আমি জন্মসূত্রে বাঙালী - বাংলা আমার মাতৄভাষা । এখন অনেকদিন প্রবাসী । তাও মনেপ্রাণে বাঙালী । কিন্তু কেন, সেটা ভাববার প্রয়োজন হল কিছুদিন আগে ।
রোজকার মত সেদিনও ছেলে-মেয়েকে বকাবকি করছিলাম - "একটু বাংলায় বলতে পারো তো । সারাক্ষণই তো ইংরিজি বলছো - একটা ভারতীয় ভাষা জানা থাকলে অনেক কাজও তো দিতে পারে ভবিষ্যতে - আর শুধু বাবা-মা-কে খুশী করতেই নাহয় তাদের culture-এর একটু মান রাখলে" - ইত্যাদি, মানে the usual lecture আর কি । আর তারাও আকাশের দিকে চোখ তুলে, দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে, "yes baba, you have told us before baba” এইসব বলে যথাযথ passive resistance দেখিয়ে যাচ্ছিল । সত্যি কেন যে বলি তা জানি না - লাভ তো হয় ঘোড়ার ডিম । তাই নিয়ে একটু ভাবতে বসে আবিষ্কার করলাম যে ওদের বলার কারণ দূরে থাক, নিজে কেন বাংলা ভাষার চর্চা নিয়ে কোনো সময় বা শক্তি ব্যয় করি তাও ঠিক জানি না । যাঁদের সঙ্গে পরিচয় আছে, তাঁরা জানেন, আমি মাঝে মাঝে বাংলায় নাটক-ফাটক করি, আবৄত্তি করি, গান করার দুঃসাহসও কখনও করি, সময় পেলে লিখি, আর এখন এই পডকাস্ট - মানে বাংলায় কথা কই, বাংলায় হাসি বাংলায় ভাসি বাংলায় totally জেগে রই - কিন্তু কেন রই ?
আমি আমেরিকান । আমেরিকা-প্রবাসী শুধু নই, ভারতীয় নাগরিকত্ব ত্যাগ করে আমেরিকার গণতন্ত্রে যোগ দিয়েছি বেশ অনেকদিনই হলো । "আমেরিকার পাসপোর্ট থাকলে কতো সুবিধা হয়" এরকম একটা সাফাই গেয়েও নয়, আমেরিকান হতে চাই বুঝেই হয়েছি । কর্মসূত্রে যে দেশে এসে পড়ে, অনেকদিন থেকে, যে দেশের প্রতি ভালোবাসা জন্মেছে, শ্রদ্ধা জন্মেছে, যে দেশের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি এবং নিচ্ছি, তার প্রতি আনুগত্য সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় স্বীকার করেছি । সুধী শ্রোতা এতে অনেকেই আমাকে অবজ্ঞা করবেন জানি - প্রসঙ্গত তাঁদের প্রতি বলতে পারি, ভারতসন্তান হিসেবে ভারতবর্ষের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা কিছুমাত্র কম নয়, এবং আমার জন্মভূমির জন্য আমার যেটুকু করা সম্ভব, সেটা আমি ভারতীয় হওয়ার চেয়ে আমেরিকান হয়ে অনেক বেশী ভালো করতে পারছি । কিন্তু সে বিতর্ক আরেকদিনের জন্যে থাক । এখনকার মতো মোদ্দা কথা এই যে, আমি, আমার স্ত্রী, আমরা আমেরিকান, আমার ছেলে-মেয়ে আমেরিকান হয়ে বড় হচ্ছে, আমি সেটাই চাই । তাহলে তাদের বাংলা ভাষা বা সংস্কৄতি শেখাবার জন্য আমার আগ্রহ কেন ? হ্যাঁ মানলাম, প্রতি বাবা-মা-ই চায়, আমার ছেলে-মেয়ে ঠিক আমার মতো হোক । (সেটা কোনো দেশকালেই হয়ে ওঠে না অবশ্য ।) কিন্তু আমেরিকা-নিবাসী আমেরিকান-আমার নিজেরই কি বাংলা সংস্কৄতিচর্চা করার কোনো সার্থকতা আছে ? কিংবা নিজেকে বাঙালী বলে পরিচয় দেবার কোনো অধিকার আছে ?
