বিংশ শতাব্দীর আশির দশক। এই দশকে আমার জীবনে অনেকগুলি স্মরণীয় ঘটনা ঘটেছিল। ষাটের দশকে সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় ভারতে এসে কলকাতায় আশ্রয় নিই। সেখানে থেকে চাকরি পাওয়ার উপযুক্ত একটি ডিগ্রী অর্জন করে দিল্লীতে একটি চাকরিও পেয়ে গেলাম এবং সত্তরের দশকের শুরুতে সেই চাকরিতে যোগ দিতে আমি দিল্লী চলে এলাম তখন থেকেই আমার প্রবাসী জীবনশুরু হল। প্রথম দিকে এই জায়গাটিকে বিদেশ বলেই মনে হত। কিন্তু দীর্ঘদিন বসবাসের ফলে এখন আর বিদেশ বলে মনে হয় না, তবে জীবনের সমস্ত ভাবনা-চিন্তা সুখ দুঃখ এখনও বাঙলা তথা বহিরবঙ্গের স্ব-সমাজকে কেন্দ্র করেই রচিত হয়ে চলেছে। 'অদল-বদল' পত্রিকার সম্পাদক শ্রদ্ধেয় শ্রী বিমল বিশ্বাসের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ও দিল্লীতে একটি সর্বভারতীয় দলিত অধিবেশনে বসেই হয়েছিল। মনের পর্দায় সেই দিনটি এখনও উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।
ছাত্রাবস্থায় চার-পাঁচটি বৎসর কলকাতায় কাটালেও সেখানকার দলিত সমাজকে জানবার কিংবা তাদের সঙ্গে মিশার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। তারপরেই চলে এলাম সুদূর দিল্লীতে। কিন্তু মনের মধ্যে আকুল ইচ্ছা নিজেদের লোকদের খুঁজে বের করা এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা। বছর দশেকের মধ্যে এখানে নিজস্ব একটি বাসস্থান অর্জন করার ফলে এই ইচ্ছা আরও প্রবল হয়ে উঠল। কারণ মনের মধ্যে ভয় এই যে জন্মস্থান থেকে দূরে বসতি স্থাপন করে হয়তবা নিজের সমাজের সঙ্গে একদিন সম্পর্ক হারিয়ে ফেলব। দিল্লীতে অনেকের সঙ্গেই ইতিমধ্যে যোগাযোগ হয়ে গিয়েছে। তাদের একজনের কাছ থেকেই 'বহুজন নায়ক' এবং 'অদল-বদল' মাসিক পত্রিকার নাম কানে এল। সালটি খুব সম্ভব ১৯৮৮। দিল্লীর হিমাচল ভবনে ভারতীয় দলিত সাহিত্য একাডেমির বিশাল সর্বভারতীয় অধিবেশন। হলের মধ্যে কয়েক হাজার লোক। কাউকে চিনি না। তার মধ্যেই লোককে জিজ্ঞেস করে পশ্চিমবঙ্গ থেকে কারা এসেছেন খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। এইভাবে আলাপ হয়ে গেল শ্রদ্ধেয় শ্রীবিমল বিশ্বাস এবং রঞ্জিত কুমার শিকদার মহাশয়ের সঙ্গে। এটাই আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ এবং এই সাক্ষাৎকার পরবর্তীকালে আমার জীবনে বেশ বড় রকমের পরিবর্তন এনে দিয়েছিল।
বিমলবাবু বললেন যে তিনি সরকারী চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করার পরে একটি মাসিক পত্রিকার সম্পাদনা শুরু করেছেন এবং পত্রিকাটির নাম রেখেছেন 'অদল বদল'। গ্রাহক হওয়ার জন্য অনুরোধ জানালেন - আমি রাজী হয়ে গেলাম। তৃপ্তির হাসি হেসে তিনি বললেন, 'যাক আমার আর একজন গ্রাহক বাড়ল এবং আর একখানা পত্রিকা বিক্রির ব্যবস্থা হয়ে গেল। বৎসরে চল্লিশ টাকা গ্রাহক চাঁদা-তাও কেউ কিনতে চায় না'। সুখ-দুঃখ মিলিয়ে তার সেই হাসিটি এবং কথাগুলি আমার আজও মনে আছে।
সামান্য অর্থবল, সামান্য সংখ্যক গ্রাহক এবং সামান্য কয়েকজন অনভিজ্ঞ লেখক নিয়ে অদলবদলের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এককথায় বলা যায়-- তিনি জোর করেই এই পত্রিকাটি অনিচ্ছুক সমাজের মাথার উপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন। প্রথম সাক্ষাতের দিন তার মুখ থেকে যে আক্ষেপের কথা শুনেছিলাম পচিশ-ছাব্বিশ বৎসর পরেও তার কোন পরিবর্তন দেখতে পাইনি। হায়রে চেতনাহীন-বাঙলার দলিত সমাজ। অথচ বাঙলার দলিত সমাজে শিক্ষা এবং আর্থিক উন্নতি আজ যে স্তরে পৌঁছেছে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অদল বদলের প্রচার সংখ্যা অতি সহজে লক্ষাধিক হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু এর প্রচার সংখ্যা শেষ দিন পর্যন্ত হাজারের নীচেই সীমাবদ্ধ ছিল। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পত্রিকাটির সবকিছুই অসামান্য ছিল। কিন্তু একথা আমি নিঃসন্দেহে ঘোষণা করতে পারি যে নিজে সামান্য থেকেও এটি বাঙলার দলিত সমাজের, এমনকি সমস্ত বাঙালি সমাজের সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মানসিক বিকাশে এক অসামান্য অবদান রেখে গেছে। ভবিষ্যতে যদি কোনদিন আমাদের সমাজে চেতনার সঞ্চার হয়, সেদিনই অদল বদলের সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব হবে।
জোতিবা ফুলে, গুরুচাঁদ ঠাকুর এবং দলিত সমাজের অন্যান্য মহাপুরুষরা বলে গেছেন যে কেবলমাত্র শিক্ষা বিস্তারের দ্বারাই সমাজে চেতনার সঞ্চার করা সম্ভব। তাই তারা সকলেই শিক্ষা বিস্তারের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বাবাসাহেব আম্বেদকরও দলিত সমাজের প্রতি তার Three Commandments Educate, Agitate and Organize এ প্রথম স্থানে রেখেছেন Educate অর্থাৎ শিক্ষাকে। কিন্তু তাঁরা যে শিক্ষার কথা বলেছিলেন সে শিক্ষা বাঙলার দলিতসমাজে পৌছায়নি। প্রকৃত শিক্ষা মনকে আলোকিত করে, মনে চেতনার সঞ্চার করে। কিন্তু যে শিক্ষা মানুষকে স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক, সংকীর্ণমনা এবং আত্মসম্মানহীন করে তোলে এবং মানুষের মনকে অন্ধকারে ডুবিয়ে রাখে সে শিক্ষা কোনমতেই সমাজকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিতে পারে না। এইরকম শিক্ষা ব্যক্তিবিশেষের উদর-পূরণের সহায়ক হতে পারে কিন্তু সমাজের সার্বিক উন্নতি সাধন করতে পারে না। দুর্ভাগ্যক্রমে দলিতসমাজ এখন পর্যন্ত এই রকম শিক্ষাই পেয়ে আসছে। তাদের সেই অন্ধকার মনে সামান্য একটু আলোর সঞ্চার করার জন্যই অদল বদলের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু এই কথাটি বুঝতে বুঝতে আমারও বেশ কিছুদিন সময় লেগেছিল।
আদল বদল বাড়ীতে আসতে লাগল। কৌতূহলের সঙ্গে লেখাগুলি পড়তে আরম্ভ করলাম। সবগুলি লেখাই যে ভাল লাগত তা নয়। তবে পড়ার আগ্রহ বাড়তে লাগল এবং ধীরে ধীরে অদল বদলের লেখকদের নামগুলো মনের মধ্যে খোদাই হতে লাগল। এইভাবে একটু একটু করে আমি অদল বদলের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়লাম। কিন্তু তখন পর্যন্ত আমি নিজে এই পত্রিকায় লিখব এ কথা মনের মধ্যে স্থান পায়নি।
এই সময় আমার জীবনে আরও কয়েকটি এমন ঘটনা ঘটেছিল যার দ্বারা আমার মানসিক পরিবর্তন তরান্বিত হয়েছিল। ব্যাঙ্গালোর থেকে প্রকাশিত Dalit Voice এর পাঠক হওয়ার ফলে এবং সেই পত্রিকার সম্পাদক V.T. Rajsekharএর পনের-কুড়িখানা চটিবই একমাসের মধ্যে গোগ্রাসে গলাধকরণ করে মনের মধ্যে প্রচন্ড রকমের আলোড়ন অনুভব করছিলাম। হিন্দুসমাজে আমাদের অবস্থান এবং উচ্চবর্ণের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সবকিছু দিবালোকের মত পরিষ্কার হয়ে গেল। তারই মধ্যে বহুজন- নায়কের সম্পাদক শ্রদ্ধেয় মহেন্দ্রনাথ তালুকদার একদিন আমাদের বাড়ীতে এলেন। তার সঙ্গে দিল্লীতে অবস্থিত আম্বেদকর ভবনে গেলাম। তিনি সেখানে অনেকগুলি বই কিনলেন এবং কৌতূহল বশতঃ আমিও ডঃ আম্বেদকরের দুইখানা বই কিনে ফেল্লাম- (1) Philosophy of Hinduism and (2) Riddles in Hinduism. কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পরে একদিন ভলিউম ও বইখানা নাড়াচাড়া করতে লাগলাম। প্রথম এক-দুই পৃষ্ঠা পড়ার পর আমি যেন high voltage electric shock অনুভব করলাম। মনে হল আমার জ্ঞানচক্ষু খুলে গেছে এবং আমি যেন এক নূতন জীবন লাভ করতে চলেছি।
তারপর কয়েক বৎসর উন্মাদের মত বাবাসাহেবের সবগুলি ভল্যুম সংগ্রহ করে সেগুলি আদ্যোপান্ত পড়ে ফেললাম। যে জ্ঞানপিপাসা বাবাসাহেবকে সারা রাত বইয়ের মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছিল এবং যার ফলে রাতের খাবার টেবিলের উপরেই পড়ে থাকত সেই পিপাসা আমিও যেন অনুভব করতে লাগলাম। শুরু হল বই কেনার পালা। বাবাসাহেবের লেখাতে যে সমস্ত বইয়ের উল্লেখ ছিল সেগুলি সংগ্রহ করেও পড়তে লাগলাম। ফলে মনের মধ্যে চেতনার সঞ্চার হতে লাগল। সচেতন মন কখনও মানুষকে শান্ত এবং নির্জীব থাকতে দেয় না। সবসময় মন ছটফট করত এবং কিছু একটা করতে হবে এই চিন্তা মনকে পেয়ে বসল। দিল্লীতে সমান চিন্তাধারার আরও কিছু লোকের সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল। তাদের সঙ্গে অনেকগুলি অধিবেশন হওয়ার পরে আমরা বাঙলার দলিত মানসে চেতনা সঞ্চারের উদ্দেশ্যে একটি সাহিত্য সংস্থা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিলাম। অনেক আলোচনার পরে তার নাম রাখা হল 'বাঙলা দলিত সাহিত্য সংস্থা'।
এইভাবে 'বাঙলা দলিত সাহিত্য সংস্থা'র অঙ্কুরিত হল দিল্লীতে। কিন্তু তার বপন-ক্ষেত্র কখন ও দিল্লী হতে পারে না। সেটা হতে পারে কেবলমাত্র পশ্চিমবঙ্গে। তাই চেষ্টা শুরু হল পশ্চিমবঙ্গের দলিতসমাজের শিক্ষিত সচেতন ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের। বিভিন্ন সূত্র থেকে তাদের নাম ঠিকানা যোগাড় করে প্রতিদিন কতগুলি করে চিঠি ছাড়তে আরম্ভ করলাম। তারাও আগ্রহ দেখাতে শুরু করলেন। এই ভাবে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের সমস্ত কোনায় কোনায় কর্মরত শিক্ষিত এবং জাগরুক আপনজনদের সঙ্গে পত্রের মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপিত হল। এক নূতন উদ্দীপনায় মন ভরে উঠল।
