জলাশয়ের নিকটে সভ্যতা গড়ে ওঠার ধারণার সঙ্গে আমরা সকলেই পরিচিত। তবে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিবেশেও সভ্যতা গড়ে উঠতে পারে। কেমন হবে যদি সমাজ এমন কোন স্থানে গড়ে ওঠে যেখানে পানির নির্ভরযোগ্য কোনো উৎস নেই, এমনকি অপরিহার্য অক্সিজেনও অনুপস্থিত?
সম্ভবত সর্বপ্রথম মঙ্গল গ্রহই পৃথিবীবাসীকে আন্তঃগ্রহ প্রজাতিতে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ করে দেবে। আমরা অনেকেই ডিরেক্টর রিডলি স্কট এর দ্যা মার্শিয়ান চলচ্চিত্রটি দেখে থাকব। মঙ্গল গ্রহের পরিবেশ এ চলচ্চিত্রটিতে প্রদর্শিত অবস্থার থেকেও বহুগুণ প্রতিকূল।
মঙ্গল গ্রহ হচ্ছে অক্সিজেন বিহীন একটি মরুভুমির মতো। যেখানে দুই মেরুতে বরফ এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। দূরত্বের বিচারে এটি সূর্য থেকে চতুর্থ গ্রহ, যেখানে পৃথিবীর তুলনায় মাত্র ৪০ শতাংশ সূর্যালোক পৌঁছায়। এত সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মঙ্গল গ্রহে কলোনি স্থাপন করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। স্পেস এক্স এর প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক ২০২২ -২০২৪ সালের মধ্যেই মঙ্গল গ্রহে বসতির জন্য কার্গো পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেননা, ২ বছর অন্তর অন্তর গ্রহ দুটি সবচেয়ে নিকটে আসে।
এবার, মঙ্গল গ্রহের একটি শহর কেমন হতে পারে তা দেখে নেয়া যাক।
নামঃ নুআ সিটি
লোকেশনঃ টেম্প মেনসা, মঙ্গল গ্রহ
জনসংখ্যাঃ ১০ লক্ষ
শহরটি চাইনিজ প্রকৃতির দেবী নুআ এর নামে নামকরণ করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হল মঙ্গল গ্রহ নুআ দেবীর মতো মমতাময়ী নয়। আমরা পৃথিবীতে শহরের প্রাথমিক বিস্তার আনুভূমিকভাবে দেখে অভ্যস্ত হলেও নুআ হবে একটি উলম্ব শহর। এটি মঙ্গল গ্রহের টেম্প মেনসার একটি ক্লীফে অবস্থান করবে এবং বড় আকারের গম্বুজের উপস্থিতি থাকবে। মঙ্গল গ্রহের তেজস্ক্রিয় পরিবেশ থেকে বেঁচে পর্যাপ্ত আলো পাওয়ার জন্য আন্ডারগ্রাউন্ড বা আপারগ্রাউন্ড এর তুলনায় ক্লীফ বেশি সুবিধাজনক। এ শহরের মূলমন্ত্র হবে আত্মনির্ভরশীলতা ও স্থিতিস্থাপকতা। পৃথিবীর শহরগুলোর মতই এ শহরে বিল্ট আপ এরিয়া, ইনডাসট্রিয়াল এরিয়া, বিজনেস এরিয়া, রোড নেটওয়ার্ক এবং ওপেন স্পেস থাকবে। যেখানে বসবাসের জন্য বরাদ্দ থাকবে ৪৬%, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ২০%, যোগাযোগ ৭% এবং কৃষি কাজ ও ওপেন স্পেসের জন্য ২৭% ল্যান্ড এরিয়া।
শহরটি পৃথিবীর শহরের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি এনার্জি খরচ করবে। যার উৎস হবে সোলার ও নিউক্লিয়ার প্লান্ট। এছাড়াও জৈব, ফোটোভোল্টায়িক উৎসও ব্যবহার করা হবে। এ শহরের অভ্যন্তরীণ বা বহিঃযোগাযোগ ব্যবস্থা সবই হবে টানেল নির্ভর। মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও অক্সিজেন উৎপাদিত হবে কৃষির মাধ্যমে। গ্রীন হাউজ এর মতো বদ্ধ সিস্টেমে প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম আলোর সমন্বয়ে তা কার্যকর করা হবে। এক্ষেত্রে হাইড্রোপনিক্সও ব্যবহার উপযোগী। যেহেতু নুআ হবে একটি ক্লীফ শহর, এর উপত্যকাটি ওপেন স্পেস বা কমিউনিটি কার্যক্রমের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক। নগর পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা হচ্ছে এর কমিউনিটি। নুআ হবে একটি আত্মনির্ভরশীল ও আকর্ষণীয় শহর। সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে এবং প্রত্যেক নাগরিক এর শেয়ার হোল্ডার হবে। পৃথিবীর মতো শহরকে দূষিত করে নাগরিকরা চলে যেতে পারবে না। বরং, নাগরিকদের নিজেদের বাঁচতে হলে নুআ কেও বাঁচাতে হবে। অর্থাৎ, শহরবাসীর একটি একতাবদ্ধ প্রতিরূপ হবে নুআ।
নুআ শহরটির ধারণা এসেছে মার্শ সোসাইটি আয়োজিত একটি সিটি ডিজাইন কম্পিটিশন এর সাবমিশন থেকে। দেশ-বিদেশের ১৭৫টি টিম থেকে মঙ্গল গ্রহে পরস্পর সংযুক্ত পাঁচটি শহরের পরিকল্পনা সেখান থেকে নির্বাচন করা হয়। যার একটি নুআ। উপরিউক্ত শহরের বিবরণ ২২ শতকের শুরুর জন্য উপযোগী।
অনেকে মন্তব্য করতে পারেন যে, মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপন অসম্ভব। প্রকৃতপক্ষে, তা অসম্ভব নয়। শুধু কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল মাত্র। এছাড়া অনেকে বিতর্ক করতে পারেন যে, মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপনের চেয়ে পৃথিবীটাকে সুন্দরভাবে রেখে তাতে বাস করাই শ্রেয়। তাদের জন্য মার্কিন জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী নীল ডি. টাইসন বলেছেন,
যেদিন আমাদের মঙ্গল গ্রহকে পৃথিবীতে পরিণত করার ক্ষমতা হবে, সেদিন আমরা পৃথিবীকে পৃথিবীতে পরিণত করতে সক্ষম হব।
আর মঙ্গল গ্রহকে টেরাফর্ম করার আগে সেখানে প্রাথমিক বেস স্থাপন করতে হবে। যার উপায় হতে পারে নুআ এর মত উচ্চাভিলাষী নগর। হয়তো তখন থেকে চাঁদ এর জায়গায় ডেমোস, ফোবোস নিয়ে সাহিত্য রচনা শুরু হবে।
ব্যক্তিগত মতামতঃ নগরপরিকল্পনাকে আন্তঃগ্রহ পর্যায়ে নিয়ে যেতে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে পরিকল্পনাবিদদের এ ধরনের গবেষণায় অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
সোর্সঃ
https://abiboo.com/projects/nuwa/
https://youtu.be/ySERcYMWza0
https://innovationorigins.com/nuwa-urban-planning-on-mars-as-a-model-for-earth/
https://youtu.be/7XdkKMhAdnA
https://mars.nasa.gov/all-about-mars/facts/
গ্রাফিক্সঃ Yeasir Mohammad Amin