অতীতকে ভুলে যাও। অতীতের দুশ্চিন্তার ভার অতীতকেই নিতে হবে। অতীতের কথা ভেবে ভেবে অনেক বোকাই মরেছে। আগামীকালের বোঝার সঙ্গে মিলে আজকের বোঝা সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়। ভবিষ্যৎকেও অতীতের মতো দৃঢ়ভাবে দূরে সরিয়ে দাও। আজই তো ভবিষ্যৎ-কাল বলে কিছু নেই। মানুষের মুক্তির দিন তো আজই। ভবিষ্যতের কথা যে ভাবতে বসে সে ভোগে শক্তিহীনতায়, মানসিক দুশ্চিন্তায় ও স্নায়ুবিক দুর্বলতায়। অতএব অতীতের এবং ভবিষ্যতের দরজায় আগল লাগাও, আর শুরু করো দৈনিক জীবন নিয়ে বাঁচতে।

সারাংশ : মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় হলো বর্তমান। অতীত এবং ভবিষ্যতের ভাবনা মানুষের জীবনে কোনো সুফল বয়ে আনে না। বরং তা মানুষকে শক্তিহীন, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এবং স্নায়ুবিকভাবে দুর্বল করে তোলে। তাই জীবনকে সফল করে তুলতে হলে অতীত ও ভবিষ্যতের চিন্তা ঝেড়ে ফেলে বর্তমানকে গুরুত্ব দিতে হবে।


অতীতকে ভুলে যাও। ভবিষ্যত দরজায় খিল তুলে পরম নিশ্চিন্তে বর্তমানে বাসরসজ্জা রচনা করো। নদীর দিকে তাকাও-যে স্রোত চলে যায়, তা আর ফিরে আসে না। দূর নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে তাকাও, তার রহস্য এক অচিন্তনীয় তমসায় আচ্ছন্ন। কী লাভ অন্ধকারে? স্বচ্ছ সুন্দর বর্তমানকে ভালবাস। প্রতি মুহূর্তের কর্মই তোমার বর্তমান।

সারাংশ : অতীত বা অজানা ভবিষ্যতের ভাবনা নয় বর্তমানের ভাবনাই মানুষের জীবনকে সার্থক করে তোলে। তাই অতীতের স্মৃতিচারণা নয়, ভবিষ্যতের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টাও নয়, স্বচ্ছ সুন্দর বর্তমানই আমাদের জীবনের প্রকৃত সত্য।


অর্ধ শতাব্দীর অধিককাল ধরিয়া বাংলা ভাষায় বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ-সকল প্রচারিত হইতেছে; কিন্তু ইহাতে বিশেষ কিছু ফলাফল হইয়াছে কি? বিজ্ঞান-বিষয়ক যে-সকল পুস্তকের কিছু কাটতি আছে, তাহা পাঠ্য-পুস্তক নির্বাচিত কমিটির নির্বাচিত তালিকাভুক্ত। সুতরাং পুস্তক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইবার সোপান স্বরূপ। আসল কথা এই যে, আমাদের দেশ হইতে প্রকৃত জ্ঞানস্পৃহা চলিয়া গিয়াছে। জ্ঞানের প্রতি একটা আন্তরিক টান থাকিলেও কেবল বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের অঙ্গীভূত বিদ্যালয়সমূহে বহুকাল হইতে বিজ্ঞান অধ্যাপনার ব্যবস্থা হইয়াছে। তথাপি এই জ্ঞানস্পৃহার অভাবেই বিজ্ঞানের প্রতি আন্তরিক অনুরাগসম্পন্ন ছাত্র আদৌ দেখিতে পাওয়া যায় না; কেননা ঘোড়াকে জলাশয়ের নিকট আনিলে কি হইবে? উহার তৃষ্ণা নাই। পরীক্ষা পাশ করাই যেখানকার ছাত্রজীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য, সেখানকার যুবকগণের দ্বারা অতীত বৈজ্ঞানিক বিদ্যার শাখা-প্রশাখাদির উন্নতি হইবে, এই হাস্যোদ্দীপক উন্মত্ততা অন্য কুত্রাপিও দেখিতে পাওয়া যায় না। অপরপক্ষে অপরাপর দেশের লোকেরা একথা সম্যক উপলব্ধি করিয়াছেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বার হইতে বাহির হওয়াই জ্ঞানসমুদ্রে মন্থনের প্রশস্ত সময়। আমরা দ্বারকেই গৃহ বলিয়া মনে করিয়াছি, সুতরাং জ্ঞানমন্দিরের দ্বারেই অবস্থান করি, অভ্যন্তরস্থ রত্মরাজি দৃষ্টিগোচর না করিয়াই ক্ষুন্ন মনে প্রত্যাবর্তন করি।

সারাংশ : আমাদের দেশে প্রকৃত জ্ঞান চর্চার প্রতি মানুষের আগ্রহ নেই বললেই চলে। জ্ঞানস্পৃহার অভাবে এদেশে বিজ্ঞানচর্চা প্রসার লাভ করেনি। সকলেই পরীক্ষায় পাশ করার জন্য ব্যগ্র বলেই এদেশে প্রাপ্ত গ্রন্থসমূহও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত তালিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষার্থীদের আগ্রহকে জাগিয়ে তুলে উন্নত দেশের মতো আমাদের দেশকেও বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে।


অনেকের ইন্দ্রিয় সংযত, তাঁহাদের চিত্ত শুদ্ধ নয়। ইন্দ্রিয়-সুখ ভোগ করব না, কিন্তু আমি ভালো থাকব এবং আমার ইন্দ্রিয়গুলো ভালো থাকবেÑএই বাসনা তাদের মনে প্রবল। আমার ধন হউক, আমার মান হউক, আমার সম্পদ হউক, আমার সৌভাগ্য হউক, আমি বড় হই, আর সবাই আমার চেয়ে ছোট হউক, তাঁরা এরূপ কামনা করেন। এই সকল অভীষ্ট যাতে সিদ্ধ হয়, তাঁরা চিরকাল সেই চেষ্টায় সেই উদ্যোগে ব্যস্ত থাকেন। সেই জন্য না করেন এমন কাজ নেই, তদ্ভিন্ন মন দেন এমন বিষয় নেই। যারা ইন্দ্রিয়াসক্ত তাদের অপেক্ষাও এরা নিকৃষ্ট। এদের নিকট ধর্ম কিছুই নয়, জ্ঞান কিছুই নয়, ভক্তি কিছুই নয়। তাঁরা আল্লাহকে বাহ্যত মানেন বটে, কিন্তু কার্যত তাঁদের ধর্ম বলে কিছুই নেই। কেবল আপনি আছেন, আপনি ভিন্ন আর কিছুই নেই। ইন্দ্রিয়াসক্তি অপেক্ষাও এই স্বার্থপরতা চিত্ত-শুদ্ধির অন্তরায়। পরার্থ ভিন্ন চিত্ত-শুদ্ধি নেই।

সারাংশ : জীবনকে সার্থক করে তুলতে হলে কেবল ইন্দ্রিয়াসক্তি থেকে মুক্ত হলেই চলবে না মনকেও শুদ্ধ করে তুলতে হবে। যাদের ইন্দ্রিয় সংযত কিন্তু মন শুদ্ধ নয় তারা নিজ স্বার্থের জন্য সব কিছুই করতে পারে। বাইরে নিজেদের ধার্মিক বলে পরিচয় দিলেও ধর্মের মূল যে কথা পরোপকার তা থেকে তারা অনেক দূরে। সেই মানুষই সার্থক যার ইন্দ্রিয় সংযত, মন শুদ্ধ এবং পরার্থ চিন্তাই যার ব্রত।


অনেকে বলেন, স্ত্রীলোকদের উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন নাই। মেয়েরা চর্বচোষ্য রাঁধিতে পারে, বিবিধ প্রকার সেলাই করিতে পারে, দুই-চারিখানা উপন্যাস পাঠ করিতে পারে, ইহাই যথেষ্ট, আর বেশি আবশ্যক নাই। কিন্তু ডাক্তার বলেন যে, আবশ্যক আছে, যেহেতু মাতার দোষ-গুণ লইয়া পুত্রগণ ধরাধামে অবতীর্ণ হয়। এইজন্য দেখা যায় যে, আমাদের দেশে অনেক বালক শিক্ষকদের বেত্রতাড়নায় কণ্ঠস্থ বিদ্যার জোরে এফএ, বিএ পাস হয় বটে; কিন্তু বালকের মনটা তাহার মাতার সহিত রান্নাঘরেই ঘুরিতে থাকে।

সারাংশ : যারা নারীদের চার দেয়ালে বন্দি রাখার পক্ষে তারা মনে করে যে নারীদের উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সন্তান যেহেতু মায়ের দ্বারা প্রভাবিত হয় সেহেতু নারীদের উচ্চশিক্ষা একান্ত প্রয়োজন। তা না হলে মায়ের ক্ষুদ্র গন্ডিতে সন্তানের মনও আবদ্ধ থাকবে। হয়ত সে উচ্চশিক্ষা লাভ করবে ঠিকই কিন্তু তার মন প্রসার লাভ করবে না।


অনেকের ধারণা এই যে, মহৎ ব্যক্তি শুধু উচ্চবংশেই জন্মগ্রহণ করে থাকেন; নীচকুলে মহত্ত্বের জন্ম হয় না। কিন্তু প্রকৃতির দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় যে, মানুষের এ ধারণা ভ্রমাত্মক। পদ্ম ফুলের রাজা; রুপে ও গন্ধে সে অতুলনীয়। কিন্তু এর জন্ম হয় পানের অযোগ্য পানিভরা এঁদো পুকুরে। পক্ষান্তরে বটবৃক্ষ বৃক্ষকুলের মধ্যে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন বটে। অথচ বহু বৃক্ষের ফল আমরা আস্বাদন করি। কিন্তু এত খ্যাতনামা যে বটবৃক্ষ তাহার ফল আমাদের অখাদ্য।

সারাংশ : বংশমর্যাদা মানুষের মহত্ত্বের পরিচায়ক নয়। মানুষ তার হৃদয়ের বিশালতা, প্রতিভা, গুণাবলি প্রভৃতির মাধ্যমেই মহৎ হয়ে ওঠে। কেবল মানবসমাজই নয় প্রকৃতির মধ্যেও এ বিষয়টি লক্ষণীয়।


অপরের জন্য তুমি তোমার প্রাণ দাও, আমি বলতে চাই নে। অপরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দুঃখ তুমি দূর করো। অপরকে একটুখানি সুখ দাও। অপরের সঙ্গে একটুখানি মিষ্টি কথা বলো। পথের অসহায় মানুষটির দিকে একটা করুণ কটাক্ষ নিক্ষেপ করো। তাহলেই অনেক হবে। চরিত্রবান, মনুষ্যত্বসম্পন্ন মানুষ নিজের চেয়ে পরের অভাবে বেশি অধীর হন, পরের দুঃখকে ঢেকে রাখতে গৌরববোধ করেন।

সারাংশ : অন্যের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করতে হবে এমন কোনো কথা নেই ।জীবন উৎসর্গ না করে ছোট ছোট দুঃখ দূর করার মধ্য দিয়েও অন্যকে সুখী করা যায়। নিজের কথা না ভেবে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল হলে অসহায় মানুষ উপকৃত হয়। মহৎ ব্যক্তিরা এভাবে সর্বদাই নিজের সুখ-দুঃখকে উপেক্ষা করে পরের কল্যাণ কামনায় ব্রতী হন।


অভাব আছে বলিয়া জগৎ বৈচিত্র্যময় হইয়াছে। অভাব না থাকিলে জীব-সৃষ্টি বৃথা হইত। অভাব আছে বলিয়া অভাব-পূরণে এত উদ্যোগ। সংসার অভাবক্ষেত্র বলিয়া কর্মক্ষেত্র। অভাব না থাকিলে সকলেই স্থানু-স্থবির হইত, মনুষ্যজীবন বিড়ম্বনাময় হইত। মহাজ্ঞানীগণ অপরের অভাব দূর করিতে সর্বদা ব্যস্ত। জগতে অভাব আছে বলিয়াই মানুষ সেবা করিবার সুযোগ পাইয়াছে। সেবা মানবজীবনের পরম ধর্ম। সুতরাং অভাব হইতেই সেবাধর্মের সৃষ্টি হইয়াছে। আর এই সেবাধর্মের দ্বারাই মানুষের মনুষ্যত্বসুলভ গুণ সার্থকতা লাভ করিয়াছে।

সারাংশ : অভাব মানুষকে কর্মের পথে চালিত করে জগতকে বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। অভাব আছে বলেই মানবজীবন চলমান। এ অভাব থেকেই সেবাধর্ম উৎপত্তি লাভ করেছে। অপরের অভাব পূরণের ইচ্ছা এবং তা বাস্তবে রূপ দেওয়ার মধ্য দিয়েই মানুষ মহান হয়ে ওঠে।


অভ্যাস ভয়ানক জিনিস। একে হঠাৎ স্বভাব থেকে তুলে ফেলা কঠিন। মানুষ হবার সাধনাতেও তোমাকে সহিষ্ণু হতে হবে। সত্যবাদী হতে চাও? তাহলে ঠিক করো, সপ্তাহে অন্তত এক দিন মিথ্যা বলবে না। ছ’মাস ধরে এমনই করে নিজে সত্য কথা বলতে অভ্যাস করো। তারপর এক শুভ দিনে আর একবার প্রতিজ্ঞা করো, সপ্তাহে তুমি দুদিন মিথ্যা বলবে না। এক বছর পরে দেখবে সত্য কথা বলা তোমার কাছে অনেকটা সহজ হয়ে পড়বে। সাধনা করতে করতে এমন একদিন আসবে যখন ইচ্ছে করলেও মিথ্যা বলতে পারবে না। নিজেকে মানুষ করার চেষ্টায় পাপ ও প্রবৃত্তির সঙ্গে সংগ্রামে তুমি হঠাৎ জয়ী হতে কখনও ইচ্ছা করো না, তাহলে সব প- হবে।

সারাংশ : মানুষ এমনভাবে অভ্যাস দ্বারা বশীভূত সে সহজে তার অভ্যাসগুলো ত্যাগ করতে পারে না। তবে প্রকৃত মানুষ হওয়ার জন্য খারাপ অভ্যাসগুলো অবশ্যই বর্জন করতে হবে। হঠাৎ করেই মানুষ তার খারাপ অভ্যাস ত্যাগ করতে গেলে সব পন্ড হয়ে যায়। ধীরে ধীরে অনুশীলনের মাধ্যমেই বদ অভ্যাস পরিবর্তন করে একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠা সম্ভব।


১০

অমঙ্গলকে জগৎ হইতে হাসিয়া উড়াইয়া দিবার চেষ্টা করিও না। তাহা হইলে মঙ্গলসমেত উড়িয়া যাইবে। মঙ্গলকে যেভাবে গ্রহণ করিয়াছ, অমঙ্গলকেও সেইভাবে গ্রহণ করো। অমঙ্গলের উপস্থিতি দেখিয়া ভীত হইতে পার, কিন্তু বিস্মিত হইবার হেতু নাই। অমঙ্গলের উৎপত্তি অনুসন্ধান করিতে যাইয়া অকূলে হাবুডুবু খাইবার দরকার নাই। যেদিন জগতে মঙ্গলের আবির্ভাব হইয়াছে, সেই দিনই অমঙ্গলের যুগপৎ উদ্ভব হইয়াছে। একইদিনে, একই ক্ষণে, একই উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্ত উভয়ের উৎপত্তি। এক কে ছাড়িয়া অন্যের অস্তিত্ব নাই, এক-কে ছাড়িয়া অন্যের অর্থ নাই। যেখান হইতে মঙ্গল ঠিক সেখান হইতেই অমঙ্গল। সুখ ছাড়িয়া দুঃখ নাই, দুঃখ ছাড়িয়া সুখ নাই। একই প্রয়োজনে, একই নির্ঝর ধারাতে উভয় স্রোতস্বিনী জন্মলাভ করিয়াছে, একই সাগরে উভয়ে গিয়া মিশিয়াছে।

সারাংশ : মঙ্গল-অমঙ্গল, সুখ-দুঃখ পরস্পর বিপরীতমুখী হলেও একে অপরের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। মঙ্গলের পথে যাত্রায় যেমন অমঙ্গলকে এড়ানো যায় না তেমনি দুঃখ না পেলেও সুখের মর্ম অনুধাবন করা যায় না। এদের একটির উপস্থিতিতে আরেকটির মূল্য আমরা উপলব্ধি করি। তাই মঙ্গল ও সুখের পাশাপাশি অমঙ্গল ও দুঃখকেও জীবনে বরণ করে নিতে হবে।


১১

অমঙ্গলের অপলাপ করিও না; অমঙ্গল তোমার সহচর, তুমি ছাড়িতে চাহিলেও সে তোমাকে ছাড়িবে না। মঙ্গল ও অমঙ্গল সমানভাবে তোমাকে জড়াইয়া থাকিবে। যতদিন তোমার জাগ্রতাবস্থা স্ফুর্তি পাইবে, ততদিন মঙ্গলের সঙ্গে অমঙ্গলও নিত্য ফুটিয়া উঠিবে। যখন অমঙ্গলের তিরোধান হইবে তখন মঙ্গলেরও তিরোধান হইবে; তোমার জাগরণ তখন সুষুপ্তিতে বিলীন হইবে। যতদিন জাগিয়া আছ ততদিন তোমার ব্যাপ্তি; ততদিন মঙ্গল তোমার ডান হাত ধরিয়া থাকিবে, অমঙ্গল তোমার বাম হাত ধরিয়া থাকিবে। উভয়ই তোমাকে জীবনের পথে লইয়া যাইবে। একের বুঝি আকর্ষণ অপরের বুঝি বিকর্ষণ। উভয়ের মধ্যে তোমার গমনীয় পথ।

সারাংশ : মানুষের জীবনে মঙ্গল ও অমঙ্গল সর্বদাই পাশাপাশি অবস্থান করে। মানুষ চাইলেই অমঙ্গলকে উপেক্ষা করতে পারে না। তাই আমঙ্গলকে ভয় পাওয়া বা এর জন্য দুঃখ পাওয়ার কোনো কারণ নেই। কেবল মৃত্যুতেই এর শেষ, তাই একে বরণ করেই লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।


১২

আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে আমাদের উপমহাদেশ ছিল সভ্যতার সূতিকাগার। মানুষের জ্ঞান কতদিকে কতভাবে কতকিছুর অনুসন্ধান যে করেছে, সেকালের উত্তর-পশ্চিম ভারতের অধিবাসীদের কীর্তি খ্যাতি থেকে তা আজ সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেকালের ভারতের ইয়াঙ্ক, পাণিনি এবং পতঞ্জলি প্রভৃতি গুণিজনেরাই প্রথমে ধ্বনি বিজ্ঞানের চর্চা করেন। ইউরোপ আমেরিকা আজ যা করছে আড়াই হাজার বছর আগে ওঁরা তাই করে গেছেন। তফাতের মধ্যে এই যে তাঁদের ধ্বনি বিজ্ঞান সাধনার ভিত্তি ছিল অনুভূতি আর একালে এঁদের হাতে আছে বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার

সারাংশ : আড়াই হাজার বছর আগের মানব সভ্যতার সূতিকাগার হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশের অধিবাসীদের কীর্তি এবং উদ্ভাবন মূলত আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণার অন্যতম বিষয়। ইয়াঙক, পানিনি, পতজ্ঞলি প্রমুখ ছিলেন সেকালের ভারতের ধ্বনি বিজ্ঞান চর্চার পথিকৃৎ। ইউরোপ-আমেরিকার মতো গবেষণাগার না থাকলেও তাদের চর্চার মাধ্যমেই ধ্বনি বিজ্ঞান আজ এ পর্যায়ে পৌছেছে।


১৩

আজকের দুনিয়াটা আশ্চর্যভাবে অর্থের বা বিত্তের ওপর নির্ভরশীল। লাভ ও লোভের দুর্নিবার গতি কেবল আগে যাবার নেশায় লক্ষ্যহীন প্রচ-বেগে শুধু আত্মবিনাশের পথে এগিয়ে চলেছে। মানুষ যদি এই মূঢ়তাকে জয় না করতে পারে, তবে মনুষ্যত্ব কথাটাই হয়তো লোপ পেয়ে যাবে। মানুষের জীবন আজ এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে সেখান থেকে আর হয়তো নামবার উপায় নেই, এবার উঠবার সিঁড়ি না খুঁজলেই নয়। উঠবার সিঁড়িটা না খুঁজে পেলে আমাদের আত্মবিনাশ যে অনিবার্য তাতে আর কোনো সন্দেহ থাকে না।

সারাংশ : অর্থ-বিত্তের লোভে মানুষ এতটা উন্মত্ত হয়েছে যে, সে তার বাস্তব জ্ঞানও হারিয়ে ফেলছে। মানুষ তার মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিয়ে ক্রমশ আত্মবিনাশের পথে এগিয়ে চলেছে। এ অবস্থা থেকে পিছিয়ে আসার উপায় হয়তো নেই। কিন্তু গোটা মানব জাতির মঙ্গলের জন্য এ নেশা পরিত্যাগের পথ খোঁজাটা আজ অপরিহার্য।


১৪

আমরা যখন তর্ক করি তখন অপরকে আত্মমতাবলম্বী করিয়া জয়লাভের জন্য ব্যগ্র হই, যখন আত্মমত প্রকাশ করি তখন অপরের মতকে বশে আনিয়া প্রবল হইবার চেষ্টা করি এবং যখন অপ্রয়োজনীয় গল্প বলি তখনও অপরের হৃদয়কে আশ্রয়প্রার্থী করিয়া আশ্রয়দাতা প্রভু হইতে চাই। সংসারের কাজে আমরা অপরের অভাব ও আকাক্সক্ষার উদ্রেক বৃদ্ধি করিয়া সফল হইবার নিমিত্তে প্রভু সাজিয়া আপনাদিগকে দুর্লভ করি। আমাদের নিজেদের অভাব থাকিলেও পাছে বিপক্ষ আমাদের অভাব বুঝিতে পারিয়া প্রবল হয় এই ভয়ে আমরা সেই ভাবটিকে হৃদয়ের এক প্রান্তে লুকায়িত রাখিয়া বাহিরে কপট বিমুখতার ভাবটিকে প্রকাশ করি। সংসারে প্রত্যেকেই জয়লাভের উদ্যোগে ব্রতী, কিন্তু তাই বলিয়া সকলেই জয়লাভ করিতে পারে না। একের জয়ে অন্যের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। সম্পূর্ণ জয়লাভ কদাচিৎ ঘটে। আংশিক জয়লাভই নিত্য ঘটনা। সংসার-সংগ্রামী আড়ম্বরের যদিও অভাব নাই কিন্তু শেষ ফল সন্ধি। এই সন্ধিতে যাহার লাভের ভাগ অধিক তিনিই জয়ী এবং যাহার লাভের ভাগ অল্প তিনি পরাজিত।

সারাংশ : নিজের চিন্তার বীজ অন্যের মনে বপণ করাই আমাদের বিতর্কের উদ্দেশ্য। আপন অভাবকে সংগোপন রেখে বাইরের জগতে রাজা হওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা আমাদের। জয়ী হওয়ার আকুলতাই অন্যকে পরাজিত করে, আর শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে পরাজয়ের ইতিহাসই বেশি। পরস্পর সন্ধির ফলে নির্ণিত হয় শেষ ফল, সেখানে অধিক ভাগের অধিকারী সর্বদা জয়ী।


১৫

আমরা যে কত শিক্ষালোভী তার প্রমাণ আমাদের পাঁচ বৎসর বয়সে হাতেখড়ি হয়। আর কমসে কম একুশ বৎসর বয়সে হাতে কালি মুখে কালি মেখে আমরা সেনেট হাউস থেকে লিখে আসি। কিন্তু এতেও আমাদের শিক্ষার সাধ মেটে না। এরপরে আমরা সারাজীবন যখন যা কিছু পড়ি তা কবিতাই হউক, আর গল্প হউক-আমাদের মনে স্বতঃই এ প্রশ্নের উদয় হয় যে, আমরা এ পড়ে কী শিক্ষা লাভ করলুম, এ প্রশ্নের উত্তর মুখে মুখে দেওয়া অসম্ভব; কেননা, সাহিত্যের যা শিক্ষা তা হাতে হাতে পাওয়া যায় না। সাহিত্য যা দেয় তা আনন্দ; কিন্তু ও বস্তু আমরা জানি নে বলে মানি নে। আমাদের শিক্ষার ভিতর আনন্দ নেই বলে আনন্দের ভিতর যে শিক্ষা থাকতে পারে তা আমাদের বুদ্ধির অগম্য। আমাদের আকাঙক্ষাকে শিশুকাল থেকেই কোমর বেঁধে আমরা খর্ব করি। অর্থাৎ সেটাকে কাজে খাটাবার আগেই তাকে খাটো করে দিই। অনেক সময়ে বড়ো বয়সে সংসারের ঝড়-ঝাপটার মধ্যে পড়ে আমাদের আকাঙক্ষার পাখা জীর্ণ হয়ে যায়, তখন আমাদের বিষয় বুদ্ধি অর্থাৎ ছোট বুদ্ধিটাই বড় হয়ে ওঠে; কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, শিশুকাল থেকেই আমরা বড়।

সারাংশ : আমাদের শিক্ষার সম্পর্ক প্রয়োজনের কারণেই আনন্দের সাথে নয়। আর এ কারণেই সাহিত্য পাঠ করে সবাই শিক্ষাকে খোঁজে আনন্দকে নয়। শিক্ষার সাথে আনন্দের যোগের অভাবে তাই জীবনটাও নিরানন্দময় হয়ে পড়েছে। আমাদের শিক্ষা প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে বলে এর মূল তাৎপর্যকে আমরা কখনোই উপলব্ধি করতে পারি না।


১৬

আমার বলিতে দ্বিধা নাই যে, আমি আজ তাহাদেরই দলে, যাহারা কর্মী নন ধ্যানী। যাহারা মানবজাতির কল্যাণসাধন করেন সেবা দিয়া, কর্ম দিয়া, তাহারা মহৎ যদি নাই হন, অন্তত ক্ষুদ্র নন। ইহারা থাকেন শক্তির পেছনে রুধির ধারার মতো গোপন, ফুলের মাঝে মাটির মমতা রসের মতো অলক্ষ্যে।

সারাংশ : মানবজাতির কল্যাণসাধনে কর্মীরা সেবা, কর্ম দিয়ে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু ধ্যনীরা থাকেন পরোক্ষে। তারা কর্মীদের প্রেরণাশক্তি হিসেবে কাজ করে যান।


১৭

আমরা ছেলেকে স্কুল কলেজে পাঠিয়ে ভাবি যে, শিক্ষা দেওয়ার সমস্ত কর্তব্য পালন করলাম। বৎসরের পর বৎসর পাস করে গেলেই অভিভাবকরা যথেষ্ট তারিফ করেন। কিন্তু তলিয়ে দেখেন না যে, কেবল পাস করলেই বিদ্যার্জন হয় না। বাস্তবিক পক্ষে ছাত্রের বা সন্তানের মনে জ্ঞানানুরাগ বা জ্ঞানের প্রতি আনন্দজনক শ্রদ্ধার উদ্রেক হচ্ছে কিনা, তাই দেখবার জিনিস। জ্ঞানচর্চার মধ্যে যে এক পরম রস ও আত্মপ্রসাদ আছে, তার স্বাদ কোনো কোনো শিক্ষার্থী একবিন্দুও পায় না।

সারাংশ : শিক্ষা বিষয়টিকে আমরা সার্টিফিকেট অর্জনের সাথে একাত্ম করে ফেলেছি। কিন্তু সার্টিফিকেট অর্জন আর প্রকৃত শিক্ষা এক নয়। আনন্দের সাথে জ্ঞানের চর্চার মাধ্যমে যে শিক্ষা অর্জিত হয় সেটিই প্রকৃত শিক্ষা।


১৮

আমরা সকলেই ভ্রমণকারী। সকলেই পথ চলিতেছি। কেবল শিক্ষাভেদে, সংসর্গভেদে, লক্ষ্যভেদে কেহ সুপথে, কেহ বিপথে চলিতেছি। বিপথে চলিলে যে শেষে হিংস্র জন্তু সমাকুলে গহীন বনে প্রবেশ করিয়া অকালে প্রাণ হারাইতে হইবে, পাপ পশু আমাদিগকে গ্রাস করিবে, ইহা নিশ্চিত। আবার সুপথে চলিলে যে অপ্রমেয় পুরুস্কার লাভ হইবে সত্য সুন্দর শান্তিদাতার প্রেমের নন্দনকাননে প্রবেশের সৌভাগ্য ঘটিবে, ইহাও সত্য কথা। কিন্তু ভ্রমণে সব সময়ে যদি পথের কিনারা হয়, যেই হিরন্ময় চিরঅজ্ঞাত দেশের যতটুকু ভৌগোলিক সন্ধান মিলিয়াছে, তাহা উপযুক্ত ভ্রমণকারীর মুখে বা লিখিত বিবরণ হইতে অবগত হইতে পারি, তবে বোধ হয় দুর্বল মন অনেক বল পাইবে, পথের দুর্গমতা আতঙ্কের কারণ হইবে না, দীর্ঘদিন ঘুরিয়া হয়তো-বা বিপথে পড়িয়া ব্যর্থকাম ভগ্নহৃদয়ে অনুশোচনার তীব্র দংশন জ্বালা সহিতে হইবে না।

সারাংশ : প্রতিটি মানুষই জীবনের পথে চলমান- কেউ পাপের পথে, কেউ পূণ্যের পথে। তাই পাপের পথে চললে যেমন মানুষকে শাস্তি ভোগ করতে হয় তেমনি পূণ্যের পথে চললে সে স্বর্গের সন্ধান পায়। আর পূণ্যের পথে চলার জন্য পূণ্যবান ব্যক্তির অথবা ধর্মগ্রন্থের উপদেশ গ্রহণ করাই উত্তম।


১৯

আমার মনে হয়, যে দেশের নরনারীর মধ্যে পরস্পরের হৃদয় জয় করিয়া বিবাহ করিবার রীতি নাই, বরঞ্ছ তাহা নিন্দার সামগ্রী, যে দেশে নরনারী আশা করিবার সৌভাগ্য, আকাঙ্ক্ষা করিবার ভয়ঙ্কর আনন্দ হইতে চিরদিনের জন্য বঞ্ছিত, যাহাদের জয়ের গর্ব, পরাজয়ের ব্যথা কোনটাই জীবনে একটিবারও বহন করিতে হয় না, যাহাদের ভুল করিবার দুঃখ, আর ভুল না করিবার আত্মপ্রসাদ, কিছুরই বালাই নাই, যাহাদের প্রাচীন এবং বহুদর্শী সমাজ সর্ব প্রকারের হাঙ্গামা হইতে অত্যন্ত সাবধানে দেশের লোককে তফাৎ করিয়া, আজীবন কেবল ভালোটি হইয়া থাকিবারই ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছেন, তাই বিবাহ ব্যাপারটা যাহাদের শুধু নিছক ইংরেজি তা সে যতই বৈদিক মন্ত্র দিয়া ইংরেজি পাকা করা হোক, সে দেশের লোকের সাধ্যই নাই মৃত্যুঞ্চয়ের অন্নপাপের কারণ বোঝে। বিলাসীকে যাঁহারা পরিহাস করিয়াছিলেন, তাঁহারা সাধু গৃহস্থ এবং সাধ্বী গৃহিণী। অক্ষয় সতীলোক তাঁহারা সবাই পাইবেন, তাও আমি জানি, কিন্তু সেই সাপুড়ের মেয়েটি যখন একটি পীড়িত শয্যাগত লোককে তিল তিল করিয়া জয় করিতেছিল, তাহার তখনকার সেই গৌরবের কণামাত্র হয়তো আজিও ইহাদের কেহ চোখে দেখেন নাই। মৃত্যুঞ্জয় হয়তো নিতান্তই একটা তুচ্ছ মানুষ ছিল, কিন্তু তাহার হৃদয় জয় করিয়া দখল করার আনন্দটাও তুচ্ছ নহে, সেই সম্পদও অকিঞ্চিৎকর নহে।

সারাংশ : হৃদয় জয় করে কাউকে আপন করে পাওয়ার আনন্দ কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে বিরল। মৃত্যুঞ্জয়ের হৃদয় জয়ের যে অসামান্য গৌরব বিলাসী অর্জন করেছিল তা আধুনিক যুগের মানুষের কাছে বোধগম্য নয়। বৈদিক মন্ত্র দিয়ে হৃদয় জয়ের বিরল অনুভূতি বোঝার সাধ্যও তাই কারো নেই।


২০

আমাদের আকাঙ্ক্ষাকে শিশুকাল থেকেই কোমর বেঁধে আমরা খর্ব করি। অর্থাৎ সেটাকে কাজে খাটাবার আগেই তাকে খাটো করে দিই। অনেক সময় বুড়ো বয়সে সংসারের ঝড়-ঝাপটার মধ্যে পড়ে আমাদের আকাঙ্ক্ষার পাখা জীর্ণ হয়ে যায়, তখন আমাদের বিষয়-বুদ্ধি অর্থাৎ ছোট বুদ্দিটাই বড়ো হয়ে ওঠে; কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে, শিশুকাল থেকেই আমরা বড়ো রাস্তায় চলবার পাথেয় হালকা করে দিই। প্রথম কয় বৎসর এক রকম বেশ চলে। ছেলেরা যেই থার্ড ক্লাসে গিয়ে পৌঁছায় অমনি বিদ্যা অর্জন সম্বন্ধে তাদের বিষয়-বুদ্ধি জেগে ওঠে। অমনি তা হিসেব করে শিখতে বসে। তখন তারা বলতে আরম্ভ করে, আমরা শিখবো না, আমরা পাশ করবো। অর্থাৎ যেপথে যথাসম্ভব কম জেনে যতদূর সম্ভব বেশি মার্ক পাওয়া যায়, আমরা সেই পথে চলব। এইত দেখছি শিশুকাল থেকেই ফাঁকি দেবার বুদ্ধি অপবলম্বন।

সারাংশ : মাত্রাতিরিক্ত প্রতিযোগিতা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পরীক্ষায় ভাল ফলাফলকে শিশুকাল থেকে লক্ষ হিসেবে নেওয়ায় শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য জ্ঞানার্জন ব্যহত হচ্ছে, যা আমাদেরকে মেরুদন্ডহীন জাতিতে পরিণত করবে।


২১

আমাদের মনের ভাবে একটা স্বাভাবিক প্রবৃত্তি এই, সে নানা মনের মধ্যে নিজেকে অনুভূত করিতে চায়। প্রকৃতিতে আমরা দেখি, ব্যাপ্ত হইবার জন্য, টিকিয়া থাকিবার জন্য প্রাণীদের মধ্যে সর্বদা একটা চেষ্টা চলিতেছে। যে জীব সন্তানের দ্বারা আপনাকে বহুগুণিত করিয়া যত বেশি জায়গা জুড়িতে পারে, তাহার জীবনের অধিকার তত বেশি বাড়িয়া যায়, নিজের অস্তিত্বকে সে তত অধিক সত্য করিয়া তোলে। মানুষের মনোভাবের মধ্যেও সেই রকমের একটা চেষ্টা আছে। তফাতের মধ্যে এই যে, প্রাণের অধিকার দেশে ও কালে মনোভাবের অধিকার মনে এবং কালে। মনোভাবের চেষ্টা বহুকাল ধরিয়া বহু মনকে আয়ত্ব করা।

সারাংশ : নিজ মনের অনুভূতি অন্যের মনে ছড়িয়ে দেয়ার অপরিসীম আনন্দ মানুষের মাঝেই বিদ্যমান। প্রাণী জগতে নিজেদের বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই আকাঙ্ক্ষার জন্ম। এই বিস্তার যত অধিক হয় নিজেদের প্রতিষ্ঠার ভীত তত সুদৃঢ় হয়। মনোভাবের এই সুনিপুণ বীজ মন থেকে মনে বপন হয়।


২২

আমাদের মধ্যে বিলাসিতা বাড়িয়াছে বলিয়া অনেকে কল্পনা করেন যে, ইহা আমাদের ধন-বৃদ্ধির লক্ষণ। কিন্তু এ কথা বিচার করিয়া দেখিতে হইবে যে, পূর্বে যে অর্থ সাধারণের কাজে ব্যয়িত হইত, এখন তা ব্যক্তিগত ভোগে ব্যায়িত হইতেছে। ইহাতে ফল হইতেছে, দেশের ভোগ-বিলাসের স্থানগুলি ফাঁপিয়া উঠিতেছে কিন্তু পল্লীগুলিতে দারিদ্র্যের অবধি নাই। দেশের অধিকাংশ অর্থ শহরে আকৃষ্ট হইয়া কোঠাবাড়ি, গাড়ি-ঘোড়া, সাজ-সরঞ্জাম, আহার-বিহারেই উড়িয়া যাইতেছে। অথচ যাঁহারা এরূপ ভোগ-বিলাস ও আড়ম্বরে আত্মসমর্পণ করিয়াছেন, তাঁহাদের প্রায় কেহই সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে নাই, তাঁহাদের অনেকেরই টানাটানি, অনেকেরই ঋণ, অনেকেরই পৈতৃক সম্পত্তি মহাজনের দায়মুক্ত করিবার জন্য চিরজীবনই নষ্ট। কন্যার বিবাহ দেওয়া, পুত্রকে মানুষ করিয়া তোলা, পৈতৃক কীর্তি রক্ষা করিয়া চলা, অনেকেরই পক্ষে বিশেষ কষ্টসাধ্য হইয়াছে। যে ধন সমস্ত দেশের বিচিত্র অভাব মোচনের জন্য চারিদিকে ব্যাপ্ত হইত, সেই ধন সঙ্কীর্ণ স্থানে আবদ্ধ হইয়া যে ঐশ্বর্যের মায়া সৃজন করিতেছে তাহা বর্ণনাযোগ্য নহে। সমস্ত শরীরকে প্রতারণা করিয়া কেবল মুখেই যদি রক্ত সঞ্চার হয়, তবে তাহাকে স্বাস্থ্য বলা যায় না। দেশের ধর্মস্থানকে, বন্ধুস্থানকে, জন্মস্থানকে কৃষ করিয়া কেবল ভোগস্থানকে স্ফীত করিয়া তুলিলে বাহির হইতে মনে হয় যেন দেশের শ্রীবৃদ্ধি হইতে চলিল। সেই জন্যই এ ছদ্মবেশী সর্বনাশ আমাদের পক্ষে অতিশয় ভয়াবহ। মঙ্গল করিবার শক্তিই ধন, বিলাম ধন নহে।

