কাঠের পেঁচা, গৌর-নিতাই, বর-বউ

হোম পেজ

এই সংখ্যার হোম পেজ

খরা
খরার সঙ্গে লড়াই করছে ণ্ণগোতি কোয়া', ণ্ণমুরিয়া'-রা

সেজ
ফলতা সেজ-এর কারখানার দূষণে অতিষ্ঠ জনজীবনের সুরাহা নেই

আইলা-বিধ্বস্ত সুন্দরবন
নিজেদের বাঁচা-মরা নিজেরাই গড়ে নিয়েছে হতদরিদ্র সুন্দরবনবাসী, নিজেদের মতো করে

সোয়াইন ফ্লু
স্বাস্থ্যবেনিয়া ওষুধ কোম্পানির টাকা খেয়ে সোয়াইন-ফ্লু আতঙ্ক ছড়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

পুকুর চুরি
ণ্ণপুকুর বুজিয়ে ফ্ল্যাট' রেওয়াজ বেহালায়

জল সঙ্কট
প্রতি গ্রীষ্মে পানীয় জলের সঙ্কটে ভোগে বরানগর

ভোপাল ট্র্যাজেডি
প্রধান পার্টিগুলির মদতে কর্পোরেট সংস্থারা মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে

শতবর্ষ
এক সমাজবাদী সত্যাগ্রহী
রেডিমেড রবীন্দ্র সার্ধশতবর্ষ পালন মহেশতলা পুরসভায়

পড়াশুনা
মাধ্যমিক পাশ করে পড়াশুনায় ইতি টানল মহিরামপুরের তিলক, আমিরুলরা

জঙ্গলমহল
যৌথবাহিনী ঘেরা জঙ্গলমহলে বেলপাহাড়ির আশেপাশে (১)

পণ্যপরিচয়
কাঠের পেঁচা, গৌর-নিতাই, বর-বউ

খবরে দুনিয়া
ণ্ণগরিব জনসমাজের বিশ্বকাপ', কেপটাউনে সবার নিমন্ত্রণ
ভারতে আদিবাসীদের ওপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতন বন্ধের দাবি উঠল সুদূর ব্রাজিলে





























