প্রাচীন বাংলায় সর্বপ্রথম দুর্গাপূজা কোনটি তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত আছে, সেরকম এটি একটি মত মাত্র। মূলত এটি দুর্গাপুরের গড় জঙ্গলের কাহিনী ( শ্যামারূপা মা ও গড়চণ্ডী মহামায়াধাম)।
গড় জঙ্গলের মূলত দুটি ধারা আছে, একটি শ্যামারূপা মা বা গড়ের মা এবং অপরটি গড়চণ্ডী মহামায়াধাম বা মেধসাশ্রম নামে পরিচিত।
গড় জঙ্গলে শ্যামারূপা মায়ের যে শ্বেত পাথরের মুর্তিটি আছে সেটিতো মহিষাসুর মদ্দিণীর, তবে দেবী দুর্গার নাম এখানে শ্যামরূপা হল কেন!
এই প্রশ্নের উত্তর বলতে এই প্রসঙ্গে এক কিংবদন্তি আছে যে ইছাই ঘোষ লাউসেনের হাতে নিহত হওয়ার দেড়শ বছর পর যখন কুতুবউদ্দিনের নেতৃত্বে ভারতে তুর্কিদের রাজ্য বিস্তার শুরু হয় গাঙ্গেয় উপত্যকায় সেই সময় তাঁরই প্রধান সেনাপতি বস্তিয়ার খলজি নামে এক তুর্কি বাংলার দ্বিতীয় রাজধানী নদীয়া অতর্কিত আক্রমন করেন। তখন রাজা ছিলেন বল্লাল সেনের পুত্র রাজা লক্ষন সেন। এই আক্রমনের ফলে রাজা লক্ষনসেন ও তার কিছু বিশ্বস্থ অনুচর এবং সিপাহীদের নেয়ে এই গড় জঙ্গলে আত্মগোপন করেন। আবার অন্য মতে পিতা পুত্রে অর্থাৎ রাজা বল্লাল সেনের সাথে রাজা লক্ষনসেনের সাময়িক বিবাদের জেরে লক্ষন সেন কিছুদিন এই গড়ে বসবাস করে ছিলেন। যাই হোক কথিত আছে সেই সময় অর্থাৎ কবি জয়দেবেরে সমসাময়িক এক কাপালিক এই মন্দিরের পূজারি ছিলেন এবং বিশেষ বিশেষ তিথিতে নরবলি দিতেন।
রাজা লক্ষনসেন যতদিন এখানে আত্মগোপন করে ছিলেন তত দিন তার আয়ত্বে ছিল ওই এলাকা। তাই এখনো এই এলাকা সেন পাহাড়ি নামেই পরিচিত লক্ষন সেন ছিলেন একজন সু-কবি, পন্ডিত এবং একজন দক্ষরাজা। তার প্রতিভা ছিল অসাধারণ।
কাপালিক দেখলেন রাজা লক্ষন সেন এই গড় জঙ্গলে আত্মগোপন করে রয়েছেন। যদি আমি রাজা লক্ষন সেনের স্মরনাপন্ন না হই তবে আমার কার্য্য সিদ্ধি হবে না। দুষ্ট কাপালিক ঠকবাজের আশ্রয় লইলেন এবং রাজা লক্ষন সেনের কাছে এসে বললেন-রাজা আপনি নরবলি দ্বারা গড়ের মায়ের পুজো অর্চনা করুন। আপনার সমস্ত বিপদ কেটে যাবে এবং সুদিন ফিরে আসবে।
কাপালিকের কথাগুলো শুনে রাজা লক্ষন সেনের মাথায় যেন সমস্ত আকাশ ভেঙে পড়ল। রাজা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন।
দুষ্টাচার কাপালিক পুনরায় বললেন-রাজা, আপনি আমার ধর্মের প্রতি হস্তক্ষেপ না করলে আপনার দ্রুত সু-দিন ফিরে আসবে।
কাপালিকের মুখে সু-দিন ফিরে আসার কথাটি শুনে, রাজা লক্ষন সেন বললেন ঠিক আছে তাই হবে, তবে আমার অনুচরবৃত্ত পন্ডিত গণ সিপাহী এবং প্রজাগণ যেন জানতে না পারেন অর্থাৎ গোপনে।
একদিন রাজা লক্ষন সেনের মহামান্য পন্ডিতগন কাপালিকের নর বলিদানের কথা জানতে পারেন এবং রাজা লক্ষন সেনকে অনুরোধ করেন যাহাতে কাপালিক এই কু-কর্মের জন্য শাস্তি পায় এবং নরবলি না করেন। রাজ্য ঘোর অনাচারে পরিণত হয়েছে কাপালিকের জন্য।