উত্তেজনা যখন তুঙ্গে সেই অবস্থায় ১৯৯২ সালের ৫ এবং ৬ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের 'ভায়না'তে 'বাঙলা দলিত সাহিত্য সংস্থার' দুদিন ব্যাপী প্রথম সম্মেলন হয়। দিল্লী থেকে আমরা অনেকেই প্রচণ্ড উৎসাহ নিয়ে সেই সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়েছিলাম। বিভিন্ন জায়গা থেকে সহস্রাধিক লোক সেই সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছিলেন এবং এইখানেই প্রথম আমাদের সমাজের অনেক চিন্তশীল ব্যক্তির সঙ্গে চাক্ষুস পরিচয় হয়। আমার সব থেকে বড়লাভ হল এই যে ভারতে এসে পরিচয়হীন অবস্থায় প্রথমে আমি নিজেকে সমাজের কিনারায় অবস্থিত একজন অপরিচিত ব্যক্তি বলে মনে করতাম, কিন্তু এই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পর নিজেকে আমাদের বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে ভাবতে শুরু করলাম। মনে হল আমি বৃহত্তর দলিতসমাজেরই একটি অংশ এবং এই সমাজের ভালো-মন্দ চিন্তা করার দায়িত্ব এবং অধিকার দুটিই আমার আছে এবং সেই দায়িত্ব আমাকে পালন করতেই হবে। এই দায়িত্ব কেউ আমাকে দেয়নি, আমি নিজেই স্বেচ্ছায় এই দায়িত্ব গ্রহন করলাম।
'অদল বদল' সম্পর্কে লিখতে গিয়ে উপরে যে সমস্ত ঘটনাক্রমের উল্লেখ করলাম সেগুলো অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে হতে পারে। বাস্তবে কিন্তু তা নয় কারণ উপরোক্ত প্রতিটি ঘটনা এমন ভাবে আমার ভিতর সমাজ চেতনা জাগিয়ে তুলেছিল যার ফলে অতি সহজেই আমি অদল বদলের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম। এই সময়ে শ্রী বিমল বিশ্বাস একদিন দিল্লীতে আমাদের বাড়ীতে এলেন। তিনি আমাকে তার পত্রিকায় লিখবার কথা বললেন। আমি বললাম আমি বিজ্ঞানের ছাত্র, সাহিত্য সম্পর্কে জ্ঞান খুবই কম এবং ভাষার উপরেও খুব একটা দখল নেই, বিশেষ করে বাঙলা ভাষার উপরে তো একেবারেই নেই। যে সমস্ত বই পড়ি সবই ইংরেজী ভাষায় লেখা অফিসের কাজকর্ম, রিপোর্ট তৈরী সব ইংরেজী ভাষায় কাজেই মনে হয় বাংলার থেকে ইংরেজীতেই একটু ভালো লিখতে পারবো। উনি বললেন যেহেতু অদলবদল একটি বাংলা পত্রিকা তাই সমস্ত লেখা সেখানে বাঙলায় হওয়াই বাঞ্ছনীয় তবে তুমি যত খুশী ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করতে পার। কথাটি মনঃপূত হল এবং একটি English to Bengali Dictionary কিনে তখন থেকেই বাংলা শব্দ এবং তার বানান রপ্ত করতে লেগে গেলাম। অদলবদলের মে' ১৯৯৪ সংখ্যায় আমার প্রথম প্রকাশিত লেখা 'সতী প্রথার গোড়ার কথা' প্রকাশিত হল। বাস আমার লেখার হাতে খড়ি হয়ে গেল এবং মন আনন্দে ভরে উঠল।
কোথায় যেন পড়েছিলাম যে মুঘল সম্রাজ্ঞী নূরজাহান চল্লিশ হাজার গোলাপ ফুল নিংড়ে এক ফোটা আতর প্রস্তুত করতেন। একথা যদি সত্য হয় তাহলে সেই আতরের সুগন্ধও আমাদের কাছে কল্পনাতীত। তবে একথা বৈজ্ঞানিক সত্য যে, Superior output পেতে গেলে Superior input দিতে হবে। Input থেকে আউটপুট বেশী হয় একমাত্র খড় বিছালির ক্ষেত্রে, যেটা হয় মোষের খাবার। যারা পড়েন কম কিন্তু লেখেন বেশী তাদের বেলায়ও এ কথা প্রযোজ্য। এই নির্ভেজাল সত্যটি আমার মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল। তাই আবার নূতন উদ্যোগে পড়াশুনার দিকে মন দিলাম যাতে আমি অদল বদলের পাঠকদের কাছে নিত্য নূতন তথ্য পৌঁছে দিতে পারি। প্রকৃত সত্যের সন্ধান পেতে মন আকুল হয়ে উঠলো। অদল-বদলে বিশ বৎসরেরও অধিক সময় ধরে লিখেছি।
এই দীর্ঘ সময় আমার অন্ততপক্ষে একশত পঞ্চাশটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। একথা বলা যায় যে আমি এই পত্রিকার একজন নিয়মিত লেখক ছিলাম। এর সমস্ত কৃতিত্ব সম্পাদক শ্রীবিমল বিশ্বাসের। তারই উৎসাহে লেখা শুরু করেছিলাম এবং দীর্ঘদিন এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে তার সঙ্গে আমার একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তিনি অনেক বার আমাদের বাড়ীতে এসেছেন এবং আমিও অনেকবার তার সল্টলেকের বাড়ীতে গিয়েছি। আমাদের সমাজের প্রতি তার যে গভীর ভালবাসা ছিল এবং এই সমাজকে সঠিক পথনির্দেশ করাই যে তার উদ্দেশ্য ছিল আমাদের দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে সেটা আমি অনুভব করতে পেরেছিলাম।
আমরা প্রায় সকলেই পূর্ব-পাকিস্তানের উদ্বাস্তু। আমাদের জাতির মোট জনসংখ্যার পঁচানব্বই শতাংশ পূর্ব বাঙলার বিভিন্ন জেলায় বসবাস করত। বঙ্গ বিভাজনের ফলে আমরাই সব থেকে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত। উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে এসে পশ্চিমবঙ্গে এবং ভারতের অন্যান্য প্রদেশে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হই এবং অর্থনৈতিক পুনর্নির্মাণের কাজে আমাদের প্রায় তিন দশক কেটে যায়। এই তিন দশক সমাজ সম্বন্ধে চিন্তা করবার কারোই অবসর ছিলনা সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যাস্ত ছিলেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দশকে শ্রদ্ধেয় গুরুচাঁদ ঠাকুর এবং আরও কয়েকজন নেতার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আমাদের সমাজে শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সাহিত্য আলোচনায় যে জাগরণ এসেছিল বঙ্গ বিভাজনের ফলে সেসব একেবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আবার আশির দশক থেকে সেই প্রচেষ্টা নূতন করে শুরু হয় এবং শ্রীবিমল বিশ্বাসই তার প্রথম উদ্যোক্তা, প্রথম পথপ্রদর্শক। তার এই অবদান সমাজ দীর্ঘদিন মনে রাখতে বাধ্য হবে।
অদল বদল শুধুমাত্র একটা পত্রিকা ছিল না, এটিকে আমাদের সমাজের লেখক তৈরীর কারখানাও বলা যেতে পারে। সবর্ণদের অনেক পত্র-পত্রিকা আছে কিন্তু তারা আমাদের কথা বলে না এবং আমাদেরও সেখানে বলবার সুযোগ দেয় না। কারণ এই মাধ্যমটিকে তারা নিজেদের প্রভাব বিস্তারে এবং দলিত সমাজকে বিপথে পরিচালিত করতেই প্রয়োগ করে থাকে। একবার দিল্লী থেকে প্রকাশিত একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায় আমি একটি চিঠি লিখেছিলাম। রাজস্থানের উদয়পুর শহরে শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরে দলিত প্রবেশাধিকার নিয়ে সবর্ণদেরই নেতৃত্বে একবার এক জোরদার আন্দোলন হয়েছিল অথবা বলা যায় আন্দোলনের নামে এক প্রহসন হয়েছিল। আমার চিঠিটি ছিল সেই আন্দোলনের উপর কটাক্ষ করে। কিন্তু চিঠিটি যখন প্রকাশিত হল তখন দেখি সেটিকে কেটে ছিড়ে সম্পাদনার নামে এমন রূপ দিয়েছে যার ফলে আমি যা বলতে চেয়েছিলাম তার ঠিক উল্টো কথাই সেখানে প্রকাশ পেয়েছে। তখনই বুঝে গেলাম যে এইসব পত্রিকায় আমাদের লেখার চেষ্টা বৃথা। নিজেদের কথা বলতে গেলে চাই নিজস্ব পত্রিকা। তাই অদল-বদলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরে নিজের কথা, নিজের সমাজের কথা প্রাণ উজাড় করে বলতে আরম্ভ করলাম।
কোন কালে কোন সমাজেই সকল সদস্য উচ্চবুদ্ধি সম্পন্ন হয় না। সামান্য কিছু বুদ্ধিমান লোক জন্মে, তারাই সমাজকে পথ দেখায় এবং বাদবাকীরা কিছু বুদ্ধিমান সেই পথে এগিয়ে চলে। এইভাবেই সেই সমাজ প্রগতির পথে এগিয়ে চলে। যে সমাজের লোকেরা এই পদ্ধতি অনুসরণ করে না তারা নিশ্চিত রূপে একদিন পথভ্রান্ত হবে এবং ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে। যে সমাজ যত বেশী প্রগতিশীল তাদের সামাজিক প্রতিষ্ঠানের (Institution) সংখ্যাও তত অধিক। সমাজের সকলের যোগদানেই এইসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে এবং এইসব প্রতিষ্ঠানই দীর্ঘস্থায়ী হয়। নূতন প্রজন্মও এই প্রতিষ্ঠানগুলিকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে, তাদের পূর্ব-পুরুষের অবদান স্মরণ করতে গর্ববোধ করে এবং সেগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে।
আমাদের সমাজের কোন ইনস্টিটিউশন আছে কি? সামাজিক সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক, রাজনৈতিক, শৈক্ষিক কিংবা অন্য কোন বিষয়ে, যেটিকে আমাদের একান্ত নিজস্ব বলে দাবী করতে পারি এবং গর্ববোধ করতে পারি? এমন একটিও আমার চোখে পড়ছে না। এটা কি খুবই দুঃখের বিষয় নয়? যোগেন মণ্ডলের পরে আমাদের সমাজে আর কোন নেতার জন্ম হল না। আজ আমাদের সমাজে এমন একজন ব্যক্তি নেই যাকে নিয়ে আমরা গর্ববোধ করতে পারি। কিন্তু এমনটি কেন হল? আমার মনে হয় এর একমাত্র কারণ আমাদের কোন Institution নেই যেটি অন্ধকার রাতে Light House হয়ে সকলকে পথ দেখাতে পারত। অদল-বদল এমনি একটি Institution হতে পারত- কিন্তু তা হয়নি।
অদল-বদলের অবদান অনেক। এই পত্রিকাটি অনেক লেখক তৈয়ার করেছে, দলিত সমাজকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছে এবং অন্যের দোষারোপ না করে নিজের রাস্তা বেছে নেওয়ার উপায় দেখিয়েছে। কিন্তু শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এটি ব্যক্তির বিশেষের প্রতিষ্ঠানে ছিল। সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি গড়ে উঠতে পারেনি। তার কারণ অনুসন্ধান করা এখন নিরর্থক। এটি ছিল এক প্রজন্মের প্রতিষ্ঠান। আমাদের চোখের সামনে এই জন্ম হলো আবার আমাদের চোখের সামনেই এর জীবনাবসানও হলো। দ্বিতীয় প্রজন্ম "অদল বদলের" রূপ দেখতে পেল না, স্বাদ-গন্ধও পেল না। কিন্তু অদল-বদলের স্মৃতি এবং প্রভাব অতি সহজে মুছে যাওয়ার নয়। এই স্মৃতিই একদিন সমাজকে অনুপ্রাণিত করবে এবং নূতন প্রজন্মকে নূতন কিছু করতে প্রেরণা যোগাবে।
কৃতজ্ঞতাবোধ সর্বশ্রেষ্ঠ মানবিক গুণ। অকৃতজ্ঞ লোক পশুর সমান। সকলেরই প্রথম কৃতজ্ঞতা হচ্ছে পিতামাতার প্রতি। তার পরেই যে সমাজে সে জন্মেছে সেই সমাজের স্থান। বাবাসাহেব বলেছেন, 'Blessed are those who are awakened to their duty to those among who they are born', অর্থাৎ যাদের মধ্যে জন্মেছি তাদের প্রতি কর্তব্যপরায়ণতা সম্বন্ধে সজাগ থাকলেই আশীর্বাদপুষ্ট হওয়া যায়। আম্বেদকরবাদ গ্রহণ করার পরে বাবা সাহেবের এই বাণীটিকেই জীবনের মূলমন্ত্র করে নিয়েছিলাম।
