তানপুরায় অনুশীলনের উপকারগুলোর তালিকায় নিচে ৭ নম্বর পয়েন্ট হিসেবে তানপুরা সুর করা একটি সুরের অনুশীলন হিসেবে যুক্ত করা হলো এবং পূর্বের তালিকার সঙ্গে সাজিয়ে দেওয়া হলো।
তানপুরায় অনুশীলনের উপকার:
১) শ্রুতি সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি (Ear Training for Microtones): তানপুরার একটানা সুর (ড্রোন) শ্রুতিকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সংবেদনশীল করে। এটি গায়ক বা বাদককে স্বরের মাইক্রোটোনাল (সূক্ষ্ম স্বর) পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে, যা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হারমোনিয়ামে নির্দিষ্ট কী (keys) থাকায় এই সূক্ষ্ম স্বরের অনুশীলন সম্ভব হয় না।
২) স্বরের বিশুদ্ধতা (Pitch Accuracy): তানপুরার সুর কোনো নির্দিষ্ট কী-এর উপর নির্ভর করে না, বরং এটি একটি অবিচ্ছিন্ন সুর তৈরি করে। এটি গায়ককে তাদের কণ্ঠের স্বরকে তানপুরার সঙ্গে মিলিয়ে গাইতে বাধ্য করে, যা স্বরের বিশুদ্ধতা ও নির্ভুলতা বাড়ায়। হারমোনিয়ামে স্বরগুলো আগে থেকেই নির্দিষ্ট থাকে, তাই এই ধরনের সূক্ষ্ম অনুশীলন কম হয়।
৩) রাগের মেজাজ ধরে রাখা (Sustaining Raga Mood): তানপুরার একটানা ড্রোন রাগের ভাব বা মেজাজ ধরে রাখতে সাহায্য করে। এটি গায়ক বা বাদককে রাগের স্বরগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে সংযোগ স্থাপন করতে সহায়তা করে। হারমোনিয়ামে বাজানোর সময় সুরের ধারাবাহিকতা বা ড্রোনের মতো প্রভাব থাকে না, যা রাগের গভীরতা অনুভব করতে বাধা দেয়।
৪) কণ্ঠের স্বাভাবিকতা বজায় রাখা (Natural Voice Development): তানপুরার সঙ্গে অনুশীলন করলে গায়কের কণ্ঠ স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়। তানপুরা কোনো সুর বা স্বর নির্ধারণ করে না, তাই গায়ককে নিজের কণ্ঠের স্বাভাবিক সুর ও শক্তি ব্যবহার করতে হয়। হারমোনিয়ামের সঙ্গে গাইলে অনেক সময় গায়ক যন্ত্রের সুরের উপর নির্ভর করে, যা কণ্ঠের স্বাধীনতা কিছুটা হ্রাস করতে পারে।
৫) ধৈর্য ও একাগ্রতা বৃদ্ধি: তানপুরার সঙ্গে অনুশীলন করতে গেলে গায়ক বা বাদককে দীর্ঘ সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট স্বরের সঙ্গে মিলিয়ে গাইতে বা বাজাতে হয়। এটি ধৈর্য ও একাগ্রতা বাড়ায়। হারমোনিয়ামে দ্রুত সুর পরিবর্তন বা রাগের স্বর বাজানো যায়, তাই এটি তুলনামূলকভাবে কম ধৈর্যের প্রয়োজন হয়।
৬) অন্তর্নিহিত সুরের গভীরতা অনুভব (Understanding Overtones): তানপুরার তারে বিভিন্ন ওভারটোন (harmonic overtones) তৈরি হয়, যা সঙ্গীতের গভীরতা ও সমৃদ্ধি বাড়ায়। এটি গায়ক বা বাদককে সুরের সূক্ষ্ম স্তরগুলো অনুভব করতে শেখায়। হারমোনিয়ামে এই ধরনের ওভারটোন তৈরি হয় না, তাই এই গভীরতা অনুভব করা সম্ভব নয়।
৭) তানপুরা সুর করার মাধ্যমে সুরের অনুশীলন (Tuning as a Musical Exercise): তানপুরা সুর করার প্রক্রিয়া নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরের অনুশীলন। এটি গায়ক বা বাদককে সঠিক স্বর (পঞ্চম, সপ্তম বা ষষ্ঠ স্বর) নির্ধারণ করতে এবং তারের সূক্ষ্ম সমন্বয়ের মাধ্যমে সুরের ভারসাম্য বজায় রাখতে শেখায়। এই প্রক্রিয়া শ্রুতির সংবেদনশীলতা ও স্বরের সঠিকতা বাড়ায়, যা হারমোনিয়ামে সম্ভব নয় কারণ এর স্বরগুলো আগে থেকেই নির্দিষ্ট এবং যান্ত্রিক। তানপুরা সুর করার সময় গায়ক বা বাদককে সুরের সঙ্গে গভীরভাবে মনোযোগ দিতে হয়, যা তাদের সঙ্গীতের প্রতি সংযোগ ও সচেতনতা বাড়ায়।
হারমোনিয়ামের সীমাবদ্ধতা:
নির্দিষ্ট স্বর (Tempered Scale): হারমোনিয়াম সমান-তাপিত স্কেল (equal-tempered scale) অনুসরণ করে, যা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সূক্ষ্ম স্বরগুলো (মাইক্রোটোনস) প্রকাশ করতে পারে না। তানপুরা এই সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত।
যান্ত্রিক শব্দ: হারমোনিয়ামের শব্দ যান্ত্রিক এবং কৃত্রিম, যা রাগের ভাবকে কিছুটা প্রভাবিত করতে পারে। তানপুরার শব্দ প্রাকৃতিক এবং ধ্যানমগ্ন পরিবেশ তৈরি করে।
স্বরের সীমাবদ্ধতা: হারমোনিয়ামে নির্দিষ্ট কী-এর মাধ্যমে স্বর বাজানো হয়, যা গায়ক বা বাদককে যন্ত্রের উপর নির্ভরশীল করে তুলতে পারে। তানপুরা এই নির্ভরতা দূর করে স্বাধীনভাবে সুর গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
উপসংহার:
তানপুরায় অনুশীলন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জন্য অপরিহার্য, কারণ এটি শ্রুতি, স্বরের বিশুদ্ধতা, রাগের গভীরতা, কণ্ঠের স্বাভাবিকতা এবং সুরের সঠিকতা বিকাশে সহায়তা করে। তানপুরা সুর করার প্রক্রিয়া নিজেই একটি অনুশীলন হিসেবে কাজ করে, যা শ্রুতির সংবেদনশীলতা ও সুরের সঙ্গে গভীর সংযোগ স্থাপনে সহায়ক। হারমোনিয়াম দিয়ে রাগের স্বর শেখা বা বাজানো সহজ হলেও, এটি তানপুরার মতো সূক্ষ্ম শ্রুতি ও ভাবের গভীরতা প্রদান করতে পারে না।