একটি সংক্রামক ব্যাধি চলাকালীন অবস্থায় হাসপাতালগুলো কীভাবে পরিচালনা করতে হবে, এই অভিজ্ঞতা প্রাথমিকভাবে সেই দিকটিই প্রদর্শন করে। মহামারীর ফলে সৃষ্ট অস্থিতিশীল এই অবস্থা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা পদ্ধতির দুর্বল দিকগুলো উদঘাটন করতে সক্ষম হয়। এবং কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহনের মাধ্যমে হাসপাতালগুলোকে পুনরায় স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেন।
নিউইয়র্কের অন্যতম প্রাচীন এবং বৃহত্তম মাউন্ট সিনাই হাসপাতালে ২০২০ সালের মার্চ মাসের শুরুর দিকে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগীর হার এতোটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, চিকিৎসকদের জন্য উদ্বুদ্ধ এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কষ্টকর হয়ে পরে। সংক্রামক এই ভাইরাস এ আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালের বাকি অংশ থেকে আলাদা করার প্রয়োজনীয়তা সত্ত্বেও, চিকিৎসক এবং কর্মীরা নির্দিষ্ট সীমানা রক্ষা করতে পারছিলেন না । হাসপাতালে আসা রোগীদের বিছানা এবং তাদের সেবার জন্য পর্যাপ্ত কর্মীর সংকট সৃষ্টি হয় । নিউইয়র্ক শহরের বিশৃঙ্খলায় করোনাভাইরাসে মৃত্যু এত দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল যে,ফ্রিজার ট্রাকগুলোকে অস্থায়ী মর্গ হিসাবে স্থাপন করা হয়।
চিকিৎসার সরঞ্জামসমূহ সরবরাহের জন্য হাসপাতালগুলোকে ব্যাপক আর্থিক চাপের সম্মুখীন হতে হয়। ১ মার্চ, ২০২০ থেকে ৩০ জুন, ২০২০ পর্যন্ত চার মাসের আর্থিক লেনদেনগুলোর বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। যেখানে দেখানো হয় যে মোট চার মাসে আমেরিকার হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য ক্ষতির পরিমাণ ২০২.৬ বিলিয়ন বা প্রতি মাসে গড়ে ৫০.৭ বিলিয়ন ডলার।
কোভিডের সাথে মোকাবিলার জন্য হাসপাতালগুলো যেসব ব্যবস্থা নিয়েছিল, সেগুলো তাদেরকে নতুন নিয়মকানুনে অভ্যস্ত হতে বাধ্য করে। যা হয়তো স্বাভাবিক সময়ে এতো দ্রুত সম্ভব হতো না।
“নিউইয়র্ক স্টেট হেলথ ডিপার্টমেন্ট” হাসপাতালগুলোতে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগীদের অত্যধিক চাপ মোকাবিলা করার জন্য ‘জরুরী বিভাগ’ গঠন করার পরিকল্পনা নেয় , যেখানে অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ রোগীর বিছানা ধারণ ক্ষমতা রাখা হবে। ক্রমবর্ধমান কোভিড রোগীদের ২৪ ঘন্টা সেবা নিশ্চিত করার জন্য কিছু হাসপাতাল অস্থায়ীভাবে অন্যান্য ধরণের চিকিৎসা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। মেরিল্যান্ডের একটি প্রযুক্তি সংস্থা “জাইটার” স্মার্ট হাসপাতাল প্ল্যাটফর্ম চালু করছে, যেটি স্বাস্থ্যসেবা সরঞ্জাম, রোগীর অবস্থান এবং রোগ নিরীক্ষণের জন্য ইন্টারনেট সেন্সরগুলোকে ব্যবহার করছে। কোভিড-পরবর্তী সময়ের হাসপাতালগুলোর জন্য একটি বিখ্যাত মডেল হলো শিকাগোর রাশ ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টার, যার প্রজাপতি-আকৃতির টাওয়ারটি ডিজাইন করেছেন পার্কিনস এন্ড উইল। এর জরুরি বিভাগের রোগীর কক্ষগুলোতে রয়েছে কাচের দরজা যাতে বায়ু চলাচলে কোন সমস্যা না হয় এবং চিকিৎসকরা ভাইরাসের সংস্পর্শে না এসেই রোগীদের পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
হাসপাতাল সমূহের পুনর্নির্মাণে আরেকটি নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে যেটিকে বলা হচ্ছে “সুস্থতার জন্য ডিজাইনিং”।এটির মূল প্রতিপাদ্য হলো প্রতিটি বড় স্বাস্থ্যসেবা কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত সবুজ স্থান এবং দিবালোক নিশ্চিত করা। এসকল উদ্যান রোগীর মানসিক সুস্থতায় সহযোগিতা করার পাশাপাশি কোভিড সঙ্কটের সময়ে সমস্ত স্তরের স্বাস্থ্যকর্মীরা যে চরম চাপ সহ্য করেছেন তাদেরকে কিছুটা হলেও নিস্কৃতি প্রদান করবে।
নিঃসন্দেহে হাসপাতাল পুনর্নির্মাণ করা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল প্রকল্প।তবে সফলভাবে এটি সম্পন্ন করতে পারলে ভবিষ্যতে যেকোনো মহামারী পরিস্থিতি মোকাবিলা করা অনেকটাই সহজতর হবে বলে আশা করা যায়।
আরও জানতে –
১. https://www.bloomberg.com/news/articles/2021-02-23/how-the-pandemic-is-transforming-hospital-design
২. https://www.washingtonpost.com/health/2020/03/31/new-york-city-hospitals-coronavirus/?outputType=amp
লেখক : আনিকা রহমান,
নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
গ্রাফিক্সঃ Syeda Mastura Maliha