বঙ্গীয় সঙ্গীত পরিষদ syllabus
4th year-1
4th year-2
5th year-1
5th year-2
7th year-1
7th year-2
3rd year
banshi 2
meghnad 2
meghnad 3
dan 2
dan 3
hotat dekha 2
samyobadi2
charkar gan2
charkar gan 3
babumosay2
banglar mukh2
4th year
dussomoy2
sobujer obhijan2
afrika2
sorbohara2
sobbosachi2
sobbosachi3
সাত ভাই চম্পা
বিষ্ণু দে
চম্পা! তোমার মায়ার অন্ত নেই,
কত-না পারুল-রাঙানো রাজকুমার
কত সমুদ্র কত নদী হয় পার!
বিরাট বাংলা দেশের কত-না ছেলে
অবহেলে সয় সকল যন্ত্রণাই
চম্পা কখন জাগিবে নয়ন মেলে।
চম্পা, তোমার প্রেমেই বাংলা দেশ
কত-না শাঙন রজনী পোহাল বলো।
গৌরীশৃঙ্গ মাথা হেঁট টলোমলো,
নিষিদ্ধ দেশে দীপঙ্করের শিখা
চিনে জ্বলে, হয় মঙ্গোলিয়ায় লেখা,
চম্পা, তোমায় চিনেছিল সিংহলও।
তোমাকে খুঁজেছে জানো কি কৃষকে নৃপে
অশ্বের খুরে, লাঙলের ফলা টেনে,
হাতুড়ির ঘায়ে, কাস্তের বাঁকা শানে,
ভাটিয়ালি গানে, কপিলমুনির দ্বীপে;
কলিঙ্গে আর কঙ্কণে গুর্জরে
চম্পা, তোমার সাত ভাই গান করে।
শ্যাম-কাম্বোজে তারা বুঝি টানে দাঁড়,
নীল-কমলের দেশে রেখে আসে হাড়
বহু চাঁদ বহু শ্ৰীমন্ত সদাগর,
চম্পা, তোমারই পারুল মায়ার লোভে
বাহিরকে ঘর আপনকে করে পর,
বলী হাসে, আসে যবদ্বীপের সাড়।
তোমার বাহুর নির্দেশ দেখে ক্ষোভে
কত প্রাণ গেল, কতজনা নিশি ডেকে
অন্ধ আবেগে বৈতরণীতে ডোবে।
চম্পা, তোমার অবিনশ্বর প্রাণ।
এ কোন হিরণমায়ায় রেখেছ ঢেকে,
খুলে দাও মুখ, রৌদ্রে জ্বলুক গান।।
কড়ির পাহাড়ে চম্পা, তুমি তো নেই;
কাঞ্চনমালা জানে না তোমার খেই;
তবুও তোমায় খুঁজে মরে সারা দেশ
ঘোচাও চম্পা, দুস্থ ছদ্মবেশ,
এ মাহ ভাদরে ভরা বাদরের শেষে
চকিতে দেখাও জনগণমনে মুখ
মুক্তি! মুক্তি! চিনি সে তীব্র সুখ,
সাত ভাই জাগে, নন্দিত দেশ-দেশ।।
5th year
ঐকতান ২
ঐকতান ৩
ঝুলন ২
ঝুলন ৩
কৃষ্ণকলি ২
হিন্দু-মুসলিম যুদ্ধ ৩
বনলতা সেন২
বাবুমশাই ২
আমার নাম ভারতবর্ষ ২
কথা
প্রেমেন্দ্র মিত্র
তারপরও কথা থাকে;
বৃষ্টি হয়ে গেলে পর
ভিজে ঠাণ্ডা বাতাসের মাটি-মাখা গন্ধের মতন
আবছায়া মেঘ মেঘ কথা;
কে জানে তা কথা কিংবা
কেঁপে ওঠা রঙিন স্তব্ধতা।
সে কথা হবে না বলা তাকে:
শুধু প্রাণ ধারণের প্রতিজ্ঞা ও প্রয়াসের ফাঁকে ফাঁকে
অবাক হৃদয়
আপনার সঙ্গে একা-একা
সেই সব কুয়াশার মত কথা কয়।
অনেক আশ্বর্য কথা হয়তো বলেছি তার কানে।
হৃদয়ের কতটুকু মানে
তবু সে কথায় ধরে!
তুষারের মতো যায় ঝরে
সব কথা কোনো এক উত্তুঙ্গ শিখরে
আবেগের,
হাত দিয়ে হাত ছুঁই,
কথা দিয়ে মন হাতড়াই
তবু কারে কতটুকু পাই।
সব কথা হেরে গেলে
তাই এক দীর্ঘশ্বাস বয়,
বুঝি ভুলে কেঁপে ওঠে
একবার নির্লিপ্ত সময়।
তারপর জীবনের ফাটলে-ফাটলে
কুয়াশা জড়ায়
কুয়াশার মতো কথা হৃদয়ের দিগন্তে ছড়ায়।
6th year
shashtro 2
basanti 2
ovijan 2
thikana 2
ghor soar 2
amontron romake 2
kurani 2
songram cholbei 2
7th year
বর্ষামঙ্গল
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে
জলসিঞ্চিত ক্ষিতিসৌরভরভসে
ঘনগৌরবে নবযৌবনা বরষা
শ্যামগম্ভীর সরসা।
গুরুগর্জনে নীপমঞ্জরী শিহরে,
শিখীদম্পতি কেকাকল্লোলে বিহরে।
দিগবধূচিতহরষা
ঘনগৌরবে আসে উন্মদবরষা।
কোথা তোরা অয়ি তরুণী পথিকললনা,
জনপদবধূ কিঙ্কিণীকলকলনা,
মালতীমালিনী কোথা প্রিয়পরিচারিকা,
কোথা তোরা অভিসারিকা!
ঘনবনতলে এসো ঘননীলবসনা,
ললিত নৃত্যে বাজুক স্বর্ণরশনা,
আনো বীণা মনোহারিকা।
কোথা বিরহিণী, কোথা তোরা অভিসারিকা!
আনো মৃদঙ্গ, মুরজ, মুরলী মধুরা,
বাজাও শঙ্খ, হুলুরব করো বধূরা--
এসেছে বরষা, ওগো নব-অনুরাগিণী,
ওগো প্রিয়সুখভাগিনী!
কুঞ্জকুটিরে, অয়ি ভাবাকুললোচনা,
ভূর্জপাতায় নব গীত করো রচনা
মেঘমল্লার-রাগিণী।
এসেছে বরষা, ওগো নব-অনুরাগিণী!
কেতকীকেশরে কেশপাশ করো সুরভি,
ক্ষীণ কটিতটে গাঁথি লয়ে পরো করবী,
কদম্বরেণু বিছাইয়া দাও শয়নে,
অঞ্জন আঁকো নয়নে।
তালে তালে দুটি কঙ্কণ কনকনিয়া
ভবনশিখীরে নাচাও গনিয়া গনিয়া
স্মিতবিকশিত বয়নে,
কদম্বরেণু বিছাইয়া ফুলশয়নে।
স্নিগ্ধসজল মেঘকজ্জল দিবসে
বিবশ প্রহর অচল অলস আবেশে,
শশীতারাহীনা অন্ধতামসী যামিনী--
কোথা তোরা পুরকামিনী!
আজিকে দুয়ার রুদ্ধ ভবনে ভবনে,
জনহীন পথ কাঁদিছে ক্ষুব্ধ পবনে,
চমকে দীপ্ত দামিনী--
শূন্যশয়নে কোথা জাগে পুরকামিনী!
যূথীপরিমল আসিছে সজল সমীরে,
ডাকিছে দাদুরী তমালকুঞ্জতিমিরে,
জাগো সহচরী, আজিকার নিশি ভুলো না--
নীপশাখে বাঁধো ঝুলনা।
কুসুমপরাগ ঝরিবে ঝলকে ঝলকে,
অধরে অধরে মিলন অলকে অলকে--
কোথা পুলকের তুলনা।
নীপশাখে সখী ফুলডোরে বাঁধো ঝুলনা।
এসেছে বরষা, এসেছে নবীনা বরষা,
গগন ভরিয়া এসেছে ভুবনভরসা--
দুলিছে পবনে সনসন বনবীথিকা,
গীতিময় তরুলতিকা।
শতেক যুগের কবিদলে মিলি আকাশে
ধ্বনিয়া তুলিছে মত্তমদির বাতাসে
শতেক যুগের গীতিকা--
শতশতগীতমুখরিত বনবীথিকা।
*****************
আমি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,
চুনি উঠল রাঙা হয়ে।
আমি চোখ মেললুম আকাশে,
জ্বলে উঠল আলো
পুবে পশ্চিমে।
গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম "সুন্দর',
সুন্দর হল সে।
তুমি বলবে, এ যে তত্ত্বকথা,
এ কবির বাণী নয়।
আমি বলব, এ সত্য,
তাই এ কাব্য।
এ আমার অহংকার,
অহংকার সমস্ত মানুষের হয়ে।
মানুষের অহংকার-পটেই
বিশ্বকর্মার বিশ্বশিল্প।
তত্ত্বজ্ঞানী জপ করছেন নিশ্বাসে প্রশ্বাসে,
না, না, না--
না-পান্না, না-চুনি, না-আলো, না-গোলাপ,
না-আমি, না-তুমি।
ও দিকে, অসীম যিনি তিনি স্বয়ং করেছেন সাধনা
মানুষের সীমানায়,
তাকেই বলে "আমি'।
সেই আমির গহনে আলো-আঁধারের ঘটল সংগম,
দেখা দিল রূপ, জেগে উঠল রস।
"না' কখন ফুটে উঠে হল "হাঁ' মায়ার মন্ত্রে,
রেখায় রঙে সুখে দুঃখে।
একে বোলো না তত্ত্ব;
আমার মন হয়েছে পুলকিত
বিশ্ব-আমির রচনার আসরে
হাতে নিয়ে তুলি, পাত্রে নিয়ে রঙ।
পণ্ডিত বলছেন--
বুড়ো চন্দ্রটা, নিষ্ঠুর চতুর হাসি তার,
মৃত্যুদূতের মতো গুঁড়ি মেরে আসছে সে
পৃথিবীর পাঁজরের কাছে।
একদিন দেবে চরম টান তার সাগরে পর্বতে;
মর্তলোকে মহাকালের নূতন খাতায়
পাতা জুড়ে নামবে একটা শূন্য,
গিলে ফেলবে দিনরাতের জমাখরচ;
মানুষের কীর্তি হারাবে অমরতার ভান,
তার ইতিহাসে লেপে দেবে
অনন্ত রাত্রির কালি।
মানুষের যাবার দিনের চোখ
বিশ্ব থেকে নিকিয়ে নেবে রঙ,
মানুষের যাবার দিনের মন
ছানিয়ে নেবে রস!
শক্তির কম্পন চলবে আকাশে আকাশে,
জ্বলবে না কোথাও আলো।
বীণাহীন সভায় যন্ত্রীর আঙুল নাচবে,
বাজবে না সুর।
সেদিন কবিত্বহীন বিধাতা একা রবেন বসে
নীলিমাহীন আকাশে
ব্যক্তিত্বহারা অস্তিত্বের গণিততত্ত্ব নিয়ে।
তখন বিরাট বিশ্বভুবনে
দূরে দূরান্তে অনন্ত অসংখ্য লোকে লোকান্তরে
এ বাণী ধ্বনিত হবে না কোনোখানেই--
"তুমি সুন্দর',
"আমি ভালোবাসি'।
বিধাতা কি আবার বসবেন সাধনা করতে
যুগযুগান্তর ধ'রে।
প্রলয়সন্ধ্যায় জপ করবেন--
"কথা কও, কথা কও',
বলবেন "বলো, তুমি সুন্দর',
বলবেন "বলো, আমি ভালোবাসি'?
