বন্যার্তদের পাশে গ্রিন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী
ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে ফেসবুক স্ক্রলিং করে দেখলাম ফেনী বন্যা কবলিত! আশ্চর্য লাগলো, ফেনীতে বন্যা? আমার ছোট্ট জীবনে এমন কিছু আগে কখনো শুনিনি। আজকাল ফেসবুকের যে অবস্থা তাতে করে শঙ্কিত হলাম ঘটনাটা আসলে গুজব কিনা। সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে ফ্যাক্ট চেটিং করে আসল খবর খুঁজে বের করতে বেগ পেতে হলোনা! সত্য তা যাচাই শেষে জুলাই মাস থেকে চলা নির্ঘুম রাতের সঙ্গে আরও একটি রাত যুক্ত হলো। প্রথমবার আন্দলনে বের হওয়া আমি এবারই প্রথমবার দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে কাজ করেছি, ট্রাফিক পুলিশ সামলানো, বৈষম্যবিরধী আন্দলনে অসুস্থদের রক্তদান ইত্যাদি সহ বেশ ভালোই কিছু কাজে অংশগ্রহণ করতে পেরেছি। তাই ভাবলাম বন্যা কবলিত ফেনীতেও যাব! যদিও আমি নিজেই উত্তর বঙ্গের বন্যা কবলিত এলাকার ছেলে! বন্যায় আমাদের অঞ্চলের সংকট কালে এত মানুষ কখনো সহমর্মিতা দেখিয়েছে কিনা সেটার প্রশ্ন রাখতেই পারি ।
কিভাবে ফেনী যাব এটা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে কোনও উপায় খুঁজে পেলাম নাহ!
শেষে ইক্যাব থেকে যাওয়ার সুযোগ করে দিলেন ঢাকাপোস্টে চাকরিরত গ্রিন ইউনিভার্সিটির সিনিয়র নাইম ভাই।
২৩শে আগস্ট রাত দশটায় সদরঘাট থেকে ট্রলারে নৌপথে ফেনীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। আমার সঙ্গে আরও দশজন ছিলেন। নৌপথে বর্ষার এই মৌসুমে ফেনী যাওয়ার ঠিক হবে কিনা এটা নিয়ে ভয়েই ছিলাম। অবশ্য বৈষ্যম্যবিরোধী আন্দলনে জীবন থেকে ভয় অনেক আগেই গায়েব হয়েছিল।
রাত জেগে গুগল ম্যাপ দেখে মাঝিকে নির্দেশ দিচ্ছিলাম। নদীর স্রোত ভীতিকর অবস্থা আরো বৃদ্ধি করছিল। আমাদের ট্রলার এর চালক এর আগে কখনও ফেনী যাননি। একপ্রকার ধোকাই যে দিচ্ছেন আমাদের এটা পরবর্তীতে বুঝতে পেরেছি। ভারত থেকে আসা গোমিতী নদীর বিপরীত স্রোতে আমাদের ট্রলার এগোচ্ছিল। কুমিল্লার গৌড়িপুরে গিয়ে যা থামাতে বাধ্য হই। কারণ সেখানের একটি ব্রিজের নীচে দিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না, পানির পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল। ট্রলার ছেড়ে দিয়ে পিকআপ ভ্যান নিয়ে ফেনীর উদ্দেশ্যে আবার রওনা হই। তিন ঘন্টার জার্নি করে জ্যাম ঠেলে ফেনী পৌঁছাই ২৪শে আগস্ট বিকেল চারটায়। ফেনীর মহিপালে দিয়ে আমাদের টিম দুই ভাগে বিভক্ত হই। আমাদের টিমের ভাগে সোনাগাজী এরিয়া পরে।
২০০ প্যাকেট ত্রাণ একটা ট্রাক্টরে নিয়ে সোনাগাজীর দিকে রওনা হতে গিয়েই ঘটে বিপত্তি, পথে বিএনপির(সাথে থাকা একজন স্থানীয় নিশ্চিত করেন) এক নেতা আমাদের ট্রাক্টর চালক কে মারধর করে পুরো ট্রাক্টর লুট করে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে ইক্যাবের অন্যান্য সদস্যদের থেকেও একই অভিজ্ঞতা শুনি। বিএনপির ঐ নেতা ত্রাণ এভাবে লুট করে নিজের নামে তাদের ওয়ার্ড সদস্যের কাছে বিলি করে!