সারাংশ : ধন সম্পদ জড়ো করে আমরা ভোগ বিলাসের শহর গড়ছি ঠিকই, কিন্তু গ্রামগুলোকে বানাচ্ছি দরিদ্র পল্লী। আড়ম্বরের কাছে আত্মসমর্পিত মানুষগুলোও তাই ঠিক সুখের ঠিকানা খুঁজে পায় না। কেননা অন্যের মঙ্গল সাধনের আনন্দ ভোগ বিলাসের মাঝে নেই। সুখের ঐশ্বর্য্য ছড়িয়ে আছে সকল মানবের মাঝে।


২৩

আমাদের দেশের শিল্পকারের উপদেশ হলো- পরিপাটি করে মূর্তি গড়, পরিচ্ছন্ন করে পালিশ কর পাথরের দেবমূর্তি, কিন্তু খবরদার মানুষ মূর্তি গড় না নোংরা কাজ সেটা। গ্রিক শিল্পকার ঠিক এর উল্টো কথা বললে মানুষগুলোকে করে তোলো দেবতার মতো সুন্দর। আবার চীনের শিল্পকার বললে খবরদার, দেবভাবাপন্ন মানুষকে গড় তো দৈহিক সৌন্দর্যকে একটু স্থান দিও না চিত্রে বা মূর্তিতে। নিগ্রোদের গড়া মূর্তি, যার আদর আর কাটতি খুব ইউরোপে, তার মধ্যে বেঢপ বেয়াড়া রূপই আশ্চর্য কৌশলে সুন্দরভাবে দেখিয়েছে মানুষ। মন এই তেমাথা পথে ত্রিশঙ্কুতে পড়ে বলতে চায়- ‘মন বেচারার কি দোষ’ আছে। নিজের মন ছাড়া যখন সুন্দর অসুন্দরের আদর্শ কোথাও নেই, কোনকালেই নেই এবং ছিলও না, থাকবেও না এটা নিশ্চয় তখন ও নিয়ে মাথা ঘামানো কেন? বিচার-বিতর্কে নিষ্পত্তি হলো গিয়ে এক কথা। তিনিই রস, তিনিই সুন্দর, তাঁর সৃষ্টি হলো অসুন্দরে মিলিয়ে অপরূপ সুন্দর। সৌন্দর্যে পূর্ণচন্দ্র কুত্রাপি, নাস্তি, পরিপূর্ণতা অপরিপূর্ণতা অস্তি।

সারাংশ : শিল্প গড়ার ক্ষেত্রে শিল্পীর মনের ক্যানভাসে যে চিত্র অংকিত হয় তার বাস্তব রূপ না পেলে শিল্পের সৌন্দর্য্য বাধাগ্রস্ত হয়। সৌন্দর্য প্রকাশের প্রকৃত পট হল মানুষের মন। একমাত্র মনেই শিল্পের আসল বহি:প্রকাশ ঘটে।


২৪

আমাদের জন্য এদেশে শিক্ষার বন্দোবস্ত সচরাচর এইরূপÑ প্রথমে আরবীয় বর্ণমালা, অতঃপর কুরআন শরীফ পাঠ। কিন্তু শব্দগুলোর অর্থ বুঝাইয়া দেওয়া হয় না, কেবল স্মরণশক্তির সাহায্যে টিয়াপাখির মতো আবৃত্তি কর। কোন পিতার হিতৈষণার মাত্রা বৃদ্ধি হইলে, তিনি দুহিতাকে ‘হাফেজা’ করিতে চেষ্টা করেন। সমুদয় কুরআনখানি যাঁহার কণ্ঠস্থ থাকে, তিনিই ‘হাফেজ’। আমাদের আরবি শিক্ষা ঐ পর্যন্ত। পারস্য এবং উর্দু শিখিতে হইলে, প্রথমেই ‘করিমা ববখশা-এ বরহালে মা’ এবং একেবারে (উর্দু) ‘বানাতন্ নাস’ পড়। একে আকার ইকার নাই, তাতে আবার আর কোন সহক পাঠ্যপুস্তক পূর্বে পড়া হয় নাই, সুতরাং পাঠের গতি দ্রুতগামী হয় না। অনেকের ঐ কয়খানি পুস্তক পাঠ শেষ হওয়ার পূর্বেই কন্যা-জীবন শেষ হয়। বিবাহ হইলে বালিকা ভাবে, ‘যাহা হোক, পড়া হইতে রক্ষা পাওয়া গেল।’ কোন কোন বালিকা রন্ধন ও সূচিকর্মে সুনিপুণা হয়। বঙ্গদেশেও বালিকাদিগকে রীতিমতো বঙ্গভাষা শিক্ষা দেওয়া হয় না। কেহ কেহ উর্দু পড়িতে শিখে, কিন্তু কলম ধরিতে শিখে না। ইহাদের উন্নতির চরমসীমা সল্মা চুমকির কারুকার্য, উলের জুতা-মোজা ইত্যাদি প্রস্তুত করিতে শিক্ষা পর্যন্ত।

সারাংশ : নারীদের পশ্চাদপদতার প্রধান কারণ ভুল শিক্ষা গ্রহণ করা। কোন কিছু বুঝার চেয়ে মুখস্ত করাতেই মেয়েদের আগ্রহী করে তোলা হয়। ফলে নারীদের বিদ্যার দৌড় হয় দু’ একটি বই মুখস্ত করা পর্যন্ত। বিয়ের পর তাদের প্রধান শিক্ষার বিষয় হয় রান্না এবং সেলাই কাজ।


২৫

আমাদের প্রচলিত পাঠ্যবিষয়সমূহ নীরস প্রকৃতির। এ কারণে তা হৃদয়গ্রাহী হয় না। খাদ্য হজমের প্রয়োজনে যেমন পরিমিত নির্মল বায়ু সেবন আবশ্যক, তদ্রুপ পাঠ্যবিষয় বোঝার প্রয়োজনে আনুষঙ্গিক কিছু সহায়ক গ্রন্থ পাঠ করা দরকার, যা আনন্দদায়ক।

সারাংশ : আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় পাঠ্য বিষয়সমূহের সাথে আনন্দের কোনো সম্পর্ক নেই বলে তা আমাদের হৃদয়গ্রাহ্য হয় না। তাই পাঠ্য বিষয়কে হৃদয়গ্রাহী করে তুলতে এর পাশাপাশি সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে সাহিত্য ও অন্যান্য আনন্দদায়ক গ্রন্থ পাঠ করা অত্যাবশ্যক।


২৬

আমার বিবেচনায় স্বাস্থ্যরক্ষার উপায় গৃহ ও পল্লী পরিষ্কার; বিশুদ্ধ জল ও বায়ুর ব্যবস্থা নির্ধারণ। এইসব বিষয়ে শিক্ষাবিস্তার এবং আদর্শ গঠিত পল্লী প্রদর্শন অতি সহজেই হইতে পারে। ইহার উপায় মেলা স্থাপন। পর্যটনশীল মেলা দেশের একপ্রান্ত হইতে আরম্ভ করিয়া অল্প দিনেই অন্যপ্রান্তে পৌঁছিতে পারে। এই মেলায় স্বাস্থ্যরক্ষা সম্বন্ধে ছায়াচিত্রযোগে উপদেশ, স্বাস্থ্যকর ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যায়াম প্রচলন, যাত্রা, কথকতা,গ্রামের শিল্প-বস্তুর সংগ্রহ, কৃষি-প্রদর্শনী ইত্যাদি গ্রামহিতকর বহুবিধ কার্য সহজেই সাধিত হইতে পারে। আমাদের কলেজের ছাত্রগণও এই উপলক্ষে তাহাদের দেশ পরিচর্যা বৃত্তিকার্য পরিণত করিতে পারেন।

সারাংশ : পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘর-বাড়ি, বিশুদ্ধ জল এবং বায়ুর ব্যবস্থা স্বাস্থ্য রক্ষার অন্যতম পূর্বশর্ত। এসব বিষয়ে গ্রামবাসীকে সচেতন করার অন্যতম মাধ্যম হলো মেলা। যেখানে আদর্শ গঠিত পল্লি প্রদর্শন, স্বাস্থ্যরক্ষার উপর নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও স্বাস্থ্যকর ক্রীড়া-কৌতুক প্রদর্শনের মাধ্যমে সহজেই গ্রামবাসী সুস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবে। স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরাও এ কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে।


২৭

আমাদের চাষী বলে, মাটি হইতে বাপ-দাদার আমল ধরিয়া যাহা পাইয়া আসিতেছি তাহার বেশি পাইব কী করিয়া? এই কথা চাষীর মুখে শোভা পায়, পূর্বপ্রথা অনুসরণ করিয়া চলা তাহাদের শিক্ষা। কিন্তু সেই কথা বলিয়া আমরা নিষ্কৃতি পাইব না। এই মাটিকে এখনকার প্রয়োজন অনুসারে বেশি করিয়া ফলাইতে হইবে, না হইলে আধপেটা খাইয়া, জ্বলে অজীর্ণ রোগে মরিতে কিংবা জীবন্মৃত হইয়া থাকিতে হইবে। এই মাটির ওপরে মন এবং বুদ্ধি খরচ করিলে এই মাটি হইতে যে আমাদের দেশের মোট চাষের ফসলের চেয়ে অনেক বেশি আদায় করা যায় তাহার অনেক দৃষ্টান্ত আছে। আজকাল চাষকে মূর্খের কাজ বলা চলে না, চাষের বিদ্যা এখন মস্ত বিদ্যা হইয়া উঠিয়াছে।

সারাংশ : মাটির ফসল ফলানোর ক্ষমতা যে সুনির্দিষ্ট নয় এ কথা আমাদের দেশের চাষীদের ধারণার অতীত। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান দেখিয়েছে যে, কৃষিবিদ্যার সঠিক প্রযোগে এই মাটি থেকেই অধিক ফসল ফলানো সম্ভব। আর এর মাধ্যমেই দূর হতে পারে চাষীদের দুঃখ-দুর্দশা।


২৮

আমি ভালোবেসেছি এ জগৎকে, আমি প্রণাম করেছি মহৎকে- আমি কামনা করেছি মুক্তিকে। যে মুক্তি পরম পুরুষের কাছে আত্মনিবেদনে- আমি বিশ্বাস করেছি মানুষের সত্য মহামানবের মধ্যে যিনি ‘সদা জানানং হৃদয়ে সন্নিবিষ্ট’। আমি আবাল্য অভ্যস্ত ঐকান্তিক সাহিত্য সাধনার গন্ডিকে অতিক্রম করে একদা সেই মহামানবের উদ্দেশ্যে যথাসাধ্য আমার কর্মের অর্ঘ্য, আমার ত্যাগের নৈবেদ্য আহরণ করেছি- তাতে বাইরের থেকে যদি বাধা পেয়ে থাকি অন্তর থেকে পেয়েছি প্রসাদ। আমি এসেছি এই ধরণীর মহাতীর্থে- এখানে সর্বদেশ, সর্বজাতি ও সর্বকালের ইতিহাসের মহাকেন্দ্রে আছেন নরদেবতা, তারাই বেদীমূলে নিবৃত্তে বসে আমার অহংকার, আমার ভেদবুদ্ধি ক্ষালন করবার চেষ্টায় আজও প্রবৃত্ত আছি।

সারাংশ : একজন জীবনসাধকের কাছে এ জগতই সত্য। তিনি মানুষের সত্যে বিশ্বাস করেছেন, মানুষও তার মনুষ্যত্বকে মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন। আর তাই মহামানবের কাছে তিনি তাঁর সকল কিছু সমর্পণ করে ক্ষুদ্রতা, সংকীর্ণতার গন্ডি থেকে নিজেকে মুক্ত করার সাধনায় রত।


২৯

আমি ভাগিনীদের কল্যাণ কামনা করি, তাহাদের ধর্মবন্ধন বা সমাজবন্ধন ছিন্ন করিয়া তাহাদিগকে একটা উন্মুক্ত প্রান্তরে বাহির করিতে চাহি না, মানসিক উন্নতি করিতে হইলে হিন্দুত্ব বা খ্রিষ্টানকে খ্রিষ্টানি ছাড়িতে হইবে এমন কোনো কথা নাই। আপন আপন সম্প্রদায়ের পার্থক্য রক্ষা করিয়াও মনটাকে স্বাধীনতা দেওয়া যায়। আমরা যে কেবল উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে অবনত হইয়াছি, তাই বুঝিতে ও বুঝাইতে চাই।

সারাংশ : উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে নারী তার মনের স্বাধীনতা হারিযেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ধর্মবন্ধন বা সমাজবন্ধন ছিন্ন করার কোনো প্রয়োজন নেই। নিজ ধর্মে বা সমাজে থেকেই সুশিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে মানসিক উন্নতি সাধন করা যায়।


৩০

আমি লাইব্রেরিকে স্কুল কলেজের উপরে স্থান দিই এই কারণে যে, এ স্থানে লোক স্বেচ্ছায় স্বচ্ছন্দচিত্তে স্বশিক্ষিত হবার সুযোগ পায়। প্রতিটি লোক তার স্বীয় শক্তি ও রুচি অনুসারে নিজের মনকে নিজের চেষ্টায় আত্মার রাজ্যে জ্ঞানের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। স্কুল কলেজে বর্তমানে আমাদের যে অপকার করছে সে অপকারের প্রতিকারের জন্য শুধু নগরে নগরে নয়, গ্রামে গ্রামে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা কর্তব্য। আমি পূর্বে বলেছি যে লাইব্রেরি হাসপাতালের চাইতে কম উপকারী নয়, তার কারণ আমাদের শিক্ষার বর্তমান অবস্থায় লাইব্রেরি হচ্ছে এক রকম মনের হাসপাতাল।

সারাংশ : স্বশিক্ষিত হবার সুযোগ আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় নেই। পুথিগত শিক্ষা থেকে বের হয়ে এসে স্বেচ্ছায় ও স্বচ্ছন্দে লেখাপড়ার জন্য দরকার লাইব্রেরি। শিক্ষার বর্তমান রুগ্নদশার চিকিৎসার জন্য শহর, গ্রাম সর্বত্র লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা দরকার।


৩১

আল্লাহ তাআলা এই সংসার সৃষ্টি করিয়াছেন। তিনি পরম দয়ালু, সর্বদা আমাদের মঙ্গল করেন ও লালন-পালন করেন। তিনি আমাদের খাদ্য দিয়াছেন; আমরা তাহা আহার করি। তিনি আমাদের পানি দিয়াছেন; আমরা তাহা পান করি। তিনি আমাদিগকে বায়ু দিয়াছেন, তাহা আমরা নিশ্বাস দ্বারা গ্রহণ করিয়া বাঁচিয়া থাকি। তিনি আমাদের সুখী করিবার জন্য সমস্তই দিয়াছেন। আমরা যাহা করি, তিনি তাহা বুঝিতে পারেন। আমরা তাঁহাকে দেখিতে পাই না। কিন্তু তিনি সকল স্থানেই আছেন। চলো আমরা তাঁহার ইবাদত করি।

সারাংশ : মহান সৃষ্টিকর্তা এই জগৎ সংসার সৃষ্টি করে মানুষের প্রয়োজনীয় সকল কিছুই দিয়েছেন। তাঁকে দেখা না গেলেও তিনি সর্বত্রই বিরাজমান এবং আমাদের সকল কিছুই তিনি জানেন। তাই আমাদের উচিত পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার ইবাদত করা।


৩২

ইসলাম কথা ও কাজে এক। মুসলমান মুখে মুখে সাম্য ও মানবতার কথা স্বীকার করিয়াই সন্তুষ্ট হয় না। ঈমান, শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতার ভিতর দিয়া সে তাহার দৈনন্দিন জীবনে সাম্য ও মানবতার আদর্শকে সুন্দরভাবে রূপদান করিবার চেষ্টা করে। মসজিদে যাও, দেখিবে বাদশাহের পাশে ক্রীতদাস দাঁড়াইয়া খোদার উদ্দেশ্যে মাথা নত করিতেছে। ইসলামে সাদা-কালোর ভেদ নাই, দাস-প্রভুর তফাৎ নাই। তাই ইসলাম ভৌগোলিক সীমা লঙ্ঘন করিয়া বর্ণবৈষম্য তুলিয়া দিয়া সমস্ত মুসলমানকে ভ্রাতৃত্ব-বন্ধনে আবদ্ধ করিয়াছে।

সারাংশ : সাম্য ও মানবতা ইসলাম ধর্মের মূল কথা। এটি কেবল তত্ত্বেই সীমাবদ্ধ নয়, কাজেও এ কথার প্রমাণ রয়েছে। ঈমান, শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতার মধ্যদিয়ে সাম্য ও মানবতার বাণী সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিয়ে ইসলাম গোটা বিশ্বের মুসলমানকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে।


৩৩

ইহাই যৌবন, এই ধর্ম যাহাদের তাহারাই তরুণ। তাহাদের দেশ নাই, জাতি নাই, অন্য ধর্ম নাই। দেশ-কাল-জাতি ধর্মের সীমার উর্ধ্বে ইহাদের সেনানিবাস। আজ আমরা- মুসলিম তরুণেরা- যেন অকুণ্ঠিত চিত্তে বলিতে পারি- ধর্ম আমাদের ইসলাম, কিন্তু প্রাণের ধর্ম আমাদের তারুণ্য, যৌবন। আমরা সকল দেশের, সকল কালের। আমরা মুরিদ যৌবনের। এই জাতি-ধর্ম কালকে অতিক্রম করিতে পারিয়াছে যাহাদের যৌবন, তাহারাই আজ মহামানব, মহাত্মা, মহাবীর। তাহাদিগকে সকল দেশের সকল ধর্মের সকল লোক সমান শ্রদ্ধা করে।

সারাংশ : যৌবনকে যারা হৃদয়ে ধারণ করেছে তারাই তরুণ। দেশ, কাল, ধর্ম, জাতি সব কিছুর ঊর্ধ্বে তরুণের অবস্থান। যৌবনের এই ধর্মই মানুষকে করে তুলেছে মহামানব, তাকে স্থান দিয়েছে সকল মানুষের হৃদয়ে।


৩৪

এ দেশে লোকে যে যৌবনের কপালে রাজটিকার পরিবর্তে তার পৃষ্ঠে রাজদ- প্রয়োগ করতে সদাই প্রস্তুত সে বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ নেই। এর কারণ হচ্ছে যে, আমাদের বিশ্বাস মানবজীবনে যৌবন একটা মস্ত ফাঁড়া, কোনো রকমে সেটি কাটিয়ে উঠতে পারলেই বাঁচা যায়। এ অবস্থায় কী জ্ঞানী কী অজ্ঞানী সকলেই চান যে এক লম্ফে বাল্য হতে বার্ধক্যে উত্তীর্ণ হন। যৌবনের নামে আমরা ভয় পাই। কেননা তার অন্তরে শক্তি আছে। অপরপক্ষে বালকের মনে শক্তি নেই, বৃদ্ধের দেহে শক্তি নেই, বালকের জ্ঞান নেই, বৃদ্ধের প্রাণ নেই। তাই আমাদের নিয়ত চেষ্টা হচ্ছে দেহের জড়তার সঙ্গে মনের জড়তার মিলন করা, অজ্ঞতার সহিত সন্ধি স্থাপন করা। তাই আমাদের শিক্ষানীতির উদ্দেশ্যে হচ্ছে ইঁচড়ে পাকানো আর আমাদের সমাজনীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে জ্ঞান দিয়ে পাকানো।

সারাংশ : অন্তরের শক্তি, প্রাণপ্রাচুর্য যৌবনের মূলকথা। কিন্তু সমাজের দৃষ্টিতে যৌবন মানে উচ্ছৃঙ্খলতা। আর তাই সমাজ শাসন করে সর্বদা তার শক্তিকে দমিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু যৌবন মানে উচ্ছৃঙ্খলতা নয়, যৌবন মানে সত্য ও সুন্দর। তাই সমাজের উচিত যৌবনকে তার শক্তি ও সম্ভাবনা প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া।


৩৫

এ জগতে যিনি উঠেন, তিনি সাধারণের মধ্যে জন্মিয়া, সাধারণের মধ্যে বাড়িয়া, সাধারণের ওপর মস্তক তুলিয়া দাঁড়ান; তিনি অভ্যন্তরীণ মালমশলার সাহায্যে বড় হইয়া থাকেন। কুষ্মান্ড-লতা যেমন যষ্ঠির সাহায্যে মাচার ওপর ওঠে, তেমনি কোন কাপুরুষ, কোন অলস শ্রমকাতর মানুষ কেবলমাত্র অপরের সাহায্যে এ জগতে প্রকৃত মহত্ত্ব লাভ করিয়াছে? এ জগতে উঠিয়া-পড়িয়া, রহিয়া-সহিয়া, ভাঙ্গিয়া-গড়িয়া, কাঁদিয়া-কাটিয়া মানুষ হইতে হয়; ইহা ছাড়া মনুষ্যত্ব ও মহত্ত্ব লাভের অন্য পথ নাই।

সারাংশ : পৃথিবীতে কিছু মানুষ রয়েছে যারা সর্বসাধারণের মধ্য থেকেই নিজ প্রচেষ্টায় মহৎ হয়ে ওঠেন। নিজ প্রচেষ্টা ব্যতীত কেবলমাত্র অন্যের সাহায্য নিয়ে প্রকৃত্ব মহত্ত্ব লাভ করা যায় না। তাই নিজ উদ্যোগ, শ্রম, মেধা, অধ্যবসায়, ধৈর্য ও দুঃখ লাঘবের ক্ষমতা প্রভৃতি গুনাবলীর দ্বারা সকল প্রকার প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে মনুষ্যত্ব ও মহত্ত্ব অর্জন করা সম্ভব।


৩৬

এ যুগে পাঠক হচ্ছে জনসাধারণ, সুতরাং তাদের মনোরঞ্জন করতে হলে অতি সস্তা খেলনা গড়তে হবে, নইলে তা বাজারে কাটবে না। এবং সস্তা করার অর্থ খেলা করা। বৈশ্য লেখকের পক্ষেই শূদ্র পাঠকের মনোরঞ্জন করা সঙ্গত। অতএব সাহিত্যে আর যাই কর না কেন, পাঠক সমাজের মনোরঞ্জন করবার চেষ্টা করো না।

সারাংশ : পাঠকের মনোরঞ্জন করতে গেলে সাহিত্য তার ধর্মচ্যুত হয়। সাহিত্যের উদ্দেশ্য আনন্দ দেয়া, মনোরঞ্জন নয়। মনোরঞ্জন করতে গেলে সাহিত্য খেলনার মত সামান্য হয়ে যায়।


৩৭

এই সৌরজগৎ কিরূপে বিধি-নির্দিষ্ট নিয়মাধীন থাকিয়া সুশৃঙ্খলভাবে চলিতেছে, তাহা চিন্তা করিলে উচ্ছৃঙ্খল জীবন নিয়মিত হয়। চারদিকে এই প্রকা- বিশ্ব কী সুন্দর সুশৃঙ্খলভাবে চলিতেছে। সূর্য প্রত্যেক দিন নির্দিষ্ট সময়ে উদিত হইতেছে, নির্দিষ্ট সময়ে অস্ত যাইতেছে, চন্দ্রের ষোলকলা নির্দিষ্ট নিয়মানুসারে বৃদ্ধি পাইতেছে এবং ক্ষয় পাইতেছে। অন্যান্য গ্রহনক্ষত্রাদি যাহার যেদিন যেভাবে যতটুকু চলার কথা ততটুকুই চলিতেছে। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত- ছয় ঋতু নির্দিষ্ট চক্রে ঘুরিতেছে, অগ্নি নির্দিষ্ট নিয়মে তাপ দিতেছে, বায়ু নির্দিষ্ট নিয়মে বহিতেছে, মেঘ নির্দিষ্ট নিয়মে সঞ্চারিত হইতেছে- ইহা চিন্তা করিলে নির্দেষ্ট নিয়ম ত্যাগ করিয়া কর্ণধারহীন তরণীর ন্যায় কে আপনার জীবনকে উচ্ছৃঙ্খল করিবে।

সারাংশ : নিয়মানুবর্তিতা প্রকৃতির এক অপার সৌন্দর্য্য। সৌরজগতের বিশালাকার গ্রহ থেকে ক্ষুদ্রতিক্ষুদ্র নক্ষত্র সবাই সুশৃংখল নিয়মাধীন। যা মানবজীবনকে উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন বর্জন করার এক সুস্পষ্ট আহ্বান।


৩৮

এই সেই রমযান মাস যাতে মানববৃন্দের পথপ্রদর্শক এবং সৎপথ ও মীমাংসার উচ্চ নিদর্শন কোরআন শরীফ অবতীর্ণ হইয়াছে। এই সেই রমযান যাহার মধ্যে প্রভুর প্রথম দান মানুষকে সার্থক ও সুন্দর করিয়াছে। দারুণ গ্রীষ্মের দাবদাহের শেষে স্নিগ্ধ বারিধারার মতো ইহারই মধ্যে প্রথম অবতীর্ণ হইয়াছে কোরআনের মহাবাণী গভীর অন্ধকারে শান্তি ও মুক্তির প্রথম জ্যোর্তিবিভাগ। প্রভু জানাইয়াছেন, হে মানুষ। আমি আছি। আমি অনন্ত, অজয়, চিন্ময়, অরুপ। আমি তোমার সৃষ্টিকর্তা, আমি তোমার পালনকর্তা। আমাকে জানো। ‘একরা বেসমে রাব্বিক’-‘তোমারই প্রতিপালকের নামে পড়ো।’ তাহাই মুসলমানের মনোবীণায় রমযান এমন মহান বিরাট সুরের ঝংকার তুলিয়াছে।

সারাংশ : পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহতায়ালা কোরআন শরীফ নাযিল করেছেন যা মানবজাতির শ্রেষ্ঠ পথ নির্দেশনা। এই পবিত্র কোরআনের বাণীর দ্বারাই মানুষ আল্লাহর পরিচয় ও অপরিসীম ক্ষমতা সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করেছে। তাই মুলসমানদের নিকট রমজান মাস অতীব মূল্যবান।


৩৯

এই শ্মশানে আসিলে সকলেই সমান হয়। পন্ডিত, মূর্খ, ধনী, দরিদ্র, সুন্দর, কুৎসিত, মহৎ, ক্ষুদ্র, ব্রাহ্মণ, শুদ্র, ইংরেজ, বাঙালি এইখানে সকলেই সমান। নৈসর্গিক, অনৈসর্গিক সকল বৈষম্য এখানে তিরোহিত হয়। শাক্য-সিংহ বলো, শঙ্করাচার্য বলো, ঈশা বলো, মুসা বলো, রামমোহন বলো কিন্তু এমন সাম্যসংস্থাপক এ জগতে আর নাই। এ বাজারে সব একদর- অতিমহৎ এবং অতিক্ষুদ্র। মহাকবি কালিদাস এবং বটতলার নাটক লেখক একই মূল্য বহন করে।

সারাংশ : শ্মশানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, শিক্ষা, বাহ্যিক সৌন্দর্য, আকার, আর্থিক প্রাচুর্য, দীনতা প্রভৃতি প্রকারভেদে সকল ধরনের মানুষ সমান। কেননা রাজা-প্রজা, কবি, জ্ঞানী, নিরক্ষর সকলেই এখানে সমান পরিচয় বহন করে এবং সকলেই মৃত।


৪০

একজন সৈন্যাধ্যক্ষ তাঁর অনুচরদের ডেকে বলেছিলেন, নিজেদের চেয়ে শত্রুপক্ষের সৈন্যকে ভালো করে চিনে রেখো, যুদ্ধজয়ের অর্ধেক সেখানেই। যে চিকিৎসক ব্যাধির সঙ্গে সংগ্রামে চলেছেন, তাঁকে এই কথাটা ভালো করে মনে রাখতে হবে। মানুষের সকল শত্রুর বড় শত্রু হলো ওইসব জীবাণু। তারা আড়ালে থাকে, অনেক তোড়জোড় করে তাহাদের খুঁজে বের করতে হয়, তাদের রাজনীতির পরিচয় পেতে হয়, তাদের ধ্বংসের উপায় ঠিক করতে হয়।

সারাংশ : জগতে কতিপয় স্বার্থানেন্বেষী লোক রয়েছে যারা মানবতা ও সভ্যতার শত্রু। মানবতাবিরোধী এসব শত্রুদের মেধা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শীতা দ্বারা চিহ্নিত করে তাদের কৌশল, নীতি, শক্তি, সামর্থ্য, উদ্দেশ্যসহ যাবতীয় কর্মকা- সম্পর্কে জেনে সঠিক দমনব্যবস্থা গ্রহণ করাই মানব কল্যাণীদের কর্তব্য।


৪১

একটা বরফের পিন্ড ও ঝরনার মধ্যে তফাৎ কোনখানে? না, বরফের পিন্ডের মধ্যে নিজস্ব গতি নেই। তাকে বেঁধে টেনে নিয়ে গেলে তবে সে চলে। কিন্তু ঝরণার যে গতি সে তার নিজের গতি, সেজন্য এই গতিতেই তার ব্যাপ্তি, তার মুক্তি, তার সৌন্দর্য। এই জন্য গতিপথে সে যত আঘাত পায়, ততই তাকে বৈচিত্র্য দান করে। বাধায় তার ক্ষতি নেই, চলায় তার শান্তি নেই। মানুষের মনেও যখন রসের আবির্ভাব না থাকে, তখনই সে জড়পি-। তখন ক্ষুধা-তৃষ্ণা-ভয়-ভাবনাই তাকে ঠেলে কাজ করায়। তখন প্রতি কাজে পদে পদেই তার ক্লান্তি। সেই নীরস অবস্থাতেই মানুষ অন্তরের নিশ্চলতা থেকে বাহিরেও কেবলই নিশ্চলতা বিস্তার করতে থাকে। তখনই তার যত খুঁটিনাটি, যত আচার-বিচার, যত শাস্ত্র-শাসন। তখন মানুষের মন গতিহীন বলেই বাইরেও আষ্টেপৃষ্ঠে সে বন্ধ।

সারাংশ : মানুষ তার মনকে বরফের পিন্ডের মতো গতিহীন না করে যদি ঝরনার যদি অঝোর ধারার মতো গতিশীল করে তবে জীবনের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠে। আর মন যদি গতিহীন হয় তাহলে নানা সীমাবদ্ধতা ও কুসংস্কার মানুষের পরিপূর্ণ বিকাশে বাধা দান করে।


৪২

একটি নবযুগ আমাদের দুয়ারে এসে উপস্থিত; মান্য অতিথির মতো সংবর্ধনা করে না আনলে সে ঘরে আসতে নারাজ। অনাহূত গৃহে প্রবেশ করতে সকলেরই লজ্জা হয়। নবযুগও লজ্জা অনুভব করছে। তার লজ্জা ভাঙানোর ভার আমাদের ওপর। কিন্তু অতিথি এল, সে শত্রু, না মিত্র প্রকৃত হিতাকাক্সক্ষী, না প্রতারক, তা না জেনে তো তাকে গ্রহণ করা যায় না। তাই তার যথাসম্ভব পরিচয় দেওয়া দরকার। আগন্তুক আমাদের পর নয়, মানবসভ্যতার শিশু, অতীত ও বর্তমানের সন্তান, সে নিজ থেকেই এসেছে; তার সম্বন্ধে আমাদের অবহিত হতে হবে মাত্র, আর এক্ষেত্রে অবহিত হওয়ারই সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা। তাঁর কণ্ঠে যে অস্পষ্ট বাণী তার অর্থ, হে মানুষ ভয় করো না; তোমার মধ্যে যা শ্রেষ্ঠ মূল্যবান অবিনশ্বর ও অশেষ সম্ভাবনাপূর্ণ তার রক্ষার ভার আমার হাতে। আর সে জন্যেই আমার আগমন। বর্তমান যুগের কি সেসব রক্ষার ক্ষমতা নেই? শ্রেষ্ঠ ও মূল্যবানকে ভুলে বর্তমানে আমরা কি শুধু অপকৃষ্টের সাধনা করে চলেছি? ব্যতিক্রম হয়তো আছে, তবে মোটের ওপর কথাটায় সায় না দিয়ে উপায় কী? মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিব্যক্তি সৃজনশীলতা আজ শোচনীয়রূপে পরাভূত, ধূর্ততা ও ফন্দিবাজি তার স্থানে সমাসীন। এ দুরবস্থাকে মুক্তি দেয়ার জন্যেই নবযুগের আগমন।

সারাংশ : সমাজকে পরিবর্তনের জন্যই নবযুগের সৃষ্টি। তবে নবযুগ আনয়নে পরিশ্রম, সাধনা ও সংগ্রাম দ্বারা এর যথার্থতা বিচার করতে হবে। আর এভাবেই নবযুগ অতীত ও বর্তমানের মধ্য থেকে সৃষ্ট হয়ে সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত ও সৃজনশীল করে গড়ে তোলে।


৪৩

এমন কথা কেউ বলতে পারে না, সূর্যটা আমার। আকাশটা আমার। একজন মানুষ এ কথা বলতে পারে না। এমনকী কোনো একক জনগোষ্ঠীও এ দাবি তুলতে পারে না। কিন্তু তবু আকাশের কিছু অংশ যদি আমার নিজের মনের মতো না হয়, তবে সমস্ত আকাশটাই আমার কাছে মিছে। সূর্যের কিছু রোদে আমার যদি স্বতন্ত্র অধিকার না থাকে, তবে সূর্যটাও আমার কাছে মিছে ছাড়া আর কিছু নয়। তেমনি আমার ঘর আছে বলেই অপরের ঘরের দাম আমি বুঝি। আমার অস্তিত্বের মর্যাদা আমার কাছে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

সারাংশ : গোটা পৃথিবী একটা হলেও মানুষ এর কিছু অংশ একান্ত আপন করে নেয় যা তার দেশপ্রেমকে জাগ্রত করে। মানুষ তার নিজ অস্তিত্ব ও দেশপ্রেমের উপলব্ধি দ্বারাই অপরের দেশাত্ববোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারে।


৪৪

এটা স্মরণ রাখা কর্তব্য যে, পৃথিবীতে যেখানে তুমি থামবে, সেখান হতেই তোমার ধ্বংস আরম্ভ হবে। কারণ তুমিই কেবল একলা থামবে, আর কেউ থামবে না। জগৎ-প্রবাহের সঙ্গে সমগতিতে যদি না চলতে পারে তো প্রবাহের সমস্ত সচল বেগ তোমার ওপর এসে আঘাত করবে, একেবারে বিদীর্ণ বিপর্যস্ত হবে কিংবা অল্পে অল্পে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে কালস্রোতের তলদেশে অন্তর্হিত হয়ে যাবে। হয় অবিরাম চলো এবং জীবনচর্চা করো, নয় বিম্রাম করো এবং বিলুপ্ত হও পৃথিবীর এই রকম নিয়ম।

সারাংশ : গতিশীল ও কর্মময় জীবনে সর্বদা মানুষকে সমানতালে সামনে এগিয়ে যেতে হয়। অন্যথায়, গতির আঘাতে জীবন স্থবির, ক্ষয়প্রাপ্ত, বিলুপ্ত ও বিপর্যপ্ত হয়ে সাগরের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়। তাই কর্মময় জীবন চর্চায় গতিশীলতা পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়ম।


৪৫

কথায় কথায় মিথ্যাচার, বাক্যের মূল্যকে অশ্রদ্ধা করা এসব সত্যনিষ্ঠ স্বাধীন জাতির লক্ষণ নয়। স্বাধীন হবার জন্য যেমন সাধনার প্রয়োজন, তেমনি স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রয়োজন সত্যনিষ্ঠা ও ন্যায়পরায়ণতা। সত্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধহীন জাতি যতই চেষ্টা করুক তাদের আবেদন নিবেদন আল্লাহর কাছে পৌঁছাবে না, তাদের স্বাধীনতার দ্বার থেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়া হবে। যে জাতির অধিকাংশ ব্যক্তি মিথ্যাচারী, সেখানে দু’একজন সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তির বহু বিড়ম্বনা সহ্য করতে হবে। কিন্তু মানবকল্যাণের জন্য, সত্যের জন্য যে বিড়ম্বনা ও নিগ্রহ তা সহ্য করতেই হবে।

সারাংশ : স্বাধীন হবার জন্য যেমন সাধনা প্রয়োজন তেমনি একে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন ন্যায়পরায়ণতা ও সত্যনিষ্ঠা। মিথ্যাবাদিতা ধ্বংস ডেকে আনে এবং জীবনকে পরাধীনতার দিকে ঠেলে দেয়। যে জাতির অল্পসংখ্যক লোক সত্যবাদী, তারা অনেক সময় বিড়ম্বনা ও নিগ্রহের স্বীকার হলেও দেশ ও জাতির স্বার্থে তারা তা সহ্য করে থাকেন।


