"শেয়ার্ড স্পেস" ডিজাইন কনসেপ্ট টি হলো ইউরোপীয়ান নগর পরিকল্পনায় এমন একটি ধারণা, যেখানে একটি যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলের পরিবেশের মাঝে পরিষ্কার পার্থক্য তৈরি এবং নির্দেশনা দেয় এমন এলিমেন্ট যেমন, ফুটপাথ বা সাইডওয়াক, ট্রাফিক সিগন্যাল, রোড সাইন ইত্যাদি উঠিয়ে দেয়া হয়। যেখানে, ধারণা করা হয় যে বাহ্যিক সংকেত বা আইনের মাধ্যমে চালক ও পথচারীদের দ্বারা নীয়ম পালনের জন্য বাধ্য করার চাইতে, এসব সিগন্যাল ও সাইন তুলে কোনো বাহ্যিক সহায়তা বা নিয়ন্ত্রণ এর চেষ্টা না করার ফলে, চালক ও পথচারীরা একটা ব্যাবস্থার উপর নির্ভরশীল হয়ে পরা এবং তা মানা বা না মানার সমস্যা সৃষ্টি হয় না। যার ফলে নিজ সুরক্ষা ও অন্যের সুরক্ষার জন্য ব্যাক্তিগত জায়গা থেকে চালক ও পথচারীরদের মাঝে একটি যোগাযোগ ও সমঝোতার প্রয়োজন হয়, যার ফলে ব্যাক্তিগত জায়গা থেকে উভয় পক্ষই আরও সচেতন হয়। এখানে, এছাড়াও “এজ ফ্রিকশন” ধারণার মাধ্যমে চালকদের যানবাহনের গতি সম্পর্কে আরও সচেতন করে অতিরিক্ত গতিতে যানবাহন চালনা রোধে প্রভাব ফেলা হয়। ধারণা করা হয় শেয়ার্ড স্পেস ডিজাইন কনসেপ্ট এর মাধ্যমে রাস্তার মোড় বা ইন্টারেকশনে এভাবে যানবাহন ও পথচারীদের মাঝে মুক্ত চলাচলের ফলে যানজটজনিত নষ্ট হওয়া সময় ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি উভয়ই হ্রাস পায়।
একই ধরণের এরকম ধারণা আগেও প্রয়োগ করা হয়ে থাকলেও, মূলত ডাচ ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ার হ্যান্স মন্ডম্যান কে "শেয়ার্ড স্পেস" ধরণার অগ্রগামী হিসেবে ধরা হয়।
মূলত এই ধারণার পিছে মূল বিষয় গুলো হলো,
প্রথমত,
নির্দিষ্ট কোন ট্রাফিক সিগন্যাল সিস্টেম বা রোড সাইন না থাকার কারণে মানুষ কিছুটা আনকম্ফোর্টেবল হয় এবং আনকম্ফোর্টেবল হওয়ার কারণে মানুষ নিজ থেকে আরো সচেতন হতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ কে কার আগে যাবে বা কিভাবে কোন দিকে যেতে হবে এরকম কোন স্পষ্ট নীতি নির্ধারণ করে না দেওয়ার ফলে যে অনির্দিষ্টতা তৈরি হয় তার ফলে পথচারীরা নিজেরা যেমন সচেতন থাকে যানবাহনের চলাচলের পথ ও গতির দিকে, তেমনি ভাবে যানবাহন চালকদেরও পথচারীদের দিকে খেয়াল রাখতে হয়। যার ফলাফলস্বরূপ,
১) যানবাহনের গতি ধীর হয়,
২) চালক ও পথচারীর মাঝে আই কন্টাক্ট হয় ও
৩) চলাচলের জন্য উভয়ের মাঝে একটি সমঝোতা তৈরি হয়।
দ্বিতীয়ত,
পথচারীরা না থাকলেও যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের মাঝে এবং তুলনামূলক ধীর থাকে। কারণ,
"এজ ফ্রিকশন" বা ভিজুয়াল কিউ যেমন রাস্তার পাশে ল্যাম্পপোস্ট ও গাছের সারির মাধ্যমে যানবাহন চালকদের তাদের বাহনের গতি সম্পর্কে আরো স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়। মূলত সাধারণ রাস্তার চেয়ে সারিবদ্ধ ভাবে ল্যাম্পপোস্ট বা গাছকে পাশে সরে যেতে দেখার বিষয়টি চালককে তার গতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে সক্ষম, যার ফলে যানবাহন অতিরিক্ত দ্রুত চালানোর পরিমাণ কমে।
তৃতীয়ত,
ট্রাফিক সিগন্যালের অপেক্ষা করতে না হওয়ায় গড়ে গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পথচারী ও যানবাহন উভয়ের সময় কম লাগে।
