মূর্ত্তি তৈরী করে তার অর্চণা করতে শুরু করে ও ক্রমে একক উপাস্য আল্লাহ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ হয়ে পড়ে। একসময় তারা নিষ্ঠুর বর্বরস্তর থেকে বর্বরতার স্তরে উন্নীত হয় এবং ভীতি ও বিভীষিকাময়তার মধ্যে প্রাকৃতিক বস্তুর পূজায় লিপ্ত হয়। ব্যকটেরিয়ায় শেকড় গেড়ে থাকা এই জনগোষ্ঠীই আর্য এবং এদের পালিত ধর্মমতই বৈদিক ধর্ম।
পরবর্তিতে আল্লাহ এসব পথভ্রষ্টদেরকে সুপথে আনতে একজন রসূল প্রেরণ করলেন। আর্যদের এক বংশে তিনি জন্মগ্রহণ করলেন। এই রসূল ছিলেন নূহ। আল্লাহ তাকে নব্যুযত দান করেছিলেন এই সতর্কবাণী দিয়ে-‘হে নূহ! তুমি তোমার সম্প্রদায়কে, তাদের উপর শাস্তি আসার আগেই সতর্ক কর।’
কিন্তু লোকদের প্রায় সকলেই তাকে অগ্রাহ্য করল এবং তার অনুসরণে বিরত রইল। এমনকি নূহের স্ত্রী ওয়াগেলাও তার আহবানে সাড়া দেয়নি। তার কনিষ্ঠ পুত্র গোমর ছিল চরম পাপাচারে লিপ্ত।
তার সম্প্রদায়ের লোকেরা তার কথায় কর্ণপাত না করলেও তিনি তাদেরকে বিরতিহীনভাবে আহবান জানিয়ে যেতে লাগলেন। যে কোন পর্ব পার্বণে যখন অধিক লোক সমবেত হত, তখন তিনি তার সম্প্রদায়কে ডেকে তাদের উদ্দেশ্যে বলতেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর উপাসনা কর, তিনি ব্যতিত তোমাদের জন্যে অন্য কোন উপাস্য নেই। আমি তোমাদের জন্যে এক মহাদিনের শাস্তির আশঙ্কা করছি।’
তার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ বলেছিল, ‘আমরা তো তোমাকে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখছি।’আর তারা লোকদেরকে বলল, ‘এ তো তোমাদের মতই একজন মানুষ; তোমাদের উপর নেতৃত্ব করতে চাচ্ছে। আল্লাহ ইচ্ছে করলে ফেরেস্তা পাঠাতে পারতেন। আমাদের পূর্বপুরুষদের কালে এমন ঘটেছে আমরা তো তা শুনিনি। এ তো এক পাগল, সুতরাং এর ব্যাপারে কিছুকাল অপেক্ষা কর।’
তারপর ঐ প্রধানগণ নূহকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আমরা তোমাকে তো আমাদের মতই মানুষ দেখছি। আমরা তো দেখছি, যারা আমাদের মধ্যে ছোটলোক তারাই না বুঝে তোমাকে অনুসরণ করছে। আর আমরা তো আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব দেখছি নে; বরং আমরা তোমাদের মিথ্যেবাদী মনেকরি।’
নূহ বললেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমাকে বল, আমি যদি আমার প্রতিপালকের পাঠান স্পষ্ট নিদর্শণে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকি ও তিনি যদি আমাকে নিজে অনুগ্রহ করে থাকেন, অথচ এ বিষয়ে তোমরা জেনেও জানতে না চাও। তবে আমি কি এ ব্যাপারে তোমাদের বাধ্য করতে পারি যখন তোমরা এ পছন্দ করছ না? আর আমি বিশ্বাসীদের তাড়িয়ে দিতে পারিনে, নিশ্চয় তাদের প্রতিপালকের সাথে তাদের দেখা হবে। কিন্তু আমি তো দেখছি তোমরা এক অন্ধ সম্প্রদায়। হে আমার সম্প্রদায়! আমি যদি তাদেরকে তাড়িয়ে দেই তবে আল্লাহর শাস্তি থেকে কে আমাকে রক্ষা করবে? তবুও কি তোমরা বুঝবে না? আমি তোমাদেরকে বলিনে যে আমার কাছে আল্লাহর ধন-ভান্ডার আছে এবং আমি অদৃশ্যের বিষয়ও অবগত নই, আমি এও বলিনে যে, আমি ফেরেস্তা এবং তোমাদের চোখে যারা নীচ, তাদের সম্বন্ধে আমি বলিনে যে, আল্লাহ তাদের কখনই মঙ্গল করবেন না; তাদের অন্তরে যা আছে তা আল্লাহ ভালকরেই জানেন। তোমাদের কথা শুনলে আমি তো সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভূক্ত হব।
হে আমার সম্প্রদায়! আমি তো তোমাদের জন্যে এ বিষয়ে স্পষ্ট সতর্ককারী যে, তোমরা আল্লাহর উপাসনা করবে, তাকে ভয় করবে ও আমার আনুগত্য করবে। তিনি তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন ও এক নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তোমাদেরকে অবকাশ দেবেন। আল্লাহর নির্ধারিত কাল উপস্থিত হলে তিনি আর দেরী করেন না; যদি তোমরা এ জানতে!’