৪৬

কবিতার শব্দ কবির অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির প্রতীক। বাক্যের মধ্যে প্রবন্ধের মধ্যে প্রত্যেক শব্দ আপন আপন বিশিষ্টতায় উজ্জ্বল। যাঁরা কবিতা লিখবেন, তাঁদের মনে রাখতে হবে যে, অনুভূতিদীপ্ত শব্দসম্ভার আয়ত্তে না থাকলে প্রত্যেকটি শব্দের ঐতিহ্য সম্পর্কে বোধ স্পষ্ট না হলে, কবিতা নিছক বাকচাতুর্থ হয়ে দাঁড়াবে মাত্র। কবিতাকে জীবনের সমালোচনাই বলি বা অন্তরালের সৌন্দর্যকে জাগ্রত করবার উপাদানই বলি, কবিতা সর্বক্ষেত্রেই শব্দের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই শব্দকে আমাদের চিনতে হবে।

সারাংশ : কবিতায় শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে কবিকে নিজস্ব গভীর অভিজ্ঞতা, অনুভূতিদীপ্ত শব্দসম্ভার, ভাষার প্রাঞ্জলতা, রূপ-রীতি ও শব্দের প্রচলিত ও বুৎপত্তিগত অর্থের দিকে মনযোগী হতে হবে। কেননা কবিতার ভিত্তি শব্দের সঠিক ব্যবহারের মধ্যেই নিহিত। অন্যথায় কবিতা বাকবৈভবের সম্ভারের পরিবর্তে বাকচাতুর্যে পরিণত হবে।


৪৭

কলম্বাস যখন আমেরিকা আবিষ্কার করিতে কৃতসংকল্প হন, তখন লোকে তাহাকে বাতুল বলে নাই কি? নারী আপন স্বত্ব-স্বামিত্ব বুঝিয়া আপনাকে নরের ন্যায় শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করিতে চাহে, ইহাও বাতুলতা বৈ আর কি? পুরুষগণ স্ত্রীজাতির প্রতি যতটুকু সম্মান প্রদর্শন করেন, তাহাতে আমরা সম্পূর্ণ তৃপ্ত হইতে পারি না। লোকে কালী, শীতলা প্রভৃতি রাক্ষস প্রকৃতির দেবীকে ভয় করে। পূজা করে সত্য। কিন্তু সেইরূপ বাঘিনী, নাগিনী, সিংহী প্রভৃতি দেবীও কি ভয় ও পূজা লাভ করে না? তবেই দেখা যায় পূজাটা কে পাইতেছেন রমনী কালী, না রাক্ষসী নৃমুন্ড মালিনী।

সারাংশ : সমাজ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হলে, প্রচলিত প্রথা ভাঙতে হলে, শত বাঁধা-বিঘ অতিক্রম করতে হয়। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এই বাঁধা-বিপত্তি জয় করে নারীকে তার অধিকার আদায় করে নিতে হবে।


৪৮

কাব্য, সংগীত প্রভৃতি রসসৃষ্ট বস্তু বাহুল্যবিরল রিক্ততার অপেক্ষা রাখে। তাদের চারদিকে যদি প্রকাশ না থাকে তাহলে সম্পূর্ণ মূর্তিতে তাদের দেখা যায় না। আজকালকার দিন সেই অবকাশ নেই, তাই এখানকার লোকে সাহিত্যে বা কলা সৃষ্টির সম্পূর্ণতা থেকে বঞ্চিত। তারা রস চায় না, মন চায়। চিত্তের জাগরণটা তাদের কাছে শূন্য, তারা চায় চমক-লাগা ভিড়ের ঠেলাঠেলির মধ্যে অন্যমনস্কের মতো যদি কাব্যকে, গানকে পেতে হয় তাহলে তার খুব আড়ম্বরের ঘটা করা দরকার। কিন্তু, সে আড়ম্বরে শ্রোতার কানটাকেই পাওয়া যায় মাত্র, ভিতরের রসের কথাটা আরো বেশি করে ঢাকাই পড়ে। কারণ সরলতা, স্বচ্ছতা আর্টের যথার্থ আভরণ।

সারাংশ : শিল্প-সাহিত্যের প্রকৃত রস গ্রহণ করতে হলে অবকাশের প্রয়োজন যা মানুষের চিত্তকে জাগ্রত করে। কিন্তু বর্তমানে মানুষ অবকাশের চেয়ে আড়ম্বরতায় ব্যস্ত। এই আড়ম্বরতা শিল্প-সাহিত্যের সরলতা ও স্বচ্ছতাকে দূর করে মানুষের মনে রসের শূন্যতা সৃষ্টি করেছে।


৪৯

কাব্যরস নামক অমৃতে যে আমাদের অরুচি জন্মেছে তার জন্যে দায়ী এ যুগের স্কুল এবং তার মাস্টার। কাব্য পড়বার ও বোঝবার জিনিস, কিন্তু স্কুলমাস্টারের কাজ হচ্ছে বই পড়ানো ও বোঝানো। লেখক এবং পাঠকের মধ্যে এখন স্কুলমাস্টার দন্ডায়মান। এই মধ্যস্থদের কৃপায় আমাদের সঙ্গে কবির মনের মিলন দূরে থাক, চার চক্ষুর মিলনও ঘটে না। স্কুলঘরে আমরা কাব্যের রূপ দেখতে পাই নে, শুধু তার গুণ শুনি। টীকা-ভাষ্যের প্রসাদে আমরা কাব্য সমসৎ সফল নিগূঢ় তত্ত্ব জানি। কিন্তু সে যে কী বস্তু তা চিনিনে। আমাদের শিক্ষকদের প্রসাদে আমাদের এ জ্ঞান লাভ হয়েছে যে, পাথুরে কয়লা হীরার সবর্ণ না হলেও সগোত্র; অপর পক্ষে হীরক ও কাচ যমজ হলেও সহোদর নয়।

সারাংশ : কাব্য পড়ার ও বোঝার বিষয়। শিক্ষকের সহায়তায় কাব্যের তাত্ত্বিক রূপ জানা গেলেও এর প্রকৃত রস আস্বাদন করা সম্ভব হয় না।


৫০

কিসে হয় মর্যাদা ? দামি কাপড়, গাড়ি, ঘোড়া ও ঠাকুরদাদার কালের উপাধিতে? - মর্যাদা এইসব জিনিসে নাই। আমি দেখতে চাই তোমার ভিতর, তোমার মাথা দিয়ে কুসুমের গন্ধ বেরোয় কিনা। তোমায় দেখলে দাসদাসী দৌড়ে আসে। প্রজারা তোমায় দেখে সন্ত্রস্ত হয়, তুমি মানুষের ঘাড়ে চড়ে হাওয়া খাও, মানুষকে দিয়ে জুতা খোলাও, তুমি দিনের আলোতে মানুষের টাকা আত্মসাৎ কর। বা-মা-শ্বশুর-শাশুড়ি তোমায় আদর করেন। আমি তোমায় অবজ্ঞায় বলব- যাও।

সারাংশ : সমাজে মানুষের মর্যাদা অর্থ-সম্পদ, ক্ষমতা, আভিজাত্য ইত্যাদি দ্বারা নির্ধারিত হয় না। মিথ্যা আভিজাত্য, অহমিকা, অর্থলোভ, দুশ্চরিত্র ইত্যাদি মানুষকে অবজ্ঞার পাত্রে পরিণত করে।

৫১

কুসংসর্গও চরিত্রহীনতার অন্যতম কারণ। সঙ্গদোষে মানুষ পশুরও অধম হয়ে থাকে। এ জগতে যত লোকের অধঃপতন হয়েছে, অসৎ সংসর্গই তার কারণ। মানুষ সতর্ক থাকলেও কুসংসর্গে পড়ে নিজের অজ্ঞাতে পাপের পথে পরিচালিত হয়। কুসংসর্গ বলতে কেবল কুলোকের সংসর্গ নহে, কুচিন্তা, কদর্য পুস্তকাদি পাঠ এসকলকেও কুসংসর্গ বলা হয়। যদি সচ্চরিত্র হয়ে জীবন যাপন করা তোমার অভিপ্রায় হয়, তবে হীন চরিত্র লোকের সঙ্গ, থিয়েটার, সিনেমা ও আমোদে উত্তেজিত হওয়া, কুরুচিপূর্ণ সঙ্গীত, কবিতা ও পুস্তক পাঠ এবং কুচিন্তা প্রভৃতি সযত্নে পরিত্যাগ করবে।

সারাংশ : সৎসঙ্গ মানুষকে যেমন উচুঁতে নিয়ে যায় তেমনি অসৎ সঙ্গ মানুষকে চরম অধ:পতিত করে। অসৎ সঙ্গ পরিত্যাগ করাই হল উন্নত জীবনের স্বরূপ। খারাপ সঙ্গ জীবনকে কদর্যপূর্ণ ও পশুর ন্যায় বিবেকহীন করে তোলে।


৫২

কোন সভ্য জাতিকে অসভ্য করার ইচ্ছা যদি তোমার থাকে, তাহলে তাদের সব বই ধ্বংস কর এবং সকল পন্ডিতকে হত্যা কর, তোমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে। লেখক, সাহিত্যিক ও পন্ডিতেরাই জাতির আত্মা। এই আত্মাকে যারা অবহেলা করে, তারা বাঁচে না। দেশকে বা জাতিকে উন্নত করতে চেষ্টা করলে, সাহিত্যের সাহায্যেই তা করতে হবে। মানব মঙ্গলের জন্য যত অনুষ্ঠান আছে, তার মধ্যে এটাই প্রধান ও সম্পূর্ণ। জাতির ভেতর সাহিত্যের ধারা সৃষ্টি কর, আর কিছুর আবশ্যকতা নেই।

সারাংশ : সাহিত্য জাতির বিবেকের দর্পণ। কোনো জাতিকে সভ্য হতে হলে সাহিত্যের অনুশীলন এবং লেখক ও সাহিত্যিকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন আবশ্যক। তাই জাতীয় কল্যাণের জন্য উন্নত সাহিত্যের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।


৫৩

কোন পাথেয় নিয়ে তোমরা এসেছ? মহৎ আকাক্সক্ষা। তোমরা বিদ্যালয়ে শিখবে বলে ভর্তি হয়েছ। কী শিখতে হবে, ভেবে দেখো। পাখি তার মা-বাপের কাছে কী শেখে। পাখা মেলতে শেখে, উড়তে শেখে। মানুষকেও তার অন্তরের পাখা মেলতে শিখতে হবে। তাকে শিখতে হবে, কী করে বড় করে আকাক্সক্ষা করতে হয়। পেট ভরতে হবে- এ শেখবার জন্য বেশি সাধনার দরকার নেই। কিন্তু পুরোপুরি মানুষ হতে হবে, এ শিক্ষার জন্য যে অপরিমিত আখাঙ্ক্ষা দরকার, তাকে শেষ পর্যন্ত জাগিয়ে রাখবার জন্য চাই মানুষের শিক্ষা।

সারাংশ : শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের মহৎ আখাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়, প্রকৃত মনুষ্যত্ব অর্জিত হয়। শুধু জীবিকা অর্জনের জন্যই নয়, নিজেকে পরিপূর্ণ মানুষরূপে গড়ে তোলার জন্যই শিক্ষা লাভ করা প্রয়োজন।


৫৪

ক্রোধ মানুষের পরম শত্রু। ক্রোধ মানুষের মনুষ্যত্ব নাশ করে। যে লোমহর্ষক কা-গুলি পৃথিবীকে নরকে পরিণত করিয়াছে, তাহার মূলে রহিয়াছে ক্রোধ। ক্রোধ যে মানুষকে পশুভাবাপন্ন করে তাহা একবার ক্রুদ্ধ ব্যক্তির মুখের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। যে ব্যক্তির মুখখানা সর্বদা হাসিমাখা, উদারতায় পরিপূর্ণ, দেখলেই তোমার মনে আনন্দ ধরে, একবার ক্রোধের সময় সেই মুখখানির দিকে তাকাইও; দেখিবে, সে স্বর্গের সুষমা আর নাই- নরকাগ্নিতে বিকট রূপ ধারণ করিাছে। সমস্ত মুখ কী এক কালিমায় ঢাকিয়া গিয়াছে। তখন তাহাকে আলিঙ্গন করা দূরে থাকুক, তাহার নিকটে যাইতেও ইচ্ছ হয় না। সুন্দর মুহূর্তের মধ্যে কুৎসিত করিতে অন্য কোনো রিপু ক্রোধের ন্যায় কৃতকার্য হয় না।

সারাংশ : ক্রোধ মানুষের মনুষ্যত্বকে নষ্ট করে তাকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে মানুষ বিভিন্ন লোমহর্ষক কর্মকান্ড ঘটায়। ক্রোধ সুন্দর ব্যক্তিকে মুহূর্তেই কুৎসিত পশুর মতো করে তোলে।


৫৫

খোদার দেওয়া এই পৃথিবীর নিয়ামত হইতে যে নিজেকে বঞ্চিত রাখিল, সে যত মোনাজাতই করুক, খোদা তাহা কবুল করিবেন না। খোদা হাত দিয়াছেন বেহেশত ও বেহেশতি চিজ অর্জন করিয়া লইবার জন্যে, ভিখারির মতো হাত তুলিয়া ভিক্ষা করিবার জন্য নয়। আমাদের পৃথিবী আমরা আমাদের মনের মতো করিয়া গড়িয়া লইব।

সারাংশ : মহান স্রষ্টা পৃথিবীতে মানুষকে সৃষ্টি করে অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন। আর এই নিয়ামত অর্জনের জন্য শুধুমাত্র মোনাজাত করাই যথেষ্ট নয়। এর সাথে প্রয়োজন নিয়মিত শ্রম।


৫৬

খুব ছোট ছিদ্রের মধ্যে সূর্যকে দেখা যায়, তেমনি ছোট ছোট কাজের ভিতর দিয়েও কোনো ব্যক্তির চরিত্রের পরিচয় ফুটে ওঠে। বস্তুগত মর্যাদাপূর্ণভাবে ও সুচারুরূপে সম্পন্ন ছোট ছোট কাজেই চরিত্রের পরিচয়। অন্যের প্রতি আমাদের ব্যবহার কীরূপ তাহাই হচ্ছে আমাদের চরিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরীক্ষা। বড়, ছোট ও সমতুল্যের প্রতি সুশোভন ব্যবহার আনন্দের নিরবিচ্ছিন্ন উৎস।

সারাংশ : ছোট ছোট কাজের মধ্য দিয়েই মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয়। ছোট কাজকেও যে মর্যাদা দেয় এবং নিপুণভাবে সম্পন্ন করে সে প্রকৃত অর্থেই ব্যক্তিত্ববান এবং চরিত্রবান। ছোট বড় সবার প্রতি ভালো আচরণ প্রদর্শনের মাধ্যমে সে তার জীবনকে আনন্দময় করে তোলে।


৫৭

গানের সহিত বাজনার মিল না থাকিলে গান-বাজনা ভালো লাগে না। কবিতা আবৃত্তি করিবার সময় ছন্দের তাল রক্ষিত না হইলে আবৃত্তি শ্রুতিমধুর হয় না। তাল বা ছন্দ একটি বড় জিনিস। আমরা স্বভাবতই চলিতে ফিরিতে, গান-বাজনা করিতে, কবিতা পড়িতে তাহা মানিয়া চলি। সিঁড়ির ধাপ যদি এলোমেলো বা অসমান হয়, তাহা হইলে চলার গতি ব্যাহত হয়, ওপরে আরোহণ করিতে কষ্ট হয়। শুধু চলার নহে, বলারও তাল আছে। প্রতি কাজেই এই তাল যাহাতে সঠিক থাকে, তাহার দিকে লক্ষ্য রাখা উচিত। তাহাতে জীবন স্বচ্ছন্দ হইয়া উঠিবে।

সারাংশ : গান-বাজনা, কবিতা আবৃত্তি করতে ছন্দ, শৃঙ্খলাকে মেনে চলতে হয়। তেমনি জীবনে চলার পথেও এই ছন্দ, শৃঙ্খলাকে রক্ষা করা প্রয়োজন। কারণ এর মধ্য দিয়েই জীবন স্বাচ্ছন্দময় সুন্দর হয়ে ওঠে।


৫৮

গুরুর আবশ্যক শিষ্যকে কতকগুলি বুলি মুখস্ত করবার জন্য নয়, তীক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের দ্বারা শিষ্যের আত্মার সামর্থ্য ও বৈশিষ্ট্যের খোঁজ নিয়ে তাকে স্বীয় সত্তায় প্রতিষ্ঠিত করা। শিষ্যের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। এইভাবে শিক্ষা পদ্ধতি চললে দেখতে পাব, সব ছেলেরই কিছু না কিছু শক্তি আছে, কোনো ছেলেই একেবারে বাজে নয়। সুতরাং শিক্ষা বস্তুকে নয়, শিক্ষার্থীর অন্তরকে বড় করে দেখে। তার ভিতরকার শক্তিকে জাগ্রত করাই শিক্ষার লক্ষ্য।

সারাংশ : শিক্ষকের কাজ শিক্ষার্থীকে পড়া মুখস্থ করানো নয়। তিনিই পারেন শিক্ষার্থীর জ্ঞানস্পৃহা জাগিয়ে তুলতে, তার অন্তর্নিহিত শক্তি ও সামর্থ্যকে জাগ্রত করে তাকে আপন সত্তায় প্রতিষ্ঠিত করতে। আর এটাই হওয়া উচিত শিক্ষকের প্রকৃত লক্ষ্য।


৫৯

গ্রিসের প্রসিদ্ধ দার্শনিক পন্ডিত আরস্তুল বলিয়াছেন যে, মানব স্বভাবত আসঙ্গলিপ্সু। মানবসৃষ্টির উপাদানগুলির মধ্যে প্রেম একটি উপাদান ছিল, ইহা সুনিশ্চিত। খোদাতাআলা মানবকে তাহার আকৃতির অনুরূপ সৃষ্টি করিয়া তাহার দেহের মধ্যে আত্মা প্রবেশ করাইয়া দিয়া মানবকে অনুগৃহীত করিয়াছেন। কারণবশত মানব যখন অবিনশ্বর জগৎ হইতে নশ্বর জগতে পদার্পণ করে, তখন সে-ই খোদাতাআলার প্রতিনিধিত্ব-প্রাপ্ত হয়। এই পৃথিবী খোদাতাআলার আশ্চর্যজনক সৃষ্টি-কৌশলে পরিপূর্ণ। যদিও মানবাত্মা চতুর্ভুজরূপে প্রাচীরের মধ্যে আবদ্ধ হইল, তথাপি তাহার গমনাগমনের দ্বার উন্মুক্ত রহিয়াছে ; তাহার উন্নতিমার্গে আরোহণার্থ একদিকে সোপানশ্রেণী সংলগ্ন রহিয়াছে। যদি সে উদ্যমসহকারে চেষ্টা করে, তাহা হইলে খোদাতাআলার অনুগ্রহে উক্ত সোপানশ্রেণী অতিক্রমপূর্বক উন্নতিমার্গে আরোহণ করিতে সক্ষম হয়। আবার অন্যদিকে তাহার জন্যে অবনতির দ্বার অবরুদ্ধ রহিয়াছে ; যদি তাহার কু-প্রবৃত্তি প্রবল হয়, তাহা হইলে অজ্ঞানতারূপ লৌহনির্মিত হস্ত উক্ত দ্বার উন্মুক্ত করিয়া দেয়, তখন সেই অপরিণামদর্শী মানবাত্মা অবনতির গভীরতম গর্ভে নিপতিত হয়। একদিকে বিবেক ঐশ্বরিক জ্ঞান শিক্ষা দিয়া আত্মাকে জ্যোতির্ময় করিয়া তুলিতেছে, অন্যদিকে কু-প্রবৃত্তি অসৎ পথে চালিত করিয়া তাহাকে ধ্বংস করিতেছে।

সারাংশ : খোদা মানুষকে সৃষ্টি করে তার মধ্যে আত্মাকে প্রবিষ্ট করে নিজের প্রতিনিধিরূপে এ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। মানুষের মধ্যে কুপ্রবৃত্তি, সুপ্রবৃত্তি দুটোই আছে। সুপ্রবৃত্তি তাকে উন্নতির পথে ধাবিত করে আর কুপ্রবৃত্তি তাকে অবনতির অতল গভীরে নিক্ষেপ করে। তাই তাকে সব সময় সুপ্রবৃত্তির পথেই চলতে হবে।


৬০

চরিত্র ছাড়া মানুষের গৌরব করার আর কিছু নেই। মানুষের শ্রদ্ধা যদি মানুষের প্রাপ্য হয়, মানুষ যদি মানুষকে শ্রদ্ধা করে, সে শুধু তার চরিত্রের জন্যে। অন্য কোনো কারণে মানুষের মাথা মানুষের সামনে নত হওয়া দরকার নেই। জগতে যে সকল মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করেছেন, তাঁদের গৌরবের মূলে এই চরিত্রশক্তি। তুমি চরিত্রবান ব্যক্তি এ কথার অর্থ এই নয় যে, তুমি শুধু লম্পট নও। তুমি সত্যবাদী, বিনয়ী এবং জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করো। তুমি পরদুঃখকাতর, ন্যায়বান এবং স্বাধীনতাপ্রিয় চরিত্রবান মানে এই।

সারাংশ : চরিত্রই মানুষের একমাত্র সম্পদ যার কারণে সে গৌরবান্বিত হয়, অন্যের শ্রদ্ধা প্রাপ্ত হয়। যুগ যুগ ধরে মহাপুরুষগণ এই চরিত্র বলেই গৌরব আর শ্রদ্ধা লাভ করে আসছেন। তাদেরকেই চরিত্রবান বলা যায় যাদের কামনা সংযত, সত্যবাদী, বিনয়ী, জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, পরদুঃখকাতর, ন্যায়বান এবং স্বাধীনতাপ্রিয়।


৬১

ছাত্রজীবন আমাদের ভবিষ্যৎ-জীবনের বীজ বপনের সময়। এ সময় যে যেমন বীজ বপন করবে, ভবিষ্যৎ-জীবনে সে সেরূপ ফল ভোগ করবে। এ সময় যদি আমরা নিষ্ঠার সঙ্গে জ্ঞানের অনুশীলন করে যাই তবে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময় হবে। আর যদি হেলায় সময় কাটিয়ে দেই, তাহলে জীবনের মহৎ উদ্দেশ্য ব্যর্থ হতে বাধ্য। যে শিক্ষা জীবন ও জীবিকার পথে কল্যাণকর, যে শিক্ষা মানুষকে উন্নত চরিত্রের অধিকারী করে, তাই সর্বোৎকৃষ্ট শিক্ষা। ছাত্রদের জীবন গঠনে শিক্ষকসমাজ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের সুষ্ঠু পরিচালনার মধ্যে দিয়েই ছাত্রদের জীবন গঠিত হয় এবং উন্মুক্ত হয় মহত্তর সম্ভাবনার পথ।

সারাংশ : আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনের সাফল্য-ব্যর্থতা ছাত্রজীবনের ওপরই নির্ভর করে। জীবন, জীবিকা এবং উন্নত চরিত্র গঠনের পক্ষে সহায়ক এমন শিক্ষাই ছাত্রদেরকে প্রদান করা উচিত। আর এ পথে শিক্ষার্থীদের পরিচালনা করে তাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ তৈরি করে দেওয়ার দায়িত্ব শিক্ষকসমাজের।


৬২

জাতি শুধু বাইরের ঐশ্বর্য-সম্ভার, দালান-কোঠার সংখ্যাবৃদ্ধি কিংবা সামরিক শক্তির অপরাজেয়তায় বড় হয় না, বড় হয় অন্তরের শক্তিতে, নৈতিক চেতনায় আর জীবনপন করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ক্ষমতায়। জীবনের মূল্যবোধ ছাড়া জাতীয় সত্তার ভিত কখনও শক্ত আর দৃঢ়মূল হতে পারে না। মূল্যবোধ জীবনাশ্রয়ী হয়ে জাতির সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়লেই তবে জাতি অর্জন করে মহত্ত্ব আর মহৎ কর্মের যোগ্যতা।

সারাংশ : বাহ্যিক ঐশ্বর্য এবং ক্ষমতার বলে কোনো জাতি বড় হয়ে ওঠে না। অন্তরের শক্তি, নৈতিকতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ক্ষমতা এবং মূল্যবোধ অর্জনই একটি জাতিকে বড় করে তোলে। আর এভাবেই সে জাতি অর্জন করে মহত্ত্ব এবং মহৎ কর্মের যোগ্যতা।


৬৩

জাতিকে শক্তিশালী, শ্রেষ্ঠ, ধন-সম্পদশালী, উন্নত ও সুখী করতে হলে শিক্ষা ও জ্ঞান বর্ষার বারিধারার মতো সর্বসাধারণের মধ্যে সমভাবে বিতরণ করতে হবে। দেশে সরল ও সহজ ভাষার নানা প্রকারের পুস্তক প্রচারের দ্বারা এ কার্য সিদ্ধ হয়। শক্তিশালী দৃষ্টিসম্পন্ন মহাপুরুষদের লেখনীর প্রভাবে একটি জাতির মানসিক ও পার্থিব অবস্থার পরিবর্তন অপেক্ষাকৃত অল্পসময়ে সংশোধিত হয়ে থাকে। দেশের প্রত্যেক মানুষ তার ভুল ও কুসংস্কার, অন্ধতা ও জড়তা, হীনতা ও সংকীর্ণতা পরিহার করে একটি বিনয় মহিমোজ্জ্বল উচ্চ জীবনের ধারণা করতে শেখে। মনুষ্যত্ব ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করাই সে ধর্ম মনে করে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন হয় এবং গভীর দৃষ্টি লাভ করে। তারপর বিরাট জাতির বিরাট বিরাট দেহে শক্তি জেগে ওঠে।

সারাংশ : কোনো জাতিকে সমৃদ্ধি অর্জন করতে হলে সর্বসাধারণকে শিক্ষা ও জ্ঞানের সমান সুযোগ দিতে হবে। সরল ভাষায় লিখিত বই প্রচারের মাধ্যমে এ কাজ সহজেই করা সম্ভব। এসকল বইয়ে থাকে মহাপুরুষদের শক্তিশালী দৃষ্টির স্পর্শ যা একটি জাতিকে তার সকল ক্ষুদ্রতা, সংকীর্ণতা পরিহার করে মানসিকভাবে সমুন্নত হতে সাহায্য করে।


৬৪

জীবনের কল্যাণের জন্য, মানুষের সুখের জন্য এ জগতে যিনি কথা বলিয়া থাকেন তাহাই সাহিত্য।বাতাসের উপর কথা ও চিন্তা স্থায়ী হইতে পারে না মানব জাতি তাই অক্ষর আবিষ্কার করিয়াছে। মানুষের মূল্যবান কথা, উৎকৃষ্ট চিন্তাগুলি কোন যুগে পাথরে, কোন যুগে গাছের পাতায় এবং বর্তমানে কাগজে লিখিয়া রাখা হইয়া থাকে। যে নিতান্তই হতভাগা সেই সাহিত্যকে অনাদর করিয়া থাকে। সাহিত্যে মানুষের সকল আখাঙ্ক্ষার মীমাংসা হয়। তোমার আত্মা হইতে যেমন তুমি বিচ্ছিন্ন হইতে পার না, সাহিত্যকেও তেমনি তুমি অস্বীকার করিতে পার না উহাতে তোমার মৃত্যু, তোমার দুঃখ ও অসম্মান হয়।

সারাংশ : মানব কল্যাণে ও সুখের নিমিত্তে সুবিন্যস্ত কথামালার স্থায়িত্ব দেওয়ার জন্য লেখকগণ অক্ষর আবিষ্কার করেন। কালের পরিক্রমায় মানুষের মূল্যবান বাণী, উৎকৃষ্ট চিন্তা ও গবেষণা বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় প্রস্তরখ খন্ডে, গাছের পাতায়, পশুর চামড়ায়, কাগজে, লিপিবদ্ধ হচ্ছে। সাহিত্য হিসেবে বিবেচিত সকল কথামালা জাতিসত্ত্বার আখাঙ্ক্ষারই প্রতিচ্ছবি। যার অপ্রয়োজনীয়তা অনুভব মূর্খতার শামিল।


৬৫

জীবনের একটি প্রধান লক্ষণ হাসি ও আনন্দ। যার প্রত্যেক কাজে আনন্দ-স্ফুর্তি তার চেয়ে সুখী আর কেউ নয়। জীবনে যে পুরোপুরি আনন্দ ভোগ করতে জানে, আমি তাকে বরণ করি। স্থূল দৈনন্দিন কাজের ভেতর সে এমন একটা কিছুর সন্ধান পেয়েছে যা তার নিজের জীবনকে সুন্দর শোভন করেছে এবং পারিপার্শ্বিক দশ জনের জীবনকে উপভোগ্য করে তুলেছে। এই যে এমন একটা জীবনের সন্ধান যার ফলে সংসারকে মরুভূমি বোধ না হয়ে ফুলবাগান বলে মনে হয়, সে সন্ধান সকলের মেলে না। যার মেলে সে পরম ভাগ্যবান। এরূপ লোকের সংখ্যা যেখানে বেশি সেখান থেকে কলুষ বর্বরতা আপনি দূরে পালায়। সেখানে প্রেম, পবিত্রতা সর্বদা বিরাজ করে।

সারাংশ : হাসি-আনন্দ মানবজীবনের এমন একটি সম্পদ যার মাধ্যমে জীবন সুন্দর হয়ে ওঠে। এই হাসি ও আনন্দকে যে তার জীবনের সর্বক্ষেত্রে খুঁজে পেয়েছে তার মাধ্যমে কেবল তার নিজের জীবনই সুন্দর হয়নি চারপাশের মানুষের জীবনও হয়ে উঠেছে উপভোগ্য। এই সুখী মানুষের স্পর্শেই সমাজের কালিমা দূর হয়, সমাজ হয়ে ওঠে পবিত্র ও প্রেমময়।


৬৬

জীবন বৃক্ষের শাখায় যে ফুল ফোটে তাই মনুষ্যত্ব। বৃক্ষের গোড়ায় জল ঢালতে হবে এই ফুলের দিকে লক্ষ রেখে। শুধু শুধু মাটির রস টেনে গাছটা মোটা হয়ে উঠবে, এই ভেবে কোনো মালী গাছের গোড়ায় জল ঢালে না। সমাজব্যবস্থাকেও ঠিক করতে হবে মানুষকে খাইয়ে-দাইয়ে মোটা করে তুলবার জন্য নয়, মানুষের অন্তরে মূল্যবোধ তথা সৌন্দর্য, প্রেম ও আনন্দ সম্বন্ধে চেতনা জাগিয়ে তুলবার উদ্দেশ্যে। যখন এই চেতনা মানুষের চিত্তে জাগে তখন এক আধ্যাত্মিক সুষমায় তার জীবন পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং তারই প্রতিফলনে সমস্ত জগৎ আলোময় হয়ে দেখা দেয়। ফলে মানুষ ইতর জীবনের গুরুভার থেকে মুক্তি পেয়ে নিজেকে লঘুপক্ষ প্রজাপতির মতো হালকা মনে করে।

সারাংশ : মানব জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য হলো মনুষ্যত্ববোধ অর্জন। সৌন্দর্য, প্রেম, আনন্দ প্রভৃতির সমন্বয়ে যে মানবিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠে তার জাগরণই সমাজব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত। এই মূল্যবোধ যার মধ্যে জাগ্রত হয় তার জীবন অপরিসীম সৌন্দর্যে ভরে ওঠে। তার হৃদয়ের আলোয় সমস্ত পৃথিবী আলোকিত হয়।


৬৭

জীবনে সুখ-দুঃখের স্মৃতিতে মুখ লুকাইয়া একবারও কাঁদে নাই, সংসারে এরূপ লোক দেখা যায় না। সকল মনুষ্যেরই হৃদয়-তন্ত্রীতে এক একটি সুর কেমন লাগিয়া থাকে; সেই সুরে যেদিন আঘাত পড়ে, সেই দিন সহসা যেন তাহার জীবনে কী পরিবর্তন সাধিত হয়, তাহার হৃদয়ে মর্মে কী যেন ত্বড়িৎ স্রোত ছুটিয়া বেড়ায়, আপনাকে কোথাও যেন ধরিতে পাইয়া সে একবার পশ্চাতে ফিরিয়া দেখে, তাহার নয়ন বাহিয়া অশ্রুজল ঝরিতে থাকে। কিন্তু কোনখানে কবে কী আঘাত লাগিয়া তাহার হৃদয় চঞ্চল হইয়া ওঠে, সে কি তাহা বুঝিতে পারে/ সে আপনার মনে কাঁদিয়া যায়- না কাঁদিয়া থাকিতে পারে না।

সারাংশ : মানুষের হৃদয়তন্ত্রীতে প্রতিনিয়ত বিচিত্র অনুভূতি খেলা করে। কোনো অনুভূতি কোনো কারণে যদি আন্দোলিত হয় তবে আনন্দে বা বেদনায় তার অশ্রুসিক্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে।


৬৮

জ্ঞান যে বাহুতে বল দেয়, জ্ঞানের তাই শ্রেষ্ঠ ফল নয়; জ্ঞানের চরম ফল যে তা চোখে আলো দেয়। জনসাধারণের চোখে জ্ঞানের আলো আনতে হবে, যাতে মানুষের সভ্যতার অমূল্য সৃষ্টি, তার জ্ঞান বিজ্ঞান, তার কাল্যকলা, তার মূল্য জানতে পারে। জনসাধারণ যে বঞ্চিত, সে কেবল অন্ন থেকে বঞ্চিত বলে নয়, তার পরম দুর্ভাগ্য যে সভ্যতার এইসব অমৃত থেকে সে বঞ্চিত। জনসাধারণকে যে শেখাবে একমাত্র অন্নই তার লক্ষ্য, মনে সে তার হিতৈষী হলেও কাজে তার স্থান জনসাধারণের বঞ্চকের দলে। পৃথিবীর যেসব দেশে আজ জনসংঘ মাথা তুলেছে, জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষার প্রচারেই তা সম্ভব হয়েছে। তার কারণ কেবল এই নয় যে, শিক্ষার গুণে পৃথিবীর হালচাল বুঝতে পেরে জনসাধারণ জীবনযুদ্ধে জয়ের কৌশল আয়ত্ব করেছে। এর একটি প্রধান কারণ সংখ্যার অনুপাতে জনসাধারণের সমাজে শক্তি লাভের যা গুরুতর বাধা অর্থাৎ সভ্যতা লোপের আশঙ্কা, শিক্ষিত জনসাধারণের বিরুদ্ধে সে বাধার ভিত্তি ক্রমশই দুর্বল হয়ে আসে।

সারাংশ : শক্তির উৎস আলো, তেমনি জ্ঞানীরা আলোকিত এবং শক্তিশালী। শক্তি ও সামর্থের বিচারে জ্ঞানের অবস্থান সবার উপরে। সভ্যতার বীজ বুনন থেকে বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় চরম উৎকর্ষতায় অবস্থান জ্ঞানাচর্চারই ফলাফল। জ্ঞানের আলোর অভাবে সভ্য সমাজেও আধুনিক বিজ্ঞানের বিশ্বয়কর উদ্ভাবনের সূফল থেকে বঞ্চিত মানুষের সংখ্যা কম নয়। যে জাতি যত বেশী জ্ঞানী সে জাতি তত বেশী উন্নত।


৬৯

টাকা পয়সার অপব্যবহার করে যে লোক তাকে অমিতব্যয়ী লক্ষ্মীছাড়া বলে। সময়ের অপব্যবহার যে করে সেও অমিতব্যয়ী। সময়ের সদ্ব্যবহার করো। সময়ের আরেক নাম সম্পদ। লেখাপড়া শিখে চাকুরী করা ছাড়া কি জীবনের আর কোনো ব্যবহার নাই? কামারের লোহার কাজ, চটি তৈরি, পুস্তক বাধাই, কলাই ও কলকারখানার কাজ, কাপড় তৈরি, কাঠের কাজ, খেলনা তৈরি, লণ্ঠন ও ছড়ি তৈরি প্রভৃতি বহু শিল্প তুমি শিখতে পার। আলস্য করে শুধু খেয়ে-পরে, শুধু পৃথিবীর কলহ-দ্বন্দ্ব নিয়ে তুমি তোমার জীবনকে নিরর্থক করে দিও না।

সারাংশ : অর্থ এবং সময় এ দুটোই মানুষের জীবনে অত্যন্ত মূল্যবান। অর্থ অপচয়কারীর মতো সময় অপচয়কারীও অমিতব্যয়ী। তাই অলসতায় বৃথা সময় নষ্ট না করে লেখাপড়ার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের কাজ শিখে সময়কে কাজে লাগানো উচিত।


৭০

তবে কি সাহিত্যের উদ্দেশ্যে লোককে শিক্ষা দেওয়া? অবশ্য নয়। কেননা কবির মতিগতি শিক্ষকের মতিগতির সম্পূর্ণ বিপরীত। স্কুল না বন্ধ হলে যে খেলার সময় আসে না, এ তো সকলেরই জানা কথা। কিন্তু সাহিত্য-রচনা যে আত্মার লীলা, একথা শিক্ষকেরা স্বীকার করতে প্রস্তুত নন। সুতরাং শিক্ষা ও সাহিত্যের ধর্মকর্ম যে এক নয়, এ সত্যটি একটু স্পষ্ট করে দেখিয়ে দেওয়া আবশ্যক। প্রথমত, শিক্ষা হচ্ছে সেই বস্তু যা লোকে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও গলাধঃকরণ করতে বাধ্য হয়, অপরপক্ষে কাব্যরস লোকে শুধু স্বেচ্ছায়-সানন্দে পান করে; কেননা শাস্ত্রমতে সে রস অমৃত।

