EXPLAINER
News | Opinion
বদলাচ্ছে কাজের জগৎ: বৈশ্বিক শ্রমবাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব!
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বদলে দিচ্ছে কাজের ধরন, তৈরি হচ্ছে নতুন সুযোগ আর ঝুঁকিও। শ্রমবাজারে আসছে এক নতুন প্রযুক্তিনির্ভর বিপ্লব।
আহম্মেদ ইশতিয়াক মাহিন
২৪ মে, ২০২৫
গত কয়েক বছর ধরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আমাদের দৈনন্দিন জীবন এবং কর্মক্ষেত্রে একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে। শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত অগ্রগতির চেয়েও এটি অনেক বেশি কিছু; এটি বৈশ্বিক শ্রমবাজারের প্রতিটি স্তরে গভীর প্রভাব ফেলছে। কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয় হচ্ছে, কিছু কাজের ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে, এবং একই সাথে নতুন নতুন পেশার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। AI-এর এই প্রভাব নিয়ে বিতর্কও কম নয় – একদিকে যেমন কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা ও নতুন সুযোগের সম্ভাবনা, তেমনি অন্যদিকে বৃহৎ আকারে চাকরি হারানোর আশঙ্কা। AI কি কর্মসংস্থানের জন্য হুমকি, নাকি এটি এক নতুন যুগের সূচনা?
ইনফ্রোগ্রাফিক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিবর্তন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিচিতি ও শ্রমবাজারে এর প্রবেশ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence - AI) হলো এমন একটি প্রযুক্তি যা যন্ত্রকে মানুষের মতো চিন্তা করতে, শিখতে, সমস্যা সমাধান করতে এবং সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম করে তোলে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো মেশিনকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা যাতে তারা মানুষের বুদ্ধিমত্তা এবং শেখার ক্ষমতা অনুকরণ করতে পারে। মেশিন লার্নিং (ML), ডিপ লার্নিং, ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (NLP) এবং কম্পিউটার ভিশনের মতো শাখাগুলো AI-এর মূল স্তম্ভ।
শ্রমবাজারে AI-এর আগমন নতুন নয়। বহু বছর ধরেই এটি শিল্প কারখানায় রোবোটিক্স, ডেটা অ্যানালাইসিস এবং গ্রাহক পরিষেবাতে চ্যাটবটের মাধ্যমে কাজ করে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি জেনারেটিভ AI (যেমন ChatGPT, Midjourney) এবং উন্নত অটোমেশন প্রযুক্তির উত্থান এর প্রভাবকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রকারভেদ:
* আর্টিফিশিয়াল ন্যারো ইন্টেলিজেন্স (ANI): নির্দিষ্ট একটি কাজ দক্ষতার সাথে করতে সক্ষম (যেমন - স্প্যাম ফিল্টার, সুপারিশ ইঞ্জিন)।
* আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স (AGI): মানুষের মতো যেকোনো বুদ্ধিভিত্তিক কাজ করতে সক্ষম (বর্তমানে গবেষণার পর্যায়ে)।
* আর্টিফিশিয়াল সুপার ইন্টেলিজেন্স (ASI): মানুষের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান এবং সক্ষম (ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা)।
ছবিঃ ইন্টারনেট
চাকরি হারানোর আশঙ্কা ও কাজের স্থানচ্যুতি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অটোমেশনের উত্থান শ্রমবাজারে সবচেয়ে বড় যে উদ্বেগ তৈরি করেছে তা হলো ব্যাপক হারে চাকরি হারানোর আশঙ্কা। কিছু নির্দিষ্ট কাজ, বিশেষ করে যা পুনরাবৃত্তিমূলক (repetitive), ডেটা-নির্ভর এবং শারীরিক শ্রমের উপর নির্ভরশীল, সেগুলোতে AI ও রোবট মানুষের জায়গা নিতে শুরু করেছে।
আশঙ্কার কারণ:
* ম্যানুফ্যাকচারিং: কারখানায় রোবটের ব্যবহার শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিচ্ছে।
* গ্রাহক পরিষেবা: চ্যাটবট এবং ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্টগুলো কল সেন্টারের কর্মীদের প্রতিস্থাপন করছে।
* ডেটা এন্ট্রি ও প্রশাসনিক কাজ: AI স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডেটা প্রক্রিয়াকরণ এবং রিপোর্ট তৈরি করতে পারে।
* পরিবহন: স্বয়ংক্রিয় গাড়ি এবং ডেলিভারি ড্রোন ভবিষ্যতে ড্রাইভার এবং ডেলিভারি কর্মীদের কাজ কেড়ে নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলো, যেখানে ম্যানুয়াল শ্রমের উপর নির্ভরতা বেশি, সেখানে এই প্রভাব আরও প্রকট হতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (ILO) এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এশিয়ার অনেক দেশেই পোশাক শিল্পে অটোমেশনের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ চাকরি হারাতে পারে।
তবে, অনেকেই মনে করেন যে এই কাজগুলো হারানোর পাশাপাশি AI নতুন ধরনের কাজও তৈরি করবে, যা মানুষের সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান এবং আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করবে।
নতুন কাজের সুযোগ ও দক্ষতা বৃদ্ধি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধুমাত্র চাকরি কেড়ে নিচ্ছে না, বরং এটি নতুন ধরনের কাজের সুযোগও তৈরি করছে। AI প্রযুক্তির ডিজাইন, ডেভেলপমেন্ট, রক্ষণাবেক্ষণ এবং তত্ত্বাবধানের জন্য নতুন ধরনের দক্ষতা সম্পন্ন কর্মীর চাহিদা বাড়ছে।
নতুন পেশার ক্ষেত্র:
* এআই ইঞ্জিনিয়ার ও ডেভেলপার: AI মডেল তৈরি এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য।
* ডেটা সায়েন্টিস্ট ও অ্যানালিস্ট: AI মডেলের জন্য ডেটা সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং ব্যাখ্যা করার জন্য।
* রোবোটিক্স ইঞ্জিনিয়ার: স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম ডিজাইন ও পরিচালনার জন্য।
* AI নৈতিকতা বিশেষজ্ঞ: AI ব্যবহারের নৈতিক দিকগুলো তত্ত্বাবধানের জন্য।