তারা বলল, ‘হে নূহ! তুমি আমাদের সাথে তর্ক করেছ; তুমি আমাদের সাথে বড় বেশী তর্ক করেছ; সুতরাং তুমি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যার ভয় দেখাচ্ছ তা নিয়ে এস।’
নূহ বললেন, ‘ইচ্ছে করলে আল্লাহই তা তোমাদের কাছে উপস্থিত করবেন, আর তোমরা তা ব্যর্থ করতে পারবে না। আমি তোমাদের উপদেশ দিতে চাইলেও আমার উপদেশ তোমাদের কাজে আসবে না, যদি আল্লাহ তোমাদের বিভ্রান্ত করতে চান। তিনিই তোমাদের প্রতিপালক, আর তাঁরই কাছে আমরা ফিরে যাব।’
নূহ আরও বলেছিলেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আমার মধ্যে কোন ভ্রান্তি নেই, আমি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের প্রেরিত রসূল। আমার প্রতিপালকের বাণী আমি তোমাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি ও তোমাদেরকে সদুপোদেশ দিচ্ছি, আর তোমরা যা জান না, আমি তা আল্লাহর কাছ থেকে জানি। তোমরা কি অবাক হচ্ছ যে, তোমাদেরই মত একজনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমাদের কাছে উপদেশ এসেছে, যেন সে তোমাদের সতর্ক করতে পারে এবং যেন তোমরা সাবধান হও ও তাঁর অনুগ্রহ লাভ কর?
আমি তোমাদের কাছে এরজন্যে কোন প্রতিদান চাইনে। আমার পুরস্কার তো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছেই আছে। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর ও আমার আনুগত্য কর।’
ওরা বলল, ‘আমরা কি তোমাকে বিশ্বাস করব, যখন দেখছি ছোটলোকেরাই তোমার অনুসরণ করছে?’
নূহ বললেন, ‘ওরা কি করত তা আমি জানিনে। ওদের হিসেব নেয়া তো আমার প্রতিপালকের কাজ, যদি তোমরা বুঝতে! বিশ্বাসীদেরকে তো আমি তাড়িয়ে দিতে পারিনে। আমি তো কেবল একজন স্পষ্ট সতর্ককারী।’
ওরা বলল, ‘হে নূহ! তুমি যদি না থাম তবে তোমাকে আমরা পাথর মেরে খতম করব।’
আর তারা লোকদেরকে বলল, ‘তোমরা তোমাদের দেব-দেবীকে পরিত্যাগ কোরও না; পরিত্যাগ কোরও না ওয়াদ, সূয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক ও নাসরকে।’
নূহ তখন তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আমার অবস্থান ও আল্লাহর নিদর্শণ দ্বারা আমার উপদেশ তোমাদের কাছে যদি দুঃসহ হয়, তবে আমি তো আল্লাহর উপর নির্ভর করি। তোমরা যাদেরকে শরিক করছ তার সাথে তোমাদের কর্তব্য ঠিক করে নাও, পরে যেন কর্তব্যের ব্যাপারে তোমাদের কোন সন্দেহ না থাকে। আমার সম্বন্ধে তোমাদের কর্তব্য ঠিক করে ফেল আর আমাকে অবসর দিও না। তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলে কিছু আসে যায় না, কারণ আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাইনি। আমার পারিশ্রমিক আছে আল্লাহর কাছে। আমাকে তো একজন আত্মসমর্পনকারী হতে আদেশ করা হয়েছে।’
নূহ আরও বলেছিলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য কর, কারণ ওরা আমাকে মিথ্যেবাদী বলছে। সুতরাং আমার ও ওদের মধ্যে পরিস্কার ফয়সালা করে দাও, আর আমাকে ও আমার সাথে যেসব বিশ্বাসী আছে তাদেরকে রক্ষা কর।’
নূহের সম্প্রদায়ের প্রতি তার আহ্বান সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ- ‘নূহকে আমি তার সম্প্রদায়ের কাছে এই নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছিলাম-‘তুমি তোমার সম্প্রদায়কে, তাদের ওপর শাস্তি আসার আগে সতর্ক কর।’ (৭১:১)
আর সে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর উপাসনা কর, তিনি ছাড়া তোমাদের জন্যে অন্য কোন উপাস্য নেই। আমি তোমাদের জন্যে মহাদিনের শাস্তির আশঙ্কা করছি।’
তার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ বলেছিল, ‘আমরা তো তোমাকে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখছি।’ (৭:৫৯-৬৪)
তার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ যারা অবিশ্বাস করেছিল তারা লোকদেরকে বলল, ‘এ তো তোমাদের মতই একজন মানুষ; তোমাদের উপর নেতৃত্ব করতে চাচ্ছে। আল্লাহ ইচ্ছে করলে ফেরেস্তা পাঠাতে পারতেন। আমাদের পূর্বপুরুষদের কালে এমন ঘটেছে আমরা তো তা শুনিনি। এ তো এক পাগল, সুতরাং এর ব্যাপারে কিছুকাল অপেক্ষা কর।’ (২৩:২৪-২৫)
তার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ (নূহকে উদ্দেশ্য করে) বলল, ‘আমরা তোমাকে তো আমাদের মতই মানুষ দেখছি। আমরা তো দেখছি, যারা আমাদের মধ্যে ছোটলোক তারাই না বুঝে তোমাকে অনুসরণ করছে। আর আমরা তো আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব দেখছি নে; বরং আমরা তোমাদের মিথ্যেবাদী মনেকরি।’
