দৈনন্দিন চলাফেরার সময়েই আমরা লক্ষ্য করলে দেখব রাস্তার নামের শেষে বিভিন্ন রকমের সাফিক্স থাকে। যেমন: এভিনিউ, বোলেভার্ড, স্ট্রীট, হাইওয়ে, এক্সপ্রেসওয়ে, ট্রাংক রোড ইত্যাদি। এগুলো স্বেচ্ছাচারপ্রসূত দেয়া হয়না। এগুলোর পেছনে যুক্তিসংগত কারণ অথবা ইতিহাস থাকে। সীমিত কয়েক ক্ষেত্র অসংগতি ছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটি নির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করা হয়। কালক্রমে কিছু রাস্তার বৈশিষ্ট্য পাল্টে গেলেও সাফিক্স একই থাকার উদাহরণও আছে। নগরায়ণ, ইতিহাস, সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এমন কিছু রাস্তার নামের উদ্দেশ্য, ইতিহাস ও প্রভাব সম্পর্কে এবার জেনে নেয়া যাক।
Delhi-Dehradun elevated expressway
এক্সপ্রেসওয়ে: এটি উচ্চগতির মটরযানের জন্য নির্ধারিত হাইওয়ে। এর বৈশিষ্ট্য হল এতে অল্প ইন্টারসেকশন থাকে বা একেবারেই থাকেনা। এতে মোটরগাড়ির সর্বনিম্ন গতি তুলনামূলক বেশি রাখা হয় এবং ছোট কিংবা ধীরগতির যানবাহনের প্রবেশাধিকার থাকে না। এক্সপ্রেসওয়ে এর ভিন্নধর্মী বৈশিষ্ট্যের কারণে এতে দূর্ঘটনা তূলনামূলক কম ঘটে, দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো যায় এবং গাড়ি চালানো উপভোগ করা যায়। প্রথম প্রকৃত এক্সপ্রেস হাইওয়ে, অটোভান জার্মানিতে নির্মিত হয়েছিল। সমস্ত এক্সপ্রেস হাইওয়ে সিস্টেমগুলির মধ্যে সর্বাধিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তঃরাজ্য হাইওয়ে। এক্সপ্রেসওয়ে এর সামরিক সুবিধা এবং হাইওয়ে উন্নয়নের বিস্তৃত কর্মসূচীর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে কংগ্রেস ১৯৪৪ সালে প্রকল্পটি অনুমোদনও দিয়েছিল, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে বেশ কয়েক বছর পরে এর ফান্ড উন্মুক্ত হয়।
5th Avenue, Manhattan, New York City, NY, USA
এভিনিউ: এর নাম শুনতেই আমাদের মাথায় চলে আসে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ এর কথা। সেখানকার ব্যস্ত রাস্তা ও বড় বড় দালানকোঠার কথা। মূলত এভিনিউ হচ্ছে একপ্রকার সরলরৈখিক রাস্তা যার দুই পাশে বড় বড় দালানকোঠা, গাছপালা থাকে। তাছাড়া দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য থাকলে তারও অসাধারণ ভিউ পাওয়া যায়। গাছপালা ও দালানকোঠার সারিবদ্ধ অবস্থান রাস্তাটিকে আকর্ষণীয় করে তোলে। ধারণা করা হয় এ ধরণের রাস্তার নকশা ব্রোঞ্জ যুগে সর্বপ্রথম করা হয়েছিল এবং তা অনেকটা এখনকার মতই আকর্ষণীয় মনুমেন্ট কিংবা প্রাসাদ বা অট্টালিকায় যাওয়ার প্রধান রাস্তা হিসেবেই ব্যবহার করা হতো।
Cul-de-sacs with round ends
কাল-ডি-স্যাক বা ডেড এন্ড (স্ট্রিট): সাধারণত ডেড এন্ড বলতে আমরা বুঝি এমন একটি রাস্তা যার একটিমাত্র প্রবেশমুখ বা বাহিরমুখ থাকে। মূলত এর উদ্যেশ্য আবাসিক এলাকায় যানবাহন চলাচল সীমিত করা। এছাড়া এটি এলাকার কোলাহল কমায় এবং নিরাপত্তাও বৃদ্ধি করে। কিছু ক্ষেত্রে বড় আকারের যানবাহন ঘোরানোর সুবিধার্থে এর শেষ প্রান্ত বৃত্তাকার রাখা হয়। প্রাচীন মিসর, এথেন্স ও রোমে ডেড এন্ড স্ট্রীট এর নিদর্শন পাওয়া যায়। বর্তমান পরিকল্পনাবিদ ও স্থাপত্যবিদরা মনে করেন এদের উদ্দেশ্য ছিল পৃথক অবস্থান ও যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা। আধুনিক যুগে এ ধরণের রাস্তার ব্যবহার নিয়ে বহু বিতর্ক বিদ্যমান থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নগর পরিকল্পনায় এখনও কাল-ডি-স্যাক বা ডেড এন্ড (স্ট্রিট) কে বিবেচনা করা হয়।