******************
উদাসীন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হাল ছেড়ে আজ বসে আছি আমি ,
ছুটি নে কাহারো পিছুতে ।
মন নাহি মোর কিছুতেই , নাই
কিছুতে ।
নির্ভয়ে ধাই সুযোগ – কুযোগ বিছুরি ,
খেয়াল – খবর রাখি নে তো কোনো – কিছুরি –
উপরে চড়িতে যদি নাই পাই সুবিধা
সুখে পড়ে থাকি নিচুতেই , থাকি
নিচুতে ।
যেথা – সেথা ধাই , যাহা – তাহা পাই –
ছাড়ি নেকো ভাই , ছাড়ি নে ।
তাই ব’লে কিছু কাড়াকাড়ি ক’রে
কাড়ি নে ।
যাহা যেতে চায় ছেড়ে দিই তারে তখুনি ,
বকি নে কারেও , শুনি নে কাহারো বকুনি –
কথা যত আছে মনের তলায় তলিয়ে
ভুলেও কখনো সহসা তাদের
নাড়ি নে ।
মন – দে’য়া – নে’য়া অনেক করেছি ,
মরেছি হাজার মরণে –
নূপুরের মতো বেজেছি চরণে
চরণে ।
আঘাত করিয়া ফিরেছি দুয়ারে দুয়ারে ,
সাধিয়া মরেছি ইঁহারে তাঁহারে উঁহারে –
অশ্রু গাঁথিয়া রচিয়াছি কত মালিকা ,
রাঙিয়াছি তাহা হৃদয় – শোণিত –
বরনে ।
এতদিন পরে ছুটি আজ ছুটি ,
মন ফেলে তাই ছুটেছি ;
তাড়াতাড়ি ক’রে খেলাঘরে এসে
জুটেছি ।
বুকভাঙা বোঝা নেব না রে আর তুলিয়া ,
ভুলিবার যাহা একেবারে যাব ভুলিয়া –
যাঁর বেড়ি তাঁরে ভাঙা বেড়িগুলি ফিরায়ে
বহুদিন পরে মাথা তুলে আজ
উঠেছি ।
কত ফুল নিয়ে আসে বসন্ত
আগে পড়িত না নয়নে –
তখন কেবল ব্যস্ত ছিলেম
চয়নে ।
মধুকরসম ছিনু সঞ্চয়প্রয়াসী ;
কুসুমকান্তি দেখি নাই , মধু – পিয়াসী –
বকুল কেবল দলিত করেছি আলসে
ছিলাম যখন নিলীন বকুল –
শয়নে ।
দূরে দূরে আজ ভ্রমিতেছি আমি ,
মন নাহি মোর কিছুতে ;
তাই ত্রিভুবন ফিরিছে আমারি
পিছুতে ।
সবলে কারেও ধরি না বাসনা – মুঠিতে ,
দিয়েছি সবারে আপন বৃন্তে ফুটিতে –
যখনি ছেড়েছি উচ্চে উঠার দুরাশা
হাতের নাগালে পেয়েছি সবারে
নিচুতে ।
******************************
ঝুলন ৩
ঝুলন ২
আঠারো বছর বয়স
আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ
র্স্পধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি,
আঠারো বছর বয়সেই অহরহ
বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।
আঠারো বছর বয়সের নেই ভয়
পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,
এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়-
আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা।
এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য
বাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো চলে,
প্রাণ দেওয়া-নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শূন্য
সঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে।
আঠরো বছর বয়স ভয়ঙ্কর
তাজা তাজা প্রাণে অসহ্য যন্ত্রণা,
এ বয়সে প্রাণ তীব্র আর প্রখর
এ বয়সে কানে আসে কত মন্ত্রণা।
আঠারো বছর বয়স যে দুর্বার
পথে প্রান্তরে ছোটায় বহু তুফান,
দুর্যোগে হাল ঠিক মতো রাখা ভার
ক্ষত-বিক্ষত হয় সহস্র প্রাণ।
আঠারো বছর বয়সে আঘাত আসে
অবিশ্র্রান্ত; একে একে হয় জড়ো,
এ বয়স কালো লক্ষ দীর্ঘশ্বাসে
এ বয়স কাঁপে বেদনায় থরোথরো।
তবু আঠারোর শুনেছি জয়ধ্বনি,
এ বয়স বাঁচে দুর্যোগে আর ঝড়ে,
বিপদের মুখে এ বয়স অগ্রণী
এ বয়স তবু নতুন কিছু তো করে।
এ বয়স জেনো ভীরু, কাপুরুষ নয়
পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে,
এ বয়সে তাই নেই কোনো সংশয়-
এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।।
*****************
বিক্ষোভ
সুকান্ত ভট্টাচার্য
দৃঢ় সত্যের দিতে হবে খাঁটি দাম,
হে স্বদেশ, ফের সেই কথা জানলাম।
জানে না তো কেউ পৃথিবী উঠছে কেঁপে
ধরেছে মিথ্যা সত্যের টুঁটি চেপে,
কখনো কেউ কি ভূমিকম্পের আগে
হাতে শাঁখ নেয়, হঠাৎ সবাই জাগে?
যারা আজ এত মিথ্যার দায়ভাগী,
আজকে তাদের ঘৃণার কামান দাগি।
ইতিহাস, জানি নীরব সাক্ষী তুমি,
আমরা চেয়েছি স্বাধীন স্বদেশ ভূমি,
অনেকে বিরূপ, কানে দেয় হাত চাপা,
তাতেই কি হয় আসল নকল মাপা?
বিদ্রোহী মন! আজকে ক’রো না মানা,
দেব প্রেম আর পাব কলসীর কাণা,
দেব, প্রাণ দেব মুক্তির কোলাহলে,
জীন্ ডার্ক, যীশু, সোক্রোটিসের দলে।
কুয়াশা কাটছে, কাটবে আজ কি কাল,
ধুয়ে ধুয়ে যাবে কুৎসার জঞ্জাল,
ততদিন প্রাণ দেব শত্রুর হাতে
মুক্তির ফুল ফুটবে সে সংঘাতে।
ইতিহাস! নেই অমরত্বের লোভ,
আজ রেখে যাই আজকের বিক্ষোভ।।
*******************
সোনার মেডেল
পূর্ণেন্দু পত্রী
বাবু মশাইরা
গাঁ গেরাম থেকে ধুলো মাটি ঘইসটে ঘইসটে
আপনাদের কাছে এয়েছি।
কি চাক্ চিকান শহর বানিয়েছেন গো বাবুরা।
রোদ পড়লে জোছনা লাগলে মনে হয়
কাল-কেউটের গা থেকে খসে পড়া
রুপোর তৈরী একখান লম্বা খোলস।
মনের উনোনে ভাতের হাঁড়ি হাঁ হয়ে আছে খিদেয়
চাল ডাল তরিতরকারি শাকপাতা কিছু নেই
কিন্তু জল ফুটছে টগবগিয়ে।
বাবু মশাইরা,
লোকে বলেছিলো,ভালুকের নাচ দিখালে
আপনারা নাকি পয়সা দেন।
যখন যেমন বইললেন, নেইচে নেইচে হদ্দ
পয়সা দিবেন নি?
লোকে বলেছিলো ভানুমতির খেল দিখালে
আপনারা নাকি সোনার মেডেল দেন।
নিজের করাতে নিজেকে দু খান কইরে
আবার জুইড়ে দেখালুম,
আকাশ থিকে সোনালী পাখির ডিম পেইড়ে
আপনাদের ভেইজে খাওয়ালুম গরম ওমলেট,
বাঁজা গাছে বাজিয়ে দিলুম ফুলের ঘুঙুর
সোনার মেডেল দিবেন নি?
বাবু মশাইরা
সেই ল্যাংটোবেলা থেকে বড়ো শখ
ঘরে ফিরবো বুকে সোনার মেডেল টাঙিয়ে।
আর বৌ বাচ্চাদের মুখে
ফাটা কাপাসতুলোর হাসি ফুটিয়ে বলবো-
দেখিস! আমি মারা গিলে
আমার গা থেকে গজাবে
চন্দন গন্ধের বন।
সোনার মেডেল দিবেন নি?
*************
বঙ্গভূম
শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়
ত্যামুন দিন কবে আসবেক গ
যখুন গরুড় বাহনে চড়ি আকাশে যেতি যেতি মা-লক্ষ্ণী শুধাবেন
উদিক উটা কী দেশ গ' ?
লদী ভরি জল টমটম করে, মাঠ ভরি ধান
কাল কাল মানুষগুলান খিল খিল খিল খিল করি হাসে।
অন্তরযামী, নারায়ণ মিটিমিটি হাসবেন।
শুধাবেন, 'তুমার মনে লাই
কতবার এইচ ইদিকে, তুমার মনে লাই
কত পুজা লিউচ
ই হল বঙ্গভূম।
বান হইছিল, উরা বাঁধ বাঁধল
লদী শুকাইছিল, এখুন কেনাল হইচে,
বছরে তিন-তিনবার ধান উঠে। দেখ ক্যানে
লতুন দালান হইচে কত। উদের আর কষ্ট লাই।
বিকালের সোনার পরা লহর
উই শুন -- টিকটিক টিকটিক করি শব্দ উঠে--
বল দিনি, উ কিসের শব্দ?'
'কী জানি।' মা-লক্ষ্ণী অবাক হই তাকান।
'মানুষ এখন কাজ করি ফিরছে।
শিশুরা পড়া করি ফিরছে।
উ মুড়ি খাওয়ার শব্দ বটে; দুধে ভিজাই মুড়ি খায়
বঙ্গভূমের মানুষ!'
হায়, ত্যামুন দিন কবে আসবেক গ'? কবে আসবেক?
যখন দুধ পাবেক, পেট ভরে মুড়ি পাবেক পোড়া দেশের মানুষ!
ত্যামুন দিন কবে আসবেক গ'?
*******************
গাছপালাগুলো
পূর্ণেন্দু পত্রী
গাছপালাগুলো যেন কেমন হয়ে গেছে আজকাল।
কেউ কেউ স্নান করেনি কতদিন
কেউ কেউ চুল কাটেনি কতদিন
কেউ কেউ বাসি জামাকাপড় পরে আছে কতদিন।
মনে হয় মাঝরাতে ঘুসঘুসে জ্বর হয় কারো কারো
কারো কারো হাঁপানির শ্বাসকষ্ট শুনতে পাই মাঝরাতে
স্বপ্নের মধ্যে এপাশ-ওপাশ আইঢাই করে কেউ কেউ।
কেউ কেউ নিশ্বাস ফেলে আগুনে হাপরের মতো।
গাছপালাগুলো সত্যি সত্যি কেমন হয়ে গেছে আজকাল।
একটু সভ্য ভব্য হ।
বাইরে যখন ঝড়-ঝাপটার ওলোট-পালোট হাওয়া
ঘরে শুয়ে বসে থাক দু’দণ্ড।
দেখছিস তো দিনকাল খারাপ
মেঘে মেঘে দল পাকাচ্ছে দলা পাকাচ্ছে গোপন ফিসফাস
দেখছিস তো ইট চাপা পড়ে ঘাসের রঙ হলুদ।
দেখছিস তো যে-পাখি উড়তে চায় তার ডানায় রক্ত।
দেখছিসতো উল্টে পাল্টে পড়ে আছে নৌকগুলো
একটু সাবধান সতর্ক হ।
সে-সব কথা কানে ঢোকে নাকি বাবুদের?
উড়নচণ্ডের মতো কেবল ঘুরছে আর পুড়ছে,
দাঁতের মধ্যে দাঁতের ঘস্টানি
হাতের মধ্যে হাতের মুঠো
যেন এক একটি বদরাগী বশিষ্ঠ বিশ্বামিত্র।
এক-একদিন না চেঁচিয়ে পারি না।
- আরে ও হতভাগারা ! যাচ্ছিস কোন্ চুলোয়?
- ভাঙতে।
- কী ভাঙবি ?
- সেই সব থাম, যাদের গায়ে সাত শতাব্দীর ফাটল।
- তারপর?
- সেই সব পাথর, যাদের দেবতা সাজিয়ে আরতি হচ্ছে ভুল মন্ত্রে।
- তারপর?
- সেই সব তালা, যার ভিতরে ডাঁই হয়ে আছে যুগ যুগান্তরের লুটের মাল।
- তাহলে ফুল ফোটাবি কবে?
ছড়িয়ে ছিটিয়ে আমরা এখন ছন্নছাড়া
- আগে গায়ে-গা লাগিয়ে অরণ্য হই
পরাস্ত অন্ধকারের কবর খুঁড়ি এঁদো জঙ্গলে
তারপর ডালপালা ঝাঁপিয়ে ফুল
ফুলের মশাল জ্বালিয়ে আহ্লাদে আটখানা হৈ হৈ উৎসব।
- তবে মরগে যা! মরে আকাশ-পিদিম হ।
এই বলে আমি খিল তুলে দিই আমার খিড়কি দরজায়।
**********************
দুব্বো
সুবোধ সরকার
আমরা থাকি এ গ্রামে আর
তোমরা থাক পাশের গ্রামে
আমার গ্রামে বৃষ্টি হলে
পাশের গ্রামে বৃষ্টি নামে।
দুটি গ্রামের একটি কুয়ো
করেছি পান একই জল
আমার গ্রামে উঠলে চাঁদ
তোমার গ্রামে কাঁপে হিজল।
হীরকপুর, মুক্তোপুর
দুটি গ্রামের দু/দুটি নাম
হিন্দু থাকে এ গ্রামটিতে
ও গ্রামটিতে মুসলমান।
এই গ্রামের তুলসীপাতা
পুজোয় লাগে মুক্তোপুরে
মুক্তোপুরে নামাজ পড়া
হীরক শোনে আরবি সুরে।
এ গ্রামে যদি কারোর বিয়ে
ও গ্রাম থেকে দুব্বো আসে
এ গ্রাম থকে ও গ্রামে যেতে
দুব্বো নিজেও ভালবাসে
দুব্বো হল একটি নাম
দুব্বো এক রাইকিশোরী
একটি ছেলে ডুবতে এল
বলল তবে ডুবেই মরি।
ডুবতে এত ভাল লাগে যে
গহীন গাঙে ওঠে তুফান
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি তুই
হিন্দু নাকি মুসলমান /
বৃষ্টি বলে, আমার কাজ
মাটির বুকে ঝরে পড়ার
মাটির কাজ আমাকে ধরে
শস্য উৎপাদন করা।
আমি যখন বৃষ্টি হই
সমানভাবে দু গ্রামে যাই
ধর্ম দেখে আমি ঝরি না
সবাই যেন বৃষ্টি পায়।
কিন্তু কারা কোথার থেকে
এ গ্রামে এসে গোল বাধাল
ফাটলো বোমা, ছুটলো তীর
নিভল দুই গ্রামের আলো।
এলো পুলিশ, সাংবাদিক
বসল বেড়া কাঁটাতারের
দুব্বো নামে ওই মেয়েটি
সে হয়ে গেল ওই পারের।
ছেলেটি আজ এই পারের
কীসের থেকে ঘটলো কী যে
মার খেয়ে সে হয়েছে আজ
নতুন মানচিত্র নিজে।
মেয়েটি কাঁদে, মেয়েটি হাসে
হাসলে তার রক্ত পড়ে
কিন্তু দুটি গ্রামে আজও
সমানভাবে বৃষ্টি ঝরে।
ছেলেটি একা, মা-ভাই-বোন
সবাই তাকে ত্যাজ্য করে
কিন্তু দুটি গ্রামের মাঠে
আজও সমান বৃষ্টি পড়ে।
*************
কার্তিক ঘোষ
মাঠ মানে কি মজাই শুধু মাঠ মানে কি ছুটি-
মাঠ মানে কি অথৈ খুশির অগাধ লুটোপুটি !
মাঠ মানে কি হল্লা শুধুই মাঠ মানে কি হাসি-
মাঠ মানে কি ঘুম তাড়ানো মন হারানো বাঁশি !
মাঠ মানে কি নিকেল করা বিকেল আসা দিন ,
মাঠ মানে কি নাচনা পায়ের বাজনা তাধিন ধিন !
