শ্রোতাবন্ধুরা, "গল্প-কথার আসর"-এর আজকের বৈঠকে যোগদান করার জন্য অনেক ধন্যবাদ । আমি রুদ্র দত্ত । এই এপিসোড থেকে পাট আরম্ভ করবো একটি শ্রুতিপুস্তকের - বিমল কর রচিত একটি উপন্যাসোপম বড় গল্প, "বালিকা বধূ" । বিমল কর-এর রচনা আমরা এই পডকাস্টে আগে পাঠ করেছি - ১৯৫২ সালে প্রকাশিত বিমল কর-এর গল্প "বরফ সাহেবের মেয়ে" দিয়ে তাঁর গল্পের পাঠ বন্ধুবর রাজীব আরম্ভ করেছিলো আমাদের তৃতীয় সীজনে, ১৪২ নম্বর এপিসোডে । তখন তাঁর জীবন ও সাহিত্য নিয়ে রাজীব সংক্ষেপে আলোচনা করেছিলো, এখন আর তার পুনরাবৃত্তি করবো না; কৌতূহলী শ্রোতাবন্ধুরা সেই এপিসোডটি শুনে নেবেন আশা করি । তার পরে বিমল কর-এর বিভিন্ন গল্প এই পডকাস্টে আমরা পাঠ করেছি; কিছু বড়দের গল্প, আর বিশেষ করে কিকিরা-র গল্প, ধর্মগুরু সেজে বসা প্রতারকদের মুখোশ খুলে দেওয়ার জন্য এক অবসরপ্রাপ্ত যাদুকরের অভিযানের যে গল্প ছোটো-বড় সকলের সমান প্রিয় । কিন্তু আজ আপনাদের সামনে নিয়ে আসবো বিমল কর-এর সম্পূর্ণ অন্য এক মেজাজ ।
আজ যে গল্পটি পাঠ করবো, সেটি বিমল কর-এর লেখক জীবনের মাঝামাঝি সময়ে লেখা, কিন্তু মেজাজে, ভাষায়, আর বিষয়বস্তুতে বিমল কর-এর একেবারে প্রথমে দিকের রচনার সঙ্গে তুল্য । শুধু তাই নয়, ১৯৬৭ সালে রচিত হলেও, এই লেখায় রবীন্দ্রপ্রভাব খুব স্পষ্ট । রবীন্দ্রনাথের প্রভাব যে তাঁর কতদিন পরে অবধি কত সাহিত্যিকের উপরে ছায়া ফেলেছিলো, এই উপন্যাস তার একটি নিদাহরণ ।
শুধু ভাষা বা ভাবের উপর পরোক্ষ প্রভাব নয়, এই বিশেষ উপন্যাসটিতে মনে হয় বিমল কর হয়তোবা সজ্ঞানে রবীন্দ্রনাথের অনুসরণ করেছিলেন, সন্দেহ করতে ইচ্ছা হয় যে রবীন্দ্রনাথের প্রতি প্রচ্ছন্ন শ্রদ্ধাঞ্জলি এই উপন্যাস । ১৯৬৫ সালে, রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকীর চার বছর পরে, এই উপন্যাসের প্রকাশ । নামকরণ যে রবীন্দ্রনাথের "খেয়া" কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত একটি কবিতার সঙ্গে এক, তা তো প্রতীয়মান । তাছাড়াও দেখি, যে বিমল কর এর আগে পোনেরো কুড়ি বছর ধরে চলিত ভাষায় লিখছেন, এই উপন্যাস রচনা করার জন্য তিনি বেছে নিয়েছেন সাধু ভাষা - এবং তৎসম দেশজ মিশ্রিত এমন এক সাধু ভাষা, যা রবীন্দ্রনাথের সাবলীল ভাষাকে সহজেই মনে করিয়ে দেয় । কিন্তু এইসব উপর-উপর সাদৃশ্যের কথা পেরিয়ে, আরো গভীর একটি সম্পর্কের আভাস পাই যেন । রবীন্দ্রনাথের "বালিকা বধূ" কবিতাটিতে আছে এক "নবীনা, বুদ্ধিবিহীনা" বালিকার কথা, এখনো যার সংসার বা দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই । কিন্তু কবির মনে আছে গভীর বিশ্বাস, যে যিনি পতি, যিনি দুঃখদিনের ঝড়ে অবলম্বন, তিনি আসলে স্মিতমুখে এই বালিকার বাল্যখেলা দেখেই খুশী, ভবিষ্যতের পূর্ণতার সম্ভাবনার অবিচল প্রতীক্ষারত । অবশ্য রবীন্দ্রনাথের যে কোনো লেখাতেই অনেক স্তর - এই কবিতা পড়ে প্রথমে যুবক স্বামী আর ক্ষুদ্র বালিকা বধূর যে ছবি মনের মধ্যে গড়ে ওঠে, তার চেয়ে গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ সম্ববতঃ কবিতায় অন্তর্নিহিত আছে । কিন্তু ভাবতে ইচ্ছা হয়, ওই প্রথম, নিতান্ত মানবিক ঘরোয়া চিত্রকল্পটিকে এক সম্পূর্ণ কাহিনীর রূপ দিতেই বিমল কর হয়তো রচনা করেছিলেন তাঁর নিজস্ব "বালিকা বধূ" ।