সে (নূহ) বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আমাকে বল, আমি যদি আমার প্রতিপালকের পাঠান স্পষ্ট নিদর্শণে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকি ও তিনি যদি আমাকে নিজে অনুগ্রহ করে থাকেন, অথচ এ বিষয়ে তোমরা জেনেও জানতে না চাও। তবে আমি কি এ ব্যাপারে তোমাদের বাধ্য করতে পারি যখন তোমরা এ পছন্দ করছ না? আর আমি বিশ্বাসীদের তাড়িয়ে দিতে পারিনে, নিশ্চয় তাদের প্রতিপালকের সাথে তাদের দেখা হবে। কিন্তু আমি তো দেখছি তোমরা এক অন্ধ সম্প্রদায়। হে আমার সম্প্রদায়! আমি যদি তাদেরকে তাড়িয়ে দেই তবে আল্লাহর শাস্তি থেকে কে আমাকে রক্ষা করবে? তবুও কি তোমরা বুঝবে না? আমি তোমাদেরকে বলিনে যে আমার কাছে আল্লাহর ধন-ভান্ডার আছে এবং আমি অদৃশ্যের বিষয়ও অবগত নই, আমি এও বলিনে যে, আমি ফেরেস্তা এবং তোমাদের চোখে যারা নীচ, তাদের সম্বন্ধে আমি বলিনে যে, আল্লাহ তাদের কখনই মঙ্গল করবেন না; তাদের অন্তরে যা আছে তা আল্লাহ ভালকরেই জানেন। (তোমাদের কথা শুনলে) আমি তো সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভূক্ত হব।’
তারা বলল, ‘হে নূহ! তুমি আমাদের সাথে তর্ক করেছ; তুমি আমাদের সাথে বড় বেশী তর্ক করেছ; সুতরাং তুমি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যার ভয় দেখাচ্ছ তা নিয়ে এস।’
সে বলল, ‘ইচ্ছে করলে আল্লাহই তা তোমাদের কাছে উপস্থিত করবেন, আর তোমরা তা ব্যর্থ করতে পারবে না। আমি তোমাদের উপদেশ দিতে চাইলেও আমার উপদেশ তোমাদের কাজে আসবে না, যদি আল্লাহ তোমাদের বিভ্রান্ত করতে চান। তিনিই তোমাদের প্রতিপালক, আর তাঁরই কাছে আমরা ফিরে যাব।’ (১১:২৭-৩৪)
সে (নূহ আরও) বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আমার মধ্যে কোন ভ্রান্তি নেই, আমি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের প্রেরিত রসূল। আমার প্রতিপালকের বাণী আমি তোমাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি ও তোমাদেরকে সদুপোদেশ দিচ্ছি, আর তোমরা যা জান না, আমি তা আল্লাহর কাছ থেকে জানি। তোমরা কি অবাক হচ্ছ যে, তোমাদেরই মত একজনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমাদের কাছে উপদেশ এসেছে, যেন সে তোমাদের সতর্ক করতে পারে এবং যেন তোমরা সাবধান হও ও তাঁর অনুগ্রহ লাভ কর? (৭:৬১-৬৩)
আমি তোমাদের কাছে এরজন্যে কোন প্রতিদান চাইনে। আমার পুরস্কার তো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছেই আছে। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর ও আমার আনুগত্য কর।’
ওরা বলল, ‘আমরা কি তোমাকে বিশ্বাস করব, যখন দেখছি ছোটলোকেরাই তোমার অনুসরণ করছে?’
নূহ বলল, ‘ওরা কি করত তা আমি জানিনে। ওদের হিসেব নেয়া তো আমার প্রতিপালকের কাজ, যদি তোমরা বুঝতে! বিশ্বাসীদেরকে তো আমি তাড়িয়ে দিতে পারিনে। আমি তো কেবল একজন স্পষ্ট সতর্ককারী।’
ওরা বলল, ‘হে নূহ! তুমি যদি না থাম তবে তোমাকে আমরা পাথর মেরে খতম করব।’ (২৬:১০৯-১১৬)
সে (তখন) তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আমার অবস্থান ও আল্লাহর নিদর্শণ দ্বারা আমার উপদেশ তোমাদের কাছে যদি দুঃসহ হয়, তবে আমি তো আল্লাহর উপর নির্ভর করি। তোমরা যাদেরকে শরিক করছ তার সাথে তোমাদের কর্তব্য ঠিক করে নাও, পরে যেন কর্তব্যের ব্যাপারে তোমাদের কোন সন্দেহ না থাকে। আমার সম্বন্ধে তোমাদের কর্তব্য ঠিক করে ফেল আর আমাকে অবসর দিও না। তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলে কিছু আসে যায় না, কারণ আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাইনি। আমার পারিশ্রমিক আছে আল্লাহর কাছে। আমাকে তো একজন আত্মসমর্পনকারী হতে আদেশ করা হয়েছে।’(১০:৭১-৭২)
সে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আমি তো তোমাদের জন্যে এ বিষয়ে স্পষ্ট সতর্ককারী যে, তোমরা আল্লাহর উপাসনা করবে, তাকে ভয় করবে ও আমার আনুগত্য করবে। তিনি তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন ও এক নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত তোমাদেরকে অবকাশ দেবেন। আল্লাহর নির্ধারিত কাল উপস্থিত হলে তিনি আর দেরী করেন না; যদি তোমরা এ জানতে!’ (৭১:২-৪) নূহ (আরও) বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সাহায্য কর, কারণ ওরা আমাকে মিথ্যেবাদী বলছে।(২৩:২৬) সুতরাং আমার ও ওদের মধ্যে পরিস্কার ফয়সালা করে দাও, আর আমাকে ও আমার সাথে যেসব বিশ্বাসী আছে তাদেরকে রক্ষা কর।’ (২৫:১১৮)