মাঠ মানে তো সবুজ প্রাণের শাশ্বত এক দীপ-
মাঠ মানে ছুট এগিয়ে যাবার-পিপির পিপির পিপ।
ছুট মানে কি ছোটাই শুধু ছুট মানে কি আশা-
ছুট মানে কি শক্ত পায়ের পোক্ত কোন ভাষা।
ছুট মানে কি সাহস শুধু ছুট মানে কি বাঁচা ,
ছুট মানে কি ছোট্ট পাখির আগল ভাঙা খাঁচা !
ছুট মানে কি ছুটন্ত আর ফুটন্ত সব প্রাণে-
সাতটি সবুজ সমুদ্দুরের ঢেউকে ডেকে আনে !
ছুট মানে তো জীবন এবং ছুট মানে যে সোনা-
ছুট মানে কি ছুটেই দেখ- আর কিছু বলবো না।
********************
ভারতবর্ষ
শমীন্দ্র ভৌমিক
এখানে তিনটে ওখানে তিনটে
সেখানে তিনটে ঢেউ।
এই তল্লাটে তারা ছাড়া আর
মনিষ্যি নেই কেউ।
হরে রে রে রে রে চিৎকার শুনে
সবাই পগারপার।
কেবল একটা হাবাগোবা ছেলে
নাম ভুলে গেছে তার।
তার দু চোখের দৃষ্টি কেমন
স্বপ্নের মতো নীল।
আমির খানের মুখের সঙ্গে
একটু রয়েছে মিল।
সবাই ধরল, মারল, বলল
বল জয় সিয়ারাম।
ছেলেটা বলল, রবীন্দ্রনাথ
নজরুল ইসলাম।
আরো একদল বলল, বল তো
আল্লাহু আকবর,
ছেলেটা বলল, ডিরোজিও আর অতীশ দীপঙ্কর।
সবাই ধরল মারল বলল
কোনখানে তোর ঘর?
ছেলেটা বলল : ভারতবর্ষ।
সরবমতির চর।
*************
মশা
সরল দে
এত সাহস, চলল মশা
বাঘের পিঠে চাপতে,
হালুম হুলুম ডাকলে যে বাঘ
আমরা থাকি কাঁপতে।
বাঘের পিঠে চেপেই মশা
হুল ফোটালো আস্তে
তারপরে কি?উড়ল মশা
হাসতে-হাসতে হাসতে।
মশা মশা ছোট্ট মশা
এইটুকু একফোঁটা
খুকুর ঠোঁটে কামড়েছিল
ফুলেও ছিল ঠোঁটটা।
মশার ভারী বুকের পাটা
ভয় করে না কাউকে
কামড়ে দিলো ভীম পালোয়ান
শম্ভুচরন সাউকে।
**************
নন্দলাল
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়
নন্দলাল তো একদা একটা করিল ভীষণ পণ-
স্বদেশের তরে, যা করেই হোক, রাখিবেই সে জীবন।
সকলে বলিল, ‘আ-হা-হা কর কি, কর কি, নন্দলাল’ ?
নন্দ বলিল, ‘বসিয়া বসিয়া রহিব কি চিরকাল ?
আমি না করিলে কে করিবে আর উদ্ধার এই দেশ ?’
তখন সকলে বলিল- ‘বাহবা বাহবা বাহবা বেশ !’
নন্দর ভাই কলেরায় মরে, দেখিবে তাহারে কেবা !
সকলে বলিল, ‘যাও না নন্দ, করো না ভায়ের সেবা।’
নন্দ বলিল, ‘ভায়ের জন্য জীবনটা যদি দিই-
না হয় দিলাম, -কিন্তু অভাগা দেশের হইবে কি ?
বাঁচাটা আমার অতি দরকার, ভেবে দেখি চারি দিক্।’
তখন সকলে বলিল- ‘হাঁ হাঁ হাঁ, তা বটে, তা বটে, ঠিক !’
নন্দ একদা হঠাৎ একটা কাগজ করিল বাহির,
গালি দিয়া সবে গদ্যে পদ্যে বিদ্যা করিল জাহির;
পড়িলো ধন্য দেশের জন্য নন্দ খাটিয়া খুন;
লেখে যতো তার দ্বিগুণ ঘুমায়, খায় তার দশ গুণ;
খাইতে ধরিল লুচি ও ছোকা ও সন্দেশ থাল থাল,
তখন সকলে বলিল- ‘বাহবা বাহবা নন্দলাল।’
নন্দ একদা কাগজেতে এক সাহেবকে দেয় গালি;
সাহেব আসিয়া গলাটি তাহার টিপিয়া ধরিল খালি;
নন্দ বলিল, “আ-হা-হা ! কর কি, কর কি ! ছাড় না ছাই,
কি হবে দেশের, গলাটিপুনিতে আমি যদি মারা যাই ?
বলো ক’বিঘৎ নাকে দিব খত যা বলো করিব তাহা”
তখন সকলে বলিল- “বাহবা বাহবা বাহবা বাহা !”
নন্দ বাড়ির হ’ত না বাহির, কোথা কি ঘটে কি জানি;
চড়িত না গাড়ি, কি জানি কখন উল্টায় গাড়িখানি,
নৌকা ফি-সন ডুবিছে ভীষণ, রেলে ‘কলিশন’ হয়;
হাঁটিতে সর্প, কুক্কুর আর গাড়ি-চাপা-পড়া ভয়,
তাই শুয়ে শুয়ে, কষ্টে বাঁচিয়া রহিল নন্দলাল
সকলে বলিল- ‘ভ্যালা রে নন্দ, বেঁচে থাক্ চিরকাল।’
***********************
বিলেত ফের্ত্তা
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়
আমরা বিলেত ফের্ত্তা ক’ভাই,
আমরা সাহেব সেজেছি সবাই,
তাই কি করি নাচার, স্বদেশী আচার
করিয়াছি সব জবাই।
আমরা বাংলা গিয়াছি ভুলি’,
আমরা শিখেছি বিলিতি বুলি,
আমরা চাকরকে ডাকি ‘বেয়ারা’ আর
মুটেদের ডাকি ‘কুলি’।
‘রাম’ ‘কালীপদ’ ‘হরিচরণ’
নাম এ সব সেকেলে ধরণ;
তাই নিজেদের সব ‘ডে’ ‘রে’ ও ‘মিটার’
করিয়াছি নামকরণ।
আমরা সাহেবের সঙ্গে পটি
আমরা মিস্টার নামে র’টি,
যদি সাহেব না বলে বাবু কেহ বলে
মনে মনে ভারি চটি।
আমরা ছেড়েছি টিকির আদর
আমরা ছেড়েছি ধুতি ও চাদর
আমরা হ্যাট বুট আর প্যন্ট কোট প’রে
সেজেছি বিলিতি বাঁদর।
আমরা বিলিতি ধরণে হাসি
আমরা ফরাসি ধরণে কাশি
আমরা পা ফাঁক করে সিগারেট খেতে
বড্ডই ভালোবাসি।
আমরা হাতে খেতে বড় ডরাই,
আমরা স্ত্রীকে ছুরি কাঁটা ধরাই,
আমরা মেয়েদের জুতো মোজা, দিদিমাকে
জ্যাকেট কামিজ পরাই।
আমাদের সাহেবিয়ানার বাধা
এই যে রংটা হয় না সাদা
তবুও চেষ্টার ত্রুটি নেই-‘ভিনোলিয়া’
মাখি রোজ গাদা গাদা।
আমরা বিলেতফের্ত্তা ক’টায়
দেশে কংগ্রেস আদি ঘটাই
আমাদের সাহেব যদিও দেবতা তবু ঐ
সাহেবগুলোই চটাই।
আমরা সাহেবি রকমে হাঁটি,
স্পীচ্ দেই ইংরিজি খাঁটি;
কিন্তু বিপদেতে দেই বাঙালিরই মত
চম্পট পরিপাটি।
*****************
অনুবাদ কবিতা(বিদেশী)-১
জর্জ স্টাইনার-এর কবিতা
অনুবাদ ও ভূমিকা- হিন্দোল ভট্টাচার্য
জীবনপঞ্জি
মানুষ চায় একটা সুন্দর জীবন কাটাতে
টিভি দেখে আর গাড়ি চালিয়ে
একটা বাড়ি আর কিছুটা সবুজ বাগানে
মানুষ সাহায্য করতে চায় একে অপরকে
চায় অন্ধকে রাস্তা পার করে দিতে, যখন
এক অন্ধ মানুষ রাস্তা পার হতে চায়
মানুষ চায় অন্যরা তাদের নিয়ে কথা বলুক
প্রশংসা করুক
যন্ত্রণাবিহীন একটা জীবন কাটাতে চায় দীর্ঘদিন ধরে
আর মৃত্যুর আগে
একটু অমরতাও প্রার্থনা করে।
আধুনিক জার্মান সাহিত্যের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব জর্জ স্টাইনার। মূলত ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার হিসেবেই বেশি জনপ্রিয়। কিন্তু লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। কবিতা সংখ্যায় কম লিখলেও, তাঁর কবিতা আধুনিক জার্মান কবিতার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে, যত দিন যাচ্ছে জর্জ স্টাইনারের কবিতা নিয়ে তরুণ প্রজন্মের কবিদের মধ্যে উৎসাহ তত বাড়ছে। ১৯৩০ সালে সুইৎজরল্যন্ডে জন্ম। ঘুরেছেন সারা বিশ্ব। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ডার স্কোয়ার্জে কাস্টেন প্রকাশিত হয় ১৯৬৫ সালে। কবিতা লেখার পাশাপাশি তিনি টেলিভিশন সিরিজ, ফিল্মের স্ক্রিপ্ট, নাটক লিখেছেন। লিখেছেন অসংখ্য ছোটগল্প। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ, গ্রেঞ্জেন গাব। তাঁর কবিতা কাঠামোয়, বক্তব্যে এবং ভাষায় এক স্বতন্ত্র ঘরানার।
অনুবাদ কবিতা(বিদেশী)-২
লুইস এলিজাবেথ গ্লাক
জন্ম : লুইস গ্লাকের জন্ম ১৯৪৩ সালে, নিউইয়র্কে। ১৯৬৮ সালে প্রথম বই ফার্স্টবর্ন দিয়ে কবি হিসেবে তাঁর অভিষেক। অল্প সময়েই তিনি মার্কিন সমকালীন সাহিত্যে নিজের স্বতন্ত্র জায়গা করে নেন। ২০২০ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইসমূহ– ফেইথফুল অ্যান্ড ভার্চুয়াস নাইট, কাব্য সংকলন পোয়েমস ১৯৬২-২০১২, প্রুফস অ্যান্ড থিওরিজ, আমেরিকান অরিজিন্যালিটি ইত্যাদি।
অনুবাদক : সহিদ পারভেজ
জন্ম: ১৯৮৬ সালে রাজশাহী বিভাগের বগুড়া জেলার সূত্রাপুরে। লেখালেখির হাতেখড়ি স্কুলজীবনেই, তবে বিস্তার লাভ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে। প্রকৃতি,প্রেম,যাপিত জীবন ও সমসাময়িক পারিপার্শ্বিকতা তার লেখায় প্রকাশ পায়। তার প্রকাশিত বইসমূহ ‘সিক্সটি নাইন’ ও ‘নিত্যদিন’।
ইচ্ছেডানা
মনে পরে সেই সময়টা
যখন তুমি স্বপ্ন বুনেছিলে!
আমিও লক্ষ-কোটি স্বপ্ন বুনেছি।
সেদিন ইচ্ছেডানা সম্পর্কে আমি তোমাকে মিথ্যে বলেছিলাম,
আমি বরাবরই ভাবতাম তুমি কি চাও!
তুমি কি কখনও ভেবেছো,আমি কি চেয়েছিলাম!
জানিনা ফিরতে পারবো কিনা,
তবে এটা জানি–
আমরা যে কোন উপায়ে শেষপর্যন্ত মিলিত হবো।
সব সময় যা চেয়েছি,আজও তাই চাই-
আরেকটি কবিতা বুনতে চাই আমি।
......................
