বাগধারা ও প্রবাদ-প্রবচন - অ


অক্কা পাওয়া (মারা যাওয়া) – প্রায় বছরখানেক ভুগে কাল রাতে সৈয়দ সাহেব অক্কা পেয়েছেন।


অতিদর্পে হত লঙ্কা (বেশি অহংকারে পতন) – লোকটি কালো টাকার জোরে কাউকে পাত্তাই দিতো না; এখন কেমন ফল ফললো, একেই বলে অতিদর্পে হত লঙ্কা।


অগস্ত্য যাত্রা (শেষ প্রস্থান) – শ্বশুরের সাথে ঝগড়া করে জামাতা একেবারে অগস্ত্য যাত্রা করল।


অষ্টবজ্র সম্মিলন (প্রতিভাবান ব্যক্তিদের একত্র সমাবেশ) – মাওলানা আকরাম খাঁর সভাপতিত্বে বাংলা সাহিত্যের অষ্টবজ্র সম্মিলন হয়েছিল।


অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী (অল্প বিদ্যার গর্ব) – অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী বলেই অর্বাচীন গফুর মিয়া বাংলাদেশের সেরা বৈজ্ঞানিক ড. কুদরত-ই-খুদার বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সমালোচনায় অগ্রসর হলো।


অগাধ জলের মাছ (অত্যন্ত কৌশলী) – কথাবার্তায় সাদাসিধে হলেও লোকটি অগাধ জলের মাছ, ওর প্রকৃত পরিচয় পেতে একটু দেরি হবে।


অন্ধের যষ্টি (একমাত্র অবলম্বন) – বৃদ্ধা জননীর অন্ধের যষ্টি পুত্রটি অকালে প্রাণ হারালো।


অর্ধচন্দ্র দান (গলাধাক্কা দেয়া) – চোরটার মায়াকান্নায় কর্ণপাত করো না, বেশ করে অর্ধচন্দ্র দান করে বিদায় কর।


অগ্নিশর্মা হওয়া (অত্যন্ত রাগান্বিত হওয়া) – সাহেব বড় বদমেজাদি, তার কথার ওপর কথা বলতেই অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন।


অন্তরটিপুনী (মর্মপীড়াদায়ক) – তোমার কথা শুনলে গা জ্বালা করে, তুমি প্রত্যেক কথাতেই অন্তরটিপুনী দিতে ওস্তাদ।


অগ্নি পরীক্ষা (চরম পরীক্ষা) – বাঙালি জাতি একাত্তর সালে চরম অগ্নি পরীক্ষায় জয়লাভ করেছে।


অকূলে কূল পাওয়া (নিরূপায় অবস্থা হতে উদ্ধার পাওয়া) – এই ঘোরতর দুর্দিনে তোমার সাহায্য পেয়ে যেন অকূলে কূল পেলাম।


অনুরোধে ঢেঁকি গেলা (অসম্ভবকার্য সম্পাদন করা) – কাজটা খুবই কঠিন, তারপরও অধ্যক্ষের অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে হচ্ছে।


অলক্ষ্মীর দশা (দারিদ্র্য) – পিতা পুত্রের বাড়িতে গিয়ে দেখেন যে, তার পুত্র অলক্ষ্মীর দশায় পতিত হয়েছে।


অন্ধকার দেখা (বিপদে পড়ে ভয় ও ভাবনায় আকুল হওয়া) – পিতৃমাতৃহীন আকবর দেনার দায়ে গৃহহীন হয়ে দুই চোখে অন্ধকার দেখতে লাগল।


অন্ধকারে থাকা (কোনো বিষয়ে অনভিজ্ঞ থাকা) – আমি তো সব সময়ই অন্ধকারে থাকলাম, অথচ কি দোষে আমাকে দোষী করছো, ভাই?


