চারু বিকাশ ত্রিপুরা
ভাষার নাম ও ভাষা পরিবার:
ত্রিপুরা জনগণের মাতৃভাষার নাম ত্রিপুরা কক বা ককবরক। এটি সিনো-তিব্বতীয় (তিব্বত-বর্মীয়) ভাষা পরিবারের অন্তর্গত। বাংলাদেশে প্রায় ১.৫০ লাখ মানুষ এই ভাষায় কথা বলে। ইউনেস্কো আন্তর্জাতিকভাবে ককবরককে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
উপভাষা ও বৈচিত্র্য:
ত্রিপুরা ভাষা উত্তর-পূর্ব ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত। এটি মূলত ত্রিপুরী জনগণের ভাষা, যারা দেববর্মা, রিয়াং (ব্রু), জমাটিয়া, ত্রিপুরা (ত্রিপুরী), নোয়াটিয়া, কলই, মুরাসিং, রূপিণী এবং উসুইসহ নয়টি প্রধান উপজাতিতে বিভক্ত। প্রতিটি উপজাতির নিজস্ব উপভাষা ও উচ্চারণগত বৈচিত্র্য রয়েছে। দেববর্মা গোত্রের ব্যবহৃত ‘পুরাতন ত্রিপুর’ উপভাষাটি শিক্ষালেখা ও সাহিত্যচর্চার মানদণ্ড হিসেবে স্বীকৃত।
বর্ণমালা ও লিপি:
আদিকালে ত্রিপুরীরা নিজস্ব কলমা লিপি ব্যবহার করত। পরে বাংলা-অসমিয়া (বাংলা) বর্ণমালার উপর ভিত্তি করে লেখা হতো। খ্রিস্টান প্রচারের ফলে রোমান (ল্যাটিন) বর্ণমালাও ব্যবহৃত হতে শুরু করে। বর্তমানে কলমা লিপি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ চলছে।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব:
ত্রিপুরীদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিতে ককবরক ভাষার গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। গান, নৃত্য এবং সঙ্গীত তাদের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। সামাজিক ও পারিবারিক মেলামেশায় এ ভাষার প্রচলন দৃঢ় হলেও আধুনিক সময়ে সরকারি বা আনুষ্ঠানিক পরিসরে প্রয়োগ খুব সীমিত। গবেষণায় দেখা গেছে, ককবরক ভাষা প্রধানত গৃহ এবং সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনিক কাজে এর ব্যবহার প্রায় নেই।
শিক্ষায় ও প্রশাসনে ব্যবহারের অবস্থা:
বাংলাদেশ সরকার আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে নীতি গ্রহণ করেছে। ২০১৭ সালে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের জন্য চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা (ককবরক), গারো এবং সাঁওতাল ভাষায় পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হয়। তবে অভিজ্ঞ শিক্ষকের ঘাটতি এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এই উদ্যোগ আংশিকভাবেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছু শিশু মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে, কিন্তু সাধারণ এলাকায় এই সেবা প্রায় অনুপস্থিত। প্রশাসনিক বা সরকারি কাজে ককবরক ভাষার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই; সব সরকারি কার্যক্রমে বাংলা বাধ্যতামূলক।
সংরক্ষণ ও প্রচারের উদ্যোগ:
ভাষার সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ চলছে। ২০১৭ সালে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠ্যসামগ্রীর অংশ হিসেবে ককবরক ভাষায় বই বিতরণ করা হয়। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেস্কো এবং এশিয়া ফাউন্ডেশন কর্তৃক পরিচালিত ‘Hooked on Peace’ প্রকল্পে তরুণ ত্রিপুরা সমাজের প্রতিনিধিদের জন্য স্থানীয় কাহিনি সংগৃহীত এবং ডিজিটাল প্রকাশনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, ভাষার পুনরুজ্জীবনে সরকারি নীতি, সম্প্রদায়ভিত্তিক উদ্যোগ এবং ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার সমন্বয় জরুরি।
তথ্যসূত্র:
Challenges and Possibilities Tripura Language and Literature Face in Bangladesh – International Journal of Research and Innovation in Social Science, link: https://rsisinternational.org/journals/ijriss/articles/challenges-and-possibilities-tripura-language-and-literature-face-in-bangladesh/
Kokborok – Wikipedia, Link: https://en.wikipedia.org/wiki/Kokborok
Tripuri, Link: https://sanchika.ciil.org/collections/4be33766-cf23-4b06-b534-ac64b19f55d5
Tripuris, The – Banglapedia, Link: https://en.banglapedia.org/index.php/Tripuris,_The
ত্রিপুরা ভাষায় পাঠদান না থাকায় চট্টগ্রামে ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থী | কালবেলা, Link: https://www.kalbela.com/country-news/70594
In Bangladesh, Preserving Indigenous Culture through Storytelling - The Asia Foundation, Link: https://asiafoundation.org/in-bangladesh-preserving-indigenous-culture-through-storytelling/