অধিকারের প্রশ্ন কেন তুলছি ? "আপনি তো আমেরিকান, ভারতীয়ই না, তবে আপনি বাঙালী কিসের" এইরকম কথা কদাচ শুনতে হয়েছে বলে । কিন্তু কি অদ্ভুত কথা ! আগেকার দিনে ধারণা ছিল, কালাপানি পার হলেই ধর্ম যাবে । এখনকার দিনে তো সেরকম মনে করি না । ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে পৃথিবীর সমস্ত ধর্মের মানুষই আছেন, আমেরিকান নাগরিকদের মধ্যেও তাই । ধর্ম আর নাগরিকত্ব যেরকম এক নয়, সেরকমই সংস্কৃতিও নয় । অন্যান্য বংশগত ও জন্মগত ধর্মের মতোই সেটা আমার নিজস্ব, আমার নাগরিকত্বের সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই । কাজেই বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার অধিকার নিয়ে আর মাথা ঘামাচ্ছি না - সে অধিকার আমার ষোলো আনা আছে বলেই ধরে নিচ্ছি ।
সার্থকতার প্রশ্নটা কিন্তু আরেকটু শক্ত । কারণ, যাই বলি না কেন - বাংলা কবিতা-গান-নাটক আমেরিকাতে এখনো প্রধানতঃ বাঙালীদের জন্যই । বাঙালীরাই করেন, বাঙালীরাই দেখেন । আমেরিকার mainstream media-তে এখনো বাংলার খুব বেশী স্থান হয়নি - কোনোদিন নিশ্চয়ই হবে । কিন্তু এখনকার মতো, যখন শিল্প-সাহিত্য চর্চা করি - মঞ্চে উঠেই হোক কি ঘরোয়া আসরেই হোক - তখন যারা করছে আর যারা দেখছে সবাই মোটামুটি জানে কি ঘটছে, কি ঘটবে । অর্থাৎ সংস্কৃতির একটা মুখ্য যে উদ্দেশ্য, শিল্পী ও দর্শকের কথোপকথন এবং পরষ্পরকে আবিষ্কার, তার কোনো অবকাশ থাকে না । তাহলে কেন করছি, কেন দেখছি, কার জন্য করছি, আর কিসের জন্যই বা শুনছি ? আমার বর্তমান দেশকালের বেশীরভাগের যদি আমার সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় না থাকে, তাহলে নিজেদের জন্য নিজেরাই কৄষ্টিসাধনা করার - বা ছেলেমেয়েদের করানোর - কোনো সার্থকতা আছে কি না বলা শক্ত ।
আমেরিকাকে বলা হয় melting pot, সেখানে পৃথিবীর সমস্ত সংস্কৃতি এসে মিশেছে । কিন্তু এসে যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে তা তো নয় । Melting pot তো মানবসভ্যতার ইতিহাসে নতুন কিছু নয় - আর ভারতবর্ষ নিজেই তো তার সবথেকে বড় উদাহরণ । "কেহ নাহি জানে কার আহ্বানে / কত মানুষের ধারা / দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে / সমুদ্রে হল হারা" - মনে পড়ছে ? আর তার ফলে ভারতের সংস্কৃতি যে কতো বৈচিত্র্যময়, কতো বর্ণাঢ্য, তাও তো কাউকে বলে দিতে হবে না । "তারা মোর মাঝে সবাই বিরাজে / কেহ নহে নহে দূর / আমারি শোণিতে রয়েছে ধ্বনিতে / তারি বিচিত্র সুর" - ভারতের ধর্ম, সঙ্গীত, সাহিত্য থেকে বেশভূষা, গৃহনির্মাণ, সবকিছুতেই সেই বিচিত্র সুরের ছাপ ।