সমাজের ঋণ নানারকম ভাবে শোধ করা যেতে পার। আমি নিজে জাগরুক হয়ে নিজ সমাজে সেই জাগরুকতা বিস্তার করেই সমাজের প্রতি আমার ঋন শোধ করতে চেয়েছিলাম। অদল বদল আমাকে সেই সুযোগ দিয়েছিল। তাই আমি অদলবদল এবং শ্রী বিমল বিশ্বাসের কাছে কৃতজ্ঞ। 'অনুসন্ধান' নামে আমার একখানি পুস্তক অদল বদল প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। যদিও পুস্তকটি পাঠকদের কাছে বিশেষ সমাদৃত হয়নি তবুও আমি অদল বদলের কাছে কৃতজ্ঞ। আরও অনেক ধারাবাহিক লেখা পুস্তক আকারে প্রকাশ করার ইচ্ছে ছিল কিন্তু সাহস পাই নি।
আমাদের সমাজের দুরবস্থা সম্বন্ধে এবারে দুই একটা কথা বলব। আমাদের মহাপুরুষরা বলেছেন এবং আমরা অনুভব করি যে, সমাজকে সচেতন এবং জাগরুক করতে গেলে শিক্ষার বিস্তার ছাড়া দ্বিতীয় কোন উপায় নেই। আমাদের সমাজে আজ ডিগ্রিধারী শিক্ষিতের সংখ্যা যথেষ্ট। কিন্তু তবু সমাজ কেন সচেতন হয়নি। কেন সমাজ আত্মসম্মানহীন অবস্থায় নির্জীবের মতো দিন কাটাচ্ছে? আমার মনে হয় এর একমাত্র কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অন্য লোকের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং আমাদের ছেলেমেয়েরা মনকে আলোকিত করার উপযোগী কোন শিক্ষা পাচ্ছে না। শিক্ষার যতগুলি সংজ্ঞা আমি দেখেছি তার মধ্যে যেটি আমার সবথেকে বেশি ভালো লেগেছে সেটি হচ্ছে "Education is that which survives after what was learnt has been forgotten." স্কুল কলেজের সিলেবাস কেউ মনে রাখে না। কিন্তু সেসব ভুলে যাওয়ার পরেও যা কিছু মনের মধ্যে বেঁচে থাকে সেটাই হচ্ছে প্রকৃত শিক্ষা। যে সব গল্প কাহিনী তত্ত্বকথা আমরা ছাত্রজীবনে পড়ি তার সঙ্গে যে আলো মনের মধ্যে প্রবেশ করে সেই আলোটিই মনের মধ্যে স্থায়ী হয়ে থাকে, বাদবাকী সব আমরা সময়ের সাথে সাথে ভুলে যাই। কিন্তু শিক্ষার মধ্যে যদি কোন সত্যের আলো না থাকে, তাহলে মন আবার আস্তে আস্তে অন্ধকারে ভরে যায়। সেই অন্ধকার মনে লোভ, হিংসা, ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা, মূল্যহীনতা প্রভৃতি ধ্বংসাত্মক আগাছা গজিয়ে ওঠে, যার ফলে সমাজ আলোর পথে এগিয়ে যেতে পারে না। চেতনা বলতে আমরা কি বুঝি? জ্ঞান হওয়ার পরেই আমাদের চারপাশে যা কিছু দেখেছি- লোকজন, বাড়ীঘর, সামাজিক এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন ধর্মাচরণ এবং সামাজিক অনুষ্ঠান সেসব চিরকালই যে এইরকম ছিল না এবং ভবিষ্যতেও এরকম থাকবে না এই বোধগম হওয়াকেই চেতনা বলা হয়। বারট্রান্ড রাসেল্ একটি সচেতন মনের বর্ণনা অতি সুন্দর ভাবে করেছেন। "To Know how the world developed to the point at which our individual memory begins; how the religions, the institutions, the nations among which we live, became what they are; to be acquainted with the great of other times, with customs and beliefs differing widely from our own these things are indispensable to any consciousness of our position, ......"। আমাদের বর্তমান অবস্থান কোথায়, আগে কোথায় ছিল এবং ভবিষ্যতে আমরা কোন দিকে যাচ্ছি এই জ্ঞান এবং বিশ্লেষণ ক্ষমতা যার আছে, তিনিই সচেতন ব্যক্তি এবং যার মধ্যে এর অভাব আছে, তিনিই চেতনাহীন দলে পড়ার যোগ্য।
স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচী শাসকশ্রেণী তাদের শ্রেণীস্বার্থ বজায় রাখার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করে। সেইসব পাঠ পড়ে আমাদের ছেলেমেয়েদের মনে চেতনা আসতে পারে না। অন্ধকার মনে আলো জ্বালা এবং অচেতন মনে চেতনার সঞ্চার করার জন্য অদল বদলের একান্ত প্রয়োজন ছিল এবং পচিশ বৎসরেরও অধিক সময় অদল-বদল সেই ভূমিকা সুষ্ঠুভাবে নির্বাহ করেছে। শ্রীবিমল কান্তি বিশ্বাস সমাজের প্রতি তার ঋণ সাধ্যাতীত ভাবে শোধ করেছেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁকে কত দিন মনে রাখবে সে সম্বন্ধে কোন ভবিষ্যৎ বাণী করতে চাই না।
আমার সঙ্গে অদল-বদলের সম্পর্ক ছিল একটি মৌমাছির সঙ্গে মৌচাকের যে সম্পর্ক-সেই রকম। বিশ বৎসর বনে বনে ঘুরে মধু সংগ্রহ করেছি এবং সেই মধু মৌচাকে জমা করেছি। আজ সেই মৌচাকটি নেই। কিন্তু মৌমাছির কাজ শেষ হয়নি। সে সমাজে অসংখ্য বোধিসত্ত্বের আবির্ভাবের জন্য বিশ্বশক্তির কাছে দিনরাত প্রার্থনা করে যাচ্ছে।
উদ্বাস্তু জীবনের প্রথমদিকে জীবন-জীবিকার তাগিদে, একটু নিজের পায়ে দাঁড়াতে আমি বহুদিন পশ্চিমবঙ্গের বাইরে কাটিয়েছি প্রায় বিশ বছর। পূর্ববঙ্গের বাস্তুহারা মানুষদের পুনর্বাসন ক্ষেত্র 'দণ্ডকারণ্য প্রকল্প'-এ শিক্ষকতার চাকরি করেছি তখন। ওই প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাবার প্রাক্কালে সারপ্লাস হয়ে কলকাতা টেলিফোন্স-এ পোস্টিং পেয়ে পশ্চিমবঙ্গে এসেছি ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে। পূর্ববঙ্গে থাকাকালীন সময়ে অল্প বয়স থেকেই কবিতা, গল্প ইত্যাদি লেখালেখির অভ্যাস গড়ে উঠলেও দণ্ডকারণ্যে থেকে তা প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। পশ্চিমবাংলায় এসে আবার লেখালেখির প্রচেষ্টা শুরু করলাম বটে, কিন্তু সে লেখা ছাপবার জায়গা কোথায়? লিটল ম্যাগাজিনে দু-একটা কবিতা ছাপা হলেও তা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। এদেশে মনুবাদী প্রচার ও প্রকাশনার জগতে আমাদের লেখা প্রকাশ করতে কেউ রাজি নয়। সে হিসেবে তখনকার মুসলিম দেশ পূর্বপাকিস্তানে লেখা পছন্দ হলে, কিংবা কাঁচাহাতের লেখা হলে সম্পাদকরা তা পাঠযোগ্য করে ছাপতে দ্বিধা করতেন না। বরং আরও লিখতে উৎসাহ দিতেন। সেইসূত্রে পূর্বপাকিস্তানে থাকার সময়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আমার বেশকিছু কবিতা, গল্প বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। একটি নামকরা পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় আমার লেখা একটি উপন্যাসও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এদেশে প্রকাশ করা দূরের কথা, লেখা চোখ বুলিয়ে দেখতেও কেউ রাজি হয় না; কারণ, নামের শেষে পদবিটি। পদবি দেখেই জাত চিনে ফেলে এদেশের লোক! এদেশের লোক যে দেশেই যাক জাতকে সঙ্গে নিয়ে যায়।
পশ্চিমবঙ্গে আসার পরে নতুন একটি আন্দোলনের সঙ্গে পরিচিত হলাম- কাঁশিরামের বহুজন আন্দোলন। কাঁশিরামের নেতৃত্বে সারা ভারতে তখন বহুজন আন্দোলন বেশ সাড়া ফেলেছে, পশ্চিমবাংলায়ও তার ঢেউ এসে পৌঁছেছে। সেই সময় সন্ধান পেলাম 'বহুজন নায়ক', 'অধিকার' 'অদল বদল', 'আজকের একলব্য', 'অতএব' ইত্যাদি পত্রিকার- যেসব পত্রিকা দলিত মানুষের দ্বারা পরিচালিত, দলিত মানুষের সুখদুঃখ, ব্যথাবেদনার কথা যেখানে প্রকাশিত হতো। আস্তে আস্তে পরিচিত হয়েছি সেইসব লেখার লেখক-সম্পাদকদের সঙ্গেও। কিন্তু ওইসব লেখকদের লেখা পড়ে আবার উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন করে আবার কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ইত্যাদি লেখার ইচ্ছাও প্রকট হয়ে উঠলো। শুরুও করলাম অবসর সময়ে লিখতে। ওইসব পত্রপত্রিকায় তা ছাপাও হতে থাকলো। এর মধ্যে 'অদল বদল' পত্রিকাটি ছিল একটি নিয়মিত মাসিক সাহিত্য পত্রিকা। তাতেই সবচেয়ে বেশি লিখেছি। লিখেছি উপন্যাস, গল্প, কবিতা।
প্রথমদিকে 'বহুজন নায়ক' সাপ্তাহিক পত্রিকায় আমার লেখা কিছু কবিতা, প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে- হচ্ছে। কিন্তু আমি তখন উপন্যাস লিখছি, গল্প লিখছি, তা ছাপব কোথায়? দণ্ডকারণ্যের পটভূমিকায় উপন্যাস 'অরণ্যের অন্ধকারে' লিখে রেখেছিলাম আগেই। দলিত সমাজের কোনো লেখকের সাথে পরিচয় নেই। কোথায় ছাপতে পাঠাব কিছুই জানি না। তখন 'অদল বদল' নামে একটা পত্রিকা আছে শুনেছি, কিন্তু তার চেহারাও দেখিনি ঠিকানাও জানি না, কোথায় পাওয়া যায় তাও জানি না। অবশেষে একদিন রানাঘাটের কুপার্সে দলিত সাহিত্য সম্মেলনের খবর পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি সেখানে নতুন, সম্পূর্ণ অপরিচিত। 'দলিত সাহিত্য সংস্থা'র একজন সদস্যের সঙ্গে আলাপ হতে তাঁর কাছ থেকে পেয়েছিলাম 'অদল বদল' পত্রিকার ঠিকানা। পত্রিকাটি কোথায় পাওয়া যাবে তার হদিশ দিতে পারলেন না তিনি। অগত্যা চিঠি লিখলাম সম্পাদক মশাইয়ের কাছে পত্রিকার একটি নমুনা সংখ্যার জন্য। সঙ্গে পাঠিয়ে দিলাম দুটি কবিতা এবং একখানি ইনল্যাণ্ড লেটার আমার ঠিকানা লিখে। তিনি ডাকযোগে পাঠিয়ে দিলেন দুটি সংখ্যা। চিঠির উত্তরে জানিয়ে দিলেন কবিতা দুটি মনোনীত এবং প্রেসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। পত্রিকার সংখ্যাদুটি পেয়েই বুঝে গেলাম, এই তো সেই পত্রিকা- যেখানে আমার কথা, আমাদের কথা অকপটে লিখতে পারি। গল্প-উপন্যাস-কবিতা ছাপতে হলে এই তার উপযুক্ত জায়গা। এরপর চাঁদা পাঠিয়ে পত্রিকার গ্রাহক হলাম, আরো কবিতা পাঠালাম। একদিন টেলিফোন করলাম সম্পাদক মশাইকে-আমার পাঠানো কবিতা পেয়েছেন কিনা, পেয়ে থাকলে তাঁর মতামত জানতে। প্রসঙ্গত, তখন মফস্সল শহর থেকে কলকাতায় টেলিফোন করা বেশ কঠিন ছিল। আমি টেলিফোনের ট্রেনিং সেন্টারে চাকরি করতাম বলে আমার কাছে বিনে পয়সায় করার কিঞ্চিৎ সুযোগ ছিল। টেলিফোনে আমার নাম বলাতে বিমলদা (তখনও অবশ্য তিনি আমার বিমলদা হননি) প্রথমেই বললেন- ও, আপনি সেই 'তৃতীয় সন্তান'? আমি হেসে জবাব দিলাম- হ্যাঁ। তিনি বললেন- ও তো প্রেসে চলে গেছে। সেইসঙ্গে যোগ করলেন- আপনি তো মশাই বেশ কবিতা লেখেন!
