২০০৬ সালে প্রকাশিত, Dan Brown-এর বিখ্যাত বই ‘The Da Vinci Code’। বইটি নিয়ে আছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। বইটিতে অন্যতম দুটি চরিত্র– Sir Leigh Teabing (স্যার লেই টিবিং) এবং Jacques Saunière (জ্যাক সনিয়ে)। Protagonist-এর বাহিরে এ দুটি চরিত্র নিয়ে আলোচনার যথেষ্ট জায়গা থেকে যায়। দুজনেই যে যার ফিল্ডে অসম্ভবরকমের Brilliant & Passionate, তা সত্ত্বেও কিছু তফাৎ তো থেকেই যায়, যা বিশ্লেষণযোগ্য।
বৃটিশ নাইটহুড উপাধিপ্রাপ্ত, লেই টিবিংয়ের গোড়ামী ও অহমিকার মতো কিছু আত্মিক-ব্যাধি আছে। যিনি আবার সত্য অনুসন্ধানী বটে। অ্যাকাডেমি ও প্রফেশনকে উজাড় করে– দীর্ঘদিন ধরে খুজে আসছেন, খ্রিষ্টধর্মের আলোচিত ‘Holy Grail’। হলি গ্রেইলের ব্যাপারে, যার থেকে ভালো বিশেষজ্ঞ, দ্বিতীয়জন খুঁজে পাওয়া মুশকিল।
‘হলি গ্রেইল’ নিয়ে প্রচলিত রয়েছে নানান Conspiracy Theory। শত-শত বছর ধরে খ্রিষ্টধর্মীয় বিশ্ব চার্চব্যবস্থা যেটিকে ‘হলি গ্রেইল’ বলে পরিচিত করেছে– Leonardo da Vinci তার বিখ্যাত ‘The Last Supper’ চিত্রকর্মে এ নিয়ে ঠিক বিপরীত এক ব্যাখ্যায় ইঙ্গিত করেছেন।
সারকথা হলো— আসল ‘হলি গ্রেইল’ পৃথিবীর সামনে উন্মুক্ত করে দিতে পারলে, রাজা কনস্টানটিনের ৩২৫ সালের ‘First Council of Nicaea’ নামক ধর্ম সভায়– প্রাচীন প্রকৃতি পূজা ‘Paganism’ অনুসারী গোষ্ঠির কিছু রীতিনীতি নকল করে, ভোটাভুটির ভিত্তিতে খৃষ্টধর্মের মৌলিক বিষযবস্তুসমূহ– যেমনঃ জিসাসের পরিচয়, চার্চের আধিপত্য ও সাংগঠনিক কার্যক্রম, পোপের ক্ষমতা ইত্যাদি যা যা নির্ধারিত হয়েছিলো তা সমূলে উৎখাত হয়ে যাবে।
জিসাস যে খোদাপুত্র না, তিনিও আমাদের মতো রক্ত-মাংসের মানুষ ছিলেন, চার্চ যাকে চিরকুমার বলে– ‘ম্যারি ম্যাগদালিন’-এর গর্ভে আসলে তাঁর সন্তান ছিলো– এসব একবার প্রকাশিত হয়ে গেলে হাজার বছরের প্রচলিত চার্চ ব্যবস্থার অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।
সত্য প্রকাশিত হওয়াটাই উত্তম বলে মনে করেন লেই টিবিং। তার মতে, মিথ্যার উপরে প্রতিষ্ঠিত কিছু যতই প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন– তার অস্তিত্ব স্বীকার করা ঠিক না। সমস্যা হলো, এতে চার্চপন্থীদের সাথে চার্চবিরোধীদের চরম দন্ড শুরু হবে। পৃথিবী আবারো খৃষ্টধর্মীয় অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ– যেমনঃ ১৬১৮-১৬৪৮ সালে ইউরোপের ‘Thirty Years' War’-এর মতো মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে পড়বে; যে যুদ্ধে প্রায় ৪-১২ মিলিয়ন Catholics ও Protestants-সহ সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছিলো।
লেই টিবিং যে সত্য খুঁজে চলেছেন তা উন্মুক্ত করতে এবং নিজের আত্মতুষ্টির জন্য– তিনি নির্দ্বিধায় দুয়েক মিলিয়ন মানুষের রক্ত খুজ সহজেই বিসর্জন দেওয়াতে প্রস্তুতও রয়েছেন!