অনুবাদ কবিতা(বিদেশী)-৩
নাইজার কাব্বানি (Nizar Qabbani) -এর কবিতা : In the Summer গ্রীষ্মের সময়
অনুবাদক : শুভেন্দুবিকাশ অধিকারী
নাইজার কাব্বানি (1923-1998) একজন সিরিয়ান কবি, প্রকাশক ও ডিপ্লোমাট। মূলত রোমান্টিক ধারার এই কবি তাঁর কবিতায় প্রেম, নারীবাদ, ধর্ম এবং আরব জাতীয়তাবাদ এর মত বিষয়গুলিকে প্রকাশ করেছেন এক সহজ মাধুর্যে। তাঁর প্রকাশিত 34 টি কাব্যগ্রন্থের মধ্যে কয়েকটি হল— The Brunette Told Me (1944), My Beloved (1961), Diary of an Indifferent Woman (1968), Poems Against the Law (1972), I Love You, and the Rest is to Come (1978), Insane Poems (1985), Alphabet of Jasmine (1998)। তাঁর কবিতা ইংরেজি, হিন্দি, নেপালি সহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁকে সিরিয়ার জাতীয় কবি হিসেবে গণ্য করা হয়।
In the Summer
গ্রীষ্মের সময়
আমি মেলে দিই আমার শরীর বেলাভূমিতে
আর ভাবতে থাকি তোমার কথা।
আমি যদি সাগরকে বলতে পারতাম
তোমার জন্য আমার অনুভব
সে তার বেলাভূমি ছেড়ে
তার ঝিনুকদের ছেড়ে
তার মাছেদের ছেড়ে
ছুটে আসত আমার পিছু পিছু।
************
অনুবাদ কবিতা(অন্য প্রদেশের)-১
মারাঠি সন্ত কবি সয়রাবাঈ-এর কবিতা
অনুবাদ – বেবী সাউ
১৪ শতকে মারাঠি এক সন্ন্যাসী কবি ছিলেন সয়রাবাঈ ( অথবা সয়রাবাই) । এই নারী সেই সময়কার মারাঠা সমাজে ছিলেন ব্রাত্য মাহার সম্প্রদায়ের। বসবাস করতেন পবিত্র নগরী পান্ধারপুরে। তিনি ছিলেন তাঁর স্বামী চোখামেলার শিষ্যা। তিনি অনেক গানই লিখেছিলেন, যেগুলির বেশিরভাগই নষ্ট হয়ে গেছে। সেগুলির মধ্যে ৬২টি গান এখনও পাওয়া যায়। তাঁর অভঙ্গাগুলিতে তিনি নিজেকে চোখামেলার মাহারি রূপে বর্ণনা করেছেন। ঈশ্বরকে অভিযোগ জানিয়েছেন কেন তিনি দলিতদের ভুলে যান এবং দলিতদের জীবন হয়ে ওঠে দুর্দশাগ্রস্ত। তাঁর ভক্তিগীতিগুলিতে তিনি অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে তীব্র কণ্ঠে প্রতিবাদ জানান। দলিতদের যে অল্প মাত্রায় খাদ্যশস্য দেওয়া হত, তাতে তাদের পেট চলত না। এ নিয়েও তাঁর গান রয়েছে। তাঁর ভক্তিগীতিগুলিতে রয়েছে ঈশ্বরের সঙ্গে মিলনের কথা, এক অদ্বৈত সত্তার কথা এবং অস্পৃশ্যতা যে কোনও ভাবেই ঈশ্বরের অনুমোদিত হতে পারে না, সে সম্পর্কেও তীব্র বক্তব্য। ভক্তি এবং অস্পৃশ্যতার মধ্যে পার্থ্যকের কথাটি তিনি তীব্র ভাবেই বলেন তাঁর গানে। স্বভাবতই, সে সময়কার ব্রাহ্মণ্যসমাজে এই সব গানগুলি ছিল তাদের একপ্রকারের অস্বীকার করাই। মারাঠি সন্ত মহিলা যাঁরা, তাঁরা বেশিরভাগই ছিলেন দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ। অনেক অস্পৃশ্যতা, দারিদ্র্য এবং ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের অত্যাচার সহ্য করেও, তাঁরা গান লিখেছেন, গান গেয়েছেন। সেই সব গান এবং ভাবনা ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মধ্যে। সয়রাবাঈয়ের এই গানগুলি ইংরিজি অনুবাদ করেছেন জেরি পিন্টো এবং মীরা ভাগবৎ। ইংরিজি অনুবাদ থেকেই বাংলায় ভাষান্তর করলেন বেবী সাউ।
সয়রাবাঈ-এর কবিতা
কতটা মৃত্যু, কতটা কান্না
কতটা মৃত্যু, কতটা কান্না
কে আকাশে তোমার দিকে চেয়ে হাসছে?
আমরা তাকিয়ে থাকি বিস্ময়ে, আর ভাবি, সত্য কী?
আর কেন এত মায়ার প্রতি মন চলে যায়?
মৃত্যু কী? শোকই বা কী?
কার প্রতি হেসে উঠি ভাবনা ছাড়াই?
কাকে ছেড়ে দিই? কাকে ছেড়ে চলে যাই?
আমাদের প্রত্যেকের নিয়তিই একই সূত্রে গাঁথা
সয়রা বলে, এসব কথার উত্তর কি হয়?
এগুলির একটিও যে ঈশ্বরকে ডাকে না আর…
**************************
অনুবাদ কবিতা(অন্য প্রদেশের)-২
তামিল কবিতা (অনুবাদ-সুবল দত্ত)
সুন্দরা রামস্বামী(পাসুভিয়া)
আমার লজ্জা
গাছ কিজানে তার কতো পাতা প্রস্ফুটিত হোলো
ওর কি ইচ্ছে হয়না আকাশের আয়নায় নিজেকে দেখার
যে হাত তার শিশু চারা উপড়ে ফেলে তার বিষয়ে কি ভাবে
জ্যোৎস্না রাতে তার কেমন আনন্দ হয়
পাখিদেরকে বাসার কথা কি বলে
এসব বুঝিনা বলে আমার লজ্জা হয়
সুন্দরা রামস্বামী (1931)এক প্রখ্যাত তামিল কবি। ১৯৮৮তে একটি বিখ্যাত পত্রিকা কালচুভাডু প্রকাশ করেন। তিনি পাসুভিয়া নাম নিয়ে ১০৮ টি কবিতা লেখেন যা এখানে পপুলার। তিনি টরোনটো থেকে কুমারন আসান এওয়ার্ড ও কানাডা থেকে কথাচুড়ামনি সন্মানে বিভূষিত।
***********************
জয়দেব রচিত গীতগোবিন্দ কাব্যের প্রথম আরম্ভ-সর্গের নাম সামোদ দামোদর। দামোদর শব্দটির মধ্যে জননী যশোমতীর দামবন্ধনের স্নেহ-শাসন চিহ্নিত আছে। কৃষ্ণ যখন শৈশব, কৈশোর-পৌগণ্ড ছাড়িয়ে যৌবন-সন্ধিতে নায়ক হয়ে উঠেছেন তখনও এই নামটি ব্রজবাসী জনের আদরের নাম হয়ে উঠেছে। ভাসের নাটকে তাঁকে ব্রজবাসীরা ভ্রাতা হিসেবে মেনে নিয়েও প্রভু দামোদর বা ‘ভর্তা দামোদর’ বলে সম্বোধন করেছে। সেই দামোদরকে জয়দেব কবি নববসন্তের আগমনে ব্রজরমণীদের মধ্যে সখীসঙ্গে রাসরঙ্গে আমোদিত রসমূর্তি হিসেবে কল্পনা করেছেন। কিন্তু দামোদর কৃষ্ণের এই আমোদিত রূপ যে সেই ‘অবতার-লীলা-বীজ’ কৃষ্ণেরই লীলায়িত রূপ সেটা প্রথমেই দশাবতার-স্তোত্র শুনিয়ে জয়দেব বলে দিয়েছেন। প্রথম সর্গের আরম্ভে নাটকীয় নান্দীশ্লোকে রাধা এবং মাধবের কুঞ্জভ্রমণ-মধুরতার বর্ণনা দিয়ে ব্রজকুলের রমণীদের বিলাস-কলা বর্ণনার মধ্যেই যশোমতীর স্নেহলালিত দামোদর দামোদ-দামোদর হয়ে ওঠেন। প্রথম সর্গের শেষে জয়দেব লেখেন—কুঞ্জবিপিনে কৃষ্ণের বিনোদনী কলা-সমন্বিত কেলিরহস্য সকলের শুভ বিধান করুক। দামোদর কৃষ্ণের সামোদ হয়ে ওঠার রহস্যও এখানেই—শ্রীজয়দেব-ভণিতমিদম্-অদ্ভুত-কেশব-কেলি রহস্যম্। এই সর্গেই তিনি ‘কেশব ধৃত-দশবিধরুপ’ আবার এখানেই ‘কেশব-কেলি-রহস্যম্।
গীতগোবিন্দ : প্রথম সর্গ : সামোদ দামোদর
“গগন হয়েছে পূর্ণ নীল-মেঘ-মালে,
অরণ্য শ্যামল-বর্ণ শ্যামল তমালে,
নিশাও প্রসারে হের স্বতিমির-পুঞ্জে;
হে ভীরু শ্যামেরে তুমি লহ, গো, নিকুঞ্জে।”
শুনিয়া সখীর সেই সুখের আদেশ
চলেন নিকুঞ্জে রাই লইয়া প্রাণেশ;
পথেতে বিবিধ কেলি করেন দুজনে
কলিন্দনন্দিনী-তীরে আনন্দে বিজনে।
হউক ভকত চিতে সুখের সঞ্চার,
জয় জয় রাধা -কৃষ্ণ নিকুঞ্জ-বিহার। [১]
পদ্মাবতী-চরণের প্রধান কিঙ্কর
শ্রীহরির সুচরিতে চিত্রিত অন্তর
কবি জয়দেব ভনে এ মধুর গীত,
কৃষ্ণের নিকুঞ্জ-লীলা যাহাতে বর্ণিত।
শ্রীহরি-চিন্তায় যদি মজে হে মানস,
প্রেম-লীলা কীর্ত্তনেতে যদি মিলে রস;
শুন তবে জয়দেব-রচিত সঙ্গীত,
সুকোমল সুমধুর অতি সুললিত।
বচন বিস্তারে পটু উমাপতি ধর,
শরণ জানেন মাত্র শব্দ-আড়ম্বর,
গোবর্দ্ধনে আদি বিনা অন্য রস নাই,
শ্রুতিধর ধোয়ী লেখে শুনে যাহা তাই;
একা জয়দেব জানে বিশুদ্ধ রচনা
অর্থ-সহ যথা যোগ্য শব্দের যোজনা। [২-৪]
***********************
বসন্ত-বিহার
বিদ্যাপতি
আওল ঋতুপতি রাজ বসন্ত / ধাওল অলিকুল মাধবি-পন্থ ।।
দিনকর-কিরণ ভেল পয়গন্ড / কেসর-কুসুম ধরল হেমদন্ড ।।
নৃপ আসন নব পীঠল পাত / কাঞ্চন-কুসুম ছত্র ধরু মাথ ।।
মৌলি রসা-ল মুকুল-ভেল-তায় / সমুখহি কোকিল পঞ্চম গায় ।।
সিখিকুল নাচত অলিকুল যন্ত্র / আন দ্বিজকুল পড়ু আসিস-মন্ত্র ।।
চন্দ্রাতপ উড়ে কুসুম-পরাগ / মলয়-পবন সহ ভেল অনুরাগ ।।
কুন্দবল্লী তরু ধরল-নিসান / পাটল তূণ অশো-ক দল বান ।।
কিংসুক লব-ঙ্গলতা একসঙ্গ / হেরি সিসির ঋতু আগে দেল ভঙ্গ ।।
সৈন্য সাজল মধুমক্ষিক-কুল / সিসিরক সবহু করল নিরমূল ।।
উধারল সরসিজ পাওল প্রাণ / নিজ নবদলে করু আসন দান ।।
নব বৃন্দাবন রাজ্যে বিহার / বিদ্যাপতি কহ সময়ক সার ।।
****************
পূর্বরাগ
চন্ডীদাস
রাধার কি হৈল অন্তরে ব্যাথা |
বসিয়া বিরলে থাকয়ে একলে
না শুনে কাহারো কথা ||
সদাই ধেয়ানে চাহে মেঘ-পানে
না চলে নয়ান-তারা |
বিরতি আহারে রাঙাবাস পরে
যেমত যোগিনী-পারা ||
এলাইয়া বেণী ফুলের গাঁথনি
দেখয়ে খসায়ে চুলি |
হসিত বয়ানে চাহে মেঘ-পানে
কি কহে দুহাত তুলি ||
একদিঠ করি ময়ূর-ময়ূরী
কণ্ঠ করে নিরিক্ষণে |
চণ্ডীদাস কয় নব পরিচয়
কালিয়া-বঁধুর সনে ||
———————
একলে – একলা, একাকিনী। ধেয়ানে – ধ্যানে। \”বিরতি আহারে\”–পদকল্পলতিকা। পারা – মত; ন্যায়। \”ফুলয়ে গাঁথনি\” পাঠও আছে। চুলি – চুল।হসিত বয়ানে – হাসি মুখে। একদিঠ – এক দৃষ্টি।
ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর ব্রজবুলি ভাষায় রচিত একটি কাব্যগ্রন্থ। রবীন্দ্রনাথ কৈশোর ও প্রথম যৌবনে "ভানুসিংহ" ছদ্মনামে বৈষ্ণব কবিদের অনুকরণে কিছু পদ রচনা করেছিলেন। ১৮৮৪ সালে সেই কবিতাগুলিই ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী নামে প্রকাশিত হয়।
ভানুসিংহের পদাবলী
গহন কুসুমকুঞ্জ-মাঝে
গহন কুসুমকুঞ্জ-মাঝে
মৃদুল মধুর বংশি বাজে,
বিসরি ত্রাস-লোকলাজে
সজনি, আও আও লো।
অঙ্গে চারু নীল বাস,
হৃদয়ে প্রণয়কুসুমরাশ,
হরিণনেত্রে বিমল হাস,
কুঞ্জবনমে আও লো॥
ঢালে কুসুম সুরভভার,
ঢালে বিহগ সুরবসার,
ঢালে ইন্দু অমৃতধার
বিমল রজত ভাতি রে।
মন্দ মন্দ ভৃঙ্গ গুঞ্জে,
অযুত কুসুম কুঞ্জে কুঞ্জে,
ফুটল সজনি, পুঞ্জে পুঞ্জে
বকুল যূথি জাতি রে॥
দেখ সজনি, শ্যামরায়
নয়নে প্রেম উথল যায়,
মধুর বদন অমৃতসদন
চন্দ্রমায় নিন্দিছে।
আও আও সজনিবৃন্দ,
হেরব সখি শ্রীগোবিন্দ
শ্যামকো পদারবিন্দ
ভানুসিংহ বন্দিছে॥
******************
চণ্ডালিকা
সব্যসাচী দেব
মা, দিগন্তে তাকিয়ে দেখ
রক্তিম মেঘে সর্বনাশের আভাস,
ওই সর্বনাশের আগুন পেরিয়ে
আমার দুয়ারে এসে দাঁড়ায়নি কোনো আনন্দ,
অঞ্জলি পেতে কেউ বলেনি- ‘জল দাও’।
সারাজীবন আমাকেই তীব্র পিপাসায়
চিৎকার করতে হয়েছে- জল দাও, জল দাও।
চৈত্রের মধ্য দুপুরে পাখিরাও ডানা গুটিয়ে নেয়,
দূর শহরের রাস্তায় বাবুদের ভিড় নেই,
গাঁয়ের কুকুরগুলো ঢুকে যেতে চায় উঠোনের ছায়ায়;
আমাকে এখন যেতে হবে দূর নদীর চড়ায়,
বালি খুঁড়ে তুলে আনতে হবে ফোঁটাফোঁটা জল,
তারপর ফিরে আসব খরায় ফাটা মাঠ, শুকনো পুকুর
আর টলটলে জলে ভরা নতুন ইঁদারার পাশ দিয়ে-
বাবুদের ইঁদারা ;
তৃষ্ণায় ডুবে যায় আমাদের গোটা গাঁ,
কুকুর আর মানুষের জিভ ঝুলে পড়ে,
আর বাবুদের ইঁদারায় বাবুদের ছেলেদের স্নান;
আমাদের শরীর জ্বলে যায় চৈত্রের খরায়।
মা, আমি এক চণ্ডালিকা;
বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, রাঢ়ের হা-হা করা মাঠ ফাটিয়ে,
বিহারের তপ্ত প্রান্তর চিরে আমি চিৎকার করছি
জল দাও।
আর আমার সারা শরীরের রক্ত উঠে আসছে মাথায়।
মা, একফোঁটা জলের দাম আমাদের গোটা জীবন।
*********************
আগুনের মাঝখানে
ব্রত চক্রবর্তী
আগুনের একেবারে মাঝখানে এসে দাঁড়ালে
আর আগুন লাগে না।
আগে আশে-পাশে থাকতুম।
হাত পুড়ে যাবে, মুখ পুড়ে যাবে, বুক পুড়ে যাবে,
সর্বদা ভয় ছিল।
এখন এসে দাঁড়িয়েছি আগুনের একেবারে মাঝখানে।
হাত পুড়ে যাচ্ছে, মুখ পুড়ে যাচ্ছে, বুক পুড়ে যাচ্ছে,
এখন আর ভয় নেই।
এখন ডানায়, প্রত্যেক পালকে আগুন।
কিন্তু দারুণ অবাক হয়ে দেখছি :
আমাকে পোড়াতে গিয়ে, এই প্রথম, আগুন নিজেও পুড়ছে।
**************************
এক বিকেলের কথা
শ্রীজাত
আজ অন্তত ঘড়ির দিকে তাকাস না,
টুকরো করে উড়িয়ে দে সব সমস্যা __
চিন্তা তোকে মানায় না। দ্যাখ, আকাশ লাল
আজ অন্তত ফিরিস না ভিড় মেট্রোতে
ট্রাম চড়ব, ঘুরবে চাকা ঝমরঝম...
