স্বপ্নের পদ্মা সেতু

স্বপ্নের পদ্মা সেতু

পদ্মা সেতুতে মোট ৪১৫ টি ল্যাম্পপোস্ট বসানো হয়েছে। এর মধ্যে মূল সেতুতে ৩২৮টি, জাজিরা প্রান্তের উড়ালপথ (ভায়াডাক্ট) ৪৬টি ও মাওয়া প্রান্তের ভায়াডাক্টে ৪১টি ল্যাম্পপোস্ট বসানো হয়েছে। গত ১৮ এপ্রিল এসব ল্যাম্পপোস্ট ও এর মধ্যে বাতি লাগানোর কাজ শেষ হয়। এরপর পুরো সেতুতে বৈদ্যুতিক তার টানা হয়েছে। গত বছর ২৫ নভেম্বর মুন্সিগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে প্রথম ল্যাম্পপোস্ট বসানোর কাজ শুরু হয়েছিলো। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে নিজস্ব অর্থায়নে ৩০ হাজার কোটি টাকায় ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতুর কাজের উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্মাণকাজ শেষে ২৫ জুন ২০২২ এই স্বপ্নের সেতু যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে।

পদ্মা সেতু সম্পর্কিত তথ্য

স্থানাঙ্ক : ২৩.৪৪৬০° উত্তর ৯০.২৬২৩° পূর্ব
বহন করে : যানবাহন, ট্রেন
অতিক্রম করে : পদ্মা নদী
স্থান : মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ের সাথে শরীয়তপুর ও মাদারীপুর
অফিসিয়াল নাম : পদ্মা বহুমুখী সেতু
রক্ষণাবেক্ষক : বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ
ওয়েবসাইট : 

পদ্মা সেতুর বৈশিষ্ট্য
নকশা : এ.ই.সি.ও.এম
উপাদান : কংক্রিট, স্টিল
মোট দৈর্ঘ : ৬.১৫ কিলোমিটার (২০,২০০ ফুট)
প্রস্থ : ১৮.১০ মিটার (৫৯.৪ ফুট)

পদ্মা সেতুর ইতিহাস
নকশাকার : AECOM
নির্মাণকারী : চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লি.
নির্মাণ শুরু : নভেম্বর ২০১৪ ইং
নির্মাণ শেষ : জুন ২০২২ (আনিমানিক)
চালু : ২৫ জুন ২০২২

 

পদ্মা সেতুর অবস্থান

পদ্মা সেতু বাংলাদেশের পদ্মা নদীর উপর নির্মাণাধীন একটি বহুমুখী সড়ক ও রেল সেতু। এর মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ের সাথে শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা যুক্ত হবে। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সাথে উত্তর-পূর্ব অংশের সংযোগ ঘটবে। চলতি বছরের ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্য পদ্মা সেতু হতে যাচ্ছে এর ইতিহাসের একটি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প। দুই স্তর বিশিষ্ট স্টিল ও কংক্রিট নির্মিত ট্রাস ব্রিজটির ওপরের স্তরে থাকবে চার লেনের সড়ক পথ এবং নিচের স্তরটিতে থাকবে একটি একক রেলপথ। পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর অববাহিকায় ১৫০ মিটার দৈর্ঘের ৪১টি স্প্যান ইতিমধ্যে বসানো সম্পন্ন হয়েছে, ৬.১৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ এবং ১৮.১০ মিটার প্রস্থ পরিকল্পনায় নির্মিত হচ্ছে দেশটির সবচেয়ে বড় সেতু। পদ্মা সেতু নির্মাণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি জানিয়েছে, পদ্মা সেতু যান চলাচলের উপযোগী হতে ২০২২ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত লেগে যাবে। ২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের দিন চূড়ান্ত করা হয়েছে।

 

নির্মাণের ইতিহাস

২০০৬-০৭ সালে প্রকল্প প্রস্তুতির সাথে যুক্ত কিছু লোকের দুর্নীতির অভিযোগ উঠায় বিশ্বব্যাংক তার প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে নেয় এবং অন্যান্য দাতারা সেটি অনুসরণ করে। এই ঘটনায় তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় ও সচিব মোশারেফ হোসেন ভূইয়াকে জেলেও যেতে হয়েছিল। পরবর্তীতে এমন কোনও অবিযোগ প্রমাণ না পাওয়ায় কানাডিয়ান আদালত মামলাটি বাতিল করে দেয়। দুর্নীতির অভিযোগ পরবর্তীতে আদালতে খন্ডিত হয়। বর্তমানে প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব সম্পদ থেকে অর্থায়ন করা হচ্ছে।

