আমরা অণুজীবের জৈব রাসায়নিক কার্যক্রম, জিনগত বৈশিষ্ট্য, বিপাকীয় পথ এবং তাদের পরিবেশ ও আশ্রয়দাতার সাথে ইন্টারঅ্যাকশন নিয়ে গবেষণা করি। আমাদের গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো অণুজীব ও তাদের বিপাকজাত পদার্থের কার্যকারিতা বোঝা এবং সেই জ্ঞানকে মানবস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি ও পরিবেশগত স্থায়িত্বের জন্য কার্যকর সমাধানে রূপান্তর করা।
আমাদের গবেষণা একটি ধারাবাহিক পথ অনুসরণ করে, যা মৌলিক জৈবিক আবিষ্কারকে বাস্তব ইমপ্যাক্টের সাথে সংযুক্ত করে:
1H → 2O → 3P → 4E
ওয়ান হেলথ → অর্গানিজম · ওমিকস → পাথওয়েজ · প্রোবায়োটিকস · প্রোটেকশন → ইকোলজি · এনভায়রনমেন্ট · ইভোলিউশন · ইমার্জেন্স
মানুষ ও প্রাণীর সুস্বাস্থ্যের জন্য অণুজীবের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানবদেহে প্রতিটি মানবকোষের বিপরীতে প্রায় দশটি অণুজীবকোষ রয়েছে, যারা হজম, পুষ্টি শোষণ, রোগপ্রতিরোধ এবং এমনকি ভিটামিন সংশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়া (এলএবি) এদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, যারা শর্করার বিপাকের মাধ্যমে ল্যাকটিক অ্যাসিড উৎপাদন করে এবং একইসাথে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টিমিউটাজেনিক ও অ্যান্টিক্যান্সার বৈশিষ্ট্যসহ ক্ষতিকর জীবাণু থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।
আমরা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ফারমেন্টেড খাদ্য ও পানীয়—যেমন বোরহানি, লাবান, মাঠা, আখের রস এবং প্রাকৃতিক মধু—থেকে অটোকথোনাস ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়া আইসোলেট করেছি এবং তাদের প্রোবায়োটিক বৈশিষ্ট্য, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত উপযোগিতা মূল্যায়ন করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো এমন স্ট্রেইন আবিষ্কার করা, যা একইসাথে স্বাস্থ্য-উপকারী ও শিল্প-উপযোগী।
ঐতিহ্যবাহী ফারমেন্টেড খাদ্য শুধুমাত্র পুষ্টির উৎস নয়, বরং অণুজীবের একটি সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। আমরা ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়ার ফারমেন্টেশন ক্ষমতা ব্যবহার করে পুষ্টিসমৃদ্ধ, স্বাস্থ্যকর এবং সাংস্কৃতিকভাবে প্রাসঙ্গিক ফাংশনাল ফুড উন্নয়নের কাজ করছি। আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে যে কিছু এলএবি স্ট্রেইন খাদ্যজাত ক্ষতিকর জীবাণু দমন করতে, খাদ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি করতে এবং প্রাকৃতিক সংরক্ষক হিসেবে কাজ করতে সক্ষম।
উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও রোগপ্রতিরোধে রাইজোবিয়া এবং এন্ডোফাইটের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা স্থানীয় উদ্ভিদ ও মাটি থেকে এই উপকারী অণুজীবগুলো আইসোলেট করে তাদের উদ্ভিদ-বৃদ্ধিকারী বৈশিষ্ট্য—যেমন অক্সিন উৎপাদন, ফসফেট দ্রবণীয়করণ, নাইট্রোজেন ফিক্সেশন এবং পরিবেশগত পীড়ন সহনশীলতা—পরীক্ষা করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো রাসায়নিক সারের পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী বিকল্প তৈরি করা।
অণুজীব দ্বারা নিঃসৃত এক্সোপলিস্যাকারাইড (ইপিএস) একধরনের বহু-শর্করা, যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল, অ্যান্টিবায়োফিল্ম, অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি এবং ইমালসিফাইং বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। আমরা Limosilactobacillus fermentum এলএবি-১ সহ বিভিন্ন স্ট্রেইন থেকে ইপিএস আইসোলেট ও চিহ্নিত করেছি এবং তাদের জৈব রাসায়নিক ও কার্যকরী বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করছি। এই ইপিএসগুলো ফাংশনাল ফুড, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং পরিবেশবান্ধব ইমালসিফায়ার হিসেবে সম্ভাবনাময়।