দু'জনে খুব গন্ধ নেব রেড রোডের
আজ অন্তত চুল খুলে দে দিগ্বিদিক
ডাইনে-বাঁয়ে লোকগুলো সব মূর্ছা যাক
ইচ্ছে ক'রে মিথ্যে কথার দিব্যি দিই
আজ অন্তত রাস্তা পেরোই হাত ধ'রে
তুই একবার সাধলেই জোর ফুচকা খাই,
কান টেনে বল - ' ইস, কী আমার বাধ্য রে __'
আজ অন্তত বলিস না সব গল্প শেষ
হয়ত শুরুই হয়নি কোনও রূপকথা...
ওই তো, একটা একলা চেয়ার। চল, ব'সে
আমার নতুন লেখা শোনাই খানতিনেক
বাকিজীবন অশান্তিতে ভুগব, তাও
আজ অন্তত,
আজ অন্তত,
আজ অন্তত আমার কাছে শান্তি নে ____ !
**************************
babumosay2
রাজসভায় মাধবী
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
(একটি সংলাপ কাব্য)
(গৌড়বঙ্গের অধীশ্বর লক্ষ্মণসেন দেবের রাজসভা। রাজার দুপাশে বসে আছে কয়েকজন মন্ত্রী ও কবি। এদের মধ্যে আছে রাজার বাল্যসুহৃদ ও প্রতিপত্তিশালী মন্ত্রী হলায়ুধ মিশ্র, প্রবীণ মন্ত্রী উমাপতিধর, রাজগুরু গোবর্ধন আচার্য এবং তিন সভাকবি: জয়দেব, শরণ ও ধোয়ী। রাজকার্যের বদলে এখন সভায় কাব্যচর্চা চলেছে।]
লক্ষ্মণসেন : ভ্রমর, ভ্রমর! কেন মনে হয় মানুষের চেয়ে
ভ্রমরেরা বেশি সুখী! বসন্ত পবনে যত কাব্যের ভ্রমর
আপনারা ভাসিয়ে দেন তারা সব আনন্দের মণি,
অতৃপ্ত মানুষ তবে ভ্রমরের নামে দেয় প্রাণের উপমা
ধোয়ী : অতৃপ্ত মানুষ! এই সাগর মেখলা পুণ্যভূমি—
বীরশ্রেষ্ঠ, প্রজাপূজ্য, দানশৌণ্ড রাজা যার অধীশ্বর
সে রাজ্যে তো অসুখী বা অতৃপ্ত মানুষ কেউ নেই
শরণ : একটি ভ্রুক্ষেপে আপনি জয় করেছেন গৌড়লক্ষ্মী, আর
নিতান্ত খেলার ছলে বিজিত কলিঙ্গদেশ, শুধু
অঙ্গুলি হেলনে ক্লিষ্ট চেদীরাজ, কাশী ও মগধ
আপনার পদসেবী, অভিমান-হৃত কামরূপ
নিদাঘ সূর্যের মতো আপনার তেজে দগ্ধ অবাধ্য, দুর্জন
মহারাজ, আপনার মুখে কেন অতৃপ্তির কথা?
জয়দেব : অতৃপ্তি তো রাজরোগ। এরই জন্য পররাজ্য জয়
স্বয়ং কেলিনায়ক যিনি, তাঁরও কণ্ঠে শোনা যায় রতি
হাহাকার
যে রাজা জঙ্গমহরি, তিনিও কি নন আরও যশের
ভিখারি
যিনি যাচকের কল্পদ্রুম, হায় নিজের যাজ্ঞা কি তাঁর
কখনো মিটেছে?
[বাইরে কিসের যেন কোলাহল। রাজা স্থির নেত্রে দ্বারের দিকে তাকালেন। হলায়ুধ মিশ্র হাঁক দিয়ে বললেন, দৌবারিক, দেখো তো!]
ধোয়ী : এই স্নিগ্ধ গঙ্গাদেশ, অসংখ্য কুসুম সুবাসিত
মধুলোভী অলিকুল পারিজাত বন ছেড়ে মেঘ হয়ে
আসে
ভূভারতে এরকম শান্তিময় দেশ আর দ্বিতীয় নেই
লক্ষ্মণসেন : আবার ভ্রমর! কবিবর, উপমায়, অলঙ্কারে
এই পতঙ্গটি নিয়ে বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে যেন!
দৌবারিক : রাজসন্দর্শন চায় এক গুচ্ছ নারী ও পুরুষ
মনে হয় তারা ক্ষুব্ধ…
ধোয়ী : ক্ষুব্ধ? এই শব্দটি কি সঠিক হলো হে, দৌবারিক?
তারা প্রার্থী হতে পারে, এই রাজ্যে ক্ষুব্ধ কেউ নয়
হলায়ুধ মিশ্র : আসুক দুজন প্রতিনিধি, যুগ্ম নারী ও পুরুষ।
অন্যেরা দূরত্বে থাক…
[সভাস্থলে মাধবী ও কঙ্কের প্রবেশ। মাধবী আলুলায়িত কুন্তলা, ফুরিতধরা, একবস্ত্রা। তার চক্ষুদুটি কিছুক্ষণ আগে অধৌত হবার কারণে এখন অত্যুজ্জ্বল। তপ্তকাঞ্চনবর্ণা এই সদ্য যুবতীটি বিবাহিতা। সঙ্গের লোকটি তার ভাই, সে রক্তাম্বর পরিহিত। পুরুষটি রাজা ও অন্যদের অভিবাদন জানালো, নারীটি রইলো অধোবদনে।]
হলায়ুধ মিশ্র : যা কিছু বলার আছে, সংক্ষেপে বলো
কঙ্ক : সসম্মান পুরঃসর নিবেদন এই, মহারাজ,
দক্ষিণ নগরবাসী সার্থবাহ সম্প্রদায় প্রতিভূ আমরা
এসেছি নিতান্ত বাধ্য হয়ে সুবিচার প্রত্যাশায়
আপনার গুণ গান মনস্বী ও নিঃস্বগণ সমস্বরে গায়
আপনার বাক্য যেন স্বর্ণসম সুদৃঢ়, সুন্দর
ন্যায় ও অন্যায় আছে তুলাদণ্ডে, হে দীনপালক…
রাজা : সুবিচার? কিসের বিচার?
কঙ্ক : বিদ্যুল্লেখার মতো নিষ্কলঙ্ক, তেজস্বিনী, এই যে বালিকা
আমারই সহোদরা, এর দুভার্গের কথা কী করে যে
বলি।
ঐ যে সুপ্রাচীন মহামন্ত্রী, তিনি তো জানেন সব
[কঙ্ক রাজসভার এক প্রান্তে উপবিষ্ট প্রবীণ মন্ত্রী উমাপতিধরের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলো।]
রাজা : জ্ঞানীশ্রেষ্ঠ উমাপতি, আপনি কি চেনেন এঁদের?
উমাপতি : বিলক্ষণ চিনি, মহারাজ, জলপ্রপাত তাড়িত
অরণ্য প্রাণীর মতো এরা এসেছিল একদিন।
অন্যায়ের প্রতিকার প্রার্থনায়
রাজা : আপনার কাছে এসেছিল? তবে সেই তো যথেষ্ট
আপনি কি দেননি বিধান?
উমাপতি : দিইনি, পারিনি দিতে এমনও ঘটনা কিছু ঘটে
বিচারকও বিচারপ্রার্থীর মতো অসহায় হয়
রাজা : ঠিক বোধগম্য যেন হলো না কথাটা। দোষী অথবা
নির্দোষ
বেছে নিতে ভুল হয় আপনার মতো এত প্রাজ্ঞ
মানুষেরও?
উমাপতি : ভুল নয়, মহারাজ, দ্বিধা
রাজা : দ্বিধা?
শরণ : আহা, বিচারপ্রার্থীরা যদি সশরীরে উপস্থিত
ওদের স্বমুখে তবে শোনা যাক সমুদয় কাহিনী বর্ণন
ধোয়ী : ঠিক ঠিক
রাজা : তোমরা নির্ভয়ে বলল, কী বিচার চাও
কঙ্ক : মহারাজ, ভগিনীর দুর্ভাগ্যের কথা এত সজ্জন সমীপে
বর্ণনা করার মতো শব্দশাস্ত্রজ্ঞান নেই, যদিও আমার…
যদিও আমার…
বক্ষ ফেটে যেন এক নাগরূপী মহাক্ষোভ মুক্তি পেতে
চায়
রাজা : শান্ত হও
হলায়ুধ মিশ্র : শান্ত হও, নাগরিক, সুস্থির নিশ্বাস নাও আগে
গোবর্ধন আচার্য : বরং প্রতিবাদিনী নিজেই বলুক তার কথা
শরণ : ঠিক ঠিক
ধোয়ী : এই রমণীরই মুখে শোনা যাক কী তার কাহিনী
[মাধবী ধীরে মুখ তুলে তাকালো, কিন্তু তার মুখে কোনো কথা ফুটল না।]
রাজা : শুভমস্তু, হে কল্যাণী,
কী জন্য এসেছো, বললো, অসঙ্কোচে বলো
ধোয়ী : রাজার প্রসন্নদৃষ্টি ধন্যা তুমি, বলো
জয়দেব: দৃষ্টোসি তুষ্টা বয়ম
শরণ : উপস্থিত সভাসদ সবাই উদগ্রীব
গোবর্ধন আচার্য : কে তুমি, রমণী, অগ্রে পরিচয় দাও
মাধবী : হে রাজন, সমুদয় গুণিজন, আমি এক বণিক দুহিতা
সিংহেন্দ্রদত্তের কন্যা, পুস্তপাল অচ্যুতভদ্রের পুত্রবধূ
প্রবাসে আছেন স্বামী দীর্ঘকাল
গোবর্ধন আচার্য : অচ্যুতভদ্রের পুত্র? বসুশিব? সে তো বহুদিন
নিরুদ্দেশ
মাধবী : নিরুদ্দিষ্ট নন, তাঁর সপ্তডিঙা ফেরেনি এখনো
অজ্ঞাত সন্ধানী তিনি দূরতর দ্বীপে ভ্রাম্যমাণ
নতুন বাণিজ্য বস্তু নিয়ে ফিরবেন
রাজা : স্বামী নিরুদ্দেশে, এই নবীন বয়সে তুমি একা
কঙ্ক : না, না, মহারাজ, একা নয়, পিত্রালয়ে
এবং শ্বশুর কুলে অনেক আত্মীয়বন্ধু আছে
আমাদের ভগিনীটি বড় আদরের
ধোয়ী : তোমার ভগ্নীকে নিজ মুখে বলতে দাও
রাজা : তুমি চাও, রাজসৈন্য, রণতরী ছুটে যাক তোমার
স্বামীর কুশল সন্ধানে?
মাধবী : সেজন্য আসিনি, মহারাজ
আমি ঠিকই জানি তিনি ফিরবেন, কথা দেওয়া
আছে।
রাজা : তবে?
মাধবী : রমণীর অধিকার আছে কি না সসম্মানে জীবন যাপনে
এসেছি সে কথা জানতে। এই রাজ্যে নারীর মর্যাদা
যদি কেউ কেড়ে নেয়, সেই পাবে রাজ অনুগ্রহ?
রাজা : অলীক, অদ্ভুত প্রশ্ন। সনাতন ধর্ম অনুসারে
এ রাজ্য শাসন হয়, যদি কেউ অপর নারীকে
লোলুপ দৃষ্টিতে দেখে, তপ্ত তৈলে তার দুই চোখ
চির অন্ধকার হবে, এরকমই রয়েছে বিধান।
মাধবী : লোলুপ দৃষ্টিতে শুধু নয়, মহারাজ, এক প্রবল পুরুষ
প্রতিদিন নখ আর দন্ত দিয়ে ছিঁড়ে নিতে চায়
আমার সন্ত্রম।
রাজা : সে কি! কে সে নরাধম? এই রাজ্যে কে আছে এমন
ধোয়ী : এ যে অসম্ভব
উমাপতি : নাম বলল, হে মাধবী, স্পষ্টাক্ষরে, মুক্ত কণ্ঠে বলো
মাধবী : মহারাজ…
রাজা : বলো সে পাপীর নাম, পূর্বাহ্নেই অভয় দিয়েছি
মাধবী : প্রোষিতভর্তৃকা আমি, মহারাজ, তবু নই নিঃস্ব অসহায়
ভাই বন্ধু পরিজন, আছে আরও বহুতর স্নেহের
আড়াল
কাব্য-সঙ্গীতের সুধা ভরে রাখে নিজস্ব সময়
কখনো আকাশ দেখি, দূর বনানীর রেখা চক্ষু টেনে
নেয়
এই সব নিয়ে বেশ সুখে থাকা
একা একা গড়ে তোলা নিজস্ব ভুবন
একি কোনো অপরাধ?
