‎করোনা থেকে ক্রিকেট: কেপিএল-এর যাত্রা
‎​সালটা ছিল ২০২১। সারা পৃথিবী তখন এক অদৃশ্য ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়ছে। করোনা মহামারীর সেই দুঃসময়ে জনজীবন প্রায় থমকে গিয়েছিল। শহর থেকে গ্রামে ফিরে এসেছিল সবাই। স্কুল, কলেজ, অফিস—সব বন্ধ। এই পরিস্থিতিতে একঘেয়েমি আর হতাশা গ্রাস করছিল এলাকার তরুণদের। কিন্তু এই হতাশার মধ্যেও লুকিয়ে ছিল এক নতুন সম্ভাবনার বীজ।
‎​এলাকার কিছু তরুণ একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিল, তারা এমন কিছু করবে যা সবার মুখে হাসি ফোটাতে পারে। ক্রিকেটপ্রেমী এই যুবকরা তাদের মনের কোণে জমানো স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে চাইল। এভাবেই জন্ম হলো 'কালারমার পাড়া প্রিমিয়ার লিগ' বা কেপিএল-এর।
‎​টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি শুরু হলো জোর কদমে।সবাই মিলে কয়েকটি গ্রাম থেকে দল গঠন করা হলো। প্রতিটি দলের ছিল ভিন্ন ভিন্ন নাম, এলাকার বড়-ছোট সবাই মিলে টুর্নামেন্টের আয়োজনে সাহায্য করতে এগিয়ে এলো। স্থানীয় মাঠে পিচ তৈরি হলো,সবার চোখেমুখে ছিল এক অদম্য উদ্দীপনা।
‎​কেপিএল শুরু হতেই পুরো এলাকার চেহারাটাই যেন পাল্টে গেল। প্রতিদিন বিকেলে ক্রিকেট মাঠে উৎসবের আবহ তৈরি হতো। ব্যাট-বলের শব্দ, খেলোয়াড়দের উচ্ছ্বাস আর দর্শকদের করতালি—সব মিলে এক দারুণ দৃশ্য। এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠরা তাদের হারানো যৌবন ফিরে পেলেন, আর ছোটরা পেল এক নতুন বিনোদনের ঠিকানা। কেপিএল শুধু একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ছিল না, এটা ছিল মহামারীর বিরুদ্ধে এক যৌথ লড়াই, একতার প্রতীক। সেই টুর্নামেন্ট পুরো এলাকায় এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছিল।
‎​তবে সেই বছরই শেষ হয় কেপিএল। ২০২২, ২০২৩, এবং ২০২৪ সাল কেটে গেল, কিন্তু আর টুর্নামেন্ট আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। কেউ পড়াশোনার জন্য শহরে চলে গেল, কেউ বা চাকরির সন্ধানে। সবাই আবার যে যার মতো ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আগের সেই উন্মাদনা আর ঐক্য যেন হারিয়ে গিয়েছিল।
‎​কিন্তু মানুষের মনে কেপিএল-এর স্মৃতি ঠিকই রয়ে গিয়েছিল। পুরনো খেলোয়াড়, দর্শকরা প্রায়শই সেই সোনালি দিনের কথা স্মরণ করতেন। একসময়ের সেই উৎসবের আমেজটা তারা আবার ফিরিয়ে আনতে চাইছিলেন। অবশেষে ২০২৫ সালে তাদের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়। এক নতুন উদ্যম নিয়ে আবার শুরু হলো কেপিএল। তবে এবার আরও বড় পরিসরে, আরও সুন্দরভাবে।
‎​২০২৫ সালের কেপিএল ছিল আরও বেশি সুসংগঠিত। নতুন স্পন্সর এলো, ভালো জার্সি তৈরি হলো, আর মাঠও আরও পরিপাটি করা হলো। টুর্নামেন্টের উদ্বোধন দেখতে উপচে পড়া ভিড় হলো। করোনায় যে টুর্নামেন্ট শুরু হয়েছিল, সময়ের সাথে তা এখন এলাকাবাসীর ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে। করোনা প্রিমিয়ার লিগ এখন আর শুধু একটি খেলা নয়, এটি এক গল্প—হতাশা থেকে আশার, বিচ্ছিন্নতা থেকে একতার এবং সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠার এক সুন্দর গল্প।