ঐ রাতেই আমাদের কাছে থাকা স্বল্প কিছু খাবার এক বুক সমান পানি হেঁটে বিলি করে আবার মহিপাল ফেরত আসি। এসে থাকার জন্য কোনও হোটেল খুঁজে পাইনা, মোবাইলে হোটেল রিল্যাক্স বুক করা হলেও তার সামনে গিয়ে তালাবদ্ধ অবস্থায় পেয়ে সেখান থেকে ফেরত আসি। রাত চারটা পর্যন্ত ক্লান্ত এই শরীর নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি। অবশেষে একজন আন্সার ক্যাম্পের সন্ধান দেন। সেখানে গিয়ে এক ঘন্টা ঘুমানোর পর ঘুম ভাঙ্গে আমার পাশে থাকা সতীর্থদের ডাকে। দুজনের দুইটা মোবাইল চুরি হয়েছে! ভাবা যায়? এক রাতে ত্রাণ লুট আবার মোবাইল চুরি! ইচ্ছে করছিল ঢাকা ফিরে আসি। কিন্তু অসহায় মানুষ গুলোর আর্তনাদ, খাবার আর পানির জন্য অসহায় অবস্থার কথা ভেবে তা করিনি।
২৫ আগস্ট সকালেই আবার বেরিয়ে পরি একটা পরোটা খেয়ে। এবার ৬০০ ত্রাণের প্যাকেট ছিল যা সকালেই ঢাকা থেকে ফেনীতে পৌঁছানো হয়। সোনাগাজীর প্রত্যন্ত এক অঞ্চলে যাই, আমরা মূলত খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলাম কোথায় ত্রণ পৌছায় নি। সোনাগাজীর ঐ অঞ্চলে গিয়ে দেখলাম একটা গ্রামে চারদিন থেকে কোনও ত্রাণ যায়নি! সেখানের একজন বয়স্ক মহিলা চারদিন শুধু মাত্র আটা পানিতে গুলিয়ে খেয়ে বেঁচে ছিল। গ্রামের বুক সমান পানি হেঁটে খাবার পৌঁছে দিয়েছে আমার টিমের বাকি সদস্যরা।
সোনাগাজী এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা শেষে আমরা আরেকটা ট্রাক্টর নিয়ে মতিগঞ্জের দিকে যাই। সেখানে একটি স্কুলের আশ্রয় কেন্দ্রে আরও বেশ কিছু ত্রাণ বিতরণ শেষে মধ্যরাতে মহিপালে ফিরে আসি।
২৬ আগস্ট সকালে আমাদের গ্রিন ইউনিভার্সিটিতে অধ্যায়নরত একজন শিক্ষার্থীর বাসায় যাই। বন্যার শুরুর দিকে তার খোঁজ খবর পাওয়া যাচ্ছিল না। যা নিয়ে আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সবাই বিচলিত ছিলেন। আমাদের দেখে বন্যা কবলিত ঐ শিক্ষার্থী খুশি হন। আমাদের নুডলস রান্না করে খাওয়ান, তিন দিনে এই প্রথমবার রান্না করা কিছু খাওয়ার সুযোগ হয়।
উনি আমাদের পরামর্শ দেন সদরের আশে পাশে ত্রান না দিয়ে যেন প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমরা ত্রাণ পৌঁছাই।
সেখান থেকে বের হয়ে আবার সোনাগাজীর দিকে রওনা হই। মাঝ খানে ভ্যান চালক/সিএনজি চালকের বেশি ভাড়া চাওয়া টা আমাদের ব্যথিত করে!