সারাংশ : সাহিত্য শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত নয়। সাহিত্যের মধ্য দিয়ে মানবমন খেলা করে এবং মানবাত্মা এর মাধ্যমে আনন্দ লাভ করে। অন্যদিকে শিক্ষার সাথে জীবন-জীবিকার প্রয়োজনের সম্পর্কটি অত্যন্ত নিবিড়। তাই শিক্ষা মানুষ বাধ্য হয়ে গ্রহণ করলেও সাহিত্য সে স্বেচ্ছায় পাঠ করে।


৭১

তুমি জীবনকে সার্থক-সুন্দর করিতে চাও? ভালো কথা। কিন্তু সেজন্য প্রাণান্ত পরিশ্রম করিতে হইবে। সব তুচ্ছ করিয়া যদি তুমি লক্ষ্যের দিকে ক্রমাগত অগ্রসর হইতে পার, তবে তোমার জীবন সুন্দর হইবে। আরও আছে। তোমার ভিতর এক ‘আমি’ আছে যে বড় দুরন্ত। তাহার স্বভাব পশুর মতো বর্বর ও উচ্ছৃঙ্খল। সে কেবল ভোগবিলাস চায়। সে বড় লোভী। এই ‘আমি’-কে জয় করিতে হইবে। তবেই তোমার জীবন সার্থক ও সুন্দর হইয়া উঠিবে।

সারাংশ : কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবনকে সার্থক ও সুন্দর করে তোলা যায়। জীবনে সার্থকতা অর্জনের জন্য মানুষকে যেমন পরিশ্রমমী হতে হয় তেমনি তাকে হতে হয় সংযমী, ধৈর্য্যশীল এবং একাগ্রচিত্ত।


৭২

তুমি যদি অতুল ঐশ্বর্যের অধিপতি হও, সিংহাসনে বসিয়া অনেকের ওপর প্রভুত্ব করো, লোকে তোমাকে মহারাজ চক্রবর্তী বড় মানুষ বলিয়া মহাসম্ভ্রমে সম্বোধন করিবে। কিন্তু তুমি যদি আসল মানুষ না হও, তবে মানুষ তোমায় কখনোই মানুষ বলিবে না। ধনে কি মানুষ বড় হয়? ধনের বড় মানুষ কখনোই মনের বড় মানুষ নহে, ধনের মানুষ মানুষ নয়, মনের মানুষই মানুষ। আমি ধন দেখিয়া তোমাকে সমাদর করিব না, জন দেখিয়া তোমাকে আদর করিব না, সিংহাসন দেখিয়া তোমায় সম্মান করিব না, বাহুল্যের জন্যে তোমার সম্মান করিব না- কেবল মন দেখিয়া তোমার পূজা করিব।

সারাংশ : অর্থ সম্পদ এবং ক্ষমতা মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারণ করতে পারে না। মানবিক গুণাবলি অর্জনের মাধ্যমেই মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠে। মহৎ এবং হৃদয়বান হয়ে ওঠার মাধ্যমেই মানুষ অপরের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা লাভ করে। ধন এবং ক্ষমতার বলে এ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা লাভ করা যায় না।


৭৩

তুমি বসন্তের কোকিল, বেশ লোক। যখন ফুল ফোটে, দক্ষিণা বাতাস বহে, এ সংসার সুখের স্পর্শে শিহরিয়া উঠে, তখন তুমি আসিয়া রসিকতা আড়ম্ভ কর; আবার যখন দারুণ শীতে জীবলোকে থরথরি কম্প লাগে, তখন কোথায় থাক বাপু! যখন শ্রাবণের ধারায় আমার চালা-ঘরে নদী বহে, যখন বৃষ্টির চোটে কাক, চিল ভিজিয়া গোময় হয়, তখন তোমার মাজা মাজা কালো দুলালী ধরনের শরীরখানি কোথায় থাকে? তুমি বসন্তের কোকিল, শীত বর্ষার কেহ নও।

সারাংশ : সুযোগসন্ধানী লোকদের স্বভাব বসন্তের কোকিলের মতোই। মানুষের সুসময়ে দিন-রাত পাশে থাকলেও দুঃসময়ে তারা সামান্যতম সহানুভূতির হাতও বাড়িয়ে দেয় না।


৭৪

দীপশিখা যেমন সমগ্র প্রদীপটির বাণী প্রকাশ করে, তেমন করিয়া কবি জনসাধারণের অস্পষ্ট অনুভূতিকে নিজের হৃদয়ের গভীর রসানুভূতি দ্বারা ভাষায় প্রকাশ করেন। এই প্রকাশ করিবার আশ্চর্য ক্ষমতা অনন্যসাধারণ। অনুভব অল্পবিস্তর সকলেই করিতে পারে। কিন্তু সেই অনুভূতিকে হৃদয়ের জড়তা ভাঙ্গিয়া তুলিবার সোনার কাঠিটি পায় কয়জনে? রাত্রির অন্ধকারে অরণ্য যে কথাটি বলিবার জন্যে আকুলি-বিকুলি করিয়া মরে, পূর্ব গগনে সোনার রেখা ফুটিতে সেই কথাটি শত শত বিহঙ্গের কণ্ঠে স্বতঃউচ্ছ্বসিত হইয়া ওঠে। কবিরা সেই ভোরের পাখি। তাহারা যে কথাটি বলেন, তাহা খাপছাড়া একটা নিতান্ত অদ্ভুত জিনিস নহে। তাহাদের বাণীটি সমগ্র জনসাধারণের মধ্যে মগ্নচৈতন্য অবস্থায় আছে। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করিতে পারি না যে, কোনো মহাকবির জন্যে তোমার দেশ পূর্ব হইতেই ধীরে ধীরে প্রস্তুত হইয়া থাকে।

সারাংশ : অনুভব করার ক্ষমতা সকলের থাকলেও সেই অনুভূতিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেবল একজন কবিই প্রকাশ করতে পারেন। তিনি জনসাধারণের অনুভূতিকে সৌন্দর্যমন্ডিত করে বাণীরূপ দেন। এমন একজন মহান কবির জন্য গোটা জাতি আগে থেকেই অপেক্ষা করে এবং ধীরে ধীরে তৈরি হতে থাকে।


৭৫

দুর্জন বিদ্বান হইলেও পরিত্যাজ্য। সর্পের মস্তকে মণি আছে বলিয়া সে কি ভয়ংকর নহে? নৈতিক শিক্ষা যেমন অতি প্রয়োজনীয়, তেমনি অতি কঠিন। সুনীতি কাহাকে বলে এবং দুর্নীতি কাহাকে বলে, তাহা নির্ণয় করা প্রায় সহজ, কিন্তু তাহা হইলেও নৈতিক শিক্ষালাভ সুনীতি কি দুর্নীতি তাহা জানিলেই সম্পন্ন হয় না। কার্যত যাহা সুনীতি, তাহা আচরণ করা ও যাহা দুর্নীতি তাহা পরিহার করাই নৈতিক শিক্ষার লক্ষণ। কারণ এইরূপ কাজ করিতে পারা বহু যত ও অভ্যাসের ফল। ফলত নৈতিক শিক্ষা কেবল জ্ঞানলাভের জন্যে অতি প্রয়োজনীয়। যদিও দুর্জন বিদ্যালংকৃত হইতে পারে, তবু দুর্জনের জ্ঞানলাভ প্রায়ই ঘটে না। তাহার কারণ এই যে, জ্ঞানলাভের নিমিত্তে যে সকল যত, অভ্যাস আবশ্যক, তদুপযোগী মনের শান্তভাব দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিদের থাকে না। তাহারা তীক্ষ্ম বুদ্ধিসম্পন্ন হইতে পারে, কিন্তু ধীর বুদ্ধির হইতে পারে না।

সারাংশ : নৈতিক শিক্ষা লাভের মাধ্যমে সুনীতি এবং দুর্নীতি সম্পর্কে জানতে হবে এবং জীবনে চলার পথে সুনীতিকে বরণ করে দুর্নীতিকে পরিহার করতে হবে। দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি যত জ্ঞানী হোক না কেন তার সঙ্গ অবশ্যই পরিত্যাগ করা উচিত।


৭৬

দেখো আমি চোর বটে, কিন্তু আমি কী সাধ করিয়া চোর হইয়াছি? খাইতে পাইলে কে চোর হয়? দেখো, যাহারা বড় বড় সাধু, চোরের নামে শিহরিয়া উঠেন, তাহারা অনেকে চোর অপেক্ষাও অধার্মিক। তাহাদের চুরি করিবার প্রয়োজনাতীত ধন থাকিলেও চোরের প্রতি মুখ তুলিয়া চাহে না; ইহাতেই চোরে চুরি করে। অধর্ম চোরের নহেÑ চোর যে চুরি করে, সে অধর্ম কৃপণ ধনীর। চোর দোষী বটে, কিন্তু কৃপণ ধনী তদপেক্ষা শতগুণে বেশি দোষী। চোরের দ- হয়, চুরির মূল যে কৃপণ তার হয় না কেন?

সারাংশ : কৃপণ ধনীর লোভের কারণেই দারিদ্র্যের সৃষ্টি হয়। তখন মানুষ নিতান্ত বাধ্য হয়েই চৌর্যবৃত্তির মতো অপকর্মে লিপ্ত হয়। এই চৌর্যবৃত্তির জন্য মূলত কৃপণ ধনীরাই দায়ী। তাই চোরের পাশাপাশি তাদেরও শাস্তি হওয়া উচিত।


৭৭

দুঃখ মানুষকে আত্মসচেতন ও সংগ্রামী করে। সংগ্রামী জীবনই মানুষকে ক্রমান্বয়ে উন্নতি ও অগ্রগতির পথে পরিচালিত করে। দুঃখ মানুষের সকল জড়তা ও দৈন্য দূর করে তাকে কর্মতৎপর করে। দুঃখের ভেতর দিয়ে মানুষ জীবন সাধনায় সিদ্ধি লাভ এবং বৃহৎকে উপলব্ধি করে। দুঃখের আগুনে পুড়ে মানুষের জীবন সকল প্রকার ক্লেদ ও গ্লানি থেকে মুক্ত হয়। পরশ-পাথর নিকৃষ্ট ধাতুকে স্বর্ণে পরিণত করে। দুঃখও তেমনি মাটির মানুষকে খাঁটি করে, সত্যাশ্রয়ী, আত্মসচেতন ও কর্মঠ করে। দুঃখের স্পর্শে মানুষের ভেতরকার আত্মসত্তা ও শক্তি জাগ্রত হয়।

সারাংশ : অগ্নিদহনে লোহা যেমন খাটি হয়, তেমনি দু:খের দহনে মানুষ আত্মপ্রত্যয়ী হয়। সুখ এবং দুঃখ একে অপরের পরিপূরক। দুঃখের কারণেই সুখের স্মৃতিগুলো এত মধুময়। দুঃখ-কষ্ট মানুষের জীবনকে উপলব্ধি করতে শেখায়। দুঃখের জন্য আফসোস নয় বরং দুঃখ থেকে সুখ লাভের শিক্ষাই সাধনায় সিদ্ধি লাভের একমাত্র মূলমন্ত্র।


৭৮

দুঃখই মানুষকে বৃহৎ করে, আপন বৃহত্ত্ব সম্বন্ধে জাগ্রত ও সচেতন করে তোলে। যাতে আমাদের খর্বতা, আমাদের স্বল্পতা, তা অনেক সময় আমাদের আরামের হতে পারে; কিন্তু তা আনন্দের নহে।

যা আমরা বীর্যের দ্বারা না পাই, অশ্রুর দ্বারা না পাই, তা আমরা সম্পূর্ণ পাই না যাকে দুঃখের মধ্য দিয়ে কঠিনভাবে লাভ করি, হৃদয় তাকেই নিবিড়ভাবে, সমগ্রভাবে প্রাপ্ত হয়। মনুষ্যত্ব আমাদের পরম দুঃখের ধন। তা বীর্যের দ্বারাই লভ্য। প্রত্যেহ পদে পদে বাধা অতিক্রম করে যদি তাকে পেতে না হতো, তবে তাকে পেয়েও পেতাম না। যদি তা দুর্লভ না হতো, তবে আমাদের হৃদয় তাকে সর্বতোভাবে গ্রহণ করত না; কিন্তু তা দুঃখের দ্বারা দুর্লভ। কিন্তু দুর্লভ মনুষ্যত্ব অর্জন করার চেষ্টায় আত্মা আপনার সমস্ত শক্তি অনুভব করতে থাকে। সে অনুভূতিতেই তার প্রকৃত আনন্দ।

সারাংশ : দুঃখের মাধ্যমেই মানুষ মনুষ্যত্ববোধ অর্জন করে। এটি মানুষের চেতনাকে প্রবলভাবে আলোড়িত করে, জীবনবোধকে প্রখর করে। গভীর দুঃখের মধ্য দিয়ে মহৎ যা কিছু অর্জিত হয় তার মধ্যে এক বিশাল আনন্দ থাকে।


৭৯

ধনে কি মানুষ বড় হয়? ধনের বড় মানুষ কখনোই মনের বড় মানুষ নহে; ধনের মানুষ মানুষ নহে, মনের মানুষই মানুষ। আমি ধন লইয়া তোমাকে সমাদর করিব না, জন দেখিয়া তোমাদের আদর করিব না, সিংহাসন দেখিয়া তোমায় সম্মান করিব না, বাহুবলের জন্যে তোমার সম্ভ্রম করিব না; কেবল মন দেখিয়া তোমার পূজা করিব। তুমি যদি স্বয়ং অমানুষ হও, অথচ দ-ধর হইয়া আমাকে দ-করণে উদ্যত হও, তথাপি আমি দ-ভয়ে কদাচ দ-বৎ করিব না। কিন্তু তুমি যদি পবিত্র চিত্তে সাধুভাবে ভিক্ষার ঝুলি ধারণ করিয়া আগমন কর, তবে তোমার দর্শনমাত্রই তৎক্ষণাৎ আমি ধূলিধুসরিত হইয়া পদতলে প্রণত হইব। অতএব যদি মানুষ হইবার অভিলাষ থাকে, তবে মনকে বিমল করো ও সরল হও।

সারাংশ : ধন, জন, শক্তি এবং ক্ষমতা মানুষের প্রকৃত পরিচয়ের নির্ণায়ক নয়। যে ব্যক্তি উদার এবং মহৎ সে-ই প্রকৃত মানুষ। মানুষ তার মনের পবিত্রতা এবং সরলতার মাধ্যমেই সকলের শ্রদ্ধাভাজন হয়ে ওঠে।


৮০

ধনীর যথার্থ পরীক্ষা দানে, যাহার প্রাণ আছে, তাহার যথার্থ পরীক্ষা প্রাণ দিবার শক্তিতে, যাহার প্রাণ নাই বলিলেই হয় সেই মরিতে কৃপণতা করে। যে মরিতে জানে, সুখের অধিকার তাহারই। যে জয় করে, ভোগ করা তাহারই সাজে, যে লোক জীবনের সঙ্গে সুখ ও বিলাস দুটিকেই আঁকড়িয়ে থাকে সুখ সে-ই ঘৃণিত ক্রীতদাসের নিকট তাহার নিজের সমস্ত ভান্ডার খুলিয়া দেয় না। তাহাকে উচ্ছিষ্টমাত্র দিয়া দ্বারে ফেলিয়া রাখে। আর আহ্বান শুনিবামাত্র যাহারা তুড়ি মারিয়া চলিয়া যায়, সুখ তাহারাই জানে। যাহারা সবলে ত্যাগ করিতে জানে তাহারাই প্রবল বেগে ভোগ করিতে পারে। যাহারা মরিতে জানে না, তাহারা ভোগ-বিলাসের দীনতা, ঘৃণ্যতা, গাড়ি জুড়ি এবং তকমা চাপ রাতের দ্বারা ঢাকা পড়ে না। ত্যাগের বিলাস বিরল কঠোরতার মধ্যে আছে। যদি স্বেচ্ছায় তাহা বরণ করি তবে নিজেকে লজ্জা হইতে বাঁচাইতে পারিব।

সারাংশ : ভোগ-বিলাসের মধ্য দিয়ে জীবন সার্থক, সুন্দর হয়ে ওঠে না। দানশীল, ত্যাগী এবং মহৎকর্মে আত্মোৎসর্গীকৃত ব্যক্তিরাই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা খুঁজে পায়।


৮১

নিজের সুখ-দুঃখ, নিজের উন্নতি নিয়ে আমাদের চিত্ত সর্বদা ডুবে আছে। যাদের মধ্যে বাস করি, যারা সর্বদা আমাদের আশেপাশে ঘোরে, যারা আমাদের প্রতিবেশী, যারা জীবন-সংগ্রামে অনেক আঘাত সয়েছে, তাদের প্রতি কি কোনো কর্তব্য নেই? এই জগতে নিজের কথা নিয়ে সবাই ব্যস্ত। পরের কথা ভাববার মতো তোমার প্রাণ হওয়া চাই। পরের জন্যে সর্বস্ব তুমি দান করো, এ আমি বলছি নে। আমি চাই তোমার প্রাণ নিজের মধ্যে যেন ডুবে না থাকে। এমন করে আত্মাকে বিনষ্ট করে ফেললে তোমার মনষ্যুত্বের প্রতি খুবই অবিচার করা হবে।

সারাংশ : কেবল নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকাই মানুষের একমাত্র কাজ নয়। আমাদের আশেপাশের প্রতিটি মানুষের প্রতিই আমাদের কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য রযেছে। নিজের পাশাপাশি অপরের কথা ভেবে এই দায়িত্ব কর্তব্যসমূহ যথাযথভাবে পালন করলেই মনুষ্যত্বের মর্যাদা রক্ষিত হয়।


৮২

নিন্দা না থাকিলে পৃথিবীতে জীবনের গৌরব কী থাকিত ? একটা ভালো কাজে হাত দিলাম, তাহার নিন্দা কেহ করে না, সে ভালো কাজের দাম কী ? একটা ভালো কিছু লিখিলাম তাহার নিন্দুক কেহ নাই, ভালো গ্রন্থের পক্ষে এমন মর্মান্তিক অনাদর কী হইতে পারে? জীবনকে ধর্মচর্চায় উৎসর্গ করিলাম, যদি কোনো মন্দ লোক তাহার মধ্যে গূঢ় মন্দ অভিপ্রায় না দেখিল তবে সাধুতা যে নিতান্তই সহজ হইয়া পড়িল। মহত্ত্বকে পদে পদে নিন্দার কাঁটা জড়াইয়া চলিতে হয়। ইহাতে যে হার মানে, বীরের সদগতি সে লাভ করে না। পৃথিবীতে নিন্দা দোষীকে সংশোধন করিবার জন্য আছে তাহা নহে, মহত্ত্বকে গৌরব দেওয়াও একটা মস্ত কাজ।

সারাংশ : কোনো মহৎ কাজের দোষ ধরা এবং তার অসৎ উদ্দেশ্য খুঁজে বের করাই নিন্দুকের কাজ। নিন্দুক মহৎ কাজ বা মহত্ত্বের মূল্যায়নে সংশোধকের ভূমিকা পালন করে। তাই নিন্দুকের কাছে হার মানা চলবে না। তাকে গ্রহণ করেই মানুষকে গৌরবের আসনে অধিষ্ঠিত হতে হবে।


৮৩

নিরবিচ্ছিন্ন এক বিদ্যা আলোচনা দ্বারা যদিও সেই বিদ্যায় পারদর্শিতা লাভ হইতে পারে, কিন্তু মনের সাধারণ শক্তির দ্বারা বৃদ্ধি না হয়ে বরং হ্রাস হইয়া যায় এবং এইরূপে পন্ডেতমূর্খ বলিয়া যে একশ্রেণীর বিচিত্র লোক আছে, তাহার সৃষ্টি হয়। বিদ্যা শিক্ষা করিয়াও যদি মানসিক শিক্ষার অভাবে লোকে এইরূপ পরিহাসভাজন হইতে পারে, তবে সেই অত্যাবশ্যক মানসিক শিক্ষা কী এবং কীরূপে তাহা লাভ করা যায়-উৎসুক হইয়া সকলেই এ প্রশ্ন করিবেন। মানসিক শিক্ষা কেবল বিষয় বিশেষের জ্ঞানলাভ নয়, সকল বিষয়েই জ্ঞানলাভের শক্তিবর্ধন ইহার মূল লক্ষণ। সেই শক্তিবর্ধনের উপায়, নানা বিষয়ের যথাসম্ভব শিক্ষা এবং সকল বিষয়ই যথাসম্ভব আয়ত্ত করিবার অভ্যাস। সকল বিষয় সকলের সম্যকরূপ আয়ত্ত হইতে পারে না, কিন্তু সকল বিষয়েরই সহজ কথা কিয়ৎ পরিমাণ আয়ত্ত করিবার শক্তি সকল প্রকৃতির ব্যক্তিরই থাকা উচিত এবং একটু যত করিলেই সেই শক্তি পাওয়া যায়। প্রকৃত মানসিক শিক্ষা না হইলে জ্ঞানলাভ হয় না।

সারাংশ : নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে আদ্যোপান্ত শিক্ষালাভ করলেই মানুষের শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। সম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য এর সাথে সাথে মানসিক শিক্ষা গ্রহণএবং বহুমুখী বিচিত্র বিষয়ে জ্ঞানলাভ করাটাও জরুরি।


৮৪

নীরব ভাষায় বৃক্ষ আমাদের সার্থকতার গান গেয়ে সোনায়। অনুভূতির কান দিয়ে সে গান শুনতে হবে। তাহলে বুঝতে পারা যাবে জীবনের মানে বৃদ্ধি, ধর্মের মানেও তাই। প্রকৃতির যে ধর্ম, মানুষের সে ধর্ম; পার্থক্য কেবল তরুলতা ও জীবজন্তুর বৃদ্ধির ওপর তাদের নিজেদের কোন হাত নেই, মানুষের বৃদ্ধির ওপরে তার নিজের হাত রয়েছে। আর এখানেই মানুষের মর্যাদা। মানুষের বৃদ্ধি কেবল দৈহিক নয়, আত্মিকও। মানুষকে আত্মা সৃষ্টি করে নিতে হয়, তা তৈরি পাওয়া যায় না। সুখ-দুঃখ-বেদনা উপলব্ধির ফলে অন্তরের যে পরিপক্বতা, তাই তো আত্মা।

সারাংশ : বৃক্ষ মানবজীবনের প্রতিরূপক। জীবন ও ধর্ম, প্রকৃতি ও মানুষ উভয়ের মূলকথা হলো বৃদ্ধি। মানুষ বৃক্ষ ও অন্যান্য প্রাণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, কারণ তার বৃদ্ধির ভার তার উপরই ন্যস্ত। তবে এ বৃদ্ধি ততটা শারীরিক নয়, যতটা আত্মিক। আর এই আত্মাও তাকে তৈরি করে নিতে হয়।


৮৫

নিষ্ঠুর ও কঠিন মুখ শয়তানের। কখনও নিষ্ঠুর বাক্যে প্রেম ও কল্যাণের প্রতিষ্ঠা হয় না। কঠিন ব্যবহারে ও রূঢ়তায় মানবাত্মার অধঃপতন হয়। সাফল্য কিছু হইলেও যে আত্মা দরিদ্র হইতে থাকে, সুযোগ পাইলেই সে আপন পশু-স্বভাবের পরিচয় দেয়। যে পরিবারের কর্তা ছোটদের সাথে অতিশয় কদর্য ব্যবহার করে, সে পরিবারের প্রত্যেকের স্বভাব অতিশয় মন্দ হইতে থাকে।

সারাংশ : নিষ্ঠুরতা এবং কঠোরতার মাধ্যমে প্রেম ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এর জন্যে প্রয়োজন স্নেহ-মায়া-মমতা ও ভালোবাসা। পরিবারের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, পরিবারের যিনি প্রধান তার নিষ্ঠুরতা এবং দুর্ব্যবহার ধীর ধীরে পরিবারের সবাইকে প্রভাবিত করে।


৮৬

পথ-পার্শ্বের ধর্ম-অট্টালিকা আজ পড়-পড় হইয়াছে, তাহাকে বাঙিয়া ফেলিয়া দেওয়াই আমাদের ধর্ম, ঐ জীর্ণ অট্টালিকা চাপা পড়িয়া বহু মানবের মৃত্যুর কারণ হইতে পারে। যে ঘর আমাদের আশ্রয় দান করিয়াছে, তাহা যদি সংস্কারাতীত হইয়া আমাদেরই মাথায় পড়িবার উপক্রম করে, তাহাকে ভাঙিয়া নতুন করিয়া গড়িবার দুঃসাহস আছে এক তরুণেরই। খোদার দেওয়া এই পৃথিবীর নিয়ামত হইতে যে নিজেকে বঞ্চিত রাখিল, সে যত মোনাজাতই করুক, খোদা তাহা কবুল করিবেন না। খোদা হাত দিয়াছেন বেহেশত ও বেহেশতি চিজ অর্জন করিয়া লইবার জন্যে, ভিখারির মতো হাত তুলিয়া ভিক্ষা করিবার জন্য নয়।

সারাংশ : দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য নড়বড়ে অতীত আদর্শকে ভেঙে ফেলতে হবে। তরুণরাই কেবল এ দুঃসাহস নিয়ে কাজ করতে পারে। অন্যের দয়া প্রার্থনা নয় কর্মের মধ্য দিয়েই এ উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।


৮৭

পরীক্ষায় পাস করিবার এই হাস্যোদ্দীপক উন্মত্ততা পৃথিবীর কোথাও দেখিতে পাওয়া যায় না। পাস করিয়া সরস্বতীর নিকট চিরবিদায় গ্রহণ, শিক্ষিতের এইরূপ জঘন্য প্রকৃতিও আর কোন দেশে নাই। আমরা এদেশে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ করিয়া জ্ঞানী ও গুণী হইয়াছি বলিয়া অহঙ্কারে স্ফীত হই, অপরাপর দেশে সেই সময়েই প্রকৃত জ্ঞান চর্চা আরম্ভ হয়। কারণ সেই সকল দেশের লোকের জ্ঞানের প্রতি যথেষ্ট অনুরাগ আছে।

সারাংশ : আমাদের দেশে পরীক্ষায় পাস করাকে শিক্ষার শেষ ধাপ মনে করা হলেও অন্যান্য দেশে তা জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশের দ্বার। শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই মানুষ আরো বেশি জ্ঞান পিপাসু হয়ে উঠে।


৮৮

পরের উপর সম্পূর্ণ ভার দিয়া নিশ্চিত থাকা এ সংসারে চলে না। নিজের দেখিবার ক্ষমতা না থাকিলে অজ্ঞাতসারে সংসারের উপর যে ক্ষতি আসিয়া পড়িবে তাহা অনিবার্য। ছেলে স্কুলে গেল ও নিয়মিত সময়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইল, ইহাতে খুব আহ্লাদিত হইবার যথেষ্ট কারণ নাই। তাহার পড়াশোনার কি উন্নতি হইতেছে, তাহা নিজেরা না পারিলেও কোন শিক্ষিত আত্মীয় কিংবা বন্ধুর দ্বারা সময় সময় পরীক্ষা করিয়া দেখা উচিত। অনেক স্কুলে যখন মাতাপিতা বহু কষ্টে নিজেদের নিতান্ত প্রয়োজনীয় ব্যয় সংকুচিত করিয়াও ছেলেদের পড়াশোনার খরচ চালাইয়া থাকেন, তখন কষ্টার্জিত সামান্য আয়ের বৃহৎ অংশ একেবারে নিষ্ফল হইয়া কেন পড়িবে, এটা কি দেখিবার বিষয় নহে? এইরূপে ব্যয় করিয়াই কোন কোন ছেলের উন্নতির আশা বাল্যকালেই বিনষ্ট কহইতেছে। মাতাপিতার এই বিষয়ে কিছুতেই উদাসীন থাকা উচিত নয়।

সারাংশ : নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব অন্যকে দিয়ে সম্পাদন করলে তার ফল ক্ষতি ছাড়া আর কিছু আশা করা যায় না। সন্তানের শিক্ষার ভার ও শুধু শিক্ষকের হাতে ছেড়ে দিলে অনেক সময় সে শিক্ষা নিষ্ফল হয়ে দাঁড়ায়। সন্তানের শিক্ষার ব্যাপারে পিতামাতার উদাসীনতা তাই দায়িত্বহীনতার সামিল।


৮৯

পাখি যেমন তার বাপ-মায়ের কাছে পাখা মেলে উড়তে শেখে, তেমনি বিদ্যালয়ে এসে মানুষকেও শিখতে হবে তার অন্তরের পাখা মেলাতে। এর জন্য দরকার মনের মধ্যে মহৎ আকাঙক্ষা পোষণ করা। কেবল শরীর রক্ষার জন্য বেশি সাধনার দকার হয় না, কিন্তু সত্যিকার মানুষ হতে হলে অন্তরে বড় আকাক্সক্ষা জাগিয়ে রাখতে হবে। এই শিক্ষাই মানুষের আসল শিক্ষা।

সারাংশ : বিদ্যালয়ে এসে মানুষ শিখতে পারে কীভাবে তার অন্তরকে প্রসারিত করতে হয়। তবে এর জন্য প্রয়োজন মহৎ আকাক্সক্ষা। আর প্রকৃত শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো এই মহৎ আকাক্সক্ষাকে জাগ্রত করে মানুষকে সত্যিকার মানুষে রূপান্তরিত করা।


৯০

পাপীকে সাধু করা বড় সহজ কথা নয়। ইহাতে অনেক যত, অনেক সতর্কতা ও মানবপ্রকৃতির অনেক জ্ঞান থাকা চাই। এমনকী কিছু কালের নিমিত্ত আপনার স্বার্থ পর্যন্ত বিস্মৃত হইতে হয়। এ সংসারে প্রেমই হৃদয়রাজ্যের অদ্বিতীয় ঈশ্বর। কী শিশু, কী প্রবীণ, কী বৃদ্ধ, কী ধনী, কি নির্ধন, কী পাপী, কী সাধু সকলেই এক বাক্যে ভালোবাসার দাস। অন্যের অন্তঃকরণে প্রভুত্ব করিতে হইলে প্রথম ভালোবাসার দ্বারাই তাহার পথ প্রস্তুত করিতে হয়। এইরূপ পরোক্ষ শিক্ষাদানেরও উদ্দেশ্যে ভালোবাসার দ্বারা কার্যকরী হয়। বস্তুত সহৃদয়তা ছাড়া যে পরের উপকার করা যায় না এবং সর্বময় স্নেহের অভাবে যে সর্বপ্রকার সদগুণও থাকা না থাকা সমান, তাহাতে আর সন্দেহ কী।

সারাংশ : পাপীকে ভালো পথে ফিরিয়ে আনতে হলে নিত্য স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে তাকে ভালোবাসতে হবে। কেননা, প্রতিটি মানুষই ভালোবাসার প্রত্যাশী। আর ভালোবাসার মাধ্যমে মানুষ খুব সহজেই অন্যের হৃদয় জয় করতে হবে। তাই পরোপকারী হওয়ার প্রধান কথা হলো সুহৃদয়বান হওয়া।


৯১

পাস করা আর শিক্ষিত হওয়া এক কথা নয়। আমাদের দেশে প্রচুর পাস করা লোক থাকলেও জ্ঞানী লোকের খুবই অভাব। স্বাধীন জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে আমাদের প্রকৃত জ্ঞানার্জন করতে হবে। শুধু পরীক্ষা পাসের হাস্যকর মোহে আমরা যেন আর মোহিত না হই।

সারাংশ : জ্ঞানার্জন করা আর পরীক্ষায় পাস করে ডিগ্রি অর্জন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। জাতি হিসেবে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য প্রয়োজন প্রকৃত জ্ঞানী হওয়া, ডিগ্রি অর্জন করা নয়।


৯২

পুরুষগণ আমাদিগকে সুশিক্ষা হইতে পশ্চাৎপদ রাখিয়াছেন বলিয়া আমরা অকর্মণ্য হইয়া গিয়াছি। ভারতে ভিক্ষুক ও ধনবানÑএই দুই দল লোক অলস এবং ভদ্রমহিলার দল কর্তব্য অপেক্ষা অল্প কাজ করে। আমাদের আরাম-প্রিয়তা খুব বাড়িয়াছে। আমাদের হস্ত, মন, পদ, চক্ষু ইত্যাদির সদ্ব্যবহার হয় না। দশজন রমণীরতœ একত্র হইলে ইহার উহার-বিশেষত আপন আপন অর্ধাঙ্গের নিন্দা কিংবা প্রশংসা করিয়া বাকপটুতা দেখায়। আবশ্যক হইলে কোন্দালও চলে।

সারাংশ : পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীদের পশ্চাৎপদতার মূল কারণ হলো সুশিক্ষার অভাব। এই সুশিক্ষার অভাবে নারীরা অলস, অকর্মণ্য হয়ে পড়েছে এবং বাজে আলাপে সময় ব্যয় করছে। গোটা জাতির উন্নতির জন্যই এ অবস্থা থেকে উত্তরণ অবশ্যম্ভাবী।


৯৩

পৃথিবীতে যাহার দিকে তাকাও, দেখিবে সে নিজের অবস্থায় অসন্তুষ্ট। দরিদ্র কিসে ধনী হবে সে চিন্তায় উদ্বিগ্ন, ধনী চোর-ডাকাতের ভয়ে ত্রস্ত। রাজা শত্রুর ভয়ে ভীত। এক কথায় পৃথিবীতে এমন কেহ নেই, যে পূর্ণ সুখে সুখী। অথচ কৌতুকের বিষয় এই, পৃথিবী ছেড়ে যেতেও কেহ প্রস্তুত নয়। মৃত্যুর নাম শুনলেই দেখি মানুষের মুখ শুকিয়ে যায়। মানুষ যতই দরিদ্র হোক, সপ্তাহের পর সপ্তাহ তাকে অনাহারে কাল কাটাতে হোক, পৃথিবীর কোনো আরাম যদি তার ভাগ্যে না থাকে তবু সে মৃত্যুকে চায় না। সে যদি কঠিন পীড়ায় পীড়িত হয়, শয্যা হতে উঠিবার শক্তিও না থাকে তবু সে মৃত্যুর প্রার্থী হবে না। কে না জানে যে, শত বছরের পরমায়ু থাকলেও তাকে একদিন না একদিন মরতে হবে।

সারাংশ : নিজ অবস্থানে প্রকৃত অর্থে সুখী এমন মানুষ পৃথিবীতে নেই। কিন্তু জীবনে অতৃপ্তি থাকা সত্যেও মানুষ মৃত্যুকে বরণ করতে চায় না। দুঃখ-কষ্ট, রোগ-শোক, দারিদ্রের মতো অসহনীয় অবস্থায়ও সে অমরত্বের প্রত্যাশা করে।


৯৪

পৃথিবীতে যখন কোনো সত্য আত্মপ্রতিষ্ঠা করিতে চাহিয়াছে, তখনই তাহার বিরুদ্ধাচরণ হইয়াছে। এই বিরুদ্ধাচরণের ধারা ও নীতি মূলত সকল ক্ষেত্রেই অভিন্ন। প্রথম প্রথম যখন সেই সত্য আত্মপ্রকাশ করিতে চায়, তখন বিপক্ষীয়গণ তাহাকে উপেক্ষা করিয়া হাসিয়া উড়াইয়া দিতে চায়। ঠাট্টা-তামাসা ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ তখন তাহাদের প্রধান অবলম্বন হইয়া থাকে। সত্যের সেবক যখন এই প্রাথমিক বিঘ্নকে অতিক্রম করিয়া অগ্রসর হইতে থাকেন, তখন ঐ উপেক্ষা ক্রোধে পরিণত হয় এবং বিপক্ষীয়েরা নীচ গালাগালি ইত্যাদি দ্বারা সেই ক্রোধের অভিব্যক্তি করিতে থাকে। গালাগালি দিয়াও যখন কোনো ফল হয় না, তখন তাহারা সত্যকে প্রতিহত করিবার জন্যে দল পাকাইতে এবং অপেক্ষাকৃত নির্বোধ এবং গোঁড়া লোকদিগকে ধর্মের নামে উত্তেজিত করিতে থাকে। ইহাও যখন নিষ্ফল হইয়া যায়, তখন নানা প্রকার শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করা এবং সাধ্যে কুলাইলে অবশেষে শাণিত খড়গ ও বিষাক্ত কৃপাণ দ্বারা সত্যের মু-পাত করিবার জন্যে চেষ্টা করা হয়।

সারাংশ : আমাদের তরুণ সমাজের দৃষ্টি আজ জ্ঞানার্জনের দিকে নয়, পরীক্ষা পাশের দিকে। জ্ঞানস্পৃহার সঙ্গে সম্পর্কহীন শিক্ষা কোনো জাতির জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না। তাই আমাদের তরুণ সমাজকে পরীক্ষা পাশের মোহ ত্যাগ করে প্রকৃত জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে জাতিকে আত্মমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।


৯৫

প্রকৃত জ্ঞানের স্পৃহা না থাকলে শিক্ষা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তখন পরীক্ষায় পাসটাই বড় হয় এবং পাঠ্যপুস্তকের পৃষ্ঠায় জ্ঞান সীমাবৃদ্ধ থাকে। এই কারণেই পরীক্ষায় পাস করা লোকের অভাব নেই আমাদের দেশে, কিন্তু অভাব আছে জ্ঞানীর। যেখানেই পরীক্ষা-পাসের মোহ তরুণ ছাত্রছাত্রীদের উৎকণ্ঠিত রাখে, সেখানেই জ্ঞান নির্বাসিত জীবনযাপন করে। একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে জগতের বুকে অক্ষয় আসন লাভ করতে হলে জ্ঞানের প্রতি তরুণসমাজকে অনুপ্রাণিত করতে হবে। সহজ লাভ আপাতত সুখের হলেও জ্ঞানের দিগন্ত উন্মোচিত হবে না।