আর একটি ঘরোয়া, মানবিক গল্প হিসেবেই "বালিকা বধূ" আমাদের মন জয় করে নেয় । ১৯৬৫ সালে রচিত এই গল্পের ঘটনাকাল তারও চল্লিশ বছর আগে - অর্থাৎ আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে । যে সময়ের গল্প, পরিণত বয়স্ক যুবক-যুবতীর বিয়েই তখন স্বাভাবিক, বাল-বিবাহের প্রথা একেবারেই উঠে গেছে, কৈশোর-বিবাহও তখন বিরল - কিন্তু একেবারে বেনজির নয় । সেই সময়ে, সেই সমাজে একটি কিশোর নববিবাহিত দম্পতির গল্প "বালিকা বধূ" । শুধু বধূই চোদ্দ বছরের বালিকা নয়, বরের বয়সও মাত্র ষোলো বছর । দুজনেই শুধু অপ্রাপ্তবয়স্কই নয়, অপ্রাপ্তমনস্কও - বাবা-মার সংসারেই দুজনেরই সম্পূর্ণ জীবন । বিয়ে কি, তা নিয়ে কারুরই বিশেষ কোনো ধারণা নেই । বিয়ের দিন দুজনেরই একট বিশেষ গুরুত্ব, প্রাপ্তি, কিন্তু তার পর আবার যে যার বাবা-মা-র কাছে ফেরত, আবার আগের জীবন, স্কুলের পড়াশুনো, কিন্তু তারই মধ্যে একটা উপলব্ধি যে একটা বড় কিছু ঘটে গেছে, একটা সহ্জাত অধিকারবোধ, এই সবই এ গল্পের বিষয়বস্তু । আমাদের আধুনিক মনস্কতায় এই গল্পের সঙ্গে সম্পর্কস্থাপন করা খুব সোজা নয় - এমন একটি গল্প কেমনভাবে এগোবে, তা আন্দাজ করা হয়তো শক্ত । এমন এক পরিস্থিতি থেকে অনেক বিপদ, অনেক জটিলতারও উৎপত্তি হতে পারে, আমাদের আধুনিক মনে হয়তো সেই সব কথাই সহজে আসবে । কিন্তু একশো বছর আগের মধ্যশিক্ষিত বাঙালী সমাজে কৈশোরবিবাহ একেবারে খাপছাড়া কিছু নয় । তাই গল্পের গতি কোনো বিপজ্জনক দিকে মোড় না নিয়ে একটি সুন্দর বাল্যপ্রেমের গল্প হিসেবেই শেষ হয় । আর এইজন্যই হয়তো "বালিকা বধূ" শুধু চিত্তবিনোদন হিসেবেই নয়, শতবর্ষ আগের বাঙালী সমাজের একটি দলিল হিসেবেও আজ আমাদের কাছে মূল্যবান । গল্পটি কিছুটা বিমল করের নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার উপর রচিত কি না, তা সম্বন্ধে আমার কিছুই জানা নেই; কিন্তু এত সাবলীল এবং আন্তরিক এর ভাষা, যে গল্পটি কিছুটা আত্মজীবনীমূলক হলে পাঠক হিসেবে আমি আশ্চর্য হবো না ।
এই উপন্যাস, বা বড় গল্পের, একটি অদ্ভুত কৌতুক এই যে, একেবারে শেষ অধ্যায়ে, শেষ দুতিনটি পাতায়, এই কাহিনী হঠাৎ অনেক বছর এক লাফে পার হয়ে যায় । এই একটি অধ্যায়ে বিমল কর এক অপরিণত কিশোর আর এক প্রৌঢ় চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গী আর জীবনদর্শনের তফাৎ লেখনশৈলীর সূক্ষ্ম কৌশলে আমাদের সামনে তুলে ধরেন । এই শেষ অধ্যায়টি পড়ে শেষ করার পর মনে হয়, এই একটি অধ্যায় লিখতে পারার জন্যই বুঝি বা বাকি পুরো কাহিনীটির অবতারণা । বিভূতিভূষণের সুদীর্ঘ উপন্যাস "পথের পাঁচালী"-র শেষ কয়েক অনুচ্ছেদে এসে যেমন একটা গায়ে কাঁটা দেওয়া অনুভূতি হয়, মনে হয় লেখকের আসল কথা এতক্ষণে বুঝলাম, অত তীব্র না হলেও সেইরকম একটা অনুভূতিরই একটা হাল্কা ছায়া এই গল্পেও ।
আরম্ভ করার আগে এই বই সম্বন্ধে আর দুটি তথ্য বলে নিই । বইটির গোড়ায় উৎসর্গে লেখা আছে - "সেজকাকীমা শ্রীমতী সুবর্ণময়ী কর শ্রীচরণকমলেষু" । একটি বিজ্ঞপ্তিও আছে - "কয়েক মাস আগে ʼবালিকা বধূʼ দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল । পুস্তকাকারে প্রকাশের সময় কিঞ্চিৎ পরিবর্ধন করা হয়েছে । বলা বাহুল্য, এটি দীর্ঘ কাহিনী, উপন্যাস নয় । ৩-১২-৬৫" । আর শ্রোতাবন্ধুদের মনে করিয়ে দিই, এই গল্প এখন আর খুব বেশী পঠিত না হলেও, সেই সময়ে তা খুবই জনপ্রিয় হয়েছিলো । ১৯৬৭ সালেই এই বই থেকে একটি বাংলা চলচ্চিত্র তৈরী হয়, আর ১৯৭৬ সালে আবার হিন্দীতে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয় ।
আরম্ব করছি পাঠ, শ্রুতিপুস্তক বিমল কর রচিত "বালিকা বধূ", এই এপিসোডে প্রথম পর্ব ।