আস্তে আস্তে পানি নেমে যাচ্ছিল, প্রথম দিন যেখানে এক বুক সমপরিমাণ পানি পেয়েছিলাম সেখানে ২৬শে আগাস্ট এক কোমর সমপরিমাণ পানি পাই।
সোনাগাজীতে ঐ দিন রাতে ত্রাণ বিতরণ শেষে রাতে আশে পাশের এলাকা ডাকাতের কবলে পড়ে। পাশেই পুলিশ সদস্যের একটা টিম চায়ের দোকানে চা পান করছিল, তাদের ডাকাতের খবর দেওয়া হলে তারা ভয় পেয়ে দ্রুত সেই স্থান ত্যাগ করে থানায় যায়। যাওয়ার পূর্বে সেনাবাহিনীকে খবর দেওয়া আর নিজেদেরই ডাকাতের মোকাবিলা করতে বলা হয়। উপায় না দেখে সেনাবাহিনীকে কল করলে তাঁরা
জানায় চারদিন ত্রাণ বিতরণের ফলে তাঁরা খুব ক্লান্ত, এই মুহূর্তে তাদের
আসা সম্ভব না। এটা শোনার পর আরো বেশি অসহায় লাগছিল। স্বাধীন এই দেশে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়?
আমাদের ২৭ আগস্ট রাতেই ঢাকা ফেরার কথা ছিল জন্য ডাকাতের ঐ দিকে আর যাওয়া সম্ভব হয়নি।
বন্যায় কোনও স্থানে পুলিশের উপস্থিতি লক্ষ্য করিনি, প্রথম দিন সেনাবাহিনীর এক সদস্যকে তার পরিবারের কাছে ত্রাণ পৌঁছানোর জন্য রিকোয়েস্ট করার মতো ঘটনার সম্মুখীন হই। সেনাবাহিনীর সল্পসংখ্যক বোট নিয়ে সব জায়গায় ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছেনা বলে তিনি জানান।
ফেনী বাসি এই প্রথমবার বন্যার কবলে পড়লেও তাদের ভ্রাতৃত্ববোধ আমাদের মুগ্ধ করেছে। ধনী গরীব, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একত্রিতে হয়ে এক ছাদের উপরে বসবাস করছেন। সামর্থ্যবান রা নিজের পরিবারের কথা না ভেবে অসহায়দের পাশে দাড়াচ্ছেন। তাদের নিকট ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ মিথ্যে অভিনয় করে ত্রাণ নিয়ে গিয়ে তা চড়া দামে অন্যদের কাছে বিক্রি করছেন। মুদ্রার দু পিঠ দেখার সুযোগ করে দিয়েছিল ফেনী বন্যা। এমনকি আমাদের এমন কথাও শুনতে হয়েছে, "বাবা কি দরকার তোমাদের এসব করার? এসবের জন্য তো সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য বাহিনীরা আছেন! তোমরা ঘরে ফিরে যাও, আরাম কর!" এই সকল ব্যক্তিরা মানুষের কাতারে পরে কিনা জানা নেই।
২৭ আগস্ট রাতে আমাদের টিমের একজনের বাসায় আপ্যায়ন শেষে, একজন বুকে ব্যথা অনুভব করা মহিলাকে ট্রাকে করে ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে হাসপাতালে পৌঁছাই দিয়ে
ঢাকায় ফিরে আসি।
ফেনী বন্যা আমাকে আরো বেশি সাহসী করে তুলেছে। আমাদের রংপুরের বন্যায় যে ছেলেটি মজা করে ভেলায় উঠে আনন্দ করতো সেই ছেলে অসহায় মানুষদের পাশে দাড়িয়েছে, এটা আসলে নিজেরই বিশ্বাস হয়না! ফেনী বন্যা আমাকে শিখিয়েছে কিভাবে টাকা মূল্যহীন হয়ে পড়ে, কিভাবে ধনী গরীব এক পর্যায়ে এসে একই ধাচে জীবন যাপন করে। মানুষ না খেয়ে না ঘুমিয়ে বেঁচে আছে, তাদের কষ্ট আসলে ঢাকায় চার দেয়ালের মধ্যে নরম বিছানায় শুয়ে অনুভব করা সম্ভব নয়।
ফেনী সহ আরও যে বন্যা কবলিত অঞ্চল আছে তারা দ্রুত স্বাভাবিক হোক এটাই কাম্য।
আহম্মেদ ইশতিয়াক মাহিন
সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগ (৩য় বর্ষ)
গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