অকালকুসুম (অসম্ভব জিনিস) – অকালকুসুম আশা করো না, তাতে তোমার দুঃখই বাড়বে।


অকালপক্ব (ইঁচরে পাকা) – এমন অকালপক্ব ছেলেকে যে সবাই অপছন্দ করবে সেটাই তো স্বাভাবিক।


অকূল পাথার (সীমাহীন বিপদ/মহাসংকট) – অকূল পাথারে পড়েছি ভাই, কি করে উদ্ধার পাব জানি না।


অকূলে ভাসা (ভীষণ সংকটে পড়ে দিশাহারা হওয়া) – স্বামীপুত্র হারিয়ে মেয়েটি অকূলে ভাসছে।


অক্ষয়ভাণ্ডার (যে ভাণ্ডারের ধন কখনো ফুরায় না) – তার কি অক্ষয়ভাণ্ডার আছে যে রাজ্যসুদ্ধ লোককে চিরদিন খাওয়াবে?


অক্ষর-পরিচয় (সামান্য বিদ্যা/বর্ণপরিচয়/বর্ণজ্ঞান) – আট বছর বয়স হতে চলল, এখনো ছেলের অক্ষর পরিচয় হয়নি!


অগড়-বগড়, অগড়ম-বগড়ম (অর্থহীন বা আবোলতাবোল কথা/পাগলের প্রলাপ) – তখন থেকে কি অগড়ম-বগড়ম বকে যাচ্ছ?


অগত্য মধুসূদন (অনন্যোপায় হয়ে, উপায়ান্তর না থাকায়) – তার অনুরোধ এড়াতে পারলাম না, অগত্যা মধুসূদন আর কি।


অগাকান্ত, অগারাম, অগাচণ্ডী (একেবারে নির্বোধ, নিরেট বোকা) – তার মতো অগারামকে দিয়ে এ কাজ হবে না।


অগা মেরে যাওয়া (বোকা হয়ে যাওয়া, অকর্মণ্য হয়ে যাওয়া) – ছেলেটা দিনদিন একেবারেই অগা মেরে যাচ্ছে।


অগ্নিগর্ভ (তেজঃপূর্ণ) – তার অগ্নিগর্ভ বক্তৃতায় সকলেই অনুপ্রাণিত হয়।


অগ্রপশ্চাৎ (আগপাছ/সব দিক) – অগ্রপশ্চাৎ ভেবে কাজ করলে সমস্যায় পড়তে হয় না।


অঘটন-ঘটন-পটীয়সী (যে স্ত্রীলোক অঘটন ঘটাতে পারে) – তার মতো অঘটন-ঘটন-পটীয়সী স্ত্রীলোকের পক্ষে সবই সম্ভব।


অঘাটে জল খাওয়া (ভুল বা বাজে জায়গায় কাজের চেষ্টা করা/বাজে কাজ, ভুল কাজ বা অনুচিত কাজ করা) – অনেক অঘাটে জল খেয়ে এখন তার বুদ্ধি খুলেছে।


আঙুলি-নির্দেশ/অঙুলি-সংকেত (আঙুল দিয়ে ইশারা বা নির্দেশ, নির্দেশ) – সমস্ত ঘটনাটা তারই অঙুলি-সংকেতে ঘটেছে।


অজ পাড়াগাঁ (একেবারে গ্রাম/গণ্ডগ্রাম) – তার মতো শহুরে লোক এই অজ পাড়াগাঁয়ে এসে থাকতে পারবে?


অজুহাত দেখানো (তুচ্ছ এবং অপ্রকৃত কারণকে প্রকৃত কারণ হিসেবে দেখানো) – বাজে অজুহাত দেবার চেষ্টা করো না। তুমি যে সেদিন ইচ্ছে করেই আসনি সে তো বোঝাই যাচ্ছে।


অঞ্চলের নিধি (যে সম্পদ আঁচলে ঢেকে সুরক্ষিত রাখতে হয়/সন্তান) – তিনি অঞ্চলের নিধিটিকে চোখের আড়াল করতে চান না।


অড়বড় সড়বড় (অর্থহীন ও দ্রুত উচ্চারিত কথা) – অড়বড় সড়বড় করে কি যে বলল তার কিছুই বোঝা গেল না।


অতলে তলানো (ডুবে যাওয়া/হারিয়ে যাওয়া/বিস্মৃত হওয়া) – কত সম্ভাবনাময় তরুণ বিপথগামী হয়ে অতলে তলিয়ে গেছে তার ইয়ত্তা নেই।


অতিমানুষ, অতিমানব (অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ) – এ কাজ কেবল একজন অতিমানুষের পক্ষেই সম্ভব।