জ্যাক সনিয়ে ছিলেন ফরাসি ‘Louver Museum’-এর প্রধান কিউরেটর। সোজাসাপ্টা সাধারণ একজন মানুষ। সরকার এবং জনসাধারণ যাকে নিছক একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসাবেই চিনেন মাত্র। কিন্তু তিনি ‘হলি গ্রেইল’-এর মতো পৃথিবীর সব থেকে গুরুত্ববহ একটি সিক্রেট ধারণ করে আসছেন, যা কেউ কখনো ভাবতেও পারেনা। সবার অগোচরে ডাবল লাইফ লিড করেছেন মৃত্যুঅব্ধি। শুধু তাই নয়, তিনি একটি সিক্রেট স্যোসাইটির প্রধানও বটে! তিনিসহ সর্বমোট মাত্র চারজন সদস্য ‘হলি গ্রেইল’-এর মতো সিক্রেটের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। যাদের তিনজনই সে বিকট রাতে হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন, যে রাতে জ্যাক সনিয়েও অস্তিমিত হয়েছিলেন।
সিক্রেট স্যোসাইটিটির নাম ‘Prieuré de Sion’ (প্রয়োরি অব সাইওন)। Sir Isaac Newton, Sandro Botticelli, Victor Hugo, Leonardo da Vinci-দের মতো কয়েকজন জগদ্বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব এই স্যোসাইটির প্রধান তথা Grand Master ছিলেন। সিক্রেট স্যোসাইটিটি ‘প্যাগান’-দের কিছু আচার-অনুষ্ঠান গোপনে চর্চা করে আসছে। শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে যাদের মূল দায়িত্ব হলো, জিসাস ও ম্যারি ম্যাগদালিনের বংশধরদেরকে চার্চের বাহিনীর থেকে রক্ষা করে গোপন আশ্রয় প্রদান করা । চার্চ যদি জিসাসের কোনো বংশধর খুঁজে পায়, তাহলে চার্চের প্রয়োজনেই তাঁকে নির্ঘাত হত্যা করতে হবে– যেমনটা ‘Crucifixion’এর ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।
বর্তমান গ্রান্ডমাস্টার জ্যাক সনিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ‘প্রয়োরি অব সাইওন’- তাদের রক্ষিত সিক্রেটটি প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকবে। এতে করে চার্চের ক্ষতি সাধন সাধন হবে, তারা তা করবে না। মূলত খ্রিষ্টানদের আরেকটি রক্তযুদ্ধ প্রতিহত করতে, এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক্ষেত্রে জ্যাক সনিয়ের চিন্তা-ভাবনা হলো, “কিছু সিক্রেট, সিক্রেট থাকাই শ্রেয়– যা হবে অধিকাংশের জন্য মঙ্গলকর”। কিন্তু আমাদের আরেকজন জিনিয়াস, লেই টিবিং, কোনোভাবেই তা মানতে নারাজ।
জ্যাক সনিয়ে চরিত্রের উল্লেখযোগ্য কিছু বৈশিষ্ট্যঃ
জ্যাক সনিয়ে ছিলেন খুব সাদাসিধে একজন মানুষ। যিনি জীবিকার তাগিদের কর্মজীবন ও সিক্রেট লাইফ পৃথক রাখতে পেরেছেন।
উচ্চপদস্থ সাধারণ সরকারি চাকুরিজীবী হয়েও তিনি খ্যাতি এড়িয়ে থাকতেন।
ইউরোপের প্রাচীন এক সিক্রেট স্যোসাইটিটির সদস্য হয়ে, গ্রান্ডমাস্টার হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। এই দুনিয়ায় তিনি সাধারণ মানুষ হলেও সিক্রেট দুনিয়ায় তিনি আসলে অসাধারণ মানুষ।
খুব নিরিবিলি মানুষ ছিলেন তিনি, সহজে কারো সাথে সাক্ষাৎ করতেন না। অধিকাংশ একা সময় কাটাতেন। প্রচলিত অর্থে খুব বেশী সামাজিক না হলেও সিক্রেট দুনিয়ার সামাজিকতা যাকে ঘিরে রচিত হতো।
মাইন্ড গেইমস, ক্রিপ্টো গেইমসগুলোর মতো নানান brain teaser, নিজের লাইফে এমনকি ছোট্ট নাতনির সাথেও প্রতিনিয়ত চর্চা করতেন, যেমনটা লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি করে থাকতেন। একা সময় উপভোগ ও সিক্রেট রক্ষার জন্য মূলত এই চর্চাগুলো করে থাকেন তারা।
জ্যাক সনিয়ের দূরদর্শিতা ছিলো আকাশচুম্বী। তার মৃত্যুর পর, হাজার বছরের সংরক্ষিত সিক্রেট, সামান্য চার লাইনের একটা ক্রিপ্টো মেসেজের মাধ্যমে, অরক্ষিত দুজন মানুষের কাছে ট্রান্সফার করতে পেরেছেন সফলভাবে, যাদের একজন আবার স্বয়ং জিসাসের DNA ধারণকারী বংশধর!
বিতর্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে বলা যায়, Sir Leigh Teabing (স্যার লেই টিবিং) এবং Jacques Saunière (জ্যাক সনিয়ে), উভয় চরিত্রই জিনিয়াসের যাবতীয় গুণাবলী বহন করে। তবে, দুজনের দৃষ্টিভঙ্গি দুমেরুতে বিক্ষিপ্ত, যা তাদের চারিত্রিক বিভাজনের জন্য যথেষ্ট।