আসলে আমি যে কবিতা পাঠিয়েছিলাম, তার মধ্যে একটি কবিতার নাম ছিল 'ছাগলের তৃতীয় সন্তান'-যে কবিতাটি পরে আমার 'ভূমিপুত্রেরা শোনো' কাব্যগ্রন্থে স্থান পেয়েছে। সে বই-এর প্রকাশকও ছিলেন বিমলদা। পরের পাঠানো কবিতাগুলিও ছাপা হলো পরপর কয়েকটি সংখ্যায়। সেই থেকে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ যা-ই পাঠিয়েছি, কোনোটিই অমনোনীত হয়নি, সবই ছাপা হয়েছে। তবে প্রথমদিকের কিছু গদ্য রচনা বিমলদার হাতের ছোঁয়ায় অনেক সুন্দর হয়েছে, একথা স্বীকার না করে উপায় নেই।
মাঝে মাঝে কবিতা লিখলেও তখন আমার গল্প-উপন্যাস লেখার ঝোঁক। দণ্ডকারণ্যে থাকতেই লিখে রাখা উপন্যাসের খসড়াটিকে নতুন করে লিখে ফটোকপি করে পাঠিয়ে দিলাম 'অদল বদল'-এর দপ্তরে। কয়েকদিন পরে টেলিফোন করলে আমাকে অবিলম্বে তাঁর সাথে দেখা করতে বললেন। এক রবিবারে আমি পত্রিকা দপ্তরে গিয়ে হাজির হলাম। সেই আমার প্রথম সাক্ষাৎ বিমলদার সাথে। পরিচয় দিতেই চিনতে পারলেন। অল্প সময়ের আলাপেই একান্ত আপন করে নিলেন, হয়ে গেলেন আমার বিমলদা। আমার লেখার প্রশংসা করলেন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে উপন্যাস লেখার জন্য। তবে কিছু বাক্যের গঠন পরিবর্তন করার উপদেশ দিয়ে মূল পাণ্ডুলিপি পাঠাতে বললেন; ফটোকপি দিয়ে কম্পোজ করতে কম্পোজিটরদের অসুবিধা হয়। অনেক সময় ঠিকমতো পড়া যায় না। বিমলদার কথামতো সেই সমস্ত বাক্যে পরিবর্তন করে আসল পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে দিলাম কদিনের মধ্যেই। ধারাবাহিক ভাবে ছাপা হলো 'অরণ্যের অন্ধকারে' উপন্যাস। অনেক জায়গায়ই বাক্যের সামান্য রদবদল করে যে আরও কত সুন্দর করে তোলা যায়, সেটাও লক্ষ করলাম ছাপা হবার পরে। মনে মনে অসংখ্য ধন্যবাদ জানালাম বিমলদাকে।
একদিন বিমলদা ডেকে পাঠালেন আমাকে। প্রস্তাব দিলেন বইখানির ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে পুস্তকাকারে প্রকাশ করার। বই প্রকাশ করার ব্যাপারে আমার কোনো ধারণাই নেই তখন। সুতরাং তিনিই প্রকাশক হলেন। 'অরণ্যের অন্ধকারে' বই হয়ে বেরোল তাঁরই প্রচেষ্টায়, উদ্বোধন করা হলো 'অদল বদল'-এর দশম বর্ষপূর্তির সাহিত্যসভার অনুষ্ঠান- ঠাকুরনগর হাইস্কুলে ১৯৯৬-র ৩০ মার্চে। দলিত-সাহিত্যের মর্যাদায় সার্থক উপন্যাস হিসাবে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছিল বইখানি সে সময়। তার রিভিউ করেছিলেন সাহিত্যিক ধূর্জটি নস্কর 'চতুর্থ দুনিয়া' পত্রিকায়।
তখন প্রতি বছরই মার্চ মাসে 'অদল বদল'-এর বর্ষপূর্তিতে সাহিত্যসভার আয়োজন করা হতো বিভিন্ন জায়গায়। এই অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা ও প্রধান কর্মকর্তা বিমলদা, সমস্ত খরচও তাঁর। সারাদিন ধরে চলত অনুষ্ঠান। খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা থাকত। অনেক লেখক-পাঠকেরা হাজির থাকতেন সেই সাহিত্যসভায়। আলাপ পরিচয় মেশামেশি হতো পরস্পরের সঙ্গে। দলিত সমাজের লেখক-পাঠকদের মধ্যে একটা আত্মীয়তার পরিবেশ সৃষ্টি হতো। দলিত-সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় আলোচনা হতো। হতো কবিতা পাঠ, অনুষ্ঠিত হতো দলিত নাটকের অভিনয়। প্রকাশিত হতো নতুন লেখক-কবিদের নতুন নতুন বই। আর সেইসব লেখক-কবিরা কিন্তু 'অদল বদল'-এরই সৃষ্টি- যার সৃষ্টিকর্তার ভূমিকায় স্বয়ং সম্পাদক বিমল বিশ্বাস। তখন 'অদল বদল'কে ঘিরে সাহিত্য রচনার বিশাল একটা জোয়ার এসেছিল দলিত সমাজের মানুষের মধ্যে। সাহিত্যই তো মানুষের চেতনাকে জাগ্রত করে, ইতিহাসকে তুলে এনে আপন শৌর্যবীর্যকে জাগিয়ে তোলে, সংঘবদ্ধ হয়ে লড়াই করার প্রেরণা জোগায়। রাজনৈতিক শক্তিকেও তা বৃদ্ধি করে।
আর একটা বিশেষ তাৎপর্য ছিল 'অদল বদল'-এর, সেটা হলো আমাদের সমাজের মধ্যে ছোটো থেকেই লেখার অভ্যাস গড়ে তোলা ও উৎসাহ দেওয়া তথা তাদের মনোরঞ্জনের জন্য "প্রদীপজ্যোতি শিশু ও কিশোর বিভাগ"। এই বিভাগের নামকরণটা ছিল বিমলদার অকালপ্রয়াত ছোটো ছেলে প্রদীপের নামে। এ ছাড়া সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস মিলিয়ে একসঙ্গে বড়ো আকারে প্রকাশিত হতো শারদীয় সংখ্যা। আমার যত লেখা- গল্প-উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনি ইত্যাদি তার বেশির ভাগই প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকায়।
একবার আমার পয়ার ছন্দে লেখা 'রামচরিত কথা'-র পাণ্ডুলিপি নিয়ে গিয়ে তাঁকে পড়ে শোনালে তিনি আমার হাত থেকে পাণ্ডুলিপিটি নিয়ে নিজেই সুর করে পড়তে লাগলেন। বললেন- এটা তো সুর করে পড়তে হবে, তবেই না মজা! বলে তিনি শিশুর মতো হাসতে লাগলেন।
বিমলদা আমার দুখানি উপন্যাস ও একটি কাব্যগ্রন্থের প্রকাশকও। তাঁর উৎসাহ উদ্দীপনায় লেখারও আগ্রহ জন্মেছিল সে সময়। শিশু-কিশোরদের বিভাগের জন্যও তাঁর কথায় আমাকে লিখতে হয়েছে বেশ কিছু কবিতা-গল্প। ছোটদের জন্য 'ছড়া ও ছবিতে বাবাসাহেব আম্বেদকর' তারই ফসল। ওই বইয়ের সমস্ত ছবিও তিনি আঁকিয়ে দিয়েছিলেন সুদূর বর্ধমানের এক গ্রাম্য শিল্পীকে দিয়ে। ওই আসরেই প্রকাশিত হয়েছে আমার 'ছড়ায় ছড়ায় হরিচাঁদ ঠাকুর', 'ছড়ায় ছড়ায় গুরুচাঁদ ঠাকুর'। পরে দুটি লেখাই একত্রে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আমাকে তাগাদা দিয়ে দিয়েও অনেক লেখা লিখিয়ে নিয়েছেন। সে হিসাবে আমার অনেক লেখা 'অদল বদল'-এর পাতায়ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। দুঃখের বিষয় 'অদল বদল' বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমার লেখাও বলতে গেলে বন্ধই হয়ে গেছে।
তিরিশ বছর ধরে দু-একটি সংখ্যা বাদ দিলে প্রতিমাসে নিয়মিত বেরিয়েছে 'অদল বদল'। বন্ধ করে দেবার অনেক আগে থেকেই বিমলদা তাঁর অবর্তমানে পত্রিকাটি সচল রাখার জন্য উত্তরসূরি খুঁজেছিলেন। আমাকেও একাধিকবার বলেছিলেন পত্রিকাটির ভার নেওয়ার জন্য। কিন্তু আমার পক্ষে সুদূর গ্রামে থেকে নিয়মিত এসে পত্রিকা চালানো অসম্ভব বলে সে দায়িত্ব নিতে পারিনি। একবার দুর্গাপূজার প্রাক্কালে তিনি কিছুদিন মুম্বাইতে গিয়ে থেকেছিলেন। সে সময় আমি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে তিন সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন গিয়ে সে বছরের শারদীয়া সংখ্যার লেখা নির্বাচন, প্রুফ দেখা থেকে শুরু করে সম্পাদনার যাবতীয় কাজ সুষ্ঠুভাবে করেছিলাম। পত্রিকা প্রকাশিত হয়ে যাবার পরে তিনি ফিরেছিলেন। পত্রিকা দেখে তিনি খুশিই হয়েছিলেন। সে কথা মনে রেখেই তিনি আমাকে দায়িত্ব নেবার কথা বলেছিলেন।
'অদল বদল'-এর তিরিশ বছরের সব কটি সংখ্যা কোনো লেখক বা পাঠকের কাছে সযত্নে রক্ষিত আছে কিনা জানি না; তবে যেদিন থেকে আমি পত্রিকার পাঠক হয়েছি, সেদিন থেকে দীর্ঘ বাইশ বছরের সব কটি সংখ্যা আমার কাছে সযত্নে রক্ষিত আছে। আজও পুরোনো সংখ্যাগুলি মাঝে মাঝে বের করে পড়ি। কত অজানা তথ্য, কত ইতিহাস তার মধ্যে ছড়িয়ে আছে, যা কোনোদিনই পুরোনো হবে না। ভবিষ্যৎ গবেষকদের কাছে সেগুলি যে মূল্যবান সম্পদ হিসাবে বিবেচিত হবে সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।
নিয়মিত 'অদল বদল' পত্রিকার কল্যাণে কত মানুষের সঙ্গ পেয়েছি, কত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছি আমার কথা- আমাদের কথা, জানতে পেরেছি, শুনতে পেরেছি আমাদের মানুষের কথা- যা ছিল চিরকালআলোর অন্তরালে- অন্ধকারে ঢাকা। পরিচিত হয়েছি কত নতুন নতুন মানুষের সাথে তারও ইয়ত্তা নেই। এই 'অদল বদল'ই 'দূরকে করেছে নিকট বন্ধু পরকে করেছে ভাই'- যার অন্তরালের চালিকাশক্তি বিমল বিশ্বাস। দলিত সমাজের কত অখ্যাত নতুন লেখকদের লেখায় হাতেখড়ি হয়েছে তাঁর হাতে এই পত্রিকার মাধ্যমে তার সংখ্যা নেই। তাঁদের অনেকেই যথেষ্ট নামও করেছেন লেখক হিসাবে। কেউ কেউ 'অদল বদল'-এ হাত পাকিয়ে আলাদা হয়ে পত্রিকাও বের করেছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আড়ালে বিমল বিশ্বাসের সমালোচনাও হয়তো করেন, কিন্তু- তাঁরা স্বীকার করুন বা না-ই করুন, লেখক হিসাবে তাঁদের দাঁড় করিয়েছেন এবং পরিচিতি দিয়েছেন বিমল বিশ্বাসই- এতে কোনো সন্দেহ নেই। সে হিসাবে তাঁরা প্রত্যেকেই তাঁর কাছে ঋণী।
আমিই প্রস্তাব দিয়েছিলাম 'অদল বদল'-এ প্রকাশিত কিছু বাছাই করা গল্প এবং বাছাই করা কবিতা নিয়ে দুটি সংকলন বের করার। তিনি সানন্দে রাজি হয়েছিলেন এবং তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না বলে আমাকে দায়িত্ব নিতে বলেছিলেন। আমি দায়িত্ব নিয়েছিলাম এবং অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রায় দু-বছরের প্রচেষ্টায় সংকলন গ্রন্থ 'অদল বদল-এর গল্প' বের করেছিলাম। বয়সজনিত অসুস্থতার কারণে ছাপার অক্ষরে গ্রন্থটি বিমলদা দেখে যেতে পারবেন কিনা আশঙ্কা করেছিলেন, আমার সান্ত্বনা- সে আশঙ্কা দূর করতে পেরেছি; বইখানি ছেপে তাঁর হাতে তুলে দিতে পেরেছিলাম; তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। 'অদল বদল'-এ প্রকাশিত চল্লিশজন লেখকের বাছাই করা চল্লিশটি গল্প স্থান পেয়েছে সেই সংকলনে। এছাড়া কবিতা সংকলনের একটি কাজে কিছুদূর অগ্রসর হয়েও বিমলদার প্রয়াণে তা আর সম্পূর্ণ করা হয়নি।