নূহ বরাবরের মত ব্যর্থ হয়ে ফিরে চললেন। তিনি তার দীর্ঘ জীবনের প্রতিটি দিন তার সম্প্রদায়কে আহবান জানিয়েছেন আল্লাহর পথে ফিরে আসার জন্যে। এক প্রজন্মের কাছে ব্যর্থ হয়ে তিনি আশা পোষণ করতেন পরবর্তী প্রজন্ম নিশ্চয়ই তার আহবানে সাড়া দেবে। কিন্তু তারাও পূর্ববর্তীদের ন্যায় আচরণ করেছে। তার আবেগময় ভাষার বিপরীতে তারা তাকে পাথর ছুঁড়েছে, তাকে রক্তাপ্লুত করেছে। এভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পার হয়েছে, কিন্তু কোন ফল লাভ হয়নি। তিনি তার দীর্ঘ জীবনে মাত্র ৩৯ জনকে আল্লাহর পথে আনতে সমর্থ হয়েছিলেন। এ কারণে মনে তীব্র কষ্ট নিয়ে বাধ্য হয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি তো আমার সম্প্রদায়কে দিনরাত আহবান করেছি, কিন্তু আমার আহবান তাদের পলায়নী মনোবৃত্তিই বৃদ্ধি করেছে। তুমি যেন ওদের ক্ষমা কর তারজন্যে আমি যতবার ওদের আহবান করেছি ততবারই তারা কানে আঙ্গুল দিয়েছে; কাপড়ে মুখ ঢেকেছে; অবিশ্বাসে জিদ করেছে এবং দেমাগ দেখিয়েছে। তারপর আমি তাদের প্রকাশ্যে আহবান করেছি। তারপরও সাধারণ ভাবে প্রচার ও ব্যক্তিগত ভাবে তাদের উপদেশ দিয়েছি। তারপর আমি তাদের বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা চাও। তিনি তো মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্যে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। তিনি তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতিতে সমৃদ্ধ করবেন, তোমাদের জন্যে রাখবেন বাগান আর বইয়ে দেবেন নদী-নালা। তোমাদের কি হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে চাচছ না! তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন পর্যায়ক্রমে। তোমরা কি লক্ষ্য করনি আল্লাহ কিভাবে সাত স্তরে সাঁজান আকাশ সৃষ্টি করেছেন, আর সেখানে চাঁদকে আলো হিসেবে ও সূর্য্যকে প্রদীপ হিসেবে স্থাপন করেছেন? তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি তোমাদেরকে সেখানে ফিরিয়ে নেবেন ও পরে আবার ওঠাবেন। আর আল্লাহ তোমাদের জন্যে জমিনকে বিছিয়ে দিয়েছেন, যেন তোমরা প্রশস্ত পথে চলাফেরা করতে পার।
--হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় তো আমাকে অমান্য করছে আর অনুসরণ করছে এমন লোকদের যাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি শুধু তাদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করছে। সুতরাং তাদের বিভ্রান্তিই শুধু বৃদ্ধি করে দাও। আর আমাকে সাহায্য কর। আমার ও ওদের মধ্যে পরিস্কার ফয়সালা করে দাও, আর আমাকে ও আমার সাথে যেসব বিশ্বাসী আছে তাদেরকে রক্ষা কর।
--হে আমার প্রতিপালক! পৃথিবীতে কোন অবিশ্বাসী গৃহবাসীকে তুমি অব্যহতি দিও না। তুমি ওদের অব্যহতি দিলে ওরা তোমার দাসদের বিভ্রান্ত করবে, আর জন্ম দিতে থাকবে কেবল দুস্কৃতিকারী ও অবিশ্বাসীদের। তাই সীমালংঘনকারীদেরকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস কর।’
এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ-
সে বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি তো আমার সম্প্রদায়কে দিনরাত আহবান করেছি, কিন্তু আমার আহবান তাদের পলায়নী মনোবৃত্তিই বৃদ্ধি করেছে। তুমি যেন ওদের ক্ষমা কর তারজন্যে আমি যতবার ওদের আহবান করেছি ততবারই তারা কানে আঙ্গুল দিয়েছে; কাপড়ে মুখ ঢেকেছে; অবিশ্বাসে জিদ করেছে এবং দেমাগ দেখিয়েছে। তারপর আমি তাদের প্রকাশ্যে আহবান করেছি তারপরও সাধারণভাবে প্রচার ও ব্যক্তিগতভাবে তাদের উপদেশ দিয়েছি। তারপর আমি তাদের বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা চাও। তিনি তো মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্যে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। তিনি তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতিতে সমৃদ্ধ করবেন, তোমাদের জন্যে রাখবেন বাগান আর বইয়ে দেবেন নদী-নালা। তোমাদের কি হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে চাচছ না! তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন পর্যায়ক্রমে। তোমরা কি লক্ষ্য করনি আল্লাহ কিভাবে সাত স্তরে সাঁজান আকাশ সৃষ্টি করেছেন, আর সেখানে চাঁদকে আলো হিসেবে ও সূর্য্যকে প্রদীপ হিসেবে স্থাপন করেছেন? তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি তোমাদেরকে সেখানে ফিরিয়ে নেবেন ও পরে আবার ওঠাবেন। আর আল্লাহ তোমাদের জন্যে জমিনকে বিছিয়ে দিয়েছেন, যেন তোমরা প্রশস্ত পথে চলাফেরা করতে পার।’
