নারী ও বহুরূপতা ..............
নীল কান্ত মণি,
সংক্ষেপে নীল মণি,পরশ পাথর। পৃথিবীর সকল আপেক্ষিকতার মাঝে ইনিও নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। অথচ তাকে প্রধান ধরেই অন্যদের কাজ করার কথা। খুব ছোট্ট একটা শহরের, ছোট্ট একটা গ্রামে তার জন্ম। ওখানেই বেড়ে উঠা। অনেক চঞ্বলতার মাঝে নিজেকে গড়ে তোলা। বাবার কড়া শাসনকে টপকে মায়ের ভালবাসাকে জয় করে, দুরন্তপনার মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠা। ছোট থেকেই একটু একঘেয়ে আর জেদী ছিল নীল মণি। বাড়ির বড়রাও তাকে তার জেদ থেকে সরাতে পারেনি।
একদিন বাবার কথা না মানায় মার খেতে হবে ভেবে কার্ণিশে লুকিয়ে ছিল ৩ ঘন্টা। সে এতটাই দূরন্ত ছিল যে তার মা একদিন তাকে থামাতে গরম লোহা খুন্তি ছুঁয়িয়ে দিয়েছিল, দাগ টা একনো মিশে যায়নি। দুষ্টুর সেরা বোধহয় সেই ছিল। কারন, মা তাকে বলেছিল এ বিষয়টা তোর ফুপি যেন না জানে, সে অনেক অনুরোধ করে আশ্বাস দিয়ে বলেছিল বলবেনা, কিন্তু ফুপি বাড়ি যাওয়ার সাথে সাথেই ফুপি কে বলে দেয় সে। এতটাই পাজি।।
তার পরিবারের বাবা মা ছাড়াও তার আরো আপনজন ছিল তার বোনেরা। পাঁচ বোন তারা। বাবা বিকেলে সবাইকে নিয়ে গল্পে মেতে উঠত। রাতের তারাগুলোকে এক এক করে চিনিয়েছে তাদের বাবা। ফেরেশতার মত লম্বা- চওড়া মানুষ তিনি। পাঁচ ওয়াক্ত নামায কখনো বাদ যেতনা।
বোনদের, বাবার- মার কারো ভালবাসার কমতি ছিলনা। যখন যা ইচ্ছে হয়েছে তাই করত নীল মণি। জেদের কাছে কাবু হয়ে পরিবার বরাবরই চুপ থাকত। নীল মণির সবথেকে উজ্জ্বল
ছিল তার হাসি। সে অনেক হাসতে পারত। এমন যেন তার হাসির কোনোদিন শেষ হবেনা। আর ছিল খুব বাচ্চামি। বরাবর ই ক্লাসে প্রথম হত নীলমণি। সবদিক থেকেই সে একদম পারফেক্ট।
এমন দূরন্তপণারও ভাটি পড়ে যায় এক সময়, তার আকাশটা মেঘে ঢেকে যায় কালো আধারে। তার হাসিগুলো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যে মলিন হতে থাকে। যাকে নিয়ে পুরো পৃথিবী ছিল তার সেই আকাশটা চুরি হয়ে যায় এক নিমীষে । নির্বাক, মেঘে ঢাকা সেই আকাশের উপরে থেকে সূর্যের প্রখরতা নিয়ে হাজির হয় পরশ মানে স্পর্শ। সেই কালো মেঘগুলোকে গলিয়ে বৃষ্টি নিয়ে আসে সে। গা ভিজায় নীলমণি। ভুলে যায় সব পুরোনো স্মৃতি, ফিরে পায় তার হাসি, সেই উচ্ছ্বলতা। পরশের এই উপকার সে কোনোদিনও ভুলতে পারবেনা।। সারাক্ষন সময় কাটাতো পরশের সাথে। আর পরশ শুধু চেয়ে