আমেরিকার melting pot-এও রন্ধনকার্য আরম্ভ হয়েছে অনেকদিন হলো - আর এখানেও সেই একই কাহিনী । আমেরিকানদের মধ্যে পৄথিবীর প্রায় সমস্ত সংস্কৃতির মানুষ আছেন, নিজের নিজের সাংস্কৄতিক সত্তা হারিয়ে না ফেলেই দিব্যি আছেন । এই ইতালীয়-আমেরিকান, আইরিশ-আমেরিকান, কিউবান-আমেরিকান প্রমুখ আমেরিকান নাগরিকেরা বহু দশক ধরে, নানা কারণে, আমেরিকায় এসেছেন - কেউ নিছক কর্মসন্ধানে, কেউ স্বদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে, কেউ শুধুই ভবিষ্যতের স্বপ্ন চোখে নিয়ে । কিন্তু নিজেদের সংস্কৃতি তাঁরা ভোলেননি - তাঁদের সাংস্কৄতিক প্রাচুর্য এসে বরং দেশটাকে আরো বর্ণময়, বহুমুখ করে তুলেছে । এই বিশাল মিশ্রণ-ভাণ্ডে যেটা তৈরী হচ্ছে, সেটা বৈচিত্র্যহীন ঘ্যাঁট নয়, বরং স্বাদু পাঁচমিশালী তরকারীর সঙ্গে তার তুলনা চলতে পারে - অন্ততঃ আমি তো তাই মনে করি । ভারতীয়-আমেরিকানদেরও এই যাত্রা ইদানীংকালে আরম্ভ হয়ে গেছে - বাংলা সংস্কৃতি এখনো যদি ততোটা এগিয়ে না থাকে, খুব দেরীও নেই নিশ্চয়ই । আমার পূর্বপুরুষের সংস্কৃতি - আমার সংস্কৃতি - যখন আমি চর্চা করব, আমার বর্তমান দেশের প্রতি সেটা আমার অবদান হবে - হোক সে অবদান ক্ষুদ্র । "সেথায় আমিও ধরিব / একটি জ্যোতির রেখা ।" আর melting pot-এর দেশে এ তো শুধু অধিকার নয়, কর্তব্যও বটে ।
আর কর্তব্য আমার নিজের সংস্কৃতির প্রতিও । ভাষা, সংস্কৃতি চিরকালই ক্রমবিবর্তনমান । কিন্তু বিবর্তন আর বিলুপ্তি এক কথা নয় । সুধী শ্রোতাদের বলি - বাংলা সংস্কৃতি আজকে উপদ্রুত । আক্রমণ বাইরের কোনো শত্রুর কাছ থেকে আসছে না - দেশী-বিদেশী কোনো প্রতিবেশীকে এজন্য দোষ দিয়ে লাভ নেই । এমনকি নিজেদের বা পরবর্তী প্রজন্মকেও এজন্য দোষ দিয়ে ফল হবে না । মানবসভ্যতার বিবর্তনের স্বাভাবিক নিয়মে আজকে আমাদের রোজকার জীবনযাত্রার অনেকটা অন্য ভাষা ও সংস্কৃতি জুড়ে থাকে - সে আমরা প্রবাসীই হই, আর নাই হই । তাতে আস্তে আস্তে আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক সত্তা চাপা পড়ে যেতে পারে, এ আশঙ্কা একেবারে অমূলক নয় । অন্য অনেক ভাষার তো তাই হয়েছে । আমরা কেউ তো তা চাই না । কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, পরিবার, কাজকর্ম, সংসার, এসবের পরেও যেটুকু সময় আমাদের থাকে, তাতে আমরা এ নিয়ে কি করতে পারি ?