রমণীর একাকিত্বে সুখ ভোগে নেই অধিকার?
উমাপতি : যে তোমার নিজস্ব ভুবনখানি মত্তহস্তীসম
বারবার দলে দিয়ে যায় তার পরিচয় দাও
মাধবী : নদীতে অবগাহনে সুখ ছিল, এক দর্পী পুরুষের হাত
কেড়েছে নদীর পথ, নদীও আমার দুঃখ জানে
অলিন্দে দিগন্ত রেখা…সেখানেও মূর্তিমান বাধা
আমার সঙ্গীত সাধা প্রতিদিন ভাঙে এক লোভীর
চিৎকারে
এমন কি রাজপথে প্রকাশ্য দিনের মধ্যে বাহু চেপে
ধরে ক্ষ
মতান্ধ এক যুবা আমাকে আঁধার দিকে নিয়ে যেতে চায়
রাজা : কে সে নরাধম? তার আয়ু আমি কেড়ে নেবো এক
লহমায়
নাম বলো
মাধবী : সকলেরই পরিচিত সেই নাম, শ্রীমান কুমারদত্ত,
তিনি…
রাজা : শ্রীমান কুমারদত্ত! অর্থাৎ..অর্থাৎ…
উমাপতি : আপনার নিজের শ্যালক, মহারানী বল্লভার প্রিয় ভ্রাতা
সুতরাং মহারাজ, এবার বুঝবেন, আমি সব কিছু জেনে
জনতার সাক্ষ্য নিয়ে, তবু কেন বিচারে হয়েছি অপারগ
রাজা : এ যে অবিশ্বাস্য! এ যে নিতান্ত সুদূরতম স্বপ্নেরও
অতীত
বীরশ্রেষ্ঠ, ন্যায়শীল, ধীমান কুমারদত্ত এরকম পাপী?
না, মন্ত্রী উমাপতি, অবশ্যই কিছু ভ্রান্তি ঘটেছে
কোথাও
কিছুতে কুমার নন, অন্য কেউ, অবয়বে কুমার সদৃশ!
উমাপতি : অন্তত পঞ্চাশজন স্বচক্ষে দেখেছে, তারা কুমারকে
চেনে
কঙ্ক : যদি অন্য কেউ হতো, অন্য কোনো কুলাঙ্গার, তবে
নিজ হাতে
এক খগাঘাতে তার মুণ্ড ছিন্ন করে এনে
দিতাম চরণে, মহারাজ
হলায়ুধ মিশ্র : প্রসীদ, প্রসীদ! ওহে সার্থবাহ, বিস্মৃত হয়ো না
রাজার সম্মুখে তুমি কথা বলছো
কঙ্ক : সদ্যোজাত সারণীর মতন পবিত্র এই ভগিনী আমার
সে জানে না কপটতা, অনৃত ভাষণ
জয়দেব : হে কমলাননা নারী, হে বরবর্ণিনী, আরও মন খুলে
বলো
তোমার বাক্যের রঙে দীপ্ত এই রাজসভা, এ যেন
সাগরে
দিগন্ত মায়ার আলো, সহসা মরুতে নীপকন
হে সুন্দরী বলল দেখি, কাব্যপ্রিয়, ধীমান, কুমার
সে কি শুধু তস্কর, দস্যুর মতো লোভী?
প্রণয় রহস্য বড় গুঢ়, তার মর্ম শুধু দুজনায় বোঝে
তোমার মুখের জ্যোৎস্না, ওষ্ঠের অমিয় দেখে
মুনিঋষিরাও
বিচলিত হতে পারে, কুমার তো সামান্য মানুষ!
শরণ : কুমার কি কামবশে তোমার শরীর স্পর্শ করেছে?
অথবা
রচেছে বন্দনা, স্তুতি? সে তো কিছু দোষণীয় নয়
ধোয়ী : যেন সশরীর রতিপতি, সুপুরুষ বহু ললনার প্রিয়
ধীমান কুমারদত্ত প্রণয় কলায় সুনিপুণ, তার প্রতি
তোমার এমন ক্রোধ স্বাভাবিক নয়. তবে, সুন্দরী,
তুমি কি
পুর্ব কোনো প্রতিশ্রুত স্মরণ-বেদনা নিয়ে এসেছো
এখানে?
উমাপতি : বাঃ বাঃ চমৎকার? অতি চমৎকার, হে মহান
রাজকবিগণ
সম্মুখে রয়েছে এক কাতর হরিণী, এক দুঃখদগ্ধ নারী
অপমান বিষে যার সর্বাঙ্গে বিষম জ্বালা, পাণ্ডুর কপোল
তার হৃদয়ের হাহাকারে বুঝি কবিদের করুণা জাগে
না?
আপনারা শুনতে চান রসালো প্রণয় গল্প, অথবা নতুন
রচনার বিন্দু বিন্দু উপাদান খুঁটে খুঁটে নিতে চান বুঝি?
জয়দেব : (স্বগত) আগে রূপ,শরীরের রহস্য কাহিনী, পরে মর্মের
সন্ধান
প্রথমেই মন নিয়ে টানাটানি যে করে সে মুর্খ, কবি
নয়!
রাজা : কে সঠিক অনাচারী, পুনরায় ভেবে বলো
নারী শাস্তির যে যোগ্য তার কিছুতে নিস্তার নেই এই
গৌড়ভূমে
মাধবী : যদি মিথ্যা বলে থাকি…
জিহ্বা যেন শতখণ্ড হয়ে খসে পড়ে
যদি মিথ্যা বলে থাকি….
বাক হোক রুদ্ধ, চক্ষে নিবে যাক জ্যোতি
যদি মিথ্যা বলে থাকি…
জননীও ভুলে যাবে এ কন্যার কথা
মহারাজ, শুধুমাত্র রাজ অনুগ্রহ বলে বলী যে পুরুষ
নারীকে লুণ্ঠনযোগ্য মনে করে, সে রয়েছে এ
রাজপ্রাসাদে
দুঃশীল কুমারদত্ত, আর কেউ নয়!
উমাপতি : মহারাজ, দীপ্তিময় এ নারীর প্রতিটি অক্ষর সত্য
[হঠাৎ সভাস্থলে পাটরানী বল্লভার দ্রুত প্রবেশ]
বল্লভা : মিথ্যা! মিথ্যা! এইসব কথা
মিথ্যার কুটিল জাল…
রাজা : এ কী, মহারানী!
এই রাজসভা মধ্যে…না, না, ফিরে যাও
সামান্য এ রাজকার্য দ্রুত সেরে আমি যাব তোমার
সন্নিধে
বল্লভা : সামান্য এ রাজকার্য? চেড়ীর বর্ণনা শুনে এসেছি
এখানে
আপনি সরলমতি, ক্ষমাশীল, সে সুযোগে ষড়যন্ত্রীগণ
সর্বনাশ করে দিত আমার আড়ালে!
রাজা : না না, সেরকম কিছু নয়। এ তো দৈনন্দিন বিচারের
সভা
কিসের বা ষড়যন্ত্র? মান্যগণ্য সভাসদ আছেন এখানে
বল্লভা : আপনি নীরব হয়ে শুনুন আমার কথা, আমি সব জানি
মহাষড়যন্ত্রী ঐ যে উমাপতিধর মন্ত্রী, আর এ কুলটা
এই দুই কালসর্প…
উমাপতি : আমি ষড়যন্ত্রী? মহারাজ, আচম্বিতে সভাস্থলে
এরকম পরিহাসও রুচিযোগ্য নয়
বল্লভা : সাধু সাজছেন! ভেবেছেন বুঝি পূর্বকথা কিছু মনে
নেই?
আপনি প্রাচীন ঘুঘু, স্বর্গবাসী মহামতি বল্লাল সেনের
আমল থেকেই জানা গেছে আপনার মতি গতি, সে
সময়
ছিলেন আমার স্বামী যুবরাজ, দিবানিশি রাজার সম্মুখে
করেননি যুবরাজ-নিন্দা, তাঁকে সিংহাসন বঞ্চিত করার
দেননি কি কুমন্ত্রণা?
উমাপতি : আরে ছি ছি, সব ভুল জেনেছে, বিপরীত জেনেছেন,
রানী,
সে সময় বর্তমান মহারাজ যৌন চাপল্যে কিছুদিন
ছিলেন বিপথগামী, শস্ত্রে কিংবা শাস্ত্রে ছিল অনাসক্তি
ঘোর
যে কারণে দুরন্ত অশ্বের মুখে বন্ধু টেনে এঁটে দিতে
হয়
সে জন্যই ওঁর সংযমের জন্য উপদেশ দিয়েছি
পিতাকে সিংহাসন অন্যে পাবে, এরকম কথা আমি কদাচ
ভাবিনি।
বল্লভা : তখন ভাবেননি, তবে আজ ভাবছেন, তাই এই
রমণীকে
কল্পিত কাহিনী দিয়ে, আবেগে সাজিয়ে এনেছেন
সভাস্থলে
উমাপতি : এ নারীর স্পষ্ট এক অভিযোগ আছে
বল্লভা : কুচক্রে বপন করা, স্বার্থলোভী শয়তানের মস্তিষ্ক প্রসূত
সে সব রটনা
উমাপতি : শত শত নাগরিক সাক্ষ্য দেবে!
বল্লভা :প্রজা-বিদ্রোহের হীন, কুটিল চক্রান্ত! সব জানা হয়ে
গেছে
এ জগতে অর্থবশ কে নয়? অর্থের লোভে মিথ্যা
সাক্ষী কত!
আর এই পাপীয়সী, রঙ্গময়ী বারনারী, সর্বাঙ্গে নরক
মিথ্যা হাসি কান্না যার নিত্যসঙ্গী, মিথ্যা অঙ্গভঙ্গি অস্ত্র
যার
তার কথা শুনে কেউ বিচলিত হয় যদি
কঙ্ক : সাবধান! সাবিত্রীর মতো পুণ্যশীলা
সীতাসমা সাধ্বী এই ভগিনী আমার
তার নামে যদি কেউ অপবাদ দেয়, তবে তিনি যেই
হোন, আমি তাঁকে
হলায়ুধ : মূঢ়, দুরে সরে যাও, রাজেন্দ্রাণী কথা বলছেন
রাজা: রানী, এইখানে এসে বসো, অপর পক্ষের কথা কিছু
শুনি
বল্লভা : পরন্তপ, এই সব কটুকথা শোনাও বিষম ভুল, পাপ
এই দেহ পসারিনী কী কথা জানাতে চায় তাও আমি
জানি
মাধবী : সামান্য বণিকবধূ আমি, মহারানী, অতি গুণবান স্বামী
পেয়েছি অনেক ভাগ্যে…
বল্লভা : চুপ চুপ! শুধু কি বণিকবধূ, বারাঙ্গনা, বারবধূ তুই
মাধবী : আমার স্বামীর মতো এ জীবনে আর অন্য পুরুষ দেখিনি
বল্লভা : তোর নষ্ট স্বভাবের জন্য তোর স্বামী দুঃখে নিরুদ্দেশে
গেছে।
পুরুষ-শিকারি তুই, ভেবেছিস ফাঁদ পেতে, ছলাকলা
দিয়ে
আমার ভাইকে পাবি? তবে শোন, শত শত অনূঢ়া
রূপসী
কুমারদত্তের শুধু ইঙ্গিতের অপেক্ষায় ব্যর্থ হয়ে আছে
তুই কে রে, পদনখধূলি!
মাধবী : আপনি যা বললেন, তাতে কোনো সত্য নেই
বল্লভা : সত্য, সত্য, আমি যা বলেছি তা-ই ধ্রুব সত্য, এই শেষ
কথা
মাধবী : শুধু বুঝি রানীদেরই সত্যে আছে পূর্ণ অধিকার?
বল্লভা : কাম-পূতি গন্ধ-মাখা, বন্দর-উচ্ছিষ্ট ভোজী, দূর হ! দূর
হ!
রাজা : হুঁ, এবার বোঝা গেল। ছলাকলা পটীয়সী এই ধুরন্ধরী
কুমারদত্তের নামে কলঙ্ক লেপন করে আমারই সুনাম
নষ্ট করতে চেয়েছিল, শাস্তি এরই প্রাপ্য। তবু এবারের
মতো
ক্ষমা করা গেল!
যাও নারী, গৃহে যাও, সুসংবৃত হও!
গোবর্ধন আচার্য : কেমন বিচার হলো? সাক্ষ্য প্রমাণাদি কিছু দেখাই
হলো না
হলায়ুধ মিশ্র : চুপ! রাজারানী কথা বলছেন, অন্য কারো অধিকার
নেই
মাধবী : মহারানী, আমার প্রণম্যা আপনি, শুধু এই জিজ্ঞাসা
আমার না
রী হয়ে নারীত্বকে ধুলোয় লুটোতে দেখে কখনো
আপনার
হয় না একটুও খেদ?
নারী নির্যাতনে যদি নারীর ভূমিকা এত নির্মম, নির্দয়
হয়, তবে প্রতিকার চেয়ে আর কার কাছে যাবো?
ভ্রাতৃস্নেহে অন্ধ আপনি, তবু তো আমারই মতো
আপনিও নারী
বল্লভা : ফের তোর ছোট মুখে বড় কথা? দূর হ! দূর হ!