অণুজীব দ্বারা উৎপাদিত বায়োসারফ্যাক্ট্যান্ট হলো অ্যাম্ফিফিলিক অণু, যা পৃষ্ঠটান কমায়, হাইড্রোকার্বন ইমালসিফাই করে এবং দূষক পদার্থের জৈব উপলব্ধতা বৃদ্ধি করে। আমরা তেল-দূষিত মাটি থেকে বায়োসারফ্যাক্ট্যান্ট-উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়া আইসোলেট করেছি, যাদের নিঃসৃত যৌগ উচ্চ পিএইচ, লবণাক্ততা ও তাপমাত্রায় স্থিতিশীল থাকে এবং তেল ছড়ানো পরিষ্কারকরণ ও বায়োটেকনোলজিতে ব্যবহৃত হতে পারে।
অণুজীব দ্বারা উৎপাদিত প্রাকৃতিক পিগমেন্ট শুধুমাত্র রঙের উৎস নয়, বরং অনেক পিগমেন্টের বায়োঅ্যাকটিভ বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। প্রডিজিওসিন একটি লাল পিগমেন্ট, যা Serratia marcescens দ্বারা উৎপাদিত হয় এবং যার অ্যান্টিভাইরাল, অ্যান্টিক্যান্সার এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল কার্যকারিতা রয়েছে। আমাদের গবেষণায় প্রডিজিওসিনের ডেঙ্গু ও জিকা ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিভাইরাল সম্ভাবনা এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের বিরুদ্ধে মাল্টি-টার্গেট কার্যকারিতা কম্পিউটেশনাল পদ্ধতিতে প্রদর্শিত হয়েছে।
অণুজীব থেকে প্রাপ্ত এনজাইম শিল্পক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। আমরা ক্ষারীয় পরিবেশে সক্রিয় হাইড্রোলেজ—প্রোটিজ, অ্যামাইলেজ, সেলুলেজ—উৎপাদনকারী অণুজীব অনুসন্ধান করছি, যা ডিটারজেন্ট, চামড়া প্রক্রিয়াকরণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর। এছাড়া আমরা গ্লাইকোকনজুগেট বিপাক এবং ম্যাক্রোমলিকিউল ভাঙনে সক্ষম এনজাইম নিয়েও গবেষণা করছি।
খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহন ও সংরক্ষণে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধির অভাব জুনোটিক প্যাথোজেন সংক্রমণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। আমরা Salmonella, Shigella এবং স্ট্যাফাইলোকক্কাসের মতো খাদ্যজাত জুনোটিক প্যাথোজেনের প্রাদুর্ভাব, রোগসৃষ্টির প্রক্রিয়া এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স প্যাটার্ন পরীক্ষা করছি। ওয়ান হেলথ কাঠামোর মধ্যে থেকে আমরা এই প্যাথোজেনগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের কার্যকর কৌশল উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করছি।
অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও অনুচিত ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকট। আমরা মাল্টিড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট (এমডিআর) প্যাথোজেন এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স জিন (এআরজি) নিয়ে গবেষণা করছি। এর লক্ষ্য হলো রেজিস্ট্যান্সের জিনগত নির্ধারকগুলো চিহ্নিত করা, সংক্রমণের পথ বোঝা এবং বিকল্প অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল যৌগ—যেমন ব্যাকটেরিওসিন, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পেপটাইড ও এক্সোপলিস্যাকারাইড—আবিষ্কার করা।
প্রতিবছর বাংলাদেশের কৃষকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ফসলের ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগে ক্ষতিগ্রস্ত হন। আমরা জৈব পদ্ধতিতে—অর্থাৎ উপকারী অণুজীব ব্যবহার করে—ফাইটোপ্যাথোজেন দমন ও প্রতিরোধের কৌশল উন্নয়নের কাজ করছি। রাসায়নিক জীবাণুনাশকের পরিবর্তে বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোল পদ্ধতি পরিবেশবান্ধব এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই।
