ষোলই ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। দীর্ঘ নয়মাসের যুদ্ধের পর যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল, সেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের প্রায়শই জানতে ইচ্ছে করে। তখনই আমাদের সাহিত্যের দ্বারস্থ হ’তে হয়। ইতিহাস, গল্প, উপন্যাস কিংবা কবিতায় সেই সময়ের ঘটনাগুলো খুঁজে বের করি। আজকের এই দিনে ঠিক সেরকমভাবেই, স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে, ১৯৭১ সালকে কেন্দ্র করে রচিত কিছু ফিকশন এবং নন-দিকশন বই নিয়ে ইউএপি সাহিত্য সংঘের এই আয়োজন। এখানে তিনটি ফিকশন এবং তিনটি নন-ফিকশন বই নিয়ে মূল আলোচনা হবে, এবং পরিশেষে কিছু বিশেষভাবে যোগ্য কিছু বইয়ের নামও উল্লেখ থাকবে।
ফিকশন—
এক.
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বলতে গেলে প্রথমেই আমি যেই বইটির নাম বলতে এক প্রকার বাধ্য হবো, তা হ’লো, “জোছনা ও জননীর গল্প”, লিখেছেন আধুনিক বাংলাদেশের সবথেকে পাঠকপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ। এই গল্পে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন মানুষের মধ্যে থাকা আতঙ্ক, ভীতি এবং রাজনৈতিক দূর্যোগের দিকগুলো হুমায়ূন আহমেদের কেরামতির সঙ্গে মিলে সৃষ্টি হয়েছে একটি অসাধারণ হৃদয়বিদারক উপন্যাসে। এটিকে অনেকে ইতিহাসে স্বাক্ষী হিসেবে বিবেচনা করতে চান। তবে, লেখক এক স্বাক্ষাৎকারে নিজে বলেছেন, এটি কোনো ইতিহাসের দলিল নয়। কিন্তু, উনি চেয়েছেন ইতিহাসের কাছাকাছি থাকতে।
দুই.
“ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল”— লিখেছেন, হুমায়ুন আজাদ।
হুমায়ুন আজাদ সত্যকে অকপটে স্বীকার করতে পারেন, এটি তার অন্যতম বিশেষত্ব। এই উপন্যাসও তার ব্যতিক্রম নয়। পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর রাইফেল হাতে বাংলাদেশের ওলি-গলিতে ঢুকে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো থেকে শুরু করে গোটা নয় মাসের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিছু সাধারণ মানুষ। সেই সময়কে ঘিরে সেইসব মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সকল হাহাকারের সঙ্গে মিশিয়ে তিনি ভূভাগের বর্তমান এবং ভবিষ্যতকে সুনিপুণ গদ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন।
তিন.
“ওঙ্কার” — লিখেছেন, আহমদ ছফা। ওঙ্কার একটি উপন্যাসিকা। এই গল্পে স্বাধীনতার সঙ্গে বাঙালীর চেতনার যে মিলবন্ধন, তা বর্ণনা করেছেন। বাঙালীর আত্মায় স্বাধীনতার যে মহিমা ছিল, তা ফুঁটে উঠেছে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রের মধ্য দিয়ে।
নন-ফিকশন
এক.
“Bangladesh: A Legacy of Blood” লিখেছেন, Anthony Mascarenhas।
এই বইটি একজন সাংবাদিকের দৃষ্টিকোণ এবং অভিজ্ঞতা থেকে রচিত, যিনি ’৭১-এ মাঠকর্মী হিসেবে বাংলাদেশের যুদ্ধ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং সংবাদ পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্ব দরবারে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এই বইতে তিনি পাকিস্তানী হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। ইতিহাস কখনও সরলভাবে চলে না, সময়ে সময়ে, মানুষভেদে বিকৃত হয়। এই বইটি সেইদিক থেকে একটি নিরপেক্ষ অবস্থানেই রয়েছে বলা যায়।
দুই.
“পাকিস্তানি জেনারেলদের মন" : বাঙালি বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ” লিখেছেন, মুনতাসীর মামুন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ তিনটি-বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত।বাংলাদেশ ও ভারতের যুক্ততা নিয়ে বই/প্রবন্ধ প্রকাশিত হলেও মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের শত্রুপক্ষ পাকিস্তান নিয়ে কোন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের নীতি নির্ধারকরা কী ভেবেছিলেন কেন অন্য অংশের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন বা কারা করেছিলেন, বাঙালিদের বিরুদ্ধে তাদের মনোভাব কী ছিল সে সম্পর্কিত রচনার সংখ্যা খুবই কম। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এই ঘাটতি পুরণে অগ্রসর হয়েছেন মুনতাসীর মামুন।
তিন.
বিখ্যাত শিক্ষাবিদ, চিন্তক সলিমুল্লাহ খানের সম্পাদনায় “বেহাত বিপ্লব ১৯৭১” এই প্রবন্ধ সংকলন। স্বাধীনতা বিষয়ে রচিত কিছু বিখ্যাত লেখক এবং প্রাবন্ধিকদের রচনা নিয়ে এই বই গঠিত। উল্লেখযোগ্য কিছু নাম হ’লো, রণেশ দাশগুপ্ত, আহমদ সফা, সৈয়দ আবুল মকসুদ, প্রমুখ।
উল্লেখিত প্রতিটি বই-ই স্ব-স্ব জায়গা থেকে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধকে বর্ণনা করে পৃথক দৃষ্টিকোণ থেকে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য কিছু বই যেগুলোর নাম না বললেই নয়, সেগুলোর মধ্যে পড়ে, শাজাদুজ্জামানের লেখা “ক্র্যাচের কর্ণেল”, আরও আছে হুমায়ূন আহমেদের “দেয়াল”, জহির রায়হানের “আর কতদিন”।
এই বইগুলো আমার ব্যক্তিগত মতামত থেকে তুলে নিয়ে আসা এবং বহুল প্রচলিতও বটে। তাই আশা করি, যদি কেউ কোনোটা না পড়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে আগামী পাঠ্য হিসেবে বিবেচনায় লেখাটা কিছুটা হলেও আপনাকে সাহায্য করবে।
লেখা- এইচ. এম. ফায়েকুজ্জামান ফাহাদ
গ্রাফিক- আপন ডি'ক্রুশ
১৬ ডিসেম্বর ২০২৩