পাঁচলা থানার সবচেয়ে পুরনো পুজো তথা হাওড়া জেলার অন্যতম প্রাচীন পুজা জুজারসাহা গ্ৰাম পঞ্চায়েত এর অধীনে কুলডাঙ্গা ঘোষবাড়ির হরগৌরি পূজা। যা ঘোষবাড়ির পুজো নামে পরিচিত। এই পূজা শুরু হয়ে যায় মহালয়ার পরের দিন থেকেই অর্থাৎ প্রতিপদ থেকে শুরু হয় চণ্ডীপাঠ। সনাতন রীতি অনুযায়ী অত্যন্ত নিয়ম নিষ্ঠার সঙ্গে পূজা হয়ে থাকে। একচালার ডাকের সাজের প্রতিমা। এখানে হর গৌরীর সাথে চার ছেলে মেয়ে থাকে অসুর থাকেন না।
এই পূজায় আগমবাগীশ ব্রাহ্মণরা বংশপরম্পরায় পূজা করে আসছেন। বর্তমানে যে ব্রাহ্মণ পূজা করেন তার নাম ভোলা নাথ ঘনটেশ্বরী । তার পিতা আগে করতেন উনি ছিলেন বিশ্বনাথ ঘনটেশ্বরী এবং ওনারা চার পুরুষ ধরে পূজা করছেন । ওনাদের আগে কোন পুরোহিত পূজা করতেন তার কোনো তথ্য জানা নেই। এই পুজো শুরুর কিছু বছর পর( প্রায় ২০/৩০বছর) থেকে জুজারসাহা মান্না বাড়ির(জমিদার বংশের ) পুজো শুরু হয় । তখনকার সময় এই দুটি পুজাই হতো।
প্রতিমা শিল্পীরাও বংশ পরম্পরায় মূর্তি তৈরি করছেন। শিল্পী অশোক ধলের পূর্বপুরুষেরা এই প্রতিমা তৈরি করেন। ঢাকীরাও বংশ পরম্পরা আসতেন। রাজ কুমার ঢাকী আসতো আগে কিন্তু বছর চারেক হল আর ওরা আসেনা। ওনারা অনেক বছর বাজিয়েছিলেন। ওদের বাবা দাদুরা বাজিয়ে ছিলেন । ঢাকী যারা আসতো তার ছেলেরা আর আসেনা কারণ এই পূজার জন্য চামড়ার ঢাক ছাড়া বাজানো হয় না। অন্য কোন বাজনা থাকে না।ফলে এখন নতুন ঢাকী আসে,যার ঢাক চামড়া দিয়ে তৈরি।
পূজার নিয়ম অন্যান্য পূজার থেকে সম্পুর্ণ আলাদা। আগে তন্ত্র সাধনার মতো করে পূজা হতো। মৃন্ময়ী মা চিন্ময়ী হয়ে উঠতেন। এতটাই তিনি জাগ্রত ছিলেন যে, অষ্টমীতে সন্ধিপূজার ১০৮ পদ্মের ১০৭ ওনার চরণে থাকতো এবং একটি হাতে থাকতো।সারা ঘরে ধূনোর ধোঁয়া ভরে যেত এবং আগমবাগীশ ব্রাহ্মণের গভীর ভক্তির আকুতিতে একটি সময় ঐ পদ্ম মায়ের হাত থেকে দেবী ঘটের উপর স্থাপিত হতো। যা সকলের চোখের সামনে এক বিস্ময় উপলব্ধি। শিহরন জাগানো অনুভব।
পূজোর আয়োজনের ঘটা এতটাই বেশি এবং এতই পরিশ্রম সাধ্য ও নিয়মবদ্ধ যে, এই পূজায় শুধুমাত্র পুরুষরাই থাকেন। মহিলাদের অনুমতি নেই মায়ের পূজার আয়োজনে। পূজার প্রতিদিন ২১ মন চালের নৈবেদ্য সাজানো হয় তিন/ পাঁচ/ সাত এই রকম বিজোড় নিয়মে।কেউ মানত করে নৈবেদ্য মাকে দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে বিজোড় নিয়মে তাকে নৈবেদ্য দান করতে হবে। তবে তার সাধ্য অনুযায়ী ৩/৫/৭/৯... মন চালের নৈবেদ্য দিতে পারেন। প্রতিদিনের এই যোগাড় করতে প্রায় ১৪/১৫ জন লোক লাগে। বাড়ির ছেলেরা প্রচুর পরিশ্রম করেন যাতে মায়ের পূজার কোন ত্রুটি না থাকে।
অষ্টমীতে ধূনোপোড়াতে অংশগ্রহণ করেন বহু মহিলা।বিরাট লাইনে সার বেঁধে বসে তারা মায়ের কাছে পুষ্পাঞ্জলি ও ধূনো মাথায় নিয়ে ভক্তিতে আকুল হয়ে পড়েন।মহা অষ্টমী পূজা সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ।ধূপ আর ধূনোর ধোঁয়ায় মন্দির ভরে ওঠে। সন্ধিপূজায় বেজে ওঠে একসুরে সব ঢাক, চলে বাজি ফাটানো। অপূর্ব ঈশ্বরিক আনন্দে সবাই ভাবাবেশে আকুল হয়ে পড়েন। দশমীতে হয় নরনারায়ণ সেবা। প্রায় চার হাজারের বেশি ভক্ত মায়ের প্রসাদ গ্রহণ করেন।