মেটাজেনোমিক এবং কালচার-নির্ভর উভয় পদ্ধতি ব্যবহার করে আমরা বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রে অণুজীবের বৈচিত্র্য নিরূপণ করছি। এর মধ্যে রয়েছে মাছের অন্ত্র, উদ্ভিদের রাইজোস্ফিয়ার, ফারমেন্টেড ফুড, তেল-দূষিত মাটি এবং চরম পরিবেশ। আমাদের লক্ষ্য হলো অণুজীব সম্প্রদায়ের গঠন, কার্যকরী ভূমিকা এবং আশ্রয়দাতার সাথে তাদের সম্পর্ক বোঝা।
চরম পরিবেশে বেঁচে থাকা অণুজীব—যেমন অত্যন্ত ক্ষারীয়, লবণাক্ত বা উচ্চ-তাপমাত্রার পরিবেশে থাকা অণুজীব—তাদের অনন্য জৈব রাসায়নিক অভিযোজন ক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমরা গৃহস্থালি ক্ষারীয় পণ্য—সাবান, ডিটারজেন্ট, বেকিং সোডা—থেকে ক্ষার-সহনশীল ব্যাকটেরিয়া আইসোলেট করেছি, যা পিএইচ ১৩ পর্যন্ত সক্রিয় ক্ষারীয় এনজাইম উৎপাদন করে। এই এনজাইমগুলো শিল্পক্ষেত্রে ডিটারজেন্ট ফর্মুলেশন, চামড়া প্রক্রিয়াকরণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর।
পরিবেশগত দূষণ নিয়ন্ত্রণে উপকারী অণুজীবের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বায়োসারফ্যাক্ট্যান্ট-উৎপাদনকারী অণুজীবের মাধ্যমে তেল ছড়ানো পরিষ্কারকরণ, প্লাস্টিক ও ভারী ধাতু অপসারণ এবং বায়োরেমিডিয়েশনের কৌশল নিয়ে কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো রাসায়নিক পদ্ধতির পরিবর্তে জৈবিক, পরিবেশবান্ধব সমাধান তৈরি করা।
আমরা গুরুত্বপূর্ণ অণুজীব আইসোলেটের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সিং, অ্যানোটেশন এবং তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে তাদের জিনগত গঠন, বিপাকীয় পথ এবং কার্যকরী বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করছি। Limosilactobacillus fermentum এলএবি-১ এবং Pantoea dispersa পিজিপিআর-২৪ সহ বিভিন্ন স্ট্রেইনের জিনোম বিশ্লেষণ করে আমরা প্রোবায়োটিক, প্যাথোজেনিক ও শিল্প-গুরুত্বপূর্ণ জিন চিহ্নিত করেছি।
গ্লাইকোবায়োলজি আমাদের গবেষণার একটি মৌলিক ভিত্তি। আমরা গ্লাইকোকনজুগেট বিপাক, প্রোটিন এন-গ্লাইকান প্রসেসিং এবং সি-ম্যানোসিল ট্রিপটোফ্যানের ব্যাকটেরিয়াল অবক্ষয় নিয়ে গবেষণা করছি। এই গবেষণা অণুজীবের জটিল শর্করা-ধারণকারী অণু প্রক্রিয়াকরণের প্রক্রিয়া অনুধাবনে সহায়তা করে।
আমরা মেটাবলোমিকস ও মাইক্রোবায়োম বিশ্লেষণের মাধ্যমে অণুজীব সম্প্রদায়ের কার্যকরী বৈশিষ্ট্য এবং বিপাকীয় পথগুলো চিহ্নিত করছি। এর মাধ্যমে আমরা অণুজীব ও তাদের আশ্রয়দাতার মধ্যকার ইন্টারঅ্যাকশন এবং পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি।
ওয়ান হেলথ প্রোবায়োটিকস – ঐতিহ্যবাহী খাদ্য থেকে ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়া আইসোলেশন, প্রোবায়োটিক বৈশিষ্ট্য মূল্যায়ন এবং ওয়ান হেলথ প্রয়োগ।
জৈবসক্রিয় অণু – এক্সোপলিস্যাকারাইড, বায়োসারফ্যাক্ট্যান্ট, পিগমেন্ট, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল যৌগ ও এনজাইমের জৈব রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য ও প্রয়োগ।
অণুজীব বাস্তুবিদ্যা ও এক্সট্রিমোফাইল – ক্ষারীয়, লবণাক্ত ও চরম পরিবেশে অণুজীবের অভিযোজন, বৈচিত্র্য ও কার্যকরী বৈশিষ্ট্য।
উদ্ভিদ–অণুজীব ইন্টারঅ্যাকশন – উদ্ভিদ-বৃদ্ধিকারী রাইজোব্যাকটেরিয়া, পুষ্টি সরবরাহ, স্ট্রেস সহনশীলতা ও টেকসই কৃষি।
মাল্টি-ওমিকস ও ফাংশনাল জিনোমিকস – জিনোম সিকোয়েন্সিং, তুলনামূলক জিনোমিকস, গ্লাইকোমিকস, মেটাবলোমিকস ও বায়োইনফরমেটিক্স।
প্যাথোজেন ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স – খাদ্যজাত ও জুনোটিক প্যাথোজেন, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল সংবেদনশীলতা, বায়োফিল্ম ও রোগ নিয়ন্ত্রণ।
[ প্রথম পাতা ] [ প্রকাশিত প্রবন্ধ ] [ ল্যাব মেম্বার ] [ কন্টাক্ট ]