নূহ বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় তো আমাকে অমান্য করছে আর অনুসরণ করছে এমন লোকদের যাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি শুধু তাদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করছে। ওরা ভয়ানক ষড়যন্ত্র করেছে। ওরা বলছে, ‘তোমরা তোমাদের দেব-দেবীকে পরিত্যাগ কোরও না; পরিত্যাগ কোরও না ওয়াদ, সূয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক ও নাসরকে।’ আর ওরা অনেককে বিভ্রান্ত করছে; কাজেই তুমি সীমালংঘনকারীদের বিভ্রান্তিই বৃদ্ধি করে দাও।’
(৭১:৫-২৪)
নূহ আরও বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! পৃথিবীতে কোন অবিশ্বাসী গৃহবাসীকে তুমি অব্যহতি দিও না। তুমি ওদের অব্যহতি দিলে ওরা তোমার দাসদের বিভ্রান্ত করবে, আর জন্ম দিতে থাকবে কেবল দুস্কৃতিকারী ও অবিশ্বাসীদের। হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে আমার পিতামাতাকে, যারা বিশ্বাসী হয়ে আমার ঘরে আশ্রয় নিয়েছে তাদেরকে এবং বিশ্বাসী পুরুষ ও নারীদের ক্ষমা কর। আর সীমালংঘনকারীদেরকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস কর।’ (৭১:২৬-২৮)
মানুষের মন পরিবর্তনের জন্যে নূহের সকল প্রচেষ্টাই ছিল ব্যর্থ। তাই আল্লাহ সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি নূহকে জানালেন প্লাবন দ্বারা তার জাতিকে ধ্বংসের পরিকল্পণার কথা। এসময় নূহের বয়স ছিল ছয়’শ বৎসর।
আল্লাহ প্রত্যাদেশের মাধ্যমে জানালেন-‘যারা বিশ্বাস করেছে তারা ছাড়া তোমার সম্প্রদায়ের অন্য কেউ কখনও বিশ্বাস করবে না। সুতরাং তারা যা করে তার জন্যে তুমি দুঃখ কোরও না। তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার প্রত্যাদেশ অনুসারে নৌকা বানাও, আর যারা সীমালংঘন করেছে তাদের সম্পর্কে তুমি আমাকে কিছু বোলও না। তারা তো ডুববেই।’
নূহ নৌকা বানাতে লাগলেন। আর যখনই তার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ তার কাছ দিয়ে যেত তারা তাকে বিব্রত করতে জিজ্ঞেস করত, ‘হে নূহ! কি তৈরী করছ?’
তিনি বলতেন, ‘অনতিবিলম্বে এক মহাপ্লাবন হবে। তাই নৌকা তৈরী করছি।’
তারা তাকে ঠাট্টা করত, বলত, ‘এখানে তো পান করার মত পানিও দুর্লভ। আর তুমি ডাঙ্গা দিয়ে জাহাজ চালাবার ফিকিরে আছ?’
তিনি জবাবে বলতেন, ‘তোমরা যদি আমাকে ঠাট্টা কর তবে আমরাও তোমাদেরকে ঠাট্টা করব যেমন তোমরা ঠাট্টা করছ। আর তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে কার উপর অপমানকর শাস্তি আসবে, আর স্থায়ী শাস্তি কার আবশ্যম্ভাবী।’
এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ-
নূহের উপর প্রত্যাদেশ হয়েছিল, ‘যারা বিশ্বাস করেছে তারা ছাড়া তোমার সম্প্রদায়ের অন্য কেউ কখনও বিশ্বাস করবে না। সুতরাং তারা যা করে তার জন্যে তুমি দুঃখ কোরও না। তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার প্রত্যাদেশ অনুসারে নৌকা বানাও, আর যারা সীমালংঘন করেছে তাদের সম্পর্কে তুমি আমাকে কিছু বোলও না। তারা তো ডুববেই।’
সে নৌকা বানাতে লাগল, আর যখনই তার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ তার কাছ দিয়ে যেত, তারা তাকে ঠাট্টা করত। সে বলত, ‘তোমরা যদি আমাকে ঠাট্টা কর তবে আমরাও তোমাদেরকে ঠাট্টা করব যেমন তোমরা ঠাট্টা করছ। আর তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে কার উপর অপমানকর শাস্তি আসবে, আর স্থায়ী শাস্তি কার আবশ্যম্ভাবী।’ (১১:৩৬-৩৯)
একসময় প্রত্যাদেশ অনুসারে নৌকা তৈরী হল। শাল কাঠের তৈরী এই নৌকা ছিল সাড়ে চার‘শ ফুট দৈর্ঘ্য, পঁচাত্তুর ফুট প্রস্থ ও পঁয়তাল্লিশ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট। তিনতলা এই নৌকার একপাশে একটি মাত্র প্রবেশদ্বার ছিল।
নৌকা নির্মাণের পর নূহ আল্লাহর কাছে জানতে চাইলেন, ‘হে আল্লাহ, কখন আমাদের এই নৌকায় উঠতে হবে।’
তিনি জানালেন, ‘যখন দেখবে তোমার উনুনের তলদেশ দিয়ে পানি উঠতে শুরু করেছে। আর যখন তুমি ও তোমার সঙ্গীরা নৌকায় উঠবে তখন বোলও, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাদেরকে সীমালংঘনকারী সম্প্রদায় থেকে উদ্ধার করেছেন।’ তুমি আরও বোলও, ‘হে আমার প্রতিপালক আমাকে এমনভাবে নামিয়ে দাও যা হবে কল্যাণকর, এ ব্যাপারে তুমিই শ্রেষ্ঠ।’
এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ- ‘যখন তুমি ও তোমার সঙ্গীরা নৌকায় উঠবে তখন বোলও, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাদেরকে সীমালংঘনকারী সম্প্রদায় থেকে উদ্ধার করেছেন। তুমি আরও বোলও, ‘হে আমার প্রতিপালক আমাকে এমনভাবে নামিয়ে দাও যা হবে কল্যাণকর, এ ব্যাপারে তুমিই শ্রেষ্ঠ।’ (২৩:২৮-২৯)
এক সকালে নূহ জানতে পারলেন তাদের উনুনের তলদেশ দিয়ে পানি উঠছে। তিনি তখন দ্রুত নৌকায় আরোহণের প্রস্তুতি নিলেন। এসময় আল্লাহ তাকে জানালেন, ‘নৌকায় প্রত্যেক জিনিসের এক জোড়া তুলে নাও; তোমার পরিবারবর্গকে এই একজন বাদে- যার বিরুদ্ধে আল্লাহর নির্দেশ জারি হয়ে গেছে এবং যারা বিশ্বাসী।’
আল্লাহর নির্দেশমত সবকিছু নিয়ে নূহ নৌকায় আরোহণ করলেন। তবে অল্পসংখ্যক লোকজনই ঈমান এনেছিল। তাই নৌকার আরোহী হয়েছিল খুবই কম। আরোহীদের মধ্যে ছিলেন নূহ, তার তিন পুত্র (শ্যাম, হাম ও যেফৎ) ও তাদের স্ত্রীরা, অন্যান্য আল্লাহ বিশ্বাসীরা এবং বিভিন্ন প্রকার জীব-জন্তুর জোড়া। পাপাচারে লিপ্ত নূহের স্ত্রী ও কনিষ্ঠ পুত্র গোমর এই নৌকায় ছিল না। নূহ যখন তার স্ত্রীকে নৌকায় উঠতে বলেছিলেন তখন সে অস্বীকার করেছিল। তিনি জানতেন তার পরিবারের একজন নৌকায় উঠবে না। সুতরাং তিনি স্ত্রীকে বাদ দিয়ে কনিষ্ঠ পুত্রের খোঁজ করলেন, জানতে পারলেন গোমর তার সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে পূর্বেই গৃহ থেকে বেরিয়ে পড়েছে।
অবশেষে আল্লাহর আদেশ এলে প্লাবন শুরু হল। আসমানের দ্বারসমূহ উন্মোচিত হল, ফলে অতিবর্ষণের সাথে সাথে মাটি ফেটেও ভূগর্ভ থেকে তীব্র প্রস্রবণের সৃষ্টি হল-ফলে দ্রুতই প্লাবন সংগঠিত হল। আর পানির এই তীব্র স্রোত সবকিছু ভাসিয়ে নিল। এসময় নূহ নৌকার মধ্যে বসে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানালেন-‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাদেরকে সীমালংঘনকারী সম্প্রদায় থেকে উদ্ধার করেছেন। হে আমার প্রতিপালক, আমাকে এমনভাবে নামিয়ে দিও যা হবে কল্যাণকর, এ ব্যাপারে তুমিই শ্রেষ্ঠ।’
এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ- ‘নৌকায় প্রত্যেক জিনিসের এক জোড়া তুলে নাও; তোমার পরিবারবর্গকে এ একজন বাদে-যার বিরুদ্ধে আল্লাহর নির্দেশ জারি হয়ে গেছে-এবং যারা বিশ্বাসী। তবে অল্প সংখ্যক লোকজনই তার সাথে ঈমান এনেছিল।’(১১:৪০)
‘অবশেষে আমার আদেশ এলে পৃথিবী প্লাবিত হল। (১১:৩৬-৪০) ‘আমি উন্মোচিত করে দিলাম আসমানের দ্বারসমূহ অতি বর্ষণের সাথে এবং মাটিতে তীব্র প্রস্রবণ সৃষ্টি করলাম-যেন পানি একত্রিত হয়ে হুকুম অনুযায়ী তা সমাধা করে -যা নির্ধারিত।’(৫৪:১১-১২)
পর্বত প্রমান ঢেউ নূহের নৌকা ভাসিয়ে নিয়ে চলল। একসময় নূহ দেখতে পেলেন তার কনিষ্ঠ পুত্র গোমর ভেসে যাচ্ছে। তিনি চীৎকার করে তাকে ডেকে বললেন, ‘হে আমার পুত্র! আমাদের সঙ্গে এই নৌকায় ওঠো আর অবিশ্বাসীদের সঙ্গে থেকো না। আল্লাহর নামে এর গতি ও স্থিতি। আমার প্রতিপালক তো ক্ষমা করেন, দয়া করেন।’
সে বলল, ‘আমি এমন এক পর্বতে আশ্রয় নেবো যা আমাকে প্লাবন থেকে রক্ষা করবে।’
নূহ বললেন, ‘আজ আল্লাহর বিধান থেকে রক্ষা করার কেউ নেই, রক্ষা পাবে সেই, যাকে আল্লাহ দয়া করবেন।’
দূর থেকে যখন পিতা-পুত্রের কথোপকথন চলছিল, সেইসময় এক উত্তাল তরঙ্গ এসে উভয়ের মাঝে অন্তরাল সৃষ্টি করল এবং গোমরকে নিমজ্জিত করল। নূহ জানতেন তার এই পুত্র অবিশ্বাসী। তথাপি স্নেহের কারণে এই দৃশ্য দেখে তিনি স্থির থাকতে পরলেন না। তিনি আল্লাহর উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার পরিবারকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে। আমার পুত্র আমার পরিবারের একজন আর তোমার প্রতিশ্রুতিও তো সত্য; আর তুমি বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক।’
তার আর্জি ব্যর্থ হল। আল্লাহ তাঁর হুকুম রদ করলেন না। তিনি নূহকে বললেন, ‘হে নূহ! সে তোমার পরিবারের কেউ না। সে অসৎকর্মপরায়ণ। সুতরাং যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই সেই বিষয়ে আমাকে অনুরোধ কোরও না। আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, তুমি যেন অজ্ঞদের দলে শামিল না হও।’
নূহ
১. প্রশ্নঃ আমি ধনী হতে চাই!