অথৈ জল (গভীর সংকট, ঘোর বিপদ) – বাবার হঠাৎ মৃত্যুতে ছেলেটা অথৈ জলে পড়েছে।


অদৃষ্টের পরিহাস (ভাগ্যের বিড়ম্বনা) – অদৃষ্টের পরিহাসে রাজা ফকির হয়েছেন।


অধঃপাতে যাওয়া (উচ্ছন্নে যাওয়া) – হাতে অতিরিক্ত টাকা পাবার পরেই ছেলেটা অধঃপাতে গেছে।


অধমে অধমে (মন্দের সঙ্গে মন্দে/খারাপের সঙ্গে খারাপে) – উত্তমে উত্তমে যেমন মেলে তেমনি মেলে অধমে অধমে।


অনধিকার চর্চা (যে বিষয়ে তেমন জ্ঞান নেই সেই বিষয়ে হস্তক্ষেপ/যে বিষয়ে তেমন জানা নেই সেই বিষয়ে অযথা আলোচনা) – আমি ভাই ব্যবসায়ী লোক, সাহিত্যের আলোচনায় যোগ দিয়ে অনধিকার চর্চা করতে চাই না।


অনন্তশয্যা (মৃত্যু, শেষ শয্যা) – আমাকে ডাকলেই হতো, আমি তো আর অনন্ত শয্যায় শুয়ে ছিলাম না।


অনভ্যাসের ফোঁটা (অনভ্যস্ত সৌভাগ্য) – গরিবের টাকা হয়েছে; এ তো অনভ্যাসের ফোঁটা-সইতে সময় লাগবে।


অনর্থ করা, অনর্থ বাধানো (বিপদ সৃষ্টি করা/গোলমাল পাকানো) – তার কথামতো কাজ না করলে কিন্তু সে অনর্থ করবে।


অনলে জল পড়া (ক্রোধ প্রশমিত হওয়া, রাগ পড়ে যাওয়া) – চিঠি পড়িবামাত্র অনলে জল পড়িল -গৃহিনী কিছুকাল ভাবিয়া বলিলেন, ‘এ দুঃখিনীর কি এমন কপাল হবে।’


অনাসৃষ্টি, অনাসৃষ্টি কাণ্ড (সৃষ্টিছাড়া ব্যাপার/উদ্ভট কাজকর্ম) – মা মাত্র এক ঘণ্টার জন্য বাইরে গেছেন, এরই মধ্যে এমন অনাসৃষ্টি কাণ্ড বাধিয়ে বসেছ?


অনুনয়-বিনয় (সনির্বন্ধ অনুরোধ, অনুরোধ-উপরোধ) – আমাদের শত অনুনয়-বিনয়েও সে কর্ণপাত করল না।


অন্ধ বিশ্বাস (যুক্তিহীন বিবেচনাহীন প্রবল বিশ্বাস) – অন্ধবিশ্বাস থেকেই কুসংস্কারের জন্ম হয়।


অন্ধভক্তি (যুক্তিবর্জিত গভীর ভক্তি) – তিনি যুক্তিবাদী লোক, এসব অন্ধভক্তিকে আমল দেন না।


অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়া (পুরোপুরি আন্দাজে কাজ করা, অনুমানের ওপর নির্ভর করে কিছু করা বা বলা) – অন্ধকারে ঢিল না ছুঁড়ে কি হয়েছিল জানতে চেষ্টা করো।


অন্ধিসন্ধি (ফাঁকফোকর/গোপন তথ্য) – এই ব্যবসার অন্ধিসন্ধি কেবল তারই জানা আছে।


অন্ন ধ্বংস করা (অলসভাবে জীবন কাটানো এবং নির্বিকারভাবে খেয়ে যাওয়া) – এতদিন তো মামার অন্ন ধ্বংস করলে, এবার কিছু কাজের চেষ্টা কর।


অপোগণ্ড (নাবালক) – দুটি অপোগণ্ড ভাই নিয়ে কি করে চালিয়ে এসেছি তা আমি জানি।


অবরেসবরে, অবুরে সবুরে (কখনো-সখনো, কালে-ভদ্রে) – সে অবরেসবরে গ্রামের বাড়িতে যায়।


অমৃতে অরুচি (পছন্দসহ খাবারে বা ভালো জিনিসে অনিচ্ছা) – তুমি কী সত্যিই ধূমপান ছেড়ে দিয়েছ? হঠাৎ অমৃতে এমন অরুচি হলো কেন?


