بسم الله الرحمن الرحيم
الإسلام
الإسلام
A PEACE MAKING PLATFORM
সফল জীবন গড়ার সহিহ পথ
মোটামোটি ৭ টি গুণ হাসিল ও ৫ টি গুণ বর্জন করতে পারলে ইসলাম তথা দ্বীন কায়েম সহজ হয়।
গুণ ৭ টি হলোঃ
১. নিয়ত ২. কালেমা ৩.ইলম ও যিকির ৪.একরামুল মুসলেমীন
৫. সালাত ৬. দাওয়াত ৭. জিহাদ( চুড়ান্ত প্রচেষ্টা)।
দোষ ৫ টি হলোঃ
১. শিরক ২. রীয়া ৩.গীবত ৪. ওয়াহান(দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করা )৫. মিথ্যা।
সংবিধানঃ আল কোরআন।
অনুসরনিয় নেতাঃ হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)।
সদস্য হওয়ার তরিকাঃ
১. মুসলিম প্রার্থী ২. কর্মী ৩. দায়ী ৪. মুসলিম
র্যাঙ্ক এবং বেজ ধারণঃ
১. মুসলিম প্রার্থীঃ *
২. কর্মীঃ * *
৩. দায়ীঃ * * *
৪. মুসলিমঃ * * * *
যদিও কোরআনে "নিয়ত" শব্দটি সরাসরি অনেকবার ব্যবহৃত হয়নি, তবে নিয়তের ধারণা ও তাৎপর্য অনেক আয়াতে প্রতিফলিত হয়েছে।
১. সূরা আল-বাইয়্যিনাহ (৯৮:৫):
"তাদেরকে কেবল এই আদেশই দেয়া হয়েছে যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে একনিষ্ঠভাবে, তাঁরই জন্য দ্বীন কায়েম করে..."
এই আয়াতে "একনিষ্ঠভাবে" শব্দটি নিয়তের গুরুত্ব বোঝায় — ইবাদত কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে।
২. সূরা আল-ইমরান (৩:২৯):
"বল, তোমরা তোমাদের অন্তরে যা কিছু আছে তা প্রকাশ করো বা গোপন রাখো, আল্লাহ তা জানেন..."
মানুষের নিয়ত বা অভিপ্রায় আল্লাহ জানেন এবং সে অনুযায়ী বিচার করা হবে।
১. সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম – প্রথম হাদীস:
"إنما الأعمال بالنيات، وإنما لكل امرئ ما نوى..."
“নিশ্চয়ই সমস্ত কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল, এবং প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নিয়ত অনুযায়ী ফল দেওয়া হবে।”
(সহীহ বুখারী, হাদীস ১)
এই হাদীসটি ইসলামী শরীয়তের অন্যতম মূলনীতি — কোনো কাজের গ্রহণযোগ্যতা নিয়তের ওপর নির্ভর করে।
২. আবু দাউদ, নাসাঈ ও তিরমিজি:
“যে ব্যক্তি দুনিয়া বা কোনো নারীর জন্য হিজরত করে, তার হিজরত সেই উদ্দেশ্যেই গণ্য হবে।”
ইবাদতের চেহারা একই হলেও, নিয়ত অনুযায়ী তার প্রতিদান ভিন্ন হতে পারে।
কর্মের গ্রহণযোগ্যতা নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।
একই কাজ – একাধিক উদ্দেশ্য হতে পারে, ফলে ফলাফলও ভিন্ন হয়।
আল্লাহ শুধু বাহ্যিক কাজ নয়, অন্তরের অভিপ্রায়ও বিচার করেন।
নিয়ত ছাড়া কোনো ইবাদত পূর্ণ হয় না (যেমন সালাত, রোযা)।
২. কালেমার গুরুত্ব
কালেমার গুরুত্ব কুরআন ও সুন্নার আলোকে
কালেমা (كلمة) আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো বাক্য বা ঘোষণা। ইসলামে কালেমা বলতে বোঝানো হয় এমন একটি ঘোষণাকে, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ঈমান প্রকাশ করে। এটি ইসলামের মৌলিক ভিত্তি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কালেমা হলো:
لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ، مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ
(লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ)
"আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসুল।"
আল্লাহর একত্ব (তাওহীদ) প্রতিষ্ঠা:
قُلْ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ ﴿١﴾ ٱللَّهُ ٱلصَّمَدُ ﴿٢﴾
"বলুন, তিনি আল্লাহ, এক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী।"
— [সূরা ইখলাস, ১-২]
وَإِلَـٰهُكُمْ إِلَـٰهٌۭ وَٰحِدٌۖ
"তোমাদের উপাস্য একজনই উপাস্য।"
— [সূরা বাকারা, ২:১৬৩]
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে কালেমার প্রথম অংশ "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" সরাসরি আল্লাহর একত্বকে স্বীকৃতি দেয়।
ঈমানের শর্ত:
فَٱعْلَمْ أَنَّهُۥ لَآ إِلَـٰهَ إِلَّا ٱللَّهُ
"জেনে রাখ, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।"
— [সূরা মুহাম্মদ, ৪৭:১৯]
এ আয়াত ঈমান আনার পূর্বশর্ত হিসেবে কালেমার জ্ঞান ও ঘোষণা করার নির্দেশ দেয়।
জান্নাতে প্রবেশের গ্যারান্টি:
رسول الله ﷺ قال:
"من قال لا إله إلا الله دخل الجنة."