সাহিত্য জগতে আমার যেটুকু পরিচয়, তার বেশির ভাগটাই যে 'অদল বদল' সম্পাদক শ্রদ্ধেয় বিমল বিশ্বাসের আন্তরিক সহযোগিতা ও অবদানের ফল, সে কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ না করলে আমার অন্যায়ই হবে। তাঁর মতো একজন নমস্য ব্যক্তিকে দলিত সমাজের পক্ষ থেকে নানাভাবে সংবর্ধনা জানানো উচিত ছিল। কিন্তু আমরা আমাদের সমাজের গুণীজনদের সম্মান জানাতে শিখিনি, তাই তাঁকে সম্মান জানানোর কথা কারও মনেই হয়নি। হয়তো কিছুদিন পর তাঁর নামও কারও মনে থাকবে না। অথচ মনুবাদী তথা ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজের লোকেরা তাদের সমাজে কেউ সামান্য কিছু অবদান রাখলেই নানাভাবে ফলাও করে তা প্রচার করে থাকে। পত্রপত্রিকায় নানাভাবে তাকে নিয়ে হইচই ফেলে দেয়, নানা পুরস্কারে ভূষিত করে তাকে মহামানবের পর্যায়ে তুলে দেয়। রেডিও-টিভিতে তাঁর সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়। কিন্তু আমাদের মানুষেরা তার সম্পূর্ণ উলটো- কেউ বিশাল আত্মত্যাগ করলেও তার স্বীকৃতি তো দিই না, উপরন্তু তাঁর দোষত্রুটি খুঁজতে উঠেপড়ে লেগে পড়ি।
বিমল বিশ্বাসের লেখা গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি পুস্তকাকারে খুব কমই বেরিয়েছে। প্রসঙ্গত তিনি 'ফকিরচাঁদ' ছদ্মনামে কবিতা এবং শিশুবিভাগে গল্প লিখতেন। তাঁর অসংখ্য লেখা ছড়িয়ে আছে তিরিশ বছরের 'অদল বদল'-এর পাতায়। প্রতি সংখ্যায় থাকতো তাঁর 'খবর নিয়ে জাবর কাটা', যা ছিল পাঠকদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি পাঠ্যবিষয়। বেশ কিছু গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধও তিনি লিখেছেন। পুস্তকাকারে প্রকাশিত তাঁর তিনটি মাত্র বইয়ের খবরই আমার জানা- 'নস্যি দিয়ে বন্ধু পেলাম টাক ডুমা ডুম ডুম' এবং 'গল্পের রঙ মশাল' বই দুটি শিশু-কিশোরদের জন্য। এছাড়া বড়োদের জন্য 'আমার ভালবাসার মেয়ে'।
উপন্যাস হিসাবে আছে 'প্রেম নাম্বার থ্রি', 'প্রেম নাম্বার ফোর', 'অবৈধ সন্তান' ইত্যাদি। এছাড়া তাঁর কিছু গল্পও প্রকাশিত হয়েছে। 'অর্ধ শতাব্দীর বর্ণ পরিচয়' নামে তাঁর একটি গবেষণামূলক গ্রন্থও ধারাবাহিক ভাবে ছাপা হয়েছে। তাঁর সমস্ত রচনা সংগ্রহ করে রচনাবলি হিসাবে প্রকাশ করলে তা হবে দলিত সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ- যা উত্তরপুরুষের জন্য পথনির্দেশক হিসাবে বিবেচিত হবে। 'অদল বদল'-এর সর্বশেষ সংখ্যাটিতে (ডিসেম্বর, ২০১৫) বিমলদার লেখা সম্পাদকীয় থেকে কয়েকটি পঙ্ক্তির উল্লেখ করছি-
"যুদ্ধক্ষেত্রে ক্লান্ত অথবা মৃত সৈনিকের জায়গা নেয় নতুন সৈনিকরা। ক্লান্ত সৈনিকদের বিশ্রামের সুযোগ অথবা শূন্য পদের সুযোগ করে দেয় নতুন সৈনিকরা- যুদ্ধ কিন্তু চলতেই থাকে। এই পত্রিকার বিশ্রাম নেবার পালা এবার। দেখা যাক নতুন সৈনিকরা কীভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। এত বছরে আশা করি বেশ কিছু সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, কবি আর পাঠক তৈরী করতে পেরেছে এই পত্রিকা। আজ তারই পরীক্ষা তাঁদের সামনে।"
দুঃখের বিষয় বিগত বছরগুলিতে সেই পরীক্ষার আশাজনক ফলাফল আমরা বিশেষ দেখতে পাইনি। ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকেই পত্রিকা প্রকাশ করে প্রচেষ্টা চালালেও তা 'অদল বদল'-এর শূন্যস্থান পূরণ করতে ব্যর্থ। বাংলা দলিত সাহিত্যের কারিগর বিমল বিশ্বাস- আমাদের বিমলদার সেই আশা পূরণ হওয়াটা এখনো বোধ হয় অনেক দূরে! প্রসঙ্গক্রমে জানাই 'অদল বদল' পত্রিকাতেই ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হতে থাকা আমার উপন্যাস "জলমাটির মানুষ" শেষ সংখ্যাটি পর্যন্ত প্রকাশিত হবার পরে ওই উপন্যাস অসমাপ্তই থেকে যায়। পত্রিকা নেই, লেখার জন্য তাগাদা নেই, তাই লেখাও আর হয়ে ওঠেনি।
বিমল বিশ্বাস আমার মামা। একমাত্র মামা। বাংলায় যে প্রবাদ বাক্যটি চালু আছে “মামা বাড়ি ভারী মজা......” সেটা যে কতো খাটি এরকম মামা না হলে কারও ভাগ্যে ওরকম সুখ জোটে না। সে ব্যাপারে আমি ভীষণ ভাগ্যবান। ছোটবেলা থেকেই আমি ওনার কোলেপিঠে মানুষ। অফিসের বড়বাবু, মাসি-পিসি, কাকা-খুড়ি সব সংসারের উনি সর্বময় কর্তা। কত গুরু দায়িত্ব, সে সবের তোয়াক্কা আমি করতাম না, বুঝতামও না। শুধু জানি উনি আমার মামা।
উনি আমার জীবনে কতটা জুড়ে আছেন সেটা একটা ছোট্ট উদাহরণ দিলে পাঠকরা আরও ভাল বুঝতে পারবেন। আমার বাবা যখন মারা যায় এবং তার মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল আমি তখন বাবার বিয়োগ ব্যথায় কাঁদছিলাম। উনি আমাকে জড়িয়ে ধরে ধরা গলায় বললেন। “কাঁদিস নারে গনু। আমিতো আছি”। কি এক অদ্ভুত স্পর্শে আমার কান্না বন্ধ হয়ে এসেছিল। মামীমা (যিনি আজ আর নেই) পাশে ছিলেন। সেই অপার্থিব স্নেহসুখ আজও আমার একই ভাবে জড়িয়ে ধরে আছে। বাবার জায়গাটা উনি সম্পূর্ণ দখল করে নিয়েছিলেন। উনি কখনও শাসন করতেন না। কিন্তু এমন একটা লক্ষণরেখা আমাদের জীবনে টেনে দিয়েছিলেন সেটা পার হবার ইচ্ছে বা সাহস কোনটাই আমাদের ছিল না। আজ এতবছর বয়সে এসে বুঝি এ জিনিস করতে নিজেকে কতটা সংযমী হতে হয়।
এবার আসি লেখার বিষয়ে। ‘অদল বদল’ অনেক দিন ধরেই চলছিল। আমি লিখতে জানতাম না তাই লেখার প্রশ্নই ওঠে না। উনি কিন্তু আমায় খোঁচাতেন, বলতেন, ‘নিজেদের একটা পত্রিকা’। তোরা কেন এগিয়ে এসে লেখালেখি করিস না। আমি পত্রিকা দু-চারটে বেচলেও লেখালেখির কথা ভাবতেই পারতাম না।
হঠাৎ করে একবার অফিসের কাজে আন্দামান যেতে হয়েছিল। প্রায় দিন কুড়ি সেখানে ছিলাম। সেটা চুরানব্বই সাল হবে বোধহয়। তখন এত মোবাইলের উন্নত পরিষেবা ছিল না। বাড়িতে ফোনও তখন আসে নি। স্ত্রী তখন সন্তান সম্ভবা। মনে মনে একটা টেনশন কাজ করতো। রোজকার খরচ লেখার জন্য একটা খাতা কিনেছিলাম। দিনের শেষে হোটেলে ফিরে সারাদিনের খরচ লিখতাম। আর পিছনের পাতায় আন্দামান বেরোনোর সামান্য সহজ বর্ণনা লিখে রাখতাম। ইচ্ছা ছিল বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে শোনাবো। TV দেখার নেশা ছিল না বলে লেখাটা একটু বড়ই হয়েছিল।
যেদিন আন্দামান থেকে বাড়ি ফিরে এলাম দেখি মামা এবং মামিমা দুজনেই এসেছেন। ওনারা প্রায়ই আসতেন। শুধু আমাদের বাড়ি নয়। পাড়ায় বেশ কয়েকটা বাড়িতে যাওয়া আসা করতে হতো। বিমলবাবু এসেছেন অথচ তারা খবর পাননি এটা ঘটলে বাবা-মাকেও অনুযোগ শুনতে হতো।
তা বেশ, মামা বসে বললেন, “হ্যাঁরে তুই আন্দামান ঘুরে এলি। এতো সুন্দর জায়গা। সেটা নিয়েও তো লিখতে পারিস”। ব্যাগ থেকে জিনিস পত্তর বের করতে করতে খাতাটাও বেড়িয়ে এলো। সেটা টেবিলের উপর রাখলাম। উনি খাতাটা তুলে নিলেন। আমি কিসের একটা লজ্জায় সেখান থেকে সরে গেলাম। মিনিট দশেক বাদে উনি ডেকে বললেন, “সামনের রবিবার এই লেখাটা ফ্রেস করে অবশ্যই দিয়ে আসবি। আমি ঠিকঠাক করে পরের মাসে অবশ্যই ছাপবো। এটাই আমার লেখালেখির প্রথম পাঠ। তারপর যত গল্প লিখেছি সবই ওনার চাপে। এমনকি ট্রেকিং করতে গেলে, যখন মামা মামীমাকে প্রণাম করতে যেতাম মামা একটা কথাই বলতেন-খাতা কলম নিয়েছিস তো। জীবনের এই একটা স্বাদ আমার অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। পারলে আমায় একবার ট্র্যাকিং-এ নিয়ে যাস। সব ভেতরের চোখ দিয়ে দেখবি, পুঙ্খানুপুঙ্খ লিখে আনবি। আমি পড়বো। আমি তোর চোখ দিয়ে হিমালয় দেখবো। ছাপবো।
মামা একটা জিনিস বারবার বলতেন লিখতে গেলে কয়েকটা জিনিসের উপর পড়াশুনা ভীষণ দরকার। ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন, নৃতত্ত্ববিজ্ঞান এবং সাহিত্য। চেষ্টা করতাম সে সব পড়ার পর সে সব নিয়ে ওনার সঙ্গে আলোচনা করতে।
মামার বাড়িতে ছিল সবার জন্য অবারিত দ্বার। চার থেকে চুরাশি মামা সবার সঙ্গে এত সহজভাবে মিশতে পারতেন এবং এত তাড়াতাড়ি প্রিয় হয়ে যেতে পারতেন- এমন মানুষ আমি আজও দেখিনি।
বয়স বেড়ে গেলেও ওনার স্মৃতি শক্তি ছিল প্রবল। আগের দিন আলোচনা কোথায় শেষ করেছিলাম সেটা উনিই ধরিয়ে দিতেন। “ইতিহাসের ভিতর ইতিহাস” খুঁজে খুঁজে পড়বি। আমাদের ইতিহাস অনেক সত্যি মিথ্যে দিয়ে লেখা। সত্যি গুলোকে খুঁজে খুঁজে না পড়লে দেশটাকে চিনবি কি করে, আর না চিনলে লিখবি কি করে?