* প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ার: জেনারেটিভ AI মডেল থেকে কার্যকর আউটপুট পাওয়ার জন্য প্রম্পট ডিজাইন করার জন্য।
AI কিছু নির্দিষ্ট কাজ স্বয়ংক্রিয় করার মাধ্যমে কর্মীদেরকে আরও জটিল, সৃজনশীল এবং কৌশলগত কাজে মনোযোগ দিতে সাহায্য করবে। এটি কর্মীর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে পারে এবং কাজের মান উন্নত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ডাক্তাররা AI টুল ব্যবহার করে দ্রুত রোগ নির্ণয় করতে পারবেন, শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে পারবেন।
এই পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে কর্মীদের জন্য নতুন দক্ষতা অর্জন (reskilling) এবং বিদ্যমান দক্ষতা উন্নত করা (upskilling) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থাগুলোকে এই রূপান্তরে সহায়তা করার জন্য বিনিয়োগ করতে হবে।
ছবি: AI জ়েনারেটেড
ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি: শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও নীতিমালার ভূমিকা
বৈশ্বিক শ্রমবাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিবাচক প্রভাব নিশ্চিত করতে এবং সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব কমানোর জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং সরকারের সঠিক নীতিমালা এই পরিবর্তনের সফল রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস:
* STEM শিক্ষায় গুরুত্ব: বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত (STEM) শিক্ষায় জোর দেওয়া, যা AI সম্পর্কিত পেশার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি করবে।
* সফট স্কিলস: সমস্যা সমাধান, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ এবং আবেগিক বুদ্ধিমত্তার মতো সফট স্কিলস শেখানো, যা AI সহজে প্রতিস্থাপন করতে পারবে না।
* জীবনব্যাপী শিক্ষা: কর্মীদের জন্য নিরন্তর শেখার সুযোগ তৈরি করা, যাতে তারা নতুন প্রযুক্তি এবং কাজের সাথে মানিয়ে নিতে পারে।
সরকার ও নীতি নির্ধারকদের ভূমিকা:
* জাতীয় কৌশল: AI এবং শ্রমবাজারের জন্য একটি জাতীয় কৌশল তৈরি করা, যা কর্মসংস্থান সুরক্ষা এবং নতুন সুযোগ তৈরিতে সহায়তা করবে।
* পুনঃপ্রশিক্ষণ কর্মসূচি: AI দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে এমন কর্মীদের জন্য পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের কর্মসূচি চালু করা।
* সামাজিক সুরক্ষা জাল: যারা চাকরি হারাবেন, তাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা জাল (যেমন - বেকার ভাতা, নতুন চাকরির সুযোগ) নিশ্চিত করা।
* নৈতিক AI ব্যবহার: AI-এর নৈতিক এবং দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য নীতিমালা তৈরি করা।
ভবিষ্যৎ ভাবনা ও বিনিয়োগ
বৈশ্বিক শ্রমবাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব কেবল একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের চেয়েও বেশি কিছু। এটি আমাদের কাজের সংজ্ঞা, জীবনযাত্রার মান এবং সামাজিক কাঠামোকে পুনর্বিন্যাস করবে। এই রূপান্তরকে সফল করতে হলে কেবল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করলেই চলবে না, বরং মানব সম্পদেও বিনিয়োগ করতে হবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এই পরিবর্তন চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। এখানে বহু মানুষ এখনও প্রচলিত, শ্রম-নির্ভর পেশায় জড়িত। AI-এর দ্রুত বিস্তার তাদের জন্য একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারে। তাই, সরকারকে দ্রুততার সাথে একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল গ্রহণ করতে হবে:
* শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন: প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত AI এবং প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা। ক্রিয়েটিভিটি, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া।
* ব্যাপক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি: যারা বর্তমানে প্রচলিত পেশায় রয়েছেন এবং AI দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন, তাদের জন্য ব্যাপক পরিসরে পুনঃপ্রশিক্ষণ (reskilling) এবং দক্ষতা উন্নয়নের (upskilling) ব্যবস্থা করা। এর জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব জরুরি।
* স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম তৈরি: AI-ভিত্তিক নতুন ব্যবসা এবং স্টার্টআপ তৈরিতে উৎসাহিত করা, যা নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করবে। এই খাতে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
* সামাজিক সুরক্ষা জাল শক্তিশালীকরণ: AI-এর কারণে যারা চাকরি হারাবেন, তাদের জন্য পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, যাতে তারা নতুন কাজের সুযোগ খুঁজে নিতে পারে।
* নৈতিক নীতিমালা প্রণয়ন: AI ব্যবহারের নৈতিক দিকগুলো নিয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করা, যাতে এর ব্যবহার সমাজের জন্য ক্ষতিকর না হয়।
জাপান, জার্মানি এবং ফিনল্যান্ডের মতো উন্নত দেশগুলো AI যুগে নিজেদের কর্মসংস্থানকে সুরক্ষিত রাখতে এবং নতুন সুযোগ তৈরি করতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তাদের কাছ থেকে আমরা শিখতে পারি। ভবিষ্যৎকে ভয় না পেয়ে, একে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করার জন্য আমাদের প্রস্তুত হতে হবে।
লেখক: আহম্মেদ ঈশতিয়াক মাহিন
গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