সারাংশ : পৃথিবীতে কোনো নতুন সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত কঠিন একটি ব্যাপার। কেননা এর পদে পদে আছে বহু বাধা বিপত্তি। যারা সত্যের বিরোধী তারা নানা উপায়ে সত্য প্রতিষ্ঠার পথকে রুদ্ধ করে দিতে চায়।


৯৬

প্রাচীনযুগে জ্ঞানার্জন আজিকার মতো এত সস্তা ছিল না। জ্ঞান ছিল সাধনার সামগ্রী। সে সাধনায় ছাত্রমাত্রকেই শ্রম স্বীকার করিয়া উহা সঞ্চয় করিতে হইত। শুক্তির মতো সে জ্ঞান ধীরে ধীরে জমাট বাঁধিয়া মুক্তাতে পরিণত হইত। মুক্তার কদর মানুষ করিত, জ্ঞানীর কদরও তাহারা করিত। ফলে প্রবাদবাক্য রচিত হইয়াছিল-বিদ্বান সর্বত্র পুজ্যতে’। যুগের হাওয়ায় সে জ্ঞান তপস্যার পাদপীঠ হইতে বাজারে আসিয়া আস্তানা গড়িয়াছে। লোকে পয়সার বদৌলতে তাহা আহরণ করিয়া কৃতবিদ্যা হইতেছে। কিন্তু ইহার ফলে বিদ্যার অধঃপ্রভা বিলুপ্ত হইয়াছে, যাহা কিছু দৃষ্ট হইতেছে তাহা বাহ্যিক চাকচিক্য মাত্র।

সারাংশ : প্রাচীনকালে জ্ঞানার্জন অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ছিল বলেই জ্ঞান এবং জ্ঞানী উভয়েরই সম্মান ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিদ্যা অনেকাংশে হয়ে উঠেছে বাণিজ্যিক। আর এর ফলে বিদ্যা তার প্রকৃত সত্য হারিয়ে বাহ্যিক আড়¤¦রে পরিণত হয়েছে।


৯৭

ফুল ফুটেছে, এটাই ফুলের চরম কথা। যার ভালো লাগল সে-ই জিতল, ফুলের জিত তার আপন আবির্ভাবেই। সুন্দরের অন্তরে আছে একটি রহস্যময় আয়ান্তর অথীত সত্য, আমাদের অন্তরের সঙ্গে তার অনির্বচনীয় সম্বন্ধ তার সম্পর্কে আমাদের আত্মচেতনা হয় মধুর গভীর ও উজ্জ্বল। আমাদের ভেতরে মানুষ বেড়ে ওঠে, রেঙে উঠে, রসিয়ে ওঠে। আমাদের সত্তা যেন তার সঙ্গে বসে মিলে যায় একেই বলে অনুরাগ।

সারাংশ : ফুল সার্থকতা লাভ করে বিকশিত হৃদয়ের সুবাস দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করার মাধ্যমে। মানুষের হৃদয়ও ঠিক তার অনুরূপ। সুন্দরকে ধারণ করে মানব হৃদয় উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠে।


৯৮

বড়লোকের নন্দগোপালটির মতো দিবারাত্রি চোখে চোখে এবং কোলে কোলে রাখিলে যে সে বেশটি থাকবে, তাহাতে কোনোই সন্দেহ নাই, কিন্তু একেবারে তেলোপোকাটির মতো বাঁচাইয়া রাখার চেয়ে এক আধবার কোল হইতে নামাইয়া আরও পাঁচ জন মানুষের মতো দু-এক পা হাঁটিতে দিলেই প্রায়শ্চিত্ত করার মতো পাপ হয় না।

সারাংশ : বাঁচার মতো বাঁচতে হলে কোনো কুসংস্কারকে হৃদয়ে স্থান দেওয়া যাবে না। স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ঘটিয়ে প্রত্যেককে কর্মে প্রবৃত্ত হতে হবে।


৯৯

বর্তমান সভ্যতায় দেখি এক জায়গায় একদল মানুষ অন্ন উৎপাদনের চেষ্টায় নিজের সমস্ত শক্তি নিয়োগ করেছে। আর এক জায়গায় আর একদল স্বতন্ত্রভাবে সেই অন্নে প্রাণ ধারণ করে। চাঁদের যেমন একপিঠে অন্ধকার, অন্যপিঠে ধনের সন্ধান, ধনের অভিমান, ভোগ-বিলাস সাধনের প্রয়াসে মানুষ উন্মত্ত। অন্নের উৎপাদন হয় পল্লীতে, আর অর্থের সংগ্রহ চলে নগরে। অর্থ-উপার্জনের সুযোগ ও উপকরণ যেখানে কেন্দ্রীভূত, স্বভাবত সেখানেই আরাম, আরোগ্য, অমোদ ও শিক্ষার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়ে অপেক্ষাকৃত অল্পসংখ্যক লোককে ঐশ্বর্যের আশ্রয় দান করে। পল্লীতে সেই ভোগের সৃষ্টি যা কিছু পৌঁছায় তার যৎকিঞ্চিৎ।

সারাংশ : বর্তমানে গ্রাম এবং শহরের অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান। উৎপাদনের কেন্দ্র গ্রাম হলেও তার সকল সুবিধা ভোগ করছে শহরবাসী। তাই গ্রামের মানুষ একদিকে অনাহারে দিন কাটায় আর অন্যদিকে শহরের মুষ্টিমেয় মানুষ ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে।

অথবা,

সারাংশ : বর্তমান সভ্যতায় উৎপাদন ও পরিভোগে বিশাল ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে। পল্লির বিপুল জনগণ অন্ন উৎপাদন করেও দারিদ্র্যাকবলিত। অথচ নগরের মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীরা ভোগবিলাসিতায় আচ্ছন্ন। অর্থের কেন্দ্রীভবন নগরকে দিয়েছে নানা নাগরিক সুবিধা। পক্ষান্তরে, পল্লি সুবিধাবঞ্চিত ও অন্ধকারে নিমজ্জিত।


১০০

বর্তমান বিশ্বসাহিত্যের দিকে একটু ভালো করে দেখলে সর্বাগ্রে চোখ পড়ে তার দুটি রূপ। এক রূপে সে ধুলিমলিন পৃথিবীর উর্ধ্বে উঠে স্বর্গের সন্ধান করে, তার চরণ কখনও ধরার মাটি স্পর্শ করে না-এইখানে সে স্বপ্নবিহারী। আরেক রূপে সে এই মাটির পৃথিবীকে অপার মমতায় আঁকড়ে ধরে থাকে। এইখানে সে মাটির দুলাল।

সারাংশ : বর্তমান বিশ্বসাহিত্যের দুটি রূপ লক্ষণীয়। এক রুপে সে কল্পলোকের সৌন্দর্য সন্ধানী। আর অন্য রুপে সে এই মাটির পৃথিবীর স্নেহ-মমতার বন্ধনে আবদ্ধ।


১০১

বার্ধক্য তাহাই যাহা পুরাতনকে, মিথ্যাকে আঁকড়িয়া পড়িয়া থাকে। বৃদ্ধ তাহারাই যাহারা মায়াচ্ছন্ন নবমানবের অভিনব জয়যাত্রার শুধু বোঝা নয়, বিঘ;শতাব্দীর নবযাত্রীর চলার ছন্দে ছন্দ মিলাইয়া যাহারা কুচকাওয়াজ করিতে জানে না, পারে না; যাহারা জীব হইয়াও জড়; যাহারা অটল সংস্কারের পাষাণস্তুপ আঁকড়িয়া পড়িয়া আছে। বৃদ্ধ তাহারাই যাহারা নব-অরুণোদয় দেখিয়া নিদ্রাভঙ্গের ভয়ে দ্বাররুদ্ধ করিয়া পড়িয়া থাকে।

সারাংশ : বয়স কম বা বেশি যা-ই হোক না কেন যারা রক্ষণশীল তারাই বৃদ্ধ। সমাজের প্রগতিকে তারা গ্রহণ করতে চায় না। সমাজের কল্যাণকে যে এরা শুধু ভয় পায় তা-ই নয়, সমাজের কল্যাণের পথে তারা নিজেরাও এক বিরাট বাধা।


১০২

বাল্যকাল হইতেই আমাদের শিক্ষার সহিত আনন্দ নাই। কেবল যাহা নিতান্ত আবশ্যক, তাহাই কণ্ঠস্থ করিতেছি। তেমন করিয়া কোনো মতে কাজ চলে মাত্র, কিন্তু মনের বিকাশ লাভ হয় না। হাওয়া খাইলে পেট ভরে না। আহারাদি রীতিমতো হজম করিবার জন্য হাওয়া খাওয়া দরকার। তেমনি একটা শিক্ষা পুস্তককে রীতিমতো হজম করিতে অনেকগুলি পাঠ্যপুস্তকের সাহায্য আবশ্যক। আনন্দের সহিত পড়িতে পড়িতে পড়িবার শক্তি অলক্ষিতে বৃদ্ধি পাইতে থাকে। গ্রহণশক্তি, চিন্তা বেশ সহজ স্বাভাবিক নিয়মে বৃদ্ধি পায়।

সারাংশ : শিক্ষার সাথে আনন্দের সংস্পর্শ না থাকলে সে শিক্ষা হৃদয়কে বিকশিত করতে পারে না। তাই হৃদয়ের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য পাঠ্য-পুস্তকের পাশাপাশি চিন্তাশক্তি বৃদ্ধিকারী ও আনন্দদায়ক পুস্তক পাঠ করা অত্যাবশ্যক।


১০৩

বিষয় অনুসারেই রচনার ভাষায় সামান্যতা বা উচ্চতা নির্ধারিত হওয়া উচিত। রচনার প্রধান গুণ এবং প্রথম প্রয়োজন সরলতা এবং স্পষ্টতা। যে রচনা সকলেই বুঝিতে পারে এবং পড়িবামাত্র যাহার অর্থ বুঝা যায়, অর্থগৌরব থাকলে তাহাই সর্বোৎকৃষ্ট রচনা। তাহার পর ভাষার সৌন্দর্য। সরলতা এবং স্পষ্টতার সহিত সৌন্দর্য মিশাইতে হইবে। অনেক রচনার মুখ্য উদ্দেশ্য সৌন্দর্য, সে স্থলে সৌন্দর্যের অনুরোধে শব্দের একটু অসাধারণতা সহ্য করিতে হয়। প্রথমে দেখিবে তুমি যাহা বলিতে চাও, কোন ভাষায় তাহা সর্বাপেক্ষা পরিষ্কাররূপে ব্যক্ত হয়। যদি সরল প্রচলিত কথাবার্তার ভাষায় তাহা সর্বাপেক্ষা সুস্পষ্ট ও সুন্দর হয় তবে কেন উচ্চ ভাষার আশ্রয় লইবে? যদি সে পক্ষে টেকচাঁদী বা হুতোমী ভাষায় সকলের অপেক্ষা কার্য-সুসিদ্ধ হয়, তবে তাহাই ব্যবহার করিবে। যদি তদপেক্ষা বিদ্যাসাগর বা ভুদেববাবু প্রদর্শিত সংস্কৃতবহুল ভাষায় ভাবের অধিক স্পষ্টতা ও সৌন্দর্য হয়, তবে সামান্য ভাষা ছাড়িয়া সেই ভাষার আশ্রয় লইবে। যতি তাহাতেও কার্যসিদ্ধ না হয়, আরও ওপরে উঠিবে, প্রয়োজন হইলে তাহাতেও আপত্তি নাই, নি®প্রয়োজনেই আপত্তি।

সারাংশ : স্পষ্টতা, সরলতা এবং অর্থময়তা রচনার অন্যতম প্রধান গুণ। এগুলোর পরই গুরুত্ব দিতে হয় ভাষার সৌন্দর্যের ওপর। যে ভাষায় মনের ভাব সহজে ব্যক্ত হয় সে ভাষাই রচনায় ব্যবহার করা উচিত। ভাষার আড়ষ্ঠর নয়, বিষয় উপযোগী ভাষাই রচনাকে সার্থক করে তোলে।


১০৪

বিদ্যা মঙ্গলের নিদান সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। কিন্তু অল্প বিদ্যা মারাত্মক। সংসারে প্রত্যেক ব্যক্তিরই আপনার যথার্থ মূল্য বুঝিয়া চলা উচিত। যে ব্যক্তি যে বিষয়ে বিশেষরূপে দক্ষ নহে, তাহার পক্ষে সেই কার্যে হস্তক্ষেপ অবিধেয়। যে ব্যক্তি অর্ধশিক্ষিত, সুশিক্ষিতের ভান করা তাহার অনুচিত। কেননা ইহাতে সে যে কেবল আপনার ক্ষতি করে তাহা নহে; তাহার এইরূপ আচরণের দ্বারা সমাজেরও বিষম অনিষ্ট সাধিত হয়। হাতুড়িয়া বৈদ্যগণ প্রকৃত চিকিৎসক নহে, চিকিৎসাশাস্ত্রে তাহাদের অতি অল্প জ্ঞানই থাকে। কিন্তু তাহা তাহারা নিজেরাও বুঝে না বা বুঝিলেও অপরের নিকট স্বীকার করে না। সুতরাং তাহারা কোনো সুচিকিৎসকের ভান করিয়া যদি সংকটাপন্ন রোগীর চিকিৎসার ভার গ্রহণ করে তবে ঐ রোগীর মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। তাহারা সমাজের অজ্ঞ লোকদিগকে প্রতারিত করিয়া উহাদের ভীষণ ক্ষতিসাধন করে। তাহাদের এই কার্যের জন্যে চিকিৎসাবিদ্যা দায়ী নহে, দায়ী তাহাদের চিকিৎসাবিদ্যার অল্প জ্ঞান।

সারাংশ : বিদ্যা মুল্যবান এবং মঙ্গলজনক হলেও অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী। অল্প বিদ্যা নিয়ে কোনো কাজে হাত দেওয়া উচিত নয়। কেননা, এতে বড় ধরনের ক্ষতি সাধিত হতে পারে।


১০৫

বৃক্ষের দিকে তাকালে জীবনের তাৎপর্য উপলব্ধি সহজ হয়। তাই বারবার সেদিকে তাকানো প্রয়োজন, মাটির রস টেনে নিয়ে নিজেকে মোটাসোটা করে তোলাতেই বৃক্ষের কাজের সমাপ্তি নয়। তাকে ফুল ফোটাতে হয়, ফল ধরাতে হয়। নইলে তার জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাই বৃক্ষকে সার্থকতার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা, সজীবতা ও সার্থকতার এমন জীবন্ত দৃষ্টান্ত আর নেই।

সারাংশ : মানব অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকার মধ্যেই মানবজীবনের সার্থকতা নিহিত থাকে না। জগৎ, জীবন ও জাতির কল্যাণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার মধ্য দিয়েই মানুষের জীবন সার্থক হয়ে ওঠে।


১০৬

বিদ্যা মানুষের মূল্যবান সম্পদ, সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। কিন্তু চরিত্র তদপেক্ষাও মূল্যবান। অতএব, কেবল বিদ্বান বলিয়াই কোনো লোক সমাদর লাভের যোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে না। চরিত্রহীন ব্যক্তি যদি নানা বিদ্যায় আপনার জ্ঞানভান্ডার পূর্ণ করিয়াও থাকে, তথাপি তাহার সঙ্গ পরিত্যাগ করাই শ্রেয়। প্রবাদ আছে যে, কোনো কোনো বিষধর সর্পের মস্তকে মণি থাকে। মণি মহামূল্যবান পদার্থ বটে, কিন্তু তাই বলিয়া যেমন মণিলাভের নিমিত্ত বিষধর সর্পের সাহচর্য লাভ করা বুদ্ধিমানের কার্য নহে, সেইরূপ বিদ্যা আদরণীয় হইলেও বিদ্যালাভের নিমিত্ত বিদ্বান দুর্জনের নিকট গমন বিধেয় নহে।

সারাংশ : বিদ্যা মূল্যবান সম্পদ হলেও চরিত্রের মূল্য তার থেকে বেশি। চরিত্রহীন ব্যক্তি বিদ্বান হলেও তার সঙ্গ পরিত্যাগ করা উচিত। কারণ তার সংস্পর্শে সাধু ব্যক্তির চরিত্রও নষ্ট হতে পারে।


১০৭

ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবাই হলো জ্ঞানীর কাজ। পিঁপড়ে-মৌমাছি পর্যন্ত যখন ভবিষ্যতের জন্যে ব্যতিব্যস্ত, তখন মানুষের কথা বলাই বাহুল্য। ফকির-সন্ন্যাসী যে ঘরবাড়ি ছেড়ে, আহার-নিন্দ্রা ভুলে, পাহাড়-জঙ্গলে চোখ বুজে বসে থাকে, সেটা যদি নিতান্ত পঞ্জিকার কৃপায় না হয়, তবে বলতে হবে ভবিষ্যতের ভাবনা ভেবে কোনো লাভ নেই। সমস্ত জীব-জন্তুর দুটো চোখ সামনে থাকবার মানে হলো ভবিষ্যতের দিকে যেন নজর থাকে। অতীতের ভাবনা ভেবে লাভ নেই। পন্ডিতেরা তো বলে গেছেন, ‘গতস্য শোচনা নাস্তি।’ আর বর্তমান সে তো নেই বললেও হয়। এটা যেটা বর্তমান সেই-এই কথা বলতে বলতে অতীত হয়ে গেল। কাজেই নদীর তরঙ্গ গণনা আর বর্তমানের চিন্তা করা সমানই অনর্থক। ভবিষ্যতের মানব কেমন হবে সেটা একবার ভেবে দেখা উচিত।

সারাংশ : ভবিষ্যতের ভাবনাই জীবনে সুফল বয়ে আনে, অতীত অথবা বর্তমানের ভাবনা নয়। আর এই ভবিষ্যতকে সার্থক ও সুন্দর করে তোলার জন্য প্রয়োজন নিখুঁত কর্মপরিকল্পনা।


১০৮

মহাসমুদ্রের শত বৎসরের কল্লোল, কেহ যদি এমন করিয়া বাঁধিয়া রাখিতে পারিত যে, সে ঘুমন্ত শিশুটির মতো চুপ করিয়া থাকিত, তবে সে নীরব মহাশব্দের সহিত এই পুস্তকাগারের তুলনা হইত। এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্থির হইয়া আছে, মানবাত্মার অমর অগ্নি কালো অক্ষরের শৃঙ্খলে কালো চামড়ার কারাগারে বেড়া দগ্ধ করিয়া একবার বাহির হইয়া আসে। কালের শঙ্খরন্ধ্রে এই নীরব সহস্র বৎসর যদি এককালে ফুৎকার দিয়া উঠে তবে সে বন্ধনমুক্ত উচ্ছ্বসিত শব্দের স্রোতে দেশ-বিদেশে ভাসিয়া যাইত। হিমালয়ের মাথার ওপরে কঠিন তুষারের মধ্যে যেমন শত শত বন্যা বাঁধা পড়িয়া আছে, তেমনি এই পুস্তকাগারের মধ্যে মানবহৃদয়ের বন্যাকে বাঁধিয়া রাখা হইয়াছে।

সারাংশ : গ্রন্থাগার হলো জ্ঞানের এক নীরব মহাসমুদ্র। হাজার বছরের জ্ঞান ও মানবহৃদয়ের আবেগ, উচ্ছ্বাস বিভিন্ন গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়ে গ্রন্থাগারে রক্ষিত হয়।


১০৯

মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ প্রাণী। জগতের অন্যান্য প্রাণীর সহিত মানুষের পার্থক্যের কারণ- মানুষ বিবেক ও বুদ্ধির অধিকারী। এই বিবেক, বুদ্ধি ও জ্ঞান নাই বলিয়া আর সকল প্রাণী মানুষ অপেক্ষা নিকৃষ্ট। জ্ঞান ও মনুষ্যত্বের উৎকর্ষ সাধন করিয়া মানুষ জগতের বুকে অক্ষয় কীর্তি স্থাপন করিয়াছে, জগতের কল্যাণ সাধন করিতেছে; পশুবল ও অর্থবল মানুষকে বড় বা মহৎ করিতে পারে না। মানুষ হয় জ্ঞান ও মনুষ্যত্বের বিকাশে। জ্ঞান ও মনুষ্যত্বের প্রকৃত বিকাশে জাতির জীবন উন্নত হয়। প্রকৃত মানুষই জাতীয় জীবনের প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন আনয়নে সক্ষম।

সারাংশ : বিবেক, বুদ্ধি ও জ্ঞান মানুষকে অন্য প্রাণী থেকে পৃথক করে তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছে। জ্ঞান ও মনুষ্যত্ববোধের মাধ্যমে মানুষ সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়ে জগতের কল্যাণসাধন করছে। জাতীয় উন্নতির জন্যও এই জ্ঞান ও মনুষ্যত্ববোধই প্রয়োজন, অর্থবল বা পেশীশক্তি নয়।


১১০

মানুষের জীবনে ভাষার স্থান যে কত বড় তা আমরা খুব কমই ভেবে থাকি। আমরা যেমন খাই-দাই, ওঠা-বসা করি ও হেঁটে বেড়াই, তেমনি সমাজজীবন চালু রাখবার জন্যে কথা বলি, নানা বিষয়ে নানাভাবে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সামাজিকতা বজায় রাখতে হলে তার প্রধান উপায় কথা বলা, মুখ খোলা, আওয়াজ করা। একে অন্যের সঙ্গে সম্বন্ধ যেমনই হোক না কেন শত্রুতার কী ভালোবাসার, চেনা কী অচেনার, বন্ধুত্বের কিংবা মৌখিক আলাপ-পরিচয়ের, মানুষের সঙ্গে মানুষের যে কোনো সম্বন্ধ স্থাপন করতে গেলেই মানুষমাত্রকেই মুখ খুলতে হয়, কতকগুলো আওয়াজ করতে হয়। সে আওয়াজ বা ধ্বনিগুলোর একমাত্র শর্ত হচ্ছে যে, সেগুলো অর্থবোধক হওয়া চাই।

সারাংশ : মানবজীবনে ভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। অপরের সাথে সম্পর্ক গড়া এবং তা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন ভাষার। ভাষা বলতে কেবল মুখনির্গত কতগুলো আওয়াজ বা ধ্বনিকে বোঝায় না, ভাষা বলতে বোঝায় অর্থবোধক ধ্বনি বা ধ্বনির সমষ্টি।


১১১

মানুষের এক বড় সৃষ্টি তার সাহিত্য। তার বৈচিত্র্যময় জীবনের অন্তধারা দিয়ে মানুষ সাহিত্যের নানা শাখাকে রসে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। যুগ যুগ ধরে মানুষের মনোরাজ্যের লীলা খেলার কল্পলোকের বিচিত্র সূর ধ্বনিত হয়েছে। সাহিত্য সৃষ্টির গোড়া মানুষের চিন্তারাজ্যের এই যাত্রা রুদ্ধ হতে পারে না। যেখানে যে মানুষের মধ্যে এই চিন্তার স্রোতে রুদ্ধ হয়ে এসেছে, সেখানে তার জীবনও স্থবির হয়ে এসেছে। গতিহীন যে  স্রোত সম্মুখে অগ্রসর হতে পারে না তার অকালমৃত্যু অনিবার্য।

সারাংশ : সাহিত্য মানুষের এক অনিন্দ্য সুন্দর সৃষ্টি। যুগ যুগ ধরে সাহিত্য মানুষের মনকে অবলম্বন করে হয়ে উঠেছে সমৃদ্ধ। মনের স্বাভাবিক গতি যদি রুদ্ধ হয় তবে সেই মনের মৃত্যু ঘটে। আর রূদ্ধ হওয়া মনে সাহিত্য তার খোরাক খুঁজে পায় না।


১১২

মানুষের সুন্দর মুখ দেখে আনন্দিত হয়ো না। স্বভাবে সে সুন্দর নয়, দেখতে সুন্দর হলেও তার স্বভাব, তার স্পর্শ, তার রীতিনীতিকে মানুষ ঘৃণা করে। দুঃস্বভাবের মানুষ মানুষের হৃদয়ে জ্বালা ও বেদনা দেয়। তার সুন্দর মুখে মানুষ তৃপ্তি পায় না। অবোধ লোকেরা মানুষের রূপ দেখে মুগ্ধ হয় এবং তার ফল ভোগ করে। যার স্বভাব মন্দ, সে নিজেও দুষ্ক্রিয়াশীল, মিথ্যাবাদী, দুর্মতিকে ঘৃণা করে। মানুষ নিজে স্বভাবে সুন্দর না হলেও সে স্বভাবের সৌন্দর্যকে ভালোবাসে। স্বভাব গঠনে কঠিন পরিশ্রম ও সাধনা চাই, নইলে শয়তানকে পরাজিত করা সম্ভব নয়।

সারাংশ : বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, স্বভাবের সৌন্দর্যই মানুষকে বিচারের মাপকাঠি। খারাপ স্বভাবের মানুষও বাহ্যিক সৌন্দর্যের অধিকারী হতে পারে। আর যারা খারাপ স্বভাবের তারাও সুন্দর স্বভাবের মানুষকে পছন্দ করে। তাই কঠোর পরিশ্রম ও সাধনার মাধ্যমে সুন্দর স্বভাবের অধিকারী হতে হবে।


১১৩

মানুষের একটা বড় পরিচয় সে ভাবতে পরে। করতে পারে যে কোন বিষয়ে চিন্তা। সে চিন্তা ও ভাব মানুষকে সাহায্য করে মানুষ হতে। পশুপাখিকে পশুপাখি হতে ভাবতে হয় না পারেও না ওরা ভাবতে বা চিন্তা করতে। সে বালাই ওদের নেই- যেটুকু পারে তার পরিধি অত্যন্ত সংকীর্ণ বাঁচা ও প্রজননের মধ্যে তা সীমিত। সভ্য-অসভ্যের পার্থক্যও এ ধরনের। যারা যত বেশি চিন্তাশীল সভ্যতার পথে তারাই তত বেশি অগ্রসর। আর চিন্তার ক্ষেত্রে যারা পেছনে পড়ে আছে, সভ্যতারও পেছনের সারিতেই তাদের স্থান। ব্যক্তি, গোষ্ঠী, জাতি, দেশ সবের বেলায় এ সত্যের তারতম্য নেই। মোট কথা সভ্যতার প্রথম সোপানই হল চিন্তা-চিন্তার অভ্যাস তথা বুদ্ধির চর্চা।

সারাংশ : মানব জাতি প্রাণিকুলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কেবল চিন্তাশক্তির কারণে। যুগ যুগান্তরে সভ্যতার উদ্ভাবন ও বিবর্তন তাদের চিন্তারই ফসল। মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও গবেষণা জাতিকে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে নিয়ে যায়। আর এর বিপরীতে রয়েছে কেবল দৈন্যদশা।


১১৪

মানুষের মূল্য কোথায়? চরিত্রে, মনুষ্যত্বে, জ্ঞানে ও কর্মে। বস্তুত চরিত্র বলেই মানুষের জীবনের যা কিছু শ্রেষ্ঠ তা বুঝতে হবে। চরিত্র ছাড়া মানুষের গৌরব করার আর কিছু নেই। মানুষের শ্রদ্ধা যদি মানুষের প্রাপ্য হয়, মানুষ যদি মানুষকে শ্রদ্ধা করে, সে শুধু চরিত্রের জন্যে, অন্য কোনো কারণে মানুষের মাথা মানুষের সামনে এত নত করার দরকার নেই। জগতে যে সকল মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করেছেন, তাঁদের গৌরবের মূলে এই চরিত্রশক্তি। তুমি চরিত্রবান লোক, একথার অর্থ এই নয় যে, তুমি লম্পট নও। তুমি সত্যবাদী, বিনয়ী এবং জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধাপোষণ করো, তুমি পরদুঃখকাতর ন্যায়বান এবং মানুষের ন্যায় স্বাধীনতাপ্রিয়, চরিত্রবান মানে এই।

সারাংশ : চরিত্র মানবজীবনের অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। চরিত্র বলেই মানুষ গৌরবের আসনে অধিষ্ঠিত হয়, লাভ করে অপরের শ্রদ্ধা। আর চরিত্রবান বলতে মূলত সত্যবাদী, বিনয়ী, জ্ঞানবান, পরদুঃখকাতর, ন্যায়বান, স্বাধীনতাপ্রিয় ব্যক্তিকে বোঝায়।


১১৫

মানুষের জীবনকে একটি দোতলা ঘরের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। জীবসত্তা সেই ঘরের নিচের তলা আর মানবসত্তা বা মনুষ্যত্ব ওপরের তলা। জীবসত্তার ঘর থেকে মানবসত্তার ঘরে উঠবার মই হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষাই আমাদের মানবসত্তার ঘরে নিয়ে যেতে পারে। অবশ্য জীবসত্তার ঘরেও সে কাজ করে; ক্ষুৎপিপাসার ব্যাপারটি মানবিক করে তোলা তার অন্যতম কাজ। কিন্তু তার আসল কাজ হচ্ছে মানুষকে মনুষ্যত্বলোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। অন্য কথায় শিক্ষার যেমন প্রয়োজনের দিক আছে, তেমনি অপ্রয়োজনের দিকও আছে; আর অপ্রয়োজনের দিকই তার শ্রেষ্ঠ দিক। সে শেখায় কী করে জীবনকে উপভোগ করতে হয়, কী করে মনের মালিক হয়ে অনুভূতি ও কল্পনার রস আস্বাদন করা যায়।

সারাংশ : মনুষ্যত্ববোধের কারণে মানুষ পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা। মানুষের জীবসত্তা থেকে মানবসত্তা তথা মনুষ্যত্বে উত্তীর্ণ হওয়ার উপায় হলো শিক্ষা। শিক্ষাই মানুষকে মনুষ্যত্ববোধের সন্ধান দেয়, জীবনকে উপভোগ করতে শেখায় এবং হৃদয়কে আলোকিত করে।


১১৬

মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ সার্থকতা সৈনিক-জীবনে। সৈনিক যে-পথ দিয়া হাঁটেন, সে পথের ধূলাগুলিও পবিত্র। সৈনিক সামান্য নহেন। পাপকে দমন করিবার জন্যে যে মানুষ অসি গ্রহণ করেন, তিনি অসামান্য। জীবনকে তুচ্ছ জানিয়া যিনি কামান-গোলার সম্মুখে বুক পাতিয়া দাঁড়ান, তিনি কত বড় তাহা কি ভাবিয়া দেখিয়াছ? সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দান করিবার সাহস যাঁহার আছে তিনি কি শ্রেষ্ঠ মানুষ নন? খোদার সহিত প্রেম করিবার অধিকার সৈনিক ছাড়া আর কাহার আছে? যে মানুষ জীবনের মায়ায় অসত্যকে নমস্কার করে, সে মানুষ নহে।

সারাংশ : নিজ জীবনকে তুচ্ছ করে সৈনিকরা সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য, অপরের কল্যানের জন্য অস্ত্র ধারণ করে বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাই সৈনিক জীবন সার্থক জীবনের শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত। অন্যদিকে যারা নিজের সুখের জন্য অন্যায়কে বরণ করে তারা প্রকৃত মানুষ নয়।


১১৭

মাতৃস্নেহের তুলনা নাই। কিন্তু অতিস্নেহ অনেক সময় অমঙ্গল আনয়ন করে। যে স্নেহের উত্তাপে সন্তানের পরিপুষ্টি, তাহারই আধিক্যে সে অসহায় হইয়া পড়ে। মাতৃস্নেহের মমতার প্রাবল্যে মানুষ আপনাকে হারাইয়া আসল শক্তির মর্যাদা বুঝিতে পারে না। নিয়ত মাতৃস্নেহের অন্তরালে অবস্থান করিয়া আত্মশক্তির সন্ধান সে পায় না - দুর্বল অসহায় পক্ষীশাবকের মতো চিরদিন স্নেহাতিশয্যে আপনাকে সে একান্ত নির্ভরশীল মনে করে। ক্রমে জননীর পরম সম্পদ সন্তান অলস, ভীরু, দুর্বল ও পরনির্ভরশীল হইয়া মনুষ্যত্ব বিকাশের পথ হইতে দূরে সরিয়া যায়। অন্ধ মাতৃস্নেহ সে কথা বুঝে না অলসকে সে প্রাণপাত করিয়া সেবা করে ভীরুতার দুর্দশা কল্পনা করিয়া বিপদের আক্রমণ হইতে ভীরুকে রক্ষা করিতে ব্যস্ত হয়।

সারাংশ : মাতৃস্নেহে অতুলনীয় হলেও অন্ধস্নেহে এবং অত্যধিক স্নেহে সন্তানের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না। মাতৃস্নেহে আধিক্যে সন্তানের অন্তরের শক্তির স্বাভাবিক বিকাশ ব্যহত হয়। ফলে সে দুর্বল এবং পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষতির সম্মুখীন হয়।


১১৮

মাতৃভাষার উন্নতি ছাড়া এ জগতে কোন জাতি বড় হইয়াছে? সারা দেশটিকে মূর্খ রাখিয়া দুই-চারজন লন্ডনে উচ্চজ্ঞানের সাথে পরিচিত হইতে পারিলে কি লাভ হইল ? তেমাার জ্ঞান, তোমার চিন্তা, যতদিন না তোমাকে প্রত্যেক দেশবাসীর আত্মাকে যাইয়া আঘাত করিতেছে, ততদিন তোমার উচ্চ জীবনের কোনো সার্থকতা নাই। তোমার জ্ঞান-ভান্ডারর মূল্য এক পয়সা নয়। জাতিকে উচ্চ রকমের জ্ঞান দান করো- তার চিত্ত মহৎ ও সুখী হইয়া উঠিবে। উহা কি দুই-একটা বিদেশী ভাষার স্কুল-কলেজে সম্ভব? সাহিত্যের ভিতর দিয়া জাতির হৃদয়ে আগুন জ্বালাইয়া দাও। সে জীবনের সার্থকতা অনুভব করিতে সমর্থ হইক।

সারাংশ : মাতৃভাষার উন্নতি ব্যতীত জাতির উন্নতি সম্ভব নয়। একটি দেশের গুটিকয়েক লোক বিদেশি ভাষায় উচ্চশিক্ষা লাভ করলেই গোটা জাতির উন্নতি হয় না। জাতির উন্নতির জন্য মাতৃভাষায় সাহিত্য চর্চা, যার মধ্যদিয়ে সমগ্র জাতি জ্ঞানবান হয়ে ওঠবে।


১১৯

মিথ্যাকে মিথ্যা বলিলে, অত্যাচারীকে অত্যাচারী বলিলে যদি নির্যাতন ভোগ করিতে হয়, তাহাতে তোমার আসল নির্যাতন ঐ অন্তরের যন্ত্রণা ভোগ করিতে হইবে না। প্রাণের আত্মপ্রসাদ যখন বিপুল হইয়া ওঠে তখন নির্যাতনের আগুন ঐ আনন্দের এক ফুঁতে নিভিয়া যায়। ইব্রাহীম যখন বিদ্রোহী হইয়া নমরুদ্রের অত্যাচারকে অত্যাচার এবং তাহার মিথ্যাকে মিথ্যা বলিয়া প্রচার করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন, নমরুদ তাহাকে ধরিয়া এক বিরাট অগ্নি জাহান্নামে নিক্ষেপ করিল। কিন্তু ইব্রাহীমের সত্যের জোর ছিল বলিয়া তাহার আত্মপ্রসাদের ঐ বিপুল আনন্দের এক ফূঁতে সমস্ত জাহান্নাম ফুল হইয়া হাসিয়া উঠিল। তাঁহার মনে যদি এতটুকু ফাঁকি থাকিত তবে তখনই নমরুদের আগুন তাহাকে ভস্মীভূত করিয়া দিত।

সারাংশ : অসত্য আর অত্যাচার রুখে দাঁড়াতে গিয়ে নির্যাতিত মানুষ প্রকৃতপক্ষে আত্মিক শক্তির দুয়ারে উপনীত হয়। প্রতিবাদ করার প্রবল আত্মসুখের জোয়ারে নমরুদের আগুন ইব্রাহিমের কাছে ফুলের বাগানে পরিণত হয়েছে। কপটতা কখনোই অগ্নিকুন্ড বসে স্বর্গীয় সুখ লাভ করে না।


১২০

মুখে অনেকেই টাকা তুচ্ছ, অর্থ অনর্থের মূল বলিয়া থাকেন। কিন্তু জগৎ এমন ভয়ানক স্থান যে টাকা না থাকিলে তাহার স্থান কোথাও নাই। সমাজে নাই, স্বজাতির নিকট নাই, ভ্রাতা-ভগিনীর নিকটে নাই, স্ত্রীর নিকটে নাই। স্ত্রীর ন্যায় ভালোবাসে এমন বলতে জগতে আর কে আছে? টাকা না থাকিলে অমন অকৃত্রিম ভালোবাসারও আশা নাই। কাহারও নিকট সম্মান নাই। টাকা না থাকিলে রাজায় চিনে না, সাধারণে মান্য করে না, বিপদে জ্ঞান থাকে না। জন্মমাত্র টাকা, জীবনে টাকা, জীবনান্তে টাকা, জগতে টাকারই খেলা।

সারাংশ : অর্থকে অনর্থের মূল বলা হলেও মূলত এটি অত্যন্ত মূল্যবান। অর্থ বিত্তহীন মানুষকে তার পরিবার থেকে শুরু করে সর্বত্রই অসম্মানের চোখে দেখা হয়। মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাই অর্থই প্রধান অবলম্বন।


