দুর্গার টুইট
শুভ্র দাস
আমাকে হয়তো এখনো খুঁজছো তুমি,
যেভাবে খুঁজেছো অতীতের নিজেদের।
সমুদ্র স্নানে বিদায় নিয়েছি আমি,
দেখা আর হবে না এবছরে আমাদের।
সবলা এখন তোমরা সবাই জানি,
অতিমারী দূর সহজেই হয়ে যাবে।
ভালোবাসা দিয়ে বেঁধে রেখো গ্রামখানি,
শক্তি যা চাও নিজের হাতেই পাবে।
অসুখ
শুভ্র দাস
আয়না সামনে সকাল সকাল, থমকে দাঁড়ায় মন খারাপ
কপাল ভাঁজে বলির রেখা, সময় চলার গভীর ছাপ |
শরীর এখন যন্ত্র কেবল, জমতে থাকা জং এর স্তর;
ক্লান্ত হৃদয়, শ্রান্ত মনে, অলস আঁখির অবশ স্বর |
জগৎটারই আসল অসুখ, পুড়ছে জ্বরে তার কপাল,
এটাই কি সেই শেষের শুরু ? আসছে প্রলয়, ধ্বংস-কাল ?
আগুন কোথাও, জলের অভাব, কোথাও চলে খরার ত্রাস
বিলুপ্ত কেউ, ঘর ভেসেছে, ঝঞ্ঝা ঝড়ে জলোচ্ছাস।
তোমার আমার দুঃখবিলাস, তুচ্ছ সে সব চিন্তাভয়;
পৃথিবীটাকে বাঁচাও আগে, অন্য কথা পরেও হয় |
একদিন তো যেতেই হবে, রাস্তা না হয় খোলাই থাক,
আসা যাওয়ার পথের ধারে, নেবোই নাহয় আঁধার বাঁক।
প্রকৃতিটা বাঁচলে পরে, দেখবে যেসব নতুন মুখ,
বুক ভরা যে শ্বাসটি নেবে, সেটাই জেনো আসল সুখ।
করোনাতে নববর্ষ
শুভ্র দাস
তোমার আসার প্রতীক্ষাতে কেটেছে কত সপ্তা-মাস,
বন্ধ ঘরে উঠতো জমে বন্দী মনের দীর্ঘশ্বাস |
নববর্ষে, চাই না তো আর অন্ধ আকুল চিন্তা ভয়,
মহামারীর লড়াই শেষে, ইচ্ছা যেন পূর্ণ হয় |
নতুন আশার দিশা দেখাক প্রথম আলোর উষ্ণ ভোর,
সম্ভাবনার সিঁড়ি খুলুক আকাশ ছোঁয়া ছাদের দোর |
নতুন বছর আনুক খবর হালকা করে বুকের ভার,
ভবিষ্যতের আলোয় কাটুক বর্তমানের অন্ধকার |
সব নৈঃশব্দ এক নয়
শুভ্র দাস
নির্বাক সব শ্রোতা যখন,
সরোদ-সেতার ঝংকারে।
স্তব্ধ জমাট আঁধার যবে,
আলোর ছোঁয়ায় উপচে পড়ে।
ফস্কে পড়া ফুলদানীটা,
যখন মেঝের দিকে ধায়।
তন্দ্রা মাখা প্রেয়সী-আঁখি,
তোমার পানে চায়।
স্তিমিত ভুবন ঝড়ের আগে,
আঁধার চারিদিকে।
হারিয়ে যাওয়া প্রতিধ্বনি,
দীর্ঘ পথের বাঁকে।
গড়া ভাঙার মধ্যিখানে,
শান্ত সাগর ঢেউ।
কবর পরে নীরব ফলক,
নাম লেখে নি কেউ।
নবজাতক স্তব্ধ ক্ষণিক,
কান্না রোলের আগে।
অসৎ নেতার রাষ্ট্রে যখন,
মানুষ নাহি জাগে।
আততায়ীর গুলি যখন,
নামায় কালো রাত।
কণ্ঠ যখন রুদ্ধ করে,
নিঠুর ঘাতক হাত ।
ছায়ার ছবি
শুভ্র দাস
বৃষ্টি ভেজা সকাল শেষে রোদ ঝলমল দুপুর,
চোখ বুজলেই সেই কবেকার তক্তপোষে উপুড়।
দগ্ধ আকাশ, তপ্ত বায়ু, ভেজা কাপড় মেলা,
ঝুলতে থাকা তারের ওপর, চলতো ঝুলন খেলা।