থাকত নীলমণির দিকে। " আচ্ছা নীলমণি তুমি এত হাসো কিভাবে? " "যার জীবনে তোমার মত কেউ আছে, সে তো হেসেই যাবে, তাইনা? " কত সময় যে কাটিয়েছে নদীর ধারা দেখতে দেখতে, তা নিজেও জানেনা। একটু সময় পরশ কে ছাড়া সে উতলা হয়ে যেত। আস্তে আস্তে পরশ তার একমাত্র নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠে। পরশকে ছাড়া যেন সে এক কি.মি. এর রাস্তা টা পর্যন্ত যেতে পারেনা। যেদিকেই তাকায় যেদিকেই যায় শুধু পরশ আর পরশ।।
ওদিকে পরশও মায়াজালে আটকা পড়ে নীলমণির। তার হাসিটা সে খুব উপভোগ করত, আর তার মাইরগুলো আরো আনন্দ দিত যেগুলো দেখে রাস্তার ঘুরতে আসা এক মহিলা বলেই ফেলে, "ইশশশ ছেলেটারে মেরেই ফেলল রে।" নীলমণি সারাক্ষন ই এটা চাই, ওটা কর, এখনই কর, এরকম করত, আর পরশ সেগুলো যেভাবেই করে ফেলত, শুধু নীলমণির হাসির জন্য।
নীলমণি আর পরশ একদিন ঘুরতে যায়, হঠাৎ পরশের রাগ হয়, যাও তোমার সাথে থাকবনা আমি, বলেই সামনের দিকে পা বাড়ায় পরশ, হঠাৎ পিছনে ফিরে দেখে নীলমণি নেই। সে অস্থির হয়ে খোঁজাখুজি শুরু করে, কোথায় সে? এত মানুষের ভিড়ে কই ই বা খুঁজবে পরশ। দিশেহারা মাতাল অবস্থায় যখন হন্ন হয়ে যায় ঠিক তখনই নীলমণি দৌড়ে এসে পরশের কাঁধে চড়ে বসে। "কি? খুব তো বলেছিলে চলে যাবে, যাও এখন।" "আমি তোমার সাথে কথা বলবনা নীলমণি।" "খুব অভিমান হইছে তাইনা? হইছে আর অভিমান করতে হবেনা, আমি আমার পরশকে ছেড়ে, কই যাবো, পাগলাটা তো আরো পাগল হয়ে যাবে।" "ইহহহহহ,, ভাব করতে আসছে, যাও এখান থেকে।" "সত্যি চলে যাবো, গেলাম কিন্তু।" "না, যেওনা।" এভাবেই চলতে থাকে তাদের জীবন।। অনেক আনন্দ হাসি আর স্বাচ্ছন্দে দিন কাটতে থাকে তাদের।।।
২২ অক্টোবর,,, পরিবারের সবার সম্মতিতে বিয়ে হয় নীলমণি আর পরশের। অগ্নিসাক্ষি করে নীলমণিকে ঘরে তুলে পরশ। অনেকগুলো কই মাছে ভরা গামলা থেকে তার আংটি টা খুঁজে বের করে পড়িয়ে দেয় নীলমণি কে। নতুন সংসারে, নতুন জীবনে আবদ্ধ হয় নীলমণি।
হারিয়ে ফেলতে থাকে দূরন্তপনা, এখন শুধু স্মৃতিচারণ ছাড়া সেগুলোর কোনো দাম নেই। সারাদিন অফিস করে বাসায় ফিরে পরশ আর নীলমণি। নীলমণির ক্লান্তির কথা ভেবেই এসেই পরশ দুজনের জন্য শরবত বানাতো সবসময়। ঘরের বুয়া মাঝে মাঝে না আসলে দুজনে মিলে রান্না করত। নীলমনি যখন গরমে ঘামে ভিজে যেত পরশ সেটা মুছে দিত পরম আদরে।
দুজনে সুখে শান্তিতে কাটাতে থাকল তাদের সময়।
