ইংরেজরা প্রথম খেজুরের রস থেকে গুড় এবং চিনি উৎপাদনের যান্ত্রিক কারখানা গড়ে তোলে যশোরে।
তারও আগ থেকেই এই শিল্পে সমৃদ্ধ ছিল যশোর। দেশীয় ময়রাদের হাত ধরেই সুপ্রাচীন কাল থেকে যশোরে খেজুরের রস থেকে গুড় এবং চিনি তৈরি হচ্ছে।ঐতিহাসিক সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোহর খুলনার ইতিহাস বইতে পাওয়া যায়, ১৯০০-১৯০১ অর্থবছরে পূর্ববঙ্গে উৎপাদিত মোট গুড়ের ৭৮ ভাগই যশোরে উৎপাদন হয়েছিলো।
“যশোরের যশ, খেজুরের রস’’এই বাক্যটি যিনি প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন- তার নাম ঠিকানা পরিচয় আজ আর কারও জানা নেই। তবুও দীর্ঘকাল অতিক্রম করে আসার পরও সেই বাক্যটি যশোরের ক্ষেত্রে আজও সমভাবে প্রাসঙ্গিক।
খেজুর গুড়ের স্বাস্থ্যগুণঃ
খেজুরের গুড় কেবল পিঠা-পায়েস নয়, নানা অসুখের প্রতিরোধক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এমনকি, আয়ুর্বেদশাস্ত্রেও এই গুড়ের নানা ব্যবহার রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খেজুরের গুড়ের আয়রন শরীরের জন্য উপকারী। চিনি বা কৃত্রিম চিনির চেয়ে এটি অনেক উপকারী। চিনি নিয়ে চিকিৎসকদের নানা দ্বিমত থাকলেও খেজুরের গুড় নিয়ে কোনো মতভেদ নেই।’
🍂 চিনির বিকল্প গুড়। চিনির কার্বোহাইড্রেট শরীরে জমে। কিন্তু গুড়ের কার্বোহাইড্রেটের ক্ষেত্রে সে সমস্যা নেই। তা রক্তের সঙ্গে দ্রুত মিশে যেতে পারে আবার রক্তে বেশিক্ষণ থাকতেও সক্ষম।
🍂 এই গুড় হজমে সাহায্যকারী উৎসেচকের শক্তি বাড়ায়। ফলে খাবার দ্রুত হজম হয়, বদহজমজনিত সমস্যাও থাকে না।
🍂 খেজুর গুড়ে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে আয়রন। যা অ্যানিমিয়া প্রতিরোধ করে। শরীরে আয়রনের অভাব ঘটলে হিমগ্লোবিনের ঘাটতি হয় ফলে নানারকম সমস্যার সৃষ্টি হয়। প্রতিদিন অল্প পরিমাণে গুড় খেলে শরীরে আয়রনের ঘাটতি কমতে পারে।
🍂 পিরিয়ডের সমস্যা মেটাতে এই গুড় কার্যকর। প্রতিদিন নিয়ম করে অল্প পরিমাণ গুড় খেলে শরীরে হরমোনের সমতা বজায় থাকে।
🍂 হরমোনের সমতা রক্ষা ছাড়াও এনডোরফিন্স বা ‘হ্যাপি হরমোন’-এর ক্ষরণ বাড়িয়ে এই সমস্যাগুলো দূরে রাখে খেজুরের গুড়।
🍂 খেজুর গুড় লিভারকে রাখে সুস্থ। খেজুর গুড়ে রয়েছে প্রচুর পটাসিয়াম ও সোডিয়াম। যা পেশিকে শক্তিশালী করে। অতিরিক্ত মেদ ঝরায়। ফলে, ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে। ব্লাড প্রেশারকে নিয়ন্ত্রণ করে।
🍂 ত্বককে যদি রাখতে চান মসৃণ, বয়স যদি ধরে রাখতে চান, তবে খেজুর গুড় খান। ফুসকুড়ি ও ব্রণ নিরাময়ে নিয়মিত খেজুর গুড় খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
🍂 গুড় শীতকালে শরীরকে গরম রাখে। ফলে ঠাণ্ডা আবহাওয়ার সঙ্গে লড়তে সুবিধা হয়।
খেজুর গুড়ের এত উপকারী গূণ থাকা সত্ত্বেও দিন দিন খেজুরের গুড় দুর্লভ হয়ে উঠছে।
এর কারণঃ শীতকালে শীত নেই। তাই খেজুরগাছে রসই অমিল। ভালো রস পেতে গেলে টানা দিন দশেক তাপমাত্রা ১০-১২ ডিগ্রি বা তার নীচে হবার দরকার হয়। বিশ্ব জলবায়ুতে আমরা জানি বিশ্রী রকমের রকমফের চলছে। মানুষ বিষিয়ে ফেলছে জগৎ মায়ের পরিবেশ। পরিণামে সুস্বাদু, সুগন্ধি নলেন গুড় দুর্লভ থেকে দুর্লভতর হয়ে উঠেছে। কলকাতা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ বিভাগের শিক্ষক উৎপল রায়চৌধুরী জানাচ্ছেন, ‘‘প্রতিকূল আবহাওয়ায় খেজুর গাছে রস নিসঃরণের পরিমাণ অনেক কমে গিয়েছে। রস হয়ে গিয়েছে বিস্তর পাতলা। গন্ধেও ফারাক।’’ এছাড়া গাছি বা শিউলি সংকট রয়েছে যথেষ্ট। সব মিলিয়ে খাটি খেজুরের গুড় যথেষ্ট সংকট চলছে।
সব সমস্যা কাটিয়ে উঠে যশোরের যশ, খেজুরের রস বেঁচে থাকুক আরো হাজার বছর।