কোনো বিশেষ সংস্কৃতির মানুষের এক বা একাধিক প্রজন্মের নিজেদের সংস্কৃতিচর্চার কোনো সুযোগ বা উৎসাহ হলো না, আর তার ফলে সেই ভাষা-সংস্কৃতি বিলুপ্তির পথে পৌঁছে গেলো, মানুষের ইতিহাসে এই গল্প নতুন নয় । সাধারণতঃ কয়েক প্রজন্মের অবহেলার পরে এই বিলুপ্তি সম্পূর্ণ হয়ে যায় । আরো পরবর্তী যুগের মানুষ সেই সংস্কৃতি খুঁজলেও পান না - তখন পূর্বপুরুষকে দোষ দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না । যাতে আমাদের তা না হয়, তার জন্যে আমরা দুরকম কাজ করতে পারি । প্রথমতঃ, সংরক্ষণ । বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির সবথেকে উজ্জ্বল নিদর্শনগুলো বারবার বলা, শোনা, পড়া, অনুধাবন করা - এইসবের মধ্যে দিয়ে আমরা প্রত্যেকেই এক-একজ্ন conservator বা সংরক্ষক হতে পারি । দ্বিতীয়তঃ, প্রগতি । ভাষা ও সংস্কৃতি অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত । দৈনন্দিন জীবনের সুখদুঃখ আলোচনা করতে যদি বিদেশী ভাষার শরণ নিতে হয়, যদি বিভাষী সাহিত্যের থেকে নিজের জীবনের অনুরণন বেশী পাই, তাহলে আস্তে আস্তে নিজের ভাষা-সাহিত্যের ওপর টান কমবেই । যুগোপযোগী সাহিত্য-শিল্প রচনা করতে হবে - কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, যে তার মান যেন নীচু না হয়ে যায় - বাংলার অতীতগৌরবের তুলনায়, আর বর্তমান বিশ্বসাহিত্য-শিল্পের তুলনায়, আমাদের রচনা যেন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে । কারণ দর্শক-শ্রোতা-পাঠক কেউই বোকা নন - আর তাঁদের সময়ও সীমিত । "কতরূপ স্নেহ করি / দেশের কুকুর ধরি / বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া" - এরকম আর কেউ করে না, মশাই । ভালো জিনিষ না হলে উঠে যাবো - গিয়ে আবার রবীন্দ্রনাথই পড়ব, বা মায়া এঞ্জেলু ।
নিশ্চয়ই অনেকে বলবেন, এতটা ভয় পাওয়ার কিছু নেই । যথেষ্ট নতুন শিল্পসৃষ্টি চলছে, প্রাচীন গৌরবও ভুলে যাওয়ার কোনো বিশেষ বিপদ হয়নি । তাঁদের বলবো - আপনাদের মুখে ফুল-চন্দন পড়ুক, আপনারাই যেন ঠিক হন, আমারই যেন ভুল হয়ে থাকে । কিন্তু সাধ্য অনুযায়ী যতটুকু পারি করতে ক্ষতি তো কিছু নেই । তাইজন্যেই বাংলায় কথা বলা, নাটক করা, আবৃত্তি - আর এই পডকাস্ট । এই পডকাস্ট প্রধানতঃ সংরক্ষণমুখী । বাংলা সাহিত্যের অতিগৌরবের যেসব কীর্তি, সেগুলোও আমরা কেউ কেউ ভুলতে বসেছি বলে মনে হয় মাঝে মাঝে । এই ইন্টারনেট আর বৈদ্যুতিন মাধ্যম (সোজা বাংলায় যাকে বলে electronic medium) - এর যুগে সংরক্ষণের কাজটা অনেক সোজা হয়ে গেছে - বহু লোকে তা করছেন - তাঁদের সবাইকে আমার সেলাম এবং ধন্যবাদ । আমার নিজস্ব ক্ষুদ্র অবদান - আমি সেই সম্পদের অল্প কিছু আমার যথাসাধ্য রূপদান করছি । তাতে যদি অন্য একজন বাঙালীরও একটু উৎসাহবৃদ্ধি হয় বাংলা নিয়ে, আজই হোক কি কয়েকপ্রজন্ম পরেই হোক, তাহলে তো এই চেষ্টা সার্থক । আর তাও যদি না হয় - আমার নিজের চর্চা করা তো হলো । তাই কোনো ফলের আশা না করেই, এই পডকাস্ট আরম্ভ করছি ।