"যে ব্যক্তি বলে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ', সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।"
— [সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৪৩৭]
ঈমানের চূড়ান্ত ঘোষণা:
"أفضل الذكر لا إله إلا الله."
"সর্বশ্রেষ্ঠ জিকির হলো 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'।"
— [তিরমিযী, হাদীস: ৩৫৮৫]
মৃত্যুর পূর্বে কালেমা বললে মুক্তি:
"من كان آخر كلامه لا إله إلا الله دخل الجنة."
"যার শেষ কথা হবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ', সে জান্নাতে যাবে।"
— [আবু দাউদ, হাদীস: ৩১১৬]
এটি ইসলামে প্রবেশের মূল চাবিকাঠি।
এটি ঈমানের প্রথম স্তম্ভ।
এটি তাওহীদের ঘোষণা, যা শিরক থেকে মুক্তি দেয়।
এটি আখিরাতে মুক্তির মাধ্যম।
এটি অন্তরের শুদ্ধি ও আত্মার মুক্তির মূল উপায়।
৩.ইলম (জ্ঞান) ও যিকির (আল্লাহর স্মরণ)
ইলম (জ্ঞান) ও যিকির (আল্লাহর স্মরণ) — এ দুটি বিষয় কুরআনুল কারিমে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা অনেক আয়াতে ইলমের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন এবং যিকিরকে মুমিনের একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
নিচে কোরআন থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আয়াত তুলে ধরা হলো:
আলিম ও জাহিলের তুলনা:
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ
বলুন, যারা জানে ও যারা জানে না—তারা কি সমান?
— সূরা যুমার (৩৯:৯)
ইলমের মাধ্যমে আল্লাহর ভয় হয়:
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
আল্লাহকে তাঁর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই যথাযথভাবে ভয় করে।
— সূরা ফাতির (৩৫:২৮)
জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব:
وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا
এবং বলুন, “হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।”
— সূরা ত্বাহা (২০:১১৪)
যারা আল্লাহকে বেশি স্মরণ করে, তাদের মর্যাদা:
وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
যারা আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, পুরুষ ও নারী—আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন।
— সূরা আহযাব (৩৩:৩৫)
যিকিরের মাধ্যমে অন্তর প্রশান্ত হয়:
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
জেনে রাখো, আল্লাহর যিকিরেই অন্তর প্রশান্ত হয়।
— সূরা রা’দ (১৩:২৮)
যারা আল্লাহর যিকির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়:
وَمَنْ يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَـٰنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ
যে কেউ দয়াময়ের যিকির থেকে বিমুখ হয়, আমি তার জন্য এক শয়তান নিয়োজিত করি, সে তার সঙ্গী হয়ে যায়।
— সূরা যুখরুফ (৪৩:৩৬)
ইলম: মানুষকে আল্লাহর পরিচয়, দ্বীনের সঠিক বুঝ এবং ন্যায়-অন্যায় পার্থক্য শেখায়।
যিকির: অন্তরকে আল্লাহর সাথে সংযুক্ত রাখে, ঈমানকে শক্তিশালী করে।
এই দুইটি মিলে একজন মুসলিমের আধ্যাত্মিক ও জ্ঞানগত পরিপূর্ণতা অর্জন সম্ভব।
ইলম (জ্ঞান) ও যিকির (আল্লাহর স্মরণ) — ইসলাম ধর্মে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি ইবাদত। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এদের গুরুত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুসলমানের জীবন পরিচালনার ভিত্তিই হলো ইলম ও যিকির।
ইলম (জ্ঞান) এর গুরুত্ব — কুরআন ও হাদীসের আলোকে
কুরআনে ইলমের গুরুত্ব:
জ্ঞানীদের মর্যাদা আল্লাহর নিকট উচ্চ:
يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ
“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বহু স্তর উঁচু করেন।”
— সূরা মুজাদালা (৫৮:১১)
জ্ঞান ছাড়া কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়:
فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَـٰهَ إِلَّا اللَّهُ
“জেনে রাখো! আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই।”
— সূরা মুহাম্মদ (৪৭:১৯)
⟶ এখানেও 'ইলম' (জ্ঞান) আগে এসেছে, তারপর 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'।
জ্ঞান অর্জন করা ফরজ:
طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ
“জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরজ।”
— ইবনে মাজাহ, হাদীস: ২২৪
আল্লাহ ভালো পথ দেখান তার মাধ্যমে যাকে তিনি ইলম দেন:
مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ
“আল্লাহ যার জন্য কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের ব্যাপারে ফিকহ (গভীর জ্ঞান) দান করেন।”
— সহীহ বুখারী, হাদীস: ৭১
আলেমের মর্যাদা:
فَضْلُ الْعَالِمِ عَلَى الْعَابِدِ كَفَضْلِ الْقَمَرِ عَلَى سَائِرِ الْكَوَاكِبِ
“একজন আলেমের মর্যাদা একজন আবিদের তুলনায় ঐ রকম, যেমন চাঁদের মর্যাদা অন্য সকল নক্ষত্রের উপর।”
— তিরমিযী, হাদীস: ২৬৮২
যিকিরে অন্তর প্রশান্ত হয়:
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
“নিশ্চয়ই আল্লাহর যিকিরেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।”
— সূরা রা’দ (১৩:২৮)
প্রচুর যিকিরকারীদের জন্য পুরস্কার:
وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
“যারা আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, পুরুষ ও নারী — আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন।”
— সূরা আহযাব (৩৩:৩৫)
আল্লাহর যিকির না করলে শয়তান সঙ্গী হয়:
وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَـٰنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا
“যে দয়াময়ের যিকির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্য এক শয়তান নিয়োজিত করি।”
— সূরা যুখরুফ (৪৩:৩৬)
সবচেয়ে উত্তম আমল:
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِخَيْرِ أَعْمَالِكُمْ... ذِكْرُ اللَّهِ
“তোমাদের কি এমন আমলের কথা বলবো, যা সবচেয়ে উত্তম?… — আল্লাহর যিকির।”
— তিরমিযী, হাদীস: ৩৩৭৭
যিকিরকারী মানুষকে ফেরেশতারা ঘিরে রাখে:
হাদীসে এসেছে, যখন কিছু মানুষ একত্র হয়ে আল্লাহর যিকির করে, তখন ফেরেশতারা তাদেরকে ঘিরে রাখে এবং আল্লাহ তাদের স্মরণ করেন তাঁর নিকটবর্তী সত্তাদের কাছে।
— সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৭০০
যিকিরহীন অন্তর মৃত:
مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّهُ وَالَّذِي لَا يَذْكُرُ رَبَّهُ، مَثَلُ الْحَيِّ وَالْمَيِّتِ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর যিকির করে ও যে করে না—তাদের উদাহরণ জীবিত ও মৃত ব্যক্তির মতো।”
— বুখারী, হাদীস: ৬৪০৭
৪.একরামুল মুসলেমীন" (মুসলিমদের সম্মান করা)
একরামুল মুসলেমীন" (মুসলিমদের সম্মান করা) ইসলামী আদর্শে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কুরআন ও হাদীসের আলোকে এটি শুধু নৈতিক আচরণ নয়, বরং ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। নিচে কুরআন ও হাদীসের আলোকে একরামুল মুসলেমীনের গুরুত্ব তুলে ধরা হলো:
ভ্রাতৃত্ব ও সম্মান প্রতিষ্ঠার আদেশ:
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
"নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে সংশোধন করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।"
— (সূরা হুজরাত, 49:10)
এ আয়াতে মুসলিমদের পারস্পরিক সম্পর্ক ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা একে অপরকে সম্মান করার ভিত্তি।
অহংকার ও অপমান নিষিদ্ধ:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ
"হে মুমিনগণ! কোন জাতি যেন অন্য জাতিকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করে..."