রাজা লক্ষন সেন বললেন-হে মহামান্য পন্ডিত গন। আমি রাজা ঠিকই কিন্তু কারো ধর্মের প্রতি হস্তক্ষেপ করতে পারি না। তোমরা তোমাদের পান্ডিত্য দিয়ে বোঝাও এই কাজের জন্য দক্ষ পন্ডিত হিসাবে রাজা লক্ষন সেন তারই সভাকবি জয়দেবের উপর দায়িত্ব অর্পণ করেন।
এদিকে বিশেষ বিশেষ তিথিতে কাপালিক নরবলি দিয়ে সাধনা করে চলেছেন এবং মন্দিরের পূজারী ছিলেন। অন্যদিকে অজয়ের অপর পাড়ে জয়দেবের স্মৃতি ধন্য কেন্দুবিন্ন গ্রাম। তাই একদিন অমাবস্যার মহানিশীর তমসা বিদীর্ণ করে এক যুবতীকে নরবলি দিতে উদ্যত, তখন বৈষ্ণব কবি জয়দেব শ্যামরূপা মন্দির পরিদর্শন করতে এলেন। উনি কাপালিককে বললেন-শুনেছি তুমি নর বলি দিয়ে সাধনা কর। আর নর বলি দেওয়ার জন্য সুন্দর ফুলের মতো একটি মেয়েকে ধরে নিয়ে এসেছো। তুমি নর বলি বন্ধ কর। এই ভাব নিয়ে-এই আচার নিয়ে মাকে পাওয়া যায় না।
পশু ভাবাপন্ন কাপালিক তিক্ত কণ্ঠে বললেন-আমার মায়ের আদেশ নরবলি দিতে হবে। এই শেষ বলি। আর এই বলির দ্বারা আমি ত্রিকালজ্ঞ হয়ে উঠব।
কাপালিকের এই কথা শুনে মেয়েটি কবি জয়দেবের চরণে লুটিয়ে পড়ল এবং মেয়েটি বলল-হে মহামান্য কবি আপনি আমায় রক্ষা করুন। কবি তাকে মাভৈঃ শব্দ উচ্চারিত করে বললেন তোমার কোন ভয় নাই। আমার রক্তের শেষ বিন্দু দিয়েও তোমায় রক্ষা করব।
কাপালিক উন্মাদের মতো চিৎকার করতে লাগলেন, তার কণ্ঠশ্বরের ঝঙ্কারে পশু-পক্ষী নিরুত্তর কম্পমান। আকাশের উল্কা পিন্ডগুলো যেমন আকাশেই বিলিন হয়। বিদ্যুতের তরঙ্গগুলো যেন মহাকাশে লয় হয় তেমনি কবির মন বেদনার গভীরতায় কিছু ক্ষনের জন্য লয় হয়ে গেল।
কিন্তু কবি জয়দেব ছাড়বার পাত্র নয় তাই দৃপ্ত কণ্ঠে বললেন যদি মা সত্যই নরবলির দ্বারা পূজো চেয়ে থাকে, তবে তোমার মাকে দেখাতে পারবে? কবির কথা শুনে কাপালিক ক্রধিত হয়ে উঠলেন। তার নয়ন যেন রক্তিম হয়ে উঠল। শরীরের রঙ যেন অস্তিয় মান সূর্যের মত লাল হয়ে উঠল। সিংহের কেশের মতো তার কেশ গুলো পরিণত হয়েছে। অঙ্গভঙ্গিমা যেন হিংস্র পশুর শিকার ধরার পূর্ব মুহুর্ত।
সীমিত অবস্থা দুইজনে স্থির থাকা পর কাপালিক কবিকে বললেন-এসো কবি আমার মাকে দেখাই। মন্দিরের দরজা খুললেন ও মা মা করে আকুল কণ্ঠে ডাকতে লাগলেন এবং মাথা ঠুকতে লাগলেন, কিন্তু মা কাপালিকের ডাকে সাড়া দিলেন না। তার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল।