মামা একবার বলেছিলেন, জানিস গণু, রবি ঠাকুরের নৃতত্ত্ববিজ্ঞানটা খুব ভালোভাবে পড়া ছিল। এই কবিতাটা পড়লেই বুঝতে পারবি। “রণধারা বাহি জয়গান গাহি.......” চারটে লাইন মামা আবৃত্তি করে শোনালেন ভারি সুন্দর আবৃত্তি করতেন। বললেন, এই চারটে লাইনেই উনি ভারতে আর্য-অনার্য mixing টা সম্পূর্ণ বুঝিয়ে দিয়েছেন। মামা আবার বললেন, ছোটদের কবিতা “পুরাতন ভৃত্য” দুটো লাইন আছে “সে বছর ফাঁকা পেনু কিছু টাকা করিয়া দালালগিরি ...........” এ দুটি লাইনে উনি বাঙ্গালিদের সর্বাত্মক চরিত্র তুলে ধরেছেন। বাঙালিরা জানে চাকরি আর পূজা পার্বণ। উনি কিন্তু সরাসরি বললেন না। ঘুরিয়ে বললেন। এটাই হলো সাহিত্যের মাহাত্ম্য। সাহিত্য স্লোগান নয়। তুই যা বলতে চাস। সেটা হবে সাহিত্যের ঢঙে। তবেই সেটা গল্প হবে নতুবা প্রবন্ধ হয়ে যাবে।
উনি বলতেন, একটা লেখা লিখে পাঁচ-সাতদিন ফেলে রাখবি। তারপর নিজে পাঠক সেজে সেই লেখা পড়বি। দেখবি কোথাও পচন ধরছে কি না। প্রয়োজনে সেই অংশটা কেটে বাদ দিবি আবার প্রয়োজনে দরকার মতো সংযোজন করবি।
মামা খুব ভাল নাটক করতেন। ওনার অপিসের নাটকে আমরা ভাই বোনেরা দলবেঁধে দেখতে যেতাম। সে সব ভারি মজার দিন ছিল। দেখতাম ওনার অধ্যবসায় আয়নার সামনে, ফ্রিজের সামনে, খাবার টেবিলে বসে মামীমাকে সামনে রেখে ডায়লগ বলে যাচ্ছেন। মামীমার মুচকি হাসি আমাদের মুখে ছড়িয়ে পড়তো। উনি যখন যে কাজটা করতেন সেটার মধ্যে সম্পূর্ণ ডুবে যেতেন। বলতেন, যদি কখনও বাথরুম, ড্রেন সাফ করিস সেটাও সেই ভাবে করবি। কাজের কোনও জাত হয় না।
যখন তখন ওনার ঘরে ঢোকা, কথাবার্তা বলা, বিরক্ত করাতে উনি কখনই বিরক্ত হতেন না। ওনার লেখাতেও কোনও প্রভাব পড়তো না। খেয়াল করে দেখেছি উনি যখন লিখতেন অথবা পড়তেন তখন এতটাই তন্ময় হয়ে যেতেন বাহ্যিক কোন কিছুই ওনার গোচরে থাকতো না। উনি যখন মুখ তুলে চাইতেন দেখে মনে হতো উনি এই বুঝি ধ্যান থেকে উঠে এলেন।
মামা ছিলেন দলিত সাহিত্যের ও সমাজের একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি। জীবনটাই কাটিয়ে দিয়েছেন দলিত সাহিত্যের সেবায় ও দলিত সমাজের উপকারে। দেখেছি মহাশ্বেতা দেবী ওনাকে কি ভীষণ স্নেহ করতেন। আমি মাঝে মাঝে বলতাম- “মামা আপনার এত ভাল কলম, আপনি লেখাগুলোকে কেন সর্বজনীন করছেন না!” উনি আমার দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসতেন, বুঝতাম উনি নিজের সংকল্পে অটল। আমার কথায় রাগ না করে মজাই পাচ্ছেন। উনি আমাকে এতটাই স্নেহ করতেন যে আমার অনেক অনধিকার চর্চা গায়ে মাখতেন না স্নেহের পরশে মাফ করতেন।
আশি বছর বয়সে দেখেছি ওনার নতুন জিনিস শেখার কি প্রখর আগ্রহ। দর্শন সম্বন্ধীয় বা মনোবিজ্ঞান সম্বন্ধীয় কোন কথা বললেই উনি কলম খাতা এগিয়ে দিয়ে বলতেন। ডায়লগটা এখানে লিখে দেতো।
যে লোকটা চাকরি থেকে অবসরের পর খুব সহজে ঘুরে ফিরে, নাতিনাতনিদের সঙ্গে অতি সুখের জীবন কাটাতে পারতেন সেই লোকটি স্বইচ্ছায় বৃদ্ধ বয়সে “অদল বদলের” জন্য কি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। এই দৃষ্টান্ত আমাদের জীবনে বেশ কিছুটা পড়েছে। আমাদের পরিবারের ছোটরা আজ এত সুপ্রতিষ্ঠিত তার একটা প্রকট প্রভাব আছে বলে আমার ভীষন বিশ্বাস।
যখন ছোটরা গিয়ে দেখতো প্রিয় মজার দাদু এত এত বই খাতার মধ্যে ডুবে আছে। তাদের মনের মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু কাজ করেছে বলে আমার মনে হয়। আবার খাবার টেবিলে সেই দাদু নানা বিষয় নিয়ে শিশুদের বোঝার মতো করে সব বোঝাতেন। আবার শুধু ছোটদের জন্য গল্প লিখে “অদল বদলে” ছাপতেন, সেই দাদুকে কাছ থেকে দেখে এবং পেয়ে তারা হয়তো অনেক কিছু শিখেছে যা বইতে পাওয়া যায় না। আমার ছেলেকে দেখেছি “অদল বদল” বাড়িতে এলেই খুঁজে পেলে দাদুর লেখা পড়তো। ছোটদের সামনে যদি এরকম জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত তুলে ধরে রাখা যায়- তার তো একটা সু-এফেক্ট তার জীবনে পড়বেই।
মামা ভীষণ গ্রাম ভালবাসতেন। বাংলাদেশের গ্রাম্য জীবন ছেলেবেলা ওনাকে আচ্ছন্ন করে রাখতো। তাই উনি বারবার ছুটে যেতেন নিজের ভাইয়ের বাড়ি বনগাঁয়। চাষী ও সমবর্গের মানুষদের সঙ্গে ছিল সুমধুর সম্পর্ক।
আমার ছোটবেলা থেকে বড়বেলা পর্যন্ত মামা প্রায় প্রতি রবিবার আমাদের বাড়িতে তাস খেলতে আসতেন। ওনার যথেষ্ট তাসের নেশা ছিল। সঙ্গে আসতেন রাশিয়ার এম্বেসেডর দীনেশ বিশ্বাস এবং স্বনামধন্য কার্ত্তিক চন্দ্র মল্লিক। খেলার অন্য সাথীরা যারা ছিলেন তাদের মধ্যে দোকানদার, সেলুনের নাপিত, অতি সাধারণ মানুষজন। দেখেছি উনি কি সহজে ওদের সঙ্গে মিশে যেতে পারতেন। ওরা ভাবতো মামা ওনাদেরই একজন কাছের মানুষ।
যে লোককে দেখেছি অফিসে কী গুরুগম্ভীর ব্যক্তিত্ব নিয়ে অফিস করছেন। আবার বিকেলে দেখেছি সমবয়সীদের সঙ্গে তাস খেলছেন। আবার সেই মানুষটাই রাত আটটার সময় আমাদের নিয়ে বাজি ফাটিয়ে আনন্দে মেতেছেন। রাতের বেলায় সবাই মিলে খেতে বসে কতো মজার মজার গল্প করছেন। আবার রাত বেশী হলে বিভিন্ন পারিবারিক নানা সমস্যার সমাধান করতেন। মানুষের এই মেলামেশার বিশাল পরিধি এটা দেখা বেশ দুষ্কর।
মামার স্মৃতি শক্তি ছিল প্রবল। বয়স বেড়ে গেলে মানুষের স্মৃতি শক্তি দুর্বল হয়ে যায়। সেটা উনি ভুল প্রমাণ করেছেন। নিজের কাজের ও লেখালেখির সমস্ত কিছুই থাকতো ওনার নখদর্পণে। বর্তমান জগত সম্বন্ধে খোঁজখবর রাখতেন ও চর্চা করতেন নিয়মিত। শেখার আগ্রহ ছিল প্রবল। নতুবা আশি বছর পার করে কেউ বলে, গণুরে আমারে একটা ল্যাপটপ কিনে দে।
-আপনার তো আঙুল কাঁপে।
-কাঁপুক। কাঁপা আঙ্গুলে কাঁপতে কাঁপতে ল্যাপটপ চালাবো।
মামাকে দেখেছি দুঃখটাকে খুব গ্রহণ করতে। ছিল না কোনও বহিঃপ্রকাশ। ছোট ছেলে আমাদের সবার সবচেয়ে প্রিয় প্রদীপ যখন মারা গেল তখন দেখেছি এক আশ্চর্য মৌনব্রত নিয়ে তিনি চুপ করে বসে থাকতেন। আর দেখেছি যখন “অদল বদল” বন্ধ হয়ে গেল তিনি তখন একই রকম দুঃখ পেয়ে নীরবে বসে থাকতেন। মুখে কোন বহিঃপ্রকাশ ছিল না।
মামা ছিলেন খুব রসিক মানুষ। ওনার রসবোধ ছিল খুবই উচ্চ মার্গের। ওনার ব্যাঙ্গাত্মক লেখা “খবর নিয়ে জবর কাটা” সে তো ইতিহাস হয়ে গেছে। বাংলা সাহিত্যে ওটা একটা নতুন ধারার লেখা ছিল। বর্তমান রাজনীতির খবর অথবা ঘটনাগুলোকে নিয়ে উনি যে রঙ্গ-তামাশা করেছেন সেটা উচ্চ প্রশংসার দাবী রাখে। আমাকে দিয়ে উনি কয়েকটি রম্য রচনা লিখিয়েছিলেন। লেখা নিয়ে গিয়ে মামাকে যখন দেখাতাম, আমার মাঝে মাঝে মনে হতো দু-একটা জায়গায় হয়ত ছ্যাবলামী হয়ে গেছে। উনি পড়ে বলতেন, নারে, একদম ঠিক আছে। রবি ঠাকুরের কবিতা বলতেন, “কোনদিন এত বুড়ো হব নাকো আমি, হাসি ঠাট্টারে কব ছ্যাবলামী”। এটাই ছিল ওনার জীবন দর্শন।
কোথায় যেন পড়েছি ‘জ্ঞানের আরেক নাম প্রজ্ঞা’। শুধু জ্ঞানী হলেই তাকে প্রজ্ঞাবান বলা যায় না। তার সঙ্গে থাকতে হবে আধ্যাত্মিক চেতনা, বিশ্বজনীন সম্পর্ক, অনেক কিছুই। শুধু আমি জোর গলায় বলতে পারি আমার মামা একজন খুব উঁচু দরের প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি। নমঃশুদ্র সমাজে জন্ম না হলে উনি হয়তো অনেক প্রচার পেতেন।
আমার বাবা শ্রীবিমল কান্তি বিশ্বাস-এর সম্বন্ধে যদি আমাকে মেয়ে হিসেবে কিছু লিখতে হয়, তাহলে আমার ছোটবেলা থেকে শুরু করতে হবে। বাবা যখন কোচিনে customs officer হিসেবে কাজ করতেন তখন আমার জন্ম হয়। সব বাচ্চাদের মতোই সেই সময়কার কথা আমার মনে নেই। কোচিন থেকে বাবা কোলকাতায় আসার পর আমার জ্ঞান হয় এবং তার পরেরকার কথা আমার মনে পড়ে। কোলকাতায় আমরা ঢাকুরিয়ার একটা বাড়িতে ভাড়া থাকতাম। বাবা, মা, আমরা তিন ভাই বোন ও আমাদের সেজ ও ছোট পিসি। আমাদের বাড়িতে সব সময়ই আত্মীয়স্বজনদের আসা-যাওয়া লেগেই থাকতো। আমাদের ঠাকুরদা গোপালচন্দ্র বিশ্বাস ও বাবার ভাইপোও আমাদের সাথেই থাকতেন। বাবার গ্রামের বা বাবার যে কোনও আত্মীয়স্বজনের কোনও প্রকার দরকার লাগলে বা তারা কোন প্রকার অসুবিধায় পড়লে আমাদের বাড়িতে চলে আসতো। বাবা যত সম্ভব সবাইকে সবভাবে সাহায্য করে দিতেন। এই সাথে আমার মায়ের কথা না বললে খুবই অন্যায় হবে। বাড়িতে অতিথি এলে তার সব রকমের দেখাশুনা ঘরের গৃহিনীকেই করতে হয়। মনে আছে আমি সবসময় আমার মাকে দেখেছি সবাইকে খুবই যত্ন করতে। মা কখনই বাবার এই সমাজসেবাতে রাগ করতেন না বা বিরক্তি প্রকাশ করতেন না।
আমার বাবা, দাদুর একমাত্র পুত্রসন্তান এবং পাঁচ ভাইবোনদের মধ্যে সব থেকে বড়। আমার জন্মের আগেই আমার বড় ও মেজ পিসির বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো। আমরা যখন কোলকাতার বাড়িতে ছিলাম তখন বাবা, সেজ ও ছোট পিসির বিয়ে দেন। দাদা হিসেবে বোনদের বিয়ে দেবার দায়িত্ব বাবা সম্পূর্ণ করেছিলেন পালন করেছিলেন।
এরপর বাবার বদলি হয় পন্ডিচেরীতে (Pondichéry) ওখানে গিয়ে বাবা আমাদের দুই বোনকে ওখানকার Convent এ ভর্তি করে দেন। আমরা বাবার কাছেই লেখাপড়া শিখেছি। বিকেলে office থেকে ফিরে এসে, হাত মুখ ধুয়ে বাবা আমাদের পড়াতে বসাতেন। বাবা বিশেষ একটা বকাবকি করতেন না, কিন্তু তবুও আমরা বাবাকে একটু ভয়ই পেতাম। পন্ডিচেরীতে আমার ছোট ভাই প্রদীপ, যে আজ আর আমাদের মধ্যে নেই তার জন্ম হবার পর পরই আমরা বাবার সাথে মাদ্রাজ চলে আসি।
মাদ্রাজে আমরা একটা বিশাল বাড়িতে থাকতাম। বাড়ির সামনে-পেছনে অনেক খালি জায়গা ছিল, চারিদিকে boundary wall এ ঘেরা। বাবা ওখানে রোজ সকালে বাগান করতেন। মা এবং আমরাও বাবার সাথে বাগান করতাম। বাগানে অনেক রকম শাকসবজি লাগিয়েছিলেন বাবা। আমাদের দাদুও থাকতেন আমাদের সাথে। দাদুর ফসল উগানো সমন্ধে খুব ভালো জ্ঞান ছিলো। বাবা ও দাদু মিলে পেপে গাছ, লেবু গাছ, কলাগাছ, ডালিম গাছ ইত্যাদি লাগিয়েছিলেন। ওনাদের যত্নে শাকসবজি অনেক ফলতো। যখন সবজি তোলা হতো, বাবা অবশ্যই বাবার বন্ধুদের বাড়িতে বিলি করতেন। মাদ্রাজের বাড়িতে বাবা Garage এ অনেক মুরগিও পুষেছিলেন।
বাবাকে কখনই আমরা চুপচাপ বসে থাকতে দেখিনি। বাড়িতে বাবা খরগোশ, কাঠবিড়ালি, পাখি, কুকুর সব পুষতেন। ছুটির দিন হলে বাবা আমাদের ভোরবেলা সমুদ্রে স্নান করাতে নিয়ে যেতেন। আমাদের বাড়ির পেছনে, Mr. Sarkar বলে এক বাঙালি পরিবার থাকতো। তাদের বাড়ির বাচ্চারা ও আমরা তিন ভাইবোন স্নান করতে যেতাম। বাবা সবাইকে সাঁতার শিখিয়েছিলেন। ঘরে ফিরে এসে সবাই মিলে মার বানানো গরম গরম ইডলি, দোসা খাওয়া হতো। বাবা সবসময়ই সবাইকে সাথে নিয়ে চলতে ভালোবাসতেন। কখনই শুধু নিজের পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। কোথাও বেড়াতে যেতে হলে সব বন্ধুবান্ধবদের সাথে করে তারপরই যেতেন। রবিবার বিকেলে বন্ধুদের সাথে তাস খেলা ছিলো বাবার নেশা।