— (সূরা হুজরাত, 49:11)
➤ কারো প্রতি অবমাননাকর আচরণ ইসলামে নিষিদ্ধ, কারণ প্রতিটি মুসলিমের মর্যাদা আছে। হাদীসের আলোকে একরামুল মুসলেমীনের গুরুত্ব
ঈমানের নিদর্শন হিসাবে ভালো ব্যবহার:
قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: "مَنْ لَا يَرْحَمْ لَا يُرْحَمْ"
"যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।"
— (বুখারী ও মুসলিম)
➤ দয়ালু ও সম্মানজনক ব্যবহার মুসলিমদের মধ্যে আবশ্যক।
মুসলিমকে কষ্ট দেওয়া হারাম:
المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده
"প্রকৃত মুসলিম সে, যার মুখ ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।"
— (সহীহ বুখারী, হাদীস: ১০)
➤ এটি মুসলিমদের প্রতি সম্মান ও নিরাপত্তা দেওয়ার সরাসরি শিক্ষা।
এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই:
المسلم أخو المسلم، لا يظلمه، ولا يسلمه، ولا يحقره
"মুসলিম, মুসলিমের ভাই। সে তার প্রতি জুলুম করে না, তাকে অসম্মান করে না, তাকে ত্যাগ করে না।"
— (সহীহ মুসলিম)
একরামুল মুসলেমীনের ফজিলত ও উপকারিতা
মুসলিম সমাজে ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
অহংকার, হিংসা ও বিদ্বেষ দূর হয়।
আল্লাহর রহমত ও সন্তুষ্টি অর্জিত হয়।
পরকালে মহান পুরস্কারের যোগ্যতা সৃষ্টি হয়।
৫.সালাত
সালাত (নামাজ) ইসলামের অন্যতম প্রধান ইবাদত এবং পাঁচটি স্তম্ভের একটি। কোরআন ও হাদীস—দুই জায়গাতেই সালাতের গুরুত্ব অনেকবার এবং জোরালোভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। নিচে কোরআন ও হাদীসের আলোকে সালাতের গুরুত্ব তুলে ধরা হলো
কোরআনের আলোকে সালাতের গুরুত্ব
আল্লাহর নির্দেশ
"তোমরা সালাত কায়েম করো এবং যাকাত প্রদান করো, আর রুকু করার সাথে রুকু করো।"
— সূরা আল-বাকারা: ৪৩
মুমিনের বৈশিষ্ট্য
"নিশ্চয়ই মুমিনরা সফল হয়েছে, যারা তাদের সালাতে বিনীত।"
— সূরা আল-মু’মিনূন: ১-২
সালাত অবহেলা করলে শাস্তির হুমকি
"অতঃপর তাদের পরে এমন এক প্রজন্ম এসেছে যারা সালাত ত্যাগ করেছে এবং খেয়াল-খুশির অনুসরণ করেছে, সুতরাং তারা শীঘ্রই গোমরাহিতে নিপতিত হবে।"
— সূরা মারিয়াম: ৫৯
কিয়ামতের দিন প্রথম প্রশ্ন
"নিশ্চয়ই সালাত নিষ্ঠুরতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।"
— সূরা আনকাবুত: ৪৫
ইসলামের স্তম্ভ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত: ... সালাত কায়েম করা..."