AECOM-এর নকশায় পদ্মা নদীর উপর বহুমুখী আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প ‘পদ্মা বহুমুখী সেতুর’ নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০১১ সালে। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৩ সালে। মূল প্রকল্পের পরিকল্পনা করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালের ২৮ আগস্ট। সে সময় ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকার বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু প্রকল্প পাস করা হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার এসে রেলপথ সংযুক্ত করে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি প্রথম দফায় সেতুর ব্যয় সংশোধন করে। তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। পদ্মা সেতুর ব্যয় আরও আট হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়। ফলে পদ্মা সেতুর ব্যয় দাঁড়িয়েছে সব মিলিয়ে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বাসেক) ২০১০ সালের এপ্রিলে প্রকল্পের জন্য প্রাক যোগ্যতা দরপত্র আহবান করে। প্রথম পরিকল্পনা অনুসারে, ২০১১ সালের শুরুর দিকে সেতুর নির্মাণ কাজ আরম্ভ হওয়ার কথা ছিল এবং ২০১৩ সালের মধ্যে প্রধান কাজগুলো শেষ হওয়ার কথা ছিল। প্রকল্পটি তিনটি জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করবে- মুন্সিগঞ্জ (মাওয়া পয়েন্ট/উত্তর পাড়), শরীয়তপুর এবং মাদারীপুর (জাঞ্জিরা/দক্ষিণ পাড়)। এটির জন্য প্রয়োজনীয় এবং অধিগ্রহণকৃত মোট জমির পরিমাণ ৯১৮ হেক্টর।

পদ্মা সেতুর নকশা

পদ্মা বহুমুখী সেতুর সম্পূর্ন নকশা এইসিওএমের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরামর্শকদের নিয়ে গঠিত একটি দল তৈরি করে। বাংলাদেশের প্রথম বৃহৎ সেতু প্রকল্প যমুনা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল তৈরি করা হয়। আধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরিকে ১১ সদস্যের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সভাপতি নিযুক্ত করা হয়। এ প্যানেল সেতুর নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পর্যায়ে কর্মকর্তা, নকশা পরামর্শক ও উন্নয়ন সহযোগীদের বিশেষজ্ঞ পরামর্শ প্রদান করে।

কর্মপরিকল্পনা

পদ্মা সেতুর ভৌত কাজকে মূলত পাঁচটি প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে যথা- (ক) মূল সেতু, (খ) নদী শাসন, (গ) জাজিরা সংযোগকারী সড়ক, (ঘ) টোল প্লাজা ইত্যাদি। মাওয়া সংযোগকারী সড়ক, টোল প্লাজা ইত্যাদি এবং মাওয়া ও জাজিরা সার্ভিস এলাকা। প্রকল্পে নিয়োজিত নকশা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘মনসেল-এইকম’ ভৌত কাজের ঠিকাদার নিয়োগের প্রাক-যোগ্যতা দরের নথি প্রস্তুত, টেন্ডার আহবানের পর টেন্ডার নথি মূল্যায়ন, টেন্ডার কমিটিকে সহায়তাসহ এ সংক্রান্ত যাবতীয় কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল নকশা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাজ তদারক করত। ভৌত কাজের বিভিন্ন প্যাকেজের জন্য দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছিল। পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি।

পাইলিংয়ের সমস্যা

প্রথম দিকে পদ্মা নদীর তলদেশের মাটি খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয় সেতু নির্মাণকারী প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞদের। তলদেশে স্বাভাবিক মাটি পাওয়া যায়নি। সেতুর পাইলিং কাজ শুরুর পরে সমস্যা দেখা যায়। প্রকৌশলীরা নদীর তলদেশে কৃত্রিম প্রক্রিয়ায় মাটির বদলে নতুন মাটি তৈরি করে পিলার গাঁথার চেষ্টা করে। স্ক্রিন গ্রাউটিং নামের এই পদ্ধতিতেই বসানো হয় পদ্মাসেতু। এরকম পদ্ধতির ব্যবহারের নমুনা বিশ্বে তেমন একটা নেই। এ প্রক্রিয়ায় ওপর থেকে পাইপের ছিদ্র দিয়ে কেমিক্যাল নদীর তলদেশে পাঠিয়ে মাটির শক্তিমত্তা বাড়ানো হয়েছে। তারপর ওই মাটিতে গেঁথে দেওয়া হয়েছে পিলার। এমন পদ্ধতির প্রয়োগ বাংলাদেশে এই প্রথম। এ পদ্ধতিতে পাইলের সঙ্গে স্টিলের ছোট ছোট পাইপ ওয়েন্ডিং করে দেওয়া হয়। পাইপের ভেতর দিয়ে এক ধরনের কেমিক্যাল পাঠিয়ে দেওয়া হয় নদীর তলদেশের মাটিতে। কেমিক্যালের প্রভাবে তখন তলদেশের সেই মাটি শক্ত রূপ ধারণ করে। একপর্যায়ে সেই মাটি পাইলের লোড বহনে সক্ষম হয়ে ওঠে। তখন আর পাইল বসাতে কোনো বাধা থাকে না।