১২১

মৃত্যুর হাত হইতে বাঁচিবার উপায় জগতের একটি প্রাণীরও নাই। সুতরাং এই অবধারিত সত্যকে সানন্দে স্বীকার করিয়া নিয়াও মৃত্যুকে জয় করিবার জন্যে একটি বিশেষ কৌশল আয়ত্ত করিতে হইবে। তাহা হইতেছে অতীতের পূর্বপুরুষদের সাধনাকে নিজের জীবনে এমনভাবে রূপবন্ত করা যেন ইহার ফলে তোমার বা আমার মৃত্যুর পরেও সেই সাধনার শুভফল তোমার পুত্রাদিক্রমে বা আমার শিষ্যদিক্রমে জগতের মধ্যে ক্রমবিস্তারিত হইতে পারে। মৃত্যু তোমার দেহকেই মাত্র ধ্বংস করিতে পারিল, তোমার আরদ্ধ সাধনার ক্রমবিকাশকে অবরুদ্ধ করিতে পারিল না, এইখানেই মহাবিক্রান্ত মৃত্যুর আসল পরাজয়।

সারাংশ : মৃত্যুকে এড়ানো সম্ভব না হলেও মানুষ মৃত্যুকে জয় করে পৃথিবীতে অমরত্ব লাভ করতে পারে। পূর্ব-পুরুষদের মহৎ কীর্তির অনুসরণে নিজ কীর্তিকে পৃথিবীতে রেখে যেতে পারলে অমরত্ব লাভ করা সম্ভব। কারণ মৃত্যু কেবল দেহকে ধ্বংস করে, মহৎ কীর্তিকে নয়।


১২২

যতটুকু আবশ্যক কেবল তাহার মধ্যে কারারুদ্ধ হইয়া থাকা মানবজীবনের ধর্ম নহে। আমরা কিয়ৎ পরিমাণে স্বাধীন। আমাদের দেহ সাড়ে তিন হাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ; কিন্তু তাই বলিয়া সেই সাড়ে তিন হাত পরিমাণ গৃহনির্মাণ করিলে চলে না। স্বাধীনভাবে চলাফেরার জন্যে অনেকখানি স্থান রাখা আবশ্যক, নতুবা আমাদের স্বাস্থ্য এবং আনন্দের ব্যাঘাত হয়। শিক্ষা সন্বন্ধেও সেই কথা খাটে; অর্থাৎ কেবল যতটুকু শিক্ষা অত্যাবশ্যক তাহারই মধ্যে শিশুদিগকে একান্ত নিবদ্ধ রাখিলে কখনোই তাহার মন যথেষ্ট পরিমাণে বাড়িতে পারে না।

সারাংশ : একটি নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকলে মানবহৃদয়ের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে না। মানবহৃদয়ের পরিপূর্ণ বিকাশে প্রয়োজন স্বাধীনতা। শিক্ষার ক্ষেত্রেও তাই। শিক্ষার্থীর মানসিক উন্নতির জন্যে পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি স্বাধীন পাঠের সুযোগ থাকা অপরিহার্য।


১২৩

যত বড় কঠিন কাজই হোক না কেন, অনুকূল পরিবেশে ও উপযুক্ত সময়ে তাহা করিবার জন্য অগ্রসর হইলে সেই কঠিন কাজই অতি সহজে সম্পাদিত হয়। কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশে ও অনুপযুক্ত সময়ে তাহা শত চেষ্টাতেও সম্পন্ন করা যায় না। বিজ্ঞান জগতে স্বীকৃত এ সত্যটি মনোজগতেও সমভাবে প্রকটিত। মানুষের মন জিনিসটি বড়ই রহস্যময়, সন্দেহ নাই। বাহির হইতে শক্তি প্রয়োগ করিয়া এ মনকে আয়ত্তের মধ্যে আনা যায় না। মনেরও আছে গতি এবং সেই গতিও বহু বিচিত্ররূপে প্রসারিত। ইহা না বুঝিয়া যত শক্তিই প্রয়োগ করা যাক না কেন, কোন ফলই হয় না। ভয় দেখাইয়া বা প্রলুব্ধ করিয়া যে মানব মনকে আকর্ষণ করা যায় না, তাহাকেই হয়তো বা আকর্ষণ করা যায় সহৃদয় অন্তরের দরদ ভরা স্পর্শ লাগাইয়া। সদম্ভ শক্তি প্রাচুর্যের দ্বারা মানব চিত্ত জয় করা যায় না, মানব সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা, স্থির বুদ্ধি ও বিবেচনা শক্তিকে লইয়া আগুয়ান হইলে দৃঢ়সংকল্প মানব মনকে বশীভূত করা যায়।

সারাংশ : রহস্যময় মানুষের মন, এই মনের গতিবিধিও রহস্যময়, মনকে আয়ত্ত করতে শক্তি যেখানে পরাজিত বুদ্ধি সেখানে সর্বদাই জয়ী। মনকে জয় করার শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার তাই সময়ের সাথে স্থির বুদ্ধির প্রয়োগ।


১২৪

যথাসময়ে বে-আইনী বাড়ি দখলের ব্যাপারটা তদারক করবার জন্যে পুলিশ আসে। সেটা স্বাভাবিক্ দেশময় একটা ঘোর পরিবর্তনের আলোড়ন বটে, কিন্তু কোথাও যে রীতিমতো মগের মুল্লুক পড়েছে তা নয়। পুলিশ দেখে তারা ভাবে, পলাতক গৃহকর্তা কি বাড়ি উদ্ধারের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছে? তবে সে কথা বিশ্বাস হয় না। দু-দিনের মধ্যে বাড়িটা খালি করে দিয়ে যে দেশ থেকে উধাও হয়ে গেছে বর্তমানে তার অন্যান্য গভীর সমস্যার কথা ভাববার আছে।

সারাংশ : যারা মহৎ তারা নিজ স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন না। নিজ স্বার্থকে তুচ্ছ করে দেশ ও জাতির বৃহৎ ভাবনায় তারা সর্বদা ব্যাপৃত থাকেন।


১২৫

যাকে বলা হয় গোপন ও নীরব সাধনা তা বৃক্ষেই অভিব্যক্ত, নদীতে নয়। তাছাড়া বৃক্ষের সার্থকতার ছবি যত সহজে উপলব্ধি করতে পারি, নদীর সার্থকতার ছবি তত সহজে উপলব্ধি করা যায় না। নদী সাগরে পতিত হয় সত্য, কিন্তু তার ছবি আমরা প্রত্যহ দেখতে পাই না। বৃক্ষের ফুল ফোটানো ও ফল ধরানোর ছবি কিন্তু প্রত্যহ চোখে পড়ে। দোরের কাছে দাঁড়িয়ে থেকে সে অনবরত নতি, শান্তি ও সেবার বাণী প্রচার করে।

সারাংশ : নদী ও বৃক্ষ অভিন্ন সৌন্দর্য্য হলেও প্রকৃতির মঞ্চে নিজেদের উপস্থাপন করে ভিন্নভাবে। বৃক্ষ তার সব রহস্য দৃশ্যমান রেখে আমাদের দুয়ারে শান্তির স্তম্ভ হয়ে আছে অনুক্ষণ। কিন্তু নদীর সব রহস্য প্রতিনিয়ত আমাদের চোখে ধরা পড়ে না।


১২৬

যাহারা স্বয়ং চেষ্টা করেন আল্লাহ তাহাদের সহায় হন। পৃথিবীতে যাহারা বড় লোক হইয়াছেন তাহাদের প্রত্যেকের জীবনী পাঠ করিলে আমরা এই শিক্ষাই পাইয়া থাকি। বিদ্যাই হউক আর ধনই হউক পরিশ্রম না করিলে কেহ তাহা লাভ করিতে পারে না। এক রাজপুত এক পন্ডিতকে বলিয়াছেন, ‘মহাশয় ! সাধারণ লোক পরিশ্রম করিয়া বিদ্যা লাভ করিয়া থাকে। আমি রাজপুত্র, পরিশ্রমে অভ্যস্ত নহি। আমার জন্য কি বিদ্যা অর্জনের কোনো সহজ পথ করিয়া দিতে পারেন না?’ পন্ডিত বলিলেন, ‘রাজার বা রাজপুত্রের জন্য বিদ্যা-শিক্ষার স্বতন্ত্র উপায় নাই।’ অনেক বালকই আছে যাহারা শিক্ষক মহোদয়ের সাহায্যের ওপর নির্ভর করিয়া থাকে। অভিধান খুলিয়া কষ্ট স্বীকার না করিয়া অর্থ-পুস্তকের সাহায্য গ্রহণ করে-এইরূপ লোক কখনও জগতে উন্নতি লাভ করিতে পারে না।

সারাংশ : পরিশ্রম ব্যতীত সার্থকতা লাভ করা যায় না। সৃষ্টিকর্তা পরিশ্রমী মানুষকেই সাহায্য করেন। জ্ঞানার্জন করতে হলেও পরিশ্রম করতে হয়। সাধারণ মানুষ থেকে রাজা, মহারাজা সকলের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য।


১২৭

যাহারা মুখ্যভাবে ঠকাইয়া স্বার্থসিদ্ধ করিতে যায় আমরা তাহাদিগকে শীঘ্রই চিনিয়া ফেলি এবং ‘শঠ’, ‘তস্কর’, ‘অত্যাচারী’ ইত্যাদি নিন্দিত বিশেষণের কলংকে চিহ্নিত করিয়া জগতকে সতর্ক করি; কিন্তু যাহারা গৌনভাবে ঠকাইয়া কার্যোদ্ধার করেন তাহাদের বাহ্য উজ্জ্বলতায় মুগ্ধ হইয়া আমরা তাহাদিগকে ‘উদ্যোগী’, ‘কৃতী’, ‘যশস্বী’ আদি প্রশংসিত আখ্যায় বিভুষিত করি। কেহ সোনা বলিয়া পিতল বিক্রয় করিলে তাহাকে শঠ বলি, কিন্তু যখন কেহ সোনাই উচিত মূল্য অপেক্ষা অধিক টাকায় বিক্রয় করিয়া বড়লোক হয়, আমরা তাহাকে কৃতী পুরুষ বলি।

সারাংশ : যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে মানুষকে ঠকিয়ে নিজস্বার্থ উদ্ধার করে আমরা নানাভাবে তার নিন্দা করে থাকি। কিন্তু যে গোপনে মানুষকে ঠকিয়ে ধন এবং খ্যাতি লাভ করে তার নিন্দা তো করিই না, উল্টো তার প্রশংসা করি।


১২৮

যাহা জ্ঞানের কথা তাহা প্রচার হইয়া গেলেই তাহার উদ্দেশ্য সফল হইয়া শেষ হইয়া যায়। মানুষের জ্ঞান সন্বন্ধে নতুন আবিষ্কারের দ্বারা পুরাতন আবিষ্কার আচ্ছন্ন হইয়া যাইতেছে। কাল যাহা পন্ডিতের অগম্য ছিল, আজ তাহা অর্বাচীন বালকের কাছেও নূতন নহে। যে সত্য নূতন বেশে বিপ্লব আনয়ন করে, সেই সত্য পুরাতন বেশে বিস্ময়মাত্র উদ্রেক করে না। আজ যে সকল তত্ত্ব মূঢ়ের নিকট পরিচিত, কোনোকালে যে তাহা পন্ডিতের নিকটও বিস্তর বাধাপ্রাপ্ত হইয়াছিল, ইহাই লোকের কাছে আশ্চর্য বলিয়া মনে হয়। কিন্ত হৃদয়ভাবের কথা প্রচারের দ্বারা পুরাতন হয় না। জ্ঞানের কথা একবার জানিলে আর জানিতে ইচ্ছা হয় না; আগুন গরম, সূর্য গোল, জল তরল ইহা একবার জানিলেই চুকিয়া যায়; দ্বিতীয়বার কেহ যদি তাহা আমাদের নূতন শিক্ষার মতো জানাইতে আসে তবে ধৈর্য রক্ষা করা কঠিন হয়। কিন্তু ভাবের কথা বারবার অনুভব করিয়া শান্তিবোধ হয় না-সূর্য যে পূর্বদিকে ওঠে, একথা আর আমাদের মন আকর্ষণ করে না কিন্তু সূর্যোদয়ের যে সৌন্দর্য ও আনন্দ তাহা জীবনসৃষ্টির পর হইতে আজ পর্যন্ত আমাদের কাছে অম্লান আছে। এমনকী অনুভূতি যত প্রাচীনকাল হইতে যত লোক পরম্পরার ওপর দিয়া প্রবাহিত হইয়া আসে, ততই তাহার গভীরতা বৃদ্ধি হয়ততই তাহা আমাদিগকে সহজে আবিষ্ট করিতে পারে।

সারাংশ : জ্ঞানের কথা একবার জানার পর তার প্রতি আর মানুষের আগ্রহ থাকে না। কিন্তু হৃদয়ভাবের কথা মানুষকে শ্রান্ত করে না, মানুষ কখনো তার প্রতি আগ্রহ হারায় না। জ্ঞান পুরাতন হয়ে গেলেও ভাব থাকে চির নতুন। ভাবের সৌন্দর্য ও আনন্দের অনুভূতি যত পুরাতন হয় ততোই তার গভীরতা বৃদ্ধি পায়, ততোই তা মানুষকে আবিষ্ট করে।


১২৯

যে মনে উচ্চ আকাক্সক্ষা, উচ্চ আদর্শ নাই, সে মনে তেজও নাই। যে গাছে রোদ বৃষ্টি লাগে না, তাহা আরামে থাকতে পারে বটে, কিন্তু সে আরামে কেবল দুর্বলতা বাড়িয়া যায়। আমাদের জাতির মনে পার্থিব কোনো প্রকার উচ্চ আকাক্সক্ষা, রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতির কোনো প্রবাহ নাই। এজন্যে আমাদের উচ্চশিক্ষিত লোকদিগের মধ্যেও তেমন বিশেষ তেজ, সাহস বা প্রতিভা দেখা যায় না। আমাদিগকে প্রাণপণ চেষ্টায় আমাদের বালক-বালিকাদের মনে স্বজাতির শ্রেষ্ঠত্বলাভের শক্তিতে বিশ্বাসী এবং অন্যদিকে জাতির উন্নতির চরম ও পরম লক্ষ্যে মাতোয়ারা করিতে হইবে। আমাদের সন্তানদের মনে একবার আত্মবিশ্বাস জাগাইয়া তুলিতে পারিলেই তাহারা তাহাদের গন্তব্যপথ তাহা যতই বিঘ্ন বহুল ও বিপদসংকুল হউক না কেন, যতই দুর্গম ও দুরারোহ হউক না কেন- তাহা ধরিয়াই তাহারা প্রতিষ্ঠার স্বর্ণশিখরে উপস্থিত হইবে।

সারাংশ : উচ্চাকাঙ্খা ও উচ্চ আদর্শের অভাবে জাতি মনের দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে। আর এ কারণেই উচ্চশিক্ষিতের মধ্যেও সাহস বা প্রতিভা লক্ষ্য করা যায় না। শিশুদের যদি স্বজাতির শ্রেষ্ঠত্বের শক্তিতে আত্মবিশ্বাসী করে তোলা যায় এবং আপন লক্ষ্যে স্থির রাখা যায় তবে তারা সাফল্যের স্বর্ণশিখরে আরোহন করবেই।


১৩০

যে-সকল জিনিস অন্যের হৃদয়ে সঞ্ছারিত হইবার জন্য প্রতিভাশালী হৃদয়ের কাছে সুর, রং, ইঙ্গিত প্রার্থনা করে, যাহা আমাদের হৃদয়ের দ্বারা সৃষ্ট না হইয়া উঠিলে অন্য হৃদযের মধ্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে পারে না; তাহাই সাহিত্যের সামগ্রী। তাহা আকারে প্রকারে, ভাবে-ভাষায়, সুরে-ছন্দে মিলিয়া তবেই বাঁচিতে পারে। তাহা মানুষের একান্ত আপনার; তাহা আবিষ্কার নহে, অনুকরণ নহে, তাহা সৃষ্টি। সুতরাং তাহা একবার প্রকাশিত হইয়া উঠিলে তাহা রূপান্তর, অবস্থান্তর করা চলে না। তাহার প্রত্যেক অংশের ওপর তাহার সমগ্রতা একান্তভাবে নির্ভর করে। যেখানে তাহার ব্যত্যয় দেখা যায়, সেখানে সাহিত্য - অংশে তাহা হেয়।

সারাংশ : সাহিত্যের সাথে মানবহৃদয়ের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ট। যে সাহিত্য হৃদয় দ্বারা সৃষ্ট সে সাহিত্যই হৃদয়ে স্থান লাভ করে। অপরের অনুকরণে নয়, আপন হৃদয়ের ভাব, ভাষা, সুর ও ছন্দের সাথে মিশে সাহিত্য জন্ম লাভ করে। আর এ সাহিত্যই হয় অমর, অক্ষয়।


১৩১

যে আদিম মনুষ্য হিংস্র পশুর ন্যায় ক্ষুধার জ্বালায় মহারণ্যে বিচরণ করিয়া মৃগ বধপূর্বক মধ্যাহ্নে বৃক্ষমূলে কাঁচা মাংস চিবাইয়া খাইত, সেই মনুষ্যই যেদিন অপরাহ্নের অস্তাচলগামী মৃদু মধুর বর্ণচ্ছাটায় বিমুগ্ধ হইয়া কি জানি কি ভাবিয়া, একটি পবনান্দোলিত বিলম্বিত লতা হইতে সবুজ জ্যোতিপুষ্প ছিঁড়িয়া মাথার চুলে গুঁজিল, সেই দিনই তাহার বিশাল ইতিহাসের সূত্রপাত হইল। সেইদিন জানা গেল যে, মহারণ্যবাসী সিংহ, ব্যাঘ্র চিরকাল মহারণ্যেই বাস করিবে; কিন্তু তাহাদের আদিম সহচর মনুষ্য মহারণ্য বিনষ্ট করিয়া মহাসম্পদের সৃষ্টি করিবে। সেদিন জানা গেল যে সিংহ ব্যাঘ্রের কেবল পৃথিবী আছে, কিন্তু মনুষ্যের পৃথিবী ও স্বর্গ দুই-ই আছে। সেই হইতে মানুষের অনন্ত শিক্ষার, আনন্ত উন্নতির সূত্রপাত হইল।

সারাংশ : মানুষ প্রাণী হলেও অন্য প্রাণী থেকে সে পৃথক। মানুষের মধ্যে আছে সৌন্দর্যবোধ। এই সৌন্দর্যবোধ যেদিন মানুষের মধ্যে জাগ্রত হয়েছে সেদিন থেকে অন্য প্রাণীর সাথে তার পার্থক্য রচিত হয়েছে। মানুষের শিক্ষা এবং উন্নতির মূলসূত্রও এই সৌন্দর্যবোধ।


১৩২

যে জাতির লক্ষ্য ‘সত্য’ নহে সে জাতির কোন সাধনাই সফল হবে না। ‘সত্যবর্জিত’ জাতির জীবন অন্ধকার। জাতির উন্নতির জন্য তারা বৃথাই শরীরের রক্তপাত করে, সত্যই শক্তি। এ সকল কল্যাণের মূল। এতে মানুষের সর্বপ্রকার দুঃখের মীমাংসা হয়। সত্যকে ত্যাগ করে কোন জাতি কোন দিন বড় হয়নি, হবে না। মানব জীবনের লক্ষ্যই সত্য। এটাই শান্তির ও ঐক্যের পথ। সত্যের অভাব বিরোধ ও দুঃখ সৃষ্টি করে। মানুষে মানুষে, বন্ধুতে বন্ধুতে, আত্মীয়ে আত্মীয়ে পরস্পর মতান্তর উপস্থিত হয়। সত্য বর্জন করে তোমরা কোন কাজ করতে যেও না এর ফল পরাজয়।

সারাংশ : ‘সত্য’ জাতীয় জীবনের মূলমন্ত্র। জাতীয় জীবনে সত্যকে পরিহার করে উন্নয়ন সম্ভব নয়। শান্তি ও ঐক্য অর্জিত হয় এর মাধ্যমে। সত্যের পথ পরিহার জাতীয় জীবনে ডেকে আনে অকল্যাণ, অন্ধকার। সত্যই তাই জীবনের ব্রত হওয়া উচিত।


১৩৩

যে জাতি চেষ্টা দ্বারা, বুদ্ধি ও শ্রম দ্বারা কিছু উপার্জন করিতে সক্ষম না হয়, সে জাতি পৃথিবীতে টিকিয়া থাকিতে পারে না। শুধুমাত্র অনুকরণ দ্বারা স্থায়ী বস্তু লাভ করা যায় না। জ্ঞানের অনুশীলন, ধৈর্য্য, সততা ও পরিশ্রম ব্যতিরেকে কোনো কিছুই লাভ করা সম্ভব নয়। ছাত্রসমাজকে এই ব্যাপারে মনোযোগী হইতে হইবে। তাহারাই দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক ও জাতির মেরুদ-। তাহারাই দেশের আশা ভরসা ও মানবসভ্যতার অগ্রগতির সহিত বিশেষভাবে জড়িত। তাই প্রত্যেকটি ছাত্র-ছাত্রীকে পরিশ্রমী, মনোযোগী, কর্মঠ ও অধ্যবসায়ী হইয়া গড়িয়া উঠিতে হইবে। তাহা না হইলে জাতির জীবনের দুর্দিন ঘনাইয়া আসিবে সন্দেহ নাই।

সারাংশ : বুদ্ধি, শ্রম, প্রচেষ্টা, ধৈর্য এবং সততার মাধ্যমেই কোনো জাতির পক্ষে উন্নতি ও স্থায়িত্ব লাভ করা সম্ভব, অনুকরণের মাধ্যমে নয়। ছাত্ররাই দেশের ভবিষ্যৎ এবং দেশ ও জাতির মেরুদ-। তাই জাতির উন্নতির জন্য তাদের পরিশ্রমী, মনযোগী, কর্মঠ এবং আত্মবিশ্বাসী হয়ে গড়ে উঠতে হবে।


১৩৪

যে মরিতে জানে, সুখের অধিকার তাহারই। যে জয় করে, ভোগ করা তাহাকেই সাজে। যে লোক জীবনের সঙ্গে সুখকে, বিলাসকে দুই হাতে আঁকড়াইয়া থাকে, সুখ তাহার সেই ঘৃণিত ক্রীতাদাসের কাছে নিজের সমস্ত ভান্ডার খুলিয়া দেয় না। তাহাতে উচ্ছিষ্টমাত্র দিয়া দ্বারে ফেলিয়া রাখে। আর মৃত্যুর আহ্বান মাত্র যাহারা তুড়ি মারিয়া চলিয়া যায়, চির-অদৃত সুখের দিকে একবার পিছন ফিরিয়া তাকায় না, সুখ তাহাদিগকে চায়। সুখ তাহারাই জানে। যাহারা সবলে ত্যাগ করিতে পারে, তাহারাই প্রবলভাবে ভোগ করিতে পারে।

সারাংশ : জীবনে সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম ও মৃত্যুভয়মুক্ত হওয়ার মধ্যে যে সুখ ও তৃপ্তি রয়েছে তা বিলাসিতার মধ্যে নেই। মানসিক প্রশান্তিই প্রকৃত সুখ যা ভোগে নয় ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে আত্মতৃপ্ত হওয়ার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।


১৩৫

যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই, সেখানে জীবনের বিকাশ নেই, উল্লাস নেই, প্রেরণা নেই, নেই কোন প্রয়াস। জীবনের জাগরণের জন্য চাই দ্বন্দ্ব, চাই সংঘাত। আর দ্বন্দ্ব-সংঘাতে যারা ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রের চোখে পাপী-অপরাধী, আসামী, পরিণামে জয়ী তারাই। এমনি নতুন চিন্তা আঘাতেই জাগে, তাই এ চিন্তা আঘাতেরই সন্তান। এ অর্থে সে যে পরশ, সেই তো পুরস্কার। দুর্ব্বা ক্ষুদ্র ও কোমল। পায়ে দলিত হওয়াই তার নিয়তি। তবুও সে অমর ও চিন্ময়- সবুজ ও প্রাণময়, তেমনি মানবতাবাদী মনীষীরা সংখ্যায় নগণ্য, বাহুবলে তুচ্ছ, নির্যাতনই তাদের ললাট লিপি।তবুও তারাই মানব ভাগ্যের নিয়ন্তা। তারা ভাঙেন কিন্তু মচকান না। নিজে মরেন কিন্তু দিয়ে যান হায়াত। চিন্তাবিদ বাহ্যত একক ব্যক্তি, কিন্তু আসলে রক্তজীব। দুর্ব্বার মতো চিন্তা ও চিন্তাবিদদের ধ্বংস নেই। সে মরে, মরেই বাঁচে।

সারাংশ : চিন্তার ভিতর দিয়ে বিকশিত জীবনের ধ্বংস নেই। মানব সভ্যতার বাতিঘর হয়ে তাই যুগ যুগ ধরে আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন চিন্তাবিদ, জ্ঞানী মনীষীরা। সংখ্যায় অতি ক্ষুদ্র এই মহৎ প্রাণ মানুষগণ সমস্ত জাতির পথ প্রদর্শক। তাদের চিন্তার খোরাক জাগে সংঘাত আর দ্বন্দ্ব থেকে।


১৩৬

যুগে যুগে আদর্শবাদীরাই জগৎকে আনন্দে, শান্তিতে, সাম্যে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যাহারা বৃহৎ-এর চিন্তা করেন, তাহারা পৃথিবীতে বৃহৎ কল্যাণ আনয়ন করেন। ক্ষুদ্রত্বের বন্ধনে বাঁধা থাকিলে জীবন, যৌবন ও কর্মের শক্তি ক্ষুদ্র হইয়া যায়। পুকুরের পানি গ্রামের কল্যাণ করে, কিন্তু সংক্রামক রোগের একটি জীবাণু পড়িলেই সে পানি দূষিত ও অপেয় হইয়া যায়। কেননা পুকুরের পানির চারিধারে বন্ধনতার বিস্তৃতি নাই, গতি নাই, প্রবাহ নাই। নদীর পানিরও চারিধারে বন্ধন, একধারে পাহাড়, একধারে সমুদ্র, দুইধারে কূল। কিন্তু তার বিস্তৃতি আছে, তাই গতি ও প্রবাহ নিত্য সাথী। এই প্রবাহের জন্যই নদীর পানিতে নিত্য শত রোগের জীবাণু পড়িলেও তাহা অশুদ্ধ হয় না, অব্যবহার্য হয় না। তাই নদী পুকুরের চেয়ে দেশের বৃহৎ কল্যাণ করে। নদীর নিত্য তৃষ্ণা সমুদ্রের দিকে, অসীমের দিকে। অসীম সমুদ্রকে পাইয়াও সে সীমাবদ্ধ দেশকে স্বীকার করে, তার বক্ষচ্যুত হয় না। আমাদের আদর্শ পরম পুণ্যের, পরম নিত্যের। কিছুতেই আমরা কর্মচ্যুত হইব না, বৃহৎ কর্ম করিব।

সারাংশ : আদর্শ মানুষরাই পৃথিবীকে শান্তির সবুজ ছায়ায় ঢেকে দিয়েছেন। যারা বৃহৎ কল্যাণ সাধন করেন তারা কেউই ক্ষুদ্র মানসিকতার অধিকারী নন। পুকুর মানুষের ক্ষুদ্র প্রয়োজন মেটায় কিন্তু বৃহৎ প্রয়োজন মেটাতে দরকার নদীর মত প্রবাহমান, বিশুদ্ধ স্রোত। কেননা ক্ষুদ্র গন্ডির মধ্যে কখনোই বৃহৎ কর্ম সম্পাদন হয় না।


১৩৭

রাজার ছেলের সঙ্গে দরিদ্রের ছেলেরও খেলায় যোগ দেবার অধিকার আছে। আমরা যদি একবার সাহস করে কেবলমাত্র খেলা করবার জন্যে সাহিত্যজগতে প্রবেশ করি, তাহলে নির্বিবাদে সে জগতের রাজ-রাজড়ার দলে মিশে যাই। কোনোরূপ উচ্চ আশা নিয়ে সেক্ষেত্রে উপস্থিত হলেই নিম্নশ্রেণিতে পড়ে যেতে হয়।

সারাংশ : সাহিত্য জগতে প্রবেশের অধিকার সকলের সমান। আনন্দদানের উদ্দেশ্যেই সাহিত্য রচিত হওয়া উচিত। কিন্তু যে সাহিত্য খ্যাতি বা মহত্ব লাভের উদ্দেশ্যে রচিত হয় সে সাহিত্য নিম্ন শ্রেণিতে পতিত হয়।


১৩৮

রূপলোকে ও রসলোকে আমাদের উন্নীত করতে পারে শিক্ষা। তাই শিক্ষা একটি উদ্দেশ্য এবং সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য মনের চোখ ও রসনা সৃষ্টি করা। যেখানে তা হয়নি সেখানে শিক্ষা ব্যর্থ। মনুষ্যত্বের সাধনা জীবনে লঘুভার হওয়ার সাধনা, আর প্রেম, সৌন্দর্য ও আনন্দের তাগিদে আমরা লঘুভার হতে পারি। শিক্ষা আমাদের এই প্রেম-সৌন্দর্য ও আনন্দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে মনুষ্যত্বের সাধনায় তথা জীবনে লঘুভার হওয়ার সাধনায় সহায়তা করে। ক্ষুৎপিপাসায় কাতর রূপ ও রসের জন্যে কল্যাণ, কল্যাণের জন্যে রূপ ও রস নয় এই বোধ থাকে না বলে শিল্প-সাহিত্যের এত অপব্যবহার ঘটে। শিক্ষার কাজ সেই মানুষটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া।

সারাংশ : শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মনের চোখকে উন্মোচিত করা, প্রেম সৌন্দর্য ও আনন্দবোধ সৃষ্টি করা এবং মনুষ্যত্ববোধকে জাগ্রত করা। এ উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হলে শিক্ষা সার্থকতা লাভ করতে পারে না।


১৩৯

রূপার চামচ মুখে নিয়ে জন্মায় আর কটি লোক। শতকরা নিরানব্বইটি মানুষকেই চেষ্টা করতে হয়, জয় করে জিততে হয় তার ভাগ্যকে। বাঁচে সেই যে লড়াই করে প্রতিকূলতার সঙ্গে। পলাতকের স্থান জগতে নেই। সমস্ত কিছুর জন্যেই চেষ্টা দরকার। চেষ্টা ছাড়া বাঁচা অসম্ভব। সুখ চেষ্টারই ফল-দেবতার দান নয়। তা জয় করে নিতে হয়। আপনা আপনি এটা পাওয়া যায় না। সুখের জন্যে দু রকম চেষ্টা দরকার, বাইরের আর ভিতরের। ভিতরের চেষ্টার মধ্যে বৈরাগ্য একটি। বৈরাগ্যও চেষ্টার ফল, তা অমনি পাওয়া যায় না। কিন্তু বাইরের চেষ্টার মধ্যে বৈরাগ্যের স্থান নেই।

সারাংশ : খুব কম সংখ্যক মানুষই সৌভাগ্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। অধিকাংশ মানুষকেই বাহিরের ও অন্তরের বৈরাগ্যময় চেষ্টার দ্বারা সকল প্রতিকূলতাকে জয় করে সুখ এবং সৌভাগ্য অর্জন করতে হয়। প্রতিকূলতা আবার বৈরাগ্য ও চেষ্টার ফল, তবে বাহিরের চেষ্টার মধ্যে বৈরাগ্য নেই।


১৪০

শ্রমকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করো। কালি-ধুলার মাঝে রৌদ্র-বৃষ্টিতে কাজের ডাকে নেমে যাও। বাবু হয়ে ছায়ায় পাখার তলে থাকবার দরকার নেই। এ হচ্ছে মৃত্যুর আয়োজন। কাজের ভিতর কুবুদ্ধি, কুমতলব মন-চিত্তে বাসা বাঁধতে পারে না। কাজে শরীরে সামর্থ্য জন্মে ; স্বাস্থ্য, শক্তি, আনন্দ, স্ফুর্তি সকলই লাভ হয়। পরিশ্রমের পর যে অবকাশ লাভ হয়, তা পরম আনন্দের অবকাশ। তখন কৃত্রিম আয়োজন করে আনন্দ করবার কোনো প্রয়োজন হয় না। শুধু চিন্তার দ্বারা জগতের হিত সাধন হয় না। মানবসমাজে মানুষের সঙ্গে কাজে, রাস্তায়, কারখানায় মানুষের সঙ্গে ব্যবহারে মানুষ নিজেকে পূর্ণ করে।

সারাংশ : কোনো কাজকেই ছোটো করে দেখা উচিত নয় অলসতা হৃদয়ের মৃত্যুকে ডেকে আনে। কাজের মাধ্যমে মানুষ শরীরিকভাবে সমর্থ হয় এবং আনন্দ লাভ করে। কাজের পরবর্তী যে অবসর তার আনন্দ অতুলনীয়। কাজের মাধ্যমে অন্যের সাথে সুব্যবহার করে মানুষ নিজেকে পূর্ণ করে।


১৪১

শিক্ষা একমুখী হওয়া কিছু নহে। উহা বহুমুখী হওয়া চাই। মানুষের মনকে যদি একটি পায়রার ঘরের সঙ্গে তুলনা করা যায়, তবে সর্বতোমুখী শিক্ষা উহার সকল দ্বার মুক্ত করিয়া রাখে। এই অসীম বিশ্ব-ব্রহ্মান্ড চক্ষু উন্মীলন করিলেই কৃত বিষয় দেখিতে পাওয়া যায়, তাহা হইলে অনেক জ্ঞান লাভ করা যায়। কিন্তু যাহার মনের সকল দ্বারগুলো খোলা নাই, যাহার মনোবৃত্তিসমূহ সম্যক পুষ্ট নহে, তাহার পক্ষে সমস্তই অন্ধকার। পরন্তু যাহার সেই দ্বারগুলো খোলা সে যে দিবানিশি জ্ঞান সঞ্চয় করিতে পারে তাহাই নহে, সে ইহার ব্যবহারও করিতে পারে।

সারাংশ : শিল্প, সাহিত্য আর সংস্কৃতি চর্চা জীবনকে অর্থপূর্ণ এবং সম্পূর্ণ করে তোলে। আবার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি আর সমাজ, প্রগতি একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং পরস্পরের পরিপূরক। তাই এদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সাহিত্যিক শিল্পীদের ভূমিকা জানতে হলে দুটি বিষয়কেই জানতে হবে।


১৪২

শিক্ষা কেউ কাউকে দিতে পারে না। সুশিক্ষত লোকমাত্রই স্বশিক্ষিত। আজকের বাজারে বিদ্যাদাতার অভাব নেই, এমনকি এক্ষেত্রে দাতাকর্ণেরও অভাব নেই এবং আমরা আমাদের ছেলেদের তাদের দ্বারস্থ করেই নিশ্চিন্ত থাকি। এ বিশ্বাসে যে, সেখান থেকে তারা এতটা বিদ্যার ধন লাভ করে ফিরে আসবে যার সুবাদে তারা বাকি জীবন আরামে কাটিয়ে দিতে পারে, কিন্তু এ বিশ্বাস নিতান্ত অমূলক। মনোরাজ্যের দান গ্রহণসাপেক্ষ, অথচ আমরা দাতার মুখ চেয়ে গ্রহীতার কথাটা একেবারে ভূলে যাই। এ সত্য ভূলে না গেলে আমরা বুঝতাম যে, শিক্ষক ছাত্রকে শিক্ষার পথ দেখিয়ে দিতে পারেন, তার কৌতুহল উদ্রেক করতে পারেন, তার বুদ্ধি-বৃত্তিকে জাগ্রত করতে পারেন, মনোরাজ্যেও ঐশ্বর্যের সন্ধান দিতে পারেন, তার জ্ঞান পিপাসাকে জ্বলন্ত করতে পারেন, এর বেশি আর কিছু পারেন না।

সারাংশ : জ্ঞানার্জনের প্রতি সুতীব্র ইচ্ছা থেকে মানুষ জ্ঞানী হয়ে উঠে। প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষক কখনোই কারো জ্ঞান পিপাসা জাগ্রত করতে পারে মাত্র। জ্ঞান অর্জনের আকাক্সক্ষা শুধু ব্যক্তির অন্তর দ্বারা উপলব্ধি হতে হয়, অন্যথায় শিক্ষা হয়ে পড়ে নাম সর্বস্ব।


১৪৩

শিল্প, সাহিত্য আর সংস্কৃতি চর্চা ছাড়া জীবন কখনও অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে না- কারণ ঐ ছাড়া জীবনের ধারণা আর উপলব্ধি থেকে যায় অসম্পূর্ণ ও অলব্ধ। জীবনকে স্রেফ যৌগিক নয় এ বোধ একমাত্র শিল্প-সাহিত্যই সঞ্চারিত করে দেয় আমাদের মনে। কাজেই সমাজ, প্রগতি আর শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরস্পরের সহযোগী ও একে অন্যের পরিপূরক। তবে এসবের যথাযথ ভূমিকা বোঝার জন্যে এর প্রত্যেকটা সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। তা না হলে এদের পারস্পরিক সম্বন্ধ যেমন বুঝতে পারা যাবে না তেমনি পারা যাবে না সাহিত্যিক শিল্পীদের যথার্থ ভূমিকা কী তাও।

সারাংশ : শিল্প, সাহিত্য আর সংস্কৃতি চর্চা জীবনকে অর্থপূর্ণ এবং সম্পূর্ণ করে তোলে। আবার এগুলো সমাজ ও প্রগতির সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং পরস্পরের পরিপূরক। তাই এদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সাহিত্যিক-শিল্পিদের ভূমিকা জানতে হলে দুটি বিষয়কেই ভালোভাবে বুঝতে হবে।