— (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
সালাত ত্যাগ করা কুফরীর সমতুল্য
রাসূল ﷺ বলেন:
"আমাদের আর তাদের (কাফিরদের) মধ্যে পার্থক্য হলো সালাত; যে তা ত্যাগ করলো, সে কুফরি করলো।"
— (তিরমিজি)
প্রথম জিজ্ঞাসাবাদ হবে সালাত নিয়ে
"কিয়ামতের দিন বান্দার আমল থেকে সর্বপ্রথম যার হিসাব নেওয়া হবে তা হলো সালাত। যদি তার সালাত ঠিক থাকে, তাহলে সে সফল ও মুক্তিপ্রাপ্ত হবে।"
— (তিরমিজি, হাদীস: ৪১৩)
সালাত গুনাহ মোচন করে
"যে ব্যক্তি ভালভাবে অজু করে এবং সালাত আদায় করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ হয়ে যায়।"
— (সহীহ বুখারী)
আল্লাহর সাথে সরাসরি সংযোগ।
আত্মিক প্রশান্তি ও চরিত্রের পরিশুদ্ধি।
গুনাহ মাফের মাধ্যম।
জান্নাতে প্রবেশের পথ।
পরকালে মুক্তির প্রথম শর্ত।
দাওয়াত শব্দটি আরবী "দা‘ওয়াহ" (دعوة) থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো ডাকা, আহ্বান করা। ইসলামি পরিভাষায়, দাওয়াত বলতে বোঝানো হয় মানবজাতিকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা, তাদেরকে তাওহীদ, নবুয়ত ও পরকাল সম্পর্কে অবগত করা এবং ইসলামি জীবনব্যবস্থার দিকে ফিরে আসতে উৎসাহিত করা।।
কোরআনে দাওয়াতের গুরুত্ব:
“তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।”
(সূরা আন-নাহল ১৬:১২৫)
এই আয়াতে আল্লাহ সরাসরি রাসূল (সা.) ও তাঁর অনুসারীদের আদেশ দিয়েছেন দাওয়াতের কাজ করার জন্য।
২. সর্বোত্তম উম্মতের গুণ:
“তোমরা তো শ্রেষ্ঠ জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্য গঠিত। তোমরা সৎ কাজের আদেশ দাও এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করো…”
(সূরা আলে ইমরান ৩:১১০)
দাওয়াত দেওয়ার কাজই মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম কারণ।
“আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যেই একজন রাসূল প্রেরণ করেছি, (যিনি বলেছেন) ‘তোমরা আল্লাহর এবাদত করো এবং তাগুত থেকে দূরে থাকো।’”
(সূরা নাহল ১৬:৩৬)
প্রতিটি নবীই ছিলেন একজন দাঈ (দাওয়াতদাতা)।
"আল্লাহর কসম, যদি তোমার মাধ্যমে একজন মানুষও হেদায়াতপ্রাপ্ত হয়, তবে তা তোমার জন্য লাল-উটের চেয়েও উত্তম।"
(সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
অর্থাৎ, একজন মানুষকে ইসলামের পথে আনানো বিশাল পুরস্কার।
"তোমরা যদি কেউ খারাপ কিছু দেখো, তাহলে তা হাত দিয়ে বদলাও; না পারলে মুখ দিয়ে; আর তাও না পারলে মনে করো—এটাই ঈমানের দুর্বলতম স্তর।"
(সহীহ মুসলিম)
সমাজে ভালোর আহ্বান ও মন্দ থেকে নিষেধ করার মাধ্যমেই দাওয়াত কার্য সম্পন্ন হয়।
“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে…”
(সূরা আলে ইমরান ৩:১০৪)
এই আয়াত ও হাদিস প্রমাণ করে, দাওয়াত শুধু নবীদের কাজ নয়, বরং উম্মতের সবার দায়িত্ব।
৭.জিহাদ
ইসলামে জিহাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তৃত ধারণা, যা কেবলমাত্র যুদ্ধের সাথে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা আল্লাহর পথে সর্বাত্মক চেষ্টা ও আত্মত্যাগকেই বোঝায়। জিহাদের গুরুত্ব কুরআন ও হাদীস উভয় স্থানেই বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে।
কুরআনের আলোকে জিহাদের গুরুত্ব:
"আর যারা আমাদের পথে সংগ্রাম করে, অবশ্যই আমি তাদের আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গে আছেন।"
— সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:৬৯
২. জিহাদকারী আল্লাহর কাছে মর্যাদাসম্পন্ন:
"তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যারা জিহাদ করেছে, আল্লাহ তাদেরকে অপরদের উপর মর্যাদা দিয়েছেন..."