খেলা ছিল লুকোচুরির, ছায়াই খেলা তখন,
সিক্ত কাপড় গা ছুঁয়ে কয় ঝাপসা মনের কহন।
প্রেমিক-জামা ওই বাড়িতে, এ বারান্দায় শাড়ি,
আলো ছায়ার চোখাচোখি চলতো আড়াআড়ি।
পাঞ্জাবি আর সালোয়ারের ঘেঁষাঘেঁষি ভিড়ে ,
চাদর পরে হাত মিলেছে, নীরবে নিবিড়ে।
নৃত্য তালে নিত্য বসন, পর্দা ভেজা স্মৃতি,
ছেলেবেলা, মেয়েবেলা, শিশুবেলার ইতি।
আজকে যখন তপ্ত বাতাস, দমকা হাওয়া বয়,
সেই সেদিনের ছায়ার ছবি, ছায়াছবি হয়।
Bengali Science writing
কাজের লোক
নানা ভাবে এরা এসেছে আমাদের জীবনে
কেউ ক্ষুধার তাড়নায় অসহায়া,
কেউবা পিতৃবিয়োগে,
সদ্য স্বামীহারা কেউ,
কেউবা স্বামী পরিত্যক্তা,
অবার দারিদ্রে অপারগ, নচার পিতামাতার অনুরোধে কেউ |
উত্সুখ চোখে ওরা এসেছে
মাসান্তে কিছু টাকা,
আর দিনান্তে পেট ভরার আশায় ।
পরিবর্তে, যে ভালোবাসা দিতে পারে নি একান্ত আপনদের
তাই তারা উজাড় করেছে প্রবাসী ছেলেমেয়েদের জন্যে ------
আমরা কখনো এদের ডেকেছি রুমা,
কখনো গৌরী, শ্যামলী,বুড়ি, পঞ্চমী,হিমানী,সবিতা,কাজল ----
কখনো বা শিখা, সাবিত্রী---
প্রবাসী ছেলেমেয়েদের আশা ভরসা থেকে
এখন তাদের বাবামায়েদের কাছে
এরা হয়েছে অপরিহার্য
সকালের জলখাবারে,
সপ্তাহের রেশনে,
রান্নার বাসন পরিস্কারে,
সময় মত বাতের ওষুধ এগিয়ে দেওয়ায়,
হঠাত অসুস্থ হলে ডাক্তার ডাকায়,
আর সপ্তাহে একদিন টেলিফোন এলে
উত্সুখ বাবা-মায়ের হাতে এগিয়ে দেওয়াতে,
সর্বত্রই রয়েছে এদের হাত-----
বছরে একবার ছেলেমেয়েরা আসে,
হই হুল্লোড় করে চলে যাবার সময়
মোটা বকসিস গুঁজে দেয় হাতে----
বলে মা-বাবাকে দেখিস ---, তারপর ---
তারপর, রোজকার কর্মময় একঘেয়েমির শেষে, টিভির পর্দার সামনে
নিজেদের স্বপ্নগুলোকে বিসর্জন দিতে দিতে
এরা হয়ত আগামী জন্মের স্বপ্ন দেখে - প্রবাসী হবার ।
টেবিল
করোনার নিঃশব্দ পদধ্বনি,
বসেছি তাই দূরে দূরে,
সুপ্রাচীন টেবিলটা ঘিরে,
যেখানে রোজ জন্ম নেয় জীবন।
কোনায় পুরণো ক্ষত - চিরন্তন দংশন এক;
সেই শিশুর, এক দুপুরের লুকোচুরির চিহ্ন
যার ধরা আছে পরিণত হাঁটুতে ।
একান্তে, হারানো প্রেম আর
সুখস্বপ্নরা এখানে ঠোঁট রাখে
গরম চায়ের কাপে, আর সস্নেহে
আমরা হাত রাখি সন্তানের কাঁধে ।
এই টেবিলেই শিশু হয় পুরুষ, হয় নারী;
দূর থেকে তাদের বাড়ানো হাত
মাঝে মাঝে ধরি, হঠাৎ যখন কাঁপা পায়ে
জড়াজড়ি করে আদুরে কুকুরের অবলম্বন ।
তুষারে, বর্ষণে, এ টেবিল
ধূমায়িত খিচুড়ির মতো আশ্রয়;
বিষন্ন যুদ্ধারম্ভে, সমাপ্তির ক্লান্তিতে,