অম্বল চাখা, অম্বল চেখে বেড়ানো (ক্রমাগত জায়গা বা চাকরি বদল করা/ এক জায়গায় বা এক চাকরিতে স্থায়ী না হওয়া) – এভাবে অম্বল চেখে না বেড়িয়ে এবার স্থির হয়ে কোনো একটা চাকরি করো।


অল্পের উপর দিয়ে যাওয়া (সামান্য কষ্ট বা ক্ষতিতেই রেহাই পাওয়া) – দুর্ঘটনায় তাদের বড় কিছু হয়নি, অল্পের ওপর দিয়েই গেছে।


অশেষপ্রকারে (সর্বপ্রকারে, সর্বতোভাবে) – তার রোগ নিরাময়ের জন্য চিকিৎসকেরা অশেষপ্রকারে চেষ্টা করেছেন।


অশ্বডিম্ব (অলীক বস্তু, যার অস্তিত্বই নেই এমন জিনিস) – এত খাটনি খেটে কি লাভ হলো? পেলাম তো অশ্বডিম্ব।


অষ্টকপাল (আটকপালে; হতভাগ্য) – আমার মতো অষ্টকপাল লোকের আশা কি পূর্ণ হবে?


অষ্টরম্ভা (কাঁচকলা; কিছুই না) – সবাই কিছু কিছু পেল, কিন্তু আমি পেলাম অষ্টরম্ভা/নেতারা লম্বা লম্বা বক্তৃতা করেন, কিন্তু কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা।


অসাধ্যসাধন (সুকঠিন কাজ সম্পাদন) – এমন বিপথগামী ছেলের শুভবুদ্ধি জাগিয়ে তুমি অসাধ্যসাধন করেছ।


অসামাল হয়ে পড়া (নিজেকে সামলাতে না পারা) – শোকের আবেগে তিনি অসামাল হয়ে পড়লেন।


অসার-সুসার (অসুবিধা ও সুবিধা) – অন্যের অসার-সুসার বিবেচনা না করলে চলবে কেন?


অসূর্যস্পশ্যা (বাড়ির বাইরে বেরোয় না এমন) – মেয়েকে অসূর্যস্পশ্যা করে রাখলেই কি বাইরের প্রভাব আটকাতে পারবে?


অস্ত যাওয়া (পতন হওয়া/অবসান হওয়া) – ইংরেজ শাসকরা কি কোনোদিন ভেবেছিল যে তাদের সাম্রাজ্যও একদিন অস্ত যাবে?


অস্তব্যস্ত (অস্থির/অতি ব্যস্ত/ব্যতিব্যস্ত) – তার অস্তব্যস্ত ভাব দেখেই বুঝেছি যে ভেতরে ভেতরে উদ্বিগ্ন রয়েছে।


অস্তিনাস্তি (থাকা বা না থাকা, অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব) – ঈশ্বরের অস্তিনাস্তি জানি না ভাই, আমি পূজো করবই।


অস্থানে কুস্থানে (আজেবাজে জায়গায়/নিষিদ্ধ বা মন্দ জায়গায়) – অস্থানে কুস্থানে যাওয়ার অভ্যাস ছাড়তে হবে।


অস্থিচর্মসার (শরীরে কেবল হাড় ও চামড়া আছে এমন অবস্থাপ্রাপ্ত/অত্যন্ত কৃষ বা শীর্ণ) – দীর্ঘকাল রোগে ভুগে ভুগে তার শরীর একেবারে অস্থিচর্মসার হয়েছে।


অরণ্যে রোদন (নিষ্ফল আবেদন) – কৃপণের নিকট চাঁদা চাওয়া অরণ্যে রোদন মাত্র।

অহঙ্কারে মাটিতে পা না পড়া (অতিরিক্ত দম্ভে কাউকে গ্রাহ্য না করা) – বড় ঘরে বিয়ে হয়েছে বলে অহঙ্কারে মেয়েটির মাটিতে পা পড়ে না।