কবি শান্ত কাকলির সুরে বললেন-কাপালিক তুমি যদি আমার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হও- নরবলি বন্ধ করবে তবে আমি তোমার মাকে দর্শন করিয়ে দেব। এই দিন কাপালিক মাকে দেখাতে না পেরে জ্ঞান চক্ষু খুলল। তাই মাকে দেখার ইচ্ছায় তার হৃদয় পিঞ্জর ছটফট করতে লাগল। কাপালিক কবির কাছে অঙ্গিকার করলেন ও প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হলেন যদি তুমি আমার মাকে দেখাতে পারো তবে আজ হতে ছেড়ে দেব নর বলিদান। আর অন্যতা হলে এই মাতৃ চরণে তোমারে কবির বলিদান।
কবি জয়দেব বললেন ঐ দেখ নিশ্চল ধরণীর বুকে, মন্দির মাঝে মাতৃ পাষান মূর্তিতে আমার ইষ্ট দশপ্রহরণ ধারিণী দেবী দুর্গার মূর্তি। কবি জয়দেব দেবীর শীলা মূর্তির মধ্যে কৃষ্ণ ও দেবী দুর্গাকে দেখিয়ে ছিলেন। দেবী পার্বতীর অর্ধেক মূর্তি না কি সেই সময় শ্যাম বর্ণ ধারণ করে। সেই থেকে দেবীর নাম হয় শ্যামরূপা। কাপালিক একই সঙ্গে শ্যাম ও রূপা (রূপা শব্দের অর্থ প্রচলিত লোকমুখে দুর্গা) দর্শনে নয়নে আনন্দাশ্রু ঝড়তে লাগল। কবির চরণে লুটিয়ে পড়ে ঐ কাপালিক জয়দেবের শিষ্যত্ব গ্রহন করে চির দিনের জন্য বৃন্দাবনে নির্বাসিত হন।
তবে নাম করণের রহস্য নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে। কারো মতে ইনি শ্রী কৃষ্ণের শক্তি স্বরূপা রাধিকা। অনেকের মতে উনি দেবী কালিকার এক রূপ। কিছু ঐতিহাসিকের মতে দেবী প্রকৃত পক্ষে সুক্ষোর অধিশ্বরী বা সুক্ষোশ্বরী। এই মতে বর্ধমানের আদিম জনগোষ্ঠীর নাম শ্যামলা, যা ধ্বণী সাদৃশ্য সুষমা বা শ্যামা। এই শ্যামলা বা শ্যামাদের অধিষ্টাত্রীর নাম শ্যামরূপা।
মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্ভুক্ত বিখ্যাত 'দেবী মাহাত্ম্য' (আনুমানিক পঞ্চম-ষষ্ঠ শতাব্দী) কাহিনী অনুযায়ী, কলিযুগেরও পূর্বে চন্দ্রবংশীয় রাজা সুরথ বসন্তকালে (চৈত্র মাসে) প্রথম মৃন্ময়ী দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন।
চন্দ্রবংশীয় রাজা সুরথ ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ ও প্রজাবৎসল শাসক। কিন্তু এক যুদ্ধে শত্রুর কাছে পরাজিত হয়ে তাঁকে রাজ্য ত্যাগ করতে হয়। সেই সুযোগে তাঁরই অমাত্যরা রাজকোষ ও ধনসম্পদ লুট করে নেয়। রাজ্যচ্যুত ও হতাশ রাজা সুরথ বনভ্রমণ করতে করতে একসময় ঋষি মেধার আশ্রমে এসে আশ্রয় নেন।
আশ্রমের শান্ত, নির্লিপ্ত জীবনযাত্রার মধ্যেও তিনি তাঁর হারানো রাজ্য ও প্রজাদের কথা ভুলতে পারছিলেন না। সেখানেই তাঁর পরিচয় হয় সমাধি নামে এক বৈশ্যের সঙ্গে। সমাধি জানান, তাঁর নিজের স্ত্রী ও পুত্রেরা সমস্ত সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তাঁকে গৃহচ্যুত করার পরেও তাঁর পরিবারবর্গের শুভাশুভ আশঙ্কায় তিনি উৎকণ্ঠিত। রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি—উভয়ের মনেই প্রশ্ন জাগে, যাঁরা তাঁদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে, তাঁদের প্রতি ক্রোধের পরিবর্তে কেন এখনও মমতা, উদ্বেগ ও শুভকামনা অনুভব করছেন?