নির্মাণ ব্যয়

পদ্মা সেতু নির্মাণে মোট খরচ করা হচ্ছে ৩০ হাজার ১৯৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা। এসব খরচের মধ্যে রয়েছে সেতুর অবকাঠামো তৈরি, নদী শাসন, সংযোগ সড়ক, ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পরিবেশ, বেতন-ভাতা ইত্যাদি। বাংলাদেশের অর্থ বিভাগের সঙ্গে সেতু বিভাগের চুক্তি অনুযায়ী, সেতু নির্মাণে ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে সরকার। ১ শতাংশ সুদ হারে ৩৫ বছরের মধ্যে সেটি পরিশোধ করবে সেতু কর্তৃপক্ষ।

ক্রমিক ব্যয় বৃদ্ধি

২০০৫-এ পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রাথমিক প্রাক্কালন করা হয়েছিল ১২,০০০/- কোটি টাকা। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় পৃথিবীর অন্যান্য তুলনীয় সেতুর নির্মাণ ব্যয়ের নিরিখে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী সর্বোমোট নির্মাণ ব্যয় ১০,০০০/- কোটি টাকায় সীমিত রাখার পরামর্শ প্রদান করেন।

২০০৭ এর আগস্ট মাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একনেক-এর সভায় পদ্মা সেতুর চূড়ান্ত প্রাক্কালন ১০,১৬১/- কোটি অনুমোদন করা হয়।

পরবর্তী কালে বিভিন্ন সময়ে প্রাক্কলন বৃদ্ধি করা হয়। সর্বশেষ অনুমোদিত প্রাক্কলনের পরিমাণ ৩০,১৯৩/- কোটি টাকা যা মূল প্রাক্কলনের চেয়ে ২০,০৩২/- কোটি টাকা বেশী। বলা হয়েছে বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়াই প্রকল্প ব্যয় এতো বৃদ্ধি পাওয়ার মূল কারণ।

মার্কিন ডলারের হিসাবে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সড়ক-রেল সেতুর নির্মাণ ব্যয় এগারো বছরে ১.৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩.৫৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। চীনের ৬.৪ কিলোমিটার দীর্ঘ উফেনসাং ইয়াংজী সড়ক-রেল সেতু ২০২০ সালের ডিসেম্বরে চালু করা হয়েছে। পদ্মা সেতুর সঙ্গে তুলনীয় এই সেতুর নির্মাণে ৪ বছর লেগেছে এবং ব্যয় হয়েছে ১.০৫ বিলিয়ন ডলার যা পদ্মা সেতুর এক-তৃতীয়াংশের চেয়েও কম।

নির্মাণের সময়ক্রম

২০১৭

২০১৮

২০১৯

২০২০

২০২১

চুক্তিবদ্ধ সংস্থা

২০১৪ সালের ১৭ জুন পদ্মা সেতু নির্মানে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয় বাংলাদেশ সরকার ও চীনা চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানি। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে চীনের কোম্পানি পদ্মাসেতুর কার্যাদেশ পায়। পদ্মা সেতু নির্মাণে ২০১০ সালে প্রথম দরপত্র আহবান করা হলে সেখানে প্রি কোয়ালিফিকেশনের জন্য ৪০টি কোম্পানি অংশ নেয়। বিশ্বব্যাংক, জাইকা ও এডিবির তত্ত্বাবধানে এদের মধ্যে ৫টি কোম্পানিকে বাছাই করা হয়। পরে বিশ্বব্যাংকের আপত্তির কারনে একটি কোম্পানি বাদ পড়ে যায়। আর্থিক প্রস্তাব জমা দেয়। সেতুটি তৈরির জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড এর আওতাধীন চায়না মেজর ব্রীজ নামক একটি কোম্পানী। কাজ শুরু হয় ৭ ডিসেম্বর ২০১৪। এতে ব্যয় হচ্ছে ৩০ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।