মাধবী : যাবো, তবে তার আগে আরও একটি সরল প্রশ্নের
সদুত্তর পেতে চাই, যে-দেশের রাজকন্যা ছিলেন
একদা
সে দেশে কি বহু বল্লভার ছড়াছড়ি? সে দেশের
রমণীরা
পুরুষের সামান্য ইঙ্গিত পেলে শরীরের সব খুলে
দেয়?
পরস্ত্রী-বারস্ত্রী কোনো ভেদ নেই, সেই দেশে নারী ও
পুরুষ
সকলেই স্বেচ্ছাচারী? আপনিও কি যেথা সেথা শয্যা
পেতেছেন
পুরুষের অহঙ্কার তুষ্ট করবার অভিলাষে?
বল্লভা : ওরে পিশাচিনী, তোর এত স্পর্ধা? তবে এই মুহূর্তেই
শমন সদনে যাবি তুই
[বল্লভা মাধবীর চুলের গুচ্ছ মুঠিতে ধরে তাকে মাটিতে ফেলে পদাঘাত করতে লাগলো। ক্রুদ্ধ কঙ্ককে সরিয়ে নিয়ে গেল প্রহরীরা। গোবর্ধন আচার্য একটি খন্তা তুলে মারতে গেলেন মহারানীকে, তাঁকে বাধা দিল হলায়ুধ মিশ্র। অন্যান্য সভাকবিরা নির্বাক। রাজার চিবুক তাঁর বুকে ঠেকেছে।]
মাধবী : মারো, আরো মারো, দেখি তুমি হিংস্রতায়
কত দূর যেতে পারো
বল্লভা : আজ তোর শেষ! যদি ইষ্টনাম কিছু থাকে সেই জপ
কর
চেড়ী, চেড়ী
অগ্নি নিয়ে আয় এই বেশ্যাটাকে জীয়ন্তে
পোড়াবো
মাধবী : যদি না পোড়াও
আমি প্রায়োপবেশনে প্রাণ বিসর্জন দেবো
এই রাজসভা আজ কিছুতে যাবো না ছেড়ে, যদি না
সম্মান ফিরে পাই
এই রাজসভা আজ মৃত্যু গন্ধে ধন্য হয়ে যাবে
যে শরীরে পুরুষের লোভ সেই রক্ত মাংস
পোকা পতঙ্গের খাদ্য হবে
যে সমাজ রমণীর দেহটাই চেনে শুধু, হৃদয় চেনে না
সেখানে বাঁচতেও ঘৃণা হয়! আমি এতকাল ভেবেছি
আমার কত কিছু আছে, এই আকাশের নীল আলো,
নদীর সঙ্গীত
বৃষ্টিস্নাত দিনের সুষমা, অসীম নক্ষত্রলোক, বৃক্ষছায়া…
হঠাৎ বুঝেছি আজ পুরুষের কাম-প্রেম-আদেশ বা স্তু
তি
এর চেয়ে আর কিছু প্রাপ্য নেই নারীর জীবনে!
বল্লভা : প্রতিহারী!
এই প্রগল্ভাকে নিয়ে যাও, দুরে নগর প্রান্তের
পরিখায় ছুঁড়ে ফেলে দাও
মাধবী : পরিখায় কেন, পয়ঃপ্রণালীর গর্ভে কিংবা অতল
সাগরে
মৃত্যু যেখানেই হোক, মৃত্যু শুধু মৃত্যু, তার অন্য রূপ
নেই
শুনে রাখো শেষ কথা
যে-দেশে নারীরা শুধু খাদ্য আর ভোগ্য, পুরুষের
ইচ্ছাদাসী
সে দেশে বাঁচার কোনো সাধ নেই, এই রাজ্য রাজধানী
যাবে
কালগ্রাসে
যে রাজত্বে জননী ও জায়া ভগ্নী, স্বাধীনা নারীর নেই
স্থান
সেই রাজা কোনো দিন প্রতিষ্ঠা পাবে না, তার শিরে
বজ্রপাত হবে!
গোবর্ধন আচার্য : ছেড়ে দাও, হলায়ুধ, যদি আর এক দণ্ড থাকি
এ পাপ পুরীতে
নিঃশ্বাসের বিষে মরবো, ভ্রাতঃ, ছেড়ে দাও
হলায়ুধ মিশ্র : যাও, নগরীর বাইরে চলে যাও
[এই সময় কুমারদত্তের প্রবেশ। ঈষৎ স্খলিত কণ্ঠে সে মাধবীর নাম ধরে ডেকে উঠলো]
কুমারদত্ত : মাধবী, মাধবী, কোথা তুমি প্রাণাধিকে
মাধবী : ষোলো কলা পূর্ণ হতে এটুকুই বাকি ছিল, এসো হে
কুমার
শরীর চেয়েছে, নাও
সহস্র চোখের সামনে, প্রহরী বেষ্টিত হয়ে, সগৌরবে
নাও
তোমার স্পর্শের বিষে সেই মুহূর্তের আগে উড়ে যাবে
প্রাণ
কুমারদত্ত : শরীর তো নয় শুধু, মাধবী, তোমাকে আমি আরও
বেশি কিছু
মনে ভাবি, কল্পনা ঐশ্বর্যময়ী তুমি,
শব্দ-বর্ণ-গন্ধ মেখে সন্ধ্যার নির্জনে
তোমার সঙ্গীত সুধা, তোমার মাধুর্য, সব পেতে চাই
বল্লভা : কুমার, এখানে নয়, প্রহরীরা এ দুষ্টাকে শাস্তি দেবে
তুমি চলো বিশ্রামের কক্ষে, হাত ধরো
কুমারদত্ত : এ রমণী রত্নটিকে সঙ্গে নিয়ে যাবো
বল্লভা : না, না
কুমারদত্ত : কেনই বা না না বলছো? নিতে হবে, পেতে হবে,
আমার বাসনা
প্রত্যাখ্যান পছন্দ করে না
বল্লভা : কুমার, আমার সঙ্গে চলো দাঁড়াও!
রাজা : বল্লভা, এ কী বিপরীত রীতি, তুমি ভ্রাতাকে
দেখেই
আমাকে উপেক্ষা করে চলে যাচ্ছো
কুমারদত্ত : দিদি, এই জরফ্গবটি আর কতদিন?
বল্লভা : চুপ, ওরে চুপ
রাজা : দৌবারিক, দ্বার রুদ্ধ করো
কঠিন শৃঙ্খলে বাঁধো এই অপরাধ কর্মী প্রমত্ত যুবাকে
বল্লভা : এ কী কথা, মহারাজ? এ রকম রক্ত চক্ষু, স্বেদময় মুখ
আপনার স্বাস্থ্যের পক্ষে ঠিক নয়, শান্ত হোন! আমি
উপস্থিত
রয়েছি এখানে, তবু কুমারের অঙ্গ স্পর্শ করার সাহস
কার আছে?
কে এমন দুঃসাহসী…
রাজা : আমি! যদি বাধা আসে, তবে নিজ হাতে তরবার
ধারণ করতেই হবে। এই যুবতীর অভিশাপ বাক্য
শুনে
আতঙ্কে কম্পিত বুক। রানী, তুমি, সত্য বটে প্রেয়সী
আমার
তার চেয়ে প্রিয়তর এই দেশ, এই যুদ্ধ দীর্ণ মাতৃভূমি
কোনো ক্রমে ধরে আছি, সহসা এ নির্যাতিত নারীর
ক্রন্দনে
কেঁপে উঠলো সিংহাসন, মনে হলো পায়ের তলায়
চোরাবালি
চতুর্দিকে হাহাস্বর, আকাশে অশুভ ছায়া, প্রলয়-ইঙ্গিত
শুনি যেন অশ্বধ্বনি, ধেয়ে আসে বুঝি মহাকাল…
ওঠো হে মাধবী, তুমি শুধু নারী নও, তুমি বিশ্বের
মানবী
তুমি মাতা-কন্যা-প্রিয়া, উঠে এসো, দুই চক্ষু থেকে
মুছে ফেল অশ্রু ও অনল
ঐ পাপীর শাস্তি আমি নিজে দেবো, আজ ওর বক্ষের
শোণিতে
তোমার ললাটে আমি এঁকে দেবো জয়ের কুঙ্কুম,
দৌবারিক
ওকে নিয়ে এসো—
মাধবী : থাক থাক মহারাজ, রক্তপাতে প্রয়োজন নেই
রক্ত সন্দর্শনে তৃপ্ত হয় যে রমণী, সে কখনো
প্রকৃত মানবী নয়, আমি প্রতিহিংসাপরায়ণা নারী নই
কুমার তো কেউ নয়, সহস্রের একজন, আমার সমূহ
অভিমান
ছিল আপনার প্রতি, যেখানে বিচার অন্ধ, স্বজন
নির্দোষ
সেই গ্লানি মুক্ত করেছেন, আপনি ধন্য, আর কিছু
প্রার্থনীয় নেই
রাজা : তুমি এই পরস্ব লোভীকে ক্ষমা দিতে চাও?
মাধবী : ওকে দিন বনবাস। কিছুদিন প্রকৃতির সবুজ সেবায়
অন্তর পবিত্র হোক, মুছে যাক চক্ষের কলুষ
যার এই ধরণীর প্রতি প্রেম নেই, সেই মানুষ কখনো
নারীর প্রেমিক হতে পারে?
উমাপতি : স্বস্তি, স্বস্তি! হৃদয়বৃত্তির মধ্যে শ্রেষ্ঠ যে করুণা
হে মাধবী, তুমি তা জেনেছে
সমবেত স্বর : শান্তি, শান্তি, শান্তি, শান্তি!
*********************
কথোপকথন – ১ -পূর্ণেন্দু পত্রী
-তোমার পৌঁছুতে এত দেরী হলো ?
-পথে ভিড় ছিল ?
-আমারও পৌঁছুতে একটু দেরী হলো
সব পথই ফাটা ।
-পথে এত ভিড় ছিল কেন ?
-শবযাত্রা ? কার মৃত্যু হল ?
------------
কথোপকথন – ২-পূর্ণেন্দু পত্রী
এতো দেরী করলে কেন? সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি।
– কি করবো বলুন ম্যাডাম? টিউশনি শেষ করে বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি। আমার জন্যে তো আর গেইটের বাইরে মার্সিডিজ দাঁড়িয়ে থাকে না যে ড্রাইভারের কুর্নিশ নিতে নিতে হুট করে ঢুকে পড়বো। তাই ঝুম বৃষ্টি মাথায় নিয়ে, কাদা-জল ভেঙ্গে, গরীবের গাড়ি মানে দু’পায়ের উপর ভরসা করেই আসতে হয় আপনার আমন্ত্রণ রক্ষা করতে। তবে আজ রিক্সায় করে এসেছি নইলে একেবারে কাকভেজা হয়ে যেতাম। রিক্সা খুঁজে পেতেই যা দেরী হলো।
: ইস্ বেশ ভিজে গেছো দেখছি। কাছে এসো তো, রুমাল দিয়ে মুছে দিই।
– ওহো, আমি তো ভেবেছিলাম তোমার শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দেবে। ঠিক আছে, রুমালই সই।
: না মিস্টার, ওটা ভবিষ্যতের জন্য জমা থাকুক। যখন তোমার বউ হবো তখন ইচ্ছেটা পূরণ হবে।
– আচ্ছা। আর যদি তা না হও, তবে আমি বুড়ো বয়েসে পান চিবোতে চিবোতে কোন এক বাদলঘন দিনে বসে বসে রোমন্থন করবো আজকের এই রুমালি ভালোবাসাময় সময়টাকে। নাতিপুতিকে তখন প্রথম প্রেমিকা আর এই রুমালটার গল্প শোনাবো।
: প্লিজ, এভাবে বলো না। কেন আমি তোমাকে পাবো না? তুমি কি আমাকে চাও না? আমাকে ভালোবাসো না?
– উত্তরটা আসলে একটু কঠিন। তোমাকে চাই আবার চাই না। ভালোবাসি আবার বাসি না।
: হেয়াঁলি রাখো। আমি স্পষ্ট জানতে চাই।
– তবে শোন। আমার প্রতিদিনের জীবন সংগ্রামের নির্মম বাস্তবতা তোমার জানা নেই। সেই জীবনে তুমি কখনো অভ্যস্ত হতে পারবেও না। তোমাকে একটা প্রশ্ন করি?
: হ্যাঁ, করো।
– একটু আগে একটা টং-এর দোকানের ছাউনিতে গা বাচিয়ে রিক্সা খুঁজছিলাম। খুব শীত শীত লাগছিলো, তখন চা খেয়েছিলাম ভাঙ্গা কাপে। আধধোয়া সে কাপে লেগেছিলো অনেক মেহনতি মানুষের ঠোঁটের ছোঁয়া, লেগেছিলো থুতুও যা এখনো আমার ঠোঁটে লেগে আছে। তুমি কি পারবে সেই ঠোঁটে চুমু খেতে?
----------------
কথোপকথন –৩ – পূর্ণেন্দু পত্রী
তোমার বন্ধু কে ? দীর্ঘশ্বাস ?
আমার ও তাই ।
আমার শূন্যতা গননাহীন ।
তোমার ও তাই ?
দুরের পথ দিয়ে ঋতুরা যায়
ডাকলে দরোজায় আসে না কেউ ।
অযথা বাশি শুনে বাইরে যাই
বাতাসে হাসাহাসি বিদ্রুপের ।
তোমার সাজি ছিল, বাগান নেই
আমার ও তাই ।
আমার নদী ছিল, নৌকা নেই
তোমার ও তাই ?
তোমার বিছানায় বৃষ্টিপাত
আমার ঘরদোরে ধুলার ঝড় ।
তোমার ঘরদোরে আমার মেঘ
আমার বিছানায় তোমার হিম ।
------------
চিত্রাঙ্গদা – ০১
কাব্য-নাটক
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(অনঙ্গ-আশ্রম // চিত্রাঙ্গদা মদন ও বসন্ত)
চিত্রাঙ্গদা।
তুমি পঞ্চশর?