* বিসর্জনের দিন গ্রামের বিভিন্ন পাড়ার লোক আসেন পুরাতন রীতি অনুযায়ী। এবং রাত দুটো বেজে যায়। বিভিন্ন পূজা মন্ডপ থেকে ( কুলডাঙা শিবতলা,শ্যামচক,জুজারসাহা মান্না বাড়ি,কুলডাঙা আশ্রম, তেঁতুলতলা ও পল্ল্যেপাড়া) দেবীকে মিষ্টি মুখ করানো হয়।আসলে পুজোটা যখন শুরু হয় তখন আশপাশে সেরকম পাড়া ছিলনা । এমন কি ঐ ঠাকুর বিসর্জন করার সময় পাশের পাড়া থেকে লোক ডাকতে হতো। এবং জমিদার বাড়ির লোকজন এসে মাতৃদর্শন করতেন এবং দশমীতে খাওয়া দাওয়া করতেন সপরিবারে।সেই রীতি এখনও চলছে।সব জায়গার প্রতিমা বিসর্জনের পর এখানে বিসর্জন হয়। আগের নিয়মেই পূজা হলেও নবমী এবং দশমীতে কিছু পরিবর্তন এসেছে। এখন ছেলেরা সব দিন বারণ থাকলেও নবমীর দিন অনুষ্ঠান এবং বস্ত্র দান হয়। দশমীর দিন মাইক বক্স ভাড়া করে নিয়ে এসে বিসর্জনের নাচ শুরু করে। মায়ের নামে নিজস্ব পুকুরে বিসর্জন হয় না, পাশের পুকুরে হয়। মায়ের পুকুরে নিলাম হয় এবং সেই টাকায় মূলত মায়ের পূজা হয়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে চাঁদাও তুলতে হয়।সাত কর্তার শরিকরা সেটা দেন।
মায়ের পুকুর নিয়েও আছে কিংবদন্তি। এই পুকুর আজ পর্যন্ত কোন দিন কাটাই করা যায়নি। যে সব জেলে কাটাই বা পুকুরের ঘাট বাঁধানোর চেষ্টা করেছেন তিনিই নানা বিপদে পড়েছেন এমনকি অসুস্থ হয়ে মারাও গেছেন। পুরাতন দিনের ইঁট তাই একইভাবে দেখা যায়। এই ঘাটের পাড়ে বসে মা স্বয়ং শাঁখা পড়েছিলেন,সেটিও গল্পের মতো।
পুজোর ইতিহাস - শরৎকালের একদিন। এক শাঁখারী ঘোষপাড়ায় বিক্রির জন্য আসেন। একটি সধবা মেয়ে এসে জানালো তার বাপের বাড়ি সামনে, শাঁখা পড়িয়ে দাও।আর বাবার কাছ থেকে মূল্য নিতে। পুকুরের পাড়ে বসে শাঁখারী সেই কথা মতো তাকে শাঁখা পড়ায়।ঘোষ বাড়ির বড় কর্তার কাছে গিয়ে মূল্য চান, তিনি বলেন আমার মেয়ে নেই তুমি ভুল করেছো। তখন তারা পুকুরে আসেন কিন্তু মেয়েকে দেখতে পাননা, শুধু দুই শাঁখা পড়া হাত পুকুরে দেখতে পান। তখন বুঝতে পারেন এটা দৈব্য ব্যাপার এবং কড়ি দিয়ে মূল্য দিয়ে দেন, সেই রাতেই স্বপ্নাদেশ পান। মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং নিত্য সেবার ব্যবস্থা হয়। এবং সেই বছর থেকে দুর্গোৎসব শুরু হয়। জুজারসা মান্না জমিদারেরা এই পূজা দেখতে আসতেন।পরে প্রায় ২০/৩০ পর নিজেরাই পূজা শুরু করেন। তবে রীতি অনুযায়ী এখনও আসেন এই বাড়ির লোকজন। ৭৮ সালের প্রবল বন্যাতেও মায়ের পূজা বন্ধ হয়নি। একটানা নিয়ম মেনে চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে।
আমাদের পুজো বিভিন্ন সংবাদপত্রে এবং বইয়ের পাতায়
ঘোষবাড়ির কর্মসূচি
আমাদের পুরানো মন্দিরের ছবি