আতঙ্কিতের সহায় হয়ে
এ টেবিলেই জন্মেছে সোনালি ভবিষ্যৎ।
গণসংগীতে গলা মিলিয়েছি অনেকে,
বিমর্ষতার সুরে নীরবে প্রহর গুনেছি, একাকী।
প্রার্থনার কৃতজ্ঞ করজোড়ে হয়তো
এখানেই সব হবে ইতি,
হাসি কান্নার রেশে চলে যাবো,
এ টেবিল ছেড়ে, চিরতরে।
বিদায়
ওরা যেন সকলে এক সঙ্গে দাঁড়িয়ে
উঠে বললো "আসি আজ তবে
কখনো হয়তো আবার দেখা হবে।"
অতসী মামী কলঘর থেকে
এসে শুয়ে পড়লেন, চিরকালের মতো ।
রোজ রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি যেতেন মিলন কাকু;
কাকুর কিডনিরা একদিন দোকানের ঝাঁপ ফেলে দিলো ।
অনেকবছরের হার্টএর অসুখ সাবধানে সামলে
মেসো শেষ পর্যন্ত ঘুমের মধ্যে, মাথায় রক্ত উঠে.......
সেভাবেই একে একে উঠে চলে গেলেন
মৃনাল, দিব্যেন্দু, নীরেন্দ্রনাথ, মেরি, অতীনেরা ।
যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে ঘুরে গেলো আরও কিছু আপনার জন ।
ঠিক যেমন বছর কুড়ি আগের সেই পুজোর সময়;
তরুণ-তাজা মানুষগুলো সব বেরিয়ে পড়তে চাইছিলো,
কেউ নৈনিতাল, কেউ আগ্রা, কেউ দেওঘর
কুণ্ডুস্পেশালে কেউ, কেউবা রাজধানীতে
সকলেই যেন পণ করেছে "ঘরের মাঝে থাকবো না আর ।"
পিতার মৃত্যু
পিতার মৃত্যুতে, আইরিশরা বলেন -
সরে যায় তোমার মাথার ছত্রছায়া ।
আর আর্মেনিয়ানরা বলেন, যেন তাঁর আকাশের সূর্য্য আসে তোমার জীবনে ।
পিতার মৃত্যুতে, ওয়েলশরা বলেন -
মাটির গভীরে আরও এক ফুট তলিয়ে যাও তুমি ।
আর আর্মেনিয়ানরা বলেন, যেন তাঁর আলোয় ফুটে ওঠে তোমার চলার পথ ।
পিতার মৃত্যুতে, কানাডিয়ানরা বলেন -
শূন্য হয় তোমার অভিযোগের থলি ।
আর আর্মেনিয়ানরা বলেন, যেন তাঁর সূর্য্য আজ হয় তোমার ।
পিতার মৃত্যুতে, ফরাশিরা বলেন -
তুমি হয়ে ওঠো তোমার পিতা ।
আর আর্মেনিয়ানরা বলেন, যেন তাঁর আলোয় উদ্ভাসিত হয় তোমার জীবন ।
পিতার মৃত্যুতে, ভারতীয়রা বলেন -
প্রত্যাবর্তন হয় পিতার, বজ্র রূপে ।
আর আর্মেনিয়ানরা বলেন, যেন তাঁর আকাশের আলো হয় তোমার ।
পিতার মৃত্যুতে, রাশিয়ানরা বলেন -
হারিয়ে যায় তোমার শৈশবের স্মৃতি ।
আর আর্মেনিয়ানরা বলেন, যেন তাঁর আলো হয় তোমার ।
পিতার মৃত্যুতে, ইংরেজরা বলেন -
তুমি যোগ দাও পিতাদের আড্ডায় ।
আর আর্মেনিয়ানরা বলেন, যেন তুমি হও তাঁর আকাশের উত্তরসূরী ।
পিতার মৃত্যুতে, আর্মেনিয়ানরা বলেন -
তোমার জগৎ বদলে যায় চিরকালের মত ।
মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় দুজনের চলার পথের আলো ।