পর্ণব দাস, অগ্রদ্বীপ, ২ জুন

 
পাঁচশ' বছর আগে রাজা জনকের রাজত্বকালে গ্রামটির নাম ছিল জনকনগর। এক ক্রুদ্ধ সাধকের অভিশাপে গ্রামটি শ্মশান হয়ে যায়। প্রায় তিনশ' বছর পর একঘর দু'ঘর করে পুনরায় জেগে ওঠে গ্রামটি। নাম হয় নূতনগ্রাম। কাটোয়া সাব ডিভিশনের অন্তর্গত অগ্রদ্বীপ স্টেশন থেকে মিনিট পনেরোর পথ পেরোলেই এই গ্রাম। বছর পাঁচেক হল নতুন পাকা রাস্তা, ইলেক্ট্রিক এসেছে।
 অগ্রদ্বীপ নামটির সাথে মেলাপ্রিয় বাঙালির অনেকেরই পরিচয় আছে। বারোদোলে এখানকার গোপীনাথের মেলা, শান্তিপুরের রাস কিম্বা কেন্দুলীর জয়দেবের মেলা বা গঙ্গাসাগরের মতোই বেশ জনপ্রিয়। আর প্রতিটি মেলাতেই অগ্রদ্বীপ বা নূতনগ্রামের নাম উঠে আসবেই বিশেষ এক পণ্যের হাত ধরে --- কাঠের পেঁচা, গৌর-নিতাই বা বর-বউ।
 অগ্রদ্বীপ স্টেশন থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে পরিতোষ ভাস্করের বাড়ি। বাঁশঝাড়ের ছায়ায় কাজ করছিলেন। পরিচয় পেয়ে নিয়ে গেলেন তাঁর গোডাউন ঘরে। হরেক কিসিমের কাষ্ঠ-সম্ভার --- টি-টেবিল, আয়নার ফ্রেম, টেবিল-ল্যাম্প, কলমদানি, মোবাইল স্ট্যান্ড, ইজিচেয়ার। শিল্প সামগ্রীতে বিবর্তন ও আধুনিকতার ছাপ দেখে অবাক হলাম। প্রকৃত বিষয়টি জানা গেল নতুনগ্রামে ঢোকার পরে। 
 জাতিতে ণ্ণসূত্রধর' বা ছুতোর স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রকৃত পেশা ছিল পাথর খোদাই করা। বর্ধমানের রাজার পৃষ্টপোষকতায় কয়েক ঘর শিল্পীকে বাইরে থেকে এনে আশ্রয় দেওয়া হয় অগ্রদ্বীপের পরবর্তী স্টেশন দাঁইহাটে।
 উল্লেখ্য, এই গোষ্ঠীর শিল্পী নবীন ভাস্করের হাতেই রচিত হয় কলকাতার দক্ষিণেশ্বর ও আদ্যাপীঠের কালীমূর্তি।
 বর্ধমানের রাজার পতনের পর শিল্পীরা পড়েন ফ্যাসাদে। কেন না পাথরের মূর্তি সাধারণ মানুষের কাজে লাগে না বললেই চলে। ফলত শিল্পীর হাতটাকে সম্বল করে তাঁরা বৃত্তি বদলে চলে আসেন দারুশিল্পে। স্থানীয় দিলীপ ভাস্করের কথায়, ণ্ণপ্রথমে আমরা গরুর গাড়ির চাকা বানাতাম। কাজের ফাঁকে ছেলেমেয়েদের খেলার জন্য সাইনি (সজনে) কাঠ দিয়ে পুতুলও বানিয়ে দিতাম।'
 বর্তমানে এদের প্রোডাক্টসের মধ্যে কুড়ি শতাংশ দেবদেবীর মূর্তি, দশ শতাংশ মহান ব্যক্তির মূর্তি, তিরিশ শতাংশ পশুপাখি (বিশেষত পেঁচা) এবং চল্লিশ শতাংশ আকর্ষনীয় ঘর সাজানোর দ্রব্যাদি ও আসবাবপত্র। প্রতিটি জিনিসেই এঁরা নিজস্ব শিল্পরীতির ছাপ রাখতে চেষ্টা করেন। 
 যে কোনও শিল্প গড়ে ওঠার পেছনেই একটা ভৌগোলিক, সামাজিক ও ধর্মীয় পটভূমি থাকে। নতুনগ্রামে বিখ্যাত পেঁচার উৎসসন্ধান করতে গিয়ে জানলাম কৃষি প্রধান রাঢ়ক্ষেত্রে বছরে তিনবার লক্ষ্মীপুজো --- পৌষ-চৈত্র-ভাদ্র। লক্ষ্মীপুজোর বিধি অনুসারে এক সের ধানের চতুর্দিকে চারটি পেঁচার মূর্তি রাখতে হয়। সেই তাগিদেই বাড়ির পুরুষরা বানিয়ে দিত পেঁচা। তারপর তা ছড়িয়ে পড়ে অন্যত্র। 
 আরও জানা গেল স্থানীয় নব্বই শতাংশ পরিবার কৃষ্ণমন্ত্রী বা কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষিত। সেই অনুষঙ্গেই উঠে আসে গৌর নিতাই কৃষ্ণ ইত্যাদি মূর্তির ভাবনা। বর্ধমানের রাজা-রানীর কৃপাধন্য হয়ে তৈরি করে পুতুল রাজা-রানী। 
 নতুনগ্রামের লোকশিল্পীদের এই ইতিহাস ধাক্কা খায় বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় প্লাস্টিক পুতুলের বাজার দখলে। ১৯৫৫ সালে ভারত সরকারের (ডি.সি.হ্যান্ডিক্র্যাফ্‌ট) নজরে আসে তারা। কলকাতার রিজিওনাল ডিজাইনিং সেন্টারের পক্ষ থেকে একটি প্রশিক্ষণ তাদের শিল্পকে ব্যবহারিক করে তুলতে সাহায্য করে। ১৯৬৬-তে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পান শিল্পী শম্ভুনাথ সূত্রধর। শিল্পীদের সরকারি ভাবে ণ্ণভাস্কর' উপাধি দেওয়া দেওয়া হয়। নির্বাচিত কয়েকজন সরকারি ঋণপ্রাপ্তির জন্য মনোনীত হন। এছাড়াও বিভিন্ন আঞ্চলিক মেলা ও হস্তশিল্প মেলাগুলিতে বিনা খরচায় পাঠানোর ব্যবস্থাও হয় প্রতি বছর। কিন্তু স্থানীয় ডিস্ট্রিবিউটরের অভাবে মেলার মরশুম ছাড়া বছরের বাকি সময় বিক্রির উপায় থাকে না। অভাব রয়েছে, নগরের শো-রুমগুলির সাথে এদের সরাসরি যোগাযোগের। 
 গ্রামে ঢোকার মুখেই স্বামী জানকী দাস নূতনগ্রাম উড কাটিং আর্টিসেলস ইন্ডাস্ট্রিয়াল কো-অপারেটিভ লিমিটেডের ট্রেনিং সেন্টার। আলপথের দু'ধারে কাঠিয়া বাবার বাণী লেখা সাইনবোর্ড। অধিকাংশ গ্রামবাসীই তাঁর শিষ্য। গ্রামের ভেতর শান্ত শ্যামল লক্ষ্মীশ্রী। কারোর হেঁসেলে চলছে ধানসেদ্ধ। কারোর উঠোনে ছোটো ছোটো কাঠের টুকরো থেকে বের হয়ে আসছে পেঁচা ।
 মাটির দাওয়ায় আসন পেতে কাঁসার থালায় মধ্যাহ্নভোজ সেরে ফেরার পথে সন্ধ্যে নেমে এসেছে। মহানিমগাছের ফাঁক দিয়ে মুখ বাড়িয়েছে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ। গাছের ডালে বসে থাকা স্থবির-মগ্ন পেঁচাটা রক্ত-মাংসের নাকি কাঠের ঠাহর হল না।
ছবি www.woodcluster-burdwan.com -এর সৌজন্যে।
প্রতি মাসের ১ ও ১৬ তারিখ সংবাদমন্থন প্রকাশিত হবে। ২ টাকার বিনিময়ে আপনার নিকটবর্তী স্টল বা কাগজবিক্রেতার কাছ থেকে সংগ্রহ করুন। সারা বছর ডাকযোগে পাওয়ার জন্য গ্রাহক হ'ন।
বার্ষিক গ্রাহক চাঁদা ৪০ টাকা।
Comments