সাধারণ ভাবে বলা যায় যে এই কারণগুলোতে এই শেয়ার স্পেসের ধারণা পথচারীদের জন্য অন্য যে কোনো ব্যবস্থা থেকে বেশি সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
নেদারল্যান্ড এর ফ্রিজলান্ড-এ প্রথম এই ধারণা নিয়ে ব্যাপক ভাবে কাজ করেন হ্যান্স মল্ডম্যান ২০০৪ থেকে ২০০৮ এ তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। তখন থেকে শুরু করে এখনো পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পরীক্ষামূলক ভাবে স্পেস এর ধারণা প্রয়োগ করা হয়। যেখানে একদিকে কিছু ক্ষেত্রে স্পষ্ট সাফল্য বিদ্যমান। যানবাহন জনিত দুর্ঘটনার হার হ্রাস পায় যেমন লন্ডনের ইপ্সউইচ একটি ইন্টারসেকশনে তিন বছর ধরে ২৪ জন থেকে প্রতিবছরে ১ জনে ও কেন্সিংটন হাই স্ট্রিট -এ প্রায় ৬০ শতাংশ এবং নেদারল্যান্ডের ড্রাখটেনে ৪ বছর ধরে ৩৬ জন প্রতি বছর থেকে দুই বছরে ২ জনে নেমে আসে। একই সাথে আমরা লন্ডনের ট্রাফিক ক্যামেরার ধারণ কৃত বিভিন্ন ট্রাফিক সংঘর্ষের বিশ্লেষনের মাধ্যমে জানতে পারি যে গননার দিক থেকেও যানবাহন ও পথচারীদের প্রবাহ আরও মুক্ত হয়, কেননা যানবাহন ও পথচারীর মাঝে সংঘর্ষ যেমন কমে, তেমনি সংঘর্ষ কম গুরুতর হয়।
ধারণা ও বাস্তবতার মাঝে একটি পার্থক্য থাকে। এই কনসেপ্টের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি দেখা যায়। ধারণাটি জন্মের প্রায় এক যুগ এর মত হয়ে গেলেও এখনো এটি কিছুটা কন্ট্রোভার্সিয়াল হিসেবে ধরা হয়। এখনো এই ধারণার নিয়ে কিছু দ্বিমত ও প্রশ্ন রয়েছে।
কারণ, কিছু ক্ষেত্রে কাজ করলেও সকল ক্ষেত্রে কাজ করে না। যেমন প্রতিবন্ধী এবং বিশেষত দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য এটি কিছু সমস্যার সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে কিছু পরিমাণ মানুষ এই ব্যবস্থায় মানিয়ে নেওয়ার চাইতে, আগের মত রাস্তায় বিভিন্ন সংকেত ও আলাদা আলাদা বিভাজন উত্তম বলে মনে করে। যদিও আগে কেমন ছিল কথাটা আপেক্ষিক, কেননা প্রথম যখন যানবাহনের চলাচল শুরু হয় তখন আসলে রাস্তাঘাটে পথচারী ও যানবাহন একই সাথে চলাচল করত।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এখনও শেয়ার্ড স্পেস দিয়ে কাজ হয়ে থাকলেও ২০১২ সালের একটি দুর্ঘটনার ফলে ২০১৮ থেকে লন্ডনে এই পদ্ধতির চর্চা থেমে আছে এবং এ নিয়ে আরো গবেষণা করা হচ্ছে। ড্যানিশ বিল্ডিং ডিজাইন ইনস্টিটিউটের পূর্ববর্তী ট্রাফিক লাইট ও শেয়ার্ড স্পেসের প্রাথমিক একটি মিশ্র ধারণা নিয়ে কথা হচ্ছে যেটি প্রতিবন্ধীদের সমস্যা নিরসন করতে পারে। এছাড়া ভারত ও চীনের বিভিন্ন জায়গায়ও এই ধারণার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ কমবেশি হচ্ছে।
যদিও এই ব্যাবস্থা অনেকাংশেই সুরক্ষা নিশ্চিত করে ও সময় বাঁচায়, তারপরও মানুষের মানিয়ে নিতে এবং বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করে বহুল প্রয়োগের আগে আরও সময় ও গবেষণা দরকার।
আরোও জানতেঃ
১.https://www.citymetric.com/.../shared-spaces-clever-trick...
২.https://www.vox.com/2017/11/24/16693628/shared-space-design
৩.https://www.be.unsw.edu.au/.../resources/_notes/5A2_44.pdf
লেখকঃ Yeasir Mohammad Amin
গ্রাফিক্সঃ Sayla Afrin Monika