১৪৪

শুনিয়াছি নাকি বিলাত প্রভৃতি মেচ্ছ দেশে পুরুষদের মধ্যে একটা কুসংস্কার আছে-স্ত্রীলোক দুর্বল ও নিরুপায় বলিয়া তাহার গায়ে হাত তুলিতে নাই। এ আবার একটা কী কথা। সনাতন হিন্দু এ কুসংস্কার মানে না। আমরা বলি যাহারই গায়ে জোর নাই, তাহারই গায়ে হাত তুলিতে পারা যায়। তা সে নরনারী যাই হোক না কেন।

সারাংশ : পাশ্চাত্য দেশে নারী তার যথার্থ মর্যাদা পায়। কিন্তু আমাদের সমাজব্যবস্থায় সেটি খুব কমই দেখা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীকে নিগৃহীত, অপমানিত হতে হয়।


১৪৫

শ্রেষ্ঠ বলিয়া অহঙ্কার করিতে যে লজ্জাবোধ করে না, যে মানুষকে নি:স্বার্তে বসাইয়া রাখিতে আনন্দবোধ করে, দরিদ্র ও ছোটকে ছোট করিয়া রাখিতে কষ্ট অনুভব করে না, যে মানুষের শক্তি স্বাধীনতা হরণ করিতে ব্যস্ত, যে মানুষের হাত দিয়া নিজের পায়ের জুতা খুলাইয়া লয়, তোমরা তাহাদিগকে সালাম করিও না। সে সারারাত্রি এবাদত করুক, মানুষ তাহার পদধূলি লইয়া মাথায় মাখুক, সে প্রথম শ্রেণীর গাড়ি চড়–ক, সে রাজদরবারের সদস্য হউক, তোমরা তাহাকে আত্মীয় করিও না। তোমরা কি জান এ যুগের রাজা কাহারা? নরনারী মুক্তির আশায় করুণ নেত্রে তোমাদের দিকেই চাহিয়া আছে। পিষ্ট, কোটি মানবাত্মা তোমাদের আগমনের অপেক্ষা করিতেছে। যে দুর্বৃত্তের দল সত্যকে চূর্ণ করিয়া আল্লাহর বাণীকে অবমাননা করিতেছে তাহাদিগকে দেখিয়া আর তোমরা শ্রদ্ধার আসন ছাড়িয়া দাঁড়াইও না। মহানবীর জীবন ও চিন্তাকে যে অনুসরণ করে না, যে শুধু দরুদ (শান্তিবাদ) পাঠ করিয়াই প্রেমিক হইবার দাবি রাখে, সে মহানবীর কেহই নয়। ভ- বলিয়া তাহার গায়ে ধূলি নিক্ষেপ করিলে আমার মনে দুঃখ হইবে না।

সারাংশ : মানুষের মাঝে শ্রেষ্ঠ সে, যে অন্যকে সম্মান করতে জানে এবং অন্যের অধিকার হরণ করতে উদ্যত হয় না। সৃষ্টিকর্তাকে অমান্যকারী সমাজের যত বড় আসনে আসীন থাকুক সে সর্বদাই ঘৃণার পাত্র।


১৪৬

সকল প্রকার কায়িক শ্রম আমাদের দেশে অমর্যাদাকর বলিয়া বিবেচিত হইয়া আসিতেছে। শ্রম যে আত্মসম্মানের অনুমাত্রও হানিজনক নহে এবং মানুষের শক্তি, সম্মান ও উন্নতির ইহাই প্রকৃষ্ট ভিত্তি এ বোধ আমাদের মধ্যে এখনও জাগে নাই। জগতের অন্যত্র মানবসমাজ শ্রম সামর্থ্যরে ওপর নির্ভর করিয়া সৌভাগ্যের সোপানে উঠিতেছে, আর আমরা কায়িক শ্রমকে ঘৃণা করিয়া দিন দিন দুর্গতি ও হীনতায় ডুবিয়া যাইতেছি। যাহারা শ্রমবিমুখ বা পরিশ্রমে অসমর্থ, জীবনসংগ্রামে তাহাদের পরাজয় অনিবার্য। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগে অযোগ্যর পরিত্রাণ নাই। যাহারা যোগ্যতম, তাহাদেরই বাঁচিবার অধিকার এবং অযোগ্যর উচ্ছেদ অবশ্যম্ভাবী। সুতরাং পরিশ্রমের অমর্যাদা আত্মহত্যারই নামান্তর।

সারাংশ : পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ কায়িক শ্রমের ওপর ভিত্তি করে উন্নতির চরম শিখরে আরোহন করলেও আমাদের দেশে সকল প্রকার কায়িক শ্রমকে অমর্যাদাকর বলে বিবেচনা করা হয়। ফলে শ্রমবিমুখ এবং পরিশ্রমে অসমর্থ হয়ে আমরা ক্রমশ অধঃপতনের দিকে ধাবিত হচ্ছি।


১৪৭

সত্য ওজন দরে বা গজের মাপে বিক্রয় হয় না। তাহা ছোট হইলেও বড়। পর্বত পরিমাণ খড়-বিচালি স্ফুলিঙ্গ-পরিমাণ আগুনের চেয়েও দেখিতে বড়, কিন্তু আসলে বড় নহে। সমস্ত সেজের মধ্যে যেখানে সফলতার সূচাগ্র পরিমাণ মুখটিতে আলো জ্বলিতেছে সেখানেই সমস্ত সেজটার সার্থকতা। তেলের নিম্নভাগে অনেকখানি জল আছে; তাহার পরিমাণ যতই হোক সেইটিকে আসল জিনিস বলিবার কোনো হেতু নাই। সকল সমাজেই সমস্ত সমাজ প্রদীপের আলোটুকু যাহারা জ্বালাইয়াছেন, তাহারা সংখ্যা হিসেবে নহে, সত্য হিসাবে সে সমাজে অগ্রগণ্য। তাহারা দগ্ধ হইতেছেন। আপনাকে তাহারা নিমিষে ত্যাগই করিতেছেন, তবু তাঁহাদের শিক্ষা সমাজে সকলের চেয়ে উচ্চে। সমাজে তাঁহারাই সজীব ও তাহারাই মহৎ।

সারাংশ : সত্য এবং মহত্ত্বের শক্তি পরিমাপ করা যায় না। মহৎ ব্যক্তি সত্যের শক্তিতেই সমাজে অগ্রগণ্য, সংখ্যায় নয়। তাঁর ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সমাজের জন্য তাঁর অবদান সকল কিছুর উর্ধ্বে।


১৪৮

সব সুন্দর আপনাকে গোপন রাখে, অসুন্দর সে নিজেই এগিয়ে আসে। ফুল কতখানি সুন্দর হয়ে ফোটে তাহা সে নিজেই জানে না, প্রজাপতি জানে না যে কতখানি সুন্দর তার গতাগতি, শামুক জানে না যে তাজমহলের চেয়ে আশ্চর্য সুন্দর সমাধি গড়ে যাচ্ছে সে। যে কাজে রচয়িতা কেমনটা বানিয়াছে, এটুকুই প্রকাশ করে গেল সে কাজ অসুন্দর হলো- এর নিদর্শন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। সেখানে প্রত্যেক পাথর কী কৌশলে একের পর এক স্তুপাকার করে তোলা হয়েছে, এইটেই দেখা যায়। কারিগর তার তোড়জোড় নিয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে বুক ফুলিয়ে; কিন্তু তাজমহল? সেখানে কারিগর কেমন করে পাথরগুলো কোন কোন জায়গায় জুড়েছে তার হিসাবটিও যথাসম্ভব মুছে দিয়ে তার সৃষ্টিটাকে এগিয়ে আসতে দিয়েছে সামনে। কাজের থেকে এতখানি আপনাকে লোপ করে দিতে যে না পারল, সে অসুন্দর কাজ করল। বাড়ির কর্তা যেখানে অভ্যাগতকে আসন দিল না, নিজেই গ্যাট হয়ে জায়গা জুড়ে বসল, সেখানে উৎসব তার পরিপূর্ণ রূপ নিয়ে দেখা দিল না।

সারাংশ : অসুন্দর সাগ্রহে নিজেকে প্রকাশ করে কিন্তু সুন্দর সর্বদা নিজেকে গোপন রাখে। যে কাজ করে ব্যক্তি সেখান থেকে নিজেকে লোপ করে দিতে পারে না। সে কাজ কখনোই সুন্দর হয় না।


১৪৯

সংহতি ও শৃঙ্খলা যেমন ব্যক্তিগত জীবনে, তেমনি রাষ্ট্রীয় জীবনে ও জাতীয় জীবনে মঙ্গল বয়ে নিয়ে আসে। দুশমনের ষড়যন্ত্রে জাতির জীবনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে সঙ্কট দেখা দিতে পারে, সংহতি ও শৃঙ্খলা তা থেকে জাতিকে রক্ষা করে। ক্ষুদ্র স্বার্থান্ধতা ও ভেদবুদ্ধি পরিত্যাগ করে বৃহত্তর মানবতামুখী পরিচর্যায় পরিব্যাপ্ত করতে হবে আমাদের চিন্তা ও কর্মকে। তবেই তা অনিষ্টকর না হয়ে, হয়ে উঠবে কল্যাণের, শান্তির। জাতির পক্ষে যেকোন পরিকল্পনা কার্যকরী করতে হলে, সাফল্যম-িত করতে হলে চাই ঐক্য, শৃঙ্খলা ও শান্তি। শিক্ষা, ব্যবসা, বাণিজ্য সর্বক্ষেত্রে সার্বিক উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন বড়-ছোট, ধলো-কালো, পূর্বী-পশ্চিমী বলে কোন ভেদাভেদ থাকে না। সাম্য ও মৈত্রীর ওপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থাই মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসতে পারে। প্রগতি বলতে যদি জাতির প্রতিটি ব্যক্তির উন্নতি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি বোঝায়, তাহলে সেই প্রগতি অবশ্যই ঐক্য, শৃঙ্খলা, ঈমান, সাম্য ও মৈত্রীভিত্তিক হতে হবে। ব্যক্তির কল্যাণ মানেই জাতির কল্যাণ, আর জাতির কল্যাণ মানেই আন্তর্জাতিক তথা বিশ্বের কল্যাণ।

সারাংশ : শৃঙ্খলাম-িত জীবন সর্বদাই সাফল্যের সোনালি স্রোতে অবগাহন করে। জাতীয় জীবনে সফলতার মূলমন্ত্রও তাই ঐক্য ও শৃঙ্খলা।


১৫০

সময় ও স্রোত কারও অপেক্ষায় বসে থাকে না। চিরকাল চলতে থাকে। সময়ের নিকট অনুনয় কর, একে ভয় দেখাও, ভ্রুক্ষেপও করবে না, সময় চলে যাবে আর ফিরবে না। নষ্ট স্বাস্থ্য ও হারানো ধন পুনঃপ্রাপ্ত হওয়া যায়। কিন্তু সময় একবার গত হয়ে গেলে আর ফিরে আসে না। গত সময়ের জন্য অনুশোচনা করা নিষ্ফল। যতই কাঁদ না কেন, গত সময় কখনও ফিরে আসবে না।

সারাংশ : সময় থেমে থাকে না। স্বাস্থ্য ও ধন হারালে তা পুনরায় ফিরে পাওয়া সম্ভব, কিন্তু যে সময় চলে গেছে তা আর ফিরে পাওয়া যায়না। তাই সময়ের কাজ সময়ে করা উচিত।

১৫১

সময়ের যারা সদ্ব্যবহার করে, তারা জিতবেই। সময়েই টাকা, সময় টাকার চেয়েও বেশি। জীবনকে উন্নত করো কাজ করে। জ্ঞান অর্জন করো। চরিত্রকে ঠিক করে বসে থাকো। কৃপণের মতো সময়ের কাছ থেকে তোমার পাওয়া বুঝে নাও। এক ঘন্টা করে প্রতিদিন নষ্ট করো, বৎসর শেষে গুণে দেখো, অবহেলায় কত সময় নষ্ট হয়েছে। এক ঘন্টা করে প্রতিদিন একটু কাজ করো, দেখবে বৎসর শেষে, এমনকী মাসে কত কাজ তোমার হয়েছে। তোমার কাজ দেখে তুমি নিজেই বিস্মিত হবে।

সারাংশ : মানুষের জীবনে সময় অত্যন্ত মূল্যবান। সময় সম্পর্কে সচেতন হয়ে সে অনুযায়ী কাজ করলে তা মানুষের জীবনে সুফল বয়ে নিয়ে আসে। তাই জীবনকে সুন্দর করে তোলার জন্য সময়ের সদ্ব্যবহার করা প্রতিটি মানুষেরই কর্তব্য।


১৫২

সমাজের কাজ কেবল টিকে থাকার সুবিধা দেওয়া নয়, মানুষকে বড় করে তোলা, বিকশিত জীবনের জন্যে মানুষের জীবনে আগ্রহ জাগিয়ে দেওয়া। স্বল্পপ্রাণ স্থুল বুদ্ধি ও জবরদস্তিপ্রিয় মানুষে সংসার পরিপূর্ণ। তাদের কাজ নিজের জীবনকে সার্থক ও সুন্দর করে তোলা নয়। অপরের সার্থকতার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করা। প্রেম ও সৌন্দর্যের স্পর্শ লাভ করেনি বলে এরা নিষ্ঠুর ও বিকৃতবুদ্ধি। এদের একমাত্র দেবতা অহংকার। পারিবারিক অহংকার, জাতিগত অহংকার- এ সবের নিশান উড়ানোই এদের কাজ।

সারাংশ : সমাজের কাজ কেবল মানুষকে টিকিয়ে রাখা নয়। তার কাজ হলো মানুষের মনুষ্যত্ববোধকে জাগিয়ে তোলা, জীবনকে বিকশিত করার আগ্রহ সৃষ্টি করা। মনুষ্যত্ববোধ বিবর্জিত মানুষে আমাদের সমাজ পরিপূর্ণ। এ ধরনের মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার পথ সৃষ্টি করে দেওয়ার দায়িত্ব সমাজেরই।


১৫৩

সমাজে নারীরা পুরুষের দাসী। দাসী অর্থ যার কোনো ধরনের স্বাধীনতা নেই। প্রভু যা বলবে তাই করবে। এই যে আজ্ঞাবহ দাসী, সে একেবারেই পরাধীন। এ নারী প্রেমিকা নয়, জায়া নয়, জননী নয়, সহযোগিনী নয় বা অর্ধাঙ্গীও নয়। অর্ধাঙ্গী অর্থ তার পুরুষের সমান অধিকার আছে। স্বাধীন মতামত প্রকাশের অধিকার আছে। কিন্তু আমাদের সমাজে তা নেই তাদেরকে জ্ঞানের আলো দান করা হতো না। অজ্ঞান করে রাখা হতো, ঘরের বাইরে বের হতে দেয়া হতো না। কঠিন পর্দার মধ্যে রাখা হতো। মানসিকভাবে তারা ছিল একেবারে প্রতিবন্ধী। যেমন সীতা। সীতার আপন সত্তা বলতে কিছু ছিল না। সে রামের হাতের খেলার পুতুল ছিল।

সারাংশ : সমাজ নারীদেরকে পুরুষের অধীনস্ত করে দাসীর পর্যায়ে নিয়ে গেছে। স্বাধীনতাহীন নারী জাতি কোন কালেই পুরুষের কাছে কোন মর্যাদা পায়নি। রামের কাছে সীতাও ছিল খেলার পুতুলের ন্যায়।


১৫৪

সৎ হইলে, সাধু হইলে, পুণ্য করিলে মৃত্যুর পর ওই অনন্তকাল ধরিয়া অনন্ত শান্তি, অনন্ত তৃপ্তি ভোগ করিবে, আর এ জীবনে পাপ করিলে, রাক্ষস-পিশাচ-অধম জীবন যাপন করিলে কেবল অর্থ সঞ্চয়, সুখভোগ ও কামনা পূরণ লইয়াই দীর্ঘতম একশত বৎসরের মানবজীবন কাটাইয়া দিলে ঐ অনন্তকাল ধরিয়া অন্তরে বাহিরের তীব্রতম জ্বালাময় নরক আগুনে জ্বলিয়া মরিবে- একথা কি বিশ্বাস কর মানুষ?

সারাংশ : পরকালে মানুষ অনন্তকাল বেঁচে থাকবে। পার্থিব জীবনের কর্মফল সবাই অনন্তকাল ধরে ভোগ করবে। ভাল কাজের জন্য সুখ-শান্তি আর মন্দ কাজের জন্য সীমাহীন দুঃখ-কষ্ট নির্ধারিত রয়েছে পরকালে।


১৫৫

সমস্ত জ্ঞান, সমস্ত সাহিত্যের উদ্দেশ্যে মানুষের অন্তরস্থ বিবেককে জাগিয়ে তোলা- নির্ভীক, তেজস্বী ও সবল করে তোলা। যদি জ্ঞান, উপদেশ, পুস্তক এবং সাহিত্য মানুষের অন্তরকে জাগাতে না পারে, তাকে চিন্তাশীল করে তুলতে না পারে, তাকে আত্মবোধ না দিতে পারে, তবে বুঝতে হবে তার পাষাণ প্রাণে সমস্ত জ্ঞান ব্যর্থ হয়েছে। বিবেকের জাগরণের নামই আত্মবোধ। বিবেক অপেক্ষা আরও একটি মহৎ জিনিস আছে, তার নাম প্রজ্ঞা। বিবেক মানুষকে প্রতারণা করে, প্রজ্ঞা কোনো সময় মানুষকে প্রতারণা করে না। প্রজ্ঞা দিবালোকের মতো উজ্জ্বল, তার দৃষ্টির সম্মুখে কুয়াশা নেই, সন্দেহ নেই। প্রজ্ঞা ধ্রুব সত্যকে দর্শন করে। যিনি এই প্রজ্ঞার সন্ধান পেয়েছেন তিনি পরম চেতনা লাভ করেছেন, তিনি মানুষের পরম শ্রদ্ধার্হ।

সারাংশ : জ্ঞান ও সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানুষের বিবেককে জাগ্রত করা, তাকে সাহসী, তেজস্বী ও সবল করে তোলা। প্রজ্ঞা বিবেক অপেক্ষাও মহৎ। প্রজ্ঞার মাধ্যমেই মানুষ প্রকৃত সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে। আর প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি সকলের শ্রদ্ধা লাভ করেন।


১৫৬

সমস্ত পৃথিবীর সঙ্গে ব্যবহার বন্ধ করিয়া, একঘরে হইয়া দুই বেলা দুই মুঠা ভাত বেশি করিয়া খাইয়া নিন্দ্রা নিলেই তো চলিবে না। সমস্ত পৃথিবীর সঙ্গে দেনা পাওনা করিয়া তবে আমরা মানুষ হইতে পারিব। যে জাতি তাহা না করিবে, বর্তমান কালে সে টিকিতে পারিবে না। তাই আমাদের দেশে চাষের ক্ষেতের ওপর সমস্ত পৃথিবীর জ্ঞানের আলো ফেলিবার দিন আসিয়াছে। আজ শুধু একলা চাষীর চাষ করিবার দিন নাই। আজ তাহার সঙ্গে বিদ্বানকে, বৈজ্ঞানিককে যোগ দিতে হইবে। আজ শুধু চাষীর লাঙ্গলের ফলার সঙ্গে আমাদের দেশের মাটির সংযোগ যথেষ্ট, সমস্ত দেশের বুদ্ধির সঙ্গে, বিদ্যার সঙ্গে, অধ্যবসায়ের সঙ্গে তাহার সংযোগ হওয়া চাই।

সারাংশ : বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে গোটা পৃথিবীর সাথে আদান-প্রদানের মাধ্যমে নিজের দেশকে উন্নত করে তুলতে হবে। কৃষিক্ষেত্রেও জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটাতে হবে। আজকের দিনে কৃষির সাথে কেবল মাটির সংযোগ যথেষ্ট নয়, এর পাশাপাশি বিদ্যা, বুদ্ধি এবং অধ্যবসায়ের সংযোগ অপরিহার্য।


১৫৭

সাধারণ মানুষ পুত্র পরিবারের সুখের জন্য হৃদয়ের রক্ত ঢালে, মহাপুরুষ মানুষের মঙ্গল তরে জীবন শোণিত প্রদান করেন। অন্যের জন্য জীবন ধারণে মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সার্থকতা, অন্যের মধ্যে ডুবিয়া ও মুছিয়া যাওয়া মানুষের পূর্ণানন্দময় পরিনাম। আত্ম লইয়া আমি তৃপ্ত নহি, জীবন আমার আর কাহাকেও নিবেদন করিতে চাই। কে আমার বাঞ্ছিতজন, কাহাকে আমার জীবন দিয়া জন্ম আমার সার্থক করিব? ক্ষুদ্র লইয়া আমি বাঁচিতে পারি না, নিজেই যে ভাঙ্গিয়া ও মুছিয়া যায়, তাহার মধ্যে ডুবিয়া আমার প্রাণের তৃষ্ণা মিটিতে পারে না। আমি চাই চিরসত্য ও চিরানন্দ, মরণে মহাজীবন। চাই সর্বাপেক্ষা মহৎ ও মধূর যে, আমার উৎস ও লক্ষ্য যে, সেই পরম পবিত্র মহামহীয়ান প্রভুর কাছেই সর্বস্ব আমার লুণ্ঠিত করি, তাঁহারই মধ্যে অস্তিত্ব আমার লুপ্ত করিয়া অক্ষয় আনন্দে মগ্ন হই।

সারাংশ : অন্যের আনন্দে নিজেকে বিলীন করে দিয়ে তৃপ্ত হয় মানবাত্মা। হৃদয়ের আকুতি তাই পরার্থে নিজ স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে আত্মতৃপ্তি লাভ।


১৫৮

সাহিত্যের উদ্দেশ্য সকলকে আনন্দ দেওয়া, কারও মনোরঞ্জন করা নয়। এ দুয়ের ভিতর যে আকাশ-পাতাল প্রভেদ আছে, সেইটি ভুলে গেলেই লেখকেরা নিজে খেলা না করে পরের জন্যে খেলনা তৈরি করতে বসেন। সমাজের মনোরঞ্জন করতে গেলে সাহিত্য যে স্বধর্মচ্যুত হয়ে পড়ে, তার প্রমাণ বাংলাদেশে আজ দুর্লভ নয়। কাব্যের ঝুমঝুমি, বিজ্ঞানের ছুষিকাঠি, দর্শনের বেলুন, রাজনীতির রাঙালাঠি, ইতিহাসের ন্যাকড়ার পুতুল, নীতির টিনের ভেঁপু এবং ধর্মের জয়ঢাক-এইসব জিনিসে সাহিত্যের বাজার ছেয়ে গেছে। সাহিত্যরাজ্যে খেলনা পেয়ে পাঠকের মনতুষ্টি হতে পারে, কিন্তু তা গড়ে লেখকের মনতুষ্টি হতে পারে না।

সারাংশ : মনতুষ্টি ও মনোরঞ্জন এক নয়। বিপরীতমুখী মেরুতে এ দুটির অবস্থান। সাহিত্যিকদের কাজ পাঠকের মনতুষ্টি দায়ক সাহিত্য রচনা করা, সাময়িক মনোরঞ্জন নয়। নিম্নমানের সাহিত্য রচনার মাধ্যমে হয়ত ভানুমতির খেলার মত ক্ষণিকের আকর্ষণ পাওয়া যায়, সাহিত্যাকাশের মহৎ শিল্পী হওয়া যায় না।


১৫৯

স্বাধীন হবার জন্য যেমন সাধনার প্রয়োজন, তেমনি স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রয়োজন সত্যনিষ্ঠা ও ন্যায়পরায়ণতার। সত্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধহীন জাতি যতই চেষ্টা করুক, তাহাদের আবেদন নিবেদনে ফল হয় না। যে জাতির অধিকাংশ ব্যক্তি মিথ্যাচারী, সেখানে দু-চার জন সত্যনিষ্ঠকে বহু বিড়ম্বনা সহ্য করতে হয়। দুর্ভোগ পোহাতে হয়। কিন্তু মানুষ জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে হলে, সে কষ্ট সহ্য না করে উপায় নেই।

সারাংশ : কঠোর সাধনার মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়। আবার স্বাধীনতা রক্ষার জন্যও প্রয়োজন সত্যনিষ্ঠা এবং ন্যায়পরায়নতা। যে দেশে মিথ্যাচারীর সংখ্যা বেশি সে দেশে মুষ্টিমেয় সত্যনিষ্ঠকে অনেক যন্ত্রণা এবং দুর্ভোগ পোহাতে হয়। কিন্তু জাতিকে মর্যাদাবান করে তোলার জন্য এ দুর্ভোগ সহ্য না করে উপায় নেই।


১৬০

স্বীকার করি যে, শারীরিক দুর্বলতাবশত নারীজাতি অপর জাতির সাহায্যে নির্ভর করে। তাই বলিয়া পুরুষ প্রভু হইতে পারে না। জগতে দেখিতে পাই প্রত্যেকেই প্রত্যেকের নিকট কোনো-না-কোনো প্রকার সাহায্য প্রার্থনা করে, যেন একে অপরের সাহায্য ব্যতীত চলিতে পারে না। তরুলতা যেমন বৃষ্টির সাহায্যপ্রার্থী মেঘও সেইরূপ তরুর সাহায্য চায়। জলবৃদ্ধির নিমিত্ত নদী বর্ষার সাহায্য পায়, মেঘ আবার নদীর নিকট ঋণী। তবে তরঙ্গিনী কাদম্বিনীর স্বামী, না কাদম্বিনী তরঙ্গিণীর স্বামী? এ স্বাভাবিক নিয়মের কথা ছাড়িয়া কেবল সামাজিক নিয়মে দৃষ্টিপাত করিলেও আমরা তাহাই দেখি- কেহ সূত্রধর, কেহ অন্তুবায় ইত্যাদি। একজন ব্যারিস্টার ডাক্তারের সাহায্যপ্রার্থী, আবার ডাক্তারও ব্যারিস্টারের সাহায্য চাহেন। তবে ডাক্তারকে ব্যারিস্টারের স্বামী বলিব, না ব্যারিস্টার ডাক্তারের স্বামী? যদি ইহাদের কেহ কাহাকে স্বামী বলিয়া স্বীকার না করেন, তবে শ্রীমতীগণ জীবনের চিরসঙ্গী শ্রীমানদিগকে স্বামী ভাবিবেন কেন?

সারাংশ : পুরুষের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে পুরুষকে নারীর প্রভু হিসেবে বিবেচনা করাটা অযৌক্তিক। সমাজের প্রতিটি মানুষই তো একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। এই বিবেচনায় পুরুষ ও নারী একে অপরের সহযোগী, প্রভু নয়।


১৬১

সুখ প্রতিদিনের সামগ্রী, আনন্দ প্রত্যহের অতীত। সুখ শরীরের কোথাও পাছে ধুলা লাগে বলিয়া সংকুচিত। আনন্দ ধুলায় গড়াগড়ি দিয়া নিখিলের সঙ্গে আপনার ব্যবধান ভাঙিয়া চুরমার করিয়া দেয়। এইজন্য সুখের পক্ষে ধুলা হেয়, আনন্দের পক্ষে ধুলা ভূষণ। সুখ কিছু হারায় বলিয়া ভীত। আনন্দ যথাসর্বস্ব বিতরণ করিয়া পরিতৃপ্তি। এইজন্যে সুখের পক্ষে রিক্ততা দারিদ্র্য, আনন্দের পক্ষে দারিদ্র্যই ঐশ্বর্য। সুখ ব্যবস্থার বন্ধনের মধ্যে আপনার শ্রীটুকুকে সতর্কভাবে রক্ষা করে। আনন্দ সংসারের মুক্তির মধ্যে আপন সৌন্দর্যকে উদারভাবে প্রকাশ করে। এইজন্য সুখ বাহিরের নিয়মের মধ্যে বদ্ধ, আনন্দ সে বন্ধন ছিন্ন করিয়া আপনার নিয়ম আপনি সৃষ্টি করে। সুখ সুধাটুকুর জন্য তাকাইয়া বসিয়া থাকে। আনন্দ-দুঃখের বিষয়কে অনায়াসে পরিপাক করিয়া ফেলে। এইজন্য কেবল ভালোটুকুর দিকেই সুখের পক্ষপাত- তার আনন্দের পক্ষে ভালোমন্দ দুই-ই সমান।

সারাংশ : সুখ এবং আনন্দ মানব মনের দুটি ভিন্ন অবস্থার বহিঃপ্রকাশ। ইন্দ্রিয়জ প্রাপ্তি এবং ভোগের মধ্যে সুখ সীমাবদ্ধ। কিন্তু আনন্দ ইন্দ্রিয়জ সুখ অতিক্রান্ত হৃদয়ের ভিন্নতর এক উপলব্ধি। সুখ কেবল ভালোকে গ্রহণ করে। অন্যদিকে আনন্দের কাছে ভালো-মন্দ উভয়ই সমান।


১৬২

সুখ দুঃখের অভাব মাত্র। আর সুখের নিরপেক্ষ অস্তিত্বই যদি স্বীকার করা যায়, তাহাতেই বা কী দেখা যায় ? ধরো, সুখও আছে, দুঃখও আছে। কিন্তু সুখের তীব্রতা নাই। দুঃখের তীব্রতা আছে। সুখ যত স্থায়ী হয়, তত কমে; দুঃখ যত থাকে, তত বাড়ে। এমনকী অতিরিক্ত সুখ দুঃখ হইয়া দাঁড়ায়, দুঃখকে সুখ হইতে কখনও দেখা যায় না। সংসারে চাহিয়া দেখো, শোক, হিংসা, ঈর্ষা আর পরিতাপ সবই দুখঃময়; যৌবনের স্বাধীনতা দুঃখের তৎকালীন অভাবমাত্র। ধনমান প্রায় সুখের আশা দেয়; কিন্তু আনে দুঃখ, স্নেহ, দয়া ও মমতা। ইহারা অধিকাংশ দুঃখেরই মূল। জ্ঞান-ধর্ম তাহারা তো অন্তদৃষ্টির প্রসার বাড়াইয়া অনুভূতির তীক্ষ্মতা জন্মাইয়া দুঃখভোগেরই সুবিধা করিয়া দেয়। যে জ্ঞানী, যে ধার্মিক তাহার দুঃখভোগ শক্তি অধিক। তাহার দুঃখও অধিক। মানুষেরই তো দুঃখ, কাঠ-পাথরের আবার দুঃখ কী ?

সারাংশ : মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ উভয়ই আছে। সুখের তীব্রতা না থাকলেও দুঃখের অনুভূতি অত্যন্ত তীব্র। সংসারে সকল কিছুই দুঃখময়। অনেকে মনে করে বিত্তে অপরিসীম সুখ। কিন্তু বিত্তের সুখ মানুষের দুঃখকে আরো বাড়িয়ে দেয়। ধার্মিক এবং জ্ঞানী ব্যক্তির দুঃখানুভূতি সাধারণ মানুষ অপেক্ষা তীক্ষ্ম।


১৬৩

সুন্দর হওয়ার অর্থ কেবল গায়ের রংটি ফর্সা, কোকড়ানো চুল আর টানা চক্ষুই নয়। যাহার যেমন চেহারা থাকুক, তাহাকে থাকিতে হইবে পরিচ্ছন্ন। দাঁত মাজিয়া ঝকঝকে রাখিয়া, জামাকাপড় যাহার যেমন আছে সুন্দর করিয়া সেগুলো পরো। তাহা হইলে তুমি দেখিতে সুন্দর হইবে। কিন্তু সুন্দর হওয়ার বড় কথা হইতেছে চরিত্র। ফুল দেখিতে ভারি সুন্দর- তোমার চক্ষু জুড়াইয়া যায় ফুল দেখিয়া। ফুলের গন্ধটা আবার আরও চমৎকার। তোমার মন ভরিয়া ওঠে গন্ধে। কেবল দেখিতেই যদি সুন্দর হইত, সুন্দর গন্ধ যদি ইহার না থাকিত, তুমি কি ফুলকে এত আদর করিতে ?

সারাংশ : পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা আর সৎ চরিত্রের দ্বারা মানুষের সৌন্দর্য নির্ধারিত হয়। কেবল দৈহিক সৌষ্ঠব মানুষের সৌন্দর্যের পরিচায়ক নয়। শুধু বাহিরের সৌন্দর্য নয়, অন্তরের সৌন্দর্য মানুষকে মহৎ করে তোলে।


১৬৪

তবে কি সাহিত্যের উদ্দেশ্য লোককে শিক্ষা দেওয়া? অবশ্য নয়। কেননা কবির মতিগতি শিক্ষকের মতিগতির সম্পূর্ণ বিপরীত। স্কুল না বন্ধ হলে যে খেলার সময় আসে না, এ তো সকলেরই জানা কথা। কিন্তু সাহিত্য রচনা যে আত্মার লীলা, এ কথা শিক্ষকেরা স্বীকার করতে প্রস্তুত নন। সুতরাং শিক্ষা ও সাহিত্যের ধর্মকর্ম যে এক নয়, এ সত্যটি একটু স্পষ্ট করে দেখিয়ে দেওয়া আবশ্যক। প্রথমত শিক্ষা হচ্ছে সেই বস্তু যা লোকে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও গলধঃকরণ করতে বাধ্য হয়, অপর পক্ষে কাব্যরস লোকে শুধু স্বেচ্ছায় নয় সানন্দে পান করে, কেননা শাস্ত্রমতে সে রস অমৃত। দ্বিতীয়ত শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের মনকে বিশ্বের খবর জানানো, সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানুষের মনকে জাগানো, কাব্য যে সংবাদপত্র নয়, একথা সকলেই জানেন। তৃতীয়ত অপরের মনের অভাব পূর্ণ করবার উদ্দেশ্যেই শিক্ষকের হস্তে শিক্ষা জন্মলাভ করছে, কিন্তু কবির নিজের মনের পরিপূর্ণতা হতেই সাহিত্যের উৎপত্তি।

সারাংশ : প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কিংবা সংবাদপত্রের উদ্দেশ্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্য সাধন করে সাহিত্য। একান্ত বাধ্য হয়ে মানুষ শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে, কিন্তু সাহিত্যের কাছ থেকে সে প্রত্যাশা করে আনন্দ। শিক্ষা সংবাদপত্র মানুষকে তথ্য দিয়ে থাকে অপরদিকে সাহিত্য মানুষের হৃদয়কে জাগ্রত করে। শিক্ষক যেখানে অন্যের মনের ক্ষুধা নিবারণের জন্য ব্যস্ত থাকেন, কবি সেখানে আপন মনের খেয়ালে কাব্য রস সৃষ্টি করেন। 


১৬৫

সাহিত্যজগতে যাঁদের খেলা করবার প্রবৃত্তি আছে, সাহস আছে, ক্ষমতা আছে, মানুষের নয়ন-মন আকর্ষণ করবার সুযোগ বিশেষ করে তাদের কপালেই ঘটে। মানুষ যে খেলা দেখতে ভালোবাসে তার পরিচয় তো আমরা এই জড় সমাজেও নিত্য পাই। টাউনহলে বক্তৃতা শুনতেই বা কজন যায় আর গড়ের মাঠে ফুটবল খেলা দেখতেই বা কজন যায়। অথচ এ কথাও সত্য যে, টাউনহলে বক্তৃতার উদ্দেশ্য অতি মহৎ, আর গড়ের মাঠের খেলোয়াড়দের ছোটাছুটি, দৌড়াদৌড়ি আগাগোড়া অর্থশূন্য এবং উদ্দেশ্যবিহীন। আসল কথা এই যে, মানুষের দেহমনের সকল প্রকার ক্রিয়ার মধ্যে ক্রীড়া শ্রেষ্ঠ, কেননা তা উদ্দেশ্যহীন। মানুষ যখন খেলা করে, তখন সে এক আনন্দ ব্যতীত অন্য কোনো ফলের আকাক্সক্ষা রাখে না। যে খেলার ভিতর আনন্দ নেই কিন্তু উপরি পাওয়ার আশা আছে, তার নাম খেলা নয়, জুয়াখেলা এবং যেহেতু খেলার আনন্দ নিরর্থক অর্থাৎ অর্থগত নয়, সে কারণ তা কারও নিজস্ব হতে পারে না। এ আনন্দে সকলেরই অধিকার সমান।

সারাংশ : মানুষ সাহিত্যের কাছ থেকে ব্যক্তিগত ফল প্রাপ্তির চেয়ে অনির্বচনীয় আনন্দ উপভোগ করতে চায়। যার দক্ষতা আছে এ খেলায় সেই দর্শক মনোরঞ্জনের সফলতা লাভ করে। সাহিত্য ও খেলায় মধ্যে ব্যক্তিগত লাভলাভের প্রশ্ন জড়িত নেই বলেই আনন্দে সবারই অধিকার আছে।


১৬৬

পথ-পার্শ্বের-ধর্ম-অট্টালিকা আজ পড় পড় হইয়াছে, তাহাকে ভাঙ্গিয়া ফেলিয়া দেওয়াই আমাদের ধর্ম, ঐ জীর্ণ অট্টালিকা চাপা পড়িয়া বহু মানবের বহু মৃত্যুর কারণ হইতে পারে। যে-ঘর আমাদের আশ্রয় দান করিয়াছে, তাহা যদি সংস্কারাতীত হইয়া আমাদের মাথায় পড়িবার উপক্রম করে, তাহাকে ভাঙিয়া নতুন করিয়া গড়িবার দুঃসাহস আছে এক তরুণেরই। খোদার দেওয়া এই পৃথিবীর নিয়ামত হইতে যে নিজেকে বঞ্চিত রখিল, সে যত মোনাজাতই করুক, খোদা তাহা কবুল করিবেন না। খোদা হাত দিয়াছেন বেহেশত ও বেহেশতি চিজ অর্জন করিয়া লইবার জন্য, ভিখারীর মতো হাত তুলিয়া ভিক্ষা করিবার জন্য নয়। আমাদের পৃথিবী আমরা আমাদের মনের মতো করিয়া গড়িয়া লইব। ইহাই হউক তরুণের সাধনা।