কয়েক বছরের মাঝেই কোল জুড়ে আসে ছোট্ট ফুটফুটে একটা মেয়ে। নাম রাখা হয় স্নান। স্নান করার পর সবাইকে যেমন সতেজ দেখায় তেমনি সবসময়ের সুন্দর ছিল স্নান। নজর যাতে না লাগে তার জন্য নজর ফোটা কখনো সরানো যেত না। স্নানকে পেয়ে নীলমণি আর পরশ অত্যন্ত খুশি। কয়েকমাস পর স্নান হাটতে শিখছে মায়ের আর বাবার আঙুল ধরে ধরে, পড়ে যাচ্ছে, আবার গুটি গুটি পায়ে উঠে দাড়িয়ে এগিয়ে আসছে। ঘরে যা পাচ্ছে তাই নিয়েই মুখে দিচ্ছে সে। মায়ের মতই হয়ত দুরন্ত হবে সে। সারাদিন কাজ করে এসেই পরশ প্রথমেই মেয়েকে কোলে তুলে নিবেই, আর হাতের চকলেট ধরিয়ে দিবে, ঘুম পারাবে। এটা না করলে পরশের সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়না। আর নীলমণি র সেই প্রথম দিন থেকেই রুটিন- চাটনি তাকে আনতেই হবে, আর সেটা তেঁতুলেরই হওয়া চাই।। ডাক্তারের এত বারন তবুও চাই ই চাই।। নীলমণি তো সারাদিন বাচ্চাকে সামলাতেই দিন কাটে তাই ঘরে ফিরে পরশ নীলমণিকে সাহায্য করে খায়িয়ে দেয়। পরশ নীলমণি কে এতটাই ভালবাসে যে এতদিনেও তার কমতি তো হয়ই নি, বরং খালি বাড়ছেই। প্রতি রাতে এখনো বুকে মাথা না রেখে নীলমণি ঘুমায় না।
এভাবেই সময়ের কাটায় চলতে চলতে স্নান বড় হয়। মা য়ের ছোট বেলার দুষ্টুমি গুলো স্নান করে। মা শাসন করে আবার হাসে । আর স্নান মায়ের রাগ দেখলেই বাবার কাছে এসে লুকোয়। বাবাকে বিচার দেয়, "বাবা, বাবা, জানো, মা না আজকে আমাকে অনেক বকা দিয়েছে, মা কে বকে দাও তো যেন মা আমার সাথে আর এমন না করে। " " ঠিক আছে বাবা আমি বকে দিব, এখন তুমি ঘুমাও, কেমন? "
তারপর পরশ যখন নীলমণির কাছে যায়, উল্টো, নিজে ঝাড়ি খেয়ে বসে থাকে। " লায় দিয়ে দিয়ে মেয়েটাতে মাথায় তুলতেছ, না? আবার আমাকে কাছে আসছে, -যাও এখান থেকে " এসব পরশের অভ্যেস হয়ে গেছে, খুব রাগ হলে পরশ কেও বকতে ছাড়েনা সে।
এভাবেই চলতে চলতে এক সময় পরেশের মৃত্যু হয়। স্নান বলে, " মা, বাবা ঘুমুচ্ছে কেন, এখন কি ঘুমানোর সময়? " মা কাঁদে আর স্নানকে বুকে নেয়। তারপর পুরো সংসারকে কাঁধে নিয়ে একাই বড় করে তুলে স্নানকে। বিয়ে হয় স্নানের। কিছুদিন পর নাতির মুখ দেখে নীলমণি। নানি হয় সে। নতুন একটা জীবন চক্রের শুরু হয়।
এভাবেই নারী কখনো বালিকা, কখনো যুবতি, কখনো প্রেমিকা, কখনো স্ত্রী, কখনো মা, কখনো নানি/দাদী। এসবই ছোট্ট একটা জীবনেই। এজন্যেই, মহান আল্লাহ তা'আলা মায়ের পায়ের নিচেই সন্তানের বেহেশত্ দিয়েছেন।
-----সীমান্ত