মাদ্রাজে প্রায় পাঁচ-ছয় বছর থাকার পর বদলি হলো কোলকাতায়। কোলকাতায় আমাদের চার ভাইবোনের লেখাপড়া ও গতানুগতিক জীবন চলতে থাকে। ধীরে ধীরে দিদির বিয়ে হয়। আমি ডাক্তারিতে ভর্তি হই। এই সময় বাবা Salt Lake-এ বাড়ি বানানো শুরু করেন। এতসব দায়িত্ব একসাথে, তার উপর office-এর বিশাল দায়িত্ব সব মিলে বাবার মন ও শরীরের উপর খুব চাপ পড়ে। বাবা তখন খুব depression-এ চলে গিয়েছিলেন। বাবাকে আমরা কখনই অসময়ে শুয়ে থাকতে দেখিনি। সর্বক্ষণ বাজারঘাট, আত্মীয়-বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে হৈচৈ করা, বেড়াতে বেরোনো, এইসব নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। কিন্তু এই depression হবার পর বাবা ওষুধ খেয়ে সারাদিন সারারাত ঘুমিয়ে থাকতেন। এর মধ্যে আবার বাবার দিল্লীতে transfer হলো। এই সব মিলিয়ে সেই সময় বাবার খুব খারাপ সময় গিয়েছিলো।
যাইহোক ধীরে ধীরে বাবা সামলিয়ে নিয়েছিলেন। দিল্লীতে প্রায় ২-৩ বছর থাকার পর কোলকাতায় transfer নিয়ে চলে আসেন। তখন আমরা সবাই বড় হয়েগেছি। আমার ডাক্তারী পাশ করে বিয়ে হয়ে গেছে। বড় ভাইয়েরও বিয়ে হয়েগেছে। ছোট ভাই প্রদীপ কাশ্মীরে Engineering পড়তে গিয়েছিল। পাশ করে প্রদীপের আর বাড়ী ফেরা হয়নি। 58 বছর বয়সে বাবা চাকরি থেকে Joint chief Controller of Imports & Exports - Eastern Zone থেকে retire করেন।
অবসর নেবার আগে থেকেই বাবা “অদল বদল” পত্রিকা শুরু করেন। এই পত্রিকাটি বাংলা দলিত সাহিত্যে এক অনবদ্য পত্রিকা হিসাবে মানা যেতে পারে। এর আগে আমাদের সমাজে এ রকম পত্রিকা- যাতে আমাদের সমাজের লোকেরা, আমাদের নিজের কথা নিজের ভাষায় লিখেছে- এরকম বেরোয়নি। এই পত্রিকাই ছিল অবসর নেবার পর বাবার সঙ্গী। সারাদিন বাবার এটাই চিন্তা ছিল কী করে আমাদের সমাজের লোকদের একত্রিত করা যায়, সমাজের উন্নতি করা যায়। বাবাকে দেখেছি অনেক বাচ্চাদের টাকা দিয়ে সাহায্য করতেন, যাতে তাদের পড়াশুনা আটকে না যায়। বাবার, মার খুবই ইচ্ছা ছিলো বাবার গ্রামের বাড়ি আংরাইলে একটা বাচ্চাদের স্কুল খুলতে, কিন্তু শেষ অবধি সেটা আর হয়ে ওঠেনি।
“অদল-বদল” পত্রিকা ছিল বাবার বেঁচে থাকার উৎস। ধীরে ধীরে বয়সের সাথে সাথে বাবার পক্ষে একা পত্রিকা চালানোর ক্ষমতা কমে আসছিল। বাবা একজন দায়িত্বশীল লোক খুজছিলেন যিনি magazine টা চালিয়ে নিতে পারবেন, কিন্তু সেরকম কাউকে না পাওয়াতে বাবা খুবই দুঃখ ও বেদনার সাথে magazine বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। Magazine বন্ধ হওয়াতে বাবা আবার depression এ চলে যান। 28 বছর একা হাতে সমাজের উন্নতির কথা ভেবে, দিনরাত বসে, সবার কাছে লেখা চেয়ে, সেগুলো Correction করে, সুন্দর করে সাজিয়ে, প্রেসে পাঠিয়ে বাঁধিয়ে, গ্রাহকের ঠিকানা লিখে, post office-এ পোস্ট করা এবং পরে সবাই পত্রিকা ঠিকমতন পেয়েছে কিনা খোঁজ নেওয়া এত দায়িত্ব আর কেউ নেবার জন্য তৈরি ছিলেন না।
আজ বাবার রয়স ৯০ এর ঊর্ধে। আমার মা ও গত বছর চলে গেছেন। বাবার আর একা একা নিজে ওঠারও শক্তি নেই। সারাদিনই প্রায় শুয়েই থাকেন, আর কত কী যে ভাবেন কে জানে। যাঁর কলম দিয়ে এত লেখা বেরিয়েছে তিনি কি কিছু না ভেবে শুধু শুধু শুয়ে থাকতে পারেন? মাঝে মাঝে যখন বাবাকে দেখতে কোলকাতা যাই আমি জিজ্ঞাসা করি “বাবা তুমি শুয়ে শুয়ে কী ভাবো?” বাবা বলেন, “আমার লাটমেরচর ধানক্ষেত, গ্রামের নীল আকাশ, বর্ষায়ভরা নদী, শরতের সাদা কাঁশফুলে গ্রামের মাঠঘাট সব ভরা, প্রথম বর্ষার মাটি ভেজার, সেদো গন্ধ, শীতের দিনের কুয়াশাভরা সকাল সন্ধ্যা.......... বাবা, আমার মা।
আমার বাবা শ্রীযুক্ত বিমল কান্তি বিশ্বাস ১৯৮৬ এর মার্চ মাসে ‘অদল-বদল’ পত্রিকা প্রকাশ করা শুরু করেন।
মিডিয়ার অনেক ক্ষমতা। সব রাজনৈতিক দল, সরকার, বড় বড় প্রতিষ্ঠান, সবারই আলাদা আলাদা মুখপাত্র থাকে। CPM এর ছিল ‘গনশক্তি’, শিবসেনার ‘সামনা’, তৃনমূল কংগ্রেসের “জাগো বাংলা” ইত্যাদি। বাবা সাহেব আম্বেদকরও দুটো পত্রিকা বের করেছিলেন, যার নাম “মুক নায়ক” ও “বহিষ্কৃত ভারত”।
যে কোন পত্রিকাই তার নিজের কথা বলবে সেটাই নিয়ম, সেটাই তার উদ্দেশ্য। আমাদের কথা বলার কেউ তেমন ছিলনা। আমাদের কথা বলার জন্যে, আমাদের কথা সবার কাছে পৌঁছে দেবার জন্যে ‘অদল-বদল’ পত্রিকার জন্ম হয়। আমাদের পত্রিকার caption ছিল-
“ভাষার জন্মের পর থেকে কিছু লোকের
অনেক কথা অনেক ভাবে বলা হয়েছে- বলা হচ্ছে।
তা সত্ত্বেও অনেক লোকের অনেক কথা
তার নিজের ভাবে আজও বলা হয়নি, বলা হচ্ছে না।
একটু আধটু যা বলা হচ্ছে
তা অনেকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় নি,
পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে না।
তেমনি কথা বলার জন্য “অদল-বদল”,
তেমনি কথা শোনবার জন্য “অদল-বদল”,
তেমনি কথার বাহক এই-“অদল-বদল”।
মিডিয়া নিরপেক্ষ নয়। মিডিয়া যদি নিরপেক্ষ হত, তাহলে দেশের অনেক সমস্যাই সমাধান করা যেত। বাবার চাকরী জীবনের শেষে এসে মনে হয়েছিল আমাদের দলিত সমাজের একটি মুখপাত্রের খুবই প্রয়োজন। আর এই প্রয়োজনের তাগিদেই ‘অদল-বদল’ এর জন্ম।
আমার বাবা চিরকালই একটু দুঃসাহসী প্রকৃতির। ঠাকুরদা ছিলেন পুলিশের দারোগা। লুকিয়ে দাদুর বন্দুক নিয়ে শিকার করা, দাদুর ঘোড়ায় করে ঘুরে বেড়ানো, মাছ ধরা, পাখি ধরার স্বভাব ছিল। দেশ ভাগের সময় বাবা যখন কোলকাতায় মেসে থেকে MA পড়তেন, তখন রিফিউজি ক্যাম্পে বন্ধুদের সাথে গুড়, মুড়ি, চিড়ে বিলি করে বেড়াতেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ হওয়ার সময় বাবার কোলকাতায় পোস্টিং ছিল। সেই সময় অনেক লোককে অনুরোধ করে প্রচুর জামা-কাপড়, চাল-ডাল জোগাড় করেছিলেন। সেগুলো ছুটির দিন গিয়ে শরণার্থী শিবিরে বিলি করে বেড়াতেন। বাড়িতে কুকুর পোষা, পাখি পোষা, খরগোশ পোষা বাগান করায় অনেক আগ্রহ ছিল। এইসব কাজে বাবা ভালই পারদর্শি ছিলেন। বাবার সাথে সাথে মাও এই সব কাজে বেশ উৎসাহী ছিলেন।
১৯৮৬ এর মার্চ মাসে ‘অদল-বদল’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। বাবার এই প্রচেষ্টায় যার সাহায্যের কথা প্রথমেই বলা দরকার তিনি সুনাম ধন্য লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী। নতুন পত্রিকা, ভালো লেখার খুবই অভাব। মহাশ্বেতা দেবী ওনার লেখা কিছু বই বাবাকে ধরিয়ে দিয়ে বললেন-“আমার বই কেউ কিনে পড়েনা। তুমি তোমার পত্রিকায় এগুলে ছাপতে পারো”। একটা ভালো লেখা প্রতিমাসে স্থায়ী ভাবে পাওয়া গেল।
মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস- বাবার চাকরী আর ম্যাগাজিন দুটোই চললো। শ্রীনগরে আমার ছোট ভাই প্রদীপ R.E. College এ Engineering পড়তো। পত্রিকা ভারতবর্ষের অনেক শহরে পাঠানো হত। প্রদীপের কাছেও পাঠান হত। ডাল লেকের পাশে যে সব ম্যাগাজিনের stall Tourist দের কাছে কাগজ বিক্রি করতো, তাদের দিয়ে আসতো। আসা-যাওয়ার পথে কিছু বাঙ্গালী Tourist ঐ পক্রিকা নিত। পড়ার সাথে সাথে প্রত্যেক মাসে ওর এই একটা কাজ হয়েছিল পত্রিকা stall এ পৌঁছে দেওয়া, আর যাই বিক্রি হত, সেই পয়সা তুলে আনা। এই জাতীয় পত্রিকা বিক্রি করা খুবই মুশকিল। কিন্তু সেই সময় বিজ্ঞাপনের সাহায্যে পত্রিকার কোনো অসুবিধা হয় নি। লেখাও আসতে থাকলো, কিছু ভালো কিছু মন্দ-সব মিলিয়ে।
বাবা দিনে অফিস করতেন আর অফিস থেকে ফিরে “অদল-বদলের” কাজ করতেন। এইভাবে পত্রিকার এক বছর পূর্ণ হলে আসামের স্বনামধন্য লেখক নবকান্ত বরুয়া মহাশয় ও মহাশ্বেতা দেবীকে নিয়ে Salt Lake এ BD School এর মঞ্চে একটা অনুষ্ঠান করা হয়। ঐ অনুষ্ঠানে অদল-বদলের শুভাকাঙ্খী অনেকেই এসেছিলেন। অনুষ্ঠানের পর প্রদীপ চলে গেলো R.E. College, Srinagar এ তার পড়া শেষ করতে। তার এক মাস পরেই প্রদীপের মৃত্যুর খবর এল। বাবা-মার দুজনের কাছেই এ ছিল এক বিরাট অভিশাপ। মা কোনোদিনই আর এই শোক থেকে বেরোতে পারেন নি। কিন্তু বাবা অদল-বদল কে আরো বেশী করে আকড়ে ধরে বাঁচার পথ খুঁজে চলেছিলো। শ্রীনগরে “অদল-বদল” পত্রিকা যাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো।
এই সময় আমাদের পরিচিত সমাজের অনেক গণ্যমান্য মানুষ বাড়ীতে এসে বাবাকে “অদল-বদল” পত্রিকা চালিয়ে যাবার উৎসাহ দিয়েছিলেন। তার মধ্যে মহাশ্বেতা দেবী উল্লেখ যোগ্য। মান্যবর কাশীরামজীও এসেছিলেন- মনে পড়ে। এইসব মানুষের উৎসাহে বাবা আবার কলম ধরলেন। বাবার এক দু মাস পত্রিকা প্রকাশ করার মত মানসিক অবস্থা ছিল না। তারপর আবার পুরো উৎসাহ নিয়ে কাজ শুরু করলেন। তখন বোধহয় ওটাই বাবার একমাত্র বেঁচে থাকার প্রেরণা ছিল। লেখা জোগাড় করা, তারপর correction করা, প্রেসে পাঠানো, কাগজ কেনা, Cover Design করা, Proof check করা, গ্রাহকদের কাছে পত্রিকা ঠিকমত পৌঁছে দেওয়া, একটা পত্রিকা প্রকাশ করার অনেক কাজ। বাবার একার পক্ষে এত সব কাজ করা সম্ভব ছিল না। সেই কারণে একটি ছেলেকে বাবার সাহায্য-র জন্য রাখা হতো। ব্যাংকের কাজ প্রেসে লেখা পাঠানোর কাজ, পোষ্ট অফিসের কাজ সেই করতো।
বাবার কাছে এই পত্রিকা এত প্রিয় ও মূল্যবান ছিল যে নিজে হাতে করে পত্রিকা নিয়ে বাড়ী বাড়ী গিয়ে লোককে এই পত্রিকা পড়ার অনুরোধ করতেন। সেই সঙ্গে সবাইকে লেখার জন্যে উৎসাহিত করতেন। যারা বড় চাকরী করতেন তাদের কাছে বিজ্ঞাপনের অনুরোধ করতেন। অদল-বদলের কাজে বাবাকে কোনদিন ক্লান্ত হতে দেখিনি। মাসিক পত্রিকা। একটা বের হলেই পরেরটার জন্য প্রস্তুতি। লেখক দের কাছে বারবার অনুরোধ করা, নতুন লেখক তৈরী করা সবই বাবার দায়িত্ব ছিল। এর উপর নিজের লেখা, সম্পাদকীয় ও “খবর নিয়ে জাবর কাটা” তো ছিলোই।
অদল-বদলের কাজ নিয়ে বাবা এত ব্যস্ত থাকতেন যে বাবার মাথায় কোথাও বেড়াতে যাবার কথাও আসতো না। এই নিয়ে বাবা ও মা এর মাঝে মাঝে বেশ মনোমালিন্য হতো। যদিও মা এর “অদল-বদলে” অনেক উৎসাহ ছিল আর নিজেও অদল বদলে বেশ কিছু লিখেছিলেন।
Retired জীবন, মা ভেবেছিলেন কোথাও ঘুরে বেড়াবে- যাতে পুত্রশোক একটু ভুলে থাকা যায়। কিন্তু বাবাতো এখন আরো ব্যস্ত। রাতে কখন লেখা সেরে শুতে যান আর কখন সকালে উঠে লিখতে বসছেন, কেউ জানতেও পারতো না। মাথায় নাকি কোনো আইডিয়া এলে, কোনো একটা বিশেষ লাইন এলে সাথে সাথে লিখে রাখতে হয়। না হলে পরে উল্টো পাল্টা হয়ে যায়। এভাবেই চলতে থাকলো ‘অদল-বদল’।
এই ধরণের পত্রিকা চালানোর নানান সমস্যা। তার মধ্যে একটা বড় হল আর্থিক সমস্যা। যত দিন যেতে লাগলো বাবার পুরোনো গ্রাহক সংখ্যা কমতে লাগলো। সবারই বয়স বাড়ছে। চলাফেরার ক্ষমতা কমে আসছে। অনেক লেখক, শুভাকাঙ্খী পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। নতুন গ্রাহক তৈরী করা মুশকিল হতে লাগলো। নতুন প্রজন্ম এই ধরণের পত্রিকা পড়তে চায় না। তারা কলেজে ভর্তির সময় আর চাকরী পাবার সময় জানে বা মানে তারা দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ। তারপর তারা আর এ বিষয় নিয়ে মাথা ঘামায় না। এমনকি বর্ণ বৈষম্য আছে- এটা মানতেও তারা সব সময় রাজী নয়। অনেকে আবার বাবাকে এর থেকে বেরিয়ে আসারও উপদেশ দেন। কি আর করা যায়! বাবা রাগে দুঃখে, ফুসতে ফুসতেও পত্রিকার কাজ করতে থাকেন। অনেকেই দেখেছি পত্রিকা নিতে অস্বীকার করেন, কারণ এই ধরণের পত্রিকা পড়ার লোক বাড়ীতে নেই। পনেরো কুড়ি টাকার পত্রিকা তাও কত financial strain.