Santa Monica boulevard, Beverly Hills, Los Angeles, CA, USA
বোলেভার্ড: এটি নগরের মধ্যে দিয়ে চলা এক বৃহদাকার ও প্রশস্ত রাস্তা। যার দুপাশে সাধারণত বৃক্ষ ও দালানকোঠার সমাবেশ থাকে। অনেকক্ষেত্রেই এক সারি বৃক্ষের মাধ্যমে রাস্তাটি দুটি লেনে বিভক্ত থাকে। বাইসাইকেল চালানো ও পার্কিং এর সুবিধা থা কার কারণে এ ধরণের রাস্তায় যান চলাচল অপেক্ষাকৃত ধীরগতির হয়।এছাড়া বোলেভার্ডের পথচারীদের সুবিধার জন্য উন্নত ফুটপাত ব্যবস্থা থাকে। লস এঞ্জেলেস, ক্যালিফোর্নিয়ার সান্টা মনিকা একটি বিখ্যাত বোলেভার্ড।২০০৫ এর "লস্ট ইন হলিউড" এর মতো বিখ্যাত গানে এর অন্তর্ভুক্তি আছে এবং ন্যাট কিং কোল এর 'রুট ৬৬' থেকে শেরিল ক্রোর 'অল আই ওয়ানা ডু' পর্যন্ত সান্টা মনিকা বোলেভার্ড কয়েক দশক ধরে শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করেছে।
The Grand Trunk Road, South Asia
ট্রাংক রোড: এধরণের রাস্তা হচ্ছে সাধারণত একাধিক বন্দর বা নগরের মালামাল পরিবহনের উদ্দেশ্যে নির্মিত। এ রাস্তার নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ এর দায়িত্ব স্থানীয় কর্তৃপক্ষের না হয়ে জাতীয় বা অঞ্চল পর্যায়ের হয়ে থাকে। বিভিন্ন দেশে একে বিভিন্নভাবে সঙ্গায়িত করলেও সাধারণত জাতীয় হাইওয়ে, এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা আন্তঃরাজ্যীয় রোড গুলোকেই ট্রাংক রোড হিসেবে ধরে নেয়া যায়। ভারতীয় উপমহাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিখ্যাত ট্রাংক রোডটি হলো গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড। এটি মৌর্য শাসক চন্দ্রগুপ্তের আমলে নির্মিত। পরবর্তীতে বাদশাহ শের শাহ সুরি এর পুনঃনির্মাণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেন। প্রায় ৩,৬৭০ কি. মি. দীর্ঘ এই রাস্তাটি বাংলাদেশের কক্সবাজার থেকে আফগানিস্তানের কাবুল পর্যন্ত বিস্তৃত এবং প্রায় ৩০০০ বছরের পুরনো এ রাস্তার নিদর্শন মহাভারতেও পাওয়া যায়।
The Autobahn Road, Germany
অটোভান: শ্রেণি বিবেচনায় একে এক্সপ্রেসওয়ে বললেও এটি হচ্ছে প্রায় ১৩ হাজার কি.মি. দীর্ঘ একটি বিশেষ জার্মান রাস্তা। এটি হল একটি ২ থেকে ৪ লেনের রাস্তা যার সাথে একটি ইমার্জেন্সি লেনও থাকে। এ রাস্তার বিশেষত্ব হল এ রাস্তায় কিছু নির্দিষ্ট প্রকারের যানবাহনের জন্য কোন নির্ধারিত গতিসীমা নেই। তবে প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ রাস্তার ক্ষেত্রে নগরায়ণ, রক্ষণাবেক্ষণ অথবা দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে স্বল্পমেয়াদী বা দীর্ঘস্থায়ী গতিসীমা রাখা হয়। দুর্ঘটনায় তাৎক্ষণিক সহায়তার জন্য এ রাস্তায় রয়েছে প্রায় ১৭ হাজার ইমার্জেন্সি টেলিফোন বুথ। এছাড়া যানবাহন চালক ও যাত্রী সুবিধার জন্য রয়েছে অসংখ্য গ্যাস স্টেশন, রেস্ট হাউজ। এটি তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিলো জার্মান অটোমোবিল ইন্ডাস্ট্রির গতি ত্বরান্বিত করা, তবে ধারণা করা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রোপাগাণ্ডা প্রজেক্ট হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়েছে।
Sources:
https://www.britannica.com/technology/expressway-road
লেখকঃ Monim Abdullah
নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
গ্রাফিক্সঃ Anika Nurin