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, অল্পতুষ্টি অবলম্বন কর; ধনী হয়ে যাবে।
২. প্রশ্নঃ আমি সবচেয়ে বড় আলেম (ইসলামী জ্ঞানের অধিকারী) হতে চাই!
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, তাক্বওয়া (আল্লাহ্ ভীরুতা) অবলম্বন কর, আলেম হয়ে যাবে।
৩. প্রশ্নঃ সম্মানী হতে চাই!
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, সৃষ্টির কাছে চাওয়া বন্ধ কর; সম্মানী হয়ে যাবে।
৪. প্রশ্নঃ ভাল মানুষ হতে চাই!
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, মানুষের উপকার কর।
৫. প্রশ্নঃ ন্যায়পরায়ণ হতে চাই!
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, যা নিজের জন্য পছন্দ কর; তা অন্যের জন্যেও পছন্দ কর।
৬. প্রশ্নঃ শক্তিশালী হতে চাই!
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, আল্লাহর উপর ভরসা কর।
৭. প্রশ্নঃ আল্লাহর দরবারে বিশেষ মর্যাদার অধিকরী হতে চাই!
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, বেশী বেশী আল্লাহকে স্মরণ (জিকির) কর।
৮. প্রশ্নঃ রিযিকের প্রশস্ততা চাই!
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, সর্বদা অযু অবস্থায় থাকো।
৯. প্রশ্নঃ আল্লাহর কাছে সমস্ত দোয়া কবুলের আশা করি!
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, হারাম খাবার হতে বিরত থাকো।
১০. প্রশ্নঃ ঈমানে পূর্ণতা কামনা করি!
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, চরিত্রবান হও ৷
১১. প্রশ্নঃ কেয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে গুনামুক্ত হয়ে সাক্ষাৎ করতে চাই!
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, জানাবত তথা গোসল ফরজ হওয়ার সাথে সাথে গোসল করে নাও।
১২. প্রশ্নঃ গুনাহ্ কিভাবে কমে যাবে?
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, বেশী বেশী ইস্তেগফার (আল্লাহর নিকট কৃত গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা) কর।
১৩. প্রশ্নঃ কেয়ামত দিবসে আলোতে থাকতে চাই!
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, জুলুম করা ছেড়ে দাও।
১৪. প্রশ্নঃ আল্লাহ্ তা’য়ালার অনুগ্রহ কামনা করি!
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, আল্লাহর বান্দাদের উপর দয়া-অনুগ্রহ কর।
১৫. প্রশ্নঃ আমি চাই আল্লাহ্ তা’য়ালা আমার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবেন!
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, অন্যের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখ।
১৬. প্রশ্নঃ অপমানিত হওয়া থেকে রক্ষা পেতে চাই ?
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, যিনা (ব্যভিচার) থেকে বেঁচে থাকো।
১৭. প্রশ্নঃ আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল (সাঃ) এর নিকট প্রিয় হতে চাই ?
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, যা আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের (সাঃ) এর নিকট পছন্দনীয় তা নিজের জন্য প্রিয় বানিয়ে নাও।
১৮. প্রশ্নঃ আল্লাহর একান্ত অনুগত হতে চাই!
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, ফরজ সমূহকে গুরুত্বের সহিত আদায় কর।
১৯. প্রশ্নঃ ইহ্সান সম্পাদনকারী হতে চাই!
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, এমন ভাবে আল্লাহর এবাদত কর যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ অথবা তিনি তোমাকে দেখছেন।
২০. প্রশ্নঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! (সাঃ) কোন বস্তু গুনাহ্ মাফে সহায়তা করবে?
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন,
ক) কান্না। (আল্লাহর নিকট, কৃত গুনাহের জন্য)
খ) বিনয়।
গ) অসুস্থতা।
২১. প্রশ্নঃ কোন জিনিষ দোযখের ভয়াবহ আগুনকে শীতল করবে?
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, দুনিয়ার মুছিবত সমূহ।
২২. প্রশ্নঃ কোন কাজ আল্লাহর ক্রোধ ঠান্ডা করবে?
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, গোপন দান এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা।
২৩. প্রশ্নঃ সবচাইতে নিকৃষ্ট কি?