যাই হোক, বাবার পত্রিকা বেরোতেই থাকলো। বাবার সব সময়ই চিন্তা ছিল পত্রিকার দাম কম রাখতে, যাতে বেশী মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়। ক্রমশঃ এমন দাড়ালো যে বাবার Pension এর টাকা থেকে পত্রিকার খরচা চলতে আরম্ভ করলো। বাবার জন্মদিনে, পূজোয় কখনো কেউ কিছু দিতে চাইলে বাবা টাকা চেয়ে নিতে। আর সব টাকা পত্রিকা প্রকাশের কাজে লাগাতেন। যেহেতু গ্রাহক সংখ্যা কমে আসছিল আর কোন বিজ্ঞাপনও পাওয়া যাচ্ছিল না, পত্রিকা গ্রাহকদের কাছে যে দামে পৌঁছে দেওয়া হত, তার প্রায় দ্বিগুন দাম ছাপতে লেগে যেতো।
শারিরিক ও মানসিক দিক দিয়ে বাবা অনেকটা হতাশ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু কোনদিন ‘অদল-বদল’ বন্ধ করার কথা কিংবা কাজে আগ্রহ কমতে দেখিনি। আমাদের সমাজের অনেক ভালো ভালো লেখা ও লেখক এই অদল-বদলের হাত ধরে উঠে এসেছেন। আগে “দলিত সাহিত্য”- মানে দলিতদের দ্বারা তাদের জীবনের কথা লেখা ছিল না বললেই চলে। এখন ভারতের দলিত সাহিত্য সারা পৃথিবীর দলিত সাহিত্যের মাঝে স্থান পেয়েছে। এটা খুবই আনন্দের কথা। দলিত সাহিত্য নিয়ে গবেষণা হচ্ছে দেখলে মনটা ভরে যায়। মনে হয় এর কোথাও তো “অদল বদল”- এর একটা অবদান আছে।
২০১২ সালের পর থেকে বাবার শরীর ক্রমশঃ খারাপ হতে লাগলো। যতদিন walker নিয়ে হাটতে পারতেন ততদিন বাবা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আস্তে আস্তে পায়ের শক্তি একেবারে কমে এলে আমার ভ্রাতৃবধূ শ্রীমতি সংহিতা বিশ্বাসের সাহায্যে পত্রিকা প্রায় আরো বছর তিনেক চলেছিলো। ভালো লেখার অভাব, মানুষের এ ধরণের পত্রিকা পড়ার অনীহা আর খরচার ক্রমাগত বৃদ্ধির ও সরকারি কিছু নিয়ম কানুনের জন্য ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বাবাকে পত্রিকা বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। পত্রিকা একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে এটা বাবা আর মা কেউই মন থেকে মেনে নিতে পারেন নি কোন দিন।
বাবা বিছানায় শুয়ে শুয়েও আশা করে চলেছিলেন হয়তো কেউ “অদল-বদল”-এর হাল ধরবে। সেই আশাতেও উনি প্রায় আরো দু বছর অতিক্রান্ত করলেন।
মা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন 20th June 2016. বাবা তখন বার্ধ্যকে শয্যাশায়ী, অনেক কথা মনেও করতে পারেন না। সব কিছুর জন্যেই অন্যের উপর নির্ভরশীল। তবুও তখনও কেউ ‘অদল বদল’-এর কথা, দলিত সাহিত্যের কথা বললে বাবার ক্লান্ত চোখ দুটো আশায় চকচক করে উঠতো। জানি না “অদল বদল” বাংলা দলিত সাহিত্যের ইতিহাসে কোথাও স্থান পাবে কিনা, কিন্তু বাবার “অদল বদল”-এর প্রতি যে একনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতার অভাব কোন দিন দেখিনি।
শেষের দিকে বাবাকে পত্রিকার কথা জিজ্ঞেস করলে বলতেন- “যার জন্ম আছে তার মৃত্যুও থাকবে সেটাই নিয়ম”। বোধ হয় এই ভেবেই নিজেকে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করতেন। বাবা অদল বদল পত্রিকা শুরু করার সময় বলেছিলেন- “আমি কলম, হাতে নিয়ে মরতে চাই”। বাবার সেই ইচ্ছা পুরন হয়নি। কম বয়সে মাকে হারিয়ে, মাঝ বয়সে সন্তান হারিয়ে আর শেষ বয়সে স্ত্রীকে হারিয়ে বাবার সব জীবনী শক্তি হারিয়ে গিয়েছিল। এই বার্ধক্যের সাথে লড়তে লড়তে বাবা 18 November 2018 সালে পৃথিবীর মায়া ত্যগ করে চলে গেলেন। পেছনে রেখে গেলেন “অদল বদল”-এর একটা Legacy.
বাবার মৃত্যুর পর আমার বড় ভাই অর্ঘ্য প্রসন বিশ্বাস “অদল-বদল” কে digitize করা কথা ভাবতে শুরু করলো। কিছু লোকের সাথে এই বিষয়ে কথাও বলেছিল কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। ভংকর Covid আর তার সাথে ওর terminal Cancer ওকে মাত্র 62 বছর বয়সে 23rd January 2022 এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিল।
Covid আর Cancer নিয়ে আমার নিজের ও যুদ্ধ করতে করতে আরো বছর খানেক কেটে গেলো। অদল বদলের পুরনো কপি হারিয়ে যাচ্ছে, অনেক পত্রিকার পাতা ভেঙে ভেঙে পড়ে যাচ্ছে। ভাবলাম এবার একটা কিছু করার দরকার Salt lake এ অদল বদলের office ঘরটাও আর নেই। খুঁজে খুঁজে পুরনো পত্রিকা সব বের করা হল। এই কাজে আমাকে সাহায্য করেছিল বাবা আর অর্ঘ্যর সারথী বনিক আর অশেষ। ওরা না থাকলে আমার পক্ষে এই কাজ করা সম্ভব হত না। পত্রিকা খুজতে গিয়ে দেখি, অনেক পত্রিকা হারিয়ে গেছে। ভাবলাম কি করা যায়। তখন আমার দুইজনের কথা মনে পড়ল। শ্রী সুধীর রঞ্জন হালদার মশাই আর তালুকদার মশাই। তালুকদার মশাইয়ের কাছে সব বই পাওয়া গেল না। হালদার মশাইয়ের সব পত্রিকা পেয়ে গেলাম। ওনাকে জানাতে উনি অনেক উৎসাহিত হয়ে নিজে খুঁজে খুঁজে আমাকে পত্রিকা গুলো পাঠিয়ে দিলেন। দেখলাম অদল বদলের প্রতি ভালোবাসা আর উৎসাহ ওনার একটুও কমেনি মনটা ভালো হযে গেলো। মনে হল হয়তো অদল বদলকে বাঁচানো যাবে।
আমরা এবার অদল বদলকে digitize করার কাজ হাতে নিলাম। Little magazine পয়সা কম, পত্রিকার কোন প্রচার নেই, ভালো যারা কাজ করে তাদের অনেক চাহিদা। এর মধ্যে খুঁজে যাদের ঠিক করা হল। তারা একটু ঢিলেঢালা ভাবেই আমাদের কাজটা করতে আবম্ভ করলো। ওদের পেছনে লেগে লেগে কাজটা পুরো করাতে প্রায় বছর খানেক লেগে গেল। ওদের কাজে পুরো সন্তুষ্ট না হলেও আমরা মেনে নিলাম। পুরনো পত্রিকা গুলোর অবস্থা এত খারাপ ছিল যে খুলে digitize করে আবার বাধিয়ে রাখাটা একটা বড় কাজ ছিল।
প্রসংগত হিসেবে বলতে চাই আমাদের Salt lake Karunamayee তে Samata Bank এ “অদল বদলের” account ছিল। আমার বাবা ওই Bank এর একজন founder member দিলেন। Account এ খুবই অল্প টাকা ছিল। কিন্তু account টা dormant হওয়ায় আমরা সেই টাকাটা আর তুলতে পারি নি।
Digitize করার পর ভাবছি এবার কি করা যায়। অনেকের সাথে কথা বললাম কিন্তু কোন কুল কিনারা করতে পারছিলাম না। ভাবছিলার এই অদল বদল কি এই pendrive এই মরে পড়ে থাকবে।
একদিন 2024 এর November মাসে ডাক যোগে হঠাৎ আমার কাছে একটা বই আসে। Packet টা খুলে দেখি বইয়ের নাম “জীবন নদীর বাঁকে বাঁকে” লেখক, সেই সুধির রঞ্জন হালদার মশাই। ওনারই জীবন কথা। বইটা পড়তে গিয়ে দেখি ওনার সব বই উনি online পড়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আমার চোখের সামনে সেই বিশাল লোহার দরজাটা যেন হঠার খুলে গেল। বুঝলাম উনিই একমাত্র মানুষ যিনি অদল বদল কে বাঁচাতে পারবেন। ওনাকে আবার phone করলাম। উনি আমাকে আস্বস্ত করলেন উনি এই কাজটা করে দিতে পারবেন। আমার মাথা থেকে একটা বিরাট বোঝা নেমে গেল। জানি ওনার থেকে ভালো “অদল বদল”কে আর কেউ চেনে না। ওনার থেকে ভালো আর কেউ এই কাজ করতে পারবে না।
ওনার বয়স হয়েছে, ওনার স্ত্রী খুবই অসুস্থ তার মধ্যেই উনি, “অদল বদল” পত্রিকার web site তৈরী করিয়ে দিয়েছেন ওনার সাহায্য ছাড়া আমাদের পক্ষে এটা কখনোই সম্ভব হত না। “অদল বদল” পত্রিকা ও আমরা সবাই ওনার কাছে কৃতজ্ঞ। ভগবানের কাছে প্রার্থনা ওনারা ভালো থাকুন সুস্থ থাকন।
মালা মিত্র