মদন।
আমি সেই মনসিজ,
টেনে আনি নিখিলের নরনারী-হিয়া
বেদনাবন্ধনে।
চিত্রাঙ্গদা।
কী বেদনা কী বন্ধন
জানে তাহা দাসী। প্রণমি তোমার পদে।
প্রভু, তুমি কোন্ দেব?
বসন্ত।
আমি ঋতুরাজ।
জরা মৃত্যু দৈত্য নিমেষে নিমেষে
বাহির করিতে চাহে বিশ্বের কঙ্কাল;
আমি পিছে পিছে ফিরে পদে পদে তারে
করি আক্রমণ; রাত্রিদিন সে সংগ্রাম।
আমি অখিলের সেই অনন্ত যৌবন।
চিত্রাঙ্গদা।
প্রণাম তোমারে ভগবন্। চরিতার্থ
দাসী দেব-দরশনে।
মদন।
কল্যাণী, কী লাগি
এ কঠোর ব্রত তব ? তপস্যার তাপে
করিছ মলিন খিন্ন যৌবনকূসুম–
অনঙ্গ-পূজার নহে এমন বিধান।
কে তুমি, কী চাও ভদ্রে।
চিত্রাঙ্গদা।
দয়া কর যদি,
শোনো মোর ইতিহাস। জানাব প্রার্থনা
তার পরে।
মদন।
শুনিবারে রহিনু উৎসুক।
চিত্রাঙ্গদা।
আমি চিত্রাঙ্গদা মণিপুররাজকন্যা।
মোর পিতৃবংশে কভু পুত্রী জন্মিবে না-
দিয়াছিলা হেন বর দেব উমাপতি
তপে তুষ্ট হয়ে। আমি সেই মহাবর
ব্যর্থ করিয়াছি। অমোঘ দেবতাবাক্য
মাতৃগর্ভে পশি দুর্বল প্রারম্ভ মোর
পারিল না পুরুষ করিতে শৈব তেজে,
এমনি কঠিন নারী আমি।
মদন।
শুনিয়াছি
বটে। তাই তব পিতা পুত্রের সমান
পালিয়াছে তোমা। শিখায়েছে ধনুর্বিদ্যা
রাজদণ্ডনীতি।
চিত্রাঙ্গদা।
তাই পুরুষের বেশে
নিত্য করি রাজকাজ যুবরাজরূপে,
ফিরি স্বেচ্ছামতে; নাহি জানি লজ্জা ভয়,
অন্তঃপুরবাস; নাহি জানি হাবভাব,
বিলাসচাতুরী; শিখিয়াছি ধনুর্বিদ্যা,
শুধু শিখি নাই, দেব, তব পুষ্পধনু
কেমনে বাঁকাতে হয় নয়নের কোণে।
বসন্ত।
সুনয়নে,সে বিদ্যা শিখে না কোনো নারী;
নয়ন আপনি করে আপনার কাজ,
বুকে যার বাজে সেই বোঝে।
চিত্রাঙ্গদা।
এক দিন
গিয়েছিনু মৃগ-অন্বেষণে একাকিনী
ঘন বনে, পূর্ণা-নদীতীরে। তরুমূলে
বাঁধি অশ্ব, দুর্গম কুটিল বনপথে
পশিলাম মৃগপদচিহ্ন অনুসরি।
ঝিল্লিমন্দ্রমুখরিত নিত্য-অন্ধকার
লতাগুল্মে গহন গম্ভীর মহারণ্যে
কিছু দূর অগ্রসরি দেখিনু সহসা,
রুধিয়া সংকীর্ণ পথ রয়েছে শয়ান
ভূমিতলে চিরধারী মলিন পুরুষ।
উঠিতে কহিনু তারে অবজ্ঞার স্বরে
সরে যেতে– নড়িল না, চাহিল না ফিরে।
উদ্ধত অধীর রোষে ধনু-অগ্রভাগে
করিনু তাড়না–সরল সুদীর্ঘ দেহ
মুহূর্তেই তীরবেগে উঠিল দাঁড়ায়ে
সন্মুখে আমার–ভস্মসুপ্ত অগ্নি যথা
ঘৃতাহুতি পেয়ে, শিখারূপে উঠে উর্ধ্বে
চক্ষের নিমেষে। শুধু ক্ষণেকের তরে
চাহিলা আমার মুখপানে– রোষদৃষ্টি
মিলাল পলকে; নাচিল অধরপ্রান্তে
স্নিগ্ধ গুপ্ত কৌতুকের মৃদূহাস্যরেখা
বুঝি সে বালক-মূর্তি হেরিয়া আমার।
শিখে পুরুষের বিদ্যা, প’রে পুরুষের
বেশ, পুরুষের সাথে থেকে, এতদিন
ভুলে ছিনু যাহা, সেই মুখে চেয়ে, সেই
আপনাতে-আপনি -অটল মূর্তি হেরি’,
সেই মুহূর্তেই জানিলাম মনে, নারী
আমি। সেই মূহূর্তেই প্রথম দেখিনু
সম্মুখে পুরুষ মোর।
মদন।
সে শিক্ষা আমারি
সূলক্ষণে। আমিই চেতন করে দিই
একদিন জীবনের শুভ পুণ্যক্ষণে
নারীরে হইতে নারী, পুরুষে পুরুষ।
কী ঘটিল পরে?
চিত্রাঙ্গদা।
সভয়বিষ্ময়কণ্ঠে
শুধানু,”কে তুমি?” শুনিনু উত্তর,”আমি
পার্থ, কুরুবংশধর।”
রহিনু দাঁড়ায়ে
চিত্রপ্রায়, ভুলে গেনু প্রণাম করিতে।
এই পার্থ? আজন্মের বিস্ময় আমার?
শুনেছিনু বটে, সত্যপালনের তরে
দ্বাদশ বৎসর বনে বনে ব্রক্ষ্ণচর্য
পালিছে অর্জুন। এই সেই পার্থবীর!
বাল্যদুরাশায় কত দিন করিয়াছি
মনে, পার্থকীর্তি করিব নিস্প্রভ আমি
নিজ ভুজবলে; সাধিব অব্যর্থ লক্ষ্য;
পুরুষের ছদ্মবেশে মাগিব সংগ্রাম
তাঁর সাথে, বীরত্বের দিব পরিচয়।
হা রে মূগ্ধে, কোথায় চলিয়া গেল সেই
স্পর্ধা তোর! যে ভূমিতে আছেন দাঁড়ায়ে
সে ভূমির তৃণদল হইতাম যদি,
শৌর্যবীর্য যাহা কিছু ধুলায় মিলায়ে
লভিতাম দুর্লভ মরণ, সেই তাঁর
চরণের তলে।
কী ভাবিতেছিনু মনে
নাই। দেখিনু চাহিয়া ধীরে চলি গেলা
বীর, বন-অন্তরালে। উঠিনু চমকি;
সেইক্ষণে জন্মিল চেতনা; আপনারে
দিলাম ধিক্কার শতবার। ছি ছি মূঢ়ে,
না করিলি সম্ভাষণ, না শুধালি কথা,
না চাহিলি ক্ষমাভিক্ষা, বর্বরের মতো
রহিলি দাঁড়ায়ে–হেলা করি চলি গেলা
বীর। বাঁচিতাম, সে মূহুর্তে মরিতাম
যদি।
পরদিন প্রাতে দূরে ফেলে দিনু
পুরুষের বেশ। পরিলাম রক্তাম্বর,
কঙ্কণ কিঙ্কিণী কাঞ্চি। অনভ্যস্ত সাজ
লজ্জায় জড়ায়ে অঙ্গ রহিল একান্ত
সসংকোচে।
গোপনে গেলাম সেই বনে
অরণ্যের শিবালয়ে দেখিলাম তাঁরে–
মদন।
বলে যাও বালা। মোর কাছে করিয়ো না
কোনো লাজ। আমি মনসিজ ; মানসের
সকল রহস্য জানি।
চিত্রাঙ্গদা।
মনে নাই ভালো
তার পরে কী কহিনু আমি,কী উত্তর
শুনিলাম। আর শুধায়ো না ভগবন্।
মাথায় পড়িল ভেঙে লজ্জা বজ্ররূপে,
তবু মোরে পারিল না শতধা করিতে–
নারী হয়ে এমনি পুরুষপ্রাণ মোর।
নাহি জানি কেমনে এলেম ঘরে ফিরে
দূঃস্বপ্নবিহ্বলসম। শেষ কথা তাঁর
কর্ণে মোর বাজিতে লাগিল তপ্ত শূল–
“ব্রক্ষ্ণচারিব্রতধারী আমি। পতিযোগ্য
নহি বরাঙ্গনে।”
পুরুষের ব্রক্ষ্ণচর্য!
ধিক্ মোরে, তাও আমি নারিনু টলাতে।
তুমি জান, মীনকেতু, কত ঋষি মুনি
করিয়াছে বিসর্জন নারীপদতলে
চিরার্জিত তপস্যার ফল। ক্ষত্রিয়ের
ব্রক্ষ্ণচর্য। গৃহে গিয়ে ভাঙিয়ে ফেলিনু
ধনুঃশর যাহা কিছু ছিল, কিণাঙ্কিত
এ কঠিন বাহু–ছিল যা গর্বের ধন
এত কাল মোর– লাঞ্ছনা করিনু তারে
নিস্ফল আক্রোশভরে। এতদিন পরে
বুঝিলাম, নারী হয়ে পুরুষের মন
না যদি জিনিতে পারি বৃথা বিদ্যা যত।
অবলার কোমলমৃণালবাহুদুটি
এ বাহুর চেয়ে ধরে শতগুণ বল।
ধন্য সেই মুগ্ধ মূর্খ ক্ষীণতনুলতা
পরাবলম্বিতা লজ্জাভয়ে-লীনাঙ্গিনী
সামান্য ললনা, যার ত্রস্ত নেত্রপাতে
মানে পরাভব বীর্যবল, তপস্যার
তেজ।
হে অনঙ্গদেব, সব দম্ভ মোর
এক দন্ডে লয়েছ ছিনিয়া–সব বিদ্যা
সব বল করেছ তোমার পদানত।
এখন তোমার বিদ্যা শিখাও আমায়,
দাও মোরে অবলার বল, নিরস্ত্রের
অস্ত্র যত।
মদন।
আমি হব সহায় তোমার।
অয়ি শুভে, বিশ্বজয়ী অর্জুনে জিনিয়া
বন্দী করি আনি দিব সন্মুখে তোমার।
রাজ্ঞী হয়ে দিয়ো তারে দণ্ড পুরস্কার
যথা-ইচ্ছা। বিদ্রোহীরে করিয়ো শাসন।
চিত্রাঙ্গদা।
সময় থাকিত যদি, একাকিনী আমি
তিলে তিলে হৃদয় তাঁহার করিতাম
অধিকার, নাহি চাহিতাম দেবতার
সহায়তা। সঙ্গীরূপে থাকিতাম সাথে,
রণক্ষেত্রে হতেম সারথি, মৃগয়াতে
রহিতাম অনুচর, শিবিরের দ্বারে
জাগিতাম রাত্রির প্রহরী, ভক্তরূপে
পূজিতাম, ভূত্যরূপে করিতাম সেবা,
ক্ষত্রিয়ের মহাব্রত আর্ত-পরিত্রাণে
সখারূপে হইতাম সহায় তাঁহার।
একদিন কৌতূহলে দেখিতেন চাহি,
ভাবিতেন মনে মনে, “এ কোন্ বালক,
পূর্বজনমের চিরদাস, এ জনমে
সঙ্গ লইয়াছে মোর সুকৃতির মতো।”
ক্রমে খুলিতাম তাঁর হৃদয়ের দ্বার,
চিরস্থান লভিতাম সেথা। জানি আমি
এ প্রেম আমার শুধু ক্রন্দনের নহে;
যে নারী নির্বাক্ ধৈর্যে চিরমর্মব্যথা
নিশীথনয়নজলে করয়ে পালন,
দিবালোকে ঢেকে রাখে ম্লান হাসিতলে,
আজন্মবিধবা, আমি সে রমণী নহি,
আমার কামনা কভু হবে না নিস্ফল।
নিজেরে বারেক যদি প্রকাশিতে পারি,
নিশ্চয় সে দিবে ধরা। হায় হতবিধি,
সেদিন কী দেখেছিল! শরমে কুঞ্চিত
শঙ্কিত কম্পিত নারী, বিবশ বিহ্বল
প্রলাপবাদিনী। কিন্তু আমি যথার্থ কি
তাই? যেমন সহস্র নারী পথে গৃহে,
চারি দিকে, শুধু ক্রন্দনের অধিকারী,
তার চেয়ে বেশি নই আমি? কিন্তু হায়,
আপনার পরিচয় দেওয়া, বহু ধৈর্যে
বহু দিনে ঘটে, চিরজীবনের কাজ,
জন্মজন্মান্তরে ব্রত। তাই অসিয়াছি
দ্বারে তোমাদের, করেছি কঠোর তপ।
হে ভুবনজয়ী দেব, হে মহাসুন্দর
ঋতুরাজ, শুধু এক দিবসের তরে
ঘুচাইয়া দাও–জন্মদাতা বিধাতার
বিনাদোষে অভিশাপ, নারীর কুরূপ।
করো মোরে অপূর্ব সুন্দরী। দাও মোরে
সেই একদিন–তার পরে চিরদিন
রহিল আমার হাতে।–যখন প্রথম
দেখিলাম তারে, যেন মুহূর্তের মাঝে
অনন্ত বসন্ত ঋতু পশিল হৃদয়ে।
বড়ো ইচ্ছা হয়েছিল সে যৌবনোচ্ছ্বাসে
সমস্ত শরীর যদি দেখিতে দেখিতে
অপূর্বপুলকভরে উঠে প্রষ্ফুটিয়া
লক্ষীর চরণশায়ী পদ্মের মতন।
হে বসন্ত, হে বসন্তসখে, সে বাসনা
পুরাও আমার শুধু দিনেকের তরে।
মদন।
তথাস্তু।
বসন্ত।
তথাস্তু। শুধু একদিন নহে,
বসন্তের পুষ্পশোভা এক বর্ষ ধরি
ঘেরিয়া তোমার তনু রহিবে বিকশি।
*********************