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, দুশ্চরিত্র এবং কৃপণতা।
২৪. প্রশ্নঃ সবচাইতে উৎকৃষ্ট কি?
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, সচ্চরিত্র, বিনয় এবং ধৈর্য্য।
২৫. প্রশ্নঃ আল্লাহর ক্রোধ থেকে বাঁচার উপায় কি?
উঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করলেন, মানুষের উপর রাগান্বিত হওয়া পরিহার কর।
আল্লাহ্ তা’য়ালা আমাদের সবাইকে আমল করার তৌফিক দান করুন…।
।।আমিন।।
.
এক ছাত্র তার উস্তাদকে প্রশ্ন করলো---
--হুজুর! কিয়ামতের হিসাবনিকাশ
কিভাবে হবে?
.
ছাত্রের প্রশ্ন শোনে উস্তাদ কিছুক্ষণ
নিশ্চুপ বসে থাকলেন। তারপর, জুব্বার
পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে
ছাত্রদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন।
বণ্টনের প্রক্রিয়া ছিলো এমন-
১ম জনকে ১০০ টাকা।
২য় জনকে ৭৫ টাকা।
৩য় জনকে ৫০ টাকা।
৪র্থ জনকে ২৫ টাকা।
৫ম জনকে ১০ টাকা।
৬ষ্ট জনকে ৫ টাকা।
এবং যে ছাত্র প্রশ্ন করেছিলো তাকে
দিলেন
১টাকা।
.
প্রশ্নকারী ছাত্র উস্তাদের এমন বণ্টনে
অত্যন্ত মনঃক্ষুণ্ণ হলো, ভিষণ কষ্ট
পেলো।
সে ভাবলো উস্তাদ তাকে সবার
সামনে অপমানিত করলেন, সবার
সামনে ছোট করলেন। টাকা বণ্টনের পর
উস্তাদ মুচকি হেসে ছাত্রদের দিকে
তাকিয়ে বললেন---
-- আজ তোমাদের ছুটি। তোমরা এই
টাকা পুরোপুরি খরচ করবে এবং আগামী
সাপ্তাহিক বন্ধের দিন মাদরাসার
রান্নাঘরে সকাল ১০ঘটিকায় তোমরা
উপস্থিত হয়ে খরচের হিসাব দেবে।
.
সাপ্তাহিক বন্ধের দিন ছাত্ররা
মাদরাসার রান্নাঘরে
উপস্থিত হতে লাগলো, উস্তাদ আগে
থেকেই
সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সবাই
আসার পর উস্তাদ ছাত্রদেরকে চুলায়
চড়ানো গরম 'তাওয়া'
দেখিয়ে বললেন---
-- তোমরা একজন একজন করে এই তাওয়ায়
দাঁড়িয়ে আমার দেয়া টাকার খরচের
হিসাব দেবে।
.
প্রথমে এগিয়ে এলো যে ছাত্রকে
১০০টাকা
দিয়েছিলেন সে। সে তাওয়ায়
দাঁড়ানোর পর
উস্তাদ প্রশ্ন করলেন---
-- আমার দেয়া টাকা তুমি কিভাবে
খরচ করেছো হিসাব দাও?
.
এমনিতে আগুনে উত্তপ্ত গরম তাওয়া,
তার উপর খালি পা। ছাত্র এক পা
নামায় তো এক পা তুলে, এভাবে
অনেক কষ্টে তাওয়ায় দাঁড়িয়ে খরচের
হিসাব দিতে লাগলো---
-- ৫টাকা দিয়ে এটা কিনেছি,
১০টাকা দিয়ে ওটা খেয়েছি,
২০টাকা দিয়ে ঐ জিনিস কিনেছি।
.
এইভাবে অনেক কষ্ট সহ্যকরে সে সম্পূর্ণ
হিসাব দিলো। তারপর এলো যাকে ৭৫
টাকা দিয়েছিলেন সে। এভাবে
ধারাবাহিকভাবে একেএকে সবাই
নিজেদের টাকা খরচের হিসাব
উত্তপ্ত তাওয়ায় দাঁড়িয়ে দিয়ে
গেলো। সবার শেষে এলো যাকে
১টাকা দিয়েছিলে সে, অর্থাৎ যে
ছাত্র 'কিয়ামতের হিসাবনিকাশ'
নিয়ে প্রশ্ন করেছিলো। সে হাসিমুখে
দৌড়ে এসে তাওয়ায় দাঁড়িয়ে তার
১টাকা খরচের হিসাব দিয়ে উস্তাদের
সামনে দাঁড়ালো। বাকিরা যখন
নিজেদের তাওয়ায় পুড়া পায়ে পানি
ডালছে, তখন সে দাঁড়িয়ে হাসছে।
.
সবার হিসাব দেয়া শেষে উস্তাদ
ছাত্রদের,
বিশেষকরে প্রশ্নকারী ছাত্রকে
উদ্দেশ্য
করে বললেন- এই হলো কিয়ামতের
হিসাবনিকাশের ছোট একটি নমুনা
মাত্র। যার ক্ষমতা ও সম্পদ যতো কম, তার
হিসাব ততো সহজ।
.
প্রশ্নকারী ছাত্র ছলছল নয়নে উস্তাদের
দিকে তাকিয়ে মনেমনে তার প্রতি
উস্তাদের ভালোবাসার কথা ভাবতে
লাগলো এবং উস্তাদের প্রতি নিজের
আগের ধারণার জন্য অনুতপ্ত হতে
লাগলো।