প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা

পদ্মা বহুমুখী সেতুঃ ২০২১ সালের জিন পর্যন্ত, ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বি-স্তরের পদ্মা বহুমুখী সেতুর ৯৩.৫% (সমস্ত মূল ইস্পাত ফ্রেম স্প্যানস সেট করা আছে) নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। মূল সেতুর জন্য নিযুক্ত চীন মেজর ব্রীজ ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন (এমবিইসি) কাজটি সম্পাদন করছে। নদী প্রশিক্ষণের জন্য গত চার মাস ধরে মাটি পরীক্ষা ও ড্রেজিংয়ের কাজ চলছে। ব্রিজটিতে মোট ৪২টি পিলার থাকবে। প্রত্যেকের নীচে ছয়টি পাইল থাকবে। স্তম্ভগুলিতে ইস্পাত স্প্যান স্থাপন করা হবে। ব্রিজটির মোট ৪১টি স্প্যান থাকবে। পদ্মা বহুমুখী সেতুর কাজটি মূলত পাঁচটি ভাগে বিভক্ত- মূল সেতু, নদীর প্রশিক্ষণ, দুটি সংযোগ সড়ক এবং অবকাঠামো (পরিষেবা অঞ্চল) নির্মাণ। চীনের সিনোহাইড্রো কর্পোরেশন নদীর প্রশিক্ষণ কাজের জন্য নিয়োগ পেয়েছিল এবং বাংলাদেশের আবদুল মোনেম লিমিটেডকে দুটি সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণের চুক্তি দেওয়া হয়েছিল। অক্টোবর ২০১৭ সালে, মূল নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার দেড় বছরেরও বেশি সময় পরে ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর, ৪২টির মধ্যে ৪২টি পিলারের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এই সেতুর চূড়ান্ত (৪১তম) স্প্যানটি বসানো হয় ১০ই ডিসেম্বর ২০২০। সমাপ্তির পরে এই সেতুটি বাংলাদেশের দীর্ঘতম সেতু হবে। ব্রিজটির নতুন সমাপ্তির তারিখ ২০২২ সালের জুনে অনুমান করা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব

প্রস্তাবিত পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প মাওয়া-জাজিরা পয়েন্ট দিয়ে নির্দিষ্ট পথের মাধ্যমে দেশের কেন্দ্রের সাথে দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের ১৯ জেলার সাথে সরাসরি সংযোগ তৈরি করবে। এই সেতুটি অপেক্ষাকৃত অনুন্নত অঞ্চলের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিল্প বিকাশে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখবে। প্রকল্পটির ফলে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৪৪,০০০ বর্গ কিঃমিঃ (১৭,০০০ বর্গ মাইল) বা বাংলাদেশের মোট এলাকার ২৯% অঞ্চলজুড়ে ৩ কোটিরও অধিক জনগণ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবে। ফলে প্রকল্পটি দেশের পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য খুব গুরুত্বপুর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সেতুটিতে ভবিষ্যতে রেল, গ্যাস, বৈদ্যুতিক লাইন এবং ফাইবার অপটিক কেবল সম্প্রসারণের ব্যবস্থা রয়েছে। এই সেতুটি নির্মিত হলে দেশের জিডিপি ১.২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।

বিতর্ক ও গুজবঃ জুলাই ২০১৯ সালে পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজে মানুষের মাথা লাগবে বলে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে গুজব ছড়ায়। এতে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অপহরণকারী ধারণা করে অনেক মানসিক ভারসাম্যহীনকে মারধর করে পুলিশে হস্তান্তর করার ঘটনা ঘটে। পরে এ ঘটনাকে গুজব ও ভিত্তিহীন উল্লেখ করে ৯ জুলাই ২০১৯ তারিখ সেতু নির্মাণ কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমগুলোতে বিজ্ঞপ্তি পাঠায়। এক্ষেত্রে গবেষকরা সেতু কর্তৃপক্ষকে সেতুটি নির্মাণে খুঁটিনাটি সকল তথ্য জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার পরামর্শ দেন।

পদ্মা সেতুতে সাধারণ আলোর ব্যবস্থা ছাড়াও থাকছে ‘আর্কিটেকচারাল লাইটিং’। সেতুর সৌন্দর্যায়নের জন্য তৈরি করা হয়েছে একটি সংগ্রহশালাও। তাতে পদ্মা সেতু তৈরির বিভিন্ন উপকরণ প্রদর্শন করা হবে।