— সূরা আন-নিসা, ৪:৯৫
"তুমি কাফেরদের আনুগত্য করো না এবং এ কুরআনের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে এক মহা জিহাদ করো।"
— সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৫২
(এখানে “জিহাদ” শব্দটি যুদ্ধ নয়, বরং যুক্তি, দাওয়াহ ও কুরআনের মাধ্যমে সংগ্রামের কথা বলা হয়েছে।)
"এক ব্যক্তি রাসূল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করল, 'সবচেয়ে উত্তম কাজ কোনটি?' তিনি বললেন: ‘আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা।’ সে বলল, ‘এর পরে?’ তিনি বললেন: ‘আল্লাহর পথে জিহাদ।’"
— সহীহ বুখারী, হাদীস: ২৬
যদিও এটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত হাদীস — "আমরা ছোট জিহাদ থেকে বড় জিহাদে ফিরে এসেছি — নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ", এই হাদীসটি কিছুটা দুর্বল সূত্রে বর্ণিত। তবে এর অর্থ ইসলামী দর্শনে বিশ্লেষিত হয়।
নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ
নিজের কামনা-বাসনা, গুনাহ, অলসতা ও শয়তানী ধোঁকা থেকে বাঁচার সংগ্রাম
শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ
কুপ্ররোচনা, সন্দেহ ও বিভ্রান্তি দূরীকরণ
অপরাধ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিহাদ
সমাজ সংস্কার, দাওয়াহ ও আমর বিল মা'রূফ ও না-হি আনিল মুনকার
শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারী জিহাদ
বৈধ পরিস্থিতিতে মুসলিমদের আত্মরক্ষা বা নির্যাতিতদের সাহায্য।
৫ টি ক্ষতিকর দোষঃ
১.শিরক
ইসলামে শিরক (অর্থাৎ আল্লাহর সঙ্গে কাউকে বা কিছুকে অংশীদার করা) সবচেয়ে বড় গুনাহ হিসেবে বিবেচিত। কুরআন ও হাদীসে এর ক্ষতি ও পরিণতি সম্পর্কে অত্যন্ত কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
আল্লাহ বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করেন না, যে ব্যক্তি তাঁর সাথে শিরক করে। তবে তিনি যাকে ইচ্ছা, তা ছাড়া অন্য গুনাহ মাফ করে দেন।"
— সূরা আন-নিসা (৪:৪৮)
"যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠাঁই হবে জাহান্নামে।"
— সূরা আল-মায়িদা (৫:৭২)
আল্লাহ বলেন:
"তোমার প্রতি এবং তোমার পূর্ববর্তী নবীদের প্রতি এটি ওহি করা হয়েছে: যদি তুমি শিরক করো, তবে তোমার সব আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তুমি অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।"
— সূরা যুমার (৩৯:৬৫)
শিরক মানুষকে আল্লাহর প্রতি খাঁটি ভরসা, ভালোবাসা এবং ভক্তি থেকে সরিয়ে দেয়। ফলে, সে নানা ধরনের কুসংস্কার, ভ্রান্ত বিশ্বাস ও অপবিত্র উপাসনায় লিপ্ত হয়।
যখন মানুষ অনেক "মালিক" ও "অধিপতি" বানায়, তখন তারা তাদের স্বার্থ অনুযায়ী ধর্ম তৈরি করে, যা মানুষকে ন্যায়ের বদলে অন্যায়ের দিকে ধাবিত করে।
শিরককারীর জন্য কিয়ামতের দিন কোনো সুপারিশ বা মুক্তির আশা নেই যদি সে তাওবা ছাড়া মৃত্যুবরণ করে।
২.রীয়া
ইসলামে রীয়া (রিয়াকारी) একটি মারাত্মক গুনাহ ও শিরক (অংশীদারিত্ব) এর একটি রূপ হিসেবে বিবেচিত হয়। রীয়া অর্থ হলো — লোক দেখানোভাবে ইবাদত করা, যাতে মানুষ প্রশংসা করে বা ভালোভাবে চিন্তা করে। এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে মানুষের সন্তুষ্টি ও প্রশংসা অর্জনের উদ্দেশ্যে কাজ করা।।
রীয়া শব্দটি এসেছে "রা-আ-ইয়া" থেকে, যার অর্থ হচ্ছে দেখানো। ইসলামী পরিভাষায় রীয়া হলো —
আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য না করে মানুষকে দেখানোর জন্য ইবাদত করা বা ভালো কাজ করা।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
"অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাজ আদায়কারীদের জন্য, যারা তাদের নামাজে অমনোযোগী — যারা লোক দেখানোর জন্য কাজ করে।"
— (সূরা মাউন, আয়াত ৪-৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“আমি তোমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটি নিয়ে ভয় করি তা হলো — ছোট শিরক।”
সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ছোট শিরক কী?