এই জটিল প্রশ্নের উত্তর জানতে তাঁরা ঋষি মেধার শরণাপন্ন হন। ঋষি তাঁদের দেবীমাহাত্ম্য-এর কাহিনি শ্রবণ করান এবং বোঝান যে, জগতের সমস্ত মায়া, মোহ, আসক্তি ও সম্পর্ক পরমেশ্বরী মহামায়ারই লীলা।
ঋষির উপদেশে অনুপ্রাণিত হয়ে রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি নদীতীরে টানা তিন বছর কঠোর তপস্যা করলেন এবং সব শেষে দুর্গোৎসব করলেন। তবে রাজা সুরথ ওই পুজো করেন বসন্তকালে, শরৎকালে নয়। দেবীর কৃপায় রাজা সুরথ তাঁর হারানো রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন। অন্যদিকে বৈশ্য সমাধি লাভ করেন আত্মতত্ত্বের জ্ঞান—যা যে কোনো পার্থিব সাম্রাজ্যের চেয়েও মহামূল্যবান।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, পরবর্তীকালে রাজা সুরথ অজয় নদের তীরে ঘন শালবনে ঋষি মেধার আশ্রমসংলগ্ন স্থানে মহাকালী, মহালক্ষ্মী ও মহাসরস্বতী—এই ত্রিমাতার মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের সুরক্ষার জন্য তিনি একটি উঁচু প্রাচীর বা দুর্গবেষ্টনী নির্মাণ করেন। এই কারণেই স্থানটি গড়চণ্ডী মহামায়াধাম নামে পরিচিতি লাভ করে।
সময়ের প্রবাহে এই দুর্গবেষ্টিত তীর্থক্ষেত্র ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে ঘন জঙ্গলে পরিণত হয়। বর্তমানে পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুর মহকুমার কাঁকসা অঞ্চলের এই বিস্তীর্ণ বনভূমি গড়জঙ্গল নামে সুপরিচিত।
দীর্ঘকাল অবহেলিত থাকার পর ১৯৯২ সালে শ্রী পঞ্চ অটল আখাড়ার মহন্ত শ্রী হরি গিরিজী মহারাজের যোগ্য শিষ্য মহন্ত শ্রী ব্রহ্মানন্দ গিরি (যোগীরাজ) এই প্রাচীন মেধসাশ্রম ও গড়চণ্ডীধাম পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় প্রাচীন মন্দির সংস্কার, প্রতিমা প্রতিষ্ঠা, অখণ্ড দীপ প্রজ্বলন এবং নিত্যপূজার পুনঃপ্রবর্তন হয়। সেই থেকে গড়চণ্ডী মহামায়াধাম আবারও ভক্ত ও দর্শনার্থীদের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক তীর্থক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
নির্দেশ-গ্রন্থ
(১) বাংলা দেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ) রমেশ চন্দ্র মজুমদার (২) পশ্চিম বাংলার সংস্কৃতি (প্রথম খন্ড) বিনয় ঘোষ (৩) বর্ধমান পরিক্রমা-সুধীর চন্দ্র দাঁ (৪) দুর্গাপূজা সে কাল থেকে একাল-বিমল চন্দ্র দত্ত (৫) বাঙালীর ইতিহাস (আদিপর্ব) নিহার রঞ্জন রায় (৬) ভারত কোষ-৫ খন্ড বক্তীয় সাহিত্য পরিষদ (৮) বঙ্গে দুর্গাপূজা-গিরিশ চন্দ্রর বেদান্ত তীর্থ (৯) দুর্গোৎসব-ক্ষেত্রনাথ ঘোষ (১০) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-সুকুমার সেন। (১০) গড়ের মা-তাপস বন্দোপাধ্যায়