সারাংশ : এক কালে ধর্ম মানুষের কল্যাণে এলেও এখন সময়ের আবর্তে সেই ধর্ম উপযোগিতা হারিয়ে মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। করুণা লাভের প্রত্যাশা না করে তরুণদেরই এই মৃতপ্রায় ব্যাবস্থাকে পাল্টে দিয়ে নিজেদের বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে নিতে হবে।


১৬৭

মানুষের জীবনে ভাষার স্থান যে কত বড়ো তা আমরা খুব কমই ভেবে থাকি। আমরা যেমন খাইদাই ওঠা বসা করি ও হেঁটে বেড়াই, তেমনি সমাজজীবন চালু রাখবার জন্যে কথা বলি, নানা বিষযে নানা ভাবে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সামাজিকতা বজায় রাখতে হলে তার প্রধান উপায় কথা বলা, মুখ খোলা, আওয়াজ করা। একে অন্যের সঙ্গে, সম্বন্ধ যেমনই হোক না কেন-শত্রুতার কি ভালোবাসার, চেনা কি অচেনার, বন্ধুত্বের কিংবা মৌখিক আলাপ-পরিচয়ের, মানুষের সঙ্গে মানুষের যেকোনো সম্বন্ধ স্থাপন করতে গেলেই মানুষ মাত্রকেই মুখ খুলতে হয়, কতগুলো আওয়াজ করতে হয়। সে আওয়াজ বা ধ্বনিগুলোর একমাত্র শর্ত হচ্ছে যে সেগুলো অর্থবোধক হওয়া চাই। অর্থহীন ধ্বনিও অবশ্য মানুষ করতে পারে কিন্তু তাতে সমাজজীবন চলে না।

সারাংশ : অর্থপূর্ণ ধ্বনি সমষ্টি মানুষের ভাষা। যার সাহায্যে সে এই পৃথিবীতে মানুষে মানুষে সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছে।


১৬৮

সমাজের কাজ কেবল টিকে থাকার সুবিধা দেওয়া নয়, মানুষকে বড় করে তোলা, বিকশিত জীবনের জন্য মানুষের জীবনে আগ্রহ জাগিয়ে দেওয়া। স্বল্পপ্রাণ, স্থূল বুদ্ধি ও জবরদস্তিপ্রিয় মানুষে সংসার পরিপূর্ণ। তাদের কাজ নিজের জীবনকে সার্থক ও সুন্দর করে তোলা, অপরের সার্থকতার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করা। প্রেম ও সৌন্দর্যের স্পর্শ লাভ করে নি বলে এরা নিষ্ঠুর ও বিকৃত বুদ্ধির। এদের একমাত্র দেবতা অহংকার। পারিবারিক অহংকার, জাতিগত অহংকার-এসবের নিশান উড়ানোই এদের কাজ।

সারাংশ : ভালো-মন্দ মানুষ নিয়েই সমাজ গঠিত। যারা মন্দ তাদের মধ্যে অহংকার রিপু প্রবল। এর ফলে সমাজে উন্নতি হয় বিঘ্নিত। তাদের প্রেমহীন নিষ্ঠুর আচরণ অশান্তির সৃষ্টি করে। এদেরকে উন্নত জীবনে ফিরিয়ে আনা সমাজের কাজ।


১৬৯

অনেকে বলে, স্ত্রীলোকদের উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন নাই। মেয়েরা চর্ব্যচোষ্য রাঁধিতে পারে, বিবিধ প্রকার সেলাই করিতে পারে, দুই-চারিখানা উপন্যাস পাঠ করিতে পারে, ইহাই যথেষ্ট। আর বেশি আবশ্যক নাই। কিন্তু ডাক্তার বলেন যে, আবশ্যক আছে, যেহেতু মাতার দোষ-গুণ লাইয়া পুত্রগণ ধরাধামে অবতীর্ণ হয়। এইজন্য দেখা যায় যে, আমাদের দেশে অনেক বালক শিক্ষকের বেত্রতাড়নায় কণ্ঠস্থ বিদ্যার জোরে এফ.এ.বি.এ পাস হয় বটে কিন্তু বালকের মনটা তাহার মাতার সহিত রান্নাঘরেই ঘুরিতে থাকে। তাহাদের বিদ্যার পরীক্ষায় এ কথার সত্যতার উপলব্ধি হইতে পারে।

সারাংশ : মেয়েদের উচ্চ শিক্ষার বিরোধিতা করে অনেকই রান্নাবান্না গৃহকত্রী ও সামান্য শিক্ষার কথা বলে থাকে। কিন্তু সন্তানকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হলে মাকেও উচ্চ শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে।


১৭০

জীবনের একটি প্রধান লক্ষণ হাসি ও আনন্দ। যার প্রত্যেক কাজে আনন্দ স্ফূর্তি তার চেয়ে সুখী আর কেউ নয়। জীবনে যে পুরোপুরি আনন্দ ভোগ করতে জানে আামি তাকে বরণ করি। স্থূল দৈনন্দিন কাজের ভেতর সে এমন একটা কিছুর সন্ধান পেয়েছে যা তার নিজের জীবনকে সুন্দর ও শোভনীয় করেছে এবং পারিপার্শ্বিক দশ জনের জীবনকে উপভোগ্য করে তুলেছে। এই যে এমন একটা জীবনের সন্ধান যার ফলে সংসারকে মরুভূমি বোধ না হয়ে ফুলবাগান বলে মনে হয়। সে সন্ধান সকলের মেলে না। যার মেলে সে পরম ভাগ্যবান। এরূপ লোকের সংখ্যা যেখানে বেশি সেখান থেকে কলুষ বর্বরতা আপনাআপনি দূরে পালায়। সেখানে প্রেম, পবিত্রতা সর্বদা বিরাজ করে।

সারাংশ : সংসারের প্রত্যেকটি কাজের মধ্যে আমাদের আনন্দ খুঁজে নিতে হবে। যে হাসি আনন্দে নিজের জীবনকে ভরিয়ে তুলতে পারে সে জগৎটাকেও আনন্দময় করে তোলে। এ রকম মানুষই পৃথিবীকে পাপ পঙ্কিলতা মুক্ত করে প্রেমময় করে তোলে।


১৭১

বাল্যকাল হইতে আমাদের শিক্ষার সহিত আনন্দ নাই। কেবল যাহা কিছু নিতান্ত আবশ্যক, তাহাই কণ্ঠস্থ করিতেছি। তেমন করিয়া কোনো মতে কাজ চলে মাত্র; কিন্তু মনের বিকাশ লাভ হয় না। হাওয়া খাইলে পেট ভরে না, আহার করিলে পেট ভরে, কিন্তু আহারটি রীতিমতো হজম করিবার জন্য হাওয়ার দরকার। তেমনি একটি শিক্ষা পুস্তককে রীতিমতো হজম করিতে অনেকগুলি অপাঠ্য পুস্তকের সাহায্য আবশ্যক। ইহাতে আনন্দের সহিত পড়িতে পারিবার শক্তি অলক্ষিতভাবে বৃদ্ধি পাইতে থাকে। গ্রহণশক্তি, ধারণশক্তি, চিন্তাশক্তি বেশ সহজে এবং স্বাভাবিক নিয়মে ফল লাভ করে।

সারাংশ : আনন্দহীন শিক্ষাগ্রহণ মানুষের যথাযথ বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। আবশ্যক বিষয়ের বাইরে আনন্দদায়ক লেখা পড়া মানুষের চিন্তাশক্তিকে ও ধারণশক্তিকে বাড়িয়ে দেয়। শিক্ষার প্রকৃত ফল লাভ তখনই সম্ভব হয়।


১৭২

অভাব আছে বলিয়াই জগৎ বৈচিত্র্যময়। অভাব না থাকিলে জীব-সৃষ্টি বৃথা হইত। অভাব আছে বলিয়াই অভাব পূরণের জন্য এত উদ্যম, এত উদ্যোগ। আমাদের সংসার অভাবক্ষেত্র বলিয়াই কর্মক্ষেত্র। অভাব না থাকিলে সকলকেই স্থানু, স্থবির হইতে হইত, মনুষ্য-জীবন বিড়ম্বনাময় হইত। মহাজ্ঞানীরা জগৎ হইতে দুঃখ দূর করিবার জন্য ব্যগ্র। কিন্তু জগতে দুঃখ আছে বলিয়াই তো আমরা সেবার সুযোগ পাইয়াছি। সেবা মানবজীবনের ধর্ম। দুঃখ আছে বলিয়াই সে সেবার পাত্র যত্রতত্র সদাকাল ছাড়াইয়া রহিয়াছে। যিনি অন্নদান, বস্ত্রদান, জ্ঞানদান, বিদ্যাদান করেন, তিনি যেমন জগতের বন্ধু তেমনি যিনি দুঃখে আমাদের সেবার পাত্রে অজস্র দান করিতেছেন, তিনিও মানবের পরম বন্ধু। দুঃখকে শত্রু মনে করিও না, দুঃখ আমাদের বন্ধু।

সারাংশ : অভাববোধই মানুষের জীবনকে কর্মমুখর করে তুলেছে। অভাব না থাকলে জীবন নিশ্চল হয়ে পড়তো, দেখা দিত বিড়ম্বনা। মহামানবেরা এই অভাব দূর করবার জন্যই অন্ন, বস্ত্র, জ্ঞান, বিদ্যা ও সেবা নিয়ে মানুষের বন্ধু হয়ে আসে। অভাবের মতো দুঃখও মানুষকে আজ বড় করে তুলছে।


১৭৩

অনেকের ধারণা এই যে, মহৎব্যক্তি শুধু উচ্চবংশেই জন্মগ্রহণ করিয়া থাকেন, নিচুকূলে মহতের জন্ম হয় না। কিন্তু প্রকৃতির দিকে দৃষ্টিপাত করিলেই দেখা যায় যে, মানুষের ধারণা অতিশয় ভ্রমাত্মক। পদ্মফুল ফুলের রাজা। রূপে গন্ধে সে অতুলনীয়। কিন্তু ইহার জন্ম হয় পানের অযোগ্য পানিভরা এঁদো পুকুরে। পক্ষান্তরে বটবৃক্ষ মধ্যে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন বটে, অথচ বহু বৃক্ষের ফল আমরা আস্বাদন করি, এত খ্যাতনামা যে বটগাছ, তাহার ফল আমাদের অখাদ্য।

সারাংশ : বংশ পরিচয় নয়, কর্মই মানুষকে মহৎ করে তোলে। জন্ম পরিচয় যত নিচুস্তরেই হোক না কেন মানুষের জন্য কাজ করলে পৃথিবীতে তার আসন অটুট হয়ে থাকবে।


১৭৪

কথায় কথায় মিথ্যাচারণ, বাক্যের মূল্যকে অশ্রদ্ধা করা- এসব সত্যনিষ্ঠ স্বাধীন জাতির লক্ষণ নয়। স্বাধীন হবার জন্য যেমন সাধনার প্রয়োজন, তেমনি স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রয়োজন সত্যনিষ্ঠা ও ন্যায়পরায়ণতার। সত্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধহীন জাতি যতই চেষ্টা করুক তাদের আবেদন-নিবেদন আল্লাহর কাছে পৌঁছাবে না, তাদের স্বাধীনতার দ্বার থেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়া হবে। যে জাতির অধিকাংশ ব্যক্তি মিথ্যাচারী, সেখানে দু/একজন সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তির বহু বিড়ম্বনা সহ্য করতে হবে। কিন্তু মানবকল্যাণের জন্য, সত্যের জন্য যে বিড়ম্বনা ও নিগ্রহ তা সহ্য করতেই হবে।

সারাংশ : বহু সাধনায় অর্জিত স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে হলে জাতিকে ন্যায়পরায়ণ ও সত্যনিষ্ঠ হতে হয়। জাতির অধিকাংশ মানুষ মিথ্যাচারী হলে দু’একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষকে পীড়ন সহ্য করে ও মানবকল্যাণের জন্য কাজ করে যেতে হয়।


১৭৫

কোন পাথেয় নিয়ে তোমরা এসেছ? সৎ আকাক্সক্ষা। তোমরা শিখবে বলে বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছ। কি শিখতে হবে ভেবে দেখ। পাখি তার মা-বাপের কাছে কি শিখে? পাখা মেলতে শেখে, উড়তে শেখে। মানুষকেও তার অন্তরের পাখা মেলতে শিখতে হবে, তাকে শিখতে হবে কি করে বড় করে আকাক্সক্ষা করতে হয়। পেট ভরাতে হবে-এ শিখবার জন্য বেশি সাধনার দরকার নেই, কিন্তু পুরোপুরি মানুষ হতে হবে-এই শিক্ষার জন্য যে অপরিমিত আকাক্সক্ষা দরকার শেষ পর্যন্ত তা জাগিয়ে রাখবার জন্য প্রয়োজন মানুষের শিক্ষা।

সারাংশ : শুধু ক্ষুধা নিবৃত্তি শিক্ষার কাজ নয়, শিক্ষা মানুষের অন্তরলোকের বিস্তার ঘটায়। পাখি যেমন তার পিতা মাতার কাছে উড়তে শেখে আমাদেরও তেমনি মনের পাখায় ভর করে তীব্র জীবনাকাঙ্ক্ষী হয়ে উঠতে হবে।


১৭৬

মৃত্যুর হাত হইতে বাঁচিবার উপায় জগতের একটি প্রাণীরও নাই। সুতরাং এই অবধারিত সত্যকে সানন্দে স্বীকার করিয়া নিয়াও মৃত্যুকে জয় করিবার জন্য একটি বিশেষ কৌশল আয়ত্ত করিতে হইবে। তাহা হইতেছে, অতীতের পূর্বপুরুষদের সাধনাকে নিজের জীবনে এমনভাবে রূপবন্ত করা যেন ইহার ফলে তোমার বা আমার মৃত্যুর পরেও সেই সাধনার শুভফল তোমার পুত্রাদিক্রমে বা আমার শিষ্যাদিক্রমে জগতের মধ্যে ক্রমবিস্তারিত হইতে পারে। মৃত্যু তোমার দেহকে মাত্র ধ্বংস করিতে পারিল, তোমার আরদ্ধ সাধনার ক্রমবিকাশকে অবরুদ্ধ করিতে পারিল না,-এইখানেই মহাবিক্রান্ত মৃত্যুর আসল পরাজয়।

সারাংশ : মৃত্যু চিরন্তন। কিন্তু মানুষ নিজ কর্মের মাধ্যমে বেঁচে থাকতে পারে। এভাবেই মানুষ মৃত্যুকে জয় করে অমর হতে পারে।


১৭৭

মাতৃস্নেহের তুলনা নাই, কিন্তু অতি স্নেহ অনেক সময় অমঙ্গল আনয়ন করে। যে স্নেহের উত্তাপে সন্তানের পরিপুষ্টি, তাহারই আধিক্যে সে অসহায় হইয়া পড়ে। মাতৃহৃদয়ের মমতার প্রাবল্যে মানুষ আপনাকে হারাইয়া আপন শক্তির মর্যাদা বুঝিতে পারে না। নিয়ত মাতৃস্নেহের অন্তরালে অবস্থান করিয়া আত্মশক্তির সন্ধান সে পায় না-দুর্বল, অসহায় পক্ষীশাবকের মতো চিরদিন স্নেহাতিশয্যে আপনাকে সে একান্ত নির্ভরশীল মনে করে। ক্রমে জননীর পরম সম্পদ সন্তান অলস, ভীরু, দুর্বল ও পরনির্ভরশীল হইয়া মনুষ্যত্ব বিকাশের পথ হইতে দূরে সরিয়া যায়। অন্ধ মাতৃস্নেহ সে কথা বুঝে না-অলসকে সে প্রাণপাত করিয়া সেবা করে-ভীরুতার দুর্দশা কল্পনা করিয়া বিপদের আক্রমণ হইতে ভীরুকে রক্ষা করিতে ব্যর্থ হয়।

সারাংশ : সন্তানের জন্য মাতৃস্নেহ প্রয়োজন। কিন্তু অতিরিক্ত স্নেহ পরিণামে সন্তানের জন্য অমঙ্গলই বয়ে আনে। অন্ধ মাতৃস্নেহের সুযোগে আত্মশক্তির, মানুষ্যত্বের বিকশে বাধাগ্রস্থ হয়, সন্তান হয়ে পড়ে পরনির্ভরশীল।


১৭৮

ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবাই হল জ্ঞানীর কাজ। পিপঁড়ে-মৌমাছি পর্যন্ত যখন ভবিষ্যতের জন্য ব্যতিব্যস্ত, তখন মানুষের কথা বলাই বাহুল্য। ফকির-সন্ন্যাসী যে ঘরবাড়ী ছেড়ে, আহার-নিদ্রা ভুলে, পাহাড়-জঙ্গলে চোখ বুজে বসে থাকে, সেটা যদি নিতান্ত গঞ্জিকার কৃপায় না হয়, তবে বলতে হবে ভবিষ্যতের ভাবনা ভেবে। সমস্ত জীব-জন্তুর দুটো চোখ সামনে থাকবার মানে হল ভবিষ্যতের দিকে যেন নজর থাকে। অতীতের ভাবনা ভেবে লাভ নেই। পণ্ডিতেরা তা বলে গেছেন, ‘গতস্য শোচনা নাস্তি’। আর বর্তমানে নেই বললেই চলে। এই যেটা বর্তমান সেই-এই কথা বলতে বলতে অতীত হয়ে গেল। কাজেই তরঙ্গ গোণা আর বর্তমানের চিন্তা করা সমানই অনর্থক। ভবিষ্যত হল আসল জিনিস। সেটা কখনও শেষ হয় না। তাই ভবিষ্যতে মানব কেমন হবে সেটা একবার ভেবে দেখা উচিত।

সারাংশ : ভবিষ্যতই মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। বর্তমান প্রতি মুহূর্তে অতীতের গহ্বরে মিশে যায়। অফুরন্ত ভবিষ্যৎ সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ। জ্ঞানীদের মতো ভবিষ্যতের ভাবনা ভেবে কাজ করতে পারলেই জীবন সার্থক ও সুন্দর হয়ে ওঠে।


১৭৯

রুপার চামচ মুখে নিয়ে জন্মায় আর কটি লোক। শতকরা নিরানব্বইটি মানুষকেই চেষ্টা করতে হয়, জয় করে নিতে হয় তার ভাগ্যকে। বাঁচে সেই যে লড়াই করে প্রতিকূলতার সঙ্গে। পলাতকের স্থান জগতে নেই। সমস্ত কিছুর জন্যই চেষ্টা দরকার। চেষ্টা ছাড়া বাঁচা অসম্ভব। সুখ চেষ্টারই ফল-দেবতার দান নয়। তা জয় করে নিতে হয়। আপনা আপনি এটা পাওয়া যায় না। সুখের জন্য দু’রকম চেষ্টা দরকার, বাইরের আর ভিতরের। ভিতরের চেষ্টার মধ্যে বৈরাগ্য একটি। বৈরাগ্যও চেষ্টার ফল, তা অমনি পাওয়া যায় না। কিন্তু বাইরের চেষ্টার মধ্যে বৈরাগ্যের স্থান নাই।

সারাংশ : জীবনের লড়াই থেকে পালিয়ে বাঁচবার সুযোগ নেই। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেই জয়কে সুনিশ্চিত করতে হয়। সফলকাম হতে হলে মানুষকে বাইরের-ভিতরের দুই সংগ্রামের চেষ্টা চালাতে হয়।


১৮০

নিন্দা না থাকিলে পৃথিবীতে জীবনের গৌরব কি থাকিত? একটা ভাল কাজে হাত দিলাম, তাহার নিন্দা কেহ করে না, -সে ভাল কাজের দাম কি! একটা ভাল কিছু লিখিলাম, তাহার নিন্দুক কেহ নাই-ভাল গ্রন্থের পক্ষে এমন মর্মান্তিক অনাদর কি হতে পারে? জীবনকে ধর্মচর্চায় উৎসর্গ করিলাম, যদি কোন মন্দ লোক তাহার মধ্যে মন্দ অভিপ্রায় না দেখিল, তবে সাধুতা যে নিতান্তই সহজ হইয়া পড়িল। মহত্ত্বকে পদে পদে কাটা মাড়াইয়া চলিতে হয়। ইহাতে যে হার মানে, বীরের সদগতি সে লাভ করে না। পৃথিবীতে নিন্দা দোষীকে সংশোধন করিবার জন্য আছে-তাহা নহে, মহত্ত্বকে গৌরব দেওয়া তাহার একটা মস্ত কাজ।

সারাংশ : নিন্দুকের নিন্দা মানুষের কাজকে আরো মহিমান্বিত করে তোলে। নিন্দার কাঁটা পায়ে বিঁধে মানুষকে মহৎ কাজে জীবন উৎসর্গ করতে হয়। এতে তার বীরত্বেরই প্রকাশ ঘটে। সে অর্থে মহত্ত্বের স্বীকৃতি দিয়ে থাকে নিন্দা।


১৮১

ক্রোধ মানুষের পরম শত্রু। ক্রোধ মানুষের মনুষ্যত্ব নাশ করে। যে লোমহর্ষক কাণ্ডগুলি পৃথিবীকে নরকে পরিণত করিয়াছে, তাহার মূলেও রহিয়াছে ক্রোধ। ক্রোধ যে মানুষকে পশুভাবাপন্ন করে, তাহা একবার ক্রুদ্ধ ব্যক্তির মুখের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। যে ব্যক্তির মুখখানা সর্বদা হাসিমাখা, উদার ভাবে পরিপূর্ণ, দেখিলেই তোমার মনে আনন্দ ধরে না, একবার ক্রোধের সময় সেই মুখখানির দিকে তাকাইও, দেখিবে, সে স্বপ্নের সুষমা আর নাই- নরকাগ্নিতে বিকট রূপ ধারণ করিয়াছে। সমস্ত মুখ কি এক কালিমায় ঢাকিয়া গিয়াছে। তখন তাহাকে আলিঙ্গন করা দূরে থাকুক, তাহার নিকটে যাইতেও ইচ্ছা হয় না। সুন্দরকে মুহূর্তের মধ্যে কুৎসিত করিতে অন্য কোন রিপু ক্রোধের ন্যায় কৃতকার্য হয় না।

সারাংশ : ক্রোধ মানুষকে পশুর স্তরে নামিয়ে এনে পৃথিবীতে নরক সৃষ্টি করে। মানুষের পরম শত্রু এই রিপুর তাড়নায় মুহূর্তে সুন্দর পরিণত হয় কুৎসিতে।


১৮২

সকল প্রকার কায়িক শ্রম আমাদের দেশে অমর্যাদাকর বলিয়া বিবেচিত হইয়া আসিয়াছে। শ্রম যে আত্মসম্মানের অণুমাত্রও হানিজনক নহে এবং মানুষের শক্তি, সম্মান ও উন্নতির ইহাই প্রকৃষ্ট ভিত্তি, এই বোধ আমাদের মধ্যে এখনও জাগে নাই। জগতের অন্যত্র মানব সমাজ শ্রম সামর্থ্যরে উপর নির্ভর করিয়া সৌভাগ্যের সোপানে উঠিতেছে। আর আমরা কায়িক শ্রমকে ঘৃণা করিয়া দিন দিন দুর্গতি ও হীনতায় ডুবিয়া যাইতেছি। যাহারা শ্রমবিমুখ বা পরিশ্রমে অসমর্থ, জীবন সংগ্রামে তাহাদের পরাজয় অনিবার্য। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগে অযোগ্যের পরিত্রাণ নাই। যাহারা যোগ্যতম তারাই পায় বাঁচিবার অধিকার এবং অযোগ্যর উচ্ছেদ অবশ্যম্ভাবী। সুতরাং পরিশ্রমের অমর্যাদা আত্মহত্যারই শামিল।

সারাংশ : পৃথিবীর অন্যান্য জাতি যখন কায়িক শ্রমের যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে উন্নতির শিখরে আহরণ করছে আমরা তখন তাকে ঘৃণা করে ক্রমশ পিছয়ে পড়ছি। শ্রম বিমুখ হয়ে আত্মহত্যা না করে প্রতিদ্বন্দ্বিতার এ যুগে শ্রমের মর্যাদা দিয়েই মানুষকে জীবন সংগ্রামে জয়ী হবার যোগ্য হয়ে উঠতে হবে।


১৮৩

প্রকৃত জ্ঞানের স্পৃহা না থাকলে শিক্ষার মূল উোদ্দশ্য পূরণ হয় না। এ অবস্থায় পরীক্ষায় পাস করাটাই বড় হয় এবং পাঠ্যপুস্তক পর্যন্তই জ্ঞান সীমাবদ্ধ থাকে। আমাদের দেশে পরীক্ষায় পাস করা লোকের অভাব নেই, কিন্তু জ্ঞানী লোকের অভাব আছে। যেখানে পরীক্ষা পাসের মোহ তরুণ শির্ক্ষীদের উৎকন্ঠিত রাখে, সেখানেই জ্ঞান নির্বসিত। একটি স্বধীন জাতি হিসেবে জগতের বুকে অক্ষয় ও অমরত্ব লাভ করতে হলে জ্ঞানের প্রতি তরুণসমাজকে উম্মুখ করতে হবে। সহজ লাভ আপাতত সুখের হলেও পরিণামে কল্যাণ বয়ে আনে না। পরীক্ষা পাসের মোহ থেকে মুক্ত না হলে তরুণসমাজের সামনে কখনোই দিগন্ত উম্মোচিত হবে না।

সারাংশ : শুধু পাশ করা জ্ঞান সমাজের কোনো কাজে আসে না। এবং এই পুথিগত বিদ্যাদ্বারা শুধু সার্টিফিকেটই অর্জন করা যায়। প্রকৃত জ্ঞান আরোহণ করা যায় না। তাই তরুণ সমাজকে প্রকৃত জ্ঞান অর্থাৎ জগৎ সংসারের কল্যাণমুখী জ্ঞানই অর্জন করতে হবে।


১৮৪

বাল্যকাল হতে আমাদের শিক্ষার সহিত আনন্দ নাই। কেবল যাহা কিছু নিত্যান্ত আবশ্যক তাহাই কন্ঠস্থ করিতেছি। তেমনি করিয়া কোনোমতে কাজ চলে মাত্র কিন্তু মনের বিকাশ লাভ হয় না। হাওয়া খাইলে পেট ভরে না, আহার করিলে পেট ভরে। কিন্তু আহারাদি রীতিমত হজম করিবার জন্য হাওয়া আবশ্যক। তেমনি একটি শিক্ষাপুস্তককে রীতিমত হজম করিতে অনেকগুলি অপাঠ্য পুস্তকের সাহায্য আবশ্যক। ইহাতে আনন্দের সহিত পড়িতে পারিবার শক্তি অলক্ষিত ভাবে বৃ্দ্ধি পাইতে থাকে। প্রহণশক্তি, ধারণশক্তি, চিন্তাশক্তি বেশ সহজে এবং স্বাভাবিক নিয়মে বল লাভ করে।

সারাংশ : আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় শুধু জ্ঞানগর্ব শিক্ষাই প্রদান করা হয়ে থাকে। এতে শিক্ষা লাভে কোন আনন্দ থাকে না। আনন্দ ছাড়া বছরের পর বছর কিছু গ্রহণ করাও যায় না। এতে অনিহা তৈরি হয়। তাই পাঠ্যপুস্তকের পড়ার পাশাপাশি সাহিত্য চর্চা বা আনন্দের যোগ থাকতে হবে।


১৮৫

আমরা দেশকে সাজাব আমাদের কল্পনা দিয়ে, অনুভূতি দিয়ে, সৌন্দর্যবোধ দিয়ে-জননী করে নয়, প্রিয়া করে। কারণ প্রিয়াকে আমারা সৃষ্টি করতে পারি, কিন্তু জননী আমাদের প্রষ্ঠা জননী অতীতের , প্রিয়া বর্তমান ও ভবিষ্যতের । আজো যে আমরা দেশকে প্রগতিশীল করে তুলতে পরিনি, তার কারণ দেশকে আমরা জননী করে দেখছি, প্রিয়া করে নয়। জননীর জন্য প্রগতি নিষ্ট প্রয়োজন, অতীতের সুমধূর স্মৃতিতেই তার তৃপ্তি; প্রিয়াকে কিন্তু পরিবর্তনশীল হতে হয়, কারণ জীবনের নব নব স্বাদ পাওয়া ও পাওয়ানো তা জীবনধর্ম।

সারাংশ : [এখনো লিখা হয়নি। কমেন্ট বক্সে সারাংশটি লিখে সহায়তা করুন।]


১৮৬

শ্রমকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহন কর। কালি-ধুলার মাঝে, রৌদ্র- বৃষ্টিতেকাজের ডাকে নেমে যাও। বাবু হযে ছায়ার তলে থাকবার দরকার নেই। এ হচ্ছে মৃত্যুর আয়োজন। কাজের মধ্যে কুবুদ্ধি কুমতলব মানবচিত্তে বাসা বাঁধতে পারে না।কাজে শরীরকে সামর্থ্য জন্মে। স্বাস্থ্য, শক্তি, আনন্দ, ফূর্তি সকলই লাভ হয়।পরিশ্যমের পর যে অবকাশ লাভ হয় তা পরম আনন্দের অবকাশ। তখন কৃত্রিম আয়োজন করে আনন্দ করার কোনো প্রয়োজন হয় না। শুধু চিন্তর দ্বারা জগতের হিতসাধন হয় না। মানব সমাজে মানুষের সঙ্গে সঙ্গে কাজে, রাস্তায়-কারখানায়, মানুষের সঙ্গে ব্যবহারে মানুষ নিজেকে পূর্ণ করে।

সারাংশ : শ্রম মানুষের সামগ্রিক উন্নতি বয়ে আনে। শ্রম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরিপূর্ণ মানুষ হওয়া যায় না। চিন্তা ও বই জ্ঞানের যে দ্বার উন্মোচন করে, তা পূর্ণতা পায় কায়িক শ্রমে।


১৮৭

মানুষের মূল্য কোথায়? চরিত্রে, মনুষ্যত্বে, জ্ঞানে ও কর্মে। বস্তু চরিত্র বলেই মানুষের জীবনের যা কিছু শ্রেষ্ঠ তা বুঝাতে হবে। চরিত্র ছাড়া মানুষের গৌরব করার আর কিছুই নেই। মানুষের শ্রদ্ধা যদি মানুষের প্রাপ্য হয়, মানুষ যদি মানুষকে শ্রদ্ধা করে সে শুধু চরিত্রের জন্য। অন্য কোনো কারণে মানুষের মাথা মানুষের সামনে নত হবার দরকান নেই। জগতে যে সকল মাহাপুরুষ জন্ম গ্রহণ করেছেন, তাদে গৌরবের মূলে এই চরিত্র শক্তি। তুমি চরিত্রবান লোক, এই কথার অর্থ এই নয় যে তুমি শুধু লম্পট নও। তুমি সত্যবাদী, বিনয়ী এবং জ্ঞানে প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ কর। তুমি পরদুঃখকাতর, ন্যায়বান এবং মানুষের ন্যায় স্বাধীনতা প্রিয়। চরিত্রবান মানেই এই।

সারাংশ : মানুষের জীবনের উৎকর্ষ-অপকর্ষের বিচার হয় তার চরিত্র-পরিচয়ে। মানুষের জীবন ও কর্মের মহিমা তার চরিত্রের আলোকেই পায় দীপ্ত। মানুষ তার চরিত্র-বৈশিষ্ট্য অনুসারেই কাজ ও চিন্তা করে এবং সেই অনুযায়ীই সমাজ-জীবনে ভূমিকা রাখে। মানুষের জীবনে চরিত্র যেন অলঙ্কার ও সম্পদ। তা তাকে দেয় উজ্জ্বল শোভা ও সমুন্নত মহিমা।


১৮৮

জাতি শুধু বাইরের ঐশ্বর্যসম্ভার, দালানকোঠার সংখ্যাবৃদ্ধি কিংবা সামরিক শক্তির অপরাজেয়তায় বড় হয় নয়। বড় হয় অন্তরের শক্তিতে, নৈতিক চেতনায়, আর জীবন পণ করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ক্ষমতায়। জীবনের মূল্যবোধ ছাড়া জাতীয় সত্তার ভিত কখনও শক্ত আর দুর্মুল্য হতে পারে না। মূল্যবোধ জীবনাশ্যয়ী হয়ে জাতির সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়লেই তবে জাতি অর্জন করে মহত্ত্ব আর মহৎ কর্মের যোগ্যতা। সবরকম মূল্যবোধের বৃহত্তম বাহন ভাষা, তথা মাতৃভাষা, আর তা ছড়িয়ে দেবার দায়িত্ব শুধু লেখক আর সাহিত্যেকদেরই নয় বরং সর্বস্তরের জনগণের।

সারাংশ : বাইরের সমৃদ্ধিতে জাতি বড় হয় না, বড় হয় অন্তরের শক্তি ও ঐশ্বর্যে। জীবনাশ্রয়ী মূল্যবোধ অর্জনের ফলে জাতীয় সত্তার ভিত মজবুত হয়। লেখক আর সাহিত্যিকদের এই মূল্যবোধের কথা মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রচার করতে হবে।


১৮৯

দেশকে যে নারীর করুণা নিয়ে সেবা করে সে পুরুষ নয়, হয়তো মহাপুরুষ। কিন্তু দেশ এখন চায় মহাপুরুষ নয়। দেশ চায় সেই পুরুষ, যার ভালোবাসায় আঘাত আছে, বিদ্রোহ আছে। যে দেশকে ভালোবেসে শুধু চোখের জলই ফেলবে না, সে দরকার হলে আঘাতও করবে, প্রতিঘাতও বুক পেতে নেবে, বিদ্রোহ করবে। বিদ্রোহ করা, আঘাত করার পশুত্ব বা পৈশাচিকতাকে যে অনুভূতি নিষ্ঠুরতা বলে দোষ দেয় বা সহ্য করতে পারে না, সেই অনুভূতিই হচ্ছে নারীর অনুভূতি, মানুষের এটুকুই হচ্ছে দেবত্ব। যারা পুরুষ হবে, যারা দেশসৈনিক হবে, তাদের বাইরে ঐ পশুত্বের বা অসুরত্বের বদনামুটুকু সহ্য করে নিতে হবে। যে ছেলের মনে সেবা করার নামে বুকে জড়িয়ে ধরার ইচ্ছাটি প্রবল, তার সৈনিক না হওয়াই উচিত। দেশের দুঃখী, আর্ত-পীড়িতদের সেবার ভার এসব ছেলেরা ভালোভাবেই গ্রহণ করতে পারে।

সারাংশ : দেশ ও জাতি যখন বিপন্ন, দুর্দশাগ্রস্ত থাকে তখন প্রয়োজন অপ্রতিরোধ্য ও অদম্য শক্তিধর পুরুষের। কারণ দেশ ও জাতিকে রক্ষা করা তার পক্ষেই সম্ভব যে বিদ্রোহ করতে পারে, আত্মদান করতে পারে।


১৯০

পৃথিবীতে কোনো কিছুই নিজের জীবনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। অতএব, সব কিছুর বিনিময়ে আগে নিজের জীবন জিইয়ে রাখতে হবে; অন্তত জিইয়ে রাখার চেষ্টা করতে হবে। কেননা, জান থাকলেই জাহান। ধড়ে প্রাণ থাকলে পরে অনেক কিছু প্রমাণ করা যায়। মরণের পর বেহেশতে যেতে চাও?- ভালো কথা, তবে সেটা মানুষকে মেরে নয়, বরং মানুষকে ভালোবেসে, মানুষকে বাঁচিয়ে।

সারাংশ : মানব জীবন অত্যন্ত মূল্যবান। তাই জীবনে বেঁচে থাকাটা প্রথমে নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু জীবনে বেঁচে থাকাটা সার্থক হয়ে ওঠে মানুষকে ভালোবাসার মাধ্যমে।


১৯১

বর্তমান সভ্যতায় দেখি, এক জায়গায় একদল মানুষ অন্ন উৎপাদনের চেষ্টায় নিজের সমস্ত শক্তি নিয়োগ করেছে, আর এক জায়গায় আর একদল মানুষ স্বতন্ত্র থেকে সেই অন্নে প্রাণধারণ করে। চাঁদের এক পিঠে অন্ধকার, অন্য পিঠে আলো-এ সেইরকম। একদিকে দৈন্য মানুষকে পঙ্গু করে রেখেছে অন্যদিকে ধনের সন্ধান, ধনের অভিমান, ভোগবিলাস-সাধনের প্রয়াসে মানুষ উন্মত্ত। অন্নের উৎপাদন হয় পল্লিতে, আর অর্থের সংগ্রহ চলে নগরে। অর্থ উপার্জনের সুযোগ ও উপকরণ সেখানেই কেন্দ্রীভূত; স্বভাবতই সেখানে আরাম, আরোগ্য, আমোদ ও শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়ে অপেক্ষাকৃত অল্পসংখ্যক লোকাকে ঐশ্বর্যের আশ্রয় দান করে। পল্লিতে সেই ভোগের উচ্ছিষ্ট যা-কিছু পৌঁছায় তা যৎকিঞ্চিৎ। 

সারাংশ : বর্তমান সভ্যতায় উৎপাদন ও পরিভোগে বিশাল ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে। পল্লির বিপুল জনগণ অন্ন উৎপাদন করেও দারিদ্র্যাকবলিত। অথচ নগরের মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীরা ভোগবিলাসিতায় আচ্ছন্ন। অর্থের কেন্দ্রীভবন নগরকে দিয়েছে নানা নাগরিক সুবিধা। পক্ষান্তরে, পল্লি সুবিধাবঞ্চিত ও অন্ধকারে নিমজ্জিত।