তিনি বললেন: “রীয়া।"
— (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: 23630)
এটি ইখলাস (বিশুদ্ধ নিয়ত) নষ্ট করে।
ইবাদতের পুরো সওয়াব নষ্ট করে দেয়।
এটি শিরকের একটি সূক্ষ্ম রূপ।
মানুষকে আল্লাহর পরিবর্তে মানুষের সন্তুষ্টির দিকে ঝুঁকিয়ে দেয়।
নিজের নিয়ত বারবার যাচাই করা – আমি কী আল্লাহর জন্যই করছি?
একাকী ইবাদতের অভ্যাস করা – যেমন: রাতের তাহাজ্জুদ, গোপনে দান।
আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া – “হে আল্লাহ! আমায় রীয়া থেকে রক্ষা করো।”
নিয়মিত আত্মসমালোচনা ও আত্মবিশ্লেষণ।
ইসলামে গীবত (غِيْبَةٌ) বা পরনিন্দা একটি বড় গোনাহ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কুরআন ও হাদীস অনুযায়ী গীবতের বিভিন্ন ক্ষতি বা লোকসান রয়েছে, যা একজন ব্যক্তির দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনকেই প্রভাবিত করে। নিচে গীবতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ লোকসান তুলে ধরা হলো:
গীবত করা সরাসরি আল্লাহর নির্দেশনার বিরুদ্ধে যাওয়া। কুরআনে বলা হয়েছে:
"তোমাদের কেউ কি পছন্দ করবে যে, সে তার মৃত ভাইয়ের মাংস খাবে? নিশ্চয়ই তোমরা তা ঘৃণা করো।"
(সূরা হুজুরাত, ৪৯:১২)
এখানে গীবতকে মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে—এটি যে কতটা ঘৃণ্য ও গর্হিত, তা বুঝানোর জন্য।
গীবত করলে নিজের নেক আমল সেই ব্যক্তিকে দিয়ে দেওয়া হয়, যার সম্পর্কে গীবত করা হয়েছে। হাদীসে এসেছে:
"কেয়ামতের দিনে একজন ব্যক্তির নেক আমল থেকে কেটে কেটে দেওয়া হবে তার দ্বারা কষ্টপ্রাপ্ত মানুষদেরকে, যদি তার আমল শেষ হয়ে যায়, তবে তাদের গোনাহ তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।"
(সহীহ মুসলিম)
গীবতের মাধ্যমে সমাজে মানুষের মধ্যে বিশ্বাসহীনতা, বিদ্বেষ ও মনোমালিন্য তৈরি হয়। এতে মুসলিম সমাজ একতা হারায়, যা ইসলামে খুবই নিন্দনীয়।
গীবত মানুষের হৃদয়কে অপবিত্র করে এবং তাতে হিংসা, অহংকার ও বিদ্বেষ জন্ম নেয়। এতে আল্লাহর প্রতি খাঁটি সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
হাদীসে এসেছে, রাসূল (সা.) দুইজন কবরে শাস্তি ভোগ করছে এমন দেখতে পান। তিনি বলেন:
"তারা বড় কোনো গোনাহে শাস্তি পাচ্ছে না মনে করছো? বরং এরা একজনে গীবত করত, আরেকজন প্রস্রাব থেকে সতর্ক হতো না।"
(সহীহ বুখারী)
কারো দোষ দেখলে দোয়া করা উচিত, যেন সে সংশোধন হয়।
পরামর্শ বা সংশোধনের উদ্দেশ্যে গীবত নয়, বরং সরাসরি তাকে ভালোভাবে বোঝানো উত্তম।
নিজেকে আত্মসমালোচনায় অভ্যস্ত করা উচিত, যেন অন্যকে দোষারোপ না করি।
"ওয়াহান (الوهْن)" একটি আরবী শব্দ, যার অর্থ হচ্ছে দুর্বলতা বা নরমভাব, বিশেষত মনোবল ও আত্মিক শক্তির দিক থেকে। ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ওয়াহান একটি নেতিবাচক অবস্থা, যা মুসলিম সমাজ বা উম্মাহর পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি বিখ্যাত হাদীসে ওয়াহান সম্পর্কে বলেন:
**"এক সময় আসবে, যখন জাতিগুলো তোমাদের (মুসলিমদের) বিরুদ্ধে একত্র হবে, যেমন লোকেরা থালার চারপাশে জড়ো হয়।" সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল, তখন কি আমরা সংখ্যায় কম হবো?" তিনি বললেন, "না, বরং তোমরা তখন সংখ্যায় অনেক হবে, কিন্তু তোমরা ফেনার মতো হবে। আর আল্লাহ তোমাদের শত্রুদের অন্তর থেকে তোমাদের ভয় উঠিয়ে নেবেন এবং তোমাদের অন্তরে 'ওয়াহান' ঢুকিয়ে দেবেন।" সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল, ওয়াহান কী?" তিনি বললেন, 'দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা ও মৃত্যুর প্রতি ঘৃণা।'"
হাদীসটি পাওয়া যায়: আবু দাউদ: ৪২৯৭
আত্মিক দুর্বলতা সৃষ্টি করে:
আল্লাহর উপর নির্ভরতা কমে যায়, ফলে ঈমান দুর্বল হয়।
জিহাদের স্পৃহা নষ্ট করে:
মৃত্যুভয় এবং দুনিয়ার মোহে পড়ে মুসলিমরা ইসলামের জন্য আত্মত্যাগে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে।
শত্রুদের দমন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে:
মুসলিম জাতির ঐক্য ও শক্তি লোপ পায়, এবং তারা অন্য জাতির দ্বারা শোষিত হয়।
নৈতক ও আদর্শগত পতন:
মুসলিমরা তাদের ইসলামী চেতনা ভুলে যায়, এবং দুনিয়াবি সুখ-সুবিধা অর্জনকেই জীবনের লক্ষ্য বানায়।
উম্মাহর ঐক্য বিনষ্ট হয়:
একতা, সহানুভূতি ও পারস্পরিক সহায়তার বদলে হিংসা, ঈর্ষা ও স্বার্থপরতা বাড়ে।
দুনিয়াবি মোহ কমানো – কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনযাপন করা।
আখিরাতের প্রস্তুতি – মৃত্যুকে ভয় না করে, আখিরাতের চিন্তায় আত্মনিয়োগ।
ঈমান মজবুত করা – কুরআন অধ্যয়ন, ইবাদত ও তাকওয়া চর্চা।
একতা বজায় রাখা – মুসলিমদের মধ্যে সহমর্মিতা ও সহযোগিতা বাড়ানো।
৫.মিথ্যা
ইসলামে মিথ্যা বলাা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং এটি একটি বড় পাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। কুরআন ও হাদীসে মিথ্যার বিরুদ্ধে অনেক কঠিন সতর্কতা এসেছে। নিচে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মিথ্যার ব্যাপারে আলোচনা করা হলো:
সূরা হজ 22:30
"বস্তুত মিথ্যা কথা থেকে দূরে থাকো।"
এখানে আল্লাহ্ স্পষ্টভাবে মিথ্যা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
সূরা আন-নহল 16:105
“যারা আল্লাহর আয়াত বিশ্বাস করে না, তারাই মিথ্যা উদ্ভাবন করে এবং তারাই মিথ্যাবাদী।”
এই আয়াতে মিথ্যাবাদীদের ঈমানহীনদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
সূরা আল-আহযাব 33:70
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্য কথা বলো।”
এই আয়াতে আল্লাহ সততা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন।
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"সততা কল্যাণের দিকে নিয়ে যায়, আর কল্যাণ জান্নাতের দিকে। আর মানুষ সততার উপর থাকলে সে আল্লাহর কাছে সত্যবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়। আর মিথ্যা পাপের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপ জাহান্নামের দিকে। আর কেউ যদি মিথ্যা বলে যেতে থাকে, সে আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়।"
— (বুখারী: 6094, মুসলিম: 2607)
তিরমিযী হাদীস: 1971
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"মুনাফিকের তিনটি লক্ষণ আছে: যখন কথা বলে তখন মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে।"
এটি মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।
সমাজে বিশ্বাসহীনতা সৃষ্টি করে।
কেয়ামতের দিন মিথ্যাবাদী মানুষের জন্য কঠিন শাস্তি নির্ধারিত।